পুজোর টিট-বিট (২০২২)

 পুজোর টিট-বিট (২০২২)

পুজো শুরু হতে চলেছে। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। প্যান্ডাল কি ঠিক সময়ে তৈরী হবে? বাঁশের প্যান্ডাল শেষে বাঁশ না হয়ে দাঁড়ায়।


রোজ সন্ধ্যের পর মিটিং। আমিও মাঝে মাঝে প্রেসেন্ট প্লিস থাকি। মিনিস্টার ইউদাউট পোর্টফোলিও। গুরুদায়িত্ব নেই। সর্বঘাটে বিল্বপত্র না হলেও কাঁঠালীকলা তো বটেই। পাবলিক সেক্টরের নিয়ম মেনে রিভিউ মিটিং, টাস্ক ফোর্স গঠন হচ্ছে। শেষের দিনে টেবিলে প্রেসিডেন্ট সাহেবের হাতের সামনে বড়সড় দাঁ। কার ঘাড়ে পড়বে কে জানে!

রাতের মিটিং শেষ। চতুর্থীর রাত। কালকে সন্ধ্যেতে আনন্দমেলা। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল রাজদীপ। পুজো থুড়ি পেটপুজো কমিটির সেক্রেটারীর কর্তাব্যাক্তি। পরনে থ্রী কোয়ার্টার আর টিশার্ট। বল্লাম, “সবাই বাড়ী যাচ্ছে, মিটিং শেষ, তুমি হঠাৎ অসময়ে উদয় হলে?” রাজদীপ বল্ল-“দাদা, তিনদিন ধরে বাড়ীতে নেই, “অফসাইটকরছি। পাওয়ার প্লান্টে চাকরীর সুবাদে আমরা জানতাম বিদ্যুত উৎপাদনের মেন যন্ত্র, টারবাইন-জেনারেটার যেখানে থাকে সেটা হলমেন প্ল্যান্ট”, আর দূরের কয়লা, জল ইত্যাদি অক্সুলিয়ারি সিস্টেমের জায়গা হলঅফসাইট সেই লজিক মিলিয়ে ভাবলাম ঠাকুরের বেদী আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জায়গামেন প্ল্যান্টআর ভোগ রান্নার জায়গাটাঅফসাইট বল্লাম -“ আচ্ছা, ভোগের জায়গায় ছিলে, বুঝেছি। রাজদীপ খোলসা করল,- আজকাল অনেক অফিসই নাকি কয়েকমাস অন্তর অন্তর দুই তিন দিনের জন্য বাইরের কোন রিসর্টে নিয়ে যায়। কাজও হয় আবার রিল্যাক্সেশন ফাউ। এরকম আউটিং এর নাম নাকি আজকাল দেওয়া হয়েছেঅফসাইট সেই প্রবাদ মনে পড়ল-“ অল ওয়ার্ক এন্ড নো প্লে, মেকস জ্যাক ডাল বয়। আজকালের প্রজন্ম এর সারসত্যতা বুঝেছে, আমাদের সময় জেনে বুঝেও শিকল পরা পাখী ছিলাম। প্লান্টে পোস্টিংএর সময় কাছের শহরে সিনেমা দেখতে যেতে গেলেও বসকে বলতে হতবাচ্চোকা কাপড়া খরিদনে যানা হ্যায়।

মিনিস্টার উইদাউট পোর্টফোলিও হলে, সব ডিপার্টমেন্টের মনিটরিং সুবিধা। পঞ্চমীর সকালে গিয়ে দেখলাম দুর্গা মায়ের মুখঢাকা নেই। বোধনের আগে পর্যন্ত মায়ের মুখ কাগজ দিয়ে ঢেকে রাখার নিয়ম। পদ্মলোচনা দেবী দুর্গা চতুর্থী থেকেই স্বমহিমায় উদ্ভাসিতা। কলকাতায় ট্রেনড অবশ্য, মহালয়ার পর থেকেই দর্শক সমাগমে প্যান্ডাল মুখরিত, তাই তাল মিলিয়ে দেবী পূর্ণরূপে দেখা দিচ্ছেন। আমাদের নূতন প্রজন্মের ছেলে আদিত্য স্কুলে পড়ে, তবে পুজোতে তার উৎসাহের খামতি নেই। তাকে পাঠালাম দোকান থেকে একটা ড্রইং পেপার আর ফিতে কিনে আনতে। ৫০/- দিয়ে সে প্রথমে কিনে আনল পাঁচটা শীট। বল্ল , পঞ্চাশ টাকায় কাগজ কিনতে চলে গেল, তাই ফিতে কিনতে পারে নি। বল্লামএক কাজ কর, চারটে শীট ফেরত দিয়ে তার বদলে ফিতে নিয়ে আয়। এবারে আদিত্য নিয়ে এল সুতোর একটা রীল নিয়ে। কি আর করা, সুতোটাকেই গোছা করে কাগজের দুইপাশে লাগিয়ে ঠাকুরের মুখ ঢাকা হল। 

সাধারনত ষষ্ঠীর সন্ধ্যেতে কোন ভিআইপিকে ডেকে পুজোর উদ্বোধন করা হয়। এবার আসছেন দুই দুইবারের নির্বাচিত সিটিং এমএলএ পঙ্কজ সিং। উনার বাবা সেন্টারের হেভিওয়েট মিনিস্টার। এই সুদর্শন ভদ্রলোকটিকে দেখা যায় ইলেকশনের আগে ভোট চাইতে অথবা বড় অনুষ্ঠানের ফিতে কাটতে। এতে অস্বাভিবকতা কিছু নেই, বরঞ্চ জনদরদী হলে চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াত। পরের দিন এমপি সাহেবের আসার কথা ছিল। প্রেসিডেন্ট সাহেব সিল্কের জমকালো এাট্যায়ারে উপস্থিত ছিলেন। এমপি আসতে পারেন নি। একটু চাপে আছেন। ত্যাগী সমাজ তার পিছনে উঠে পড়ে লেগেছে। 

প্যান্ডালের থিম নন্টে ফন্টে, বাঁটুল দি গ্রেট অবিস্মরনীয় কার্টুন ক্যারেক্টর। স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ। যতদূর মনে পড়ছে আমাদের ছোটবেলায়, ষাট সত্তরের দশকে মাসিক শিশুপত্রিকা শুকতারাতে থাকত বাঁটুল দি গ্রেটের সচিত্র গল্প আর কিশোরভারতীতে থাকত নন্টে ফন্টে। বড় বড় হোর্ডিং ঝুলছে প্যান্ডালের চারিদিকে। আজকালকার প্রজন্ম নন্টে-ফন্টে পড়ে না, তাদের পছন্দ সুপারম্যান কি ব্যাটম্যান কি হ্যারি পটার। আমাদের বয়সীদের জন্য নস্টালজিয়া। রিসেপশন কাউন্টারে বসে আছি। একটি ছেলে এসে জানাল সে শক্তি প্রকাশনা বলে একটা নয়ডা বেসব পাবলিশিং হাউসের সেলসে আছে। ওরা স্টল বুক করতে চায়। এরা পুরানো কার্টুন ক্যারেক্টরের উপর নূতন করে আবার বই ছাপছে। এমেরিকাতে কপি রাইট এ্যাক্ট অনুযায়ী লেখকের মৃত্যুর একশ বছর অব্দি রয়ালিটি দিতে হয়, যদিও আমাদের দেশে এটা পঞ্চাশ বছর। 

পঞ্চমীর সন্ধ্যায় আনন্দমেলা। হরেককিসিম খাওয়ার আয়োজন। গৃহিনীরা বাড়ী থেকে খাবার বানিয়ে এনেছেন। তাদের উৎসাহ বর্ধন করতে সকলেই কিছু না কিছু কিনছেন। সঙ্গে গল্পগাছা। মাংসের চপ, ডিমের ডেভিল, নুডল্স, ছানারপোড়া, কি নেই। উদরপূর্তির পর এবছরের নূতন সংযোজন ফ্যাশান প্যারেড, গো এজ ইউ লাইকের উন্নত সংস্করণ। নাম দেওয়া হয়েছে বাঙালীয়ানা। দুই থেকে আশি, সবাই উৎসাহের সঙ্গে ramp walk করলেন। সপ্রতিভ সঞ্চালিকার প্রযোজনা অনুষ্ঠানটিতে এক প্রাণের সঞ্চার করেছিল। সঞ্চালক রোহিতও সমানভাবে সঙ্গ দিল। মনোগ্রাহী অনুষ্ঠান।

পুষ্পাঞ্জলিতে গোটাফুল পাওয়া গেল না। ফুল ছিঁড়ে কয়েকটা পাপড়ি ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশের চেনা ভদ্রলোক কানে কানে বল্লেন, ছেড়া ফুলের পেয়ে মাদুর্গাও ছাড়াছাড়া আশীর্বাদ দেবেন। মন্ত্রেযোগিনীকোটি”… বলতে বলতে ঠাকুরের মঞ্চের উপরে চোখ গেল। চার ডাকিনী যোগিনী ছাদ থেকে কটমট করে চেয়ে ঝুলে আছে।


মনে হল ওদের তৃপ্ত করতেই মন্ত্রের এই বিশেষ অংশের পাঠ। 

প্রতিমা নিরীক্ষণ করলাম ভালো করে। ছোটবেলায় দেখতাম ত্রিশূল গেঁথে আছে একদম অসুরের বুকে। সিংহও বেশ কসে থাবা বসিয়েছে দেখা যেত।


আমাদের দুর্গা মায়ের মনে হল হৃদয়ে দয়াভাব বেশী, ত্রিশূল বিঁধিয়েছেন কাঁধের কাছে অলতো করে, সিংহের থাবাও গোবেচারা গোছের। কার্তিকের গোফটাও বেশী সুচালো টাইপের।

প্রত্যেকবার কুইজ হত স্বর্গীয় শেখর রায়ের তত্বাবধানে। আজ উনি আমাদের মধ্যে নেই। কম্পিটিশনটা হল ByJu সেক্টর ৫৯ এর অফিসে, কারণ তারা স্পনসর করছে কুইজটা, তবে শেখরদার স্মরণে নাম বা ছবি দেখলাম না। গেলাম দেখতে। আরো কয়েকজন পূজা কমিটির মেম্বারদের সঙ্গে একটা রুমে বসেছি, কফি, কোল্ড ড্রিংক্স দিয়ে আদর আপ্যায়ণ করা হল। তবে নো লাঞ্চ ইজ ফ্রি লাঞ্চ। একটু পরে কোম্পানির ব্যাপারে জ্ঞান দিতে এলেন একজন। এরা অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, তবে অনেক অফিসের দেখাদেখি হাইব্রীড সিস্টেম এডপ্ট করেছেন। কনফিডেন্টলি জানালেন যে বাচ্চা যে সাবজেক্টে উইক, তারা সেটা আইডেন্টিফাই করে এক্সট্রা এফর্ট দিয়ে পরীক্ষা তরণী পার করে দেবেন। ভাবলাম বলি - এর উল্টোটাও করা যেতে পারে। যে, যে সাবজেক্টে ভাল সেটাতেই আরো ভাল করে তৈরী করে ওই সাবজেক্টে হায়ার স্টাডি করার জন্য। এরকম করলে ওদের বিজনেস মার খাবে, তাই এগোলাম না। 

 আমাদের পুজোর সময়টাতে উত্তরভারত পালিত হয় নবরাত্রি। অনেকের বাড়ীতে নয়দিন ধরে পুজা হয়, অখন্ড দিয়া জ্বলে। এই সময়টাতে নিরামিশ খাওয়ার চল।পুজো রিসেপশনে বসে আছি। দুটো ইয়াং ছেলে পাশে মৃন্ময়দার সঙ্গে কিছু একটা বলছে। একটু পরে মনে হল কথাবার্তা একটু উঁচুস্বরে। ইনটারভেন করে জিজ্ঞাসা করলাম ব্যাপার কি। ছেলেদুটো আমার কাছে এসে শুরু করল, “আপলোগ পূজা কর রহা হ্যায়, পিছে মাটন, চিকেন কা স্টল হ্যায় জানা গেল এরা অযোধ্য থেকে এসেছে, খোদ রামজন্মভূমির লোক। আমাদের নবরাত্রির ব্যাপার নেই, পূজোর অন্যতম আকর্ষণ পেটপুজো এবং অবশ্যই  ননভেজসহিত, ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের ফান্ডামেন্টাল রাইটের মধ্যে, “রাইট টু ইটআছে, ননভেজ আইটেম পুজো প্যান্ডালে নেই, বাইরে স্টলে বিক্রি হচ্ছে”- এসব হলেও তাদের বোঝান গেল না। গেরুয়া রংএ হৃদয় রাঙানো, তাই বোঝান বৃথা। প্রোগ্রাম শুরু হল মা মেয়ের যৌথ নাচ দিয়ে। পিয়ালী পিয়ালীর মেয়ে দুজনের উপস্থিতি হাসিমুখ দেখে মনে হয় না মাত্র দুই বছর আগে ওদের জীবনে এক বিশাল ট্রাজেডি ঘটে গিয়েছে। সে দুঃখ মুছবে না, কালের অবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে ফিকে হবে, কিন্তু জীবনের রূপ, রস, গন্ধের আস্বাদন মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ। প্রতিকূলতার মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোকে কুর্ণিশ না করি কি করে। অষ্টমীর ইনহাউস গানের প্রোগ্রামে শেষ গানটি শৌভিককে স্মরণ করে গাওয়া হল। গানের ফাঁকে উদ্গত অশ্রুকে  মুছে সে গান ধরল। মনে করিয়ে দিল-

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে

খাওয়ার স্টলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। ননভেজই মুখ্য উদ্দেশ্য। লক্ষৌ কাবাবের স্টল দেখা গেল। স্টলের মালিক ভাল সেলসম্যান। কানে কানে জানাল, বাকি স্টলগুলোর লিনিয়েজ ওদের ধারে কাছে নয়, খাস লক্ষৌর নবাবী আমলের দোকান, নয়ডাতে নূতন ফুটপ্রিন্ট। গুলাবটি কাবাব পরোটা নিয়ে বসা গেল। আয়েস করে খাচ্ছি আর লক্ষৌর শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শার কথা মনে পড়ছে। রাজ্যপাট হারিয়ে শেষ জীবনে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে ছিলেন। কলকাতার বিরিয়ানি, ঘুড়ি খেলা, পায়রা ওড়ানো, কথ্থক নাচ সবই ওনার হাত ধরে এসেছিল। পাশে এসে বসলেন এক পরিচিত তার সঙ্গী। আলাপ করিয়ে দিলেন তার আত্মীয় বলে। কথায় কথায় জানলাম মা বাঙ্গালী, বাবা পার্সী। টাইটেল ড্রাইভার, যদিও তার তিন জেনারেশন পাইলট। সেকি, আজকাল দূরপাল্লার বাসে, ড্রাইভারের সিটের পাশে লেখা থাকে পাইলট কেবিন, আর ইনি ডিমোশন হয়ে পাইলট থেকে ড্রাইভার! এডভাইস দিলাম টাইটেল এফিডেভিট করে পাইলট করে নিতে। তবে প্রয়াত সাইরাস মিস্ত্রি, মিস্ত্রি টাইটেল নিয়েও টাটা কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন। সুতরাং বলা যায় না, পুরুষানুক্রমে এরা হয়ত ড্রাইভার টাইটেল নিয়েও স্পেসক্রাফটের সওয়ারী হবেন। 

এবারে পার্কের মধ্যে গাড়ী ঢোকান নিষেধ। একজন ছবি পোস্ট করলেন হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে, পঞ্চমীর দিন ভিতরে অনেক গাড়ী। 

অষ্টমীর সকালে অঞ্জলিতে বেশ ভীড়। আমি লাস্ট ব্যাচে, নিক অফ দ্য টাইমে পৌঁছেছি। কুমারের ডাক শোনা গেল-“দেবদত্ত, তাড়াতাড়ি এসো।প্রেসিডেন্ট সাহেবের পাশে দাঁড়ালাম। বেশ কয়েক রো পিছনে। ঠাকুরের বেদীর তলার জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েকজন অঞ্জলি দিচ্ছে। বল্লামকি ব্যাপার ভিআইপি বক্স ছেড়ে পিছনে কেন? যাক, আমারই সুবিধে। পাপড়ি বেশী পাওয়া গেল। অষ্টমীর মাহেন্দ্রক্ষণে মেগা আশীর্বাদ যোগ। বিলম্বিত লয়ে মন্ত্রপাঠ হল। এক্সটেন্ডেড ভক্তি

ধামসার ওয়ার্কশপ হচ্ছে। স্টেজের উপর চলছে ড্রইং কম্পিটিশন। ধামসা বাজিয়ে শেখাবে দুইটি ছেলে। নদীয়া থেকে এসেছে।আমার ছোটবেলা কেটেছে ঝাড়গ্রামে। সাঁওতাল মেয়েদের নাচের সঙ্গে ধামসা বাজত। আওয়াজটা গুরুগম্ভীর। একজন ভদ্রলোক ধামসার ইতিহাস বলছিলেন। অনেক আগে ছোটনাগপুর, পুরুলিয়া অঞ্চলের অদিবাসীরা অরণ্যে শিকারের পর লোক ডাকতে বা হাতী খেদাতে ব্যাবহার হত। পরের দিকে মূলত বাজনা হিসাবে ব্যাবহৃত হচ্ছে। বাজনাদাররা অদিবাসী সম্প্রদায়ের হলেও নদীয়ায় কি করে এল সেটাও শমীকবাবুর ধারাভাষ্যে জানা গেল। পরে জানলাম শমীকবাবু যাদবপুরে ম্যাথস পড়ান। আজ থেকে প্রায় আড়াইশ বছর আগে, নীলকুঠিতে চাষ এবং রেললাইন তৈরীর কাজে এদেরকে পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম থেকে আনা হয়েছিল, পুরুষানুক্রমে তারা এখন নদীয়ার বাসিন্দা হলেও, বংশের ট্রাডিশনাল ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন।পিন্দারে পলাশের বনপালাব পালাব মন….” লোক সঙ্গীতের সঙ্গে উপস্থিত মহিলারা নাচের তাল মেলালেন। 

একটু পরে দেখি প্যান্ডালের পাশের কাপড়গুলো খুঁটি থেকে খুলে উপরে করে দেওয়া হয়েছে। ভিতরের গরমভাবটা একটু কম। পাশে জটলা। চিন্তিত মুখে কর্মকর্তারা দাড়িয়ে। কি ব্যাপার? শোনা গেল, লক্ষৌর কাছে কোন এক পূজা প্যান্ডালে আগুন লেগে লোক মারা গিয়েছে। তাই প্রশাসনের কড়া নজরদারি চলছে। ফায়ার ডিপার্টমেন্টের লোকেরা কিছু কিছু জিনিষ কমপ্লাই করতে বলে গিয়েছেন। অধিকারীদা প্যান্ডালের ইলেকট্রিকালের ইনচার্জ। তার তত্বাবধানে জোরদার টেস্টিং চলছে লাইটের। বাঘে ছুলে আঠার ঘা। ঘন্টাখানেক পরে খোঁজ এসিপি সাহেব জনা পনের ফোর্স নিয়ে হাজির। চারিদিকে ঘুরে নিরীক্ষণ চলছে। পাশে পাশে পূজাকমিটির লোকজন। যা এতদিন নিরীহ লাগছিল, উনাদের অবজারভেশনে, দিব্যচক্ষু খুলে গিয়ে সব কিছুই পোটেনশিয়াল ফায়ার হ্যাজার্ড মনে হল। বেচারা চাওয়ালার স্টলে দাঁড়িয়ে শোনা গেল, আগুন যে লাগে নি সেটাই আশ্চর্যের। চাওয়ালা ছোট গ্যাসের চুলাতে দুধ গরম করে। পুলিশ আসছে শুনে সে একটা টিনের ডাব্বা কেটে চুলাকে আড়াল করে রেখেছে। টেবিল থেকে একহাত উপরে চুলার আগুন। চুলচেরা বিচার করে নয়ডার ফায়ার অফিসার একহাত নিলেন- “ইয়ে আগ আগর পেপার পাকড়  লেগা তো ইয়ে চায়েবালা ভাগ যায়েঙ্গে, টেন্ট জ্বল যায়গা, প্যান্ডাল মে ভি আগ লাগে গা”, যদিও প্যান্ডাল ৫০/৬০ ফিট দূরে। এসিপি সাহেব যেন দুধের শিশুদের জ্ঞান দিচ্ছেন-এরকম ভাবে জানালেন, “নিজেদের ঘরে অনুষ্ঠান করার সময় তো খুব সেফটির নজর রাখেন, এখানে আর কি, পাবলিক ইভেন্ট হ্যায়, হু কেয়ারস?” অধিকারীদা সিরিয়াসলি লাইট চেক করছেন। দূরের স্টলগুলোতে লাইট জ্বলছে দেখে এবার এরা লেগে পড়লেন লাইট কেন জ্বলছে তাই নিয়ে। প্রথম অবজারভেশন ট্যাপিং করে বিজলি নিচ্ছেন, তাই দিনের বেলায় লাইট জ্বলছে। সবিনয়ে জানান হল - মিটার আছে। তারা তখন বল্লেন, “মিটার আছে বলে দিনের বেলায় কেন জ্বলবে, ন্যাশানাল ওয়েস্টেজ অফ রিসোর্স।জানানো হল যে ওদের প্রিলিমিনারি ফাইন্ডিংস অনুযায়ী টেস্টিং চলছে। ফায়ার অফিসার জানালেন, টেস্টিংকা টাইম ঠিক নেহি হ্যায়, অভি দুপহর কা খানা চল রহা হ্যায়, বহুত আদমি মজুদ হ্যায়, যব লোক কম রহেগা তব করনা হ্যায়। এসব ক্ষেত্রে হাত কচকে নতজানু হয়ে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ- সেটাই করা হল।আপনারা যা বলছেন সব আমরা পালন করবএরকমটাই জানান হল। ধর আনতে বল্লে বেঁধে আনার মত, খালি সেফটি কমপ্লায়েন্স নয়, পিছনের স্টলে কিছু জামা কাপড়, পটারি ইত্যাদির দোকান কিছু খাওয়ার দোকানও ছিল, সেগুলিও বন্ধের নির্দেশ এসেছে, এটা নাকি কমার্শিয়াল এক্টিভিটির মধ্য পড়ে। এরকম কড়া নজরদারীতে নজরানা দেওয়াটাই কাটানের মন্ত্র। জোঁকের মুখে নুন যা, পুলিশের কাছে টাকাও তাই। স্ট্যাটাসকুয়ো মেনটেনড। নিশ্চিন্ত।গ্রিজিং দ্য পাম। পাম বলতে হাতের তালু, তবে পাম গাছ সংক্রান্ত সদ্য নয়ডায় ঘটে যাওয়া ঘটনা উল্লেখ করার ইচ্ছে হচ্ছে। পুরো এপিসোডের সারসত্য হল পামগাছের জান কইমাছের জানের থেকেও কড়া। জনৈক ত্যাগী পাম গাছ লাগিয়ে নয়ডার এক সোসাইটির জায়গা দখলের চেষ্টা করছিলেন। এখন ইউপিতে বুলডোজার জমানা। কড়া ডোজ দিতে বুলডোজার ব্যাবহৃত হচ্ছে। ইনসিট্যান্ট জাস্টিস। সরকার প্রধানের নূতন নামবুলডোজার বাবা এখানেও পরের দিন বুলডোজার পাম গাছ উপড়ে দিল তো বটেই, ফ্ল্যাটের ইল্যিগাল এক্সটেনশন ভেঙে দিল। কিছুদিন পরে ম্যাডাম ত্যাগী আবার পাম গাছ লাগিয়ে দিলেন। এরপর জানা গেল সোসাইটির সব গ্রাউন্ড ফ্লোরের ফ্ল্যাটেই এরকম এক্সটেনশন আছে। পুলিশ পড়ল মহাফাঁপরে। এবারে বুলডোজার বাকী ফ্ল্যাটের এক্সটেনশন ভাঙতে এসে পাম গাছ আবার উপড়ে দিল। সেদিন সন্ধ্যেতে আবার সব গাছ লাগিয়ে দিলেন ত্যাগী পরিবার। টিভি দেখে বোঝা যাচ্ছে পাম গাছ এতবার পুনর্জীবন লাভ করেও বেশ সতেজ।


তাক লাগানো প্রোগ্রাম হল মনিপুরী ড্যান্সের, সঙ্গে মার্শাল আর্ট। ফোক সঙ্গীত কি আর্ট, এদের মধ্যে যে রীদম প্রাণচঞ্চলতা আছে, তা সহজাত ভাবে সবাইকে আকর্ষণ করে। এই ধরণের অনুষ্ঠানের আনন্দযজ্ঞে ভাগ নিতে তথাকথিত এলিট, সংস্কৃতিমনস্কতার দরকার পড়ে না। তারুণ্যে ভরপুর সাত আটটি মনিপুরী ছেলে তাদের এক্রোব্যাটিক নাচ দেখালেন, সঙ্গে তাসার মত বড় সাইজের ড্রাম বাজিয়ে। সবচেয়ে তরুন ছেলেটি চোখ বন্ধ করে একবার তরোয়াল খেলতে খেলতে, পরে কুঠার সহযোগে, সঙ্গীর হাত বুকের উপর থাকা শশা দুই টুকরো করে দেখালেন। পুরো সময়টাতে দর্শককুলের টানটান রুদ্ধশ্বাস। 

ভোগ অন্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জমাটি আড্ডা।বাবু ডাকাডাকি করছেন। ভাবলাম রূপা পাবলিকেশনের ব্যাপারে সুখবর শোনাবেন। পাশে বসা কাউকে দেখিয়ে বল্লেন, “ইনার সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছে, সিআর পার্কের ম্যাগাজিনে লেখা ছাপিয়ে দেবেন। বল্লামসে কি দাদা, এভারেস্টের চূড়া থেকেধোবি পাছাড়দিয়ে মাটিতে আছড়ালেন।কোথায় নিজের নামলেখা বই, আর কোথায় ক্লাবের ম্যাগজিন! গম্ভীর মুখে জানালেননো লাঞ্চ ইজ ফ্রি লাঞ্চ!” আনন্দমেলার দিনও ধরেছিলেন। ডাক্তার-বদ্যিও উনার হাতের মুঠোয়। এক তরুন বাঙালী ডাক্তারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে জানালেন ইনি এনডোক্রোনলজিস্ট। ফর্টিসে আছেন। আড়ালে বল্লাম, আপনার রেফারেন্সে গেলে ফর্টিসে ফর্টি পারসেন্ট ডিসকাউন্ট হবে তো! সে গুড়ে বালি। বল্লেন, “চারিদিকে সিসিটিভি নজর রাখছে, চেম্বারে কে ঢুকছে, বেরোচ্ছে, সব আন্ডার সারভাল্যান্স।

প্যান্ডালের কাপড়ের রংএর কল্যাণে, এক ভৌতিক পরিবেশ। ফটো উঠছে, মনে হচ্ছে সবাইকে হোলির মেরুন কি লাল রং মাখিয়ে দেওয়া হয়েছে। 




ঘুরে ফিরে সেই রবি ঠাকুর-“রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাওগো আবার…. রং যেন মোর মর্মে লাগে”!  মর্মে রং লাগছে কিনা বলতে পারছি না, কারণ ঘর্ম কলেবর সামলাতেই প্রাণান্তকর অবস্থা। সেপ্টেম্বরের শেষে পুজো, তাই যাত্রায়দারুন অগ্নিবাণে রে, হৃদয়ে তৃষা হানে রে।কুলার কিছু এসেছে বটে কিন্তু পূজাস্থলেড্রাই ডেএর নিয়ম মেনে তারা ড্রাই। রং এর ব্যাপারে ইনসপায়ারড হয়ে, কমিটিরই এক কমিটেড মেম্বার অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের ভূমিকায় লাল ঘেষা পায়জামা জরির কাজের ঝকঝকে কুর্তা পরে ছিলেন। সুফি-সন্তের ব্যাপার ছিল, তাই দরবেশ ড্রেস বেশ মানান সই বেশ। (পাঠক লক্ষ রাখবেন দুটো বেশের মানে আলাদা, যদিও বানান এক) “অবলা কামিনী রেদিয়ে গান টান হলনৃত্যশিল্পীদের অবশ্য অবলা মনে হয় নি। খুব সুন্দর পরিবেশন লোকাল পারফরমারদের - রবীন্দ্র সংগীতে বেশী ইনক্লাইনড, সঙ্গে ফোকের মিশেল। খাঁটি বঙ্গস অফ সিক্সটিটু বঙ্গস। অদ্রিজা বলে জিসারেগামাপা ফেমাস গান গাইলেন। আজকাল আর্টিস্টদের কৌলিন্য বোঝাতেজিসারেগামা ফেমঅথবাইন্ডিয়ান আইডল ফেমনামের পাশে জুড়তে হয়। প্রথম গানটি শুরু করলেন -

দেখো আকাশ তারায় ভরা/দেখো যাওয়ার পথের পাশে/ছোটে হাওয়া পাগলপারা /এত আনন্দ আয়োজন/সবই বৃথা আমায় ছাড়া...”

টিপিক্যল বিষাদের গান, শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে শুনেছি, পুজোর অনুষ্ঠানে চলে না। সন্ধ্যা মুখার্জির গান গাইলেন, যদিও গলা বিন্দুমাত্র মেলে না। তার আগের দিন বিশ্বরূপ বলে একজন গান করেছিলেন, মান্না দের অনেকগুলো গেয়েছিলেন। বেশ ভাল লেগেছিল। জমিয়ে দিয়েছিলেন মহুল ব্যান্ড। ফোক গাইলেন অনেক। স্টেজের উপর, নীচে দর্শকদের সঙ্গে একাত্ত হয়ে গাইলেন। বেশ নাচানাচিও হল। প্রসঙ্গে মনে পড়ল সেনশর্মাদার প্রায় একার উদ্যোগে কুমার শানুকের আনা হয়েছিল পুজোতে। দশ বার বছর আগের কথা। ছেলেপুলেরা গানের তালে নাচছিল। কর্মকর্তাদের নির্দেশে বাউন্সার দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। নাচ অপসংস্কৃতির অঙ্গ। ৬২র বাঙালী, সংস্কৃতির পরাকাষ্ঠা। যুগ বদলায়। এখন কাঁচা চুল, পাকা চুল সবাই ফোকের তালে পা মেলাচ্ছেন।

পুরুলিয়ার ধমসা-মাদলের দল যতটা সাড়া জাগিয়ে এসেছিলেন প্রোগ্রাম তেমনটা লাগে নি। কিছু এক্রোব্যাটিকস দেখলাম। গানগুলো ফোক হলেও স্লো। গ্রুপ নাচ যথাযথ। ছৌ নাচও বুড়ীছোয়া, খালি মুখোশ পরিহিত দুই একজন মঞ্চে দেখা গেল। আহিরী বলে লিটিল চাম্পের একটি মেয়ে নবমীর শেষভাগে গান গাইতে উঠল। তিনদিন দিল্লিতে একনাগাড়ে গান করে গলা ভাঙা। অদ্য শেষ রজনী।সেক্রেটারী কৌশিক ইয়াং ব্লাড, বাবার (প্রাক্তন সেক্রেটারি) ফুটস্টেপে সর্বক্ষনের অক্লান্ত নীরব কর্মী। আমাদের পুজোয় অনেক কমিটি। সবার সহযোগিতায় এই আনন্দঅনুষ্ঠান। অনেকেই বলেন আমার নামটা একটু লিখে দেবেন। এত নাম লিখতে গেলে কিছু মিস হবেই। তখন জবাবদিহি ভারী পড়বে। তাই কমিটির সব সদস্য এবং পুজোর পার্টিসিপেন্টদের আন্তরিক অভিনন্দন। আই গুড, ইউ গুড, অল গোয়িং গুড।আত্মছাড়া চেনা গন্ডীতে সমালোচনা বুদ্ধিমানরা করে থাকেন না। 

দশমীর ঠাকুরবরণে উৎসাহী মহিলাদের ভীড়। সিঁড়ি নেই। তাই তলা থেকেই শূণ্যে পান পাতা ঠেকানো, মিষ্টি খাওয়ানোর চলছে। ঢাক বাজছে, “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জনএর তালে তালে ধুনুচি নাচ।


সময় কমে আসছে। আনন্দের পূর্নতায় যেন কম না থাকে। ঠাকুর উঠল ট্রাকে। কাছেই দশেরা উৎসবের মাঠে নয়ডা অথরিটি পুকুর কেটেছে। জলটাকে দেখে একটাই কথা মনে হল, “কালো জলে কুচলা তলেগানটা এরকম কোন পুকুরকে কল্পনা করে লেখা হয়েছিল।


পাশেই রাবনপোড়ার তিনমূর্তি। সন্ধ্যেতে বধ হবে। শ্রীমতি মিত্র জিজ্ঞাসা করলেন রাবনের সাথে বাকী দুইজন কে?

সিলেবাসের বাইরে প্রশ্ন। দুই তিন জনকে জিজ্ঞাসা করে তিনটে নাম পেলাম। বিভীষণ, মেঘনাদ কুম্ভকর্ণ। কনফিউশন। মনে হল বিভীষণ হবে না। কারণ সে তো রামচন্দ্রকে সাহায্য করেছিল। গুগল সার্চও সে কথার সত্যতা সমর্থন করল।
পিছনে হাঁটে হাঁড়ি ভাঙার জন্য

দাঁড়িয়ে শান্তিরাম ও বাসব।
 রাতে কবজি ডুবিয়ে মাংসভাতের হাতছানি। তারই প্রতীক্ষায় বিসর্জনের কষ্ট ভুলে আনন্দের হাতছানি। এবারে ডুয়েল আইটেম। মাছ মাংস। রাজদীপ, সুব্রত ব্যানার্জি জিন্দাবাদ। কোলাকুলিও হবে। ছোটবেলায় পাড়ায় বাড়ী বাড়ী ঘুরে বড়দের প্রণাম করে নারকেল নাড়ু আর পায়েস, নিমকির যুগ গত। প্যান্ডালেই মিলন। আজকাল কলকাতার দেখাদেখি শারদ সন্মান শুরু হয়েছে দিল্লিতে।৬২ সেক্টরের পুজোপেল নারায়ণী নমস্তুতে সেরা সন্মান।

প্রতীক্ষায় থাকব আবার ২০২৩ এর পুজোর।

দেবদত্ত 

০৫/10/২২


Comments

  1. দারুণ বর্ননা! দিল্লির পুজো চোখের সামনে ভেসে উঠলো! সাবাস " ইচ্ছে হল তাই " !!

    ReplyDelete
  2. দারুন লাগলো। যত পড়ি ততই ভাল লাগে। ব্রাভো

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments