ক্ল্যাসিকাল ডান্সের একটি সন্ধ্যে
কামানী অডিটোরিয়ম কোপারনিকাস মার্গে
ক্ল্যাসিকাল ডান্সের একটি সন্ধ্যে পর্ব ১
জুলাই মাসের আগে সাধারণত দিল্লিতে বর্ষা আসে না। এই ২০২২এ গ্রীষ্মকালের দাবদাহ পুরো ভানুমতীর খেল দেখিয়ে ছেড়েছে, তার পাপস্খালনে বর্ষা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে এসেছে। আজ রবিবার, সকাল থেকে মেঘলা, গত দু-তিন দিন ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। সকালে পাড়ার গ্রুপের মেসেজে দেখলাম কামানী হলে ক্ল্যাসিকাল ড্যান্সের অনুষ্ঠান আছে। এর আগে বন্ধু গৌতম মেসেজ পাঠিয়েছিল, সিপি তে হ্যান্ডলুম হাট এ একমাস ধরে ওয়েস্ট বেঙ্গল ম্যাঙ্গো ও হ্যান্ডিক্রাফটসের এক্সিবিশন চলবে। ঠিক করলাম এক ঢিলে দুইপাখি মারব। দুপুরে লাঞ্চ করে বন্ধু গৌতম ওরেফে মাতলাকে নিয়ে প্রথমে যাব আম আদমির আম উৎসবে, ওখান থেকে কামানী থিয়েটার হল যাব। হ্যান্ডলুম হাট জনপথের উপর। গুগল ম্যাপ জনপথের উপর ইনার সার্কেলের পাশে এসে হাল ছেড়ে দিল। ওখানে পার্কিং নেই। রাস্তায় রাখার প্রশ্ন নেই। তাছাড়া আসবার সময় দেখলাম চারিদিকে পুলিশের ছড়াছড়ি।পিএম আসবেন প্রগতি ময়দান আন্ডার পাশ এর ফিতে কাটতে। ইনার সার্কেলে ঢুকে কেজি মার্গের বাসস্ট্যান্ডের পিছনের পার্কিং লটে গাড়ী রেখে জনপথের গারমেন্ট বাজারের
জনপথের ভীড়ে ভীড়াক্কার গারমেন্ট মার্কেটভীড় ঠেঙিয়ে পৌঁছালাম ফেস্টিভ্যলের আঙিনাতে। অনেকটা জায়গা জুড়ে দোকানপাট। জাঙ্ক জুয়েলারী, শাড়ীর দোকানই বেশী। বেতের তৈরী শীতলপাটি থেকে, মেদিনীপুরের পটচিত্র, কি নেই। ওয়েস্ট বেঙ্গলের ব্রান্ড এম্বাসেডার বিশ্ববাংলা ও উপস্থিত। দার্জিলিং ফার্স্ট ফ্লাস টি ডিসকাউন্টে কিনলাম। হরিণঘাটার মিট প্রোডাক্টসও আছে। একদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে দেশ-বারটা আমের দোকান। গন্ধে চারিদিক ম-ম করছে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের হিমসাগর, আম্রপালী, লক্ষণভোগ ও আরো বেশ কিছু ধরণের আম ছিল। একটা আমের নাম চ্যাটার্জি। ওটা নাকি হুগলীতে হয়। হিমসাগর কিনলাম ৯০/- কিলো। কলকাতার বন্ধুরা জানাল ওখানে ১০০/- উপরে কিলো। লাকি দিল্লি বংস! মেদিনীপুরের এক স্টলে পটচিত্র রোল করে করে দোকানদার সুন্দর গান গেয়ে শোনালেন। স্বামী-স্ত্রী কাঠের উপর নকশা বানাচ্ছেন, দোকানদারীও চলছে। একজায়গায় বাউল গানও হচ্ছে।
ম্যাঙ্গো ফেস্টিভ্যল জনপথের হ্যান্ডলুম হাটেবাউল গান শোনাচ্ছেন শিল্পীরা
পূর্ব মেদিনীপুর থেকে এসেছেন পটচিত্র কর ফ্যামিলি। করোনার সময় দুর্দশার অন্ত ছিল না বলে জানালেন
ফেস্টিভ্যালের প্রবেশপথ
সবাই ভিডিও তোলায় ব্যস্ত। বেরিয়ে পরলাম, যদিও আরেকটু ঘোরার ইচ্ছে ছিল। কারণ কামানী অডিটোরিয়ামে নাচের অনুষ্ঠান সন্ধ্যে সাড়ে ছটা থেকে।
সোনাল মান সিং নাচের জগতে একজন লিভিং লিজেন্ড বলা যায়। তারই ট্রুপের পারফরমেন্স। আজকে মূলত চারজন মহিলা, যাদের মধ্যে দুজন পুরুষশাসিত সমাজের শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন এবং দুজন ভারতীয় নৃত্যশাস্ত্রে ট্রাডিশনাল আর্ট ফর্মকে নিরন্তর প্রয়াসে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তাদের জীবনগাথা নৃত্যশৈলীর মধ্যে পরিবেশিত হবে। অডিটোরিয়ামের সামনের অংশাটতে সুন্দর করে ফুল দিয়ে সেই বীরাঙ্গনাদের ছবি।
ম্যাডাম মেনকা ১৮৯৯-১৯৪৩
মোহিন আট্টম ফর্মে নাচ
ভারতনাট্যম
কুড়িয়াধাতু তাত্রিচারটি পারফরমেন্সই
কমবেশী চল্লিশ মিনিটের। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছিল নটারও পরে। প্রত্যেকটি পারফরমেন্সের আগে সোনাল মান সিং মূলবিষয়বস্তু সম্বন্ধে বল্লেন। এই ৮০ বছর বয়সেও ( কারণ উনি বল্লেন ৬৩ সালে গ্রাজুয়েশন করেছিলেন) যেমন গ্রেসফুল লাগছিল, তেমনই তার জোরাল ও মিষ্টি গলার অওয়াজ, আর তেমনি প্রান্জল বিবরণী। প্রত্যেক ন্যারেশনের সময় নূতন নূতন গর্জাস শাড়ী পরেছিলেন। গ্রাজুয়েশনের পর উনি ড্যান্সকে প্রফেশন করতে চেয়েছিলেন। যে রকমটা হয়ে থাকে সেই জমানায় তার গুরুজনেরা প্রথমে রেজিস্ট করেন। তিনদিন বাড়ীতে কথা বন্ধ ছিল। পরে সোনাল তার দাদুকে বলেন -“তোমরা রুক্মিণী দেবীর এত প্রশংসা কর, তাহালে আমাকে নাচে কেন বাঁধা দিচ্ছ?” এরপর তিনি বাড়ীর ছাড়পত্র পান। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি।
প্রথম পরিবেশন ছিল কুচিপুড়ি নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে মুথ্থুপালানি নাম্নী আঠারশ শতকের মধ্যভাগে তাঞ্জোরের মারাঠা রুলার প্রতাপ সিং এর কনসর্ট ও দেবদাসীর জীবনকাহিনী নিয়ে। নৃত্যে পারদর্শিতার সাথে তার মুক্তমনা লেখনশৈলী সে যুগে পুরুষশাসিত সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়েছিল। “রাধিকা সন্তানামু” (শ্রীরাধিকার মানভঞ্জন), নামে রাখা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাতে তার বর্ণনা খালি “নিকষিত প্রেম, কামগন্ধ নাহি তায়” , তা নয়, তিনি বর্ণনাতে দেহজও মিলনও টেনে এনেছিলেন ও মেয়েদের “ডমিনেন্স ওভার মেনফোক” বর্ণনা করেছিলেন, যেকারণে তার বই নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন সমাজ সংস্কারকমন্ডলী। নিজের জীবনেও তিনি সমাজসংস্কারক ও স্বাধীনচেতা ছিল। সেযুগে যা অকল্পনীয় ছিল সেটা হল তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি ছিল। সে যুগে মেয়েরা পুরুষের কাছ থেকে গিফ্ট পেতে অভ্যস্ত ছিল, কিন্তু মুথ্থুপালানি তার স্তাবকদের গিফ্ট দিতেন।
কুচিপুড়ি নৃত্যশৈলী এসেছে অন্ধ্রপ্রদেশের ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় থেকে। সাউথের সব নৃত্যশৈলী অরিজিনালি মিথিকাল স্টোরিলাইন বেসব ছিল এবং সাধারণত মন্দিরে অনুষ্ঠিত হত।
নাচের বেশীরভাগটাই ছিল মুথ্থুপালানির রাধিকার মানভঞ্জনের নাট্যরূপ। পিছনের স্ক্রীনে টেম্পল, বা সরোবর বা বাগান একটা প্রোজেক্টারে দেখান হচ্ছিল নাচের পটভূমি অনুযায়ী।
এর পরের উপস্থাপনা ছিল কুরিয়াধাতু তাত্রি নামে বিংশশতকের শেষভাগে কেরালার নাম্বুদ্রিবংশজাত এক বীরাঙ্গনাকে নিয়ে। সেকালে কেরালার হিন্দুসমাজে নাম্বুদ্রি ব্রাহ্মণরা ছিলেন অর্থবান পুরুষশাসিত আপারকাস্ট। মেয়ারা অন্তঃপুরবাসিনী। বিয়ের আগে বাবা ও পরে পতি ছিলেন মহিলার মুখ দেখার একমাত্র অধিকারী। তাত্রির বিয়ে দেওয়া হত এগার বছর বয়সে, এক ষাট বছরের বৃদ্ধের সঙ্গে। তখনকার দিনে যাতে সম্পত্তি ভাগ না হয়, তার জন্য পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্রর খালি বিয়ের অধিকার ছিলএবং একাধিক স্ত্রী রাখতে পারতেন। তাত্রি এই প্রথার প্রতিবাদ করায়, তার স্বামী তাকে ত্যাগ করেন। তাত্রি এরপর ত্রিচূড়ের বিখ্যাত এলিফ্যান্ট ফেস্টিভালে গিয়ে এক মাহুতের প্রেমে পড়েন। সেযুগে এটা অকল্পনীয় ছিল। তার বিচার শুরু হয়। তখন তাত্রি চৌষট্টিজন নাম্বুদ্রি ও আয়ার ব্রাহ্মণদের নাম বলেন যারা গোপনে তার কাছে আসত। কোচির রাজার বিচারে সব ব্রাহ্মণকে সমাজচ্যুত করা হয়, এবং ১৯০৫ সালের এই ঘটনার পর থেকে বর্ণপ্রথা ধীরে ধীরে কমে আসে।
ডান্স স্টাইলটা ছিল মোহিনীআট্টম। সব শিল্পীর পরনে ছিল গোল্ডেন পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ী, যা ট্রাডিশনাল কেরালা এাটায়ার। কুরিয়াধাতু তাত্রির জীবনী তুলে ধরা হল পরিবেশনায়।
পরবর্তী দুটো প্রেজেন্টেশন ছিল তুলনামূলক ভাবে নূতন দুই নৃত্যশিল্পীকে নিয়ে, যাদের আজীবন প্রচেষ্ঠায়, যে নৃত্যশৈলী একবিংশ শতকের মাঝামাঝিও আবদ্ধ ছিল মন্দিরের দেবদাসী বা কিংস কোর্টে নৃত্যপরিবেশনের মাধ্যমে, সেটা পপুলারাইজ হল সাধারণ সমাজে বিশেষ করে ষাট, সত্তর ও আশির দশকে। এদের একজন হলেন লীলাবতি রায়, যার জন্ম ১৮৯৯এ বরিশালে। মারা যান মাত্র ৪৪ বছর বয়েসে। পরে তিনি ম্যাডাম মেনকা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।অন্যজন হলেন রুক্মিণী দেবী অরুন্ডেল (১৯০৪-১৯৮৬) এক তামিল ব্রাহ্মণ যিনি ভারতনাট্যম নৃত্যশৈলী কে পপুলারাইজ করেছিলেন। মেনকা ও রুক্মিনী দুজনকেই প্রভাবিত করেছিলেন লিজেন্ডারি রাশিয়ান ব্যালে ড্যান্সার আন্না পাভেলেভা, যিনি তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন দেশে ফিরে স্বদেশীয় নৃত্যকলায় মনোনিবেশ করতে। মেনকা খান্ডালাতে তা ড্যান্স এাকাডেমী খোলেন। রুক্মিণী দেবী চেন্নাইতে কলাক্ষেত্রম নামে একটি এক্যাডেমি খোলেন। মর্ডান ভারতনাট্যমের কস্টিউম এবং জুয়েলারী ভারতীয় মন্দিরের নারী অবয়বের সাযুজ্যে ডিজাইন করেন। ভায়োলিন ও মৃদঙ্গম, নৃত্যের তালে মিউজিকের ব্যবহার তিনি ও ই কৃষ্ণা আইয়ারের সংযোজন।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
ম্যাডাম মেনকার জীবন দেখান হল উত্তরভারতীয় কত্থক শৈলীর মাধ্যমে। আন্না পাভালেভার ব্যালে নৃত্যেরও ঝলক ছিল।
শেষ পরিবেশনটি হল ভারতনাট্যম নৃত্যশৈলীর মাধ্যমে। রুক্মিণীদেবীর জীবনব্যাপী কর্মকান্ডের কিছু ঝলক দেখা গেল।
যেটা আমর মত নৃত্য-অজ্ঞ ব্যাক্তির বুঝতে অসুবিধা হয় নি সেটা হল গ্রুপ পারফরমেন্সে অসাধারণ সিঙক্রোনাইজেশন। এরা সবাই ট্রেনড ড্যান্সার। ভারতনাট্যমের ফর্মটা বেশী ভাল লাগল। হাত ও পায়ের যৌথমুদ্রা ও মুখের অভিব্যক্তি, সব মিলিয়ে নাচকে এক শৈল্পিক সুষমার উচ্চশিখরে নিয়ে যায়। কত্থকে পায়ের ছন্দের প্রাধান্য বেশী মনে হল। ভারতনাট্যমের ড্রেসও খুব গর্জাস। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত এক সন্ধ্যা উপভোগ করলাম।
সোনাল মান সিং কে দেখা ও তার উপস্থাপনা শোনাও এক সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি সমঝদার নই, কলেজ লাইফে বা মধ্য চাকুরীরত অবস্থায় সেরকম কোন ভালবাসা জন্মায় নি ভারতীয় শিল্পকলা নিয়ে, পরিণত বয়সে কেন জানি এধরণের অনুষ্ঠান বেশ এনজয় করছি।
এবারে টিটবিট। সামনের সীটে এক সর্দারজী বসে সারাক্ষণ মোবাইল ঘেটে গেলেন। সারা অনুষ্ঠানে দুই একবার মুখ তুলে মোবাইলে ভিডিও তুললেন যদিও ভিডিও বা ছবি তোলা মানা ছিল। ওর দেখাদেখি সাহসে ভর করে আমিও দুই-তিনটে ছবি তুল্লাম। কামানী অডিটোরিয়াম অনেক পুরানো হল। নাচের সেটে বিশেষ কোন ডেকোরেশন ছিল না। ব্যাকগ্রাইন্ডে বড় পর্দায় দৃশ্যবলীর পটপরিবর্তন দেখানোর ব্যাবস্থা নেই। পুরো নাচের অনুষ্ঠানে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেজেছে। সাধারণভাবে যে সব সাউথ ইন্ডিয়ান ড্যান্স শো দেখেছি সেখানে ট্রাডিশনাল ড্রেস ও কপালে টিকাসহ মিউজিশিয়ানদের এককোণে বসে গান ও ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাতে দেখেছি। অবশ্য বেশীরভাগ ছিল সোলো পারফরমেন্স। এধরণের গ্রুপ শোতে স্টেজে অত জায়গা পাওয়া মুস্কিল।
যাই হোক সবমিলিয়ে দারুণ। শো শেষে সব নৃত্যশিল্পী স্টেজে এলেন, মধ্যমণি হয়ে এলেন স্বয়ং সোনাল মান সিং, তখন দর্শকদের প্রবল করতালি ও স্ট্যান্ডিং ওভেশনের মধ্যে বোঝা গেল একটি সাফল্যমন্ডিত অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি হল। কালকের অবহাওয়াও ছিল অনুকূল। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি যা বেশ কিছু বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন।
দেবদত্ত
১৯/০৬/২০২২
















গতকাল আমিও এই প্রোগ্রাম দেখি। দেবদত্ত বাবু খুব গুছিয়ে অনুষ্ঠানটির বিবরণ দিয়েছেন। পড়তে পড়তে সব যেন চলচিত্রের মত চোখের সামনে ভেসে উঠল। সুন্দর লেখা। ধন্যবাদ ও সাধুবাদ
ReplyDelete।
অনেক ধন্যবাদ🙏💕
ReplyDelete