মেছো গল্প (রম্যরচনা)


পর্ব
 ১
সেদিন সকাল সকাল কলেজের এক বন্ধুর ফোন। উত্তেজিত গলায় জানালখবর শুনেছিস, সি আর পার্কের মাছের বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু প্রবীর এখন থাকে গুরগাঁওতে। বছর দশ বার আগেও আমরা নমাসে ছমাসে সি আর পার্কে মিলতাম, উদ্দেশ্য নির্ভেজাল আড্ডা, ডিমের ডেভিল সহযোগে, সময় থাকলে কালীবাড়ীতে একটু মাথা ঠেকান। মুখ্য উদ্দেশ্য মাছ মিস্টি কেনা। কলকাতার এচোড় বা থোড়ও কখনও সখনও লিস্টে থাকত। আমি জিজ্ঞাসা করলামকি কান্ড, এরকমটা হল কি করে?” বন্ধু জানালকাগজে পড়লাম। এখনও হয় নি। সিভিক বডি বলছে, একে তো আনহাইজিনিক কন্ডিশন, তার উপরে মাছওয়ালাদের লাইসেন্স নেই।বল্লাম- “এটা কি দারুর দোকান, লাইসেন্স কেন? আর মাছের বাজারে কি ধূপ-ধূনোর গন্ধ থাকবে? মেছো গন্ধ না পেলে কি মাছ কিনে মজা হবে? মাছ কাটার পর তাজা রক্ত বেরোবে, তবেই না বুঝব টাটকা মাছ?” বন্ধু একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বল্ল-“ সব কি আর রাজমা/ছোলে- চাউল খাওয়া পার্টি বুঝবে। পার্শে, তোপসে, শিঙ্গি, মাগুরের মাহাত্ব্য কদর বাঙালীরাই জানে।গুরগাওতে ভালই মাছ পাওয়া যায়, তাই বন্ধুটির মাথাব্যাথা কম। 

কিন্তু আমার আবার সিআর পার্কের প্রতি আলাদা টান। প্রায় চল্লিশ বছর আগে পাড়ায় আমার বাস ছিল। দশ বছর কাটিয়েছি। সেই সময়ে মাছ-মুর্গা মান্ডি ছিল জামা মসজিদের পাশে। বদরপুরে ট্রেনিং করার সময়ও মাছ-ভাত খেতে সি আর পার্ক মার্কেট টু তে কেষ্টর দোকানে আসতাম। বদরপুর থেকে মথুরা রোড দিয়ে দুটো ডিটিসি বাস চলত। ৪০৫ যেত ওল্ড দিল্লি আর ৪১৫ লাজপত নগর যেত। তখনও সরিতা বিহার হয় নি। লাজপতনগর থেকে এম১৩ ধরতাম। মাছ-ভাতের জন্য যাতায়তে দুই ঘন্টার ধাক্কা। ৮৩র নভেম্বর থেকে সিআর পার্ক ব্লকে থাকতে শুরু করলাম। তখন মার্কেট এর মাছের বাজারটা ছিল রাস্তার পাশের অস্থায়ী দোকানগুলোর পাশ দিয়ে, ট্যাক্সি স্ট্যান্ডএর পিছন দিকে। রাস্তা থেকে দেখা যেত না। রুই, কাতলা, কালবোস, আর এবং পাবদা মাছই বেশী থাকত। কলকাতার মত মাছের ভ্যারাইটি নেই বলে আমরা হাহুতাশ করতাম। বাজারের মাঝখানে বেশ কিছুটা খোলা জায়গা, স্টলগুলো সব অস্থায়ী, বাঁশের খুঁটি দিয়ে মাথায় ম্যারাপ বা টিনের চাল। 

কালকাজি এক্সটেনশনে আমার আরেক পরিচিত প্রবালের বাস। জায়গাটা সিআর পার্কের পাশে। তাই মাছ কেনে সি আর পার্ক মার্কেট টু থেকে। প্রসঙ্গত বলি সি আর পার্কে দুটো মাছের বাজার মার্কেট মার্কেট ২। আমি যখন থাকতাম মার্কেট ওয়ান ছিল মোর কসমোপলিটান, বাইরের জেনট্রি সাধারনত মার্কেট১ থেকে মাছ নিত, দামও একটু বেশী। এছাড়া আরেকটা কারণ হলমার্কেট২ এর মাছের বাজার রাস্তা থেকে দেখা যেত না, তাই লোকে ওর অস্তিত্ব কম জানত। প্রবালকে ফোন লাগালাম। একটু চাপা হাসি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম -“কি রে শুনছি মাছের বাজার নাকি বন্ধ হয়ে যাবে।চালাবি কি করেপ্রবাল অবশ্য খুবই পজিটিভ। বল্ল - “আরে ধূর, রকম মাঝে মাঝে ভয় দেখায়। ওসব দোকানগুলো তো এমসিডি এল্যট করে দিয়েছে, বাপের জমিদারী আর কি! বড় জোর দুই একদিন বন্ধ থাকবে, পরে যে এমসিডি ইউনিফিকেশনের পর ভোট হবে, তখন খুলে যাবে।

এরপরের ফোন লাল্টুকে। সিআর পার্কে আমাদের একটা ক্লাব ছিল, নামসাংস্কৃতিকী লাল্টু তার মেম্বার ছিল।লাল সেলামভক্ত। লালকূয়ার কাছে ডিডিএ ফ্ল্যটে থাকে। ফিস মার্কেটের হাল-হকিকৎ জানতে চাইলাম। লাল্টুর গলার স্বর উত্তেজিত-“ব্যাটারা ভেবেছে কি? এই রাম নবমীতে মাছ- মাংসের দোকান বন্ধ করে ছেড়েছে, এবারে পার্মানেন্ট ক্লোসার নোটিশ। ইপিডিপি এসোশিয়েশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা হয়েছে। গন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মাছওয়ালা গুলোকে বলব, তোরা ফেস্টুন নিয়ে যন্তর মন্তরে আন্দোলনের রাস্তায় হাট তারপর একটু হতাশ গলায় বল্ল-“বুঝলি তো, বাঙালিদের প্রবলেম আছে, কলকাতার চ্যাটচ্যাটে ঘামের সঙ্গে মিটিং মিছিল, ‘পোতিবাদেরএকটা পজিটিভ কানেকশন আছে, নিজভূমে সাহসী, দিল্লির শুকনো গরমে এসে কেমন ভেজা ন্যাতাকানি হয়ে যায়, শুনেছিলাম সিন্ধ্রি আর পাঞ্জাবীর পর বাঙালিরাই নাকি থার্ড লারজেস্ট পপুলেশন, কিন্তু ইউনিটিতে ঢু ঢু।” 

ক্রমশঃ


পর্ব

যাক পরের ফোন শুভজিতকে। আমার থেকে বছর দশেকের ছোট। আইটি কোম্পানিতে আছে। বেশ তরক্কি করেছে। কথাবার্তায় চৌখশ, আমাকে অবশ্য দাদা দাদা করে খুব। ওকে ফোন লাগালাম। কি ব্যাপার ভায়াশুনেছি মাছের বাজার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শুভজিত বল্লআরে দাদা, এখন হচ্ছে অন লাইন শপিং এর যুগ। আলরেডি ননভেজ প্রোডাক্ট এর এ্যপ - “ফ্রেশ টু হোম”, “লিসিয়াস”, “জাস্ট মাই রুটস”- এসে গিয়েছে। দাম একটু বেশী, তবে বাজারে যাওয়ার হ্যাপা নেই আমি কিন্তু কিন্তু করে একটু সন্দেহ প্রকাশ করলাম-“ভাইটি, মাছ জিনিষটা কি না দেখে কেনা উচিত। ছোটবেলায় বাবা চিনিয়েছিল, মাছের কানকো-টা লাল কিনা দেখতে, মাছের পেট টা টিপে দেখতে, মাছ কাটার পর পেটের তেলটা সাদা বেরোল কিনা দেখতে বা মাছের চোখের তাজা ভাবটা আছে কিনা দেখে নিতে। এগুলো মাছ চেনার টিপস। আর অন্যতম ব্যাপারটা হল শোসালাইজেশন। মাছের বাজারে ইনভ্যারিয়েবলি দুই একজন পরিচিত লোকের দেখা মিলবে এবং একটু খেজুরে গল্প হবে।শুভজিতের মর্ডান আউটলুক। বল্ল -“দাদা, আমার তো বিজনেসের একটা ভাল আইডিয়া মাথায় এসেছে।”  আজকাল রিটায়ার করার পর হাতে অফুরন্ত সময়। বিজনেস মানে সময়ও কাটবে আবার লক্ষীলাভও বটে। তবে বাঙালি বলে একটু আশংকা আছে গনেশ উল্টাবার। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-“দাও ভাই বিজনেস আইডিয়া দাও বল্ল দাদা মাছের বাজার বন্ধ হলে আপনি ইপিডিপি (ইস্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পার্সন) কলোনি (সিআর পার্কের আগের নাম) মত এফএমডিপি অর্থাৎ কিনা ফিস মার্কেট ডিসপ্লেসড পার্সন নামে একটা বিজনেস এনটিটি খুলুন। যে মাছওয়ালারা ইনকাম হারাচ্ছে, তাদের এমপ্লয়ি করে নেবেন, কারণ তারা মাছ কাটায় সিদ্ধহস্ত।ক্লাউড কিচেনশুনেছেন তো।আমি আগে কালবৈশাখী কি শরতের ক্লাউড ছাড়া কিছু জানতাম না, ইদানীং আই ফোনে মেসেজ আসে-“ ইয়োর আই ক্লাউড স্টোরেজ ইজ ফুল। বাই এক্সট্রা স্টোরেজ স্পেসবাইকে বাই বাই করে দেওয়াই শ্রেয়। তাই ক্লাউডে ডাউট রয়েই গিয়েছে। চিন্তিত মুখে শুধাইভাই, কিছু কেনাকাটি করতে হবে নাকি?” শুভজিত আশ্বস্ত কর-“না দাদা, আজকাল দেখছেন না লোকে ক্লাউড রেস্টুরেন্ট থেকে জমেটো, সুইগি দিয়ে খাবার আনাচ্ছে।জমেটো আমার খুব প্রিয়। গিন্নি মাঝে মাঝেই খাবার আনায়। খাবার এলেই আমার কাজ হচ্ছে ছবি এবং ডেসক্রিপশনের সঙ্গে খাবারটা মিলিয়ে নেওয়া। এইতো সেদিন হলদিরাম পাশবালিশ টাইপের গোলাপজামুনের বদলে গোল সাইজের দিয়েছিল। কমপ্লেন ঠুকতেই বিনাপয়সায় আরেকপ্রস্থ লম্বা গোলাপজামুন এসে গেল। একবার তো কলকাতা স্টাইলের বিরিয়ানীতে আলু নেই বলে পুরো পয়সা ফেরত পেলাম। বিনি পয়সার বিরিয়ানী অমৃতসমান লেগেছিল।  শুভজিত বল্ল -“ আজকাল কস্ট কাটিং খুব জরুরী বিজনেসে। রেস্টুরেন্ট ওনার রা বড় স্পেস নিয়ে পশ এরিয়াতে দোকান ভাড়া নিচ্ছে না। সিআর পার্কের কাছে জমরুদপুরে ঘর ভাড়া নিয়ে কিচেন খুলছে। ভাড়া ওয়ান ফোর্থ। আপনিও এরকম একটা স্পেস ভাড়া নিয়ে মাছের দোকান খুলুন। অর্ডার আসবে এ্যপস , এছাড়া পাশের রেস্টুরেন্টগুলোতেও সাপ্লাই করবেন। ভাল আইডিয়া দিলাম না? বল্লামএই বয়সে বিজনেসে নামতে গেলে ফুলপ্রুফ হয়ে নামতে হবে, আগেশার্ক ট্যাঙ্কশো টা থেকে পাস করিয়ে স্পনসর যোগাড় করে দাও।

এর পরের ফোনটা করা গেল আমারই এক সিনিয়ার দাদা এনটিপিসিরই, একসময় আমরা সি আর পার্কে থাকতাম। আমি নেহেরু প্লেসের অফিসে আর মুকুলদা বদরপুর প্ল্যান্টে শিফ্ট চার্চ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। একটু ভাবুক মানুষ। আজকাল আবার নব্য রামভক্ত। হৃষিকেশে যোগের ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। মুকুলদা শ্বশুরবাড়ী আবার সি আর পার্কে। ফোন করে একথা দুকথার পর বল্লামআরে মুকুলদা খবর শুনেছেন, বৌদির পাড়ায় মাছের দোকান উঠে যাচ্ছে। কি কান্ড বলুন তো!” মুকুলদা শান্ত স্বরে বল্লেনআরে বোঝো না কেন, এটাই হল যুগের ধর্ম, দ্যাখো না, চোখের সামনে আমাদের যৌবনের উপবন বদরপুর পাওয়ার স্টেশন এখন পাওয়ার লেস।আমাদের সময় রমরম করে চলত, দূর থেকে চিমনি দিয়ে বেশী ধূয়া বেরোলে বুঝতাম ভাল জেনারেশন হচ্ছে, এখন পলিউশনের ধাক্কায় প্ল্যান্টই বন্ধ। সেখানে নাকি পাপস্খালনের জন্য গ্রীনবেল্ট তৈরী হচ্ছে। সি আর পার্কের মাছের বাজার বন্ধের একটা কারণ তো পলিউশন। এককালে লোকে দূর দূর থেকে সিআর পার্কে মাছ কিনতে আসত। এখন সেটা বন্ধ হবে। ওই সরু রাস্তার দুদিকের গাড়ী সামলিয়ে শ্বশুরবাড়ী যেতে গলদঘর্ম হয়ে যাই। বাজারটা উঠে গেলে একটু হাঁফ ছেড়ে বাচব। আর অত মাছ খাওয়ার কি দরকার? পনির, দুধ, টাটকা শাকসব্জী খাও। শরীর গরম হবে না, আবার মনও প্রফুল্ল থাকবে।বুঝলামকারও পৌষমাস তো কারো সর্বনাশ মুকুলদাকে আর বেশী না ঘাটানো সমীচীন বলে মনে হল। 

গোড়ায় গলদবলে প্রবাদটা যে কত সত্যি সেটা সিআর পার্কের ফিস মার্কেটের রিনোভেশনের সময়টাতে টের পেয়েছিলাম। অস্থায়ী মার্কেটের দোকানগুলো ভেঙে দোতলা পাকা দোকানঘর হল। সেগুলো তাও চলেবল। কিন্তু মাছ বাজার করতে গিয়ে একদম ম্যাসাকার। যখন তৈরী হচ্ছিল, সেটা এই শতাব্দীর শুরুর দিকে, নিজেদের মধ্যে লোকাল লোকজন  বলাবলি করত এইটুকু জায়গাতে মাছের বাজার হয় নাকি, ঠিক করে দাঁড়াবার পর্যন্ত জায়গা নেই। তবে কড়োয়া সচ হল বাঙালির মধ্যে ইউনিটির অভাব। ফলে গোষ্ঠীগত ভাবে প্রকাশ্যে কোন প্রতিবাদ হয় নি। যার ফলস্বরুপ আজকের এই আনহাইজিনিক বাজার। পাঁচ ফিট বাই পাঁচ ফিটের দোকান। গায়ে গায়ে লাগান। যিনি ডিজাইন করেছিলেন, তিনি জীবনে কোনদিন মাছের বাজার দেখেছেন কিনা সন্দেহ। দুটো দোকানের মাঝে কোনমতে দুটো লোক চলতে পারে। মাছের জলের ছিটা গায় পড়বেই। সুবাসিত হয়ে বাড়ী ফিরবেন। মাছ কিনুন কি না কিনুনঘ্রানেনং অর্ধ ভোজনএর সুবন্দোবস্তো। 

কানে কানে জানাই, আমি অবশ্য মার্কেট বন্ধের গুজবে একটু মুচকি হাসি হেসে নিলাম। যখন দাদরীতে পোস্টেড ছিলাম, পঞ্চাশ কিলোমিটার ঠেঙিয়ে সি আর পার্কে মাছ, মিষ্টি কিনতে আসতাম। সঙ্গে আরেকটা কাজও সেরে নিতাম। সেটা হল লাইব্রেরি থেকে বাংলা বই নেওয়া। তিনটে মেম্বারশিপ ছিল, তাই তিনটে বই ইস্যু করাতাম। তখনও মোবাইলের যুগ আসে নি। রাতে আধাঘন্টা গল্পের বই পড়া একটা দৈনন্দিন অভ্যাস ছিল। সি আর পার্ককে নাকি দিল্লির মিনি বেঙ্গল বলা হয়। ভাবতে বেশ ভাল লাগল যে হয়ত এমনও দিন আসবে যখন সি আর পার্কের বাঙালি নয়ডাতে আসবে মাছ কিনতে। ব্রাত্য নয়ডা জাতে উঠবে।

দেবদত্ত 

১১/০৪/২২

Comments

  1. Contemporary unique presentation. Pradip da

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments