ল্যাবে লঙ্কাকান্ড

 


ল্যাবে লঙ্কাকান্ড।

সেই রামায়নে ছিল, হনুমান লেজের আগুনে লঙ্কা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। আজকাল আগুন লাগার অধিকাংশ ক্ষেত্রে কালপ্রিট হচ্ছে ইলেকট্রিকের তার। এবারে সেই তারের থেকে আগুনের উৎপত্তি যদি কলকাতার এক স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর ইউনিভার্সিটির খোদ ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টে হয় তবে ব্যাপারটাবিদ্যাস্থানে ভয়ে বচগোছের হয়ে পড়ে। ভয়েরই কথা। সহপাঠিনী যিনি ওই ডিপার্টমেন্টেআলোর দিশারীঅর্থাৎ ইল্যুমিনেশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করে থাকেন তার মুখেই সব শোনা গেল। ঘটনার ঘনঘটার শুরু মধ্যরাত্রে। এটা আবার চারতলার উপরে টংএর ঘর, তবে ঘনাদার নয়। ল্যাবের নাম যদিও ইল্যুমিনেশন তবে ভিতরে ঢুকলে পূর্ণিমার বদলে অমাবস্যা। চারিদিকে অন্ধকার, যেন ফটোল্যাবের ডার্করুম। আলোর এক্সপিরিমেন্ট করতে গেলে নাকি অন্ধকারের প্রয়োজন। কোথাও একটা এইরকম ফিলোজফিক্যাল বাণী শুনেছিলাম - অন্ধকার আছে বলেই আলোর উপলব্ধি করা যায়।

দিনটা ছিল ২৩এ মার্চ। ছাত্ররা সেই অন্ধকারকে সঙ্গী করে রাত দুপুরে  ইউনিভার্সিটির রাস্তায় এক্সপিরিমেন্টরত। ডিআরডিওর প্রোজেক্ট। হেড দিদিমনিও সমানতালে লেগে আছেন। এসব এক্সপিরিমেন্টে অন্ধকার চাই, এবং লোক চলাচল শূন্য হওয়া দরকার। তাই রাত বারটা মাহেল্দ্রক্ষণ। তবে ওই যে বলেঠিক দুপ্পুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলাসেই রকমই এক ব্যাপার থেকে লঙ্কাকান্ডের সূত্রপাত। আমার সহপাঠিনী আবার ছাত্রদের সিরিয়াস গাইড। ছাত্ররা তাকেহাম লোগ সব দেখ লেঙ্গে, আপ ঘর মে আরাম করিয়েএই আশ্বাসে বিশ্বাস  করে রাত সাড়ে বারটায় বাড়ী পাঠিয়েছে। ছাত্রদের পেটে ছুঁচোর কেত্তন। প্যাকেটের ডিনার এসে পড়ে আছে। সবাই তার সদ্ব্যব্যবহারে ব্যস্ত। একটি ছেলে ধরা যাক তার নাম কৌশিক সে তখন টংএর ঘরে একা। উপরের পরিষ্কার বাথরুমে মাইনাস করতে ঢুকেছে। হঠাৎ উপরের ফলস সিলিংএ পট পট, দুম দাম আওয়াজ। ভৌতিক ব্যাপার।কৌশিক দুড়দাড় করে তলায় নেমেছে। সময়টা সোয়া বারটা নাগাদ। বন্ধুরা আওয়াজ দিল-“হয় ভাঙ খেয়েছিস, নয়ত ঘুমের ঘোরে ভুলভাল শুনেছিস দারোয়ান বল্ল অনেক সময় উপরের টিনের চাল আর মাঝের ফলস সিলিংএর মধ্যে বিড়াল বা ভাম  ঢুকে পড়ে। মনে হয় ওসব কিছুর আওয়াজ হবে। খাওয়া দাওয়া সেরে একজন রিসার্চ স্কলারের খেয়াল হল ল্যাব থেকে একটা ল্যাপটপ আনা হয় নি। সে আরো দুইজনকে বগলদাবা করে (কারণ ভূতের ভয়, একটু আগে অশরীরীর পায়ের আওয়াজ পাওয়া গিয়েছে) উপরে এসে দেখে সর্বনাশ সিঁড়ির ডানদিকে এবং বামদিকে, দুদিকেই ল্যাব। বামদিকে আবার চারটে রুম। একটার নাম জানা গেল মানিক সরকার ল্যাব। প্রখ্যাত জাদুকর পি সি সরকারের ছেলে। তিনি আলোর জগতের হোমরা চোমরা লোক। বিদেশে থাকেন। পুরানো কিছু যন্ত্রপাতি দান করেছিলেন। সেসব এখন ঢাকের গায়ে মনসা বিকানোর অবস্থা। কারণ সেগুলো সচল রাখতে কুলিং দরকার। অত ইনফ্রাস্ট্রাকচার ল্যাবে নেই। ওই রুমগুলোর একটার মধ্যে থেকে কালো ধূয়া বেরিয়ে চারিদিক ছেয়ে ফেলেছে। রুমের ভিতর থেকে আগুনের হলকা। সামনের রুমটা তখনও অক্ষত। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি সর্বগ্রাসী আগুন থেকে মূল্যবান জিনিষগুলিকে বাঁচানোর। দিল্লির বস্তিতে আগুন লাগলে একই ব্যাপার দেখা যায়। লোকে প্রাণের ভয় উপেক্ষা করে অস্থাবর সম্পত্তি বাঁচানোর চেষ্টা করে। আগুন নিভে গেলে পরেরদিন ধ্বংসাবশেষ থেকে কিছু অবশিষ্ঠ জিনিষ খুঁজে বার করার চেষ্টা করে। এখানেও তার অন্যথা হল না। ল্যাবের মূল্যবান জিনিষ মানে যন্ত্রপাতি। সেগুলো কিছু উদ্ধার হল  প্রথম রুম থেকে। গোটা কয়েক ফায়ার এক্সটিংগুইশার ছিল। তবে আমাদের দেশের প্রথা অনুযায়ী প্রায় সবই এক্সপায়ারড। একখানা অপারেট হল বটে। তবে আগুন তখনও ফলস সিলিংএর উপরে। একটা সিলিন্ডার কোন কাজেই এল না।সিঁড়ির ডানদিকে যে ল্যাবটা ছিল, সেটা ইনট্যাক্ট। ইউজি ক্লাসের ছেলেদের জন্যই বেশী ব্যবহৃত হয়। 

ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পর ফোন গেল হেড দিদিমনির কাছে। তিনি সবে তখন ডিনারে বসেছেন। ফোন গেল প্রথমে ফায়ার ব্রিগেডে। গড়িয়াহাট ফায়ার স্টেশন থেকে টিংটিং করতে করতে ছুটে এল ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ী। তবে তার সাইজ ছোট। পাঁচতলার জতুগৃহ ট্যাকেল করার মত তার দম নেই। বড় গাড়ীর জন্য আবেদন গেল। ততক্ষণে হেড দিদিমনি পড়ি কি মড়ি করে কোনমতে খাওয়া শেষ করে আবার অকুস্থলে। ডিপার্টমেন্টের বেশ কিছু ছাত্র স্যার ইতিমধ্যে এসে হাজির হয়েছেন। তারা কেউ স্বপ্নেও ভাবেন নি যে এরকম ঘটনা খোদ বিদ্যাস্থানে ঘটবে।  ফ্যাক্টরি কি বস্তি নিদেনপক্ষে হাসপাতালে আগুন লাগাটাই দস্তুর। এরকমটাই কাগজে লেখা আসে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাসরুম ইত্যাদি বেশী, সেখানে আগুন কি ভাবে লাগতে পারে। ইমোশন্যাল বাঙ্গালী কেউ কেউ কান্নাকাটি শুরু করেছেন, হেড দিদিমনি বকুনি লাগালেন- “কেঁদে কি হবে, পারলে কিছু পজিটিভ কাজ কর। সারা বিল্ডিং ঘুটঘুটে অন্ধকার। টর্চ আর মোবাইলের আলোতে কাজ চলছে। ঘন্টাখানেক পরে ফায়ার অফিসার জানালেন -আগুন নিভেছে। কিন্তু একটু পরে দেখা গেল অন্য একটা জায়গাতে আবার আগুন ধরেছে। আবার পড়িমড়ি করে অফিসার দৌড়ালেন। আরো ঘন্টাখানেক কাটল। আগুন নিভেছে। ছাত্র এবং মাস্টারমশাইরা কোমর কষে অভিযানে প্রস্তুত। যদি কিছু উদ্ধার করা যায়। যে ঘরে মেনলি আগুন লেগেছে সেখানের সাতটি তালাবন্ধ আলমারিতে সাত রাজার ধন মানিক লুক্কায়িত। ল্যাবের সব দামী ইনসট্রুমেন্ট এই সব আলমারীতে থাকে। স্টীলের আলমারি। আলমারির ভিতরে তো আর আগুন ঢুকতে পারে না। মনে আশার আলো -সেগুলো রক্ষা পেয়েছে। আমরা যখন পড়েছি-আশির দশকের গোড়ায় তখন ব্যাপারটা ছিলন্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয় মেশিন ল্যাবে গাবদা গাবদা পঞ্চাশের দশকের কিছু মোটর জেনারেটার আর ইনুস্ট্রুমেন্ট ল্যাবে গ্যালভানোমিটার, রিওস্ট্যট ইত্যাদি। আজকাল যেমন ডাক্তরবাবুরা টেস্ট বিনা উষুধ লেখেন না, হবু ইঞ্জিনিয়ারদের দলও থিয়োরির বদলে প্র্যাকটিক্যাল নলেজে বিশ্বাসী। তাই দামী দামী যন্ত্রে ল্যাব ভর্তি। মধ্যবিত্তের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী ছাত্রদের অনেকেরই পায়ে চপ্পল। ফায়ার ব্রিগেড জল দিয়ে আগুন নেভানোর পর সেই গরম জল মাটিতে পড়ে তপ্তকুন্ড। কাউরই ধারনা নেইআফ্টারমাথ অফ ফায়ারযে কি জিনিষ। মেঝের গরম জলে অনেকেরই পা পুড়ল।প্রেমে হাফসোল, পায়ে ছ্যাকা, এই নিয়ে বেঁচে থাকা 

ফায়ার ব্রিগেডের অফিসার বল্লেন- তাঁরাই আলমারিগুলো খুলে দিয়ে যাবেন। কারণ ভিতরে গ্যাস ফর্মেশন হয়ে থাকতে পারে। এবার চাবি খোঁজার পালা। ল্যাবের চাবি যার কাছে থাকে, তার বাসস্থান অনেক দূরে। খুঁজেপেতে একসেট ডুপ্লিকেট বার হল, তাতে গোছা গোছা চাবি। খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার মত সেখান থেকে খুঁজে পেতে গোটা তিনেক আলমারির চাবি পাওয়া গেল। ভিতরের যন্ত্রপাতি কাঁদুনে গাইছে-“ভেঙে মোর ঘরের চাবি….”! আলমারি খোলার পর যে টুকু আশার আলো ছিল, তা নির্বাপিত হল। প্রত্যক্ষভাবে আগুন না লাগলেও অত্যধিক তাপে সব ইনস্ট্রুমেন্ট গলে গিয়ে চেনা দায়। 

এবারে ঘটনার শবব্যবচ্ছেদের পালা। কেঁচো খুঁড়তেই সাপের মত প্রশ্নপ্রবাহ লহরীর মত এক এক করে সামনে আসতে লাগল।

ক্রমশঃ


পর্ব

আগুন লাগার পর মনে হচ্ছে, এতদিন যে আগুন লাগেনি, সেটাই চরম বিষ্ময়। প্রথমেই বলি ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্টের বিল্ডিংটির কথা যতদূর জানি প্রথমে দোতলা বিল্ডিং ছিল, পরে ছাত্রসংখ্যা বাড়ল আর আমরাও ভার্টিক্যালি গ্রো করতে শুরু করলাম। তিনতলা হল, তারপর পিছনদিকে একটা বেঢপ টাইপের এক্সটেনশন হল। পুরানো থেকে নূতন বিল্ডিংএ যেতে গোলকধাঁধার মত সিঁড়ি দিয়ে চলাচলের রাস্তা। তারপর চারতলা। পাঁচতলাটার ছাদ আবার টিনের, তলায় ফলস সিলিং। পাঁচতলা তোলার সময় এক্সসিসটিং বিল্ডিং এর স্ট্রাকচারাল ইনটিগ্রিটি চেক করে দেখা হয় নি নিশ্চয়ই, কারণ তাহালে বিল্ডিং এর তলা খোদাই করে কলামের ডেপ্থ, সাইজ দেখতে হত। সুতরাং শস্তায় বাজিমাত। কর্তৃপক্ষও পকেটের রেস্তর ব্যাপারটাতে বেশী নজর দেন। ফলে প্রাপ্তি একটা বেখাপ্পা টাইপের বিল্ডিং। আমরা আবার বাম জমানার মানুষ, দেখন-সৌন্দর্যটা আমাদের কাছে বিলাসিতা। ৮২-৮৩ সালে কনভোকেশনের সময়ঝিল কা উসপারএর অনেক পিছনে রেল লাইনের কাছাকাছি একটা জায়গাতে ফাংশনটা হয়েছিল। সেই প্রথম ওদিকে যাওয়া। অতটা ফাঁকা জায়গা পড়ে আছে দেখে বড় আশ্চর্য হয়েছিলাম। একটা সম্পূর্ণ নূতন ধাঁচের আধুনিক বিল্ডিং কি করা যেত না সেই জায়গাতে? কিন্তু আমরা নস্টালজিয়াতে ভুগি। পিতৃপুরুষের ভিটা ছেড়ে কে আর দূরে যেতে চায়। অথচ রুটিরুজির তাগিদে সেই বাঙালি দূরদূরান্তরে পাড়ি জমাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিতভাবে সাফাই গাইবেন, এই সামান্য ফি আছে বলেই না গরীব ঘরের ছেলেরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারছে। যত গুড়, তত মিঠা।ভাল বিল্ডিং চাও তো প্রাইভেট কলেজে বেশী ফি দিয়ে যাও। তবে পুরানো দিনের সঙ্গে আজকের কি তুলনা হয়। এখন তো ব্যাংক লোন সহজলভ্য। আর যাদবপুর থেকে পড়লে মোটামুটি চাকরীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল। লোন তো শোধ হবেই। 

এবার ধরা যাক জোড়াতালি দিয়ে বিল্ডিং এর কলেবর বৃদ্ধি হল, তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার গুলো কি তুল্যমূল্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন ধরুন আর্দিং। ইলেকট্রিকাল যারা পড়েছেন তারা সবাই জানেন প্রপার আর্দিং কত জরুরী। শর্ট সার্কিট, লাইভ ওয়্যার থেকে শক খাওয়া, এসব বাঁচাতে প্রপার আর্দিং জরুরী। এবার ধরুন আদিতে বিল্ডিংএর দুপ্রান্তে আর্দিং ছিল। বিল্ডিং বড় হলে আরো আর্থ পিট চাই। সেগুলো ইন্টারকানেক্ট করা দরকার। এবারে আই এস অনুযায়ী ভেন্ট পাইপে মাঝে মাঝে জল ঢেলে চারকোল ভিজাতে হয়। যে কোম্পানি বিজলি দিচ্ছে তারা অথবা মিউনিসিপ্যালিটি এসে সব চেক করে বিল্ডিং/সাপ্লাই ক্লিয়ারেন্সের সার্টিফিকেট দেবে। সেই অনুযায়ী নূতন লোড স্যাংশন হবে। যারা এবার এসব সার্টিফিকেট দেবেন তারা অনেকেই প্রাক্তন ছাত্র। টিচারদের প্রতি শ্রদ্ধাতেই তারা রিকোয়ারমেন্ট ওভারলুক করবেন। এমনটাও শুনলাম যে হঠাৎ হঠাৎ করে ভোল্টেজ ফ্লাকচুয়েশনে ফ্যান জোরে বা আস্তে ঘুরছে। কারণ হচ্ছে আনইক্যুয়াল লোড ডিস্ট্রিবিউশন ইন ফেজেস এবং ইমপ্রপার আর্থিং এর জন্য। এটাই হচ্ছে প্রদীপের তলায় অন্ধকার। বাঘা বাঘা ইঞ্জিনিয়ারদের ইনস্টিটিউশনে বিজলির প্রবলেম। যারা মেনটেনেন্স করেন তাদের দৌড় বাল্ব বা ফিউস বদলানো পর্যন্ত, কিন্তু গোড়ায় গলদ ধরার ক্ষমতা তাদের সীমিত। শুনলাম ইএলসিবি কোথাও লাগানো ছিল না, ওটা থাকলে নিউট্রালে কারেন্ট ফ্লো হলে সার্কিট ট্রিপ করার কথা। শুনলাম বেশী দাম বলে লাগানো হয় নি। ওটা ছাড়াও তো চলে যাচ্ছিল। সুতরাং ইএলসিবি লাগানো বাহুল্য বলে মনে হয়েছে, অথচ ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা এর প্রয়জোনীয়তা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল বলেই ধরে নিতে পারি। 

এবার ধরা যাক মেন ডিবি, যেখান থেকে লোড ডিস্ট্রিবিউট হচ্ছে, সেটা পঞ্চাশ বছরের পুরানো। বর্ধিত লোড অনুযায়ী পুরানো ডিবি চেঞ্জ করে নূতন ডিবি লাগানো দরকার ছিল। সে সব তো হয় নি। যখন যেখানে রুম বেড়েছে, জোড়াতালি দিয়ে এক্সটেনশন করা হয়েছে। 

এখন অনেকে প্রশ্ন করছেন এত দামী ল্যাব, তার কি কোন ইনসিওরেন্স করা ছিল না। খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেটা জানা গেল, যে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে কোন কিছুই ইনসিওরড নয়। এখানেই ম্যানেজমেন্ট স্কিলের প্রশ্ন এসে যায়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে এত মূল্যবান যন্ত্র ব্যবহার হত না, রুম হত খোলামেলা, এয়ারকন্ডিশনিং এর ব্যবস্থা রাখতে গিয়ে, ফলস সিলিং, এসি ইত্যাদি লাগানো হচ্ছে। এসির লোড অনেক বেশী থাকে। ঠিকমত কানেকশন করতে না পারলে, মানে লুজ কানেকশন থাকলে, হাইকারেন্টের ফলে হিট হয়ে জয়েন্ট থেকে আগুন লাগার প্রভূত সম্ভাবনা। বেশীরভাগ ইন্ডাস্ট্রি বা অফিস বিল্ডিংএ ফলস সিলিং এর উপর ফায়ার এলার্ম এবং স্প্রিংকলার সিস্টেম থাকে। স্প্রিংকলারের জলের পাইপ প্রেসারাইজড থাকে। হিট সেন্স করলে স্প্রিংকলারের হেড এর সেফটি ডিভাইস খুলে জল বেরিয়ে আগুন নেভাতে সাহায্য করে। এছাড়া লিনিয়ার হিট সেন্সিং কেবল থাকে। তাদের কাজ টেম্পারেচার বাড়লে এলার্ম প্যানেল থেকে এলার্ম বাজানো। এগুলি মাথায় রেখে যারা ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে আছেন, তাদের আরো প্রো এক্টিভ হওয়া উচিত ছিল। শিক্ষকরা ছাত্র পড়ান, তারা এসব ব্যাপারে সচেতন নাই থাকতে পারেন।

শুনলাম ফলস সিলিং আর উপরের টিন শেডের মধ্যে দিয়ে কেবল লে করা ছিল। এক তো যারা ইনস্টল করেছিল, তারা তার-টার বিছিয়ে কানেকশন করে চলে গিয়েছে, পরে ফলস সিলিং লেগেছে। টিনের ছাদ ফলস সিলিংএর মধ্যে হাই টেম্পারেচার থাকে, কারণ সূর্যের আলো ডাইরেক্ট রুফে পড়ে। এমবিয়েন্ট বেশী হলে তারের কারেন্ট ক্যারিইং ক্যাপাসিটি কমবে। ওভার হিটিং হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। এবারে সার্কিট ব্রাঞ্চিং এর জন্য জয়েন্ট হয়ত লুজ থেকেছে। সব মিলিয়ে জায়গাটা পোটেনশিয়ালি ভালনারেবল টু ফায়ার। 

আরো একটা জিনিষ জানা গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন সেফটি অফিসার নেই। সিকিউরিটি গার্ড তো সমস্ত জায়গায়, ইন্ডাস্ট্রী থেকে ইনস্টিটিশন সব জায়গায় আছে, পাবলিক নিয়ন্ত্রণ করতে। তেমনি সেফটি অফিসার, সেফটি অডিট, সেফটি ড্রিল এগুলোও আজকাল অত্যাবশ্যক, শুধু ইন্ডাস্ট্রী নয়, বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও জরুরী  

তবে যে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। আমি আজ যা লিখলাম, সেটা ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পরে। বছর তিনেক আগে ওই ল্যাব দেখেছিলাম। অন্ধকারে কন্ধকাটা নিয়ে মজার কিছু লিখেছিলামও। আগুন লাগতে পারে, ধরনের চিন্তাও মাথায় আসে নি। আমাদের মনেসুটাই ঘোরে, “ডাল মে যে কালাথাকতে পারে তা ভাবি না। 

শুনলাম ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ কোটিরও বেশী। ইউনিভার্সিটি খালি টাকা দেবে, পুড়ে যাওয়া সিভিল ইনফ্র্যাস্টাকচার লাইটের বন্দোবস্তো করতে। বাকী যন্ত্রপাতির টাকা ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল ফান্ডিং কোথা থেকে আসবে? আলোর পরীক্ষাগারে আশার আলো কারা যোগাবে? কিছুটা নৈতিক দায়িত্ব কি ভূতপূর্ব ছাত্রসমাজের নয়, যারা প্রায় নিখরচায় এখান থেকে ডিগ্রি নিয়েছেন? শুনলাম এখন অব্দি দশলাখ টাকা যোগাড় হয়েছে। পিনাট- বলা যায়। রবীন্দ্রনাথও ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছিলেন বিশ্বভারতীর নির্মানকার্যে। এখানে হয়ত সেরকম এগ্রেসিভ ক্যাম্পেন করলে সুফল পাওয়া যাবে। বিদেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন ছাত্র আছেন। তাদেরকে এপ্রোচ করাটা জরুরী।

দেবদত্ত 

২৯/০৫/২২

মানিক সরকার ইল্যুমিনেশন ল্যাব আগুনের পর
               আগুন লাগার আগে

            দমকল আগুন নেভানোর পর



Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments