লাদাখ দেখে এলাম (০৩/০৫/২২- ০৯/০৫/২২)



পার্ট ১

সুযোগটা হঠাৎই এসে গেল। নিজে থেকে রিসার্চ করে টুর বানানোতে আমার অনীহা। বেশ কয়েকবার সব প্রোগ্রাম সেট করে, কোন কারণে সেটা ভেস্তে গিয়েছে। আমার কলেজের ক্লাসমেটের ফোন এল-“লাদাখ ট্যুরে ছয়জনের গ্রুপে একটা সিট খালি। একজন ভ্রমনপাগল লোক অনেক রিসার্চ করে ট্রিপটা বানিয়েছে। শ্রীনগর থেকে গাড়ীতে লে-লাদাখ হয়ে ব্যাক টু দিল্লি। কারগিলের যুদ্ধের কথা খুব মনে আছে। তোলালিং পিক, টাইগার হিল ইত্যাদি। ক্যাপ্টেন বিক্রম বাটরার বীরগাথা নিয়ে এই কিছুদিন আগে “শেরশা” সিনেমা দেখলাম। প্লেনে করে খালি লে গিয়ে লাদাখ দেখে ফিরে এলে কার্গিল মিস হয়ে যাবে। গ্রুপের ঘোরাঘুরিতে ব্যাকবেঞ্চার হওয়াটাই আমার পসন্দ। হোটেলের রুম ভাল না হলে চ্যাঁটামেচি করতে হবে না, সবাইকে সকালে ওঠানোর দায়িত্ব নেই, হিসাব রাখার মত কঠিন কাজ করতে হবে না, শুধু প্রাণ ভরে এনজয় কর। 

৩রা মে জার্নি শুরু, ৯ তারিখ ব্যাক। আমি যাব দিল্লি থেকে। বাকীরা আসছে কলকাতা থেকে। দিল্লিতে এবারে গরমে লোকের হাঁসফাঁস অবস্থা। সকাল নটায় শ্রীনগরের ফ্লাইট ল্যান্ড করার আগে দেখি বাদল মেঘের মধ্যে দিয়ে হাওয়াই জাহাজ ডিসেন্ড করছে, আর ভালই ঝাঁকুনি দিচ্ছে। বাইরে বেশ জোরে বৃষ্টি। ছাতা মাথায় দিয়ে গাড়ীতে উঠলাম আমরা চারজন, আমি, বন্ধু শিবু ও তার মেয়ে তন্বী, এবং আমাদের কান্ডারী ও ক্যাপ্টেন সৌরভ। বাকী দুই মেম্বার সৈকত ও তার স্ত্রী রেশমী দুদিন আগেই এসেছে। মাসখানেক আগে, এপ্রিলের গোড়ায় আমার কয়েকজন বন্ধু এসেছিল কাশ্মীর ট্রিপে। ওরা নাকি বেশ রোদ ও গরম পেয়েছিল। তখন টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল চলছিল।

মেঘলা আকাশে পাহাড়ের সৌন্দর্য আরো বেশী আকর্ষনীয়। ট্যুরের সূচী অনুযায়ী সৈকতদের ডাল লেক থেকে সোজা এয়ারপোর্ট আসার কথা ছিল। তারপর সেখান থেকে সোজা ইনোভা গাড়ীতে কার্গিলে নাইট স্টে। এয়ারপোর্ট থেকে কার্গিলের রাস্তা সিটির উল্টোদিকে। আমি আগে শ্রীনগর দেখি নি। তাই শ্রীনগরে ঢোকা হবে না জেনে মনটা একটু খুঁতখুঁত করছিল। কিন্তু শুনলাম প্রোগ্রামে চেঞ্জ হয়েছে। যে গাড়ী আমাদের কার্গিল নিয়ে যাবে, সেটা আছে ডাল লেকে। তাই আমরা যাচ্ছি ডাল লেক। একেই বলে ভাগ্য। এয়ারপোর্ট থেকে ডাল লেক বিশ কিলোমিটার। বেশীরভাগ বাড়ীর ঢালু ছাদগুলো সবুজ রংএর। আজ আবার ইদ। ড্রাইভার আমারই বয়সী। একটা জায়গা দেখিয়ে বল্লেন এটা হল মেন মার্কেট এরিয়া। নাম লালবাগ। ইদ বলে সব দোকান বন্ধ। লম্বা একটা রাস্তার একধারে শুরু ডাললেকের। রাস্তার পাশে একটু দূরে দূরে বাঁধানো ঘাট। প্রায় শ-দুশ মিটার দূরে সেই ফেমাস হাউসবোট সার সার দিয়ে বাঁধা। একটু পরে শিকারা করে সস্ত্রীক সৈকতের আগমন। ততক্ষণে আমার ফটোগ্রাফি শেষ। ইনোভা গাড়ীতে আমরা ছয়জন। মালপত্র সব উপরের লাগেজ ক্যারিয়ারে বাঁধা।  শ্রীনগরকে বুড়িছোয়া করে গাড়ী চল্ল কার্গিলের রাস্তায়। পথে পড়বে শোনমার্গ। মাঝামাঝি এক জায়গায় হল টি ব্রেক। চায়ের বদলে কাওয়া বলে একটা লোকাল ড্রিঙ্ক খেলাম। মশালা, মধু দিয়ে তৈরী। ভালই লাগল। রাস্তার পাশ দিয়ে আমাদের সর্বক্ষনের সঙ্গী সিন্দ নদী। স্বচ্ছ জল উপল খন্ডে বাঁধা পেয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেছে। চারিপাশের উঁচু পাহাড়ের গায়ে ঘন সবুজ চিনার, পপলার, ফার, সেডার, পাইন, দেওদারের সমারোহ। এত সবুজ পাহাড় উত্তরাখন্ডেও আছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। প্রকৃতি তার রূপের ডালি অকৃপণ হাতে সাজিয়ে দিয়েছেন এখানে, তাই নাম তার ভূস্বর্গ।
ক্রমশঃ

ডাল লেক, not at all dull !

শোনমার্গের রাস্তায়

এই রাস্তার বামদিকে ডাল লেকের শুরু

শোনমার্গের রাস্তায়

পর্ব ২

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে পৌছে গেলাম শোনমার্গ। ভ্যালির বুক চিরে চলে গিয়েছে হাইওয়ে। দুপাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। আকাশটা মেঘলা। মেঘের ছাওয়ায় খোলা প্রান্তরের রূপের খোলতাই। টুরিস্টের ভীড়ে জায়গাটা সরগরম। করোনার পর সমতলের লোকেরা ভীড় করেছে। সহিসরা খচ্চর নিয়ে রেডি। এক সহিস জানাল,রাজি, আইয়ারি, ফিতুর, বজরঙ্গ ভাইজান -এইসব ব্লক বাস্টার ছবির শুটিং হয়েছে এখানে। পাঁচ কিমি দূরে ঘোড়ায় চড়িয়ে নিয়ে যাবে ও নিয়ে আসবে, দর হাঁকল ৩০০০ টাকা। আমরা যাচ্ছি কার্গিল। হাতে সময় কম। মনের কোণে শোনমার্গের পলকের স্মৃতি চালান করে গাড়ীতে উঠে পড়লাম। এরপর আসবে জোজিলা পাস। শীতের সময়টা বন্ধ থাকে। অর্থাৎ সড়কপথে শ্রীনগর লে যোগাযোগ বন্ধ। গাড়ী মাঝে মাঝে আটকে দিচ্ছে পুলিশ। শুধু আমরা নয়, সব গাড়ী। ভাসা ভাসা জবাব পেলাম-“আগে ল্যান্ড স্লাইড হ্যায়, টাইম লাগেগা। খটকা একটু লেগেছিল, কারণ চাকরীসূত্রে যোশীমঠে থাকার সময় স্লাইডে মাঝে মাঝে রাস্তা বন্ধ হত, গাড়ী থেকেই দেখতে পেতাম জেসিবি রাস্তা পরিষ্কার করছে। এখানে তিনবার আটকাল, কিন্তু স্লাইড কোথায় হয়েছে কেউ জানে না। উপর থেকে একটা ট্রাক আসছিল, সে আসছে দ্রাস থেকে সেও বল্ল কোথাও স্লাইড নেই। অনেক পরে জানলাম পাঞ্জাব পুলিশের ডিজি আসছেন।তার রাস্তা ক্লিয়ার রাখতে আম আদমির ভোগান্তি। ঘন্টা খানেক পর এসে গেল ১১৫০০ ফিট উঁচুতে অবস্থিত জোজিলা পাশ। আমরা ঢুকে পড়েছি লাদাকে। প্রায় ৪৫ মিনিট লাগল জোজিলা পেরোতে। এখনও অনেক জায়গায় বরফ জমে। রাস্তায় বড় বড় গাড্ডা। চারিদিকে বরফের পাহাড়। নয়নাভিরাম শোভা। পিকগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। জোজিলা পাসের রাস্তাটুকু বাদ দিলে শ্রীনগর-লাদাখ হাইওয়ে, যে কোন এক্সপ্রেস ওয়েকে টেক্কা দেবে। ৪৫০ কিলোমিটার লম্বা এই রাস্তায় গাড়ী চলবে ৮০-১০০ স্পীডে। হেয়ার পিন বেন্ড তুলনামূলক ভাবে কম। 
চারটে নাগাদ পৌছে গেলাম দ্রাসে। ছোট্ট শহর, সমতল ভূমির মধ্যে দিয়ে সোজা রাস্তা। ছোট্ট শহর ও মার্কেট। দ্রাস বিখ্যাত অন্য কারণে। পৃথিবীর শীতলতম বসবাসকারী জায়গার মধ্যে একটি। শীতকালে তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের ৬০ ডিগ্রি নীচে। আমাদের লাদাখ পর্যায়ের ড্রাইভার জামাল এর বাড়ী দ্রাসে। ওর কাছে শুনলাম, আজকাল ওর গ্রামের লোকেরা শীতকালে জম্মু চলে যায়। তার আগে ওরা যখন শীতে থাকত, সারা বছর ধরে কাঠ সংগ্রহ করত কয়েক মন, ঘর গরম ও রান্নার কাজে লাগত। খাবার বলতে ভাত, ডাল ও আলু। আসার সময় দেখলাম জোজিলা টানেলের কাজ চলছে জোর কদমে। এই চোদ্দ কিমি লম্বা টানেল তৈরী হলে শ্রীনগর-লে র সড়কপথে সময় কমবে তিনঘন্টা আর রাস্তা হবে অল ওয়েদার। লাদাখস্থিত দ্রাস-কার্গিলে শীতে স্থানীয় জনসাধারণ এর অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের যোগান সুগম হবে। খালি হিমালয়ের সৌন্দর্যপিপাসু ভ্রমনার্থীরা হারাবেন জোজিলা পাসের ভয়াল সৌন্দর্যের আস্বাদ। 
ক্রমশঃ


রাস্তায় আটকে। ভিআইপি যাবেন।আমি এএ (আম আদমী)। একটু পরেই জোজিলা পাস

শোনমার্গে কিছুক্ষণ

জোজিলাতে সফর সঙ্গী দের সাথে

পর্ব ৩

দ্রাস শহর থেকে একটু ছাড়িয়ে পাঁচ কিমি দূরে হাইওয়ের ঠিক পাশেই সমতলভূমির অনেকটা জায়গা জুড়ে ২০১৪ সালে তৈরী কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল। যদিও “কার্গিল” নাম দেওয়া হয়েছে , আসল যুদ্ধটা হয়েছিল দ্রাস আর বাটালিক সেক্টরে। ১৯৯৮ এর শীতে পাকিস্থানিরা আশপাশের উঁচু পাহাড়গুলিতে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। ১৯৯৯ এর সামারে ক্যাপ্টেন সৌরভ কালিয়ার মৃতদেহ পাওয়ার পর ভারতীয় ফৌজ জানতে পারে শত্রুপক্ষের উপস্থিতি। তারপরের ঘটনা ভারতীয় সেনাবাহিনীর শৌর্যের ইতিহাস। “অপারেশন বিজয়” নামক দুই মাসের যুদ্ধে ভারত আবার পাক ফৌজকে হটিয়ে দেয়। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ শত্রুপক্ষ ছিল পাহাড়ের উপর, পদাতিক যুদ্ধে যেটা ভারতীয় সেনার কাছে হ্যান্ডিক্যাপ ছিল। 
মেমোরিয়াল দেখতে কোন টিকিট লাগে না। গেট থেকে প্রায় দুইশত মিটার সোজা রাস্তা শেষ হয়েছে ওয়ার মেমোরিয়ালে। বিশাল ফলকে লেখা শহীদদের নাম। পিছনে বিশাল তিরঙ্গা ফ্ল্যাগ। একটু দূরে পাহাড়ের সারি। রাস্তার দুইপাশে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন যে বীর সৈনিকরা, তাদের মর্মর মূর্তি, নীচে ছোট্ট করে তাদের পরাক্রমের ইতিহাস লেখা। চারিদিকে অনেকটা জায়গা জুড়ে লন। পাহাড়ে ধূলোবালি থাকে না, তাই চারিপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ নির্মল। টুরিস্টও অল্পস্বল্প। যুদ্ধে যেসব কামান, প্লেন ব্যবহার করা হয়েছে, লনে তাদেরকে রাখা হয়েছে। বফর্স কামান, মিগ২১ যুদ্ধ জাহাজ ও আরো কিছু অপেক্ষাকৃত ছোট কামান। একটা ছোট কার্গিল ওয়ার ডকুমেন্টারি দেখান হল আর্মির পক্ষ থেকে। একটা স্মারক ম্যাগনেট কিনলাম ফ্রীজের গায়ে লাগাব বলে। বাড়ীতে স্যুভেনির রাখার জায়গার অভাব, তাই ফ্রীজের ওয়াল সেই শূন্যস্থান পূর্ণ করছে। নিয়ে যেতেও সুবিধে। লাঞ্চ হয় নি, তাই রাস্তার উল্টোদিকের ছোট একটা দোকানে ঢোকা হল। পাহাড়ে টুরিস্টদের জন্য ম্যাগি প্রচন্ড হিট। হাইজিনিক, শস্তা, চটজলদি ও ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য নাম্বার ওয়ান। বাঙ্গালী রসনায় অবশ্য সঙ্গে একটু পেয়াজ ও অমলেট মাস্ট।  খেয়ে-দেয়ে বাইরে বেরিয়ে একজন লোকালকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তোলালিং পিকটা ওয়ার মেমোরিয়ালের ঠিক পিছনের চূড়াটা, বাদিক ঘেসে একটু দূরে টাইগার হিল আর তার একটু পাশেই পয়েন্ট ৪৮৭৫ পিক যার নূতন নামকরণ হয়েছে বিক্রম বাটরা পিক। 
পশ্চিমের সূর্য হেলে পড়েছে, যদিও অন্ধকার হয় নি। এই সময়টাতে সাড়ে সাতটা নাগাদ অন্ধকার হয়। গাড়ী এগিয়ে চল্ল, কার্গিল শহর ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা। অন্ধকারে স্পিডোমিটারে চোখ গেল। ১১০ কিমি/ঘন্টায় চলছে। অবশ্য সব জায়গায় নয়। রাত আটটা নাগাদ পৌছে গেলাম হোটেল জোজিলাতে। বেশ সুন্দর একোমডেশন। রুম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে ডিনারের পালা। আমার রুমমেট ক্যাপ্টেন সৌরভ দত্তগুপ্ত। খোলা সুটকেসে দেখলাম জামা কাপড় প্রায় নেই। কলকাতার গরমে ওখান থেকেই জামা, জুতো, জ্যাকেট ও টুপি পরে প্লেনে উঠেছেন। শিবুর মুখে শুনেছি উনি গ্লোব ট্রটার। চেহারাটা অবশ্য সোনার কেল্লার গ্লোব ট্রটার কামু মুখার্জির মত লম্বা চওড়া নয়, একটু রবি ঘোষ টাইপের। রুমে ঢুকেই হিটারের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রত্যেক রুমেই সেন্ট্রালাইজড হিটিং, হাত দিয়ে বোঝা গেল চলছে না। রুম সার্ভিস পীড়াপীড়িতে কয়েল হিটার দিয়ে গেল। পরে জানলাম লাদাখের বড় হোটেলে হিটার থাকলেও সেটা শীতকালে চলে। এখনকার মিনিমাম ৫-৬ ডিগ্রি ওদের কাছে “গরমকাল”। প্লেনসের লোকেদের তো জবুথবু অবস্থা বিশেষত রাতে। দিনের বেলা অবশ্য দেখেছি সূর্যদেবের তেজস্বী রূপ। গায়ে লাগলে ছ্যাঁকা দেওয়ার অবস্থা। সূর্যের আলট্রা ভায়োলেট রে সোজা এসে পড়ে স্কিনে। সফর শেষে দেখলাম অনেকের ফর্সা স্কিন একটু কালো হয়েছে। 
ক্রমশঃ


কার্গিল ওয়ার মেমোরিয়াল

পিছনে বফর্স কামান

পর্ব ৪

সকালের আলোয় দেখলাম হোটেলের পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে সুরু নদী। জল সামান্য, চওড়া রিভার বেড উপলখন্ডে ভর্তি। এই নদীটা চলে গিয়েছে পাকিস্থানে, সেখানে মিলিত হয়েছে সিন্ধু নদীর সঙ্গে। চারিপাশের ন্যাড়া পাহাড়, এটাই লাদাখের বৈশিষ্ট। হোটেলের সামনের রাস্তাটা চলে গিয়েছে জাসকারের দিকে, আমাদের লে যাবার রাস্তাটা একটু পিছিয়ে নদীর উপরের ব্রীজ পেরিয়ে উত্তর পূর্ব দিকে। সবে ছটা বাজে। পায়ে হেটে বেরিয়ে পড়লাম শহরটাকে একটু দেখতে। মার্কেট এখনো খোলে নি। একটু এগিয়ে রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়েছে। মেন রাস্তাটা মার্কেটের দিকে, অন্যটা নদীর পাশ দিয়ে। একটি লোক বল্ল রাস্তা কিছুটা গিয়ে আবার একত্রিত হয়েছে। সোজা মার্কেটের রাস্তা ধরে গিয়ে নদীর পাড় দিয়ে ফিরব ঠিক করলাম। পথে একটি লোকাল লোকের সঙ্গে পরিচয় হল। লরীত খালাসীর কাজ করে। কার্গিল যুদ্ধের সময় নাকি ওদের প্রাইভেট ট্রাকে করে এম্যুনিশন আসত। জওয়ানরা নাকি বলত-“ভাগকে যাও, গোলা লেকে দৌড়কে আও”। ব্রেকফাস্ট সেরে নদীর পাশে ফটোগ্রাফি শেসন করে বেড়িয়ে পড়া গেল। আজকের গন্তব্য লে। আমাদের ড্রাইভার বদল হল। মাঝরাস্তায় পড়বে লামায়ারু মনস্ট্রি। নয়টা নাগাদ বেরিয়েছি। মাঝে আরেকটা ছোট মনিস্ট্রি পড়ল। সব মনিস্ট্রির বাইরে একটা গোলাকৃতি ঘূর্ণায়মান বস্তু। তাতে ধর্মসংক্রান্ত কিছু টিবেটিয়ান ভাষায় লেখা। এটাকে ধর্মচক্র বলে। একজনকে দেখলাম ঢোকার আগে সেটাকে ঘুরিয়ে ঢুকলেন। অনেকটা আমাদের ঘন্টা নাড়িয়ে মন্দিরে প্রবেশের মত। তবে ওদের ব্যাপারটা নিঃশব্দ। আমাদের ঠাকুর দেবতারা বোধহয় ঘুম কাতুরে, মন্ত্রধ্বনি কি ঘন্টার আওয়াজ না শুনলে তাঁরা প্রসন্ন হন না। সব মনিস্ট্রিতেই বাইরে লেখা দেখেছি নীরবতা রক্ষা করার আবেদন। 
বাইরে বেরিয়ে একটা দোকানে কাওয়া খাওয়া হল। একরকম লোকাল খাস্তা বিস্কুট জাতীয় জিনিষ এল। ভালই খেতে। চা তৈরীর ফাঁকে কাছেই একটা নির্মীয়মান বাড়ীতে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে বাক্যালাপের মাঝে জানলাম ওরা সব বিহারের।  শীতকালে বাড়ী যায়। জলের সাপ্লাই আসে পাহাড়ের গায়ে বানানো রিসার্ভার থেকে। বৃষ্টি বা বরফ গলা জল ধরে রাখা হয়।
চারিদিকে সুউচ্চ পর্বতশ্রেনী গাত্রে পাথরের নানা শেড। সূর্যের আলোয় ঠিকরাচ্ছে। পৌনে একটা নাগাদ পৌছে গেলাম লামায়ারু মনিস্ট্রি। দূর থেকে মনে হল মনিস্ট্রি ক্লিফ হ্যাঙ্গার। পাহাড়ের গা থেকে ঝুলছে। বন্ডের সিনেমার ক্লাইম্যাক্স সিনের শুটিংএর আদর্শস্থল।পৌঁছে শুনলাম মঠ খুলবে দেড়টাতে। অগত্যা লাঞ্চ করে নেওয়া সাব্যস্ত হল। আশপাশটা ঘুরে দেখলাম। পাহাড়ের গায়ে কিছু ছোট ছোট ঘর। দুই একজন লামাকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। খাবার জায়গার বাইরে কাচের গায়ে নানা ধরনের স্টিকার। আজকাল ইয়াং জেনারেশনের অনেক ছেলে মেয়ে বাইকে চড়ে লাদাখে আ্যডভেঞ্চার ট্যুরিজম করতে যায়। যৌবনের ধর্ম প্রকৃতির  বাধাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার। নমন করি তাদের সাহসকে। সেই বিভিন্ন বাইকার গ্রুপের স্টিকার লাগান রেস্টুরেন্টে ঢোকার মুখে কাচের দেওয়ালে। থুকপা বলে একটা লোকাল খাবার খেলাম। নুডলস, গ্রেভি, ডিম ও আরো কিছু শব্জী দিয়ে বানানো। এরপর মনিস্ট্রি দেখার পালা। এই জায়গার ল্যান্ডস্কেপ, অনেকটা চাঁদের প্রাকৃতিক জমির সঙ্গে মেলে, তাই একে মুনল্যান্ড-ও বলে।হাজার বছরের পুরানো এই মঠের অধীনে লোয়ার লাদাখের প্রায় পঞ্চাশটা মঠ আছে। মঠের শুরু টিবেটিয়ান ধর্মগুরু মহাসিদ্ধাচারিয়া নারোপা-র এখানে বসবাস কালে। প্রায় হাজার বছর আগের কথা। কথিত আছে পুরাকালে এখানে একটা লেক ছিল। নারোপা তার জল শুষে নেন এবং গুমফা ও সংল্গ্ন গ্রামের পত্তন করেন। রাস্তার পাশে দেওয়ালের গায়ে সারি সারি ধর্মচক্র অতিক্রম করে ঢোকা গেল ভিতরে। বড় একটি ঘরে দালাইলামার ফটো। দেওয়ালে অনেক ফ্রেসকো। কিছু টিপিক্যাল টিবেটিয়ান ছবি ও বিভিন্ন গুরুদের ছবি আঁকা। ব্যাকগ্রাউন্ড কালারটা লাল। এটা প্রায় সব গোম্পাতেই দেখলাম। বাইরে থেকে দেখলে অনেক বড় লাগে। বুঝলাম সাধারন দর্শকের বেশী কিছু দেখার অনুমতি নেই। তবে সত্যিকথা বলতে বাইরের থেকে স্টানিং ব্যাকগ্রাউন্ডে লামায়ুরুর দৃশ্য এককথায় অনবদ্য। আমরা দেখলাম দুপুর বেলায়। পড়ন্ত আলোয় বা ঊষার অরুনোদয়ে তার রূপের পসরা স্বর্গীয় অনুভূতির উদ্রেক করবে সেটা কল্পনা করতে এতটুকু অসুবিধা হল না। দেশী টুরিস্ট সার্কিটে এইসব জায়গা এখনো তার যথাযোগ্য মর্যাদা পায় নি। ইয়ুরু কাবগিয়াত বলে লামায়ুরুতে দুদিনের এক উৎসব হয়, সেটা হয় টিবেটিয়ান লুনার ক্যালেন্ডারের তিথি অনুযায়ী। তিব্বতি মুখোশ নৃত্য তার প্রধান আকর্ষণ। সারা পৃথিবী থেকে বৌদ্ধরা ভীড় করেন। 
ক্রমশঃ

কার্গিলে হোটেলের পিছনে সুরু নদী

কার্গিলে - উইলো গাছের ডাল কেটে নিয়ে যাচ্ছে। মাটিতে পুতে দিলেই গাছ হবে।

বাসস্টান্ড কার্গিলে

লামায়ারু মনিস্ট্রি। মুনল্যান্ডও বলে

লামাদের সাথে লামায়ুরুতে

পর্ব ৫

পথ উঠেছে ঘুরে ঘুরে। প্রায় চৌদ্দ হাজার ফিট উঁচুতে আর্মির এক সিগন্যাল সেন্টারের সামনে গাড়ী দাঁড়াল। আগে সুন্দর ভ্যালি। কিন্তু সাহস করে কেউ যাচ্ছে না। আর্মির ট্রেনড কুকুর তাড়া করবে। একজন মহিলা টয়লেটে গেলাম, সে সময়টুকুতে এক জওয়ান তার ঘাড়ে পা রেখে বসে রইলেন। কিছু পরে পেলাম ভ্যালি। চারিদিকে মরুভূমির মত বালি, তার বুক চিরে যতদূর দৃষ্টি যায়, টানা হাইওয়ে, অবিস্মরণীয় দৃশ্য, যেন এক অপার্থিব জগতে এসে পড়েছি। চারটে নাগাদ এলাম ম্যাগনেটিক হিল বলে এক জায়গায়। দূরে চারচাকার বাইক রাইড হচ্ছে। ড্রাইভার দেখাল গাড়ী নিউট্রালে রেখে দিলে, সামনে চলে যাচ্ছে, অথচ রাস্তা প্লেন। বিভিন্ন থিয়োরির মধ্যে একটা হল - এটা স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা, ভাল লোকেদের কে সামনে টেনে নিচ্ছে, অন্যটা হল সামনের পাহাড়টার চৌম্বক শক্তি গাড়ীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে সিধু জ্যাঠার মর্ডান সংস্করণ গুগল স্যার জানালেন চৌম্বক শক্তির ব্যাপরটা ভাওতা। ওখানের ম্যাগনেটিক ফিল্ড ইনটেনসিটি, একটা ফ্রীজের তুলনায় নগন্য। যে কোন ওজনের গাড়ী বা বাইক কি বল রেখে দিলে গ্রাভিটেশনাল ফোর্সে একসিলারেট করে স্পীড দাড়াচ্ছে ২০ কিমি পার আওয়ার। আসলে রাস্তাটা ডাউনহিল, সাদা চোখে বোঝা যায় না।
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পৌঁছালাম গুরুদ্বোয়ারা পাথ্থর সাহেব। এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন আর্মির জওয়ানরা। জনশ্রুতি শিখগুরু নানক সাহেব পদব্রজে এখানে আসেন ১৫১৭ সালে। এক দানবের অত্যাচারে গ্রামের লোকজন বিব্রত। গুরু নানক বসলেন ধ্যানে। দানব, নানককে হত্যার উদ্দেশে বড় পাথর গড়িয়ে দিল। সেই পাথর নানকের দেহ স্পর্শ করলে পাথরের সেই অংশ গলে যায় মোমের মত। পর সেই দানব নানকের ভক্ত হয়ে ওঠে। বাইরে জওয়ানরা এলাইচি চা ও বিস্কুট খাওয়াচ্ছিলেন। বাকি সঙ্গীরা মূল গুরুদ্বোয়ারাতে যেতে রাজি হলেন না, কারণ জুতো খুলে জলে পা ভেজাতে হবে। ভিতরে গ্রন্থসাহেবের পাশে সেই পাথর। মানুষের অবয়বে মধ্যে গর্ত। ফটো তোলার জন্য গ্রন্থী স্বয়ং এসে আমাকে পাথরের সামনে দাঁড় করিয়ে ফটো তুলে দিলেন। ফেরার পথে ঘৃতগন্ধী হালুয়া পেলাম প্রসাদ। শিখেদের অতিথি সৎকার অতুলনীয়। গুরুদেয়ারাতে “করসেবা” শিখেদের পরম পুণ্যের কাজ। সমাজের সব স্তরের লোক এতে অংশ নেন। মনে পড়ল যোশীমঠ থেকে হরিদ্বারে যাতায়তের রাস্তায় হেমকুন্ড সাহিব এ পুণ্যার্থীদের ঢল নামত। পুরো রাস্তায় লঙ্গর ও থাকার সুবন্দোবস্তো ছিল। 
একটু পরে ইন্দাস ভিউ পয়েন্ট এল। গাড়ী দাঁড়াল হাইওয়ের ধারে। নেমে নীচে তাকিয়ে সিন্ধু নদীর দুর্ধর্ষ প্যানারোমিক ভিউ। নদীর দুটো বিভাজিকা এখানে এসে মিলেছে। এখানে rafting হয়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ rafting point.  ছবি নিলাম মনের সুখে।
সাতটা নাগাদ এসে পৌঁছালাম লে শহরে। হোটেলের নাম “দ্য লে”। দু কদম হাঁটলেই সুন্দর চত্বরের মাঝে দুদিকে সারি দেওয়া বাজার। মেন রাস্তার একদিকে হকার্স কর্নার। স্যুভেনিরের জন্য ছোট কিছু কেনাকাটির আদর্শ জায়গা। বিকালে ওখানেই সময় কাটালাম। 
যাওয়ার আগেই দেখেছিলাম ক্যাপ্টেন সৌরভের উচ্ছলতার অভাব। একতলা উঁচু সিড়িতে চড়ার জন্য লিফট চাইছিলেন। ঘরে এসে জামা কাপড় শুদ্ধ বিছানায় বডি ফেলে দিলেন। ফোন করে হিটার আনালেন, আমি বল্লাম এতে ঘর আরো ড্রাই হয়ে যাবে। মুখে ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট। আমার ঘড়িতে ইসিজি, অক্সিজেন লেভেল, পালস রেট সব আসে। ঘড়িটা হাতে পরিয়ে পালস রেট দেখি ১১৪। ও-টু লেভেল দুই তিনবার চেষ্টা করেও এল না। ঠাট্টা করে বল্লাম - এ তো সেই বাঞ্ছারামের বাগান সিনেমার রবি ঘোষের নাড়ী দেখার সিন, চোখ গোল্লা গোল্লা করে বলছে- কি কান্ড বটেক- নাড়ী নাই নাড়ী নাই!” শিবুকে ডেকে আনলাম ওর অক্সিমিটার নিয়ে। দেখাল ৭৪। এইসব এমার্জেন্সী ভেবে ক্যাপ্টেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা রেখেছিলাম। সেটা যে তারই কাজে লাগবে কে জানত! একটু পরে লেভেল বাড়ল। মার্কেট থেকে ঘুরে এসে দেখি শুয়ে আছেন। অক্সিজেন আবার চার্জ করা হল। ওর খাবারটা ঘরে পাঠাতে বলে, আমরা ডিনার করে এসে দেখলাম প্রায় কিছুই না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। পরের দিন সকালে উঠে বসে বল্লেন আজকে অনেক ফিট। ও হরি। ও-টু দেখা গেল নেমে ৭০। আজকে আমরা রাত কাটাব সোমোরিরি বলে একটা লেকের ধারে, যার উচ্চতা ১৪০০০ ফিট। উপায় একটাই, ফাস্ট ডিসেন্ট ফ্রম হাই অলটিচুড। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। সেদিনের টিকিট পাওয়া গেল সাড়ে চার হাজারের মধ্যে।আমাদের ফেরার দিন টিকিটের দর দেখেছিলাম ১১০০০/-। ঝটপট টিকিট কিনে শিবু, সৌরভকে নিয়ে গেল গভর্নমেন্ট হসপিটালে। তারাও নিচে নামার ফরমান দিলেন। ইনজেকশন, ঔষুধপাতি দেওয়া হল। সৌরভ অবশ্য গাইগুই করছিল-“আমার তো নিজেকে ফিট লাগছে”। তবে অক্সিজেন লেভেল ৭০ দেখে রণে ভঙ্গ দিল। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙ্গে তার প্রমান পাওয়া গেল যখন সৌরভ জানাল, দিল্লিতে নেমে সে যাবে রাজস্থানের মান্ডয়া, নওলগড়ে শেখাবতি পেন্টিং দেখতে। ক্যাপ্টেন যে অকুতোভয় তার প্রমান পেলাম হসপিটাল থেকে ঘুরে ব্রেকফাস্টের সময়। টুরের টাকার “আক্কেল সেলামী” দিয়েও যখন ওয়েটারকে জিজ্ঞাসা করছে-“ব্রেড কা অন্দর সেলামি হ্যায় কেয়া?”। তারপর শুরু হল জুতো পর্ব। যে কাপড়ের জুতোগুলো বড় হোটেলে দেয় স্লিপার হিসাবে ব্যবহার করতে, ও সেটা নিয়ে এসেছে। তার একপাটি গিয়েছে হারিয়ে। রুমের টেবিল-চেয়ার সরিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। টাওয়েল মাটিতে রেখে হাঁটু মুড়ে বসে আতিপাতি দেখলাম। খাটটা মেঝে অব্দি, সুতরাং তার তলায় যাওয়ার চান্স নেই। একদম সিন্ডারেলা কেস। শিবু নামল ময়দানে। খাটের তলায় নয়, জুতো পাওয়া গেল খাটের উপরে কম্বলের তলায়। যাক নিশ্চিন্ত। দুর্গা দুর্গা করে সৌরভকে রওয়ানা করিয়ে আমরা বেরোলাম।
ক্রমশঃ


শ্রীনগর - লে হাইওয়ের সবচেয়ে উঁচু পয়েন্ট ১৩৮০০ ফিট

ম্যাগনেটিক হিল

ইন্দাস ভিউ পয়েন্ট। হাইওয়ে থেকে নীচে। পৃথিবীর উচ্চতম রিভার রাফ্টিং পয়েন্ট।

গুরুদ্বোয়ারা পাথ্থর সাহিব

পর্ব ৬

এবার নূতন ড্রাইভার নূতন গাড়ী। সদা হাসিখুশী ড্রাইভারের নাম জামান। খুব কোঅপারেটিভ ও বাধ্য এবং ভদ্রও। যাত্রাপথে যেখানে বলেছি গাড়ী থামিয়েছে-খাওয়ার জন্য হোক কি ফটো তোলার জন্য। এ রকম ট্রিপে সাইট সিইঙ এর এনজয়মেন্টটা চূড়ান্ত হয়, যদি ড্রাইভার ভাল হয়। আমাদের প্রথম গন্তব্য সে প্যালেস। লে থেকে ১৫কিমি। এটাই লে-মানালী হাইওয়ে। রাস্তার পাশে উঁচু টিলার উপর সে(Shey) প্যালেস। ২০০-২৫০ ফুট উঁচু তে সিঁড়ি ভেঙে ওঠা। ওঠার সময় সামনে সিন্ধু নদীর উপত্যকা দেখা যাচ্ছিল। লাদাখে সব জায়গায় গাছ বলতে লম্বা, ঋজু এক ধরণের গাছ। পাতাগুলি কচি কলাপাতা রংএর। হোটেলের রিসেপশনিস্ট এই গাছের নাম বলেছিল পপলার। ২০১২ সালে মাস প্লান্টেশন ড্রাইভে একদিনে একলক্ষ গাছ লাগান হয়েছিল, যা ছিল ওয়ার্ল্ড রেকর্ড। সামনের উপত্যকায় যে গাছ দেখছি সেগুলো ঐ সময়ে লাগান। এ ছাড়া উইলো গাছও আছে। হোটেলের কাঠের প্যানেলিং তাই দিয়ে তৈরী। প্লান্টেশনে জোর দেওয়ার অরেকটা কারণ, বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানো। ৩৫০ বছর আগে ডেনডাল নাগমিয়াল নামক লাদাখের রাজা এটা তৈরী করেন তার বাবার স্মৃতিতে।এক গাইড কোন টুরিস্ট গ্রুপকে বলছিল তার কথা শুনে লিখছি। লাদাখের রাজবংশ ছিল নামগিয়াল। সে প্যালেস ছিল সামার ক্যাপিটাল। এএসআই সে প্যালেস রেস্টোরেশন করেছে। রাজার মন্দিরে ৪০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি। তিনটে ধাপ আছে। দর্শকরা দেখে উপরের লেবেল থেকে। মানে মূর্তির বুকের লেভেল থেকে। কাছে গিয়ে নীচে তাকালে পুরো স্ট্যচুটা দেখা যায়। মাথার দিকটা নাকি পাচকিলো সোনা দিয়ে বাঁধানো। 
গাড়ী এগিয়ে চলেছে। মাঝ রাস্তায় একটা জায়গা পড়ল চুংথাম, এখানে লাঞ্চ সেরে হট স্প্রিং দেখতে গেলাম। এরপর আমাদের গন্তব্য সুমরিরি (Tso Moriri) , Tso তে টি টা সাইলেন্ট,  মানে হল লেক। ১৪০০০ ফিট উচ্চতায়। টুরিস্ট যায় কম। তার উপর আমরা সিজনের শুরুতে এসেছি। তাই চারিপাশে তুষার শুভ্র শৃঙ্গ। জুনের শেষে পিক সিজনে এলে এত বরফ দেখতে পেতাম না। বেশীর ভাগ রাস্তা সিন্ধু নদীর পাশ দিয়ে। লে থেকে দূরত্ব ২২০কিমি। রাস্তা প্রথমদিকে ঠিক থাকলেও পরে বেশ খারাপ। বিকালের দিকে লেকের পাশের রাস্তা ধরলাম। একটু এগিয়ে দেখি লেকের পাশে বরফ জমে আছে। লোভ সামলানো গেল না। গাড়ী থামিয়ে রাস্তা থেকে নেমে বরফ নিয়ে খেলা চল্ল। দূরের পরপর পাহাড়গুলোর মধ্যবর্তী গিরিশিরায় পড়ন্ত সূর্যালোকে আধেক অন্ধকার আর পর্বতগাত্রে নানা শেডের পাথরে অসাধারণ রংএর খেলা। লেকের জল ঘন নীল। টুরিস্টের হইচই নেই। অনন্ত গগনের তলায় নিঃসীম শূণ্যতার মাঝে আমরা কটি প্রাণী। “মনে হল যেন পেরিয়ে এলাম অন্তবিহীন পথ” দূরে আলোর আভাস। পৌছে গেলাম যাত্রীদের থাকার জায়গায়। এসব জায়গায় আসতে হলে সরকারী পারমিট লাগে। প্রথমেই পড়ল মিলিটারি ক্যাম্প। ড্রাইভার গিয়ে পারমিট দেখিয়ে এল। সবকিছুই এরেঞ্জ করেছেন আমাদের ট্যুর অপারেটার হায়দার ভাই। প্রথমদিকে লেকের ধারে বেশ কিছু কটেজ। আশেপাশে ঘোড়া চড়ছে। লেক দুই তিনশ মিটার দূরে। আমাদের থাকার জায়গা পিছনদিকে অনেকটা ঘুরে কোন এক গ্রামের হোম স্টে তে। এখানে সন্ধ্যে সাতটা থেকে এগারটা অব্দি জেনারেটার চলে। কিন্তু রাস্তা ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝে বড় বড় ট্রেঞ্চ। মোদি সাহাবের “ঘর ঘর নল মে জল” প্রকল্পের কাজ চলেছে। বেশ কষ্ট করে মোবাইল জ্বেলে গন্তব্যে পৌছে সবাই হতাশ। একদম বেসিক একোমডেশন। ভাগ্যিস শিবুর ফোনে নেটওয়ার্ক ছিল। ট্যুর অপারেটারকে বলে অন্য ব্যবস্থা হল। সেই প্রথম যে জায়গায় সারি সারি কটেজ দেখেছিলাম সেখানে। সব পোটলাপুটলি নিয়ে আবার গাড়ীতে উঠলাম। এই থাকার কটেজগুলির নাম সুমরিরি ইন। ২৫০০/- ঘর ভাড়া, ডিনার ও ব্রেকফাস্ট সহ। তবে আমাদের কিছু দিতে হল না। সবই প্যাকেজে কভার্ড। সৌরভ নেই বলে আমি কটেজে একা। একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার আমার রুমে রেখে গিয়েছে। একটু এক্সপিরিমেন্ট করে দেখলাম। নাকে নল লাগিয়ে মিনিট দশেক পরে দেখলাম ও-টু লেভেল ৮৫ থেকে বেড়ে ৯৯। আমাদের ড্রাইভার জামান আর হোটেলের ম্যানেজার, আমার পাকা চুল আর মাস্ক দেখে চিন্তিত। বল্ল - “ আঙ্কেল, আপ উন লোগোকা সাথ শো যাইয়ে, ইস হাইট মে তবিয়ত কভি ভি বিগড় সকতা হ্যায়”। বল্লাম “কিছু হবে না, চিন্তা মত করো।” তাহালেও ওরা ড্রাইভারদের রাতে শোয়ার জায়গা, ম্যানেজারের ঘর দেখিয়ে দিল, কিছু হলে যেন ডাকি। বলে গেল রাতে শোয়ার সময় যেন ছিটকিনি না লাগাই। এই পরদেশে ওদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ না হয়ে পারলাম না। কষ্ট লাগছিল জামানের জন্য। আজকেই ওর মোবাইল হারিয়েছে। এই রাতে ও লেকের রাস্তায় বেরোবে মোবাইল খুঁজতে।
ক্রমশঃ


লে হোটেলে শিবু, ট্যুর অপারেটর হায়দারের সাথে।

সে প্যালেস

সে প্যালেসের বুদ্ধমুর্তি। লক্ষ করুন কানটা কি রকম লম্বা।

মন্দির গাত্রে বুদ্ধর পেন্টিং

ওপারের গ্রামে যাবার জন্য কাঠের ব্রীজ

রাস্তার ধারে। পাহাড়ে আলো ছায়ার খেলা

আমাদের কান্ডারী জামান

সমুরিরি লেক। লেকের ধারে আইস।

ডানদিকের শেষ কটেজটাতে আমি ছিলাম

Posing with bike at Sumuriri

পর্ব ৭

সকাল ছটায় ঘুম ভেঙে গেল। একাই হাটতে বেরোলাম লেকের পাড় ঘেসে। দূরে মিলিটারী ক্যাম্প থেকে ভজনের সুর ভেসে আসছে। সকালে স্নানের জন্য বালতিতে গরম জল পাওয়া গেল। এই ঠান্ডায় পাইপের জল নাকি জমে বরফ। এই সময়ে মিনিমাম তাপমাত্রা থাকে হিমাঙ্কের নীচে। পরেরদিন সকালে জামানকে মোবাইলের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, বল্ল পায় নি। তবুও জামান মুখ গোমড়া করে বসে থাকার পাত্র নয়।
 গাড়ীর ক্যারিয়ারে লাগেজ প্যাক করে যাত্রা শুরু হল প্যাংগং লেকের উদ্দেশে। এই রাস্তায় গাড়ী কম। এক জায়গায় অফ রোডিং করে শর্টকাট মারতে গিয়ে পড়লাম এক ঝোরার মাঝে। রাস্তা বলে কিছু আছে বলে মনে হল না। আবার ফেরত আসতে হল মেন রোডে। একটু এ্যডভেঞ্চার হল আর কি। প্যাঙগঙে থাকার জায়গাগুলি সব লেকের  পশ্চিম প্রান্তে। লেকটা লম্বায় ১৩৫কিমি। এর অর্ধেক পড়ে টিবেটে আর ভারতে চল্লিশ শতাংশ। বাকী দশভাগ বিতর্কিত। এই নিয়ে সাম্প্রতিক কালে বেশ জল ঘোলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে। বেশীরভাগ টুরিস্ট আসে লে বা নুব্রা থেকে। তাদের রাস্তাটা  এসে লেকের পশ্চিমপ্রান্তেই শেষ হয়েছে। সেই জায়গার ভিউও অসাধারন, তবে তারা লেকের বাকী অংশটা দেখতে পায় না। সুমরিরির দিক থেকে আসায়, আমরা লেকের প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার রাস্তা লেকের গা ধরে এলাম। চারিপাশের পাহাড়ের মধ্যে লেকের স্বচ্ছ ঘন নীল জল। আকাশটাও পাল্লা দিয়ে নীল। ঘন্টাখানেক প্যাঙগঙ দেখতে দেখতে পৌঁছালাম আমাদের কটেজে। এখানে টুরিস্টের ভীড় অপেক্ষাকৃত বেশী। সমুদ্রের হাওয়ার মত শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে। ঠান্ডা ভালই। এখানের উচ্চতাও ১৪০০০ ফিটের কাছাকাছি। লেকের পাড় থেকে ১৫-২০ মিটার উঁচু তে আমাদের কটেজ। বিকালের দিকে যাওয়া হল লেকের ধারে এখানেই থ্রি ইডিয়টসের শুটিং হয়েছিল। ছবি তোলার জন্য লেকের ধারে সিনেমার আদলে চেয়ার, স্কুটার রাখা।পার হেড ১০০/- দিয়ে যত খুশী ছবি তোল। আমি আবার লেকের পাড়ে বসে ক্যামেরার জন্য পোজ দিতে গিয়ে ওঠার সময় সোজা লেকের জলে ডিস-ব্যালেন্স হয়ে পড়লাম। জুতো আর জ্যাকেট ভিজে গেল।এই চরম ঠান্ডায় জলে ভিজে সোনায় সোহাগা। পরের দিন সকালে রোদে মেলে দিতেই কিছুক্ষণের মধ্যে শুকিয়ে গেল। এটাও একটা ফলাও করে বলার মত খবর হল। রাতে ভেজ খাবার, তবে ভালই। স্যুপ, পাপড়, ডাল, আলু বেগুনের অনেক মশালা দিয়ে শুখা আলু বেগুনের সব্জী আর সিমাইএর পায়েস। ঠান্ডাতে লেপের তলায় ঘুম বেশ ভালই হয়। রাতে মোবাইল চার্জ দেওয়াটা জরুরী। দিনে কোন ইলেকট্রিসিটি নেই। রুমের চাবির রিংটাতে একটা সৈনিকের মুখ সহ লোগো, তাতে লেখা ব্যাটেল অফ রেজাং-লা- ১৮ই নভেম্বর ১৯৬২।  কিছুদিন আগে হটস্টারে একটা ওয়েব সিরিজ দেখেছিলাম নাম “১৯৬২ -দ্য ওয়ার অন দ্য হিলস”। এটা ছিল চায়না ওয়ারে ফেমাস লোয়ার লাদাখের পূর্বসীমায় স্পানগুরুর লেকের কাছে একটা ডিসপিউটেড পাসের কাছে। ভারতীয় ফৌজের ১২০ জন সৈন্যের মধ্যে একশ চোদ্দ জন মারা যায়, আর ১০০০ চাইনিজ সৈন্য নিহত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রটা ছিল ১৫০০০ ফিট উচ্চতায়। মেজর শয়তান সিং পস্থুমাসলি পরম বীর চক্র পেয়েছিলেন। বেশীরভাগ ভারতীয় জওয়ান ছিল হরিয়ানার রেওয়াড়ির কাছে এক গ্রামের আহির (যাদব) সম্প্রদায়ের লোক।
পরের দিনের গন্তব্য নুব্রা ভ্যালি। সায়ক আর নুব্রা নদীর সঙ্গমস্থল বলে অনেকটা জায়গা জুড়ে নদীর ফ্লাড প্লেনস। রাস্তার অনেকটা অংশ সায়ক নদীর পাশ দিয়ে এসেছে। নদীতে জলের থেকে বালি, পাথরই বেশী। এর কাছেই হল ডিস্কেট মনিস্ট্রি। আর আছে হুন্ডার বলে একটা জায়গা যেখানে ক্যামেল সাফারি হয়।, তার আগের অনেকটা রাস্তা সমতলের জায়গা জুড়ে বালিয়ারি। ধুলোর ঝড় চল্ল কিছুক্ষণ। একটু দূরে কিছু দেখা যায় না। দুপুর নাগাদ পৌছে গেলাম নুব্রা ভ্যালি এর উচ্চতা ১১৫০০ ফিট। আমাদের হোটেলের নাম ল্যাসাস্থ্যাঙ। ম্যানেজারকে জিজ্ঞাসা করলাম নামের মানে। “লাস” মানে ভগবান 
আর স্থ্যঙ মানে জায়গা। পরে যোগ করলেন- “ হামারে লিয়ে আপলোগই ভগবান হো।”  বাইরের একটা হোটেলে লাঞ্চ সেরে জামান আমাদের নিয়ে গেল হুন্ডার বলে একটা জায়গায়। টুরিস্ট গাড়ীতে জায়গাটা জ্যাম-জমাট। ডাবল হাঞ্চ উটে করে ক্যামেল সাফারি হচ্ছে। আমাদের কারোরই উঠে চড়ার ইচ্ছে ছিল না। সোনার কেল্লায় লালমোহন বাবুকে দেখেছি কি রকম কসরত করে উঠের পিঠে চাপতে। তার রিপিট পারফরমেন্স করে কী লাভ? গাড়ী ঘুরিয়ে নেওয়া হল। আমাদের হোটেলের পিছনের পাহাড়টার উপর ডিস্কেট মনিস্ট্রি। এটা মূখ্য আকর্ষণ হল জাইগান্টিক আকারের বুদ্ধমূর্তি। এই স্ট্যচুর নাম দেওয়া হয়েছে মৈত্রেয়ী মূর্তি।  জায়গাটা একদম পাহাড়ের উপর। বেশ কিছু সিঁড়ির ভেঙে মূর্তির পাদদেশে খোলা চত্বরটাতে পৌঁছান গেল। খোলা জায়গাটায় অনেক হাওয়া দিচ্ছ। বুদ্ধের মূর্তির মধ্যে যেটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় সেটা হল মাথার মুকুট। বেশীরভাগ বুদ্ধমূর্তিতে বুদ্ধের মাথার চুল দেখা যায় কোঁকড়ান।ইতিহাস বলে ভগবান বুদ্ধ মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তাই তাঁর মৃত্যুর তিনশ-চারশ বছর পর কনিষ্কের রাজত্বকালে বুদ্ধিস্ট কাউন্সিলের মিটিংএ বুদ্ধমূর্তির নির্মাণ শুরু হয়।কনিষ্কের সম্রাজ্য ছিল উত্তরে গান্ধার থেকে পূর্বে পাটলিপুত্র অব্দি। মাথার কোকড়ানো  চুলে গ্রীক প্রভাব স্পষ্ট। এই স্টাইলটাকে হেলেনিস্টিক স্টাইল বলে। বুদ্ধের গায়ে যে রোব থাকে, সেটা নাকি রোমানদের অনুকরণে। বুদ্ধের যে শাক্য বংশে জন্ম তাদের মুখের অবয়বের সঙ্গে বুদ্ধের মুখের মিল নেই। বোঝাই যায় বুদ্ধ মারা যাবার কয়েকশ বছর পরে যখন বুদ্ধমূর্তি তৈরী শুরু হল তখন কল্পনার মিশেলটাই প্রাধান্য পেয়েছে। দাঁড়ানো বুদ্ধমূর্তিতে, বাম হাতে রোব ধরে আর ডানহাতে বরাভয়মুদ্রা দেখানো মূর্তিকে বলে “অভয় বুদ্ধ”।
ক্রমশঃ


সুমরিরির জলে মেঘের প্রতিবিম্ব

প্যাঙগঙ লেক, যাওয়ার পথে রাস্তা থেকে

প্যাঙগঙ লেকের কাছে আমার কটেজ

প্যাংগঙ লেকের পাশে একলা আমি

সেই কি রিংএ ব্যাটেল অফ রে জাংলা লেখা


লেকের ধারে থ্রী ইডিয়টস স্টাইলে

পর্ব ৮

দূরে একদিকের পাহাড়ে আরেকটু উচ্চতায় মনিস্ট্রি দেখা যাচ্ছে। মূর্তির সামনের দিকে হল সায়ক নদী। তারও ওপারে পাকিস্তান বর্ডার। ছবি তোলা হল বেশ কিছু। মূর্তির পিছনদিকে তলার বেস টাতে বুদ্ধ মন্দির, তবে আকর্ষণীয় কিছু নয়। 

আমাদের ইটিনারিতে পাকিস্থান বর্ডারের কাছাকাছি ভারতের শেষ গ্রাম তুর্তুক যাওয়ার প্ল্যান ছিল।তবে হাতে সময় নেই। আগামীকাল সকালে বেরিয়ে ৬০ কিমি গিয়ে আবার এই রাস্তায় ফিরে লে যেতে গেলে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। লে তে আবার লে প্যালেস, হেমিস মনিস্ট্রি দেখা বাকী। অনেক আলোচনার পর তুর্তুক দেখা ক্যানসেল করা হল।তারপর আমরা গেলাম সুমুর ভিলেজ দেখতে। সায়ক নদী ক্রস করে রাস্তা গিয়েছে সুমরুতে। নদীর পাশে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা rappelling পয়েন্ট। মনে হল এখনো খোলে নি। সবে সিজন শুরু। সুমরু একটা সাধারণ গ্রাম। একটু দূরে একটা মনিস্ট্রি। গেলাম সেখানে। তবে সেটা বন্ধ। অগত্যা বাইরের ধর্মচক্রটাকে কয়েকবার ঘুরিয়ে আবার হোটেলে ফেরত। আমাদের গ্রুপের সৌরভের, চিকেনের সৌরভে দুর্বলতা। রাতে চিকেন পাওয়া গেল প্রভূত পরিমাণে। সবাই খুশ। 
পরের দিন সকালে উঠে একটু হাঁটতে বেরোলাম। হোটেলের কাছেই তিনমাথার মোড়ে। দেখলাম এ্যরো দেখান আছে ইয়াক ফার্মের। দেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু দুই কিমি দূরে। যাওয়া গেল না কারণ তাহালে বেরোতে দেরী হবে। হোটেলের ম্যানেজার জানালেন-এখন গেলে ইয়াক দেখা যেত না। গ্রীষ্মকালে তারা চলে যায় আরো উচ্চতায়।
যাত্রা শেষের মুখে। নুব্রা ভ্যালি থেকে লাগেজ বাঁধাছাঁদা শেষ করে রওয়ানা দিলাম সকাল নটায়। ফিরে যাব লে শহরে। ১২০ কিমির সফর। অন্যদিনের তুলনায় জার্নির ধকল কম, তবে লে তে ফিরে সোজা হোটেলে ফিরে যাব, হেমিস মনিস্ট্রি, লে প্যালেস, দেখা এখনো বাকি। তবে আজকের সফরের মুখ্য আকর্ষণ খারদুংলা পাশ। পৃথিবীর সর্বচ্চো মোটরেবল রোড। নুব্রা থেকে ৭০ কিমি আর লে থেকে পঞ্চাশ কিমি। আবার সেই সায়ক নদীর পাশ দিয়ে চলা। রিভার বেড পাথরে ভর্তি। মনে পড়ল নদীবিধৌত পলিমাটির বাংলাদেশে পাথর দুষ্প্রাপ্য ছিল। ভারত থেকে মূলত মেঘালয় থেকে পাথর আসত। বাংলাদেশের খনিজ সম্পদ বলতে কিছু গ্যাস রিজার্ভ। খারদুংলা আসার ২০-২৫ কিমি দূর থেকে চড়াই শুরু। রাস্তা খুব ভাল কিছু নয়। মে মাসেও রাস্তার দুধারে অনেক বরফ। ফটো তোলার জন্য দু জায়গায় দাঁড়ানো হল। মনের সুখে মোবাইলে ফটো, ভিডিও নিলাম। স্মৃতি গুলো ধরা থাক মোবাইলের স্টোরেজে। খারদুংলাতে গাড়ী আর বাইকের ভীড়। “লা” মানে হল পাস, আর দাখ (dakh) মানে দেশ। এর মানে লাদাখের মানে হল পাসের দেশ।
চারিদিকে শ্বেতশুভ্র তুষারের সমারোহ। ওদিকে যত না মন সবাই ব্যাস্ত  ১৮৩১০ ফিট লেখা মাইল ফলকের পাশে দাড়িয়ে ফটো তুলতে। একটু এ্যডভেঞ্চারের ইচ্ছে হল। জ্যাকেট, মাফলার, টুপি খুলে নেমে পড়লাম ফটো তুলতে। ঠান্ডা খুব কিছু লাগছিল না। ফটোর জন্য এখানে কিউ। ভারতবাসীরা অবশ্য কিউতে অভ্যস্ত। ফটোশেসনের পর একটা কাফেতে ঢুকলাম। এই ঠান্ডায় কফি খেয়ে বেশ চাঙ্গা লাগল। নামার সময় গাড়ী ছুটছে দ্রুতগতিতে। মাঝে মাঝে বাইকারের দল বেরোচ্ছে পাশ দিয়ে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে লে শহর। লে থেকে যাত্রা শুরু করে আমাদের দুটো জায়গা মিস হয়ে গিয়েছিল, সে দুটো হল হেমিস মনিস্ট্রি আর থিকসে মনিস্ট্রি। আবার সেই সুমরিরির রাস্তা, সে প্যালেস ক্রস করে আরো পনের কিলোমিটার। মেন রাস্তা থেকে ছোট একটা রাস্তা দিয়ে নদী পেরিয়ে একটা স্তুপের কাছে পৌঁছালাম। দেখে বোঝা যায় বেশীদিন হয়নি এই সৌধ নির্মাণ হয়েছে। বাদিকে দেখি অনেক লাদাখি বুদ্ধিস্ট ট্র্যডিশনাল ড্রেস পরে লাঞ্চ করছেন মাটিতে বসে। আমরাই একমাত্র টুরিস্ট। আমাদের ডেকে নিয়ে আলাপ করে লাঞ্চে বসিয়ে দিলেন। শুনলাম আজকে ওরা বৃক্ষরোপন উদযাপন করছেন। একজন তরুন লাদাখি জানালেন হিমালয়ের এপ্রান্ত থেকে অরুনাচল পর্যন্ত, টিবেট সহ বৌদ্ধধর্মের রমরমা। এরা হীনযান সম্প্রদায়ের। জাপান, মালয়েশিয়া জায়গাগুলিতে মহাযান সম্প্রদায়ের লোকেরা থাকেন। টিবেটিয়ান বুদ্ধিজিমে তন্ত্র সাধনার বড় ভূমিকা আছে। আগে ভাবতাম হিন্দুধর্মেই ভূত প্রেতের আধিক্য। ওদের সঙ্গে কথাবার্তায় বুঝলাম বুদ্ধিস্টদের মধ্যে তন্ত্র সাধনার বিরাট ভূমিকা। সত্যিই তো -পাহাড়ের ভৌগলিক জ্যামিতি অশরীরি আত্মার আদর্শ আশ্রয়স্থল। ওরা জানালেন, প্রতি বার বছরে হেমিস ফেস্টিভাল হয়। অনেকটা কুম্ভ মেলার মত। সেই অনুষ্ঠানে মুখোশ নৃত্য দেখতে অনেকে আসেন। কথিত আছে হেমিসের গোড়াপত্তন করেন তিলোপা নামে তন্ত্র সাধক, হাজার বছর আগে। এরপর তার শিষ্য নরোপা এই সাধনার প্রসার ঘটান। 
আমরা সৌধটাকে দেখে মনিস্ট্রি ভাবছিলাম। একটু অবাক হচ্ছিলাম এত নামকরা গোম্পা মাত্র এইটুকু। ভুল ভাঙ্গল যখন ড্রাইভার খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে শুরু করল। তিন কিমি এগিয়ে দেখা গেল হেমিস মনিস্ট্রি। পাহাড়ের উপর দিকে আরো পুরানো বিল্ডিং দেখলাম। সব স্ট্রাকচারই সাদা, সাইড গুলো মেরুন রং এর। ৫০/- টিকিট কেটে সিঁড়ি চড়ে উপরে উঠে গেট পেরিয়ে বিশাল আয়তাকার চত্বর। বাদিকে শ্রাইন। সামনে লম্বা বিল্ডিং। একটার মধ্যে বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। দেওয়ালে অনেক পুরানো পেন্টিং। পাশের আরেকটা ঘরে রাক্ষসের বিশাল মূর্তি। ঘরের চারিপাশ জুড়ে লম্বা বেঞ্চ, পাশে বসার গদী। প্রত্যেক স্টুলে রাখা আছে ধর্মগ্রন্থ। হেমিসে একটা মিউজিয়াম আছে। সেটা দেখা হয় নি। একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম, কারণ তন্বী আর রেশমী আসে নি। পরে দেখলাম টিকিটের উল্টোদিকে ম্যাপ দেওয়া আছে, নাম্বারিং করে কোথায় কি দেখার আছে সেটা লেখা আছে। টিকিটটা ভাল করে দেখিই নি। মোট আটটা দেখার জায়গা ছিল। পাহাড়ের উপরদিকে আরো বিল্ডিং দেখলাম। দুই একজন লামা নেমে আসছেন। মনে হল ওটা ওদের থাকার জায়গা। 
এর পরের গন্তব্য থিকসে মনিস্ট্রি। একটা ফাঁকা জায়গায় পাহাড়ের টংএ। অনেকেই বলেন দূর থেকে দেখলে একে লাসার পোতালা প্রাসাদের মত লাগে। সব ঠাকুর দেবতাই বোধহয় উচ্চস্থানে থাকতে পছন্দ করেন। আমাদের কেদার-বদ্রী-গঙ্গোত্রী-যমুনোত্রীও তাই। শিব-দুর্গাও থাকেন কৈলাসে। 
ক্রমশঃ


ডিস্কিট মনিস্ট্রি

খারদুংলা যাওয়ার পথে

বাইকারদের লাগানো স্টিকার

পথের ধারে চায়ের আসর। খারদুংলার রাস্তায়

খারদুংলায় আমার অক্সিজেন লেভেল। লে তে পৌঁছে ৯৫ ছিল

খারদুংলাতে

হেমিস মনিস্ট্রি

স্তুপ… হেমিস মনিস্ট্রি এখান থেকে ৩ কিমি উপরে।

পর্ব ৯

পঞ্চাশ টাকার টিকিট কেটে, সিঁড়ি ভেঙে ওঠা। উপর থেকে বাইরের দৃশ্য নয়নাভিরাম। চত্বরের মাঝে দুইপাশে দুটো মন্দির। একটার ভিতরে বিশাল মৈত্রেয়ী বুদ্ধমূর্তি। ১৯৭০ সালে দালাই লামার আগমন উপলক্ষে এই পনের মিটার উঁচু মূর্তি বানানো হয়। দীর্ঘ চার বছর লেগেছিল বানাতে। এএসআই থিকসে মনিস্ট্রির রিনোভেশন করেছে। মেঝেগুলোতে মার্বেল লাগিয়ে দেওয়াতে একটা মডার্ন লুক চলে এসেছে, যা কিনা মোটেই অভিপ্রেত নয়।
এর পরের গন্তব্য লে প্যালেস। এটা অরিজিনালি মাড হাউস ছিল। ঘড়ির কাটাত সাড়ে চারটে। সূর্যদেবের প্রখর তেজে আমাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। 
এর পরের গন্তব্য লে প্যালেস। এটা শহরের মাঝামাঝি পূর্ব প্রান্তে।।একটা চড়াই রাস্তার শেষ প্রান্তে লে প্যালেস। কিন্তু রাস্তায় জ্যাম। ছটায় নাকি প্যালেস বন্ধ হবে । তাই ১১ নম্বর বাস মানে হন্টন শুরু করলাম। পরে টিকিট কাউন্টারে জানলাম, সকাল ৯টা থেকে ৭টা অব্দি খোলা থাকে। এএসআই এর রক্ষণাবেক্ষণ করে। ২৫/- টিকিট, খালি ভারতীয় নয়, সার্ক কান্ট্রির সব দেশের জন্য। তাজমহলে দেখেছিলাম খালি ভারতীয়দের জন্য ২৫/-। আমার বাংলাদেশী বন্ধুর কাছে তিনশ টাকা নিল। প্রবেশ পংথ্র পর লম্বা একটা বারান্দা। বাদিকে হলঘর, মাথা সামলে চৌকাঠ পেরোলাম। দরজার সিলিং খুব নীচু। ভিতরে অনেক মনুমেন্টের ফটো, যে গুলোকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা দিয়েছে। ছোট ছোট সিঁড়ি ভেঙে এক একটা তলায় উঠছি। লেভেল নাইন অব্দি আছে। এটা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং মার্ভেলও বটে। মাটি, কাঠ দিয়ে নয়তলা বাড়ী বানানো কঠিন কাজ। পরে পোতালা বানানোর সময় এই ডিজাইন ব্যাবহার করা হয়। পাঁচ , ছয়, সাত লেভেলে খোলা চত্বর আছে। সেখান থেকে পুরো শহরের প্যানারোমিক ভিউ পাওয়া যায়। 
১৯৯০ সালে লে প্যালেস রেস্টোরেশনের কাজে হাত দেয় এএসআই। পুরানো লুকের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ কাজ। একটা রুমে ছবি লাগানো ১৯৯০ এ কেমন দেখতে ছিল, রেস্টোরেশনের আগে ও পরে। এরপর জামান বলছিল আমাদের নিয়ে শান্তিস্তূপে যাবে। কিন্তু চড়া রোদে আর মনিস্ট্রির সিঁড়ি ভাঙার পরিশ্রমে আসল শান্তি হল হোটেলের বিছানা। তাই ফিরে আসা গেল হোটেলে। হাই অকটেন সাইট সিইঙ এর সমাপ্তি। স্কুলে বার্ষিক শেষ পরীক্ষা দিয়ে যে রিল্যাক্সিং ফিলিং হত, সে রকমটাই লাগছিল হোটেলে ফিরে। 
মার্কেটিংএর আমার কোন ইচ্ছে ছিল না। তিনটে ফ্রীজে লাগানোর ম্যাগনেট নিয়েছি, স্মৃতি হিসাবে। লাদাখ কি কাশ্মীরের পশমিনা সাল বিখ্যাত। খুব হাল্কা হয়। পশমিনা হল পাহাড়ায় ছাগলের পেটের দিকের লোম। দোকানে গেলাম একবার জ্ঞানঅর্জন করতে। দোকানদার বল্লেন লাদাখ থেকে পশমিনা যায় কাশ্মীরে। সেখানে হাতে বা পাওয়ার লুমে ডিজাইন হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। হাতের কাজের শালের দাম শুরুই আট দশ হাজার থেকে। কেনার ইচ্ছে ছিল না। দিল্লিতে ট্রেড ফেয়ারে সব স্টেটের জিনিষ পাওয়া যায়। আর খালি নিজের পসন্দের উপর ভরসা কম। 
পরের দিন দুপুর ১-৪০ এ ফ্লাইট। লে-লাদাখ কে বাই বাই করে দু ঘন্টা আগে পৌঁছে গেলাম এয়ারপোর্টে। এটা একটা সামরিক বিমানঘাটি। প্লেন আকাশে উড়তেই নীচে লে শহর আর একটু পরে লাদাখের পাহাড় চূড়া আর অনেক নীচে নদী দেখতে পেলাম। কিছুক্ষণ পরে তারা চলে গেল মেঘের আড়ালে, মনের মনিকোঠায় রয়ে গেল রোমাঞ্চকর এক অভিজ্ঞতার ঝুলি।
দেবদত্ত 
১১/০৫/২২


বৃক্ষরোপন উৎসবে লাঞ্চ।

থিকসে মনিস্ট্রি। পাহাড়ের টংএ। অনেকটা সিঁড়ি ভেঙে ওঠা

থিকসে মনিস্ট্রির বুদ্ধমূর্তি


ছবির জন্য পোজ, লে প্যালেসে! পিছনে লে শহর

রেস্টোরেশনের আগে

রেস্টোরেশনের পর লে প্যালেস

১৯৯০ এর আগে

১৯৯০ এ এএসআই রেস্টোরেশন করার পর

প্লেন থেকে ফেরার পথের দৃশ্য। টা টা বাই বাই লাদাখ


















Comments

  1. আপনার দৌলতে বিনা কোন পরিশ্রমে ও বিনি খরচায় লে লাদাখ ঘুরে এলাম। এত সুন্দর ফটো সহ বিস্তারিত বিবরণ ঠিক চাক্ষুষ দেখার মতোই লাগলো। তার সঙ্গে আবার ইতিহাস ভূগোল ও পেলাম। অশেষ ধন্যবাদ।
    একটা কথা। আপনি বুদ্ধদেবের মূর্তির কথা লিখেছেন। আমি শুনেছি যে অদ্যকার বুদ্ধদেবের মুখাকৃতি নাকি রোমান সম্রাট আলেকজান্ডার এর মুখের আদলে করা হয়েছিল, কারন উনি নাকি খুব সুন্দর ছিলেন।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments