গোয়া ভ্রমন
গোয়া ভ্রমন
সিনিয়ার সিটিজেন হওয়ার পর জীবনে প্রথমবার গোয়া যাচ্ছি। শুনে এসেছি, এই জায়গার কালচার ও তারুন্যের প্রতীক। অসংখ্য বীচ, এডভেঞ্চার স্পোর্টস, রঙীন নাইট লাইফ, স্বল্পবসনা সুন্দরী ও পানীয়ের ফোয়ারা নিয়ে যৌবনের জয়গানে বিভোর গোয়া।
যাওয়ার সাহসটা আরও এল আমার কলেজের প্রাক্তনী, এল্যামনির সদাহাস্যময়, চিরতরুণ পার্থদাকে দেখে। সেভেনটি প্লাস হয়েও পার্থদা সম্প্রতি সস্ত্রীক মালদ্বীপ ঘুরে এসেছেন। আজকাল মালদ্বীপ হনিমুন কাপলদের ফেভারিট ডেস্টিনেশন, আমাদের সময়ে যেটা ছিল গোয়া। গোয়া ভ্রমনের আইডিয়াল টাইম শীতকাল। “গোয়া ইন মনসুন”, বলে আজকাল ভরা বর্ষায় শস্তার প্যাকেজ দিচ্ছে অনেক এজেন্সি। এই সময় ভীড়ও ও কম থাকে। সিঁড়ি টপকে যাওয়া ঠিক নয়, প্রথম স্টেপে গোয়া, তারপরে না হয় মালকড়ির অবস্থা ভাল থাকলে মালদ্বীপ ভাবা যাবে। ইন্ডিগোর প্যাকেজে দেখা গেল নরমাল রিটার্ন ফেয়ারের সমান্য বেশীতে পাঁচরাত্রি ছয়দিনের ৩স্টার হোটেলসহ ফ্রি ব্রেকফাস্ট। সঙ্গে আবার গোয়াতে ফ্রি এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার।
গোয়া এয়ারপোর্টটা সাউথ গোয়াতে। জায়গাটার নাম ডাবলিম। এটা একটা ন্যাভাল এয়ারবেস। নূতন একটা এয়ারপোর্ট তৈরী হচ্ছে নর্থ গোয়াতে পেরনেম বলে একটা জায়গায়।
আমাদের হোটেলের নাম ওশেন পাম. নর্থ গোয়াতে কালাঙ্গুটে বিচের পাশে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল চল্লিশ কিমি, এক ঘন্টার উপর লাগল। মাঝে একটা আলো ঝলমল বিশাল কেবল স্টে ব্রীজ পেরোলাম। ড্রাইভার বল্ল তলা দিয়ে বয়ে গিয়েছে মান্ডভী নদী। নদী পেরোলে শুরু হল নর্থ গোয়া। মান্ডভীর আশেপাশের জায়গাটা হল পানাজি বা পান্জিম, গোয়ার রাজধানী। আরেকটা জায়গা হল ওল্ড গোয়া, যেখানে পর্তুগীজরা এসে বসতি স্থাপন করেছিল ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমভাগে। এই ওল্ড গোয়াতেই আছে বিখ্যাত বম ব্যাসিলিকা। জায়গাটা পানাজি থেকে দশ কিমি দক্ষিণে।
এয়ারপোর্ট থেকে যখন গাড়ীতে উঠি তখন সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ভারতের পশ্চিম তটে আরবসাগরের পাড়ে, এই জুলাই মাসে সন্ধ্যে নামে সাতটারও পরে। ওয়েদার ফোরকাস্টে প্রতিদিনই বৃষ্টি দেখাচ্ছে, যদিও আমরা মেঘলা, প্যাচপ্যাচে ওয়েদারই বেশী পেয়েছিলাম। গোয়া জায়গাটা একাধারে বিস্তীর্ন সমুদ্র বেলাভূমি, সবুজ বনানী, ছোট ছোট পাহাড় বেস্টিত ভূভাগ সব মিলিয়ে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র, তাই পর্যটকদের অতি প্রিয় ডেস্টিনেশনের অন্যতম।
আমাদের হোটেলের নাম ওশেন পাম।কালাঙ্গুটে বিচের কাছে। সব মিলিয়ে ছিমছাম, সুন্দর একটা ডাইনিং হল, সুইমিং পুল, জিম সবই আছে। চেকইন করার পর চার পাইন্ট কিং ফিশার বিয়ার ফ্রি পাওয়া গেল। রাস্তায় পা ফেললেই দুদিকে অনেক দোকান, বেশীর ভাগ বিয়ার-হুইস্কি আর নয়ত কাজুর দোকান। বিচের রাস্তার দুপাশে পোষাকের দোকান। ক্যাসুয়াল ওয়ার, নারকেল গাছের ছবি, সমুদ্র, গোয়া লেখা টি শার্ট, ফ্রক, টুপির দোকান। আমিও একটা শার্ট কেনার লোভ সামলাতে পারলাম না। হোটেলের রিসেপশনে বলে একটা আইটোয়েন্টি সেল্ফড্রাইভ মোডে বুক করে নিলাম দুইদিনের জন্য। ১২০০/- করে প্রতিদিন ভাড়া, তেল নিজের টাকায়।
পরের দিন সকালে বুফে ব্রেকফাস্ট সেরে মিয়া-বিবি বেরিয়ে পরলাম নর্থ গোয়া এক্সপ্লোর করতে। প্রথম গন্তব্য চাপোরা ফোর্ট। গুগল ম্যাপ দেখে সেখানে পৌছে গেলাম। ফোর্টের বেশ কিছুটা আগে পার্কিং।ফোর্টে ঢোকার কোন টিকিট লাগে না, পার্কিং ফি দিতে হল একশ টাকা। বোঝাই গেল লোকাল পলিটিশিয়ানরা ভালই কামাচ্ছেন।
বেশ খানিকটা চড়াই রাস্তার পর, সিঁড়ি।রাস্তার দুধারে জামা-কাপড়, কাঠের তৈরী হ্যান্ডিক্রাফট নয়ত নারিয়েল পানির দোকান। ১২০টি সিঁড়ি ভেঙে একটা ভাঙ্গা গেট পেরিয়ে, ফোর্টের ভগ্নাবশেষ।
ফোর্টের ভাঙা দেওয়ালের পাশ দিয়ে, অনেক নীচে তিনদিকে সমুদ্র। ফোর্ট দেখে মন ভরল না। ফেরার সময় একটা দোকানে বসে ডাবের জল খেলাম। মজার ব্যাপার দেখলাম, দোকানের অল্পবয়সী ছেলেগুলো, সব টুরিস্টকে- যারা উপরে উঠছে, তাদের বলছে ডাবের জল খেতে। সবাই বলছে নামার সময় খাবে। যখন তারা ফিরছে, দোকানের ছেলে গুলো তাদের বলছে “পানি পি লো। যানে কা টাইম বোলা থা আনেকা সময় পিয়েঙ্গে। পিঙ্কি প্রমিস”! মার্কেটিংএর এই পদ্ধতিটা বেশ মজার লাগল। ফোর্ট থেকে বেরিয়ে আরো উত্তরে চল্লাম। রাস্তার বামপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে চাপোড়া নদী,
মোহনার জায়গাটা বেশী চওড়া, মাছ ধরার অনেক নৌকা, ট্রলার নোঙর করা। একটু পরে পেলাম নেরুল নদী। নদীর জল অনেক শান্ত। জোয়াভাটা ব্যাপারটা সে রকম ভাবে বুঝতে পারলাম না। আমাদের গন্তব্য মোরজিম বিচ। বিচের কাছাকাছি একটা হোটেল পড়ল, নাম লা ভ্যালেন্সিয়া। আরে, এটা তো সেই হোটেল যেখানে মেক মাই ট্রিপ প্রথমে আমাদের বুকিং দিয়েছিল। হোটেলে ফোন করতে, রিসেপশনিস্ট বলেছিল যে রিনোভেশন চলছে, তাই বল্ধ। এমএমটির রিলেশনশিপ ম্যানেজারকে বল্লাম, আমাদের অন্য একটা আপগ্রেডেড হোটেলে বুকিং করে দাও। সে দেখি কোন এ্যকশনই নেয় না। এদিকে দুদিন পরেই যাত্রা শুরু। এক্ষেত্রে টুইট করলে এ্যকশন হয়। এমএমটিতে টুইট করে জানাতেই একটু পরে সরি-টরি বলে জবাব এল, বার ঘন্টার মধ্যে প্রবলেম সলভ হবে। এতক্ষণ ওয়েট করতে হল না। ঘন্টা দুয়েক পরে হোয়াটস্ এ্যপে রিলেশনশিপ ম্যানেজার জানাল, বর্তমানে যে হোটেলে আছি সেটার কনফার্মড বুকিং উইথ নো এক্সট্রা চার্জ।
বিচের কাছে কয়েকটা ছোট খাওয়ার দোকান। টুরিস্ট প্রায় নেই বলা যায়। মেঘলা আকাশ, সুন্দর হাওয়া আসছে সমুদ্র থেকে। দিল্লির রোহিনী থেকে আগত এক কাপলের সঙ্গে আলাপ হল। তাদের তিনমাস হল বিয়ে হয়েছে। আমি জানালাম আমাদের তেত্রিশ বছর চলছে! ওরা আমাদের ছবি তুলে দিল, আমিও ওদের ছবি তুলে দিলাম।
মোরজিম বিচটার নাম বেশী দুটো কারণে, এক নম্বর হল এই বিচে অলিভ রিডল টার্টল ডিম পাড়তে আসে, আর দুনম্বর হল রাশিয়ান আর ইউক্রেনের টুরিস্টরা এই বিচের কাছাকাছি হোটেলে থাকে। এখন রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে টুরিস্ট আসা বন্ধ। দুপুরে লাঞ্চের টাইম। বিচের পাশেই বাঁশ, কাঠ আর উপরে শুকনো পাতা পলিথিন শিট দিয়ে ঢাকা দুই তিনটে ছোট দোকান। তারই একটাত বসে ম্যাগি আর লেমোনেড অর্ডার করলাম। এতেই লাঞ্চ সারব। সঙ্গে সমুদ্রের হাওয়া ফ্রি! বিবাহিতা এক লোকাল মহিলা দোকান চালাচ্ছেন। কাছেরই এক গ্রামে থাকেন। ভাষা কোঙ্কনি। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, পঞ্চায়েত থেকে প্রতি ছয়মাসে দোকান লাগানোর পারমিশন পাওয়া যায়। বর্ষাকালে টিমটিম করে দোকান চলছে, টুরিস্টের অভাব এই সময়ে। দোকানী মহিলা জানালেন অলিভ রিডল টার্টল ডিম পাড়তে আসে নভেম্বর/ডিসেম্বরে। মজার কথা ডিম পেড়ে মা টার্টল আবার ফিরে যায় সমুদ্রে। ডিম ফুটে একই সময়ে সবগুলো বাচ্চা বেরোয়, কিন্তু তারা অনাথ। গুটিগুটি পায়ে নিজেরাই বীচ পেরিয়ে সমুদ্রের জলে নেমে পড়ে। নেটফ্লিক্সের ডকুমেন্টারিতে দেখেছিলাম, এই পঞ্চাশ/একশ মিটার পথ অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক শিশু টার্টল পাখি বা বন্য কুকুর ইত্যাদির শিকারে পরিনত হয়। কোঙ্কনি দোকানী জানালেন, এখানে সরকার থেকে বন্দোবস্তো করা আছে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা নবভূমিষ্ঠ শিশু টার্টলকে নিয়ে সমুদ্রে ছেড়ে দিয়ে আসে।
আমার এক কলেজের বন্ধু পার্থ গোয়াতে ফ্ল্যাট কিনেছে। ও বলছিল গোয়ার আউটস্কার্টে অনেক সবুজে ঘেরা গ্রাম আছে। ড্রাইভ করে ঘুরলে ভাল লাগবে। নর্থ গোয়াতে এরকম একটা জায়গা পেরনেম। সেখানে লোকাল রাজার বাড়ীও আছে। গুগল ম্যাপে দেখাচ্ছে ১৭ কিমি মরজিম বিচ থেকে। শুরু হল যাত্রা। হাইওয়ে, তবে বেশী চওড়া নয়। মাঝরাস্তায় দেখি একটা সুন্দর হলুদ রং এর, বেশ বড় মন্দির। গাড়ী পার্ক করে ঢুকলাম। মন্দিরের নাম হচ্ছে দেবী ভগবতী মন্দির।
পাঁচশ বছরের পুরানো মন্দির। এখন অবশ্য রিনোভেটেড। কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে মন্দির চত্বরে বিশাল মেলা বসে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে চল্লাম। সমতল ছেড়ে, হাল্কা পাহাড়ী রাস্তা। নিবিড় বনানীর মধ্যে দিয়ে চলেছি। একটু পড়ে পড়ল পেরনেম জনপদ। আরো কিছুটা গেলেই মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি। লোকাল লোককে জিজ্ঞাসা করে পেরনেমের রাজার বাড়ীর রাস্তা নিলাম। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল সিংহদুয়ার।
গেটের কাছে দারোয়ান আর ভিতরে ঢোকার অনুমতি দিল না। বাড়ীটা কোন এক এমএলএ কিনে নিয়েছেন।
ফিরতি পথ। হোটেলের রাস্তায় পড়বে বাগা বিচ। এই বিচ, গোয়ার অন্যান্য বিচের তুলনায় বেশী জনপ্রিয়। তখন পড়ন্ত বিকাল। বেশ বড় পার্কিং লট। বিচের কাছে গিয়ে টুরিস্টের ভালই ভীড় দেখলাম।
শুনেছিলাম, বর্ষাকালে সমুদ্রে নামতে দেয় না গোয়াতে। এখানেই একমাত্র দেখলাম, লোকজন মনের আনন্দে স্নান করছে। মাঝে মাঝে তীক্ষ হুইসিল লাইফগার্ডদের, টুরিস্টদের সতর্ক করতে। বিচের সামনে পরপর দোকান। লোকজন মনের আনন্দে বিয়ার খাচ্ছে। ডানদিকে বিচটা বেকে গিয়েছে। পাশে ছোট্ট পাহাড়। বড় করে বাগা বিচ লেখা সাদা হরফে। রাস্তার দুইপাশে অনেক দোকান। বেশীরভাগই জামা কাপড় বা খাওয়ার। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। হোটেলে ফিরে এলাম। রাতে হোটেলেই বুফে ডিনার।
পরের দিন আমাদের গন্তব্য পানাজি ও ওল্ড গোয়া। প্রাতরাশ সেরে গাড়ী নিয়ে বেরোলাম দশটা নাগাদ। সাত/আট কিমি আসার পর পড়ল মান্ডবী নদীর উপরে সেই কেবল স্টে ব্রীজ।
দূর থেকে খুব সুন্দর লাগে। রাস্তাটা নদীর অনেকটা উঁচু দিয়ে। উপর দিয়ে যেতে একটু ভীতিই লাগে। ব্রীজের উপর থেকে মান্ডবীর তীরে পানাজি শহর, গোয়ার রাজধানী। আজ আমরা প্রথমে যাব ‘ফন্টেনহ্যাশ’ বলে একটা জায়গায়। ব্রীজ ক্রশ করে ইউ টার্ন নিয়ে গুগল ম্যাপের সহায়তায় পৌছান গেল ফন্টেনহ্যাশে।
ওল্ড গোয়া, যেখানে বিখ্যাত বম ব্যাসিলিকা আছে, পর্তুগীজরা গোয়া দখলের পর আঠারশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, ওল্ড গোয়াই ছিল রাজধানী। ঐ সময়ে বার বার মহামারীর কারণে মান্ডবীর তীরে পানাজিতে বেশীরভাগ লোক চলে আসে। ১৮৩৪ সালে পানাজি ঘোষিত হয় গোয়ার রাজধানী হিসাবে। পানাজিতে এই ফন্টেনহ্যাশ জায়গাটাতে অনেকটা সমতল জমি, সিঙ্গল ওনারের কাছ থেকে কিনে সরকারী বাসস্থান তৈরী হয়। বাড়ীগুলি সবই গোয়ানিজ স্টাইলের স্থাপত্ব্যে তৈরী। বাড়ীগুলির বাইরের দেওয়াল সবই গাড় হলুদ, নীল বা লাল রঞ্জিত। নেটফ্লিক্সে স্প্যানিশ/ল্যাটিন অমেরিকান সিরিয়ালে দেখা বাড়ীগুলোর সঙ্গে দারুন মিল। বেশীর ভাগ বাড়ীরই স্ল্যান্টিং রুফ, টাইলস লাগানো। রাস্তাগুলোর নাম ‘Rue’ তারপর ‘কিছু একটা’।
একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। ইন্দোরে আর্কিটেকচার পড়ে। ফন্টেনহ্যাশ এর উপর প্রোজেক্ট করছে।
ফন্টেনহ্যাশএর উত্তরদিকে একটা ৩০০-৪০০ ফিট উঁচু পাহাড়, নাম হল অলটিনো হিল। হাঁটতে হঁটতে চারিদিকের বাড়ীগুলো দেখতে দেখতে একটা পুরানো কুয়োর কাছে পৌঁছালাম। এটাকে বলে উইশওয়েল।
প্রথা অনুযায়ী, আগেকার আমলে এখানে, মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করার জন্য লোকে কয়েন ফেলত। কিছুদিন আগে একটা ট্রাভেল ব্লগে দেখছিলাম, রোম শহরে একটা ফাউন্টেনের সামনে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে, ডান হাতে কয়েন নিয়ে বাম কাঁধের উপর দিয়ে ফেলছে। উদ্দেশ্য ঐ একই, মনস্কামনা পূরণ। যেটা মনে ধরল, সেটা হল পরে ঐ সব কয়েন সংগ্রহ করে, জায়গাটার মেনটেন্যান্স করা হয়। অবশ্য এরপরে বিট কয়েনের জমানা চলে এলে ওটা আর কার্যকরী হবে না! যাই হোক আমার মনে হল, এই প্রথাটা রিভাইভ করতে পারলে, জায়গাটার আরো উন্নতি সম্ভব।
উইশওয়েলের কাছেই ধপধপে সাদা ছবির মত একটা গীর্জা।
এটার নাম “সেন্ট সেবাস্টিয়ান চ্যাপেল”। উউশওয়েল থেকে দু কদম বাড়ালেই, সিঁড়ি উঠে গিয়েছে পাহাড়ের উপরে। লোকাল একজন জানালেন হিলটপে আছে গোয়ার কোর্ট। সিঁড়ি ধরে উঠতে শুরু করলাম। উপরের কাছাকাছি পৌছে, গাছের ফাঁক দিয়ে মান্ডবী আর ব্রীজের প্যানারোমিক ভিউ পেলাম।
একদম উপরটা সমতল। চারকোনে চারটে ব্রিটিশ আমলের হলুদ রংএর বিল্ডিং, মাঝখানে গার্ডেন।
উল্টোদিকে গাড়ী আসার রাস্তা। দুই একজন কালো কোট পরা লোক আর ফাইল নিয়ে দপ্তরীর চলাফেরায় বোঝা গেল কোর্ট পুরোদমে চলছে।
আবার নেমে এলাম নীচে। শুনেছিলাম ফন্টেনহ্যাশে একটা অনেক পুরানো কেক পেস্ট্রির দোকান আছে। পথের হদিশ নিয়ে পৌঁছে গেলাম ছবির মত কিউট একটা দোকানে। নাম হল ‘৩১ দ্য জানেরিয়া’ (জানুয়ারী)।
মালিকের সঙ্গে কথোপকথনে জানা গেল ঐ দিন ১৮৯১ সালে পর্তুগালে রেভেলিউশনারিরা এক ব্যার্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, মনার্কির অবসান ঘটাতে।সেই ঘটনাকে স্মরণ করে এই নাম। লুটিয়েন দিল্লিতে এরকমই একটা রাস্তার নাম হচ্ছে তিশ জানুয়ারি মার্গ। ঐ রাস্তায় অবস্থিত বিড়লা হাউসে ৩০শে জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে গান্ধীজি এস্যাসিনেটেড হন, তার থেকেই রাস্তার নামকরণ হয়েছে।
কোল্ড কফি আর বেবিংকা (এক ধরণের গোয়ানিজ সুইট) নিয়ে বসলাম।
এর পরের গন্তব্য পানাজিতে অবস্থিত গোয়া স্টেট মিউজিয়াম। ফন্টেনহ্যাশ থেকে পাঁচ মিনিটের ড্রাইভ। যেখান থেকে মান্ডভী রিভার ক্রুইজ শুরু হয় তা ঠিক উল্টোদিকে।
দুপুর একটার সময় পৌঁছে দেখি মিউজিয়াম বন্ধ। একটা থেকে দুটো লাঞ্চ অওয়ার। ঢিল ছোড়া দূরত্বে আছে গোয়ার বিখ্যাত চার্চ। এই চার্চ দেখে মনে পড়ল অনেক সিনেমায় এটাকে দেখেছি। লোকেশনটা একদম ব্যাস্ততম রাস্তার উপর, তাই গাড়ী দূরে পার্ক করতে হল। চার্চটির পোশাকী নাম, ‘লেডি অফ দ্যি ইম্যাকুলেট কনশেপশন চার্চ’।
ছোট্ট হিলকের উপর অবস্থিত দুগ্ধধবল চার্চটাকে, দুদিকের সিমেট্রিক্যাল, জিগজ্যাগ সিঁড়ির সমারোহে ছবির মত লাগে। টংএ একটা বিশাল ঘড়ি। তবে আমরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বা ভিতরে যেতে পারলাম না। আজকাল মেরামতি ও রং করার কাজ চলছে। সাধারনভাবে এই সময়টাতে গোয়ার স্থাপত্যশিল্পের মেনটেন্যান্স হয়ে থাকে। এই সময়টাতে গোয়াতে টুরিস্ট কম। রিভার ক্রজের এজেন্টরা ঘুরে বেরাচ্ছে আশেপাশে খদ্দেরের আশায়।
আবার ফিরে এলাম মিউজিয়ামে। কোন টিকিট নেই। নাম, ঠিকানা, ফোন, আধার নম্বর লিখে প্রবেশ করতে হল। পর্তুগীজ কালচারের নিদর্শন ও সাথে সাথে গোয়ার অদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার সম্যক ধারণা পাওয়া গেল। মিউজিয়ামের এক মহিলা এমপ্লয়ি আমাদের সব ঘুরে ঘুরে দেখালেন।
এর পরের গন্তব্য ওল্ড গোয়া। পর্তুগীজরা ভারতে প্রথম আসে ১৪৯৮ সালে কালিকটে, ভাস্কো ডা গামার নেতৃত্বে আর গোয়া দখল করে ১৫১০ সালে। পৌঁছে গেলাম বিখ্যাত বম জিশাস ব্যাসিলিকাতে। চওড়া রাজপথের একদিকে বম জিশাস ব্যাসিলিকা অন্য ফুটে সে ক্যাথিড্রাল ও অস্সি (Assisi) চার্চ। দুটোরই স্প্রলিং ক্যাম্পাস। যে কোন দর্শনীয় স্থাপত্য অনেকটা খোলা জায়গার মধ্যে হলে তার সৌন্দর্য দশগুন বেড়ে যায়। এটা আমার অভিমত।গোয়ার সব চার্চই সাদা রংএর, খালি বম ব্যাসিলিকা লাল পাথরে তৈরী,
বাইরের দিকে কোন প্লাস্টার নেই বলে, ফুটে বেরোচ্ছে পুরানো আভিজাত্য, একটা এ্যান্টিক লুক। এই চার্চটি ইউনেস্কো ওয়ার্লড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্গত।
‘বম জিশাস’ কথাটার অর্থ পর্তুগীজ ভাষায় ভাল/শিশু জিশাস। আমাদের গাইড জানালেন চার্চের কনন্সট্রাকশন শুরূ হয়েছিল ১৫৯৪ সালে আর শেষ হয় ১৬০৬ সালে। আমাদের বাংলা ভাষায় বড় বা ছোট মন্দিরের মধ্যে ক্লাসিফিকেশন নেই কেদার নাথও মন্দির আবার পাড়ার কি সোসাইটির লোকাল মন্দিরও হল মন্দির। ক্রিশ্চিয়ানরা বেশ প্রাকটিকাল। ছোট ধর্মস্থান হল গিয়ে চ্যাপেল, একটু বড় হলে চার্চ বেশী বড় হলে ক্যাথিড্রাল বা ব্যাসিলিকা। সাধারনত কোন মূল্যবান রেলিকস থাকলে, সেটাকে ব্যাসিলিকা আখ্যা দেওয়া হয়। ভিতরে ঢুকলাম তবে ছবি তোলা মানা। এই ব্যাসিলিকার নামডাক আরো এইজন্য যে এখানে স্প্যানিশ সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের শব রাখা আছে। উনি মারা যান ১৬৫২ সালে। চায়নার ইউহান প্রদেশে মারা যান, তারপর তার দেহ পর্তুগাল ঘুরে আবার ভারতে নিয়ে এসে এই ব্যাসিলিকাতে রাখা হয়। তার শবের নাকি কোন দৈহিক বিকৃতি ঘটে নি। মেঝে থেকে দোতলা সমান উঁচু এক কাচের আঁধারে তার দেহ শায়িত।
গাইড জানালেন প্রতি দশ বছর অন্তর তার মৃতদেহ সর্বসমক্ষে বাইরে আনা হয়। শেষ আনা হয়েছিল ২০১৪ সালে, আবার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ২০২৪শে।তখন নাকি লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন দেখতে। বেশ লম্বা চার্চের বাঁদিক দিয়ে করিডোর মধ্যিখানে সারি সারি চেয়ার মাঝামাঝি জায়গাতে একটি কাঠে সূক্ষ খোদাই করা কারুকার্য মন্ডিত প্রোজেক্টেড ক্যানোপি। গার্ড জানালেন সেই সময়কাল কোন মাইক্রোফোন ছিল না। পাদ্রী একদম সামনের ডায়াসে সারমন পাঠ করলে অনেক সময় পিছনের লোকেরা শুনতে পেত না।তাই পাদ্রী একতলা সমান উঁচু করিডোর দিয়ে এসে ওই কাঠের ক্যানোপি থেকে রিপিট করতেন।
আরেকটু এগিয়ে যেতেই ফ্রান্সিস জেভিয়ারের শায়িত শব দেখতে পেলাম। চার্চের ভিতরের কম্পাউন্ডের দেওয়ালগুলো সবই প্লাস্টার করা। বাইরের দেওয়াল কিন্তু লাল রংএর। গাইড এর এক ইন্টারেস্টিং কাহিনী শোনালেন। বম জিশাস তৈরী হওয়ার পরে, গোয়ার বাকী সব চার্চের মত প্লাস্টার করে সাদা রং করা ছিল। সাড়ে তিনশ বছর পরে পর্তুগীজ সরকারের এক কনজারভেশনিস্ট, ১৯৫০ সালে (১৯৬১র আগে পর্যন্ত গোয়া ছিল পর্তুগিজ সরকারের অধীন),
বাইরের দেওয়ালের প্লাস্টার ভেঙে দেন। এর কারণ দেখানো হয় যে ল্যাটেরাইট সময়ের সাথে সাথে এক্সপোজড এটমোস্ফিয়ারে আরো শক্ত হয়। কিন্ত বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও জোলো অবহাওয়ার কারণে ল্যাটারাইট সারফেস উইদার্ড হয়ে যাচ্ছে।
এরপর গেলাম উল্টোদিকের সে চার্চ ও assis চার্চে। ব্যাসিলিকা থেকে বেরিয়ে, মেন রাস্তা পেরিয়ে বিশাল কমপ্লেক্সের মধ্যে বেশকিছুটা এগিয়ে ডানদিকে সে ক্যাথিড্রাল আর ডানদিকে Assis চার্চ। এই সব চার্চ কিন্তু রোমান ক্যাথলিক।
দুগ্ধধবল সে চার্চের বিশাল ব্যাপ্তি (৭৬ মিটার লম্বা, ৫৫ মিটার চওড়া)
মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মত। চার্চের সামনের দিকে জিসাসের একটা মূর্তি আছে, দুই হাত ছড়ান, অনেকটা রিও ডি জেনিরোর পাহাড়ের উপর বসান খ্রীষ্টমূর্তির সঙ্গে মেলে।
ক্যাথিড্রালের ভিতরে একটি বিশাল আকৃতির বেল আছে। ভারতের সবচেয়ে বড় ও পৃথিবীর অন্যতম বড়। তবে ভিতরে ঢোকার গেটের কাছে দেখলাম “temporarily closed” লেখা। ভিতরে বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। তাই যাওয়া গেল না। সে ক্যাথিড্রালও প্রায় বম ব্যাসিলিকার সময়কার, প্রথমে ছোট আকারে ১৫১০ সালে তৈরী হয়। পরে ১৬১৯ সালে বর্তমান আকার নেয়। এই ক্যাথিড্রাল উৎসর্গকৃত হয় সেন্ট ক্যাথারিন অফ অলেকজেন্দ্রিয়ার নামে। বছরের একটি বিশেষ দিন ধার্য আছে এক এক জন সেন্টকে স্মরণ করার জন্য। সেটাকে বলা হয় ‘ফিস্ট ডে’। সেন্ট ক্যাথারিনের ফিস্ট ডে তে মুসলিমদের হাত থেকে পর্তুগীজদের গোয়া বিজয় সম্পন্ন হয় বলে তারই নামে ক্যাথিড্রাল উৎসর্গকৃত।
এরপর গেলাম বামদিকের চার্চে যার নাম চার্চ অফ সেন্ট ফ্রান্সিস অফ অসিসি (Assisi).
‘অসিসি’ নামটা এসেছে ইটালির একটা জায়গার নাম থেকে, যেখান থেকে সেন্ট ফ্রান্সিস এসেছিলেন। ১৫১৭ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস এখানে আসেন। চার্চের একটা পার্টে মিউজিয়াম।
এটা এএসআই মেনটেন করে। টিকিট কেটে ঢুকলাম। তলার হলে সেন্ট ফ্রান্সিসের স্ট্যাচু আর কিছু বাইবেলের ছবি। উপরের তলার টানা লম্বা হলঘরের দুদিকে গোয়ার সমস্ত রুলারের বড় বড় প্রোর্টেট। নেমে এসে চার্চে ঢুকলাম। ভিতরটা খুব সুন্দর কাঠের কাজে ভর্তি। তবে মেনটেন্সের অভাব মনে হল।
আবার গাড়ীতে উঠলাম। অল্প বৃষ্টি পড়ছে। সাড়ে চারটে বাজে। এর পরের গন্তব্য ১০/১২ কিমি দূরে মঙ্গেশ টেম্পলে। এই মন্দিরে ছোটবেলায় লতা মঙ্গেশকর গান করতেন। হাল্কা পাহাড়ী রাস্তা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে উঠেছে। মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে মেন রাস্তার পাশেই বিশাল পার্কিং লট। তার মধ্যে খালি আমাদের সবেধন নীলমনি গাড়ী। সামনে সারি দেওয়া একই ধরনের দোকান, কিন্তু শাটার বন্ধ। স্থানীয় লোক বল্ল এখনও দোকানগুলোর এলটমেন্ট হয় নি। মন্দির রাস্তা থেকে দেখা যায় না। প্রায় এক কিমি হেঁটে তবে মন্দিরে পৌছান গেল। সিঁড়ি দিয়ে উঠে চত্বরের মধ্যে একটা স্তম্ভ।
এটার ছবি আগে দেখেছি। এরপরে মন্দিরের মূল দ্বার। স্তম্ভ আর মন্দির দুটোই সাদা, বর্ডারগুলো সোনালী রং করা। ষোলশ খ্রীষ্টাব্দে যখন পর্তুগীজরা ধর্মান্তকরণে ব্যাস্ত, সেই সময় কোঙ্কনী চিৎপাবন ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় মঙ্গেশ মন্দির পানাজি থেকে ২১ কিমি দূরে এই জঙ্গলে লোকচক্ষুর অন্তরালে প্রতিষ্ঠা করেন। মঙ্গেশ শিবেরই অরেক নাম। মন্দিরে ভিতরে শিবলিঙ্গ ও শশ্রুমন্ডিত শিবের মূর্তি।
দাঁড়ি-গোঁফ ওয়ালা শিব আগে দেখি নি। তাই পুরোহিত মশাইকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, শিব এই বেশে মর্ত্যে সাধারণ লোকের মত কিছুদিন ছিলেন। কৈলাসে সংসার সামলে ধ্যান করতে করতে বোর হয়ে যাচ্ছিলেন, তাই একটু রিলাক্সেসন দরকার হয়ে পড়েছিল। সেই ইংরাজী প্রবচন মনে পড়ল- “অল ওয়ার্ক এ্যন্ড নো প্লে, মেকস জ্যাক এ ডাল বয়”! মন্দিরের সামনের দিকে চত্বর ছাড়িয়ে দেওয়ালের পাশে বাঁধানো জলাশয়। সাউথ ইন্ডিয়ার মন্দিরে এরকম দেখেছি। বেরোবার সময় এক মন্দির কমিটির লোক বসেছিলেন। তিনি জানালেন, মন্দিরের প্রসাদ বাড়ীতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেইমত দেড়শ টাকা দিয়ে প্রসাদ বুক করলাম। তবে দেড়মাসের মধ্যে সেটা আসে নি। মনে হচ্ছে শিবঠাকুর একেবারে কৈলাস থেকে পাঠিয়েছেন, তাই এতটা পথ আসতে সময় লাগছে!
ফেরার পথে কালাংগুটেতে হোটেলের তিন/চার কিমি আগে রাস্তা থেকে সুন্দর আলোকিত একটা চার্চ দেখতে পেলাম। গাড়ী সাইজের রাস্তা ধরে গিয়ে পার্ক করে চার্চ দেখতে ঢুকলাম। এই চার্টটার নাম ‘লা দে দিউস’ চার্চ, তৈরী হয়েছিল ১৮৭৩ সালে। স্থাপত্য শিল্পে গোয়ার অন্য চার্চের থেকে আলাদা, চূড়ো গুলি সূঁচালো।
এটাকে গথিক স্টাইল বলে। অন্য যে বড় বড় চার্চ আগে দেখলাম সেগুলো টুসকান স্টাইল। টুসকান মধ্য ইটালির একটা জায়গা। এটা একটু রাগেড স্টাইল, ফাইননেসের থেকে বিশালতায় এবং এক্সটিরিয়ার বাহুল্যবর্জিত হয়ে থাকে। হয়ত একটু বেশী সরলীকৃত করে ফেললাম। যাই হোক আলোকিত চার্চে অন্ধকারে মোহনীয় রূপ নিয়েছে। ভিতরে ঢোকা গেল না। সন্ধ্যের সময় বন্ধ। একটি বাঙালী ইয়াং ছেলে খেজুরে আলাপ শুরু করল। পশ্চিমবঙ্গে কোন রাজনৈতিক দলের সাপোর্টার ছিল। ভয়ের চোটে গোয়াতে এসে চাকরী করছে। ভাট বকাতে বেশ ওস্তাদ দেখলাম। অযাচিত উপদেশ শুরু করল “গোয়াতে হোটেল খুলে ফেলুন। পঞ্চাশ লাখে কোথায় হোটেল পাওয়া যাচ্ছে”, তার সঙ্গের ছেলেটি স্থানীয়, সে ভুল ধরিয়ে বল্ল পাঁচ কোটি দাম।
পরের দিনটা হোটেলে রেস্ট নেওয়া ঠিক হল। সুইমিং পুলে সাঁতার, বুফে ব্রেকফাস্ট, ডিনারে দিনটা ভালই কাটল। দুপুরের দিকে কালাঙ্গুটে বিচে গেলাম হেঁটে। ছোট সর্পিল রাস্তা দিয়ে এক কিলোমিটার মত দূরত্ব। বিচে লোকজন প্রায় নেই, একটি স্থানীয় মাছ ধরছে। দূরে লাইভ গার্ড আছে।
বর্ষাকালে সমুদ্রে নামা বারণ। বিচ বরাবর দক্ষিণদিকে হাঁটলে বাগা বিচ পৌঁছে যাওয়া যাবে। ফেরার পথে গোয়ার বিচ আর নারকেল গাছের ছবি দেওয়া শার্ট কিনলাম, একটা দোকান থেকে।
পরের দিন গাড়ী নিয়ে বেরোলাম এগোডা ফোর্ট দেখতে। ইন্টারনেটে খবর পেলাম ফোর্টের নীচে গোয়া জেল ছিল। রিসেন্টলি রিনোভেট হয়ে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে নিলাম যে দুটোই দেখব। আমাদের হোটেল থেকে ফোর্টের দূরত্ব ৫/৬ কিমি। কান্ডোলিন বিচের কাছে, কিছুটা ল্যান্ডমাস সমুদ্রের মধ্যে ঢুকে আছে। ফোর্টের জন্য আইডিয়াল জায়গা। পাশ দিয়ে একটা নদী (নেরুল) এসে সমুদ্রে পড়ছে। রাস্তাটা নদীর পাশ দিয়ে এসে উঁচু পথ ধরে পৌঁছেছে ফোর্টে।আগুয়াডা ফোর্ট, আইএসআই এর অধীনে। ২৫ টাকার টিকিট কেটে অল্প কিছু সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেলাম ফোর্টের মেন গেটে। গেট দিয় ঢুকে সামনে কিছু সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে, ডানদিকে সোজা গেলে একটা চত্বরে ওপেনিং আছে। ওইখান দিয়ে বেরিয়ে এক বিশাল খোলা চত্বর পেলাম।
কেল্লার পেরিফেরিতে উঁচু চওড়া প্রাচীর। সেখানেও দর্শকরা ঘুরছে, ওখান থেকেই সমুদ্রের ভিউ পাওয়া যাবে।
আগুয়াডা কথাটা পর্তুগীজ ভাষায় মানে জলজ বা ওয়াটারি। এই পাহাড়ে একটা ফ্রেশ ওয়াটার রিজার্ভ আছে। ১৬১২ সালে আগুয়াডা ফোর্ট তৈরী হয়েছিল মূলত ডাচ দের প্রতিহত করতে। পরে এই ফোর্ট হয়ে দাঁড়ায় জাহাজের ডেস্টিনেশন পয়েন্ট এবং খাবার জল ভরার জায়গা। ফোর্টের বিশাল চত্বরের মাঝামাঝি এক অতিকায় (এশিয়ার সবচেয়ে বড়) জলাধার রয়েছে, প্রায় ২৪ লাখ গ্যালন জল ধরে। ফোর্টের পশ্চিম প্রান্তে ১৮৬৪ সালে নির্মিত সাদা রংএর লাইট হাউস, পরে ১৯৭২ সালে নূতন করে তৈরী হয়েছে। ফোর্টে একসময় ৭৯টি কামান ছিল। সিঁড়ি বেয়ে পাঁচিলের উপরে উঠলাম। দুর্দান্ত ভিউ আরব সাগরের। বিভিন্ন পোজে অনেক ফটো তোলা হল। নেমে এসে চল্লাম গোয়া প্রিজনের উদ্দেশে। ফোর্টেরই একদম নীচে সমুদ্রের কোলে। তবে গাড়ীর রাস্তা আলাদা। ২০১৫ পর্যন্ত এটাই ছিল গোয়ার সবচেয়ে বড় জেল। ২০ কোটি টাকা খরচা করে এটা সম্প্রতি রিনোভেটেড হয়েছে। ২০২১শে পিএম এর উদ্বোধন করেন। পর্তুগীজ স্থাপত্যে তৈরী সমুদ্রের গা ঘেঁষে টানা লম্বা জেল, ঢুকতেই পর পর অনেক কামান চোখে পড়ল। মনে হয় ফোর্ট থেকে তুলে এখানে রাখা হয়েছে।
দুধসাদা রং আর পাটকিলে রংএর ছাদ, দেখলেই মনে হয় ওয়েস্টার্ন ইউরোপিয়ান কোন সমুদ্র সৈকতের পাশের শহর। শুনলাম ১৯৬১ সালের গোয়ার লিবারেশনের উপর তথ্য সামগ্রী এখানে স্থান পাবে।
আজাদি কি অমৃত মহোৎসবের অংশ হিসাবে ডেভেলপ হচ্ছে। আপতত সব সেলই খালি। জেলের চিহ্ন হিসাবে বোঝার উপায় খালি মোটা মোটা লোহার দরাজ দেওয়া দরজাগুলি। বেশীরভাগ সেলের দরজা দিয়ে সমুদ্রের ভিউ পাওয়া যায়। ভাবলাম যে সব বন্দীরা এখানে সময় কাটিয়ে গিয়েছেন, তারা ভাগ্যবান যে, এতসুন্দর সি ভিউ ঘরে থাকতেন।
পরের দিন ঘরে ফেরার পালা। দুটো নাগাদ ফ্লাইট। ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়ীতে একঘন্টার বেশী লাগবে। ফেরার সময় উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল এয়ারপোর্টের সিলিংএ লাগানো ফ্যান। এতবড় ফ্যান আগে কখনো দেখি নি। মনে হল হেলিকপ্টারের ব্লেড কেটে লাগিয়েছে। গোয়ার এয়ারপোর্টটা ইন্ডিয়ান নেভির অধীনে। হেলিকপ্টারের ব্লেড হওয়ায় আশ্চর্যজনক নয়। সব মিলিয়ে একরাশ ভাললাগার অনুভূতি নিয়ে ফিরে এলাম নিজের কুলায়।
দেবদত্ত
২০/০৯/২২
































































হলঘরে সাড়ে চারশো বছরের প্রতিটি গভর্নরের পূর্ণ দৈর্ঘ্য প্রতিকৃতি আছে।
ReplyDeleteপড়লাম, খুব ভালো। তোর চোখ দিয়ে অনেক জায়গা দেখলাম, এটা ছাড়াও। কত ছবি আর সহজ বর্ণনা। যারা যাবে তাদের জন্যেও ভালো। গাড়ি নিজে চালিয়ে ঘোরাটাও দারুণ। আরো ঘোর আরো লেখ।
ReplyDeleteদারুণ লাগলো পড়ে! আমরা Goa ভ্রমণের পর বুঝেছিলাম যে , Goa is not only for beaches, এটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস, lifestyle, ও আরও অনেক কিছুর মিশ্রণ l এখানে বারে বারে আসা যায় l Actually, this is second "God's own country" of India!
ReplyDelete