মিটিং সিটিং (রম্যরচনা)
মিটিং-সিটিং
দুয়ারে পুজো। গত দুই বছরের কোভিড মহামারীতে টোনড ডাউন পূজা হয়েছে। এবার আবার সেই পুরানো মাঠ। রবিবারের সকাল। মহালয়ার আগের মিটিং। এবারে সব কমিটি মেম্বার চার্জড আপ। আমিও এসেছি গুটিগুটি পায়ে।
প্যান্ডালের কাঠামো সামনে দন্ডায়মান। প্যান্ডেল এবারে নয়-ছয়। বাঁশও লেগেছে। না, যেখানে লাগার কথা ভাবছেন সেখানে নয়, মাটিতে পোঁতা হচ্ছে। মাঠের ইতস্তত ছড়িয়ে বাঁশঝাড় নাকি বাঁশ গাছ? একটু ধন্দে পড়ে গেলাম। বাঁশ কি গাছ না অন্যকিছু? গুগল স্যার জানাচ্ছেন - বাঁশ যদিও সাইন্টিফিকালি গাছ নয়, কিন্তু ১৯২৭ সালের ফরেস্ট এ্যাক্টে একে গাছের তকমা দেওয়া হয়েছে। নামে কি বা আসে যায়। ‘এলাহাবাদ’, ‘প্রয়াগরাজ’ কি ‘রাজপথ’, ‘কর্তব্যপথ’ নাম নিলে কি এমন ক্ষতি? তবে বাঁশ, গাছের তকমা পাওয়াতে ‘টেকনিক্যালি’ বাঁশ কাটা হয়ে গেল গাছ কাটা এবং সেটা করা মানে পানিশেবল অফেন্স। এতটুকু শুনে একটু আগে যে জায়গায় প্রথমে বাঁশ লাগানোর কথা ভেবেছিলাম, কমিটি মেম্বাররা, সেটারকমটা, হতে পারে বলে শংকিত বোধ করতে পারেন। তবে বরাভয়। সেই এ্যাক্ট সম্প্রতিককালে এমেন্ডেড হয়ে ২০১৭ সালে বাঁশকে ঘাস প্রজাতির বলে গন্য করা হচ্ছে। এর কারণ অবশ্যই ব্যাবসায়িক। চায়নার পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁশের উৎপাদক হওয়া সত্বেও ভারতে বিদেশ থেকে ছোটখাট শিল্পে যেমন ধরুন ধূপকাঠি বানাতেও বাইরের দেশ থেকে বাঁশ আনতে হত। বাঁশের ডাইএর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম এরা কি সেই পুরানো ইমপোর্টেড নাকি হালের মর্ডান দেশী?
বাঁশ নিয়ে বকবকএর পর নয়-ছয়ের ব্যাপারটা খোলসা করি। পাঠক ভুল বুঝবেন না। মহামারীর পরে একুশতম পুজো একটু জাঁকজমক করে করার জন্য কমিটি বিপুল উৎসাহে নেমে পড়ছে ময়দানে। ফলস্বরূপ বাজেট বৃদ্ধি। ছয় লাখের প্যান্ডালের বাজেট হয়েছে নয় লাখ। আর প্যান্ডালের রূপসজ্জায় লাগছে বাঁশ। অন্যান্যবার পূজোর কয়েকদিন আগে স্ক্যাফোল্ডিংএর কাজ চলে। এবারে বাঁশের খুটি পোঁতা দেখে, শৈশবের স্মৃতি ভেসে এল। রোজ স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখতাম প্যান্ডেল কেমন করে কলেবরবৃদ্ধি ঘটছে।
সমুদ্রগর্জনের মত ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মধ্যে মিটিংএর সূত্রপাত। শব্দের উৎসসন্ধানে ইতিউতি তাকাতে নজর গেল প্যান্ডালের পিছনদিকে বাঁধা ত্রিপলের পর্দা তরুনীর শ্যাম্পু করা খোলা চুলের মত হাওয়ায় অবাধ্যের মত উড়ছে। তার থেকেই সমুদ্রগর্জন।
কুর্নিশ জানাতে হয় সেনশর্মাদাকে। আমাদের সেক্রেটারী সেনশর্মাদা শারীরিক প্রতিকূলতা সত্বেও উপস্থিত। মাননীয় প্রসিডেন্ট সাহেব কলকাতার ইলিশ ও মিষ্টির মায়া কাটিয়ে পূজোর কাজে সশরীরে উপস্থিত। তবে ‘কানু বিনা গীত নেই’। বোসদার উপরেই আশাভরসা। ফান্ড কালেকশনের মধ্যমণি। প্রথমটা তার বক্তব্য দিয়েই শুরু হল। ফান্ডের ফান্ডা। মেম্বারদের চাঁদার কালেকশন এস্টিমেটের কাছাকাছি। স্পনশরশিপও মোটের উপর মন্দ নয়। মেরে কেটে কালেকশন, বাজেটের কাছাকাছি হওয়ার আশা আছে, এমনটাই বুঝলাম।
এরপর নয়ডা অথরিটির স্টাটুটারি রুল কমপ্লায়েন্সের কথা জানান হল। ফায়ারের জন্য চারটে এক্সিট পয়েন্ট চাই। সেটা প্যান্ডেল কমিটি ওকে করে দিল। কোভিডের জন্য সোশাল ডিসট্যান্সিং ও হ্যান্ড স্যানিটইজার, থার্মাল স্ক্যানার ইত্যাদি জরুরী। সরকারী রুলবুক চলে ‘লিলো’ সিস্টেমে। লাস্ট ইন-লাস্ট আউট। কোভিডের ভয় আপাতত নেই, মাস্কের ব্যাপার উঠে গিয়েছে বল্লেই চলে ( যদিও প্রেসিডেন্ট সাহেবের মাস্ক দেখা গেল), সরকারী রুল, ফাইন ইত্যাদি কোভিড শুরু হওয়ার বেশ পরে ইনট্রোডিউস হয়েছে, তাই এটা উইদড্রও হবে দেরী করে। যাতে এক জায়গায় বেশী ভীড় না হয় তাই কমিটির পাকা মাথা-রা ঠিক করলেন সিরিজে তিন জায়গায় স্যানিটাইজারের বন্দোবস্তো থাকবে।আমার ঝুনো, মানে আরেক কাঠি বেশী পাকা মাথা, ঠিক করে নিলাম তিন জায়গাতেই বলব- ‘ অন্য জায়গায় লাগিয়ে নিয়েছি। ইলেকট্রিক্যাল সেফটি কমপ্লায়েন্সের সার্টিফিকেটও এসে গিয়েছে। সেটা পাওয়া গিয়েছে বিনা অডিটেই গাজিয়াবাদ অফিস থেকে।
কালচারাল কমিটির বয়ানে শোনা গেল এবারের পুজোতে নিউলি ইনট্রোডিউসড প্রোগ্রাম ‘ফ্যাশান শো’। সংস্কৃতির আঙিনায় নব দিগন্তের উন্মেষ। গো এজ ইউ লাইকের মর্ডান ফর্ম বলেই মনে হল। তিন রকম ক্যাটাগরি। বাচ্চা বুড়ো সবারই অবারিত দ্বার। এর পরে কালচারাল কমিটির পালা। কুমার শুরু করল শব্দ ব্রহ্ম বোম-বোম ধ্বনি দিয়ে। এর গূড় কারণ হল ভাল সাউন্ড সিস্টেমের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করান। সরকারী ফতোয়া অনুযায়ী ১০০০ ডেসিবলের উপর সাউন্ড যাওয়া চলবে না। তবে এতে টেকনিক্যাল প্রশ্ন হল মেজারমেন্টটা সাউন্ড বক্স থেকে কতদূরে হবে। পুরানো অভিজ্ঞতায় দেখেছি সামনের সিটে বসে প্রোগ্রাম দেখতে গেলে দশ ফুট দূরের বক্স থেকে যে জোরালো আওয়াজ বেরোয় তাতে কর্ণকুহর ঝালাপালা হয়ে যায়। সাউন্ডের ব্যাপারে আমি তালকানা। আর্টিস্ট যত নামকরা তাদের মাইক্রোফোন নিয়ে টিউনিংএ তত বেশী সময়। বছর তিনেক আগে অনুপম রায় এসেছিলেন, গান বিশ মিনিট গাইলেন, তার ট্রুপের টিউনিংএ ওর থেকে বেশী সময় লাগল। সন্ধ্যেবেলার কালচারাল অনুষ্ঠানের ডালির একঝলক শোনালেন কুমার বাবু। ইনহাউস ও প্রফেশনাল আর্টিস্টদের যুগলবন্দী। আজকাল বিদ্বান ব্যাক্তির নামের পাশে ডিগ্রীর মত, তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের পরিচিতি হয়, নামের পাশে জি সা রে গা মা ফেম, নয়ত ইন্ডিয়া আইডল খ্যাত, লিখে। কুমারের মুখে টিজার শোনা গেল, বিস্তারিত ক্রমশপ্রকাশ্য।
প্যান্ডেলের পাশে একটি ওয়াশরুমের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে দুই-তিনজন মত প্রকাশ করলেন। বেশ ব্রেন স্টর্মিং হল। সেটা রোজ কি ভাবে পরিষ্কার হবে, কিংবা ব্যাবহার লিমিটেড ওয়েতে হবে কিনা, সে ব্যাপারে অনেকেই সন্দিহান। কেউ বল্লেন তালা মেরে চাবি সিকিউরিটির কাছে থাকবে, কেউ দিলেন ‘পে এন্ড ইউজ’ এর নিদান। তবে প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত নাকচ হয়ে গেল।
এরপর ভোগ কমিটির পালা। এবারে পুজোর দুপুরের ভোগ খাওয়া প্যান্ডেলে বসে। গত বছরের মত প্যাকড লাঞ্চ নয়, যে বাড়ীর কমফর্টে এসি চালিয়ে টিভি দেখতে দেখতে খাওয়া যাবে।এবারে পুজোর দিনক্ষণ, অন্যবারের তুলনায় আগে।সুতরাং খেতে খেতে ঘামতে বা ঘামতে ঘামতে খাওয়া জুটবে সবার কপালে। এবার হাইব্রীড মডেলে চলবে পাকশালা। বেশীর ভাগ কাঁচামাল ও রান্না করবে আমাদের পুরানো ক্যাটারার নিশিকান্ত। মিষ্টি, থালা, গ্লাস, জল পুজো কমিটি থেকে। সুখবর পাওয়া গেল, ঘোর আমিশাষীদের জন্য থাকছে, ‘মাছ এবং মাংস’, আগের জমানার মত ‘মাছ অথবা মাংস’ নয়। কালীভক্তরা ওয়েট করেন ওই দিনটিতে রাতে পুজো মন্ডপে খাসি সহযোগে খাস ডিনারের। কমিটির বেশীরভাগ সদস্যই ঐ শাক্ত ভক্তির দিনটিতে পরম বৈষ্ণব মতাবলম্বী হয়ে নিরামিষ ডিনারের পক্ষপাতী। কারণটা মনে হল বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য সচতেনতা বাড়ছে। নিরামিষ প্রোপজালে হাত তুলি নি বলে, কয়েকজনের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে জানালাম, একে তো আমি রেডমিটের ভক্ত, তায় সামনের আসনে বসা এক মেম্বার, যে হৃদয়যন্ত্রের বৈকল্যের ভুক্তভোগী, সে যখন রেডমিটে, রেডফ্ল্যগ দেখায় নি, তখন আমি তাকে রেডিলি মরাল সাপোর্ট দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করেছিলাম।
মিটিং চলাকালীন একপ্রস্থ চা ফলোড বাই সিঙ্গাড়া এল। এ অবশ্য বাঙালীর সিঙ্গাড়া নয়, রীতিমত সমোসা, প্রকারন্তরে সমস্যাও বলা যায়। সূর্যকান্তি নীরব কর্মী, এটেনডেন্স রেজিস্টারে সাইন করানো থেকে শুরু করে, সমোসা পরিবেশন ও সর্বোপরি সব ব্যাবহৃত ডিসপোজেবল প্লেট, গ্লাস কুড়িয়ে জড়ো করা, সবই এক হাতে করে গেল।জাম্বো সাইজের সমোসাতে গোলমরিচের ঝালে, নাকের জলে চোখের জলে মাখানাখি হয়ে ব্রহ্মতালুতে হাত দিয়ে দেখি স্বেদবিন্দু।লক্ষ্য করলাম আমি একা নই, আমার মত বিরলকেশ কয়েকজনের মাথাও ঘামে চকচক করছে।
পিয়ালী জানাল, এবারের পুজোর বিশেষ আকর্ষণ প্যান্ডেলে বসে মহালয়া শ্রবণ। সঙ্গে দক্ষিণহস্তের ব্যাবস্থাও থাকছে।মহালয়ার স্তোত্রপাঠের পর, স্টেজ ফ্রী ফর অল। সামনের মিটিং আবার মহালয়ার দিন।
১৮/০৯/২২





Comments
Post a Comment