ডিগ্রিমাহাত্ব্য (রম্যরচনা)
ডিগ্রিমাহাত্ব্য
‘ছাত্রানাং অধ্যায়নং তপঃ’ এই মূলমন্ত্র মাথায় রেখে বাগদেবীর আরাধনার দিনে খাগের কলমে হাতেখড়ি দিয়ে যে পথচলা শুরু, তার সমাপ্তি ঘটে ডিগ্রীলাভের মধ্যে দিয়ে। পরবর্তীকালে সেই ডিগ্রী সার্টিফিকেট হয়ে দাঁড়ায় কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের প্রধান হাতিয়ার হিসাবে। আজকাল প্রাইভেট কলেজের দৌরাত্ব্যে, ইঞ্জিনীয়ারিং ডিগ্রিটার গ্ল্যামার ফিকে হয়ে এসেছে। কারিগরী ডিগ্রির কেরামতি, কয়েক দশক আগে ভারে না কাটলেও ধারে কাটত। ‘গ্রাজুয়েট’ শব্দটার মধ্যে মার্কসবাদী তত্বের আদর্শবাদী মিল, শ্রেণীবিভাগের বা উচ্চ-নীচ বিভেদ নেই, সবাই এক পংক্তিতে, তিন বছরের বিএ ডিগ্রীও গ্রাজুএট আবার পাঁচ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং বা ইন্টার্নশিপ মিলিয়ে ছয় বছরের এমবিবিএস, সবাই গ্রাজুয়েট। আমরা যেটাকে গ্রাজুয়েট বলি, বিদেশে আবার সেটা আন্ডার গ্রাজুয়েট কোর্স। বিএ/বিএসসিতে আবার ডিগ্রির পাশে ‘অনার্স’ যোগ করতে গেলে, বেশী সাবজেক্ট পড়তে হয়। আমাদের যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে সে রকম চাপ নেই। অনার্স তকমা পাওয়া যদি প্রাপ্ত নম্বর ৭৫% এর বেশী থাকে। ক্লাসটেস্টের মার্কসের পঞ্চাশ পার্সেন্ট যোগ হয় সেমিস্টারে, শিক্ষকরা দরাজ হাতে নম্বর দিয়ে থাকেন, তাই অধিকাংশ বিই ডিগ্রি হোল্ডাররা অনার্স পেয়ে যায়। নম্বরের ব্যাপারে অবশ্য কেরালা স্টেটটা নাম্বার ওয়ান। গতবারে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা কলেজ এসআরসিসিতে এডমিশান পেয়েছে, তারা প্রায় সবাই কেরালাইট, কারণ তারা বেশীরভাগই ১০০% মার্কস পাওয়া।
পোস্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রিটা আমাদের আমলে কৌলিন্য পায় নি। যারা প্রথম থেকেই ডিটারমিন্ড ছিল শিক্ষার লাইনে থাকার জন্য অথবা যারা চাকরী পায় নি তারা এমটেকের খাতায় নাম লেখাত। এমটেক করলে মোটামুটি অঙ্কের টাকাও আসত পকেটে। ডাক্তারদের আবার উচ্চশিক্ষার ডিগ্রির লোভটা বেশী। কারণটা অবশ্যই অর্থকরী। আশির দশকে এমবিবিএস ডাক্তারের ফি আট টাকা হলে, এমডি ডাক্তারের ফি চৌষট্টি টাকা। তখনকার দিনে দুই, চার, আট,ষোল, বত্রিশ এরকম দুগুন হিসাবেই ভিজিটের ফী হত। ডিগ্রির লেজ যত লম্বা হবে, তত তার পসার। ডিএনবি, এমআরসিপি, এফ আরসিএস আরো হরেক রকম নাম না জানা ডিগ্রী আছে, যে গুলোর জন্য পরীক্ষা পাশের দরকার, টাকা দিয়ে মেম্বার হলেই একটা ডিগ্রি পাওয়া গেল। শহরে আজকাল এমবিবিএস ডাক্তার প্রায় ডুমুরের ফুল। সামান্য কানে ব্যাথার জন্য সেদিন ফর্টিসে গিয়ে আড়াই হাজার গচ্ছা গেল। ইএনটির এইচওডি কানটা সাকশন মেশিন লাগিয়ে পরিষ্কার করলেন, মিনিট খানেকের কাজ, তাতে দুবার লাইনে দাড়িয়ে বিলিং করতে হল, সেটাতেই আধাঘন্টা, তারপর ওয়েটিং পিরিয়ড একঘন্টা। কানপরিষ্কারের ১৫০০ টাকার পেমেন্ট করে রসিদটা জমা দেওয়ার পর বসে থাকতে হল পয়তাল্লিশ মিনিট। পেমেন্ট হয়ে গিয়েছে, ডাক্রারবাবু নিশ্চিন্তে সর্বশেষ রোগীটিকে বিদায় করে, আমাকে ডাকলেন। কানের আরাম হল বটে, তবে হসপিটালের কানমলা বেশ মনে থাকবে। কান পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে পকেট পরিষ্কার! আফশোষ হল, পাড়ার পার্কটাতে একটা কান পরিষ্কারের লোক আসে, ওর কাছে গেলে ২৫-৩০ টাকায় হয়ে যেত! ‘চক্ষুলজ্জা-ভয়’ এই থাকতে বচত নয়। পার্কে ঢোকার মুখে ফুটপাথে একটা ইটালিয়ান সেলুন আছে, মানে ইটে বসে চুল কাটা, আমরা ছোটবেলায় ঠাট্টা করে বলতাম। রিসেন্টলি নাপিত একটা চেয়ার লাগিয়েছে, বলতে পারা যায় একটা ‘ডিগ্রি’ বেড়েছে, ফিজিক্যালি সত্যি তাই, মাটি থেকে তিনফুটের উন্নতি। মহল্লার খবর নিতে গেলে নাপিতের জুড়ি নেই। আগেকার দিনে নাপিতরা বাড়ী বাড়ী ঘুরে চুল কাটত, আর এবাড়ীর হাড়ির হাল, অন্য বাড়ীতে চালান করত। পার্কে ঢোকার মুখে মাঝে মাঝে খোশগল্প হয়। সেইদিন একজন চুল কাটছিলেন। কথায় কথায় জানলাম তিনি ইআইএল এর সিনিয়ার ম্যানেজার। একাধারে চমৎকৃত হলাম তার সাহসে, আবার দুঃখও হল ইঞ্জিনিয়ারদের অধঃপতনে। তবে জনান্তিকে জানাই, আমি ওর থেকেও এককাঠি উপরে, সেল্ফ হেল্প ইজ দ্য বেস্ট হেল্পের মত, ট্রিমার দিয়ে নিজেই চুল কেটে নিই। টাক থাকার একটাই প্লাস পয়েন্ট পেয়েছি, চুল কাটার সুবিধা। সেলুনে আবার একই দর, কুঞ্চিত কেশরাজি থেকে, টাকওয়ালা ভদ্রলোক, চুল ছাটার জন্য সবার একই রেট।
চারশ-পাঁচশ বছর আগে বাংলাতে বিদ্যাশিক্ষার জন্য টোল হত। সেকালে ব্যাকারণ, ভাষাশিক্ষা, এসবই পাঠ্য হত।’বিদ্যাবাগীশ, ন্যায়রত্ন, তর্কালঙ্কার’, এইধরনের ডিগ্রির প্রচলন ছিল। সেদিন পিকনিকে গিয়ে একটি বাচ্চা মেয়ের নাম শুনলাম বাগিশা, প্রথমে ভাবছিলাম বাগিচা বলছে, পরে তার বাবা বুঝিয়ে দিলেন ‘বাগদেবী’র বাগ ও তার সঙ্গে ‘ঈশ’ যুক্ত করে বাগিশা হয়েছে। বিদ্যাবাগীশের স্ত্রীলিঙ্গ বলা যায়। পুরানো জমানা হলে বলা যেত বাচ্চাটা জন্মেই ডিগ্রী প্রাপ্ত।
বেশ কিছু বছর আগে আনন্দবাজার পত্রিকাতে পাত্রীর কোয়ালিফকেশনে ‘বিএ ফেল’ও লেখা দেখেছি। এটা স্কুলপাশের থেকে উচ্চতর ডিগ্রি ধরা যেতে পারে। দুই তিন দশক ধরে এমবিএ ডিগ্রির বেশ ডিমান্ড। এখন বিবিএ ও বাজারে এসেছে। আগে খালি এমবিএ হত। এদের কোর্সটাই মাস্টার্স। সেদিনের গেট টুগেদারে আমার পরিচিত সিনিয়ার প্রদীপদা জানালেন, চাকরী থেকে ২০০৩ এ রিটায়ার করে, এখনো নিজের এমবিএ ডিগ্রীর দৌলতে এমবিএ পড়াচ্ছেন। প্রদীপদার কাছে নূতন জ্ঞানলাভ হল, বিএ/বিই পড়াতে গেলে মিনিমাম কোয়ালিফিকেশন এমএ/এমই দরকার, খালি এমবিএতে পড়াতে গেলে এমবিএ কোয়ালিফিকেশন যথেষ্ট।
কিছুদিন আগে পড়েছিলাম ডোমের চাকরীর জন্য এমএ ডিগ্রী তো ছেড়েই দিন, মায় ডক্টরেটও এ্যপ্লাই করেছে। এ সেই গানটার মত ‘ও রূপের মিথ্যা গরব, অমন যদি বিরূপ থাকে’, ওরূপের কি দাম বল, লাজেই যদি আগুন ঢাকে, যদি ডিগ্রির সুবাদে ভাল চাকরিই না পাওয়া গেল, তাহালে সেই ডিগ্রির কি দাম। আজকাল সেন্টারে এডুকেশন মিনিস্টারের পোস্ট নেই, গালভরা নাম হচ্ছে ‘হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট মিনিষ্টার’। বলা যায় অন্য কমোডিটির মত হিইম্যানও একটা কমোডিটি, তাদের উন্নতি করতে পারলে দেশের উন্নতি।
‘থার্ড ডিগ্রি’ বলে একটা কথা চালু আছে। পুলিশের লকআপে চোর-ছ্যাচররাই এই ডিগ্রির ভাগীদার। খুব সুখকর ডিগ্রি নয়! ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ডিগ্রী নিয়েও বেশ জলঘোলা হচ্ছে। সাধারণভাবে লোকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিটাকেই লোকসমক্ষে প্রকাশ করে থাকেন। তবে সম্প্রতি জানলাম, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি এল্যামনি এসোশিয়েশনে নাম লেখাতে গেলে প্রথম ডিগ্রিটার গুরুত্ব বেশী দেওয়া হচ্ছে। অনেকটা যেমন হয়ে থাকে চাকরির এপ্ল্যকেশনে, ওভার কোয়ালিফিকেশনের ভয়ে, পদপ্রার্থী তার আপার কোয়ালিফিকেশন লুকিয়ে রাখে, এখানেও প্রায় সেই ব্যাপার।
কোয়ালিফিকেশনের ব্যাপারে একবার আমার অফিসের বস কাপুর সাহেবের স্টোনো এক মোক্ষম প্রশ্ন করেছিল-‘ আপ ভি গ্রাজুয়েট, হাম ভি গ্রাজুয়েট, তব দোনো কা তঙ্খামে ফারাক কিউ হ্যায়’? কক্কর রাজমা-চাল খাওয়া পাঞ্জাবি। সে চটে গেলে আমার চিঠি টাইপ করার জন্য কিউতে থাকা বান্ডিলের তলায় চালান করে দেবে। তাকে ‘রসে বশে’ রাখাটাই আমার জন্য শ্রেয়। কাপুর সাহেব রোজ একটা সাদা জামা আর নীল প্যান্ট। কাঁধের কাছে জামার দুদিকে ফ্ল্যাপ, তার একটার বোতাম ছেড়া। কক্কর সব সময় টিপ টপ, সারা শীতকাল স্যুট-টাই পরিহিত। বাইরের ভেন্ডার প্রথমবার এলে আমাদের ছেড়ে ওকেই সেলাম ঠোকে। বল্লাম - আরে ছোড়ো তংখা কি বাত। তুমহারা ড্রেস দেখো, সব লোক আকে পহলে তুমকো সেলাম ঠোকতা হ্যায়, দো, দো ডিডিএ ফ্ল্যাট হ্যায় তুমারা পাশ, হামলোগোসে বহুত উপর হো।’ জবাবটা কতটা মনঃপূত হয়েছিল জানি না, তবে আমার চিঠি কিউর প্রায়োরিটি লিস্টে থাকত।
ডিগ্রির ব্যাপারটা আবার অনেক সময় ডাইসি হয়ে যায়। আনপড় হলেও আপনি মিনিস্টার টিনিস্টার পর্যায়ে থাকেন, তবে অনারারী ডক্টরেট বা ডি লিট যোগাড় করা এমন কিছু কঠিন নয়। পলিটিক্যাল লিডাররা কনট্রোভার্সিতে থাকতে পছন্দ করেন। যত ঝামেলা তত কাগজে খবর। প্রধানমন্ত্রী , পূর্বতন সেন্টারের শিক্ষামন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, সবারই ডিক্লেয়ার্ড ডিগ্রী নিয়ে যথেষ্ট জলঘোলা হয়েছে। গনতন্ত্রের অপার মহিমা। পলিটিক্স হচ্ছে এমন এক প্রফেশন যেখানে তথাকথিত কোন ডিগ্রির দরকার নেই। নিরক্ষরও ভোটে দাড়াতে পারেন। জৈল সিং, কোন ফরমাল ডিগ্রি ছাড়াই ভারতের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
নিজের ব্যাপারে জানাই কলেজ পাসের সার্টিফিকেটটা একবারই কাজে লেগেছিল, সেই চাকরীতে জয়েন করার সময়। তারপর ওটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। দীর্ঘ সাড়ে সাইত্রিশ বছর একই চাকরীতে হাতমকশ করেছি। সদ্যপরিণীতা বৌ দিল্লির বাড়ীতে পদার্পনের কিছুদিন পর সেই সার্টিফিকেট খাটের তলা থেকে ধূলিধূসরিত অবস্থায় উদ্ধার করে। বলাবাহুল্য পতিদেবের ইমেজ তাতে নির্ঘাত ফল করেছিল।
দেবদত্ত
০৮/০৩/২২

Comments
Post a Comment