চাল-চিত্র (ইনটারেস্টিং জ্ঞানগম্যি)
চাল-চিত্র
এই লেখাটা হয়ত নীরস, জ্ঞানগম্যিওয়ালা মনে হতে পারে। তবে টপিকটা আমার বেশ ইনটারেস্টিং লাগল। আগে এই ব্যাপারটা জানতাম না এবং আমার মনে হয় অনেকেরই ব্যাপারটা সম্বন্ধে সম্যক ধারণা নেই।
ছোটবেলায় যে আমরা রান্নায় নুন ব্যাবহার করতাম, সেগুলো হত মোটা মোটা দানার। ১৯৬২-৬৩ সালে ভারত সরকার প্রথম, মাস-স্কেলে, নুনে আয়োডিন মেশাতে শুরু করে। এর কারণ সমীক্ষাতে দেখা গিয়েছিল, কোস্টাল এরিয়া ছাড়া, ভারতের বাকী ভূভাগে মাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আয়োডিন না থাকায়, শাক-সব্জীতে আয়োডিনের অভাব। ফলে সাধারণ লোক থাইরয়েড ও গলগল্ড রোগে ভুগত। নুনটা সব রান্নাতেই লাগে। তাই সরকার থেকে নুনে আয়োডিন মেশানোর পরিকল্পনা হয়। ২০০৯ সালে গর্ভনমেন্ট নুনে আয়োডিন মেশানো বাধ্যতামূলেক করেছে।
সম্প্রতি ভারত সরকারের সার্ভেতে দেখা যাচ্ছে, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে সুষম ডায়েটার অভাবের জন্য, শিশুরা অপুষ্টি জনিত নানারকম ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি যেমন ভিটামিন বি১২, ভিটামিন এ, ফলিক এ্যাসিড, আয়রন ইত্যাদিতে ভোগে, কারণ তারা শাকসব্জী বা প্রোটিন কম খায়। এই অপর্যাপ্ত সুষম আহারের অভাবকে ইংরাজিতে বলে ‘হিডেন হাঙ্গার’। ভারতীয়দের মেন স্টেপল ফুড চাল ও গম। অনেক আগে বাজারে লাল লাল চাল পাওয়া যেত যেটাকে আমরা ঢেঁকিছাটা চাল বলতাম। সেটার দাম কম হত মিলে ছাঁটা ফকফকে সাদা চালের তুলনায়। আজকাল আবার উল্টোটা হয়েছে, ডেকিছাটা চাল স্বল্প পরিমাণে বাজারে পাওয়া যায় এবং কিছু উচ্চবিত্ত, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ তা কিনছেন বেশী দাম দিয়ে। চাল ব্রাউনিস-লাল হওয়ার কারণ ছিল ধানের তলায় থাকা চালের উপরের লাল কোটিং যেটাকে তুষ বা হাস্ক বা ব্রান বলা হয়, সেটা ডায়বেটিস, কোলেস্টরল ওবেসিটি ইত্যাদি কমানোর জন্য উপকারী। সমীক্ষাতে জানা যাচ্ছে এই মুহূর্তে ভারতে ম্যাল নিউট্রেশন ও খাদ্যাভাবে ৪০% বাচ্চার সঠিক গ্রোথ হচ্ছে না। আরো বড় কারণ গর্ভাবস্তায় মা সুষম খাবার পাওয়ার অভাবে, ভূমিষ্ঠ শিশু কমজোরী হয়ে জন্মায়।
বেশ কিছুদিন ধরে কাগজে মাঝে মাঝে দেখি ‘পি এম পোষন কেয়ার’ প্রোগ্রাম লঞ্চ হয়েছে। আমার ধারণা ছিল এই সরকারী স্কিমের আওতায় গরীব শিশুদের আরো স্টেপল ফুড দেওয়া হবে। কিন্তু হিন্দি ‘পোষণ’ কথাটার বাংলা হল পুষ্টি, অর্থাৎ পুষ্টিকর খাবার যাতে ভিটামিন ও মিনারেল আছে। সরকারের পক্ষে বাড়ী বাড়ী শাক-সব্জী বিলানো সম্ভব নয়। সরকারের হাতে আছে পিডিএস বা রেশন ব্যবস্থা। এ ছাড়া মিড ডে মিলও আছে। যবে থেকে করোনা শুরু, তবে থেকেই সরকার জনপ্রতি পাঁচ কিলো চাল ও গম দিচ্ছে। প্যান্ডেমিক শেষ হয়ে গেলেও অলরেডি এই স্কীম সেপ্টেম্বর অব্দি বর্ধিত হয়েছে এবং আরো হবে, কারণ বাফার স্টকের ১০০ মিলিয়ন টন চাল বাদ দিয়েও সরকারের কাছে এই মুহূর্তে আরো ১০০-১৫০ মিলিয়ন টন রাইস আছে, যা কিনা সরকারি গুদামে বেশীদিন রাখলে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা । সুতরাং নুনের মত যদি চালেও ভিটামিন বা মিনারেল মেশান যায়, তবে সহজেই গরীব লোকের কাছে ভিটামিন ও মিনারেল সাপ্লিমেন্ট পৌছবে। এই নিয়ে ২০১৬ থেকে পাইলট প্রজেক্ট শুরু হয়েছে।
এবারে এই এনরিচড চাল কি ভাবে তৈরী হবে সেটা জানিয়ে বক্তব্যে ইতি টানব। ঢেকিছাটা চালের সঙ্গে ভিটামিন ও মিনারেল মেশানো হবে এক্সট্রুশন প্রসেসের মাধ্যমে। এই পদ্ধতিটাকে ইংরাজিতে বলা হয় ‘ফর্টিফিকেশন অফ রাইস’। এতদিন ফর্টিফিকেশন মানে জানতাম কোন একটা জায়গাকে ফোর্ট, সৈন্যসামল্ত দিয়ে সুরক্ষিত করা। ল্যাঙ্গুএজও ডাইনামিক এবং এরকমভাবেই ভাষার প্রয়োগ বদলায়। তো এই ফর্টিফায়েড রাইস শতকরা একভাগ মিলে ছাঁটা চালের সঙ্গে মিশিয়ে আমরা বাজারে যে চাল খাই তার পরিবর্তে আনা হবে। এই রাইসে জলে ফোটালেও তার ভিটামিন ও মিনারেল চালে বিদ্যমান থাকবে।
তবে এই স্কিম বাস্তবায়নে ভারতের সব চালকলকে এক্সট্রুশন মেশিন ও ব্লেন্ডিং মেশিন লাগাতে হবে, যেটা প্যান্ডেমিকের কারণে পিছিয়ে গিয়েছে। কথা ছিল ২০২৪শের মধ্যে সমস্ত প্রদেশে পিডিএসের মাধ্যমে ফর্টিফায়েড রাইস দেওয়া। খুব তাড়াতাড়ি এর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, তবে এমন একটা সময় আসার সম্ভাবনা খুব উজ্জ্বল, যখন আয়োডাইজড নুনের মত ফর্টিফায়েড রাইসই খালি পাওয়া যাবে।
দেবদত্ত
২৫/০৪/২২

Comments
Post a Comment