কনফিউসড (real life satire)
কনফিউজড
রিটায়ার্ড লাইফে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে ফোনালাপে অনেকটা সময় কেটে যায়। খেজুরে গল্পই বেশী হয়। এরা বেশীরভাগই স্কুল/কলেজের ক্লাসমেট। মোবাইল আসার আগে যোগসূত্র কাট-অফ ছিল। ফোনের কথোপকথনে ধীরে ধীরে মনুষ্যচরিত্রের বিচিত্রতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হচ্ছি।
ধরা যাক বিমান নামে বন্ধুটি। ফোন করলে প্রত্যেকবারই প্রথমে যেটা বলে সেটা হল -“আরে কী ব্যাপার তোর? কোথায় থাকিস? কোন সাড়া শব্দ নেই!” এরপর শুরু হয় গল্প। সেদিন ফোন করে বিধিবদ্ধ সম্ভাষণের পর বল্ল-“আরে অসিতের কি খবর? ও কি এখানেই আছে, নাকি কলকাতায়?” বলে রাখি অসিত আমাদের আরেক ক্লাসমেট। সে নয়ডাতেই থাকে, মা কলকাতায় আছে, তাই রিটায়ার্ড লাইফে মাঝে মাঝে বেশ কিছুদিনের জন্য কলকাতায় চলে যায়। ক্লাসমেটদের হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে সবার হোয়ারএবাউটস জানা যায়। সেখান থেকেই জেনেছিলাম অসিত সম্প্রতি কলকাতা থেকে ফিরেছে। সেই খবরটাই বিমানকে জানালাম। এবার বিমানের উত্তর -“ও এতদিন ধরে কলকাতায় কেন থাকে? ও কি পার্মানেন্ট কলকাতায় শিফ্ট করার প্ল্যান করছে নাকি”। আমি বল্লাম -“ না, ওর বৌ এখন চাকরী করছে, ও যাবে কি করে? কলকাতায় মায়ের বয়স হয়েছে তাই যায়।” বিমান বল্ল -“নিশ্চয়ই ঘন ঘন কলকাতা যাওয়ার পিছনে কিছু রহস্য আছে। তাহালে তুই বলছিস ও কলকাতা থেকে ফিরে এসেছে।” আমি একটু অবাক হয়ে বল্লাম-“ কেন, তুই গ্রুপে দেখলি না কয়েকদিন আগে নয়ডার বাড়ীতে বারবিকিউ পার্টির ফটো দিয়েছিল। বিমান একটু চুপ, তারপর বল্ল-“না, অসিত কৌশানি বেড়াতে গিয়েছে। আগামীকাল ফিরবে”। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা, জিজ্ঞাসা করলাম-“তুই জানলি কোথা থেকে?” ওপ্রান্তে জবাব-“ঐ যে, কাল ফোন করেছিলাম, তখন জানলাম”। সব জেনেও আমাকে সেটা জিজ্ঞাসা করার কি মানে আছে ধরতে পারিনি! তবে বিমান ঐরকমই। “মনুষ্য চরিত্র দেবা না জানন্তি”!
বিমান নয়ডাতে বসবাস শুরু করেছে বছর খানেক হল। ছত্রিশগড়ে স্টীলপ্ল্যন্টে পুরো চাকরিজীবন কাটিয়ে এখানে থিতু হয়েছে। রুট কলকাতাতে ছিল, কিন্তু মেয়ে এখানে চাকরী করছে, তাই আসা। কিছুদিন আগে কলেজের এল্যামনি গ্রুপে দেখলাম, দিল্লীর নেহেরু পার্কে পিকনিক হবে। গত দুই বছর করোনা ও সাত/আট বছর চাকরী সুবাদে বাইরে থাকার জন্য অনেকদিন এল্যামনির পিকনিকে যাওয়া হয় নি। ঠিক করলাম এবার যাব। বিমানকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম ও যাবে কিনা। আগে গল্প করতে করতে বেশ কয়েকবার জানিয়েছে, ওর কর্মস্থলেও এল্যামনির পিকনিক হত। আমার প্রস্তাব শুনে প্রথম উত্তর-“আমি তো কাউকে চিনি না। গিয়ে চুপ করে এক জায়গায় বসে থাকতে হবে।” আমি বল্লাম-“আমি তোকে আলাপ করিয়ে দেব”। তখন বল্ল “জায়গাটা তো চিনি না, কি করে যাব?” আমি বল্লাম “সে তুই চিন্তা করিস না, আমি গাড়ী নিয়ে যাব, তুই আমার বাড়ী চলে আসিস।” ও প্রান্তে মনে হল একটু নিশ্চিন্ত হল। এপ্রসঙ্গে বলি কিছুদিন আগে আমাদের দু জনেরই গুরগাঁওতে, আরেক ক্লাসমেটের বিয়েতে নেমন্তন্ন ছিল। বিমান যাবে ড্রাইভার নিয়ে। তবে আমাকে যাবার আগে জানাল, ও ড্রাইভার সমেত গাড়ী নিয়ে আমার বাড়ীতে আসবে এবং তারপর আমার গাড়ীকে ফলো করে আসবে। যদিও ড্রাইভার নিয়ে যাবে, তবে আমাকে ফলো করা কি হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে না অন্য কোন কারণে বুঝি নি। যাক পিকনিকের আগে বেশ কয়েকদিন বিমানের ফোন এল প্রতিবার প্রশ্ন “তুই যাবি তো?” আমি বল্লাম “হ্যাঁ।” পিকনিক কমিটি, পিকনিকের কয়েকদিন আগে পুরো টাকাটা এ্যডভান্স চাইল। আমিও করে দিলাম, কাট অফ ডেটের একদিন আগে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিমানের ফোন-“হ্যা রে তুই টাকা দিয়ে দিলি?” বল্লাম “সেরকমই তো কমিটি বলেছে।” একটু চুপ থেকে বিমানের বক্তব্য “আমি ভাবছি যাব না।” আমি বিস্মিত- বল্লাম “সেকিরে দুদিন আগেও তো বলছিলি যাবি, আজ আবার কি হল?” বিমান জানাল “না কাউকে চিনি না তো, তোরা সব পুরানো লোক, বোর হয়ে যাব, পরের বার যাব!” আমি বল্লাম “পরের বরেও তো প্রশ্নটা একই থাকবে। এবার গেলে দেখবি তোর বেশ কয়েক জনের সঙ্গে আলাপ হবে, আর না গেলে গ্রুপে জানিয়ে দিস, নইলে প্লেট এক্সট্রা হয়ে যাবে”। “দেখি, ভাবছি” বলে ফোন কেটে গেল। পরের দিন ফোন করে বিমান জানাল ভাবছি পেমেন্ট করে দিই, তুই কি ভাবে যাবি?” আবার জানালাম “তোকে তো আগেই বলেছি, গাড়ী নিয়ে যাব।” জিজ্ঞাসা করলাম “তোর মত পরিবর্তনের কারণ কি?” বিমান জানাল, পুরানো বেশ কিছু কলিগকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল ওর যাওয়া উচিত কিনা। তারা সবাই একবাক্যে জানিয়েছে, যাওয়া খুবই উচিত। এল্যামনির সবাই বাঙালি হবে, এক কলেজের, ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচিং হবে, এনজয় করবি। সব দিকের ফিডব্যাক নিয়ে তবে আটঘাট বেধে বিমান ডিশিসন নিয়েছে। পিকনিক থেকে ফেরার সময় বল্ল যে, ও বেশ এনজয় করেছে।
এর কিছুদিন পরে এল্যামনির এন্যুয়াল জেনারেল মিটিং কাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। ফোন করে বল্লাম, “এবার তো তোর চেনা জানার প্রবলেম নেই, যাবি তো”। ওপ্রান্তে উৎসাহের স্বর শোনা গেল “তুই কি ফ্যামিলি নিয়ে যাবি?” এবার মেয়ে গান করবে তাই তিনজনই যাব। অত খোলসা না করে বল্লাম, “ হ্যা, সবাই যাব”। বিমানের মেয়ে আমার মেয়ের থেকে একটু ছোট। বিমানও কনফার্ম করল যাবে বলে। হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে কনফার্ম করে দিলাম যাচ্ছি, বিমানও করে দিল, কারণ খাবার প্যাকেট দেওয়া হবে। তাই কনফার্মেশন টা জরুরী। দুই তিন ধরে হলের লোকেশন নিয়ে বিমানকে বোঝাতে হল, যদিও ও যাবে ড্রাইভার নিয়ে। ফাংশনের আগেরদিন ফোন এল,- “ না রে, আমি যাব না।” আজকাল আর আমি সারপ্রাইজড হই না। নিজে থেকে বল্ল- “খুব গরম পড়েছে”। আমি বল্লাম “ওয়েদার ফোরকাস্টে কিন্তু দেখাচ্ছে বৃষ্টি হবে”। বিমান বল্ল “ নাও তো হতে পারে। হলে এসি আছে শুনেছি, কিন্তু কাজ করবে কিনা কে জানে!” ফাইনালি বিমান এল না।
মাঝে মাঝে দুই জনের মধ্যে কথা হয় রিটায়ার্ড লাইফে কোথায় কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায়। বিমান আবার ট্রেনের ভক্ত। তবে হেজিপেজি ট্রেন নয়। শতাব্দী, বন্দেভারত, দুরন্ত, রাজধানী প্রভৃতি ট্রেনের ভক্ত। তবে ডেস্টিনেশনের কনসেপ্টে বেশ “হটকে” বলা যায়। আমাকে জানাল ও সিমলা যাবে। দিল্লি থেকে কালকা মেল ধরে কালকা ওখান থেকে সিমলার হেরিটেজ টয় ট্রেন ধরে সিমলা। তবে ও সিমলাতে রাত কাটবে না। ওই ট্রেনেই আবার ব্যাক করে কালকা হয়ে দিল্লি আসবে। মনে হয় বিশ্বকবির একটা লাইন ওর মনে গেঁথে গিয়েছে- “আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ।” ডুয়ার্সের ট্রেনে দুটো ভিস্টাড্রোম কোচ দিয়েছে। কাঁচ লাগানো। ছাদও খোলা। বিমানের ওই কোচেও চড়ার ইচ্ছে।
কয়েকদিন আগে সুমিতা বিমানের মিসেস কে ফোন করছিল। শুনলাম ড্রাইভার নিয়ে আগ্রা গিয়েছিল। বিমানকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম, “বেরিয়ে এলি শুনলাম আগ্রা থেকে। কি রকম লাগল তাজমহল? বিজন বেশ খুশীমুখে জানাল, “আমি তো যাই নি। মেয়ে আর বৌ ঘুরে এল।“ আমি বল্লাম “সে কি রে দেশ বিদেশ থেকে কত লোক তাজমহল দেখতে আসে। পৃথিবীর সপ্ত আশ্চর্যের মধ্যে একটা। গাড়ীতে জায়গা ছিল না বুঝি? অন্য কোন গেস্ট ছিল?” বিমান বল্ল “ না, গাড়ীতে জায়গা তো ছিল। বৌ আর মেয়েই তো গেল। সকালে কে আর লেপ ছেড়ে ওঠে। তাছাড়া তাজমহলে দেখার আছেটা কি? ছবিতে তো দেখেইছি।” মনে মনে ভাবলাম বিশ্ববিনন্দিত এই প্রেমের সৌধের কল্পনায় বিশ্বকবি লিখেছিলেন “এক বিন্দু নয়নের জল, কালের কপোততলে শুভ্র সমুজ্জ্বল, এ তাজমহল”। বিমানের উত্তরে আমার চোখ দিয়ে জল পড়ার অবস্থা!
দেবদত্ত
০৪/০৬/২০২২

Comments
Post a Comment