মহালয়ার হালহকিকৎ (রম্য রচনা)
মহালয়ার হালহকিকৎ
নিম্নচাপ নিজের হলে তো ঘোরতর অস্বস্তি, আর সার্বজনীন হলে, ট্যাকল করতে,এমার্জেন্সী মেজারের দরকার পরে। এনসিআর বেশ কয়েকদিন ধরে জোড়ানিম্নচাপের ধাক্কায় কুপোকাৎ। পুজোর মেজাজে শরতের আকাশের পেঁজা তুলোর মেঘের বদলে কালো বাদল মেঘের ভ্রুকুটি। এবারে আমাদের অতি উৎসাহী মেম্বার পিয়ালীর উদ্যোগে প্রথমবারের মত মহালয়া পালনের আয়োজন হয়েছে। মহালয়া মানে, আপামর বাঙালীর কাছে বাণীকুমার পরিচালিত রেডিওর মহালয়া অনুষ্ঠান শোনা। ছোটবেলায় ভোর চারটের সময় আকাশবাণীতে প্রচারিত হত অনুষ্ঠান। কোনদিনই পুরোটা শুনে উঠতে পারি নি।প্রথমদিকে বেশ কিছুটা শোনার পর মা দুর্গার দশ অস্ত্রে সজ্জিত হওয়ার পর পর আমিও নিদ্রাসাগরে নিমজ্জিত হয়ে পড়তাম।
ঠিক ছিল অনুষ্ঠানটা হবে পুজা প্যান্ডালের মাঠে। পাঁচটা থেকে শুরু। অত ভোরে ওঠার অভ্যাস নেই। তাই নাম লেখাই নি। ফ্ল্যাটের ঢিলছোড়া দূরত্বে প্যান্ডাল। এত কাছে থেকে না গেলে মা দুর্গার রোষানলে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। তাই শেষ দিনে নাম লেখালাম। লিস্ট তৈরী হচ্ছে, কারণ প্যাকেট পাওয়া যাবে। লাস্ট মিটিংএ প্রেসেন্ট প্লিজ থাকার জন্য, জেনে গিয়েছি প্রাতরাশের দুর্দান্ত আয়োজন আছে। এইসব নিম্নচাপের ফলস্বরূপ কর্মকর্তাদের রক্তের উচ্চচাপ বাড়ে, কারণ এনসিআরের স্বভাবে তাল মিলিয়ে পূজাস্থল জলমগ্ন। শেষমুহুর্তের ডিশিসানে, বাদলের ধারাপাতে স্থান বদল হয়ে ভেন্যু সাব্যস্ত হল আমার বাসস্থান টেলিকমের কমিউনিটি হল। মা দুর্গা আমার আরো কাছে। জয় মা।
পাঁচটা বাজার দুই মিনিট আগে পৌছে গেছি। টিপটিপ বৃষ্টি। হলের হাল ধরতে উপস্থিত বাসব ও তার পুত্র গান্ধার। বাসব হল আমাদের মিস্টার ডিপেন্ডেবল। কর্তা নয়, কর্মে বিশ্বাসী। তখন সে অক্স জ্যাক খুঁজে বেড়াচ্ছে মিউজিক সিস্টেমে লাগানর জন্য। সামনে টেবিলে মাদুর্গার ব্যানার।
সামনে সন্দেশ রাখা হয়েছে। দেবী তো সবে বাঁধাছাঁদা করছেন। এখনও কৈলাশেই অধিষ্ঠান করছেন। সন্দেশ খাবেন কি করে? ভক্তবৃন্দ সদা হেল্পিংহ্যান্ড নিয়ে প্রস্তুত।
মঞ্চ রেডি হয়ে বাণীকুমারের মহালয়ার বাণী শ্রবণের আগেই উপস্থিত ‘স’ বাবু। গতবারেই জানিয়েছিলেন রূপা পাবলিশিংকে ডেকেছেন আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে ছাপার অক্ষরে জনসমক্ষে তুলে ধরতে। মহত প্রচেষ্টা সন্দেহ নেই। তবে রূপার শ্রীরূপ এখনও চাক্ষুষ করতে পারি নি। ঢুকেই জানালেন রূপাকে খবর দেওয়া আছে, এল বলে! সবিনয়ে তার প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ দিয়ে জানালাম - যাই ছাপুন না কেন, আমি ছাপোষা রিটায়ার্ড মানুষ, মালকড়ি খসাতে পারব না। ‘স’ বাবু অদম্য লোক। টপিক চেঞ্জ করে জানালেন পুজোতে সিবিআইএর ডিরেক্টর তার অনুরোধে আমাদের পুজোতে আসবেন। কাউকে কাঠি দেওয়ার থাকলে যেন ওকে জানাই, যথাযথ ব্যাবস্থার পূর্ণ সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। ইডি, সিবিআই ভিআইপিদের জন্য। একবার অলরেডি ইডি নিয়ে কেস খেয়েছি। সিবিআইএর সেবার আর দরকার নেই। আর শত্রুও নেই, কারণ সবকিছুর সারফেসে সাঁতার কাটার অভ্যাস। কমিটির ভিতরে ঢুকলে কমবেশী প্রতিপক্ষ তৈরী হয়।
শুরু হল মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠান।
পিছনে তাকিয়ে দেখলাম, লোকজন মন্দ হাজির হন নি। পাশে এসে বসলেন এক পরিচিত মুখ। শুভ মহালয়া বিনিময়ের পর তার প্রশ্ন - “ও, অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেল, বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের গান কি হয়ে গেল?” থতমত খেয়ে জানালাম- “আমি তো জানি উনি স্তোত্র পাঠ করেন!” -ও… তাই বুঝি - বলে উর্ধপানে চেয়ে রইলেন।
উদাত্তগলায় বীরেন্দ্র কৃষ্ণের স্তোত্র শুনছি … “হে ভগবতী মহামায়া, তুমি ত্রিগুণাত্মিকা; তুমি রজোগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী …… , এই ভগবতী বিষ্ণুনিদ্রারূপা মহারাত্রি যোগনিদ্রা দেবী।” পাশ থেকে হাঁটুতে ট্যাপিং এর ধাক্কায় আমার যোগনিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটল। তার পরবর্তী প্রশ্নবানে আমি বোল্ড আউট। জিজ্ঞাসা করলেন “এখন কি শ্যামাসঙ্গীত চলছে?” এইরকম শাক্তভক্তের ইচ্ছাশক্তিতে, সত্যি সত্যি না - “আয় মা শ্যামা নেচে নেচে” বলে মাকালী এসে হাজির হন আর শুরু হয়ে যায় মহালয়ার বদলে মহাপ্রলয়। পেট থেকে উঠে আসা দমকা হাসিটাকে, এক ধাক্কায় ঢোঁক গিলে ভিতরে পাঠিয়ে বল্লাম- “আপনার চিন্তাশক্তির জবাব নেই, দুর্গার আবাহনে, মা কালীকে কেন টেনে এনে কষ্ট দিচ্ছেন?” প্রশ্নকর্তার পদবী কিন্তু বলছে তিনি প্রগাড় জ্ঞানী ব্যাক্তি।
ইতিমধ্যে দুপ্রস্থ চা এসে গেল। সঙ্গে বিস্কুট নিয়ে এল পিয়ালীর মেয়ে। বেঁচে থাক মা। ভালই জমে উঠেছে। একটু পরে সুন্দর খোপকাটা বন্ধ প্যাকেটে, এসে গেল, রাধাবল্লভী, আলুরদম ও দরবেশ। বেশ দমদার ব্রেকফাস্ট। পাশে ছিলেন বানারসী বাবু। কানে কানে জানালেন, “একশ উনসত্তর জনের লিস্ট দেখেছিলাম, মেরে কেটে একশর কম লোক। বাকী প্যাকেটের কি হবে?” বল্লাম “ তা দিয়ে আপনার কি দরকার? মনে রাখবেন - প্যাকেট তুমি কার?, যে নেবে আমায় তার!, সুতরাং লজ্জা, ভয়, আপনার জন্য নয়, বরাভয় হয়ে হাত বাড়ান!”
মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর মঞ্চ ওপেন টু অল। একটি বাচ্চা ছেলে সুন্দর গান করল। তার মা-ও গাইলেন আগমনী গান। একজন শোনালেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণের স্তোত্রপাঠ। ছোটখাট চেহারা হলেও, তার উদাত্ত গলায়, বিনা কাগজ দেখে মন্ত্রপাঠ সবাই এনজয় করলেন। তার নামে অবশ্য শক্তির প্রকাশ আছে।
আমাদের পূর্বপুরুষ আর্য ছিলেন এরকমটাই শুনেছিলাম, যদিও এখন কাউন্টার থিয়োরিও শোনা যাচ্ছে। জার্মান জাতি নাকি খাঁটি আর্য । এখানে শৈশবে লালিত এক বালক আজকাল আর্যাবর্তে থাকে। তার রেকর্ডেড গান শুনলাম। গৌতম গান করল। আরো তিন বৌদির সম্মিলিত গান শুনলাম। পিয়ালীও গান করল।
বরুণদেবের কৃপায় অনেকে আসেননি, তাহালেও একশজনের কাছাকাছি উপস্থিতি। সব মিলিয়ে জমজমাটি প্রাক-পূজা সম্মেলন।
দেবদত্ত
২৫/০৯/২২




Comments
Post a Comment