লোকটাক ও লোকজীবন (সোশিও ইকোলজিকাল ইস্যু)
লোকটাক
‘লোকটাক’ নামটা প্রথম শুনি, ‘লোকটাক হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্রজেক্ট’এর মাধ্যমে। মনিপুরস্থিত ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন এই পাওয়ার স্টেশন থেকে নর্থওয়েস্ট ইন্ডিয়ার স্টেটগুলিতে বিদ্যুৎ বিতরন হয়।
মনিপুরের ‘লোকটাক’ লেক নর্থ ইস্টের বৃহত্তম মিষ্টি জলের লেক, আয়তনে ২৮৭ বর্গ কিলোমিটার। ইম্ফল থেকে এই জায়গার দূরত্ব ৪০ কিমি। মনিপুরের এই লেক এবং সংলগ্ন অঞ্চল সমতল বা ভ্যালি, আশেপাশের পাহাড়ী রাজ্য মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং লাগোয়া দেশ মায়ানমার থেকে বর্ষার সময় নদীর জল এখানে এসে জমা হয়ে এই লেক তৈরী হয়েছে।
আদিকাল থেকে এই লেকের জল ও পারিপার্শ্বিক ইকোসিস্টেমের উপর লোকাল মৈতেয়ি সম্প্রদায়ের আর্থ সামাজিক জীবন নির্ভর শীল ছিল। যান্ত্রিক সভ্যতার প্রসারে এই ইকোসিস্টেমের ক্রমশঃ অবনয়ন হয়েছে, যা ঘটেছে কালের প্রবাহে ধীরগতিতে।
শহুরে জীবনে, মানবসভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে, সযূয্যভাবে লাইফস্টাইল চেঞ্জ হতে থাকে। কারণটা মানুষের জীবিকা, যেটা শিক্ষিত মানুষ তার স্কুল-কলেজের বিদ্যার্জনের মাধ্যমে পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক আবহাওয়ার সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম থাকে। কিন্তু আদিবাসী সমাজের জীবিকা ও সমাজজীবন প্রাকৃতিক ও ভৌগলিক পারিপার্শ্বিতার উপর অনেকখানি নির্ভরশীল। তাই ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন তাদের লাইফস্টাইলে শুধু যে আর্থিক প্রভাব ফেলে তাই নয়, তাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলেরও আমূল পরিবর্তন ঘটায়। লোকটাক লেক ও ওয়েটল্যান্ডের পরিবেশগত অবনয়ন এবং মৈথেয়ি সমাজে তার প্রভাব এরই এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে লোকটাক জলাভূমি, ভারতের ৪৯টি ‘রামসার কনভেনশন’ ট্যাগযুক্ত ওয়েটল্যান্ডের অন্যতম। রামসার ট্যাগ সেই সমস্থ জলাভূমি কে দেওয়া হয় যেগুলি ইকোলজ্যিকালি ফ্রাজাইল, যেখানের বায়োডাইভার্সিটি জলাভূমির সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত। লোকটাক লেকে বিভিন্ন ধরনের পরিযায়ী পাখি আসে। এখানের সাঙ্গি হরিণ যা ড্যান্সিং ডিয়ার নামে পরিচিত, যা ধীরে ধীরে এক্সটিংক্ট হয়ে যাচ্ছে।
লোকটাক লেকের বিশেষত্ব যে এর দক্ষিণদিকে ভারতের একমাত্র ভাসমান ন্যাশানাল পার্ক (কেইবুল লামঝাও Keibul Lamjao) অবস্থিত। এটাই সাঙ্গি হরিণের বাসস্থান।
গতশতাব্দীর শুরুর দিকে লোকটাক ছিল গোটা কুড়ি জলাভূমির সমষ্টি এবং জলাভূমিগুলি একে অপরের থেকে আলাদা থাকত সলিড ল্যান্ডমাস দিয়ে। যখন বর্ষার জল নেমে আসত আশেপাশের পাহাড়ী নদী (থৌবাল, ইম্ফল, ইরিল, কংবা, হেইরক, সেকমাই, নামবুল, মনিপুর) বেয়ে, তখন জায়গাটা জলে ভরে লেক হয়ে যেত, আবার গ্রীষ্মকালে আলাদা আলাদা জলাভূমি হয়ে যেত।
পরবর্তীকালে শুকনো জমি কমতে থাকে, তার বদলে তৈরী হয় মাটি, নানারকম জলজ গাছপালা ও অরগানিক জিনিষ দিয়ে তৈরী একধরনের ভাসমান দ্বীপ।
স্থানীয় ভাষায় এর নাম ‘ফুমডি’। লোকটাক লেক হল মনিপুর রিভার বেসিনের অন্তর্গত এবং মনিপুর রিভার বেসিন আবার বৃহত্তর মায়ানমার-স্থিত চিন্দউইন-ইরাবাডী রিভার বেসিনের অংশ।
সমস্যার শুরু হয় ১৯৮৩ সালে নির্মিত ইথাই ড্যাম ও লোকটাক হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রোজেক্টের (১০৫ মেগাওয়াট) জন্য।
ইথাই ড্যামলোকটাক হাইড্রো ইলেকট্রিক প্রোজেক্ট
ইথাই ড্যাম তৈরী হয় মনিপুর নদীর উপর, যেটা মনিপুর রিভার বেসিনের অন্তর্গত (ম্যাপটা লক্ষ করুন)।
এই ড্যামের উত্তরদিকে হল লোকটাক লেক এবং এই লেকের জল আরো উত্তরে পাওয়ার স্টেশনে যাচ্ছে। ইথাই ড্যাম নদীর প্রবাহতাকে রেগুলেট করে, বিশেষত বর্ষাকালে জলকে অন্যদিকে ডাইভার্ট করে কৃষিকার্যের জন্য। এছাড়া লেক থেকে যত পরিমান জল পাওয়ার স্টেশনে যাচ্ছে, সেটা হিসাব করে ইথাই বাঁধ থেকে জল ছাড়া হয় যাতে লোকটাক লেকে জলের লেভেল এক থাকে অর্থাৎ কোন সিজিনাল ভ্যারিয়েশন না হয়।
প্রাইমাফেসিতে ব্যাপারটা ঠিকই লাগবে, কারণ উদ্বৃত্ত জল কৃষিকাজে লাগছে, লেকে জলের লেভেলও ঠিক থাকছে। কিন্তু গন্ডোগোলের সূত্রপাত এখানেই। লোকটাক জলাভূমির ভঙ্গুর পরিবেশ এবং সেইসঙ্গে মৈথেয়ি সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, জলের লেভেলের ওঠানামার সঙ্গে জড়িত। ব্যাপারটাকে আরেকটু খোলসা করার চেষ্টা করি। ড্যাম ও পাওয়ার স্টেশন তৈরীর আগে, লেক এবং তৎসংলগ্ন জলাভূমিতে গ্রীষ্ম এবং বর্ষার সময় জলের উচ্চতার তারতম্য থাকত। ভাসমান ল্যান্ডমাস বা ফুমডিতে যে গাছপালা থাকে তাদের নরিশমেন্ট ঠিকমত হয়, যখন জলস্তর নীচের লেভেলে থাকে এবং ‘ফুমডি’র গাছপালা মাটির অংশকে টাচ করে প্রয়জোনীয় খাদ্য রুটের মধ্যমে নিতে পারে। জলস্তর যখন উচ্চস্তরে পৌঁছায় তখন ফুমডি আবার ভাসমান হয়ে পড়ে। লোকাল মানুষেরা একটা সময়ে লোকটাক লেক এবং ওয়েটল্যান্ড থেকে মাছ ধরত এবং মাছ শুকিয়ে তা রপ্তানী করত। কিন্তু ড্যাম তৈরীর পর থেকে মাছের সংখ্যা ও সর্বোপরি ভ্যারাইটি কমে গিয়েছে। আদিমকালে খাদ্য সংগ্রহের জন্য মানুষ এবং জীবজগত যেমন একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় মাইগ্রেট করে তেমনি জলজ প্রাণীও মাইগ্রেট করে থাকে। ড্যাম তৈরীর ফলে মায়ানমারের ইরাবাডী রিভার বেসিন থেকে মাছের মাইগ্রেশন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফিশিং ছিল লোকাল মৈথেয়িদের প্রধান জীবিকা। তারা ফুমডির উপর ঘর তৈরী করত যাকে লোকাল ভাষায় বলা হয় ‘ফুমসাং’। মৈথেয়িরা ফুমডিকে ট্রিম করে, তার উইড পরিষ্কার করে ফুমডিগুলিকে গোলাকার বা বর্গাকারে সাজিয়ে পাথর বেঁধে দেয় যাতে ফুমডি ফ্লোট না করে। এরপর মাঝখানে নেট লাগিয়ে রাখে। মাসখানেক পরে, পুরো কমিউনিটি এসে নেটে জমা মাছ ধরে।এই নেট লাগানোর পুরো ব্যাপারটাকে লোকাল ভাষায় বলে ‘অথাফুং’ (athaphum)।
ট্রাডিশনালি মৈথেয়ি মেয়েরা মাছ শুকিয়ে বিক্রি করে, মেয়েরাই মাছের দোকান চালায়। এছাড়া আগে এখানে মেয়েরা মৃৎশিল্পের কাজ করত। ক্লে পাওয়া যেত জলাভূমির পাড়ে যে সেডিমেন্ট জমা হত জলের লেভেলের তারতম্যের জন্য, সেই মাটি ব্যবহৃত হত। কিন্তু ড্যাম তৈরী হওয়ার পর জলের লেভেল এক থাকার জন্য সেই মাটি আর পাওয়া যায় না। আগে ওয়েটল্যান্ড থেকে ডে টু ডে প্রয়োজনীয় শাকসব্জি, রান্নার কাঠ ইত্যাদি সংগ্রহ করা যেত অনায়াসে, এখন পুরো জায়গাটা লেক হয়ে যাওয়ায় সেটা সম্ভব নয়।
ফিশিং ও ওয়েটল্যান্ড রিলেটেড অন্যান্য জীবিকার ক্রমবর্ধমান হ্রাসের কারণে, বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই ইকোটুরিসিম করছেন। ফুমডির উপর অস্থায়ী ঘর বানিয়ে হোম স্টে বানিয়েছেন।
ফুমডি ধীরে ধীরে কমছে, যদিও সেটার কারণ লোকাল লোকের জীবিকানির্বাহের ফলে নয়, তবুও বর্তমানে লোকটাক ডেভেলপমেন্ট অথরিটি হোম স্টে নিষিদ্ধ করেছে। এছাড়া অথাফুং তৈরী করে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে। ২০১১ সালে ৭০০ ফুমসাং (ফুমডির উপর তৈরী অস্থায়ী ঘর) জ্বালিয়ে দেওয়া হয় সরকার থেকে। সরকারী একতরফা ফয়সালার প্রতিবাদে সরব হয়েছে, লোকটাক হোম স্টে এসোশিয়েশন এবং আরো কিছু লোকাল গ্রুপ।
মূল প্রবলেম বুঝতে পেরে ২০১৭ সালে, মনিপুর সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আবেদন করেছে ইথাই ড্যাম এবং পাওয়ার প্ল্যান্টটাকে ডিকমিশন করতে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এ ব্যাপারে এখনো কোন উচ্চবাচ্য করে নি, তার কারণ আশেপাশের সব স্টেটই লোকটাক জলবিদ্যুত প্রকল্পের বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল।
আজকাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার কথা হচ্ছে পৃথিবী জুড়ে, কারণ চিমনি নির্গত প্রচুর পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড ওজোনস্তরকে ডিপ্লেট করছে। হাইড্রো পাওয়ারের ক্লিন এনার্জি হিসাবে ধরা হচ্ছে। লং টার্ম ও শর্ট টার্ম পরিবেশগত প্রভাবের সম্যক স্টাডি না হলে হাইড্রো প্রোজেক্ট যে পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট করে মানবজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, লোকটাক হাইড্রো প্রোজেক্ট তারই এক নিদর্শন।
দেবদত্ত
০১/০৮/২০২২










Very nice and detailed analysis of the issues.
ReplyDeleteদারুণ লিখেছো ! Incidently, এবারের পুজোয় Imphal যাচ্ছি 😊
ReplyDelete