কোণার্কের সংরক্ষণ
কোণার্কের সংরক্ষণ
বাঙ্গালীর বেড়ানোর অন্যতম আকর্ষণ পুরী। আর পুরী গেলে ১০০০ বছরের পুরানো কোনার্ক সান টেম্পল দেখা আবশ্যিক বলে ধরে নেওয়া যায়।রথের আকৃতির মন্দিরটির চত্বরের দেওয়ালে রথের চাকার কাছে দাঁড়িয়ে সবাই ফটো তোলে। এটাকে ব্ল্যাক প্যাগোডা নামও দেওয়া হয়েছে, কারণ সমুদ্র থেকে দেখতে কালো লাগত। মূল মন্দিরটি এখন আর নেই, যেটা আমরা দেখতে পাই সেটা মন্দির ও সামনের চত্বরের মধ্যে একটি চতুর্দিকে দরজা বিশিষ্ট ঢাকা জায়গা।
দক্ষিণাত্যের মন্দিরে এটিকে বলা হয় মন্ডপম। কোনার্কের মন্দিরে এটির নাম জগমোহন। সূর্য মন্দির ইউনেস্কো ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত।
মন্দিরের ইতিহাস বা তার গোত্রের অলংকরণ নিয়ে বক্তব্য রাখা এই লেখাটির বিষয় নয়। সম্প্রতি এএসআই এর মেজর রিনোভেশনের কাজে হাত দিতে চলেছে। ১৮৩৭ সালে স্কটিশ হিস্টোরিয়ান জেমস ফার্গুসন কোনার্কের তৎকালীন পরিস্থিতির উপর রিপোর্ট তৈরী করেন, ড্রইং সহযোগে। কিন্তু সেই সময় রক্ষণাবেক্ষণে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নেয় নি। ১৮৬৮ সাল নাগাদ জায়গাটি একটি ধ্বংসস্তূপের আকারে ছিল।
চারিদিকে ইতস্তত ছড়ানো পাথর ও গাছ, তার মধ্যে সাপের বাসা। ভয়ের চোটে আশেপাশের গ্রামবাসীরা মন্দিরের কাছে ঘেঁষত না। লোকাল এক রাজা মন্দিরের কিছু মূর্তি তুলে নিজের প্রতিষ্ঠিত মন্দির বানাচ্ছিলেন।
১৯০০ সালে তৎকালীন বাংলার গভর্নর জন উডবার্নের নির্দেশে কোনার্ক মন্দিরের রেস্টোরেশনের কাজ শুরু হয়। বিষেণস্বরূপ নামে এক ইঞ্জিনিয়ারের রিপোর্ট অনুযায়ী, জগমোহন ভেঙে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য, এক অভিনব উপাত্তের সাহায্য নেওয়া হল। মন্দিরের ভিতরের অংশে বালি ভরার কাজ শুরু হল। এর জন্য জগমোহনের চারটে গেট সিল করে দিয়ে নদীর চর থেকে বালি এনে ভরা শুরু হল।
ওই সময়কালে মন্দির বা পুরানো স্থাপত্যকলার রক্ষণাবক্ষণে এটাই সবচেয়ে চালু প্রথা ছিল। এই ফিলিং করতে সময় লেগেছিল তিন বছর।আইডিয়া এটাই ছিল যে, বালির পাহাড় জগমোহনের ছাদকে, ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করবে।
বর্তমানে বিষেশজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষার পর দেখা যাচ্ছে যে একশ বছরের অধিক সময়ে, বালির উচ্চতা ছাদ থেকে কমে গিয়ে ১৭ফিটের ব্যাবধান সৃষ্টি করছে। সিবিআরআই, রুড়কি প্রথম এটা নজরে আনেন। মন্দিরের উপরে হোল করে ক্যামেরা ঢুকিয়ে দেখা যায় বালি অনেক নীচে।গ্যাপের কারণ হল বালির কণাগুলির মধ্যে যে গ্যাপ থাকে, কালের সাথে সাথে, সেই গ্যাপ বা “পোর” ফিল হয়ে বালি সংকুচিত হয়ে মাটিতে পরিণত হয়। ফলে যে উদ্দেশ্যে বালি ভরা হয়েছিল, সেটা ডিফিট হয়ে উল্টে সাইডওয়ালে প্রেশার ক্রিয়েট করে, ক্র্যাক সৃষ্টি হয়েছে।
দুটো উপায়ের কথা প্রথম ভাবা হয়েছিল। একটা হল আবার বালি ভরে সিল করে দেওয়া অথবা পুরো বালি সরিয়ে স্ট্রাকচার স্ট্রেনদেন করা। এএসআই একজন ইংরেজ ও ইটালিয়ান আর্কিওলজিকাল কনজারভেসিস্ট ও আইআইটি চেন্নাই ও রুড়কির বিষেশজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রথমে বালি সরানোর কাজে হাত দিয়েছেন। এটা করতে অনুমানিক তিন বছর লাগবে।এর সঙ্গে সঙ্গে স্টীল বিমের সহায়তায়, উপরের ছাদের সাপোর্টিংএর কাজও একই সঙ্গে করা হবে। এই কাজের জন্য মন্দিরের পশ্চিম দিকে ৯ মিটার উচ্চতায় সুড়ঙ্গ বানানো হবে। এই সুড়ঙ্গের উপরের ৬/৭ উচ্চতা অব্দি থাকা বালি মোটরাইজড ট্রলির সাহায্যে বার করে আনা হবে
এবং যুগপৎ স্টীল স্ট্রাকচার বসান হবে মন্দিরকে সুরক্ষিত করতে। এই কাজের ম্যানুয়াল তৈরী করেছেন স্যার বার্নার্ড ম্যালকয়ার ফেলডেন নামে একজন ব্রিটিশ কনজারভেসনিস্ট আর্কিটেক্ট এবং স্ট্রাকচারাল এন্যালিসিস করেছেন ইটালিয়ান প্রফেসর অঙ্গ জিওরজিও ক্রচি। এই ম্যানুয়াল অনেক আগেই তৈরী হয়েছিল, কারণ গুগুল থেকে জানলাম ফেলডেন সাহেব মারা গিয়েছেন ২০০৮ সালে আর ইটালিয়ান প্রফেসর এন্যালিসিস করেছিলেন ১৯৯৭ সালে। ভারতের নিয়মমাফিক সরকারী লালফিতের ফাঁস কাটিয়ে কাজ শুরু হতে যাচ্ছে ২৫ বছর পর। তবুও বেটার লেট দ্যান নেভার!
দেবদত্ত
২২/০৯/২২







Comments
Post a Comment