সংস্কৃতির মেলবন্ধন (ভ্রমণ)

 


সংস্কৃতির মেলবন্ধন (ভ্রমণ)

বাইশ সালের দুর্গাপুজো লক্ষীপুজো সমাপ্ত। এখন একটু কুলিং অফ পিরিয়ড। দিল্লীর বাতাসে গরমের আধিক্য কমেছে। রাতে এসি লাগছে না। আজকাল মোবাইল এ্যপসের কল্যাণে দৈনন্দিন তাপমাত্রা, হিউমিডিটি, দুই সপ্তাহের ভবিষ্যতবাণী সবই হাতের নাগালে।কয়েক বছর আগেও শীতের আমেজ টের পেতাম নারকেল তেল জমা দেখে। কয়েকদিন আগের সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে দেখলাম দিল্লী সরকারের উদ্যোগেফুলওয়ালো কা সায়রঅনুষ্ঠিত হতে চলেছে।


সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠান। দক্ষিণ দিল্লির মেহরৌলি অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু। মেহেরৌলিতে বিশ্ববন্দিত কুতুবমিনার আছে। কুতুবের পিছনে মেহেরৌলি গ্রামে (অধুনা জনস্ফীতির চাপে পরিণত আরবান স্লাম) অবস্থিত, সুলতানেট পিরিয়ডের দর্শনীয় রেলিকসগুলি যেন প্রদীপের তলায় অন্ধকার। যারা কিছুটা ইতিহাস ভালবাসেন, তারা খবর রাখেন, বাকী দিল্লিবাসীর কাছে তা অনাদরের পাত্র হলেও, সেই ঐতিহাসিক নিদর্শন গুলির রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে নানা গল্পগাঁথা। 

কাহিনী শুরুর আগে মেহেরৌলির গুরুত্ব জানতে দিল্লীর ইতিহাসের পিছনের পাতায় একটু চোখ বোলান যাক। মেহেরৌলির জন্মলগ্ন ধরা যায় তখন থেকে যখনআনঙ্গ পাল তোমারকনৌজ থেকে রাজধানী এখানে স্থানান্তরিত করেন (৭৩১ এডি) আনঙ্গপাল টু এর নাতি পৃথ্বীরাজ চৌহান ১১৯২ সালে টার্কিক অরিজিন মহম্মদ ঘোরীর কাছে পরাজিত হলে শুরু হয় দিল্লির সুলতানেট পিরিয়ড (১২০৬-১৫২৬) বর্তমানে তৈরী মেহেরৌলি আর্কিওলজিকাল পার্কের ৮০টিরও বেশী নিদর্শন সাক্ষ্যবহন করে যে সুলতানেট পিরিয়ডে এই জায়গাই ছিল দিল্লীর প্রথম রাজধানী।

ভৌগলিক বিবরণ অনুযায়ী মেহেরৌলি, রাজস্থানের আরাবল্লী হিলসের শেষ ভাগ, এর আরো কিছু পূর্বভাগে অবস্থিত যমুনা তার অববাহিকা। বর্ষার বৃষ্টির জল এই হাল্কা পাহাড়ী অঞ্চলের সানুদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, ছোট ছোট ঝরোকার মাধ্যমে যমুনাতে মিশত। ফলে শীত গ্রীষ্মে জায়গাটা রুক্ষ পাথুরে হলেও, বর্ষার সময় এই অঞ্চলে জল, ফুল, ফলের প্রাচুর্য থাকত। ভৌগলিক বিবরণের সঙ্গত কারণটি এরপরে খোলসা করছি। 

ইতিহাসের আরো কিছু পাতা উল্টে চলে আসা যাক মোঘল বংশের শেষ নবাব বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৩৭-৫৭) তার পূর্বসূরী শাহেনশা আকবর শা টু (১৮০৮-৩৭) সময়কালে।


আকবর টু নামে আকবর হলেও কর্মে মানে হুমায়ুন পুত্র আকবরের কাছাকাছিও ছিলেন না। তার শাসন রেডফোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে দিল্লীর কালচারাল সাইডে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। 

নিম্নলিখিত ঘটনাটিফুলওয়ালো কি সয়রপরম্পরার অরিজিন দর্শায়। আকবর টু কোন কারণে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সিরাজউদ্দীন জাফরের উপর খাপ্পা ছিলেন, এবং মসনদের নেক্সট ইন হেয়ার হিসাবে ছোট ছেলে মির্জা জাহাঙ্গীরকে মনোনীত করতে চাইছিলেন। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ রেসিডেন্ট কমিশনার আর্চিবল্ড সেটন এর বিরোধী ছিলেন। জাহাঙ্গীর খেপে গিয়ে সেটনকে গুলি করেন, কিন্তু সেটা লাগে আর্দালীর গায়ে এবং সে মারা যায়। সেটন জাহাঙ্গীরকে শাস্তি দেন  এলাহাবাদ জেলে পাঠিয়ে। এই ঘটনায় জাহাঙ্গীরের মা বেগম মুমতাজ মহল ভেঙে পড়েন ঠিক করেন মেহেরৌলিতে খাজা কুতুবুদ্দিন বক্তিয়ার কাকি (১১৭৩-১২৩৫) দরগাতে চাদর চড়াবেন। এই দরগার কাছেই আছে যোগমায়া মন্দির। হিন্দু-মুসলীম সম্প্রীতির নিদর্শন হিসাবে, বাহাদুর শাহ হুকুম দেন যে ফুল নির্মিত পাখা দেওয়া হবে মন্দিরে। এই ঘটনাটি ১৮১২ সালের। সেই সময় থেকে বাহাদুর শা জাফরের সময় পর্যন্ত বর্ষার পরে সাধারনত সেপ্টেম্বর মাসে পুরো পুরানো দিল্লি যার নাম ছিল শাহজানাবাদ, সম্রাট তার রাজন্য পরিবারবর্গসহিত চলে আসতেন মেহেরৌলিতে একসপ্তাহের জন্য। তখন জায়গাটা মেলার রূপ নিত। হিন্দুরাও ওই বিশেষ সময়ে দরগাতে ফুল চড়াত। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মের পারস্পরিক সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ ছিল এই ফুল চাদর চড়ানোর রেওয়াজ। ১৯৪২ সালের আগে পর্যন্ত এই প্রথা চালু ছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ৪২ সালের কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্ট শুরু হলে, তদানীন্তন ইংরেজ সরকারডিভাইড এ্যন্ড রুল পলিসিগ্রহন করে এই বাৎসরিক উৎসব বন্ধ করিয়ে দেয়। ১৯৬১ সালে নেহেরু আবার এই উৎসব শুরু করেন। প্রথমদিকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই আসতেন, পরে এই চাদর ফুল চড়ানোর দায়িত্ব যায় দিল্লীর লেফটেনেন্ট গভর্নরের উপর। এটা এখন এক সরকার আয়োজিত অনুষ্ঠান। জনসাধারণের যোগদান সীমিত। 

এবার সদ্যঅর্জিত নিজের অভিজ্ঞতায় ফরে আসি। গতকাল অর্থাৎ ১৩ই অক্টোবর ছিল খাজা বক্তিয়ার কাকি- দরগাতে ফুল চাদর চড়াবার দিন। দিল্লীর রাস্তা যতই চওড়া হোক কি ট্রাফিক সিগনাল কমুক, গাড়ী-ঘোড়া পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, ফলে গাড়ী চলে সাইকেলের গতিতে। এক্ষেত্রে মেট্রো সুবিধাজনক। সঙ্গে যাবে বন্ধুবর গৌতম, আমার দিল্লী সফরের বিশ্বস্ত সঙ্গী। দুইজনে নামলাম ইয়েলো লাইনের কুতুব মিনার স্টেশনে। ফুট ওভারব্রিজ দিয়ে রাস্তা ক্রশ করে দাঁড়িয়ে হেটে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছি। গৌতম একজন বয়স্ককে জিজ্ঞাসা করল রাস্তার হদিশ।


আশ্চর্য ব্যাপার সে নাকি খালি উর্দু জানে, হিন্দি বুঝল না একফোঁটাও। অনেক রেলস্টেশনে দেখেছি উর্দুতে নাম লেখা থাকে। তার মানে এখনো অনেক মুসলীমের কাছে এটাই মাদার টাং। কত কি যে জানার বাকি।

একটা অটো ধরলাম দরগাতে যাওয়ার জন্য। গুগল ম্যাপে হাঁটা পথে দেড় কিমি দেখাচ্ছিল ছত্তরপুর থেকে কুতুব মিনার যাওয়ার মেন রাস্তা থেকে ঢুকলাম একটা ছোট রাস্তায়। একদিকে পাঁচিলের পাশে মেহেরৌলি আর্কিওলজিকাল পার্ক। ডানদিকে প্রসিদ্ধ জামালি কামালি, সেটারও ডানহাতে উত্তরে  কুতুবের উপর পার্ট দেখা যাচ্ছে।আঁকা বাঁকা গলি দিয়ে


অটোওয়ালা একটা মোড়ে ছেড়ে দিল। অনেক লোকের ভীড়। দরগা আরো দুই-তিনশ মিটার এগিয়ে। গলির দুই দিকে নানারকম দোকান। বিরিয়ানীর উদাস করা গন্ধে পা আটকে পড়ছে।
গৌতমকে বল্লামলাঞ্চ করেই বেরিয়েছি, নইলে ঢোকা যেত। গৌতম খুব সাবধানী। আমাকে ভয় দেখাল- “কি তেল দিয়েছে কে জানে, মুরগীর ঠ্যাং গুলো রক্তলাল, খেলে পেটের বারোটা বাজবে।চক্ষুতৃষ্ণা মিটিয়ে এগিয় চল্লাম। নানা রংএর চাদর গোলাপের পাপড়ির থালা সহ দোকান।

আমরাও ফুল চড়াব। দুই থালা ফুল নিলাম। মাথায় ফেজ টুপি নেই। রুমালে মাথা বেঁধে জুতো জমা করে এগিয়ে চল্লাম।

প্রথম
গেটে পুলিশ কিছুক্ষণ আটকাল।  সেটা অতিক্রম করে দরগার মেন ফটকের দিকে চলেছি। মাটিতে কয়েকজন বসে। তবে ঠিক ভিখারী নয়। সবার কাছে খুচরো পয়সা। মনে হল লোকে টাকা ভাঙিয়ে খুচরো নেয় ভিতরে দেওয়ার জন্য।

সঙ্গে চলেছে আরো মেয়ে পুরুষ। সবাই মুসলীম বলেই মনে হল। এর আগে দোকানে বলেছিল এখন উরস চলছে।

বাংলাদেশে থাকতে এরকম মাঝে মাঝে বাস বোঝাই লোক যেত,শুনতাম উরসে যাচ্ছে। মহিলা দেখি নি। সবই পুরুষ। বাসের সামনে ব্যানারে লেখা থাকত উরস।  এটা পালিত হয় কোন সুফি-সন্তের মৃত্যুদিবসে একটা বাৎসরিক রিচুয়াল হিসাবে অনুষ্ঠিত রিলিজিয়াস কংগ্রিগেশন। 

দরগার মেন গেটে এসে ভিআইপি গেরোয় পড়া গেল। পেপারের এ্যড দেখে ভেবেছিলাম একটা জনসাধারণের জন্য সংঘটিত পাবলিক ফাংশান। বাস্তবে তা আদতেই নয়। এল জি মহাশয় প্রধান অতিথি। তার পদার্পনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। ভিআইপি প্রটোকলে পুলিশ কোন চান্স নেয় না। দরগার দরজা কুলুপ আটা। প্রহরারত পুলিশের মুখেও কুলুপ। তারা জানেও না এলজি কখন আসবেন।



উপরওয়ালার আদেশ অনুযায়ী কাজ করছেন।বহুত দূর কলকাত্তাসে রহা হ্যায়বলেও মন গলান গেল না। খালি আশ্বাসবাণী পনদরা মিনিট ওয়েট করিয়ে।পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে”, এই আপ্তবাক্য মাথায় রেখে দরগার পাশে বসে পড়লাম। মোঘল চুলোয় যাক, মোবাইলের সদ্ব্যাবহার করা যাক। কিছুদিন আগে পিএম সাহেব কর্তব্যপথ নিয়ে বক্তৃতাতে ঘন ঘন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন, গোলামীর দিন শেষ, মেন্টালিটি মে বদলাও লানা পড়েগা, বিদেশীবস কালচারকাশিকল তোড়কে বাহার আনা হ্যায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই তাকে উদ্দেশ্য করে প্রথম টুইট বাণ ছাড়লাম, ভিআইপি কালচারের চোটে আধাঘন্টার উপর দাঁড়িয়ে আছি ফাটকের বাইরে।

দেশী আচারে ঢুকে আছে গোলামী কালচার। পাঁচ মিনিটের জন্য এলজি সাহেব এসে চাদর চড়াবেন, তার মাশুল দেবে সাধারণ লোক। পরের টুইট খোদ এলজিকেই। এলজি এখন শুধু ভিআইপি নন, তিনি ডাবল ভি। কেজরিওয়াল সরকারের এক মিনিস্টারকে জেলে পাঠিয়েছেন, আরেকজনের পিছনে ইডি কড়া নাড়ছে। পাশে এক বয়স্কা মহিলা। মন্দিরের ফটকের পাশে খুচরো পয়সা নিয়ে বসে। তিনি বল্লেনসব নেট মে দিখেগা”! ইন্টারনেটের ব্যাপার সবার কাছেই পৌঁছেছে। প্রথমে ভাবছিলাম এলজি আমাদের সামনে দিয়ে যাবেন। ভুল ভাঙল রুক্সানা বিবির কথায়, সামনে বসে থাকা মহিলার নাম।

তার কাছে জানা গেল, অন্যদিকে আরেকটা মোটরেবল রোড আছে। সেটা দিয়েই এলজি আসবেন। জনতা ইষৎ উত্তেজিত, কিন্তু ভারতবাসী সহনশীল জাত, আর সাধারণ লোক জানে, ধৈর্য কষ্ট, ভগবানের দ্বারে কি আল্লার দরবারে পৌঁছানোর চাবিকাঠি। প্রবাদ বাক্যই আছে, “কষ্ট করিলে কেষ্ট মেলে।” তবে কষ্টটা কেষ্টবিষ্টুদের জন্য প্রযোজ্য নয়। দুটি অল্পবয়সী মেয়ে অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। দরগা থেকে কেউ বেরিয়ে দেখছিলেন বাইরেটা। তার হাতে মেয়েদুটি ফুলের থালি ধরিয়ে ফাটকের বাইরে থেকে মোনাজাত করে চলে গেল। রুক্সানা বিবি সব খবর রাখেন। তার কাছে জাফর মহল, জাহাজ মহলের কথা শুনলাম। সব স্থাপনা আশেপাশে ছড়িয়ে আছে। একটা জৈন মন্দির যোগমায়া মন্দিরের কথাও জানালেন। কাল যোগমায়া মন্দিরে পাংখা চড়ান হবে, সেটাও জানালেন। এরপর ভিতরে কাওয়ালির গান মাইকের শব্দে বোঝা গেল এলজি এসে পড়েছেন। মিনিট দশেক পরে ফাটক খুলল। মেন দরগার সামনে চত্বর। ফটো তুলে গেট দিয়ে করিডোরে ঢুকলাম।


একজন বয়স্ক হুজুর করিডোরের পাশে উঁচু জায়গায় বসেছিলেন। সবাই তার কাছে মাথা নত করছে, উনি আশীর্বাদ করছেন। পরে বাইরে ফটো দেখে একজনকে জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল উনি এখানের প্রধান হুজুর। এর পরে বক্তিয়ার কাকির সমাধিতে ফুল চড়ালাম।

এই বক্তিয়ার কাকির শিষ্যর শিষ্য হলেন বিখ্যাত নিজামুদ্দিন আউলিয়া যার নামে দিল্লীর নিজামুদ্দীন ব্রীজ, নিজামুদ্দীন রেল স্টেশন। আমি নমস্কার করলাম, গৌতম দেখলাম দুহাত বুকের পাশে রেখে দোয়া চাইছে। বেরিয়ে দেখি চত্বরে কাওয়ালি গান চলছে।


একজন বল্ল, কাওয়ালি সারা রাত ধরে চলবে। পাশের গলি দিয়ে জাহাজ মহল যাওয়ার রাস্তা। গৌতম গেল ফুলের দোকানে জলের বোতল ফেলে এসেছিল, সেটা খুঁজতে। গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছি, পাশের বেঞ্চে একটি ইয়াং ছেলে বসেছিল। তার সঙ্গে খেজুরে গল্প জুড়লাম। লোকাল ছেলে, নাম সামাদ, তার মা, দাদির জন্মও এই মহল্লায়। সামনের দশ বাই বিশ ফুট জমির উপর দোতলা বাড়ীটা ওর আব্বু ৯৭/৯৮ সালে কিনেছিল।দেখলাম খালি বাড়ীর রিনোভেশনের কাজ শেষ। আগে ওর চিকেনের দোকান ছিল।এবার মেডিসিন শপ খুলবে। উপরের রুমটা ভাড়ার জন্য। দূর থেকে পুণ্যার্থী আসে।।তারা অনেক সময় এক রাতের জন্য ভাড়া নেয় রুম। কথার মাঝে গৌতম এসে পড়ল। বোতল আসে নি। জানাল- দোকানের ছেলেটা ইতিমধ্যে বোতলের তলানি রেখে বাকীটা সাবাড় করেছে। তলানিটাও তাকেই দান করে গৌতম ফিরে এসেছে। কিছুটা এগোতেই অপেক্ষাকৃত চওড়া রাস্তার দুদিকে পুলিশ সিভিক ভলেন্টিয়ারের আধিক্য দেখে বোঝা গেল, এটাই এলজির গমনপথ।

দিল্লি পুলিশ দিল্লি সরকারের অধীনে নয়, সেন্টারের অধীন, পুলিশের আধিক্যে সেটাই মনে করিয়ে দিল।যিসকা ডান্ডা, উসকা ভৈঁস।একটু এগিয়ে দেখি বিশাল এক তোরণ, দুর্গে ঢোকার গেটের মত উঁচু গেট। ওর তলাতেই গোটা দশেক গাড়ী, মায় এ্যম্বুলেন্সও আছে। তার মধ্যে ঢাউশ কালো লিমুজিন, ফ্লিটের শোভাবর্ধন করছে। এলজি নাকি ভিতরে কাওয়ালি শুনছেন। রাজপ্রসাদটার নাম জাফর মহল। বাহাদুর শাহ জাফর এটা বানিয়েছিসেন। এএসআই অধিকৃত বিল্ডিংএ সাধারনের প্রবেশ নিষেধ। হয়ত কখনো রিনোভেট হয়ে টিকিট কেটে  এনট্রি হবে। 

দুইপাশে সারি সারি দোকানের পাশ দিয়ে চলেছি। একটা দোকানে দেখলাম নানা সাইজের হুকো বিক্রি হচ্ছে। গৌতম বল্ল “ভালই হল, নাটক করতে অনেক সময় হুঁকো লাগে, পরে এখান থেকে কিনে নিয়ে যাবে।”


 বাইক আর অটোর চলাচলে ধূলিধূসরিত। গৌতম সাবধান করল, “মাস্কটা লাগিয়ে নে, যে পরিমাণ পলিউশন, নির্ঘাত কাশি হবে।আমি অকুতোভয়। দিল্লির বাতাসের একিউআই বরাবরই সিভিয়ার নয়ত ভেরি সিভিয়ার। মাস্ক আর কি প্রটেকশন দেবে। সাত-আটশ মিটার পরে রাস্তার ডানহাতে পড়ল জাহাজমহল। সামনে একটা খোলা চত্বর। পরশু এখানেই কনক্লুডিং ডে- ফাংশন। প্যান্ডাল স্টেজ বাঁধার কাজ চলছে। সুলতানেট পিরিয়ডের পাথরের স্ট্রাকচার।


পাথরগুলি এসেছে পাশের আরাবল্লী হিলস থেকে।  বিল্ডিংএর উপর বেশ কয়েকটা ছত্রী বা ডোম, ওভারঅল গেটআপ-টাকে আকর্ষণীয় করেছে। এটা তৈরী হয়েছিল সুলতানেট আমলের শেষ ডাইনাস্টি লোধি বংশের শাসনকালে, পনেরশ শতকে। পাশে একটা দিঘীতে প্রতিবিম্ব দেখে জাহাজের মত লাগত বলে এর নাম জাহাজ মহল। 

বেরিয়ে এসে অটো ধরলাম। গন্তব্য কুতুব মিনার। আজকাল, আলোকিত কুতুব মিনার রাত নটা অব্দি খোলা থাকে। এএসআই-এর দেরীতে হলেও বুদ্ধি খুলেছে। গরমের দেশে রাতে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। টিকিট, ক্রেডিট কার্ডে কাটলে ৩৫/- আর ক্যাশে ৪০/- জনগনকে ডিজিটাল পেমেন্ট উদ্বুদ্ধ করার প্রচেষ্টা।



৪০ বছর দিল্লী থাকার সুবাদে কুতুব মিনার অনেকবার এসেছি। সিআর পার্ক থাকার সময়, আশির দশকে শীতকালে উইকএন্ডে, সকালে সাইকেল চালিয়ে আসতাম নিউজপেপার সহযোগে। প্রথম এসেছিলাম ১৯৭৩ সালে, দরিয়াগঞ্জে পিসীর বাড়ী বেড়াতে এসে।তখন দিল্লী ছিল, সাইকেল, টাঙার শহর। পিসেমশাই সাইকেল করে নর্থ বব্লক যেতেন। যাযাবরের লেখা দৃষ্টিপাত বইটাতেও পড়েছি ১৯৪৬ সালে উনি যখন ক্রীপস মিশন কভার করতে দিল্লী আসেন তখনও প্রধান বাহন ছিল সাইকেল। সেই ৭৩ সালে ডিটিসি বাসে করে গিয়েছিলাম। একটু পর থেকেই শহর হারিয়ে গেল, রাস্তার দুই পাশের জঙ্গল দেখতে দেখতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কুতুব পৌঁছেছিলাম। তখন কুতুবের প্রথম তলাটা দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। ৭৬ সালে স্টাম্পেডে ৪৫ জন মারা যায়, অধিকাংশ ছিল স্টুডেন্ট। তারপর থেকে উপরে ওঠা মানা। মনে আছে সিঁড়িগুলো খুব উঁচু ছিল। ফেরত আসার ঘটনাটা মনে আছে। বাসে আমি আর বাবা উঠতেই বাস ছেড়ে দিল। আমরা কলকাতারআস্তে লেডিজ, রোখকেহাঁকডাকে অভ্যস্ত। দিল্লিতে আশির দশকেও, যখন চাকরী সূত্রে আসি, বাসের সওয়ারীর ক্ষেত্রে জেন্ডার ডিসক্রিমিনেশন ছিল না, যদিও সমাজের বাকী স্তরে সেটা দৃঢ় ভাবে প্রোথিত ছিল। আমার চ্যাঁচামেচিতে বাস পঞ্চাশ মিটার এগিয়ে থামল। 

রাতের আলোকিত মনুমেন্ট দেখার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। রাতের রূপ আরো মোহময়ী। তবে মিনার ততসংলগ্ন জায়গাগুলিই দর্শকদের জন্য খোলা। আশেপাশের চত্বরে, যেখানে দিনের বেলা যাওয়া যায় সেখানে রাতে যাওয়া মানা। কারণ সব জায়গা বা রাস্তা আলোকিত নয়। ফটো তোলাই মেন উদ্দেশ্য ছিল সেটাই করলাম।




কুতুব মিনার সবাই দেখেছেন। তাই তার বিবরণ ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে পাতা ভরানোর মানে হয় না। আসার সময় মেট্রো স্টেশন যাওয়ার জন্য অটোতে উঠেছি। অটোওয়ালা বল্ল, কাছেই এক এম্পোরিয়াম আছে। আমারা যদি যাই তবে একটা গ্যাসকুপন পাবে সিএনজি ভরার জন্য। ঘড়িতে আটটা বাজে নি। সম্মতি দিলাম। জ্যামজমাট রাস্তা পেরিয়ে যখন রাজস্থানী এম্পোরিয়ামে পৌঁছালাম, তখন দোকান বন্ধ হওয়ার মুখে। তবে মাড়োয়ারীদের বিজনেস সেন্স শিরায় বইছে। দোকানের লাইট আবার জ্বালিয়ে রাজস্থানী রেজাই, বেডশীট দেখান শুরু হল। তারপর শাড়ী। বাঁধনী, সাঙ্গানেরি প্রিন্টের শাড়ী দেখলাম। কিনব না কিছুই।অস্বস্তি হচ্ছে। কিছু না কিনলেও সেলসম্যানরা জোরজারি করল না, বিদায় দিল হাসিমুখে।অটোওয়ালা বলেছিল দশ মিনিট মিনিমাম থাকতে হবে। ঐটুকু সময় কাটিয়ে আবার মেট্রো স্টেশনে এলাম। এবার নামিয়ে দিল সাকেত মেট্রো স্টেশনে। দশটার মধ্যে ফিরে এলাম বাড়ীতে। মহানগরীতে একটু অন্য ধরণের অভিজ্ঞতা।

দেবদত্ত 

১৩/১০/২২

Comments

  1. বেশ লিখেছ ভায়া! সঙ্গে নিখুঁত ইতিহাসটা উপরি পাওনা! LG র চাদর দেয়ার ব্যাপারটার needs to be circulated nationally😁

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments