ডেজিগনেশন (রম্যরচনা)
ডেজিগনেশন (পর্ব ১)
অভিধানে ডেজিগনেশনের বাংলা সমার্থক শব্দ লেখা আছে দেখছি ‘উপাধি’। সাধারণভাবে উপাধি বলতে নামের সঙ্গে টাইটেল বোঝায়। পদমর্যাদাটা মোর এপ্রোপ্রিয়েট, খালি পদ বল্লে মনে হবে রান্নার পদ। ডেজিগনেশন ব্যাপারটা ম্যানেজমেন্টের পেট টুল।
আমি যখন চাকরীতে ঢুকি, তখন ট্রেনিং পিরিওডের পর ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসাবে যোগদান করি। আমার কিছু ক্লাসমেট তখন আমাদের মত আরেকটি পাবলিক সেক্টরে জয়েন করে। ট্রেনিংএর পর তাদের ডেজিগনেশন হল ‘এসিসট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার’। শুনলাম ওই কোম্পানির সদ্যনিযুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের ‘এসিস্ট্যান্ট’ শব্দটা পছন্দ হয় নি। এইচআর ইস্যু। কিছুদিন পরে জানা গেল তাদের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ডেজিগনেশন বদল করে দিয়েছেন ‘এসিসটেন্ট ম্যানেজার’। সবাই খুশ। কলমের এক খোঁচায় কেল্লা ফতে। কোম্পানির গ্যাঁটের পয়সা খরচা হল না। সাপও মরল লাঠিও ভাঙল না।
আজকাল কেনাকাটির পপুলার মাধ্যম হল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ডেলিভারী বয়দের বেশ রমরমা। ‘মাই গেটস’ এ্যপ থেকে মাঝে মাঝেই মোবাইল বেজে ওঠে। যান্ত্রিক গলায় শুনতে পাই ‘অন্দর আনে কা অনুমতি কে লিয়ে এক দাবাইয়ে, অন্যথা দো দাবাইয়ে।’ আজকেই ফ্লিপকার্ট থেকে একটি ছেলে হাজির। আলমারি ফেরত নিতে এসেছে কারণ যেটা এসেছিল সেটা ডিফেক্টিভ। দিন পনের আগেও এরকম একটা আলমারি ফেরত নিয়ে গিয়েছিল। সেটার রিফান্ড এখনও পাওয়া যায় নি। অনেক ফোন, চ্যাট ইত্যাদি করা হচ্ছে। ধৈর্যের পরীক্ষা চলেছে। মাঝে তো কাস্টমার কেয়ার থেকে গোয়েন্দাদের মত ফোন-‘কিতনে বাজে আয়া থা? কোন থে? আপকা সামনে উঠায়া থা কেয়া? দুসরা কুছ তো লেকে নেহি গিয়া’। বোঝ ঠেলা অতবড় আলমারি, যদিও এসেম্বলড নয়, তাহালেও তার বদলে অন্য আবার কি নেবে? যাই হোক, এবার ছেলেটা আসতেই আই কার্ডের ফটো তুলেছি, নিয়ে যাওয়ার ভিডিও বানিয়েছি। আই কার্ডে ছেলেটির ডেজিগনেশন লেখা আছে ‘ডেলিভারি কনসালটেন্ট।’ কি কান্ড!
আমাদের মত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকেরা রিটায়ারমেন্টের পর রিএমপ্লয়েড হলে তাদের পদের নাম হয় ‘কনসালটেন্ট’। এতে বিপদ কম। ডাইরেক্ট রেসপনসিবিলিটি থাকে না। কনসালটেন্ট শুনলেই পাকামাথা কোট-প্যান্ট পরিহিত কোন কেউকাটাকে মনে হয়। আজকালের জমানায় ‘ডেলিভারি বয়’ এর গালভরা নাম ‘কনসালটেন্ট’। এদের আগে নাম ছিল ‘উইশ মাস্টার’। এই নামটা আমার বেশী পছন্দের ছিল। সার্কাসের রিং-মাস্টারের মত। তার হাতে একটা চাবুক থাকত। বাঘ বা সিংহ আসত ক্লাইম্যাক্স সিনে। চাবুকটা উপরে উঠিয়ে শূন্যে চালাতেন। হিস হিস করে জবরদস্ত আওয়াজ। তার আঙুলিহেলনে বাঘমামা সুড়সুড় করে সামনে থাকা একটা চেয়ারে উঠে খেলা দেখাত। ছোটবেলায় যারপরনাই আনন্দ পেতাম।জঙ্গলের সবচেয়ে ফেরোসাশ প্রাণী কেমন রিং মাস্টারের বাধ্য ছাত্রের মত আচরণ করছে। রবিনহুডের পর সার্কাসের রুম মাস্টারের এডম্যায়ারার ছিলাম।
ফ্রীজ, ওয়াশিং মেশিন বা এসির মেকানিক ডাকলে শুনতে পাবেন-‘হামারা ইঞ্জিনিয়ার আপকা কমপ্লেন এটেন্ড করেঙ্গে ‘অমুক’ দিন আয়েঙ্গ।’ এমনিতেই আজকাল শুনতে পাই ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরীর বাজার খারাপ। এরমধ্যে আবার মেকানিকের ডেজিগনেশন হয়ে গেল ইঞ্জিনিয়ার। ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে’ আর কি!
প্রাইভেট কোম্পানির উপরের পোস্টগুলো সাধারনত হয়, এভিপি এসট্যন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট, বা সিনিয়র ভিপি এবং একদম উপরে ভিপি। তবে সরকারী চাকরীতে আবার ভিপি কি প্রেসিডেন্ট বিশাল ট্যাবু। রাষ্ট্রযন্ত্রের মাথায় আছেন আমাদের মহামান্য প্রেসিডেন্ট। যদিও তিনি প্রথাঅনুযায়ী ইংরেজ আমলের সর্বেসর্বা মহামহিম ভাইসরয়ের বাসস্থানটিতে থাকেন, কিন্তু ক্ষমতার বিচারে ঠুঁটো জগন্নাথ। আমাদের দেশে সর্বেসর্বা হলেন প্রাইম মিনিস্টার। আবার অমেরিকাতে রাস্ট্রপ্রধান হলেন গিয়ে প্রেসিডেন্ট। এ ব্যাপারে সবাইকে টেক্কা দিয়েছেন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুটিন, তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশ শাসন করেছেন, আবার ২০০৮ থেকে ২০১২ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সর্বপ্রধান ছিলেন, তারপর আবার ২০১২ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। রাশিয়ান কনসিটিটিউশনে ছিল প্রেসিডেন্ট দুটো টার্মের বেশী থাকা যাবে না। তাই তিনি কৌশলে কনস্টিটিউশন চেঞ্জ করে প্রধানমন্ত্রীকে দেশের সর্বেসর্বা বানিয়ে দিলেন, তারপর আবার চেঞ্জ করে প্রেসিডেন্টের হাতে আসল পাওয়ার দিয়ে নিজে আবার প্রেসিডেন্ট। মজার কথা পুটিন যখন পিএম, তখন ডিমিত্রি মেদভেদ প্রেসিডেন্ট, আবার পুটিন যখন প্রেসিডন্ট তখন মেদভেদ পিএম। ‘
নেই ভেদাভেদ জ্ঞান, সাথে আছে ভগবান হবে জয়’! পুটিন কলিকালের রাসপুটিন। তার বোধহয় আর চোরপুলিশ খেলতে ভাল লাগছিল না। তাই ২০২০এ রেফারেন্ডাম করে কনস্টিটিউশন এমেন্ডমেন্ট করে এক্কেবারে ২০৩৬ পর্যন্ত একক ব্যাক্তি প্রেসিডেন্ট হিসাবে সর্বোময় কর্তা থাকতে পারবে, সেটা পাকা করে নিয়েছেন।
বাংলাতে ঘরমোছা বাসন মাজার লোককে ঝি বলা হত হত, এখন বলা হয় কাজের মেয়ে বা কাজের মাসী। ইংরেজীতে আগে বলা গত ‘মেড সারভেন্ট’, এখন হয়েছে ‘ডোমেস্টিক হেল্প’। জমাদার বা ঝাড়ুদার ডাকটা কমে গিয়েছে, তার বদলে বলা হয় ‘সাফাই কর্মচারী। প্রথমবার নামটা শুনে মনে হয়েছিল পকেট মারের নূতন নামকরণ। কারণ পকেট মারেরা ‘হাত সাফাই’ করে থাকে। পরে ভুল ভাঙল।
প্রাইভেট কোম্পানিতে ডেজিগনেশনের তারতম্য অনুযায়ী মাইনের কম বেশী হওয়াটা সবসময় বাধ্যতামূলেক নয়। এখানে একজন কর্মচারীর ইনট্রিনসিক ভ্যালু, অর্থাৎ কোম্পানির কাজে সে কতটা লাগছে, তার উপর মাইনে নির্ভর করে। আজকাল অবশ্য মাইনে বলে না।. পে প্যাকেজ বা আরো সন্মানজনক নাম কম্পেনসেশন প্যাকেজ। মাইনে নয়, আপনার মহামূল্যবান সময়ের বেশ কিছুটা ব্যায় করলেন, তারই গুরুদক্ষিণা হল গিয়ে কম্পেনসেশন। চাকরি মানে প্রভু ভৃত্যের সম্পর্ক নয়। কোম্পানি আপনার ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টির কিছুটা কিনে নিল। অবশ্য আপনার বাকী ইনেটলেকচুয়াল প্রপার্টি, বিয়ের পর থেকে ক্রমশ আপনার বেটারহাফের কন্ট্রোলে চলে যাচ্ছে এবং ভোকাল হয়ে যাচ্ছে। যতদিনে আপনি টের পেলেন ততদিনে আপনি সংসারের জাতাকলে আটকে গিয়েছেন। এ গাড়ীতে রিভার্স গীয়ার নেই। আপহিল টাফ রোড। দম চেপে ফার্স্ট কি সেকেন্ড গিয়ারে গাড়ী চালিয়ে সংসার সমুদ্রে চলতে থাকুন।
‘পদ’ নিয়ে ‘আপদে’ এর শেষ নেই। আমাদের কোম্পানি ৭৫ সালে তৈরী হয়েছিল। আশির দশকে প্রতি বছর দুইশোর উপর ইঞ্জিনিয়ার রিক্রুট হত। ফলে দুই হাজার দশ-বার সাল নাগাদ দেখা গেল কোম্পানির স্ট্রাকচার ইনভার্টেড পিরামিডের মত। উপরের দিকে লোক অনেক বেশী। ফিল্ডে কাজ করার ইন্জিনিয়ারের অভাব। পাবলিক সেক্টারে কাজের মোটিভেশনের মোদ্দা ইনস্পিরেশন প্রমোশন। যারা পঁচিশ তিরিশ বছর কাজ করছেন তাদের প্রমোশন আটকে যেতে লাগল। তখন কোম্পানির এইচআর ডিপার্টমেন্ট মাথা খাটিয়ে ফটাফট কয়েকটা পোস্ট ক্রিয়েট করে ফেলল। আগে ডিজিএম থেকে প্রমোশন হলে জিএম হওয়া যেত। এখন এসে গেল ডিজিএম এর পর এজিএম, তারপর জিএম এরপরে সিজিএম তারপর জিজিএম। কোম্পানিও খুশ কারণ কোন এডিশনাল এক্সপেন্ডিচার নেই, চারটে পোস্টের পেস্কেল এক, এদিকে কর্মচারীরা খুশ, প্রমোশনও পাওয়া যাচ্ছে। রিটায়ারমেন্টের পর অখন্ড অবসরে চিন্তা করে আমার কিছু কলিগ বুঝতে পারছে, কোম্পানি সবাইকে কেমন বুদ্ধু বানিয়েছে। এই কয়েকদিন আগে এক কলিগ এই নিয়ে ফোনে হাহুতাশ করছিল।
বিদেশে এক কোম্পানিতে রিসেপশনিস্টের চাকরির বিজ্ঞাপন এসেছে। গালভরা ডেজিগনেশন ‘ফার্স্ট ইমপ্রেশন ডাইরেক্টর’। তলিয়ে দেখলে নামের যথার্থতার পরিচয় পাওয়া যায়। অচেনা কোম্পানিতে সশরীরে হাজির হলে, প্রথম এনকাউন্টার হবে রিসেপশনিষ্টের সঙ্গে। সুবেসা, সুন্দরী তরুণী যদি রিসেপশনে থাকে তাহালেই অর্ধেক কেল্লা ফতে, তার সঙ্গে ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে যদি তিনি আপনাকে চা সহযোগে ওয়েট করতে বলেন, তবে দীর্ঘ ওয়েটিং পিরিওডও আপনার কাছে তুচ্ছ।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
কলসেন্টার ম্যানেজারের নূতন নাম ‘চীফ অফ চ্যাটিং’। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের এক বা একাধিক যুগপত ব্যবহারকারীদের সাথে রিয়েল টাইমে বার্তা বিনিময় করা হচ্ছে চ্যাটিং। অভিধানে এরকমই লেখা আছে। যদিও বেশীরভাগ বাঙালী ‘খেজুরে গল্প’ কেই চ্যাটিং বলে ধরে নেন।
আজ থেকে সত্তর আশি বছর আগে ডাক্তারবাবুর চেম্বারের পাশে তার সহকারী একজন কম্পাউন্ডার থাকতেন। তিনি ডিফারেন্ট বোতল থেকে লাল, নীল তরল মিশিয়ে ঊষধ প্রস্তুত করে দিতেন। আজকাল আর কমপাউন্ডারদের দেখা মেলে না। ঔষুধের দোকানে থাকেন ‘কেমিস্ট’। কখনো আবার দোকানের বাইরের সাইনবোর্ডে লেখা থাকে ‘কেমিস্ট ও ড্রাগিস্ট’। ‘ড্রাগ’ যদিও অভিধান অর্থে দাওয়াই, তবে ঔষুধকে আমরা সাধারনত মেডিসিন বলে থাকি। রিয়া চক্রবর্তী ও আরিয়ান খানের জেলে কাস্টোডিয়াল রিমান্ডের পর ‘ড্রাগ’ ওয়ার্ডটা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভীষিকাময়। ইংল্যান্ডে রাজপরিবার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বা বিখ্যাত ব্যাক্তিদের উপাধি দেওয়া হয় ‘লর্ড, ‘ব্যারন’, ইত্যাদি। আশি ও নব্বই দশকে কলম্বিয়া থেকে কোকেন, মারিজুয়ানা পাচার হত আমেরিকাতে। একজন কলম্বিয়ান এর কিংপিন ছিলেন। তার নাম পাবলো এসকোবার। তাকে সবাই ‘ড্রাগ লর্ড’ বলে জানত। এই এসকোবারের উথ্থান পতন নিয়ে নেটফ্লিক্সে টান-টান উত্তেজনাময় থ্রিলার ‘নার্কোস’।
নার্সিং স্টাফেদের নূতন নাম ‘কেয়ার গিভার’। একদম আক্ষরিক অর্থ বলা যায়!
আমাদের কোম্পানিতে ‘ডাইরেক্টর’ পোস্টটি ঠিক চেয়ারম্যানের নীচে। বেশ উঁচু পোস্ট। কর্পোরেট ল্যাডারের সাপলুডোতে যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকে, তবে ডাইরেক্টর হওয়া যায়। আমার এক বন্ধুর খুব ইচ্ছে ছিল ডাইরেক্টর হওয়ার। তবে তা ভাগ্যে শিকে ছেড়ে নি। রিটায়ারমেন্টের পরে একদিন দেখা। একগাল হেসে আমায় ভিসিটিং কার্ড দিল, নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে ‘ডাইরেক্টর’ লেখা। তলায় একটা প্রাইভেট কোম্পানির নাম। জানাল সে নিজেই বিজনেস লাইসেন্স যোগাড় করেছে তবে সে ‘বিজি উইদাউট বিজনেস’,ব্রীফলেস উকিলের’ মত। কথায় কথায় সে জানাল জীবনের একটা বড় ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। সে এখন ডাইরেক্টর। তবে কোম্পানির সেই একমোবদ্বিতীয়ম, জুতো সেলাই টু চন্ডী পাঠ।
পদমর্যাদার ব্যাপারে পুরানো সরকারী বা আধাসরকারী অফিস কর্মচারীরা খুব সেন্সেটিভ থাকেন।এটাও আমাদের অফিসের এক কলিগের গল্প। শ্রীনিবাসন তখন উচাহারে পোস্টেড।একবার ওর প্রমোশন হল না। ওরই ব্যাচের একটি ছেলে প্রমোশন পেয়ে সিনিয়ার ম্যানেজার হয়ে ওর প্রজেক্টে পোস্টিং পেল। পুরানো বন্ধু। কিন্তু অফিসিয়াল ডিলিংটা অন্যরকম। ‘কা তব কান্তা কস্তে পুত্রা’। কাউকে রেহাই নেই। কয়েকদিন পর সে শ্রীনিবাসনের রুমে এসে সংক্ষেপে তার বক্তব্য পেশ করল। শ্রীনিবাসন যে রুমটাতে বসত, সেটাতে এট্যাচড টয়লেট ছিল। ডিওপি অনুযায়ী তার এখন এট্যাচড টয়লেটওয়ালা রুম প্রাপ্য। ডিওপি বা ডেলিগেশন অফ পাওয়ার, পাবলিক সেক্টরে বাইবেলের মত জিনিষ। সেখানে পদমর্যাদা অনুযায়ী ফাইনান্সিয়াল পাওয়ার ও আপনার অফিসিয়াল প্রাপ্য লেখা থাকে। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে সে কেন কমন টয়লেটে যাবে। তাই সে নিজের হকের দাবী জানাতে এসেছে।
টয়লেটের কথা উঠতে, বদরপুর পোস্টিংএর একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। ওঝা সাহেব তখন প্ল্যান্টের জিএম। পরে ডাইরেক্টর হয়েছিলেন। কাজপাগল তবে হাসিখুশী। বদরপুরে দুর্গাপুজা হচ্ছে। অঞ্জলির সময় পার হয়ে যাচ্ছে। শোনা গেল -ওঝা সাহেব আসছেন। উনি এলে অঞ্জলি শুরু হবে। উনি আসতেই সবাই জোড়হাত করে উঠে দাঁড়াল । মনে হল দুর্গামাতা নন, উনিই দেবতা। উনার সাথে সাথে আমরা অঞ্জলি দিলাম। অঞ্জলির পর উনি সবার সঙ্গে গল্পগুজব করছেন। আমি টয়লেটে গিয়েছি ‘ছোট বাইরে’ সারতে। হঠাৎ হাল্কা কোলাহল শুনলাম টয়লেটের বাইরে। স্বয়ং জি এম সাহেব পাশে এসে দাড়িয়েছেন। কি করি। অল্প বয়স। ‘এই নাও শিশি, ধরে রাখো হিসি’র মত বাকীটাকে ব্লাডারে চালান করে, ‘সরি স্যার’ বলে তড়িঘড়ি বেরিয়ে এলাম। দরজার কাছে তখন জনা ছয় সাত ডিজিএম ও সিনিয়ার ম্যানেজার। মনে হল সবাই আমার দিকে কটমট করে তাকাচ্ছেন। বাইরে দাড়িয়ে ওয়াশরুমের দরজার দিকে ‘ওয়াচফুল আই’ রাখছিলেন। কিন্তু বাঘের ঘরে যে ঘোগের বাসা তা কে জানত! অনেক বড়সাহেব এই ধরনের ‘এটেনশ্যান’ বেশ পছন্দ করেন। ওঝা সাহেব তার ব্যতিক্রমী ছিলেন না। সন্ধ্যের সময় তার চেম্বারে বিক্রমাদিত্য স্টাইলে নবরত্ন সভা বসত। তার চেম্বারে সবারই প্রায় অবারিত দ্বার। সবসময় পারিষদ পরিবৃত। ওঝা সাহেব ট্রান্সফার হওয়ার পর এন পি সিং এলেন জিএম হয়ে। তিনি দুর্মুখ তো বটেই, এবং কাজ ছাড়া ঘুর ঘুর করলে বকুনি দিতেন। পুরানো অভ্যাসবশত কিছু উচ্চপদস্থরা বিকালে ভীড় জমানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্ত কেউ হালে পানি পেলেন না। নবরত্ন সভার ইতি হয়ে গেল।
আমার অবশ্য পদ ভারী না হলেও পদবীর সমাহারে ভারাক্রান্ত। আমার দেবদত্ত নামটা ব্রেকআপ করলে ‘দেব’ ও ‘দত্ত’, দুটোই বাঙালিদের পদবী হয় আর শেষে ‘রায়’ তো আছেই। বন্ধুদের রায়ে আমার নাম নেই, আছে শুধু তিনটে পদবী। পদবী পায়াভারী হওয়াতে ‘পদ’ নিয়ে বেশী চিন্তা করি নি। ‘রেখো মা দাসেরে মনে এ মিনতি করি পদে।’
দেবদত্ত
১১/১১/২১



Comments
Post a Comment