রাজনন্দিনী (ইতিহাস মিশ্রিত সত্য ঘটনা)




 রাজনন্দিনী

পর্ব

নয়ডা থেকে দিল্লি এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য দুটো অলটারনেট রাস্তার যে কোন একটা ব্যবহার করি। একটা হল নিজামুদ্দিন ব্রিজ ক্রস করে, বামদিকে রিং রোড, বড়াপুলা এলিভেটেড রোড, রাও তুলা রাম মার্গ হয়ে এয়ারপোর্ট, অথবা নিজামুদ্দিন ব্রীজ থেকে ডান দিকে রিং রোড ধরে প্রগতি ময়দান, ইন্ডিয়া গেট, তারপর লুটিয়েন দিল্লির চমৎকার রাজপথ গুলি পরপর আকবর রোড, তিনমূর্তি হয়ে মালচা মার্গ ধরে ধৌলাকূআ হয়ে এয়ারপোর্ট। দুনম্বর রাস্তাটা আমার বেশী প্রিয় লুটিয়েন দিল্লির সিগন্যল ফ্রি পরিষ্কার রাস্তার দুধারে সবুজ গাছের সারি।

দিন দুয়েক আগে কাগজে দেখলাম মালচা মহল বলে দিল্লির রিজ এরিয়ার, ফিরোজ শা তুঘলকের তৈরী চোদ্দশ শতকের প্রাসাদের ভগ্নাবশেষকে রেস্টোরেশনের প্ল্যান চলছে। দিল্লির রিজ এরিয়া হচ্ছে আরাবল্লী পর্বতের শেষ ভাগ, পাথুরে  এবং বাবলা অন্যান্য কাঁটা ঝোপে ভর্তি।মালচাওয়ার্ডটা নিয়ে আগে থেকেই বেশ কৌতূহল ছিল। আকবর, শাজাহান, আওরংজেব বা রাও তুলারাম কোন না কোন ব্যাক্তিত্ব্যের নামে, মালচা শব্দটা রাস্তার নামকরণে বেশ বেখাপ্পা ছিল। অনেকটা বাংলাদেশের আড়িয়াল খাঁ নামক নদীটির মত। মধুমতী, ধলেশ্বরী, রূপসা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গা ইত্যাদি সুন্দর নামের পাশে কেমন যেন বেমানান। পরে জেনেছিলাম, আড়িয়াল খাঁ নামে একজন প্রসিদ্ধ সুফী ছিলেন। 

নেট ঘাটতেই মালচা নামের অরিজিন পেয়ে গেলাম। ১৯১২ সালে যখন নূতন দিল্লির প্ল্যানিং চলছে, রায়সিনা হলের আশেপাশে দেড়শত গ্রামকে ব্রিটিশ সরকার অধিগ্রহন করে। তবে বেশীরভাগ গ্রামবাসীকে তাদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয় নি, খালি তাদের কব্জায় থাকা জমি নামমাত্র বিনিময়মূল্যে ক্রয় করেছিল। কিন্তু কিছু গ্রাম ছিল লুটিয়েন দিল্লী সংলগ্ন, তাদেরকে ভিটে-মাটি সহ উৎখাত করা হয়। এদের নাম হল রায়সিনা, মালচা, কুশাক, তালকোটরা, মতিবাগ। এই মালচা গ্রামের জমি দিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনের অধিকাংশ, ইন্ডিয়া গেট তৈরী হয়েছে। মোট জমির পরিমাণ আঠারশ একর। সময়কালের দস্তুর অনুযায়ী নামমাত্র কমপেনসেশন দেওয়া হয়েছিল। সরকারী রেকর্ড অনুযায়ী অনেকেই কমপেনসেশন নিতে অস্বীকার করে।  বাড়ী-জমি হারিয়ে বেশীরভাগ পরিবার হরিয়ানার সোনিপথের কাছে নূতন করে মালচা নাম দিয়ে গ্রাম তৈরী করে। মজার কথা তাদের  চতুর্থ জেনারেশনের লোক কোর্টে মামলা করেছে, বর্তমান দাম অনুযায়ী দুই হাজার কোটি টাকা দিতে হবে অথবা প্রেসিডেন্ট ভবনটা তাদের দেওয়া হোক। মামলা চলছে। 

উপরের লেখাটা উপক্রমণিকা হিসাবে ধরে নিন। আসল গল্পে আসা যাক। মালচা নামের অরিজিন ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে মালচা মহল সংক্রান্ত এক চমকপ্রদ তথ্য পেলাম। সত্যি ঘটনা গল্পের চেয়েও অদ্ভুত হয়, তারই এক প্রত্যক্ষ প্রমাণ। 

সালটা ১৯৭০। সেই সময়টা ডিস্কো আর বেলবটমের যুগ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এক মহিলা তার পুত্র-কন্যা সহ নিউ দিল্লির ভিআইপি ওয়েটিং রুমে এসে আস্তানা গাড়লেন। সঙ্গে বেশ কিছু খিদমদগার, গোটা পনের ব্লাডহাউন্ড জাতের কুকুর। হাবে ভাবে অভিজাত খানদানী। রেস্টরুমকে সাজিয়ে তুল্লেন অভিজাত হাভেলির ধরনে। সঙ্গে ছিল দামী পার্শিয়ান কার্পেট। মেঝে মুড়ে ফেলা হল তাই দিয়ে। পর্দা লাগল মখমলের। সুদৃশ্য রূপোর রেকাবী কাপে চা পরিবেশিত হয়। কুকুরগুলিকে চাকররা রেল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যায় বৈকালিক ভ্রমনে। রেল কর্তৃপক্ষের মাথায় হাত। মহিলা ঘোষনা দিলেন তিনি নবাবজাদী, লক্ষ্নৌএর শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শার শেষ বংশধর। নাম তার উইলিয়াৎ-অউধ রাজ্যের বেগম। ছেলের নাম প্রিন্স রাজা মহল আর মেয়ে প্রিন্সেস সাকিনা। ছেলে মেয়ে তাকে ডাকেহার হাইনেসবলে।  রীতিমত হইচই পড়ে গেল। সাংবাদিকদের ভীড়। ফটো তোলার ব্যাপারে তার শর্ত হল খালি কৃষ্ণপক্ষের দিনগুলিতে নবাব পরিবারের ফটো তোলা যাবে। শাহাজাদীর মেজাজ তার পূর্বসূরী সফদরজং এর মত সপ্তম সুরে বাঁধা। বিদেশী সংবাদিক ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। দুই একজন দেশী সংবাদিকের পিছনে কুকুর লেলিয়ে দেওয়ার পর সহজে কেউ তার গেস্ট হাউসের চত্বরে ঘেসে না।  উইলিয়াৎ বেগম নিয়ম করে চিঠি পাঠাতে লাগলেন ইন্দিরা গান্ধী থেকে হোম মিনিস্ট্রি, এই আবেদন করে যে তার বংশপরিচয় মাথায় রেখে তাকে যথাযোগ্য বাসস্থান দেওয়ার বন্দোবস্ত করুক ভারত সরকার। এমনকি বিদেশের পত্রিকাতেও ছাপা হল, অউধের শেষ নবাবের বংশধর অসহায় অবস্থায় রাত কাটাচ্ছেন রেলওয়ে স্টেশনে। সেই সময়েও তৎকালীন প্রাক্তন রাজা নবাবরা ভরণপোষণের জন্য প্রিভি পার্স পেতেন সরকার থেকে। সেটা ইন্দিরা গান্ধী বন্ধ করেন ১৯৭১ সালে। অউধের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শা- একলক্ষ টাকা মাসিক ভাতা পেতেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে। তার বংশধরের এই করুণ পরিনতি। এদিকে অউধের নবাব পরিবার শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলিম। লক্ষৌতে কয়েক লক্ষ শিয়া মুসলিমের বাস। তারাও উইলিয়াৎ বেগমের প্রতি সহানুভূতিশীল। দেশ বিদেশ থেকে চিঠির বন্যা বয়ে গেল। ব্যাপারটার গুরুত্ব অনুভব করে ইন্দিরা গান্ধী সশরীরে উপস্থিত হলেন উইলিয়াৎ বেগমের কাছে। বেগমের দাবী লক্ষৌতে তার পুস্তানি সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া হোক অথবা দিল্লিতে কোন নবাব পরিবারের যোগ্য বাসস্থান দেওয়া হোক। শুরু হল সরকার পক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ

মালচা মহল -দিল্লির রিজ এরিয়াতে
বেগম উইলিয়াৎ - স্বপ্নের জগতে
HT পেপারের ক্লিপিং


পর্ব

অবশেষে ১৯৮০ সালে উইলিয়াৎ বেগম সপরিবারে স্থান নিলেন চৌদ্দশ শতকে তৈরী ভগ্নপ্রায় জনমানবহীন মালচা মহলে। প্রদীপের তলায় অন্ধকারের মত দিল্লির সবচেয়ে রইস জায়গা রায়সিনা হিলের পিছনে ঘন জঙ্গলের মাঝে এই ভূতূড়ে প্রসাদ। দরজা-জানলা নেই। গোটা পাঁচেক ঘর। জল নেই, লাইট নেই, অধুনিক জীবনযাত্রার উপকরন শূন্য, কিন্তু সাড়ে ছয়শত বছরের পুরানো প্রাসাদে থাকা এরিস্টোক্র্যাসির চূড়ান্ত নিদর্শন। বছর গড়িয়ে যায়। ১৯৯২ সালে মৃত্যু ঘটে উইলিয়াৎ বেগমের। তিনি সুইসাইড করেন। রূপকথার ঝলমলে জীবনের মত তার জীবনের যবনিকাপাতও এক অনন্যসাধারণ সুইসাইড পদ্ধতির মাধ্যমে যা তার নবাবী লিনিয়েজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী উইলিয়াৎ বেগম বিষের সঙ্গে ডায়মন্ড পার্ল চূর্ণ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কারণ হিসাবে তার ছেলে জানান যে তার মা ভারত সরকার ব্রিটিশ সরকারের অবহেলা বঞ্চনার শিকার এবং এর প্রতিবাদস্বরূপ তার আত্মহত্যা। এর আগে তার নেপালী চাকরের দল বিদায় নিয়েছে, নবাবী শৌখিনতা তলানিতে কারণ অর্থাভাব, নামে নবাব হলেও তালপুকুরে আজ আর ঘটি ডোবে না। উইলিয়াৎ বেগমের ছেলে নিজেকে পরিচয় দেন প্রিন্স সাইরাস বলে। মায়ের সুযোগ্য পুত্র প্রিন্স সাইরাস। তিনি নিয়ম করে বছরে একবার কোন বিদেশী জার্নালিস্টকে ডাকেন। নানা জার্নালে তার রহস্যময় জীবনকাহিনী ছাপা হয়। পরিচিতি পানজাঙ্গল প্রিন্সনামে। মালচা মহলের দৈন্যদশা আরো প্রকট রূপে দেখা দেয়। প্রিন্স নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন পারিপার্শিক ঘটনাবলী থেকে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটি মাত্র গাড়ী চলার রাস্তা। রাস্তাটা শেষ হয়েছে ইসরোর এক আর্থ সেন্টারের মাঝে। সেখান থেকে কিছুদূরে জঙ্গলের মধ্যে মালচা মহল। প্রিন্স সাইরাসের বর্হিবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ ইসরোর নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে। ২০১৬ সালে তার পরিচিতি ঘটে এলেন ব্যারী নাম্নী এক পত্রকারের সঙ্গে।ততদিনে প্রিন্স আলি রাজার বোন শাকিরা বেগম গত হয়েছেন। ম্যাডাম ব্যারী   বছর দেড়েক দিল্লি থাকাকালীন, বেশ কয়েকবার দেখা করেন প্রিন্স আলি রাজা অথবা সাইরাসের সঙ্গে। ২০১৭ সালে, ইসরোর গার্ডরা, প্রিন্সকে দেখতে না পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে প্রিন্স সাইরাস এর মৃতদেহ উদ্ধার করে। মৃত্যুর কারণ খুব সম্ভবত ডেঙ্গু।

 ঘটনাটা এই বলে শেষ করতে পারলে ভাল লাগত যে পারসিয়ান নোবেলিটির অরিজিনের বংশ যারা এককালে উত্তর-মধ্যা ভারতের অনেকটা জায়গা জুড়ে শাসন করেছিল তার টিমটিম করে জ্বলা শেষ সলতেটি উপেক্ষা অবহেলার মধ্যে দিয়ে নিবে গেল লোকচক্ষুর অন্তরালে।


ঘটনাটির এন্ট্যিক্লাইম্যাক্স এর পরবর্তী সময়ে। এলেন ব্যারী বলে যে জার্নালিস্টের সঙ্গে সাইরাসের অন্তিম পনের মাসের পরিচয় হয়েছিল, সেই ম্যাডাম ব্যারী দিল্লি এসেছিলেন একটা এস্যাইনমেন্ট নিঁয়ে। সাইরাসের মৃত্যুর মাস তিনেক আগে তিনি আবার অন্য জায়গাতে চলে যান পোস্টিং নিয়ে। অউধের শেষ বংশধরের কাহিনী তখন পুরানো দিল্লি কি লক্ষৌর মুসলিম সমাজে রহস্য মন্ডিত এক গল্পগাথা, ব্যারী নিজেরও জার্নালিস্ট হিসাবে সাইরাস কাহিনী তার কাছে খুব ফ্যাশিনেটিং মনে হয়েছিল। ব্যারীর মনে পড়ল, এক আগে জীবিত অবস্থায়, সাইরাসকে তিনি কিছু সিম্পল প্রশ্ন করেছিলেন, যার সদুত্তর পান নি। যেমন তার জন্মস্থান কোথায়, ছোটবেলায় কোথায় পড়াশুনা করেছেন বা তার পিতা কি করতেন অথবা বেগম উইলিয়াৎ মৃত্যুর আগে কি করে ডায়মন্ড চূর্ণ বানিয়েছিলেন। ব্যারীর মনে হল পুরো ঘটনাটা নিয়ে একটা  ইলভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করা যাক। সেইমত সাইরাসের মৃত্যুর কিছুদিন পরে তিনি আবার দিল্লি এলেন। গন্তব্য সেই মালচা মহল। উদ্দেশ্য সাইরাসের রেখে যাওয়া জিনিসপত্র থেকে কিছু খবর যোগাড় করা যায়। 

ক্রমশঃ


বেগম উইলিয়াৎ লক্ষৌতে 

নিউ দিল্লি স্টেশনের সেই ভি আই পি গেস্ট হাউস


        মালচা মহলে ভিতরে- দৈন্যদশা 
প্রিন্স সাইরাস ও সাকিরা রিজের জঙ্গলে
        নিউ দিল্লি গেস্ট হাউসের ভিতরে



পর্ব

মালচা মহল তখন হন্টেড হাউস। মহলের চারিপাশে আগাছার জংগল, জনমানবহীন। ম্যাডাম ব্যারী ঢুকে খোঁজাখুজি শুরু করে দিলেন। অযত্নে লালিত কার্পেটের পাশে রাখা একটা ব্যাগের মধ্যে থেকে উদ্ধার হল কিছু কাগজ। তার মধ্যে আনেকগুলি ছিল মানি ট্রান্সফারের রিসিট। জনৈক সইদ নিয়ম করে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ানের মাধ্যমে টাকা পাঠাতেন। সইদের ঠিকানা ছিল- বেডফোর্ড, ইংল্যান্ড। আরেকটি চিঠি পাওয়া গেল। ২০০৬ সালে লেখা সেই চিঠির সারাংশ ছিল- প্রেরক, যিনি এতদিন টাকা পাঠাতেন, তার বয়স হয়েছে, আয় নেই, সাইরাসকে অনুরোধ করেছেন- সে যেন নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে। এরপর এলেন ব্যারী গেলেন লক্ষৌ। সেখানের শিয়া সমাজও বিশ্বাস করে না উইলিয়াৎের কোন যোগসূত্র আছে, লক্ষৌর নবাব পরিবারের সাথে। লক্ষৌর শেষ নবাব ওয়াজেদ আলিকে ইংরেজরা নির্বাসন দিয়েছিল কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। পুরো নবাব পরিবার তার সাথে নেটিয়াবুরুজ গিয়েছিল। তাদের বংশজরাও উইলিয়াৎের  নবাব পরিবারের সাথে সম্পর্কের কোন হদিশ দিতে পারলেন না। ম্যাডাম ব্যারীর শেষ গন্তব্যস্থল হল ব্রেডফোর্ড। এখানেই হল সমস্ত রহস্যের পর্দাফাঁস। লন্ডন থেকে ট্রেনে ব্রেডফোর্ড স্টেশনে নেমে পৌঁছালেন পাথরের তৈরী এক সাধারণ বাড়ীর ভিতর। বেল বাজাতেই যে অশিতীপর বৃদ্ধ ভদ্রলোক দরজা খুলে ওয়েলকাম জানালেন, তার চেহারার হাই চিকবোন আর টিকালো নাক, অবিকল মিলে যায় সাইরাসের সঙ্গে। উইলিয়াৎ বেগম,প্রিন্স আলি রাজা আর প্রিন্সেস সাকিনার অসল পরিচয় পাওয়া গেল। নবাব বংশের সঙ্গে এদের কোন সম্পর্ক নেই। সোজা বাংলায় এরা ইমপস্টার বা জালিয়াত। সইদ জানালেন সাইরাস তার ছোট ভাই। তার বাবার নাম ইনায়তুল্লা বাট। ৪৭ সালে তিনি ছিলেন লক্ষৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর লক্ষৌর অনেক মুসলিম পরিবার চলে যাচ্ছে পাকিস্থানে। শিক্ষিত মুসলিমদের পাকিস্থান সরকার ডেকে চাকরী দিচ্ছে। উইলিয়াৎ ছিলেন সাধারণ গৃহবধূ। কিন্তু লক্ষৌর প্রতি তার টান অপরিসীম। লক্ষৌ ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। ইনায়তুল্লাও ভাল চাকরী করেন এদেশে, তিনিও নূতন দেশে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু বিধি বাম। এক বিকালে বাড়ী আসার পথে, কট্টর হিন্দুদের কাছে মার খেলেন। অগত্যা পুরো পরিবার পাড়ি দিল পাকিস্থানে। সেখানে ইনায়তুল্লা সিভিল এভিয়েশন ডিপার্টমেন্টে ভাল চাকরী পেলেন। কিন্তু সুখের দিন বেশী টিকল না। এনায়তুল্লা হঠাৎ করে মারা গেলেন। উইলিয়াৎ লক্ষৌ যাওয়ার জন্য পাগল। তার মাথার গন্ডোগোল দেখা দিল। কিছুদিনের জন্য স্থান হল মেন্টাল এস্যাইসামে। শক থেরাপিও চল্ল। ছাড়া পেয়ে এক কান্ড ঘটিয়ে ফেল্লেন। অভিযোগ জানাতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী কে চড় মেরে বসলেন। ওভার নাইটে পাকিস্তান সরকারের সহানুভূতি পরিণত হল ঘৃণায়। উইলিয়াৎ তার ছেলে মেয়েদের নিয়ে পালিয়ে আসেন ভারতীয় কাশ্মীরে। সইদ চৌদ্দ বছর বয়েসে ঘর ছেড়ে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। বেডফোর্ডেই এক ফাউন্ড্রীশপে চাকরী করতেন। এর পরের ঘটনাবলী আগেই জানিয়েছি। 

আশ্চর্যের ব্যাপার হল উইলিয়াৎ যে এতবড় একটা ফ্রড করলেন, সরকার থেকে তার আসল পরিচয়ের ব্যাপারে কোন খোঁজ খবর নেওয়া হল না? গভর্নমেন্ট চাইলেই অতি সহজেই তার আসল পরিচয় বার করতে পারত। আসলে এটাই মনুষ্যচরিত্রধোঁকাটা যত বড় মাপের হয়, ততই তার গ্রহন যোগ্যতা বাড়ে। মনে আছে তো সেই গনেশের দুধ খাওয়ার কথা? সেদিন অনেক অবিশ্বাসীও মনে করেছিলেন ঘটনাটা সত্যি। কিছুদিন আগে এরকম আরেকটা ঘটনা শুনেছিলাম। রাশিয়ার জার নিকোলাসকে তার স্ত্রী পাঁচ ছেলে মেয়েকে গুলি করে বলশেভিক পার্টির লোকেরা মেরে ফেলে। এর বেশ কিছু বছর পরে এক মহিলা জার্মানিতে এসে নিজেকে জারের মেয়ে বলে পরিচয় দেন। তিনি শুট আউটে বেঁচে যাওয়ার কারণ হিসাবে জানান, পুরো পরিবারকে একটা রুমে নিয়ে যখন গুলি করা হয়, তখন তিনি জামার নিচে একটা ভেস্ট পরেছিলেন। তার মধ্যে রাজপরিবারের সব ডায়মন্ড লুকান ছিল। তাই গুলি তার দেহে প্রবেশ করে নি।  পরে অবশ্য সত্যতা যাচাই করা হয় এবং ঘটনাটা ফেক বলে জানা যায়। অবশ্য ততদিনে তার ক্লেম সংবাদপত্রের মাধ্যমে চারিদিকে ছড়িয়ে গিয়েছ। 

পাঁচ বছর ধরে মালচা মহল ভগ্নদশা নিয়ে বিদ্যমান। দিল্লি সরকার উদ্যোগ নিয়েছে মালচা মহল রেস্টোরেশনের। অদূর ভবিষ্যতে দিল্লীর দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে জায়গা করে নেবে সুলতানেট পিরিয়ডে তৈরী এই মহলটি। ইতিহাস বদলাতে থাকে, রেখে যায় কিছু গল্পগাথা।

দেবদত্ত 

২৯/০৪/২২









Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments