ভোগের মা (রম্য রচনা)


ভোগের মা

হেডিংটা দেখে চমকাবার কারণ নেই। স্কুল-কলেজে কোন জিনিষ বা ঘটনা ভেঙে বা কেঁচিয়ে গেলে বলতাম, ‘মায়ের ভোগেগেল। বালাই ষাট। দেবী মায়ের ব্যাপারে ধরণের মন্তব্য করার মত স্পর্ধা আমার নেই। ঘটনাগুলো যেটা এরপর লিখতে যাচ্ছি সেটা ঠাকুরের, বিশেষত দুর্গাপুজা সময়ের ভোগ সংক্রান্ত। এনসিআরে বাঙালিপূজার অলখিত নিয়ম হল, এই চারদিন বাড়ীতে অরন্ধন। পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যেবেলায় আনন্দমেলা দিয়ে শুরু হয়। উৎসাহী গৃহিনীরা নানারকম স্ন্যাকস তৈরী করে নিয়ে এসে স্টল দেন। বুদ্ধিমান ব্যাক্তিরা পকেট হাল্কা করে তার রসাস্বাদন করেন। সপ্তমীর দিন সকাল সকাল অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ খেয়ে পেটপূজার পর্ব সারা হয়।


দুপুরে প্যান্ডালে বসে গল্পগুজবের মধ্যে দিয়ে খিচুড়ি, লুচি বা পোলাও সহযোগে লাঞ্চ। বিকালে কালচারাল ফাংশন দেখতে দেখতে প্যান্ডেলের পিছন থেকে ননভেজ ডিনার। এই মোটামুটি নবমী অব্দি চলে। বিসর্জনের পর সন্ধ্যেবেলায় কোলাকুলির পর কব্জি ডুবিয়ে মাংস ভাত। রসনা তৃপ্তি করেরসে-বশেথাকার প্রচেষ্টা! এতটা অব্দি বেশ রোজি পিকচার দিলাম। তবে চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে অথবা নূতন জেনারেশনের জন্য উদাহরণ হিসাবে হালফিলের ইন্টারনেটের কলঙ্ক যাকেডার্ক ওয়েববলে, সেটাও বলা যায়। 

 

শুরু করা যাক। আমাদের সেক্টরে যেমন ৫০০০/- টাকা চাঁদা দিতে হয় মেম্বারদের। এতে দুর্গাপুজা, লক্ষী, কালী সরস্বতী পূজার চাঁদাও ইনক্লুডেড। এমনি দেয় চাঁদা ছাড়া নানাধরণের স্পনসরশিপের ছড়াছড়ি থাকে। ঠাকুরের স্পেশাল ভোগ থেকে শুরু করে, পূজার ফুল, সন্ধিপূজা, ড্রিংকিং ওয়াটার প্রত্যেক ইভেন্টের জন্য স্পনসর থাকে। প্যান্ডেলে মাঝে মাঝে মাইকে শোনা যায় অমুকে এটা স্পনসর করেছেন, তমুকে ওটা স্পনসর করেছেন ইত্যাদি। বুদ্ধিমান স্পনসরার-রা স্পেশাল ভোগ বা মূল ভোগ স্পনসর করেন। কারণ তাদেরকে পঞ্চব্যঞ্জন পরমান্ন সহিত মূলভোগের প্যাকেট উপরি পাওনা হিসাবে পাওয়া যায়। অন্যান্য স্পনসরশিপে এইরকম উপরিপাওনা মিসিং। আবার পকেট সচেতন বুদ্ধিমান বাঙ্গালীর অভাব নেই। তারা ক্যালকুলেট করে বার করেছেন, অঞ্জলি দিতে অর্থাৎ পুণ্য অর্জন করতে বা বিকালে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজিরা দিতে কোন দক্ষিণা নেই। দুপুরের খাওয়ায় গেষ্ট কুপনের চল আছে। সেই হিসাবে তিনজনের ফ্যামিলি হিসাবে তিনদিন ভোগে নয়শত টাকায় কেল্লা ফতে। 


দুর্গাঠাকুর তার সন্তানদের জন্য ভোগ রান্না হয় আলাদা করে। বেচারা অসুর বাদ। ওইরকম ম্যাসলম্যানের কপালে খুদকুটোও নেই। গব্যঘৃত, সুগন্ধী আতপ নানাবিধ পদের তরকারী, পরমান্ন, ভাজা সহ এইমূলভোগঅতি উপাদেয় খাদ্য। এই ভোগ রান্নার অধিকারী কেবলমাত্র ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়  অর্থাৎ বামণি। তবে ক্লোস সার্কিটের কিছু অব্রাহ্মণ মহিলা এতে অংশ নিয়ে থাকেন। তারা কাটাকুটি,চাল ধোয়া ইত্যাদি কাজ করেন, তবে হাতাখুন্তি নাড়া থেকে বঞ্চিত।শোনা যায় ঠাকুরের মূলভোগ রান্না করা পুণ্যের কাজ, তবে নিন্দুকেরা বলেন, এই মূলভোগ রান্নার মূল কারণ, এই কাজে যুক্ত প্রমীলাবাহিনীর উৎকৃষ্টমানের মূলভোগে জঠর পূর্তির তীব্র আকর্ষণ। 

ভোগ দেখা যায় অনেক সময়ে খাবার বেঁচে যায়। তক্কে তক্কে থাকা কিছু সুযোগসন্ধানী লোকও থাকেন। তারা গাছেরও খান আবার তলারও কুড়োন। তাদের আর্মস হল টিফিন কেরিয়ার বা নিদেনপক্ষে প্লাস্টিকের কৌটো।বাড়ীর লোক আসে নিএরকমটাই বলে খাওয়ার লাইনের শেষপর্বে তারা এক্টিভ হয়ে কৌটো ভরে ফেলেন। কমিটির কিছু হর্তাকর্তা অবশ্য নিঃশব্দে, উৎসমুখ অর্থাৎ কিচেন থেকে সরাসরি ডাব্বা ভর্তি করে ঝোলায় ভরে প্যান্ডালের কাছে থাকা গাড়ীতে রেখে আসেন। একবার তো এক মেম্বার কৌটো বোঝাই হয়ে ভাবলেশহীন মুখে যাচ্ছিলেন। খিচুড়ির ভারে প্লাস্টিকের প্যাকেট ছিঁড়ে সব খিচুড়ি কার্পেটে মাখামাখি। ভদ্রলোকের মুখ তখন শুকিয়ে আমসি।


নিম্নলিখিত ঘটনা বা দুর্ঘটনাও বলা যায়, যার মঞ্চস্থল আমাদের ২৬ সেক্টরের নয়ডা কালীবাড়ী ইনফ্যাক্ট ওটা শোনার পরেই এই লেখার শুরু। আজকাল হোয়াটস্ এ্যপের কল্যানে এ্যকশন-রিএ্যকশন মুহুর্তে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের সেক্টরের এক ভদ্রলোক আজ আমায় মেসেজ ফরোয়ার্ড করায় জানতে পারলাম।পরশুদিন ছিল কৌশিকী অমাবস্যা। এই অনুষ্ঠান আমার ডিকশনারিতে নবতম সংযোজন।গুগল করে জানলাম ভাদ্র মাসের অমাবস্যায় দেবী কৌশিকী বা আদ্যাশক্তি শুম্ভ-নিশুম্ভ নামে দুই অসুর বধ করেছিলেন। এযাত্রায় অবশ্য একজন অসুরই ধরাশায়ী হলেন। কালীবাড়ীতে রাতে ভোগ খাওয়ার জন্য লাইনে অনেকে দাঁড়িয়েছিলেন। যে মহিলা ভিক্টিম তার জবানবন্দী মারফত জানা গেল, জনৈক বোস নিজের বাড়ীর জন্য দুই-তিন ডাব্বা খিচুড়ি সরিয়ে রেখেছিলেন। ভোগ প্রসাদ পেতে দেরী হচ্ছে দেখে ওই মহিলা কারুর নাম না করে এর প্রতিবাদ করেন। তারপরেই শুরু জগাখিচুড়ি কান্ডের। তর্কাতর্কির পর উত্তেজিত বোসবাবু মহিলাকে এক বিরাশীসিক্কার চড় হাকিয়েছেন। নিমেষে চড়চড় করে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। নিপীড়িতা মহিলা সোজা পুলিশে ফোন করেছেন। ফলস্বরূপ বোসবাবুর একরাত লকআপে কাটাতে হয়েছে। খিচুড়ির খেসারত!

পুলিশকে উৎকোচের মাধ্যমে বশীভূত করে শেষরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন কালীবাড়ী কমিটির কর্তা ব্যাক্তিরা। তবে আজকাল গেরুয়াধারী সিএম ঘুষের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স পন্থা নিয়েছেন, তাই কমিটির চেষ্টা ফলপ্রসূ হয় নি।

 ঘটনাট আমার কলেজের এক সিনিয়ার দাদাকে ফোনে বলছিলাম। উনি তার বসন্তকুঞ্জের পুজোর ভোগের এক গল্প শোনালেন। ওদেরই পাড়ার এক সিনিয়ার লোকের গল্প, পঁচাত্তরের উপর বয়েস, তার উপর উনি বড় ডাক্তার ছিলেন, তার ওয়াইফও সরকারী চাকুরে ছিলেন। করোনার সময় গেলবার প্যাকেট করে খাবার দেওয়া হচ্ছিল। ডাক্তার ভদ্রলোক মিসেসের জন্য আরো একটা প্যাকেট লাগবে বলে, দু প্যাকেট নিয়ে গেলেন। উনি গাড়ীতে গিয়ে বসার পর, উনার ওয়াইফও দুটো প্যাকেট নিয়ে গেলেন। আমার কলেজের দাদা ঠাট্টা করে বল্লেন, মনে হচ্ছে এই খাবারে লক্ষীপুজো অব্দি টেনে দেবেন।

তবে দেখেছি, ভোগের ব্যাপারে নর্থ ইন্ডিয়ার লোকজন বেশ প্রাকটিক্যাল। আমাদের সোসাইটির হলে মহিলারা মাঝে মাঝে বিশেষ তিথিতে পুজো করেন। সমবেত স্বরে গান হতে থাকে, একটু পরে পরে গানের বিরতির সময়, “মাইয়াকো ভোগ লাগে বলে শূন্য মুষ্ঠি ঠাকুরের মুখের সামনে ঘুরিয়ে আনেন। একদম প্রাকটিক্যাল এপ্রোচ। একেবারে খালি হাতে অবশ্য ভক্তগনকে যেতে দেওয়া হয় না। সাধারনত একটা কলা ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতেই পুজোর ষোলকলা পূর্ন

দেবদত্ত

২৮/০৮/২২


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments