ভোলা মন (মজার ঘটনা)
রুমির ঘরের সেই এসি
ভোলা মন
মানুষের লজিকাল মন কখন যে ভোলা মন হয়ে যায় তার খবর কে রাখে।যুধিষ্টির পৃথিবীর সবচেয়ে গতিময় জিনিষ কি, তার উত্তরে এই মন এর কথা জানিয়েছিলেম।কবিও বলে দিয়েছেন, “মন মোর মেঘেরও সঙ্গী”। “ভোলা মন” নিয়ে একটা বাউল গানও আছে। পরের লাইনটা হল “মনের কথা বলি কারে আর”। তা সেই আমার ভোলা মনের কথা আপনাদেরকেই শোনাই।
ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে একটা গল্প ছিল- একজন লোক লাঠি নিয়ে মর্নিং ওয়াক সেরে ফিরে এসে, লাঠিটাকে বিছানায় শুইয়ে, নিজে লাঠির জায়গা অর্থাৎ দরজার পাশে চুপটি করে দাড়িয়ে আছে। ভোলা মনের পারফেক্ট এক্সাম্পল। কর্মজীবনের শুরুতেই নিজের ভোলা মনের পরিচয় পেয়েছিলাম। মিটিংএ কাউর সঙ্গে আলাপ হলে নাম কিছুতেই মনে রাখতে পারি না। ট্রেনে এক সহযাত্রী এনটিপিসিতে চাকরী করি শুনে সিএমডির নাম জিজ্ঞাসা করেছিলেন। অনেক চেষ্টাতেও মনে পড়ল না। আগে যে চেয়ারম্যান ছিলেন তার নামটা বল্লাম। সহযাত্রী বেশ “সাসপিশাস” মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। বোধহয় ভাবছিলেন-“এ ব্যাটা নিশ্চয়ই এনটিপিসিতে চাকরী করে না”। একবার সদ্যবিবাহিত পত্নীকে এক কলিগের সঙ্গে আলাপ করিয়ে বলেছিলাম” ইনসে মিলো, ইনকা নাম মিস্টার অগরওয়াল”। ভদ্রলোক সুমিতাকে নমস্কার করে আমার কানে কানে বল্লেন-“নাম তো ভুল গিয়া, কোই বাত নেহি, লেকিন হাম বেনিয়া অগরওয়াল নেহি হ্যায়, হাম হ্যায় ব্রাহ্মিণ শর্মা”। রিটায়ারমেন্টের পর নূতন পরিচিতি কমে গিয়েছে, তাই নাম বিভ্রাট নিয়ে ভীতি কমেছে।
তবে আজকে যে ঘটনা ঘটল, তারপর থেকে নিজের মনে নিজেই হেসে যাচ্ছি। ২০২২এ এবার গরমটা বেশ তাড়াতাড়ি পড়েছে। মার্চের শেষ থেকেই দিল্লিতে সূর্যদেবের প্রখর তেজের প্রকাশ। আমাদের বেডরুমের এসিগুলো বছর দশেকের পুরানো। এদিকে মানে নয়ডা সাইডে গ্যাস লিকের সমস্যা বেশী।মাঝে মাঝেই মেকানিক ডাকতে হয়। আজকাল ফোরস্টার, ফাইভস্টারের পর ইনভার্টার এসিও মার্কেটে এসে গিয়েছে। বেশ কয়েকটা দোকান সার্ভে করে। তিন বেড রুমের জন্য তিনটে উইনডো এসি কিনলাম। একটা আমাদের ঘরের, সেটা এক কোম্পানির আর ছেলে ও মেয়ের ঘরের জন্য আরো দুটো সেগুলো অন্য একটা কোম্পানির। মেয়ের ঘরের এসিটা বেশ আওয়াজ করে।একই কোম্পানির এসি ছেলের ঘরেও-সেটাতে আওয়াজ অনেক কম। মেয়ের ওয়ার্ক ফ্রম হোম- আওয়াজের চোটে মিটিং এটেন্ড করতে অসুবিধা হয়। গুগল ঘেটে ব্লুস্টারের কাস্টমার কেয়ারে ফোন করলাম। ওয়েবসাইটের নামটা ভাল করে দেখে সিওর হয়ে নিলাম, যে ওই কোম্পানিরই ওয়েবসাইট কিনা। কারন এর আগে ওয়াশিং মেশিনের সার্ভিসিং এর জন্য গুগল টাইপ করে যে কাস্টমার কেয়ার নম্বর পেয়েছিলাম, সেটা ছিল জাল। ভালই আক্কেল সেলামি দিতে হয়েছিল।
পরের দিন দুপুর দুটোর সময় ফোন এল এক টেকনিশিয়ানের। আমি মানা করলাম এই দুপুরের লাঞ্চ ও তৎপরবর্তীতে “ভাতঘুমে” এর ব্যাঘাত না ঘটিয়ে এখন না আসতে, আগামীকাল সকালে যেন আসে। কমপ্লেন লজ হয়েছিল নয় তারিখ, আর ঘটনার যবনিকা পাত আজ ১৪ তারিখ। পরের দিন কি তার পরের দিনও এল না। কলসেন্টারে ফোন করতে, অনেক সরি-টরি বলে জানাল- প্রবলেম এস্কালেট করা হয়েছে, নিশ্চয়ই কালকের মধ্যে হবে। পরের দিন আবার ফ্রানচাইজির নম্বর নিয়ে ফোন করলাম। সেও জানাল যে টেকনিশিয়ান একটু পরেই আসবে। আবার চাতকের প্রতীক্ষা। কিন্তু ‘কাকস্য পরিবেদনা!’ আজকে রেগে গিয়ে চ্যাটিং করলাম কাস্টমার কেয়ারে। কিছুই লাভ হল না। বক্তব্য সেই একই-‘আজ হো জায়গা’। রেগে গিয়ে টুইটারে অভিযোগ জানালাম। ব্লুস্টারের মেল যোগাড় করে লম্বা চওড়া অভিযোগ জানালাম। মোটকথা কয়েকদিন বেশ কাঠখড় পোড়াতে হল টেকনিশিয়ান ভিসিট নিয়ে। সাধারনত সার্ভিসিং কোম্পানির লোকেরা কখনই এত দেরী করে না। তার একটা কারণ কাস্টমারকে সার্ভিসিং এর রেটিং দিতে হয়।
যাক শেষমেষ আজ তিনটে নাগাদ ব্লুস্টারের টেকনিশিয়ানের দেখা মিলল দুপুর তিনটে নাগাদ।
সবে লাঞ্চ করে উঠেছি। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। দরজা খুলে প্রথমেই কড়া করে দু-চার কথা শোনালাম। দুজন টেকনিশিয়ান ২০-২২ বছরের, সরি টরি বলে ঢুকল।
ঘরে ঢুকে সবে বলতে শুরু করেছি আওয়াজের কথা, ছেলেটা বল্ল-“স্যার, ইয়ে তো ক্যারিয়ার কোম্পানিকা এসি হ্যায়। আরে তাই তো-ভাবছি এরকম ভুল কি করে হল! ততক্ষনে ছেলে দুটো হাসতে শুরু করেছে। আমারও হাসি পেয়ে যাচ্ছিল। তবুও গম্ভীর থাকার চেষ্টা করলাম। মাথার মধ্যে তখনও ঘুরছে “ব্লুস্টার কোম্পানি” যখন বলেছি, তাহালে নিশ্চয়ই আমাদের বেডরুমের এসিটা ওই কোম্পানিরই হবে। আমাদের এসির রিমোটে বেশ কয়েকরকম মোড আছে এনার্জি সেভিং রিলেটেড। ফাংশানগুলো কোনদিন জানার চেষ্টা করি নি। ওদের বললাম যে আমাকে ফাংশন গুলো বুঝিয়ে দাও। বেডরুমে তখন সুমিতা টিভি দেখতে দেখতে লাঞ্চ করছে। তাই আমি রিমোটটা নিয়ে ড্রইংরুমে এলাম। ছেলেটা এবার রিমোটটা হাতে নিয়ে গোল্লা গোল্লা চোখ করে বল্ল -“স্যার, ইয়ে তো লয়েড কোম্পানিকা রিমোট হ্যায়! ইসকা মতলব আপকা পাশ ব্লুস্টার কা এসি হ্যায়ই নেহি।” এবার আমিও আর হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। ছেলে দুটো তো দুই হাতে মাথা চেপে হাসতে হাসতে মেঝেতে বসে পড়ছে। একটা ছেলে জিজ্ঞাসা করল “স্যার আপকা দিমাগ মে ব্লুস্টার ক্যায়সে ঘুস গিয়া?” সত্যিই তো কি করে মাথায় ব্লুস্টার এল? আগের তিনটে এসি ছিল এলজি কোম্পানির। ড্রইংরুমের এসিটা স্যামসঙ এর। ব্লুস্টার তো কোনদিন কিনি-ই নি।
ছেলেগুলোকে কি আর বলি। এক্সকিউজ দিলাম বয়সের জন্য এরকম গলতি হচ্ছে। সরিও বল্লাম। ছেলেদুটো ফিলজফিক্যাল। বল্ল “কোই বাত নেহি স্যার। হাম ভি তো আপকো চারদিনসে বহুত পরিশান কিয়া। হো গিয়া শোধবোধ।”
ভাবার একটা নূতন টপিক পাওয়া গেল। ছেলে দুটো যাওয়ার পর থেকে মাথায় ঘুরছে হঠাৎ করে ব্লুস্টার কোম্পানি মাথায় ঢুকল কি করে? অনেক ব্রেনস্টর্মিং করে যে উত্তরটা পেলাম সেটাই সম্ভাব্য কারণ মনে হচ্ছে। ক্যারিয়ার এসির লোগোটা ডার্ক ব্লু কালারের। ওই ব্লু কালার দেখেই মাথায় ব্লুস্টার ঢুকে গিয়েছে। সাইকোলজিস্টদের জন্য ভাল কেস স্টাডি।
“টু এ্যর ইজ হিউম্যান” এই আপ্তবাক্যটির সত্যতা সন্দেহাতীত ভাবে হাতে নাতে প্রমাণ পেলাম!
দেবদত্ত
১৪/০৬/২০২২
পুনঃ- ঘটনাটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু হাসির খোরাক কিছু বাকি ছিল। যে দুইজন টেকনিশিয়ান এসেছিল অদৃশ্য ব্লুস্টার এসির মেরামতি করতে, তারা কোন জব কার্ডে আমাকে দিয়ে সই করায় নি। কোন জব তো ছিল না। আর এরকম পরিস্থিতি তো আগে ফেস করে নি। এর ফলে যেটা হল সেটা এই যে সিস্টেমে একটা ফ্ল রয়ে গেল। জব এসাইনড, টেকনিসিয়ান ভিসিটেড, জব কার্ড নট ক্লোসড। কলেজে সেই ফ্লো চার্ট বানাতে হত। ‘ইয়েস’ হলে একটা লুপ আর ‘নো’ হলে আরেকটা লুপ। ব্লুস্টারের ক্ষেত্রে ইয়েস বা নো কোনটাই নয়, মাঝামাঝি হ্যাঙগিং। ব্লুস্টার মেনটেনেন্স টিম ব্লু এর বদলে ইয়েলো মানে সর্ষেফুল দেখছে। দুই দিন অন্তর অন্তর ফোন আসছে ব্লুস্টার কোম্পানি থেকে মিষ্টি বামা কন্ঠে -“স্যার, আপনার কমপ্লেন কি সলভ হয়েছে? টেকিনিশিয়ান কি ভিসিট করেছিল? যদি বলি আমার ব্লুস্টার এসি বাপের জন্মেও ছিল না তাহালে নিজের প্রেস্টিজ পাংচার। বেশী বোঝাতে গেলে সময় নষ্ট। তাই সংক্ষেপে প্রতিবার উত্তর দিই, ‘কমপ্লেন এটেন্ড হয়েছে। এসি ভাল চলছে!’ তবে ভবী ভোলার নয়। আজ সকালে ফোন এল রিজিওনাল ম্যানেজারের। যথাসম্ভব মার্জিত গলায় চোস্ত ইংরাজিতে একই প্রশ্ন। সঙ্গে আবার এক লেজুড়- “স্যার আপনি টুইট করে লিখেছিলেন, রিমোটটা খুব ছোট সাইজের। আমরা দুঃখিত, কিন্তু আপনার ঠিক কি অসুবিধা হচ্ছে? কি আর করা যায়, ফল্গুধারা অনেক এগিয়েছে। এবার স্টপ করতে হবে। বল্লাম-“সরি আসলে আমার কোন ব্লুস্টার কোম্পানির এসি নেই। ভুলে আপনাদের কমপ্লেন দিয়েছিলাম। সঙ্গে একটু স্বান্তনা বাক্যের মত বল্লাম- আপনাদের ব্র্যান্ড ইমেজ তো খুব ভাল। তাই এসি বল্লে ব্লুস্টার মাথায় ঘুরপাক খায়। অন্যপাশ কিছুক্ষণ চুপ। একটু পরে বল্ল - ‘নো ইস্যু স্যার, থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর হাই পারসেপশন অফ আওয়ার ব্র্যান্ড।’ টুক করে ফোন কেটে গেল। আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
দেবদত্ত
২২/০৬/২২

Comments
Post a Comment