দন্ডকারণ্যে দ্বন্দ্ব (সোশাল ইস্যু)
দন্ডকারণ্যে দ্বন্দ্ব
দন্ডকারণ্য নামটার সাথে পরিচিতি ঘটে শিশুবয়সে। সেই ঘন অরণ্যে রাম-সীতা মাতৃআজ্ঞায় বনবাসে গিয়েছিলেন রাজপ্রাসাদের বিলাস-ব্যসন তুচ্ছ করে। ফলত নিজের অকালপক্কতায় মায়ের কাছে কড়া শাসন পেয়েও নিজেকে রামের স্থানে বসিয়ে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, কখনো চিড় খায় নি আমার। ‘ছবিতে রামায়ণ’ বইটিতে বর্নিত চিত্রকলা অনুযায়ী ঘন অরন্য বেষ্টিত, নদীতীরবর্তী এক অতীব সুন্দর জায়গার চিত্র মনে আঁকা ছিল। যখন ক্লাস টু থ্রিতে পড়ি, তখন বাবার মুখে বা আনন্দবাজার/যুগান্তরে চোখ বুলালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দু শরনার্থীদের দন্ডকারণ্যে রিহ্যাবিলিটেট করার কথা থাকত। মনে মনে পুলকিত হতাম যে যারা দন্ডকারণ্য যাচ্ছে তারা খুব ভাগ্যবান। ওরা কি সুন্দর জঙ্গলে থাকবে, তীর-ধনুক দিয়ে শিকার করবে। ঔ বয়সাটাতে আমাকে একটা বড়সড় তীর ধনুক বানিয়ে দিয়েছিল বিপিন মাহাতো, সে আমাদের দুধ দিত। তীরগুলোতে সত্যিকারের লোহার ফলা ছিল। তখনকার দিনে ঝাড়গ্রাম বাজারে হাটের দিনে ফলা বিক্রি হত। আমি খালি গাছের গুড়িতে টিপ প্রাকটিশ করতাম। তাই ভাবতাম দন্ডকারণ্যে গেলে তীর-ধনুকের সদ্ব্যবহার হবে।
বড় হয়ে অবশ্য জেনেছি, রামায়নে বর্নিত দন্ডকারণ্য ও পঞ্চবটী অধুনা নাসিকের পাশে গোদাবরী তীরে অবস্থিত।
এবার আপনাদের একটু ইতিহাসের পাতায় নিয়ে যাই। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর শরনার্থীদের ঢল নামায় পশ্চিম বাংলায় জনবসতির ঘনত্ব ক্রমাগত বাড়তে থাকে। দেশ ভাগের ঠিক পর পর বর্ন হিন্দুরা যারা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন ছিলেন, তারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করেন। তখনো অনেক হিন্দু বাঙ্গালীর বিশ্বাস ছিল দুই দেশ আবার জুড়ে যাবে। বর্ডারে কড়াকড়ি বিশেষ ছিল না। পঞ্চাশের দশকে উর্দু ভাষা কে জাতীয় ভাষা ঘোষনা নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনৈতিক টানা পোড়েনের শিকার হয় হিন্দুরা। এরপর আসে ৬২ ও ৬৫ র যুদ্ধ এবং সবশেষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। খেপে খেপে শরনার্থী আসে পশ্চিম বঙ্গে। তখন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোট এ তরী’। বাংলার সঙ্গে পাঞ্জাবের এটাই বড়ো তফাত যে, পাঞ্জাবে মাইগ্রেশন প্রায় পুরোটাই দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে যায়, কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গলে এটা ঘটে স্পোরাডিক ওয়েতে।
এখানে উল্লেখযোগ্য এটাই যে পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে যারা পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ থেকে ভিটে মাটি ত্যাগ করে আসেন তারা অধিকাংশ নমঃশূদ্র।
পঞ্চাশের দশকের প্রথম শরনার্থী ব্যাচের অনেককে পাঠান হয় আন্দামানে। অনেকেই যেতে চান নি, কারণটা আন্দামান - মেন ল্যান্ড থেকে অনেক দূরে, তায় আবার জায়গাটা ‘কালাপানি’ নামে কুখ্যাত। যারা সাহসে ভর করে গিয়েছিলেন, তাদের জন্য “আগে গেলে বাঘে খায়”, প্রবাদ বাক্যটি মিথ্যে প্রমানিত হয়েছে। সমুদ্রের মাছ, সুপারী গাছ ও চাষবাস নিয়ে সুখে আছেন। এর পরে অনেককে পাঠান হয় মূলত দুই জায়গাতে- একটি উত্তরাখন্ডের তরাই অঞ্চলে, অধুনা উধম সিং নগর ও নৈনীতাল অঞ্চলে। এরাও মোটের উপর ভাল আছেন, যদিও একই সময়ে আগত পাঞ্জাবীদের তুলনায় অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমশঃ পিছিয়ে পড়ছেন। অন্য জায়গাটি হল অদিবাসী অধ্যূষিত দন্ডকারণ্য। জায়গাটি অধুনা উড়িষ্যা প্রদেশের দক্ষিণে কোরাপুট, মালকানগির জেলা, কিয়দংশ অধ্রপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বস্তার অঞ্চল নিয়ে অবস্থিত। এই অঞ্চলটায় লোকবসতি কম, কারণ জমি অনুর্বর, সেচযুক্ত জমি প্রায় নাই, অরণ্যের আধিক্য এবং অধিকাংশ জমি সমতল নয় (আনডুয়েলেটিং)। গ্রামবাংলার শস্যশ্যামলা নদীবেষ্টিত জায়গা থেকে সম্পূর্ন অপরিচিত ও হোস্টাইল পরিবেশে তারা খাপ খাওয়াতে মানসিক ও শারীরিক শ্রমের চরম সীমায় পৌঁছে যান। মাঝে বামফ্রন্ট আমলে এদেরই কিছু অংশ সুন্দরবনের মরিচঝাপিতে পুনর্বাসনে যান, কিন্তু তার পরের ঘটনা রাজনৈতিক জাঁতাকলে সেই ভাগ্যহীনদের অশ্রুজলে সিক্ত। এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ আলোচ্য বিষয় নয়। এখানের গ্রামের নাম গুলি হল এমভি-১/২/৩ ( এমভি হল মালখানগির ভিলেজ) ইত্যাদি, অথবা এমপিভি-১/২/৩ ( মালখানগির পটেরু ভিলেজ), বা বস্তার রিজিয়নে পিভি-১/২…. ইত্যাদি (পারালকোট ভিলেজ).
যে ঘটনাটি এই প্রতিপাদ্যের মূল বিষয়বস্তু, এবার তার কথায় আসি। এতক্ষণ ‘ধান ভাঙতে শিবের গীত’ হল।
কয়েকদিন আগে উড়িষ্যার কোরাপুটে একটি তরুণ বাঙালী ছেলের আত্মহত্যাজনিত ঘটনা কাগজে ছাপা হয় এবং সেই ঘটনার ‘ইনভেস্টিগেটিং জার্নালিজম’ হয় ও এরপর কাগজে বেশ কিছুটা জুড়ে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ছাপা হয়, যা এক চমকপ্রদ সোশ্যাল ও কালচারাল বিভাজনের জন্য উদ্ভুত পরিস্থিতির শিকারের পরিণতি তরুণটির আত্মহত্যা।
তরুণটির নাম সঞ্জীব হালদার, তার পূর্বপুরুষ বরিশাল থেকে ১৯৫৮ সালে দন্ডকারণ্য আরো বিশ হাজার উদ্বাস্তুর সঙ্গে পুনর্বাসনে আসেন। এই অঞ্চলের ভূমিপুত্ররা হচ্ছে কোয়া (Koya) নামক অদিবাসী সম্প্রদায়ের, যাদের জীবননির্বাহ মূলত অরণ্যকেন্দ্রিক ও সমান্য কিছু চাষবাস থেকে প্রাপ্ত ফসল। সঞ্জীব বোলানগিরে ড্রাইভারের চাকরী করত। গায়ত্রী বলে একটি অদিবাসী মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়। পরিবারের অমতে মেয়েটি সঞ্জীবের সঙ্গে পালিয়ে যায় ও মালকানগিরি শহরে স্পেশাল ম্যরেজ এ্যক্টে নোটারীর সামনে বিয়ে হয়। বিয়ের দুইদিন পর মেয়ের বাড়ীর লোকেরা, মায়ের শরীর খারাপ বলে মেয়েটিকে বাড়ী নিয়ে যায়। অদিবাসীদের নিজেদের পঞ্চায়েতে বা ইংরাজিতে বল্লে ক্যাঙারু কোর্টে মেয়েটিকে ভয় দেখিয়ে স্বীকার করায় যে সে এই বিয়েতে রাজী নয়। এই ঘটনা জানার পর সঞ্জীব বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। এরকম ঘটনা ভারতবর্ষে প্রায়শই ঘটে থাকে এবং এ ধরনের ঘটনা বহুল প্রচারিত ইংরাজি দৈনিকে কালেভদ্রে স্থান পায়।
এই ঘটনাটি, দন্ডকারণ্যে বসবাসকারী আদিবাসী ও বাঙালিদের মধ্যে ৭০ বছরের ব্যবধানেও যে সোশাল দূরত্ব দূর করতে পারে নি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সোসিওলজিস্টরা এর প্রধান কারণগুলি উল্লেখ করেছেন সেইগুলি জানিয়ে এই প্রবন্ধের ইতি টানব।
অদিবাসীদের মূল অভিযোগ ছিল, সরকার যে পরিমান উদ্যোগ শরনার্থী পুনর্বাসনে দেখিয়েছিল, তার ছিটেফোঁটাও ছিল না অদিবাসীদের স্বনির্ভর করতে। ফলস্বরূপ পুরো দন্ডকারণ্য অঞ্চলটাই ছিল ফেভারিট পোচিং গ্রাউন্ড ফর রিক্রুটিং মাওইস্ট। আজকাল অবশ্য সরকার থেকে উদ্যোগ নিয়ে জমি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে কোরাপুট অঞ্চলটি কফি প্ল্যান্টেশনের জন্য ফেভারেবল। তাই আজকাল কুর্গের প্রতিদ্বন্দ্বী কোরাপুট কফি। সেইজন্য বাজারে কফির দাম সেই অনুপাতে বাড়ে নি। ফিরে আসি আগের কথায়। অরণ্য কেটে সাত একর করে জমি দেওয়া হয় প্রত্যেক পরিবারকে। ফলে অদিবাসীদের বিচরণক্ষেত্র কমে যায় তৎসঙ্গে আয় ও।
ভাষাগত সমস্যা তো ছিল। কিন্তু তৃতীয় প্রজন্মের কাছে সেটা বড় সমস্যা নয়।
উদ্বাস্তুরা বেশীরভাগ ছিল নমঃশূদ্র। ফলে তারা এসসি ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। কন্টিটিউএন্সি হয়ে যায় রিজার্ভড। এই অঞ্চলে অদিবাসী ও বাঙালীর সংখ্যানুপাত ৫০ঃ৫০। তবে পড়াশুনায় এগিয়ে থাকা বাঙালিদের চাকরিতে অগ্রাধিকার বেশী হয়, যা আদিবাসীদের আরো বাঙালী বিদ্বেষী করে তোলে।
বাঙালিদের প্রধান পুজো দুর্গাপুজা যেখানে মা দুর্গার অসুর নিধনের মূর্তিকে পূজা করা হয়। মজার কথা এই যে আদিবাসীদের আরাধ্য দেবতা হলেন গিয়ে অসুর। স্বভাবতই তাদের দেবতা, অসুর হিসাবে বাঙালিদের কাছে অশুভ শক্তির প্রকাশ হিসাবে বিদ্যমান, এটা খুব লজিক্যালি যে বাঙালির দুর্গাপুজা তাদের ধর্ম বিশ্বাসের আঘাত হানবে।
এর পরের কারণটি অর্থনৈতিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অদিবাসী সমাজ প্যাট্রিয়ার্ক সোসাইটি এবং ট্রাইবাল নিয়ম অনুযায়ী বিবাহিত মেয়ে তার বাবার সম্পত্তির ভাগ পায় না। ভারতের আইন অনুযায়ী বিবাহিত মেয়ে বাবার প্রপার্টির শেয়ার পায়। তাই অদিবাসী সমাজ এ ধরনের ইন্টারকাস্ট ম্যারেজকে ধরে নেয় তাদের সম্পত্তি হাতানোর জন্য এক প্রয়াস।
এই কারণগুলি মনে করিয়ে দেয় বিভিন্ন ধরণের কালচারাল ব্যাকগ্রাউন্ড, এক ধরনের সোশাল ফল্ট লাইন তৈরী করে, যা অস্বীকার করে সামাজিক উদারীকরণ এক অলীক সত্য।
দেবদত্ত
২৯/০৬/২২

Well written. Good effort. Please keep it up.
ReplyDelete