সুরারসিক (রম্যরচনা)
মদ
রচনার হেডলাইনটা দেখলে শিক্ষিত বাঙালি একটু ভুরু কোঁচকাতেই পারেন। আমাদের সময়ে মানে ষাট সত্তরের দশকে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কাছে মদ্যপান অনেকটাই অচ্ছুত ছিল। তবে হিন্দু পুরাণে সোমরসের বর্ণনা পাওয়া যায়। সমুদ্রমন্থনে হলাহলের সঙ্গে বারুনী নামক মদও পাওয়া গিয়েছিল। কৃষ্ণের দাদা বলরাম সুরারসিক ছিলেন। বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথিতে অমৃতের অপর নাম সোমরস বলে বর্নিত হয়েছে।
যখন নার্সারি স্কুলে পড়তাম, ভোরবেলায় গরুরগাড়ী নিয়ে একটি লোক হরিসংকীর্তন করতে করতে সামনের রাস্তা দিয়ে যেত। নাম ছিল ভূষণ ওর কাজ ছিল গরুরগাড়ীতে কয়লা নিয়ে বাড়ী বাড়ী বিক্রি করা। দুপুরের পর তার অন্য মূর্তি। দেশী মদের নেশায় চূর হয়ে ফিরত। ওর কয়লা মাখামাখি মুখ ও লাল চোখ দেখে আমার মনে হত ভূষণ নয় ভূষুন্ডীর মাঠের প্রেতাত্মা। আমি ভয়ে ভয়ে ঘর থেকে জানালার পর্দাটা ফাঁক করে ওর মত্ত অবস্থা দেখতাম এবং ওর মুখনিঃসৃত বাণী শুনতাম। ব্রহ্মজ্ঞানীর মত মা-জননী ইন্দিরার গুনগান থেকে শুরু করে নিজের বৌকে খিস্তি দিয়ে তারপর ভারত পাকিস্থান লড়াই দিয়ে শেষ হত। গরুগুলোর বোধহয় অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। বিনা গাইডেন্সে নির্বিকার মুখে চলতে থাকত, কারণ ভূষণ প্রায়ই পাচনটাকে বন্দুকের মত বাগিয়ে অদৃশ্য পাকিস্তানী সৈন্য মারার চেষ্টা করত।
সেই থেকে মদে একটা ভীতি ধরে গিয়েছিল স্কুল জীবনে। কলেজে এসে সেকেন্ড ইয়ারে হোস্টেলে একবার ঠিক হল পার্টিতে দারু খাওয়া হবে। কেউই আগে কোনদিন মদ খায় নি। হুইস্কি কি রামে আমার ভয়। তাই ঠিক হল বিয়ার খাওয়া হবে। ওটা নাকি লাইট। শুনেছি মদে জল মেশাতে হয়। সেই ফান্ডাতে আমরা বিয়ারে জল মিশিয়ে খেলাম। বিগিনারস লাক এর মত ওই সুপার লাইট বিয়ার খেয়ে তুরীয়ানন্দে নাচানাচি করলাম।
তবে আজকাল মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে মাছ-ভাতের মত মদ হল জলভাত। বাংলা সিরিয়ালে আকছার দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক প্রেমিকা একসঙ্গে বসে মদ্যপান করছেন। এসব সময়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে রবীন্দ্রসংগীত বাজানোর রীতি আছে। অনেকটা গঙ্গাজল দিয়ে শুদ্ধ করে দেওয়া আর কি! আশি কি নব্বইএর দশক পর্যন্ত বাড়ীতে মদ্যপান ট্যাবু ধরা হত। কলেজে পড়ার সময় প্রায়ই এসপ্লানেড চত্বরে সিনেমা দেখতে যাওয়া হত। বিশেষত নিউ এম্পায়ার হলে পঁচাত্তর পয়সার ব্যালকনির টিকিট কলেজ পড়ুয়াদের খুব প্রিয় ছিল। সাধারনত নাইট শো দেখে লাস্ট পাঁচ নম্বর বাসে যাদবপুরের হোস্টেলে ফিরতাম। বাসের অর্ধেক সহযাত্রী হতেন সিজনড ড্রিংকার। ওই চত্বরে অনেক বার ছিল। পার্কস্ট্রীটের অভিজাত বার ছাড়াও বাংলায় যাকে শুড়িখানা বলে সে রকম বেঞ্চে বসে শস্তায় মদ্যপানের দোকানও ছিল।ওইসব দোকানে আবার পেগের সঙ্গে চাটও ফ্রি থাকত। এইসব দোকানের খদ্দেররাই সাধারনত বাসে উঠতেন। তারা জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। একে অপরকে চিনতেন। বাসের হ্যাঁচকা ব্রেকেও হ্যান্ডেল ধরে সামলে নিতেন। এদের পাড়ায় পরিচিতি থাকত মদ্যপ হিসাবে। তখনকার যুগে কুলীন মদ্যপ বলতে এদেরকেই বোঝাত। এখন অবশ্য জন্মদিনের পার্টি হোক কি বন্ধুদের আড্ডা, ড্রিংকসের আসর নিওনরম্যাল।
আমার আসল টপিকটা ঠিক মদ নয়, বলতে পারেন মদের বিজনেস। তার আগে একটু বহুল প্রচারিত জোকস দিয়ে পাঠকের মন জয়ের চেষ্টা করি। এক অনভিজ্ঞ ভদ্রলোক মদের দোকানের লাইনে দাড়িয়ে তার আগে দাঁড়ানো ভলোকটি দোকানদারকে বল্লেন - “জনি ওয়াকার, সিঙ্গল”। এরপর উনি দাম মিটিয়ে বোতলটি হাতে করে চলে গেলেন। এর পরের লোকটি দোকানদারকে বল্ল - “জ্যাক ড্যানিয়েল, সিঙ্গল”। সেও বোতল নিয়ে দাম চুকিয়ে বিদায় নিল। এবারে গল্পের নায়কের পালা। উনি জানালেন -“সমীর বোস, ম্যারেড”!
খোদ রাজধানী শহর দিল্লিতে সম্প্রতি সুরারসিকদের জন্য দোকানে দোকানে লোভনীয় ডিসকাউন্ট বা বাই ওয়ান গেট ওয়ান অফার চলছে। শস্তায় দারু পেলে মদ খাওয়ার আনন্দটা নিশ্চয়ই দ্বিগুন হয়ে যায় বলেই আমার ধারণা। এমনিতেই ইন্ডিয়ান মার্কেট প্রাইস সেনসেটিভ। ডিসকাউন্ট দিয়ে কাস্টমার টানা রাজধানী শহরের পুরানো প্রথা। জামা কাপড়ের ক্ষেত্রে এটা বেশী দেখা যেত। আশির মধ্যভাগ থেকে লাজপতনগর, সরোজিনী নগর বা করোলবাগ মার্কেটে কেনাকাটি করতাম। তখন থেকেই অভ্যস্ত ছিলাম সামার সেল ও উইন্টার সেলে কেনাকাটি করতে। প্রথমটা হত অগাস্টে দ্বিতীয়টা হত ফেব্রুয়ারিতে। প্রথমদিকে এমআরপির উপর ১০ বা ২০ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দিয়ে শুরু হয়ে শেষ কয়েকদিন চলত ৫০ ভাগ ডিসকাউন্ট। তখনকার দিনে চুনমুন, রিতু ওয়্যার, বালুজা, স্নো হোয়াইটের দোকানের সামনে লম্বা লাইন লেগে যেত। দোকানে ঢোকার সময় ফুটপাথের কাউন্টারে সিকিউরিটির কাছে ব্যাগ জমা রাখতে হত। এখনকার জেনারেশন ব্র্যান্ড কনশাস, তাই এইচ এন্ড্য এম, ইউএস পোলো, এ্যরো, জারা, ভিভা, এড্যিডাস ইত্যাদি অনেক ব্র্যান্ডের রমরমা। সেলের টাইমটা এখন সিজনভিত্তিক নয়। সারাবছর কাস্টমার ধরে রাখার জন্য অনেক রিসার্চ করে সেলের অফার আসে। কোন প্রডাক্টের স্টক শেষ হয়ে আসতে থাকলে তখন তার ডিসকাউন্ট বেড়ে যায়। বড় দোকানে দেখা যায়, ফিফটি পারসেন্ট সেলের পাশে “ফ্রেশ এরাইভাল” লেখা মার্কেন্ডাইজ রাখা। ট্যাগের দামটাও বেশ চড়া। তখন স্বভাবতই আমার মত মধ্যবিত্ত সেলের মাল কিনবে, হোক না সেটা স্টক হিসাবে পুরানো। তবে এক্সশেপসনের মত কিছু লোক থাকেন যারা ফ্রেশ এরাইভাল থেকে কেনেন। এ ব্যাপারে দাদরীতে আমার এক কলিগ কাম দাদার কথা মনে পড়ছে। আমাদের কাছে সেলের কথা শুনে একদিন গেলেন লাজপতনগর মার্কেটে। ফিরে আসার পর জিজ্ঞাসা করলাম - সেলের বাজার কেমন হল? বৌদি হাফসোল খাওয়া মুখে জানালেন “আপনার দাদা তো সেলের দোকানেই ঢুকলেন না। আমরা খুঁজে খুঁজে যে দোকানে সেল নেই সেখান থেকে কিনলাম।” আমার বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে সাফাই দিলেন -“খুব ভীড় ছিল তো”। এটা বছর পঁচিশেক আগের ঘটনা। আজকাল ওরা এনসিআরে থাকেন। খবর পেয়েছি কেজিতে পাঁচ সাতটাকা কমের জন্য মাঝে মাঝে দাদরী যান চাল কিনতে।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
এইটা শ্রদ্ধেয় তারাপদ রায় মহাশয়ের বইতে পাওয়া। এক গাঁজাড়ু তারাপদবাবুকে বোঝাচ্ছে বিভিন্ন নেশার ক্লাসিফিকেশন কিভাবে আঙুল দিয়ে করতে হয়। সবচেয়ে ওঁচাটে নেশা হল গুড়াকু, উড়িয়ারা কাগজে করে বেচে, ওটা এক আঙুল দিয়ে দাঁতের ফাঁকে গুঁজে রাখতে হয়। অবশ্য আধ আঙুলের নেশাও আছে। সেটা চায়ের পেয়ালা, ওটার হ্যান্ডেল আর্ধেক আঙুল দিয়ে ধরতে হয়। দু আঙুলের নেশা হল নস্যি। এক চিমটে নিয়ে নাকে গুঁজে দাও। এর আরেকটু উপরে হল সিগারেট কি বিড়ি। আড়াই আঙুল দিয়ে সুখটান। এরপর হল পাঁচ আঙুলের নেশা-মদিরাপান। গ্লাসে ঢেলে পাঁচ আঙুল দিয়ে ধরে চুমুক।সিদ্ধির শরবতও তাই। তবে আরো উঁচু জাতের নেশা হল গাঁজা। এটা হল দশ আঙুলের নেশা। ছিলিমটাকে দুই হাতের দশ আঙুল দিয়ে “দম মারো দম”।
কবি শক্তি চট্টেপধ্যায় কে নিয়ে অনেক অসত্য গল্প বাজারে চালু আছে। তার মধ্যে কিছু সত্যিই আছে। যে ঘটনাগুলোকে লোকে অসত্য প্রমানের চেষ্টা করেছে, তার মধ্যে দুই-একটি এরকম। শক্তিবাবু একদিন সজ্ঞানে কলকাতার রাস্তায় শুয়ে পথচারীদের উদ্দ্যেশে মধুবর্ষণ করছিলেন। সেই খবর পেয়ে টহলদারী পুলিশ তাকে মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। সেখানে তার পেট ওয়াশ করে দুইশত টাকার কাছাকাছি মাল বার করে দেয়। যারপরনাই বিরক্ত শক্তিবাবু বলেছিলেন- এ হল একরকম পুলিশি জুলুম। খামোকা আমার পেট থেকে একশ ষাট টাকার মাল বার করে দিয়েছে। আমি ক্ষতিপূরণের মামলা করব! দ্বিতীয় কাহিনীটি কিছুটা এইরকম। ডিসেম্বরে বড়দিনে সকালে ও রাত্রে শুড়িখানায় মদ্যপান করে, বেশ কয়েকবার বমনকর্ম করেন। পরেরদিন সকালে কাগজের অফিসে গিয়ে এক কলিগকে জিজ্ঞাসা করলেন- কাল কি রামনবমী ছিল? কলিগ বল্লেন -না দাদা, কাল বড়দিন ছিল। শক্তি বলেছিলেন- কি হয়েছে জানো ভাই, কাল আমি রাম গিলে রাস্তায় ন-বার বমি করেছি, তাই ভাবছিলাম কাল বোধহয় রামনবমী ছিল!
আমার দারু খাওয়ার হাতেখড়ি আমার কলেজের একই অফিসের এক দাদার কাছে। ব্যাচেলর লাইফে আমরা কাছাকাছি ছিলাম। তারই উদ্যোগে এবং তারই কেনা হুইস্কিতে প্রত্যেক উইকএন্ডে পার্টি হত। তখন ওর সদ্য সদ্য বিয়ে হয়েছে। বৌদি সাকেত-এ বাপের বাড়ীতে। তখন মধ্যরাত। পার্টি শেষ হতে সেই দাদার ইচ্ছে হল বৌএর তৈরী মাছের ঝোল ভাত খাবেন। সি আর পার্কের ট্যাক্সি স্ট্যন্ডের সর্দারজী আমাদের নিয়ে চল্ল সাকেতে। শ্বশুরবাড়ী একতলা লনের পাশে মেন গেট তালা দেওয়া। ঠকঠক করে কোন লাভ হল না। সব বাড়ীতেই আলো নেভান। দাদা ছেড়ে দেবার পাত্র নন, মদের ঘোরে কিঞ্চিৎ হাই। তবে তিনি জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক। বাড়ীর কলিং বেল বাজাতে গেলে গেট টপকাতে হবে। রজতদা সেই চেষ্টাই করতে গেল। ও সাধারনত ধুতিটাকে লুঙ্গির মত করে পড়ত। ফাঁসটা একবার খুলে মালকোচা মেরে সবে গেটের উপর উঠতে শুরু করেছে। বাড়ীর ভিতর থেকে ঘেউ ঘেউ করতে করতে বেরিয়ে এল এক এ্যলসেশিয়ান। রজতদা এক লাফে দুইপা পিছনে। দাদা এত সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। এবার শুরু হল পম্পা পম্পা বলে ডাক। সেই চ্যাঁচ্যামেচিতে আশেপাশের দুই একটা বাড়ীর লাইট জ্বলে উঠল। জানলা খুলে দুই একজন বোঝার চেষ্টা করছেন ডাকাত পড়ল কিনা। একটু পরে শ্বশুরমশাই বুঝতে পারলেন এই হাঁকডাক জামাই এর। যাক এরপর আমরা সদলবলে বৌদিকে পাকড়াও করে নিয়ে এলাম সি আর পার্কে। শ্বাশুড়ী মিনমিন করে বলেছিলেন -“ আমার এখানেই তোমরা খেয়ে যাও।” রজতদা সে কথায় কর্ণপাত করল না। ফিরে এসে বৌদির রান্না করা মাছভাত খেয়ে তবে রজতদার শান্তি।
রজতদার এক কলিগ ছিলেন বসন্ত মিত্র। বসন্তবাবু এমনিতেই অনেক কথা বলতেন, আর পেটে দুই পেগ পড়লে বাক্যবাণের ফোয়ারা ছুটত। একবার দুজনে মিলে সন্ধ্যেতে মদ্যপান করেছে, বসন্তবাবু তার দাম্পত্যজীবনের হাহুতাশ ব্যাক্ত করে চলেছেন, রজতদা তখনও ব্যাচেলার, হু-হা করে এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বার করে দিচ্ছে, নিজের গ্লাস ও তন্দুরির দিকে মন বেশী। “বসন্ত বিলাপ” শুনতে শুনতে রজতদা কখন ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেই জানে না। সকাল বেলায় ঘুম ভাঙতেই পাশের চেয়ারে বসে থাকা বসন্তবাবু রজতদার মুখের উপর ঝুকে বলতে শুরু করলেন -“এই যে রজতবাবু ঘটনাটা তো পুরো না শুনে ঘুমিয়ে গেলেন, আমি জেগে বসে আছি কখন আপনাকে পুরোটা শোনাই, এবার বাকীটা শুনুন বলে আবার শুরু করলেন।
রজতদা ছিলেন খানদানী নেশাড়ু। নিজে তো খেতেরই এবং সাঙ্গোপাঙ্গোদেরও খাওয়াতেন। প্রথমে দিল্লিতে ছিলেন ,পরে কলকাতায় গিয়েও নিজের পারফরমেন্স অক্ষুন্ন রেখে ছিলেন। এ হেন রজতদা মধ্যপঞ্চাশে গিয়ে হঠাৎ করে মদ খাওয়া ছেড়ে দিলেন। “গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে, রজত মহাশয় ক্ষান্ত দিয়েছেন রণে” - এক শুভানুধ্যায়ীর ফোন এল কয়েকদিন পরে - “আরে রজত তুমি নাকি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছ?” রজতদার উত্তর -“হ্যাঁ দাদা, কোটা শেষ। সেই ভদ্রলোকের বিস্মিত গলায় উত্তর “আই জাস্ট কান্ট বিলিভ ইট!” তারপর কয়েক সেকেন্ড বিরতির পর তিনি বল্লেন -“আপনি যে পরিমাণ মাল খেয়েছেন, আমি সারাজীবনে অত জলে স্নান করিনি!”
শুধু দিল্লি কেন ভারতবর্ষের বেশীরভাগ শহরেই লিকার দোকানের সামনে গ্রিল দেওয়া থাকে।
আগে খালি সরকারি ডিএসআইডিসির দোকানে লিকার পাওয়া যেত। পরে কিছু প্রাইভেট দোকান হল। তবে তাতেও গ্রিল। লাইনে দাড়িয়ে মাথাটাকে নীচু করে মদ কিনতে হত। নিজেকে বেশ অপরাধী লাগত। নিজেকে আবার সঙ্গে করে ক্যারিব্যাগ নিয়ে যেতে হত। খুব বেশী হলে বা জোরাজুরি করলে কাগজে মুড়ে দিত। বেশীরভাগ সময় রেট লিস্ট বেপাত্তা, যে ব্র্যান্ড চাইছেন সেটা অমিল। বেশীক্ষণ দাড়িয়ে এনকোয়ারি করাও বিপদ। পিছনের কাস্টমার জলদি কিজিয়ে বলে তাড়া দেবে। একই রকম এক্সপিরিয়েন্স হত ট্রেনের বুকিং করতে গিয়ে। যে সময়ের কথা বলছি তখনও আইআরসিটিসি বাজারে আসে নি।
তবে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে “কাস্টমার ইজ দ্য কিং” এই কনসেপ্টে, লিকার শপের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এই তো সেদিন মলে ঘুরতে গিয়ে লিকারশপ থেকে বীয়ার কিনলাম। শোকেসে রকমারী বোতল সাজান। সুন্দর এলইডি লাইটিংএর কল্যাণে রঙীন বোতল আরো মোহময়। আমিই একমাত্র ক্রেতা। তবে বয়স্ক বাঙালীর মনে এখনও সর্বসমক্ষে দারুর বোতল কিনে রাস্তায় হেটে বাড়ী ঢোকা কে ভ্রুকুটিযুক্ত দৃষ্টিতে দেখা হয়। এব্যাপারে আমার কলেজের এক সিনিয়ার দাদা, প্রবীরদাকে বেশ প্রগ্রেসিভ দেখলাম। ফোনে কথা হচ্ছিল। কয়েকদিন পরে আমার নেমন্তন্ন প্রবীরদার বাড়ীতে। আমাকে আপ্যায়নের জন্য বিয়ার কিনতে গিয়েছিলেন পাড়ার দোকানে। ফেরার পথে আরেক পরিচিত ‘ক’ বাবুর সঙ্গে দেখা। প্রবীরদার হাতে পুরানো আমলের প্লাস্টিকের বালতি ব্যাগ। তার মধ্যে থেকে উকি দিচ্ছে বিয়ারের বোতলগুলো। ‘ক’ বাবুর উপদেশ, “আরে ভায়া, পাড়ার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ, একটু কাগজ টাগজ দিয়ে ঢেকে নিয়ে যাবে তো।” প্রবীরদার সপাট জবাব-“ভাই, নিজের পয়সায় দারু কিনে নিয়ে যাচ্ছি, লুকিয়ে কেন নিয়ে যাব? তুমি যখন দেখেই ফেলেছ, যাও একটা কাগজ নিয়ে এস, একটা বোতল কাগজে মুড়িয়ে তুমি নিয়ে যাও।” ‘ক’ বাবু নাকি এই শুনে আর কথা বাড়ান নি। “একটু তাড়া আছে” বলে কেটে পড়েছেন!
সাম্প্রতিককালে তিনটে প্রধান কনজিউমেবেল লিকুইডের মধ্যে ভোজ্য তেল ও জ্বালানি তেলের মূল্যে স্পাইরালিং উর্ধগতি আর বীয়ার-হুইস্কিতে দামের অধোগতি। সরকারের ভাবখানা এই যে করোনার বাজারে গাড়ী কম চালাও, ঘরে বসে হুইস্কি খাও।
এই জিএসটি জমানাতে লিকার এবং পেট্রল ডিজেল জিএসটির আওতার বাইরে আছে। সেন্টার, স্টেট নিজের ইচ্ছেমত শুল্ক বসায়। ফলে সব স্টেটে এমআরপি আলাদা আলাদা। এখন দিল্লি ও আশেপাশের গুরুগ্রাম, নয়ডা, ফরিদাবাদ, সব মিলিয়ে এনসিআর রিজিয়ন বলা হচ্ছে। অথচ বানিজ্যিকভাবে তার কোন সুফল পাওয়া যায় না। কারণ স্টেট ট্যাক্সের কল্যাণে নয়ডা, দিল্লি, গুরগাঁও-ফরিদাবাদে আলাদা আলাদা দাম। ট্রাডিশনালি দিল্লিতে পেট্রোল-ডিজেল শস্তা হত, তখন দিল্লি বর্ডার সাইডে ফিলিং স্টেশনে গাড়ীর লম্বা লাইন, নয়ডার পেট্রোল পাম্প মাছি তাড়াচ্ছে। বছর খানেক আগে হঠাৎ করে ইউপিতে তেলের দাম কমে গেল, তখন চিত্রটা উল্টে গেল।
ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি থেকে পেপারে আসতে থাকল দিল্লিতে দারুর দোকানে খুব ডিসকাউন্ট চলছে, কারণ মার্চে ফাইনান্সিয়াল ইয়ারএন্ডিং এর আগে স্টক খালি করতে হবে। কাগজের খবর অনুযায়ী মনে হল এই সেল ক্ষণস্থায়ী, মার্চ এন্ডে শেষ হয়ে যাবে। ফলে দিল্লির সেল-প্রেমী পাবলিকের লাইনের ল্যাজ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে লাগল। সোমরসের রসাস্বাদনে সবাই লালায়িত। মেডিক্যাল ট্যুরিসম বলে একটা কথা শুনেছিলাম। বিদেশীরা ভারতে এসে অনেক কম খরচে চিকিৎসা বা অপারেশন করেন, এরপর তাজমহল, লালকেল্লা ইত্যাদি দেখে ঘরে ফিরে যান। রথ দেখা, কলা বেচা-দুটোই একসঙ্গে হচ্ছে। দিল্লির লিকার ডিসকাউন্টের ফলে খালি নয়ডা গুরগাঁও নয়, বেরিলি, গোয়ালিয়ার, জয়পুর, লক্ষৌ, বেনারস এমনকি মুম্বাই থেকে লোকজন এখানে আসছে শস্তায় লিকারের খরিদারি করতে।
ক্রমশঃ
পর্ব ৩
নিউজপেপার থেকে জানলাম আইএমএফএল মানে ইন্ডিয়ান মেড ফরেন লিকার-এ যে এম আর পি লেখা থাকে তাতে লভ্যাংশ চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পারসেন্ট। সুতরাং তিরিশ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট দিলেও রিটেলারের ভাল লাভ থাকে। গত বছর নভেম্বর মাস থেকে দিল্লি গভর্নমেন্ট লিকার বিজনেস থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে এবং আবগারী রুলে পরিবর্তন এনে ডিসকাউন্টে রিটেলারের ডিসক্রিশন এনেছে। মুম্বাই থেকে এক কাপল এসে দশ লিটার আইএমএফএল কিনে প্লেনে করে মুম্বাই গিয়েছে। ঐ কাগজ থেকেই জানলাম, হাওয়াই জাহাজে জনপ্রতি পাচলিটার করে লিকার এল্যাউড। এতে তারা মুম্বাই এর তুলনায় দামে ৩০,০০০/- টাকা মুনাফা করেছে। এদিকে গুরগাঁও এর লিকার শপগুলির মাথায় হাত। ওখানে আবার ডিসকাউন্টের মিনিমাম প্রাইস ফিক্সড। ফলে গুরগাঁও এর দোকানগুলো ডিসকাউন্ট দিত কিন্তু সেটা ইরেশানালি হত না। নয়ডা চিরকালই লিকার প্রাইসে দিল্লি/গুরগাঁও এর কাছে হেরে বসে আছে। এখানে চিরকালই দিল্লির তুলনায় ১৫/২০ পারসেন্ট দাম বেশী। কাগজ অনুযায়ী গত এক মাসে, দিল্লিতে লিকারের বেচা কেনা ডবল হয়ে গিয়েছে। তবে এই সুখ ক্ষণস্থায়ী। মার্চের মাঝামাঝি থেকে দিল্লি সরকারের নির্দেশে ডিসকাউন্ট বন্ধ। সরকার কারণ হিসাবে বলছে, করোনার সময় খরিদ্দারদের লম্বা লাইন। যদিও এই যুক্তি ধোপে টেকে না, কারণ অমিক্রন শেষের মুখে। গুরগাঁও এর যে দোকানগুলোতে লালবাতি জ্বলতে বসেছিল, সেগুলি আবার হৃত গৌরব ফিরে পেয়েছে।
এবারে দুটো শোনা গল্প দিয়ে ইতি টানি। প্রথমটা শ্রদ্ধেয় রবি ঘোষ অনুষ্ঠানে শোনাতেন। এক মাতাল অফিসফেরতা রোজ শুড়িখানায় ঢুকে মদ্যপান করে, অধিক রাতে বাসায় ফেরেন। তিনি ধুমকির নেশায় নিজেই মত্ত থাকেন, গিন্নির উপর চোটপাট নেই, নীরবে ডিনার করে ঘুমাতে যান। গিন্নিকে একদিন বল্লেন- “দ্যাখো আমি মাল খাই বটে, কিন্তু বাড়ীতে শান্তি বজায় রাখি।” গিন্নির ব্যাজার মুখের উত্তর -“ছাইপাশ গিলে তোমার কোন হুঁশ থাকে না, দিনের পর দিন একটা করে চাদর হারিয়ে আস।” ভদ্রলোক মনে খুব দুঃখ পেলেন। সেদিনকে মদের টেবিলে বসে সবে দুপাত্তর চড়িয়েছেন, মনে হল পিছন থেকে কেউ চাদরটা টানছে। নাঃ, নিশ্চিন্তে বসে মাল খাওয়া যাবে না। উনি দুত্তোর বলে উঠে আরেকটা বারে গেলেন। নেশা তখনও জমে নি। নূতন জায়গায় আরো দু পাত্র চড়াবার আগে চাদরটাকে গা থেকে খুলে ভাজ করে কোলে রাখলেন। এবার নিশ্চিন্ত। সবে মৌতাত একটু জমেছে, কি বিপদ, উনার মনে হল চাদরটা কিরকম পিছলে পিছলে যাচ্ছে। বিপদ আর কাকে বলে, গিন্নির কাছে এমনিতেই প্রেস্টিজ ঢিলে হয়ে আছে, না, চাদর হারানো চলবে না, সে যতই শত্রুতা করুক। উনি চাদরটার একপ্রান্ত চেয়ারের পায়ে বেঁধে নিলেন। আরেক পেগের পর মনে হল চাদরটা ওড়ার চেষ্টা করছে। কি আর করা-কম্পিত হাতে চাদরের অন্য এন্ডটা গিঁট পাকিয়ে মাথার উপর দিয়ে ঝুলিয়ে নিলেন আর বলতে থাকলেন -“ মায়ের দিব্যি, দেখি আজ তুই কি করে হারাস!” অন্যদিনের তুলনায় মদ্যপান একটু বেশী হল, কিন্তু চাদরটা সন্তর্পনে খুলে, ভাল করে গলায় ফাঁস দিয়ে, একটা খুঁট হাতে শক্ত করে ধরে বাড়ী পৌছে গিন্নিকে বল্লেন -এই দ্যাখো, আজ তোমার চাদর ঠিক ফেরত এনেছি। গিন্নি বল্লেন -“তা তো দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু তোমার ধুতি গেল কোথায়?”
অন্য কাহিনীটা কিছুটা এইরকম - দুই মাতাল বন্ধু শুড়িখানা থেকে মধ্যরাত্রে বেরিয়েছে। একটু এগোনর পর এক বন্ধু বল্ল -“একটু চা খেলে হয় না।” অন্যজন বল্ল “মাইরি, তুই আমার মনের কথাটাই বললি।” প্রথমজন বলল তুই এই ফুটে বস, উল্টোদিকের চায়ের দোকানটা থেকে আমি চা নিয়ে আসি।” বলে সে বন্ধুকে বসিয়ে দোকানে গেল। দোকানদার অনেক আগেই দোকান বন্ধ করে চলে গিঁয়েছে। প্রথমজন বন্ধুকে কথা দিয়েছে চা খাওয়াবে, সে কথার খেলাপ কি করে করবে, অগত্যা সে দোকানে বসে রইল। ভোরবেলা দোকানদার এসে দোকান খুলতে সে চায়ের অর্ডার দিল। খুশী মনে দুকাপ চা নিয়ে রাস্তা ক্রস করে বন্ধুকে বল্ল-“এই যে, তোর জন্য চা এনেছি। দ্বিতীয় বন্ধু উৎফুল্ল স্বরে বলল “ আরে, তুই তো পাখি, ফুরুৎ করে গেলি আর এলি!”
আরেকটা ছোট গল্প না বলে পারছি না। দুই বন্ধু মদ্যপান করে বেরিয়েছে। কিঞ্চিৎ অধিকমাত্রায় নেশা হওয়ায় একে অপরের কাঁধে হাত রেখে চলেছে। একটু পরে নেশা আরেকটু চড়াতে দুজন এক জায়গায় একে অপরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটু পরে পুলিশ এসে দুজনকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ওর মধ্যে একজন বলে উঠল- “স্যার, প্লিজ ছাড়াবেন না, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল!”
এবারের ঘটনাটা দিয়ে যবনিকাপাত। ঘটনার নায়ক এই অধম। এতক্ষণ যে মাতালদের গল্প শোনালাম, তাদের উচ্চমার্গে বিচরণ সুরাপানের পর। তবে আমি বোধহয় একমাত্র যে সুরাপানের আগেই বেসুরো। মাঝে মাঝে দুই এক পেগ হুইস্কি খাওয়ার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে ওঠে। ইন্সপিরেশন অবশ্যই খুশবন্ত সিং। সুরা ও সাকী তার লেখার প্রধান উপকরন। সেদিনকে ডাইনিং টেবিলে গ্লাসে হুইস্কি ঢেলে সোডা মিশিয়ে পটেটো চিপস নিয়ে সদ্য বেডরুমে টিভির সামনে বসেছি। চুমুক দিতে গিয়ে দেখি বোতল ধরে বসে আছি। গ্লাসসুদ্ধ হুইস্কি প্যাকেটের মধ্যে করে আলমারির কোনে রেখেছি। এটা হল গন্ধ শুঁকে নেশা। আমি একমোবদ্বিতীয়ম।
দেবদত্ত
০১/০৪/২০২২


Comments
Post a Comment