পরিবেশ সংরক্ষণে নিজস্ব চিন্তাধারা
পরিবেশ সংরক্ষণ ও চিন্তাধারা
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। প্রথমেই বলি আমার এই লেখার উদ্দেশ্য পরিবেশ সংরক্ষণের বিপক্ষে নয়, পুরো ব্যাপারটাকে একটা নূতন আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা।
আজকাল অনেকেই পরিবেশ ও সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তাভাবনা করে থাকেন। এই ব্যাপারে আমাদের চিন্তাধারা, শুধু আমাদের কেন সব সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই তাৎক্ষণিক বলে মনে হচ্ছে।
কিছু উদাহরণ দেওয়ার আগে কবির এক স্বাশ্বত বাণী উল্লেখ করি - সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।মানুষ জীবকুলের সর্বশ্রেষ্ঠ জীব, আমরা সভ্যতার চরম শিখরে, নিজেদের এই পৃথিবীতে টিকিয়ে রাখতে ও স্বাচ্ছন্দ্যে রাখতে প্রকৃতির ও জীবজগতের সংহার করেছি। এই ধরাধামে থিয়োরি অফ ইভোলিউশন আর থিয়োরী অফ এক্সটিংশন হাতে হাত মিলিয়ে চলছে। মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসর প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলাতে না পেরে অবলুপ্ত হয়ে যায়। এটা একটামাত্র উদাহরণ দিলাম। এরকম অসংখ্য আছে।
ধরা যাক চড়াই। আগে দিল্লিতে অনেক ছিল, ছোটবেলায় ঝাড়গ্রামে দেখেছি। কুটোকাটা মুখে এনে ঘুলঘুলির মধ্যে বাসা করত। খুব কিচিরমিচির শুনতাম নিঃস্তব্ধ গ্রীষ্মের দুপুরে। আজকাল সব ফ্ল্যাটবাড়ী, তাদের বাসা বাঁধার জায়গা নেই। তাই চড়াইএর সংখ্যা কম যাচ্ছে। কাকের কথাই ধরা যাক। দিল্লিতে আশি-নব্বই এর দশকে ছিল, কলকাতায় ছিল অনেক বেশী। আজকাল দিল্লিতে দেখা যায় না। আগেকার কালে পাড়াতে বা বাড়ীর পাশে আস্তাকুড়ে, ছাইগাদা থাকত। সেখানে উচ্ছিষ্ট ফেলা হত। কাকের দল কা কা করে উড়ে এসে বসত আর খেতো। এখন শহরে পরিবেশ রক্ষার কল্যাণে বাড়ী থেকে কুড়া নিয়ে যায়। মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ীতে করে চলে যায় কমপ্যাক্টরে। তো কাক খাবে কি? সুতরাং তারা ধীরে ধীরে অবলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।
এবার একটু গ্রামের দিকে তাকানো যাক। কেঁচোর কথাই ধরা যাক। ছোটবেলায় দেখতাম মাটির ছোট ছোট দলা পাকানো কেঁচোর বিষ্ঠা (?) থেকে তৈরী আমাদের বাড়ীর আশেপাশে আছে। কেঁচো এবং অন্যান্য মাটিতে থাকা ইনসেক্ট জমিকে উর্বর করত। চাষের ফলন বাড়াত। কিন্তু যে রেটে পপুলেশন বেড়েছে, সেই হারে তো ফলন বাড়ে নি। অনেক ফেমিন হয়েছে। উৎপাদনে স্বল্পতা এর মূল কারণ হলেও , অপ্রতুল গুদাম এবং যাতায়তের অব্যবস্থা এর আনুষঙ্গিক কারণ ধরা যায়। পরবর্তী সময়ে হাই ইল্ড গ্রেন এবং পেস্টিসাইড ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার আমাদের দেশকে ফুড সিকিইরিটি দিয়েছে। সরকার পঁচকিলো করে চাল-গম, ৮০ কোটি লোককে দিয়েও ১০০ মিলিয়ন টন বাফার স্টক সরকারের কাছে। স্বল্প কথায় কেঁচো হয়ত লোপ পেতে বসেছে, কিন্তু লোকে তো অনাহারে মরছে না।
এবারে নয়ডার কথায় আসি। সোসাইটি থেকে বেরোলেই দেখি পাঁচ ছয়টা গরু রাস্তায় ঘুরছে। কাছেই একটা গোশালা - সেখানে শদুয়েক গরু। স্বাভাবিক ভাবে দুধ বন্ধ হয়ে গেলে, সাধারণ গৃহস্থ গরু ছেড়ে দেয়। আগে এদেরকে কিনে নিয়ে স্লটার হাউসে নিয়ে যাওয়া হত। মাংস ছাল সবই অর্থকরী ভাবে কাজে আসত। এই সাইকেলটাকে ব্রেক করে দেওয়াতে, আজ কেওস হচ্ছে।
ধরা যাক কচুরীপানা। এটা ১৮ শতকে ব্রাজিল থেকে এক অর্কিড প্রেমিক নিয় আসেন। পরবর্তীকালে বাংলার জলাশয় ঢেকে যায় কচুরীপানাতে। এমনকি ১৯৩৭ এর প্রভিনশিয়াল নির্বাচনে সব পার্টির ইস্তাহারে কচুরীপান নির্মূল করা একটা অঙ্গীকার ছিল। দুটো এক্সাম্পল দিলাম, যে বাড়ন্ত জিনিষেও ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
আগে শুনতাম বিদেশ থেকে আগত দেশীয় নাগরিকরা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনে জল খায়। ভারী আশ্চর্য লাগত। এখন তো আমরাও RO ওয়াটারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছ। বেড়াতে গেলে জল কিনে খাই। এবার সেই প্লাস্টিক বোতল ঠিকমত ডিসপোজ করার জন্য সচেতন হই। পরিবেশবান্ধব হতে হবে। অথচ সাধারণ পরিবেশে কূয়োর জল ফুটিয়ে খাওয়া যেটা ছোটবেলায় করতাম তা উঠে গিয়েছে। গরমকালে কুঁজোতে জল রেখে ঠান্ডা করে খেতাম, সেটা প্রায় নেই বল্লেই চল।
আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। অথচ এই আমরা পেট ঠিক রাখতে মিনারেল ওয়াটার খাচ্ছি, আবার বিয়ন্ড লিমিট পিএম টু পয়েন্ট ফাইভ নিশ্বাসের সঙ্গে ঢোকাচ্ছি। ওটা দেখা যায় না, তাৎক্ষনিক এফেক্ট নেই, তাই চ্যাঁচামেচি কম।
এখানে আমার প্রশ্ন হল ল অফ ন্যচারাল এক্সটিংশন প্রযোজ্য হবে না কেন? মানুষ হিসাব আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণে মূল স্টাডি হওয়া উচিত সেই প্রজাতির জীবজগত থেকে বিদায় নেওয়া, এক্ষেত্রে আমাদের অর্থ্যাৎ মানুষের পরিবর্তিত লাইফস্টাইলে কতটা বিপরীত এফেক্ট আনছে। আজ যদি কাক, চড়াই না থাকে, তবে আমাদের জীবনে কোন নেগেটিভ ব্যাপার আসবে কি? যদি না আসে, তবে এক্সটিংশনে ক্ষতি কি? যেহেতু আমাদের জীবদ্দশায় এই পাখিগুলো আমাদের জীবনযাত্রায় জড়িত ছিল, পরিবেশবাদীরা এই নিয়ে মাথাব্যাথা দেখাচ্ছেন।
শুনেছি সরকারের ব্যাঘ্র প্রকল্প বেশ সাকসেসফুল। মানুষ ও সরকার এই ব্যাপারে মাথা ঘামিয়েছেন, তার পিছনে বড় কারণ হল তার ম্যাজেস্টিক চেহারা ও তার শিকার ধরা। এদেরকেই ধরে আমরা চিড়িয়াখানায় রেখে লোকেদের আনন্দ দিই বা বড় গেম রিজার্ভে তাদের চলাফেরা মানুষ উপভোগ করে, ফটো-ভিডিও তোলে। পুরোটাই নিজেদের আনন্দের জন্য। গ্রীন হাউজ গ্যাস নিয়ে চ্যাঁচামেচির ও কারণ আবহাওয়ার চেঞ্জ ভবিষ্যতে মানুষের এক্সটিংশনের কারণ হতে পারে। আমরা ক্ষুদ্র পরিবেশবাদীরা যতই কাজ করি না কেন, পরিবেশের ভারসাম্য অল্প কিছু লোকের চেতনার মধ্যে দিয়ে সম্ভব নয়। যখন নিজেরাই কাচড়া ডিসপোজালের ব্যাবস্থা করে নিচ্ছি তবে কাক যদি না থাকে তাহালে ক্ষতি কি। “সারভাইভাল অফ দি ফিটেস্ট” কথাটাতো আজকের নয়। বাকীরা কি বলেন?
দেবদত্ত
২০/০৫/২০

Comments
Post a Comment