দিল্লিতে বাংলা নাট্যোৎসব ২০২২
এলটিজি হলের সামনে আমি ও গৌতম
দিল্লি নাট্যোৎসব ২০২২
এই মার্চ মাসের বসন্তকালটা দিল্লিতে সবচেয়ে সুন্দর সময়। অধিকাংশদিন ঝকঝকে রৌদ্রকরোজ্জ্বল, রাতে হাল্কা ঠান্ডার আমেজ। লেপ বেশ কিছুদিন হল বক্সবেডে ঢুকে গিয়েছে। ‘টু বি অর নট টু বি’র মত, সোয়েটার পরব কি না পরব সেটা নিয়ে দ্বিধা থাকে। লুটিয়েনস দিল্লির প্রশস্ত রাজপথের মিলনস্থলের গোল চক্করগুলো তে সিজনাল ফ্লাওয়ার বেডে রংএর রায়ট। ওমিক্রনভীতি ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। করোনার আগে দিল্লির সংস্কৃতির পীঠস্থান মান্ডি হাউসের হলগুলি, যেমন ধরুন শ্রীরাম সেন্টার, কামানী অডিটোরিয়াম, এলটিজি, রবীন্দ্রভবন, ত্রিবেণী কলাসঙ্গম, সবতেই কোন না কোন প্রোগ্রাম লেগে থাকে। নাটক, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, ও ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের অনুষ্ঠানই বেশী অনুষ্ঠিত হয়।সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্য প্রায় লটারি লাগার অবস্থা। মজার ব্যাপার, অধিকাংশ অনুষ্ঠানই নিখরচায় দেখা যায়। মেট্রো লাইন হওয়ার পর থেকে মান্ডি হাউসের জনপ্রিয়তা উর্ধমুখী। আমার সোসাইটির কাছেই নয়ডা, সেক্টর-৬২র মেট্রো স্টেশন। সেখান থেকে পয়ত্রিশ মিনিট পরেই প্রাণচঞ্চল মান্ডি হাউস,
মান্ডি হাউস মেট্রো স্টেশনের কাছে
রাজীব চকের দুটো স্টেশন আগে। বাংলা ‘আগে’ কিন্তু, হিন্দির নয়।
আজ থেকে বছর কুড়ি আগে, যখন বাচ্চারা ইস্কুলের মিডিয়াম ক্লাসের ছাত্র, তখন সামার ভ্যাকেশনে থিয়েটার ওয়ার্কশপ বেশ পপুলার ছিল। আমাদের কলেজের এবং এনটিপিসিতে আমার ব্যাচমেট, অমলেন্দুর দুই ছেলে বাবি, ছোটু আমার ছেলে মেয়ের সমবয়সী। অমলেন্দুর থিয়েটার স্কিল ওর ছেলেদের মধ্যেও ছিল। ওরা ওয়ার্কশপ করত। মাসখানেকের ওয়ার্কশপের পর শ্রীরাম সেন্টারে সেই নাটক প্রদর্শিত হত। আমরা সব বাবা-মা দল বেধে যেতাম। তারও অনেক আগে মান্ডি হাউসের গোলচক্করের পাশে হিমাচল ভবনে যাদবপুর এল্যামনির নাটক প্রদর্শিত হয়েছে। মেন প্রটাগনিস্ট অবশ্য বিই কলেজের ছিল, তার নাম ছিল কল্যাণ। সিআর পার্কে আমার রুমমেট ছিল। পরে ভুটানে চলে গেল চাকরী নিয়ে। যাক গে, পুরানো দিনের কথা ছেড়ে আজকের জমানায় ফিরে আসি।
গতকাল থেকে নয়াদিল্লী কালীবাড়ী পরিচালিত অখিল ভারতীয় বাংলা নাটক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। হোয়াটস্ এ্যপের কল্যাণে সহজেই খবর চলে আসে। সি আর পার্কে আমাদের সংস্কৃতিকী ক্লাবের এক মহারথী গৌতম ওরেফে মাতলা, দিল্লির নাট্যসমাজের এক বিদগ্ধ ব্যাক্তি। ওই আমাকে উৎসাহ যোগায় নাটক দেখতে। করোনা কারণে গত বছর কিছুই হয় নি। ২০২০ এর পর আবার গেলাম। সাড়ে পাঁচটা থেকে শুরু নাটক। শর্ট ড্রামা, এক ঘন্টা করে এক একটি। বেশ ঠাসা পোগ্রাম। নাটকের মাঝে মিনিট পনেরর বিরতি। অনুষ্ঠানটা চলছে এলটিজি হলে। নাটক যারা মঞ্চস্থ করলেন তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত নাট্যগোষ্ঠীগুলি দলে ভারী, কয়েকটি সংস্থা দিল্লির লোকাল নাট্যগোষ্ঠী।
যে জিনিষটা লক্ষণীয় সেটা হল পুরানো ট্র্যডিশনাল ছক থেকে বেরিয়ে, আজকের কমপ্লেক্স জীবনযাত্রার টানা পোড়েনে উদ্ভুত বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিচ্ছবি। ইন্টারনেট, স্মার্টফোনের যুগে, দেশকালের গন্ডী ছাড়িয়ে খবর পৌছে যাচ্ছে নিমেষে। যে কালচারাল ট্র্যডিশন পাল্টাতে বহুযুগ সময় লাগত, আজ সময় এসেছে ফিউশনের। অনেক আগে রবিশংকর, ইহুদি মেনুহিনের ফিউশন মিউসিক জনপ্রিয় হয়েছিল। আজ যুগের পরিবর্তনের সাথে সামাজিক চেতনার মেলবন্ধন ঘটছে। সামান্য উদাহরণরূপে বলি দিল্লি সাইডে আন্টি, আঙ্কেল, মাম্মী, পাপা চলে।আমাদের সময় কাকু, কাকি, বাবা, মা ডাকার চল ছিল ওয়েস্ট বেঙ্গলে। এখন কলকাতার দিকে আঙ্কল আন্টি বেশী কমন। এখানের মত কলকাতাতেও ছেলেকে বেটা বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। পিলু বলে একটা সিরিয়াল দেখছি। তাতে নায়িকার, হনুমানের ভক্তি, খুব দেখান হচ্ছে। থেকে থেকেই সে নাড়া লাগাচ্ছে ‘জয় বজরংবলী’। এটাই হচ্ছে কালচারাল এসিমিলেশন। সিরিয়ার যুদ্ধ, অফগানিস্থানের ক্রাইসিস, ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা, এসবের ঘটনাক্রম ছবিসহ হাতের মুঠোর মুঠোফোনে পাওয়া যাচ্ছে।
প্রথম নাটকটার নাম ছিল ‘অচিন্ত্য স্বজন’। বিষয়বস্তুটা প্রথমদিকে বোঝাই যাচ্ছিল না। তারপর মহিলারা নাইটি পরে পার্ট করছেন। “দেখন দৈন্যতা” বাঙালীর হলমার্ক। একটু ভাল পোষাকে অভিনয় করতে কি হয়? অভিনেতাদের ড্রেস সেন্সও তথৈবচ। কস্টউম জিনিষটা আমার মনে হয় খুব জরুরী নাটকের ক্ষেত্রে। চরিত্রের অনেকটাই ফুটে ওঠে পরিহিত পোষাকের গুনে। একটি মহিলা জীবনযুদ্ধের তাগিদে পঙ্কিলতার আবর্তে নিমজ্জিত। এক ব্যাক্তি তাকে রাস্তায় দুস্কৃতীকারীদের হাত থেকে বাঁচায়। পরে জানা যায় সে এক ছদ্মবেশী পুলিশ অফিসার। নাটকের বক্তব্যের থেকে নাটকীয়তা বেশী। চরিত্রচিত্রণ দুর্বল। মোটের উপর যথেষ্ট কাঁচা উপস্থাপনা।
নাটক শেষ হতে আমি আর গৌতম বেরোলাম সামনের চত্বরটাতে। পাশেই কালিবাড়ী পরিচালিত খাবার স্টলে বেশ ভীড়। মাছের চপ, সিঙ্গাড়া, রসগোল্লা, চা সবই পাওয়া যাচ্ছে।
মাছের চপ ও সিঙ্গারার দোকানে বিশাল কাটতি
কলকাতা স্টাইলে ক্যাশ পারচেজ। পেটিএমের কোন সিন নেই। মাছের চপ, সিঙ্গাড়া দুটোই সমান লোভনীয়। কোনটা ছাড়ি কোনটা খাই। শেষমেশ দুটোই খেলাম। তারপর চা।
এরপরের নাটকের নাম ‘সোনার হরিণ’। আগরপাড়ার গ্রুপ। থিমটা বেশ ভালো লাগল। একটা মেয়ে, সে সুন্দরী। বাঙালী আর পাঁচটা মেয়ের মত সে নাচ শিখেছে। কিন্তু সেটা পাড়ার মঞ্চেই সীমাবদ্ধ। তার উচ্চাকাঙ্খী হবু বর তাকে বম্বের রিয়েলিটি শোতে নিয়ে যায়। বাড়ীতে আদরে লালিত মেয়েটি তার নিরাপদ, স্নেহচ্ছায়ামন্ডিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে গুরুকুলে থাকে। উদ্দেশ্য রিয়েলিটি শোয়ের গ্রুমিং। অনেক রঙীন স্বপ্ন দেখান হয়। সুকোমল মনগুলির মনন ঘূর্ণিত হতে থাকে এক গ্ল্যামারাস জগতের হাতছানির প্রত্যাশায়। অসংখ্য প্রতিযোগীর মধ্যে শিকে ছেড়ে দুই একজনের মধ্যে। তবুও সহজে ঘোর কাটে না। ভাবে এতসহজে হার মেনে বাড়ী ফিরে যাবে। স্বপ্নপথের আকাশ কুসুম উচ্চতা থেকে সে বাস্তবের ধরণীতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। হতাশা তাকে কুড়ে কুড়ে খায়। ট্রমা থেকে মুক্তির উপায় পরিবারের স্নেহের পরশপাথর। শেষ সিনটি ড্রামাটিক। মেয়েটির হতাশার অভিব্যক্তি জীবনের ক্যাকোফনির কোলাহলে হারিয়ে যায়। থিমটা বাস্তবের জ্বলন্ত প্রতিফলন। আজকাল নাচগানের রিয়েলিটি শোতে যখন বিচারকদের মন্তব্য শুনি, মনে হয় গল্পের গরুকে গাছে চড়ানো হচ্ছে। অভিনয় প্রায় সবারই ভাল।অভিনয়ে মেয়েটির মুখের অভিব্যক্তি তার মনের ভাব যথার্থ রূপে প্রকাশ পেয়েছে। বেকার ভাইয়ের অভিনয়ও সুন্দর, বিশেষত খালি গলার গান মনে দাগ কাটে।
তৃতীয় নাটকের নাম ‘কোন একদিন হয়ত বা’। নাটকের শুরুতে দেখানো হচ্ছে একটি এ্যমেচার নাট্যগোষ্ঠী তাদের পরবর্তী শোয়ের জন্য নাটকের অনুসন্ধান করছে। একজন জানাল কাগজে আসা ছোট্ট একটি খবর। বিদেশে কোন এক রেবেল গোষ্ঠি স্কুলে ঢুকে বাচ্চাদের পণ হিসাবে ব্যবহার করছে। একটি গর্ভবতী নারী জার্নালিস্ট নিউজ কভার করতে গিয়ে এক অভিনব উপায়ে প্রতিবাদের উপায় স্থির করে। এই তমসাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সে তার অনাগত সন্তানকে ভূমিষ্ঠ হতে দেবে না। এই খবরটুকু থেকে নাট্যগোষ্ঠী তার নাট্যরূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। এখানে মেয়ে জার্নালিস্ট, কর্তব্যকে প্রায়োরিটি দিয়ে, কভার করতে যায় ঘটনাটির। কিন্তু প্রতিবাদের উপায়টি কুশীলবগন বদলে দেয়। সৃষ্টির বিনাশ অভিপ্রেত নয়, জীবনের জয়গান প্রাণের উন্মেষের মধ্যে। তাই ভ্রুণহত্যা প্রতিবাদের হাতিয়ার হতে পারে না। যুদ্ধের প্রতিবাদ সম্মিলিত মানুষের শুভবুদ্ধির উদয়। দলবেধে মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ শুরু করে। যুদ্ধের দামামা থামে। যদিও প্রতিবাদের পন্থাটি অতি সরলীকৃত, তাহালেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এধরনের উপস্থাপনা সামাজিক চিন্তাভাবনার প্রতিফলন হিসাবে ধরা যায়।
পরেরদিনের প্রথম নাটকের নাম ‘খুন হবার পর’। বিষয়বস্তু ধর্মভিত্তিক ভেদাভেদ, যা আমাদের দেশে এক অভিশাপ। বিষয়বস্তুর যদিও অতিচর্চায় দূষিত, তবে উপস্থাপনা অভিনবত্বের দাবী রাখে। লাশকাটা ঘরে দুটো দাঙ্গায় নিহত দেহকে নিয়ে কনফিউশন। বহিরঙ্গের অবয়বে চেনার উপায় নেই। কোন বিচ্যুতির কারণে নাম উল্লেখ নেই। লাশকাটা ঘরে ডোম ও ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে দুটি মৃত যুবকের কথোপকথনে জানা যায় তারা একে অপরকে চিনত। কৈশোর বয়সে, বন্ধুত্বের মধ্যে ধর্মের রেষারেষি থাকে না। পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও ঘটনাক্রম, যেটা হয়ত একটা তুচ্ছ ঘটনা এবং লোকের রটনা, স্খুলিঙ্গ থেকে দাঙ্গার দাবানল ছড়ায়। মৃত্যুর পর দুই বন্ধুই লাশ, বাবা-মায়ের মনে গভীর ক্ষত, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের তকমাধারীরা তাদের স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যস্ত। অভিনয়, ড্রামাটিক সিকোয়েন্সে আলোর খেলা সব মিলিয়ে দর্শককে এনগ্রস করে রাখে।
এলটিজি অডিটোরিয়াম চত্বরে সেলফিসত্যি ঘটনা গল্পের চেয়েও অদ্ভুত হতে পারে তার জ্বাজ্জল্য প্রমাণ নাটক দেখতে এসে পেলাম। দুনম্বর নাটকের পর বাইরে দাড়িয়ে চা খাচ্ছি। পাশে দাড়িয়ে তিন-চারজন মধ্যবয়স্ক গল্প করছেন। একজনকে আমি চিনি। সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটে চাকরি করেন। দিল্লির ঐতিহাসিক জায়গাগুলি নিয়ে প্রভূত জ্ঞান। হেরিটেজ ওয়াক করান। ওনার গ্রুপের নাম ‘লাভিং এন্ড নোয়িং দিল্লি বেটার’। দুবছর আগে কনট প্লেসে হেরিটেজ ওয়াকে গিয়ে আলাপ। আরো দুজন, তারাও মনে হল সরকারী চাকুরে, একজন দিল্লিতে সদ্য আগত। জোরকদমে আগামীকাল পাঁচ রাজ্যের ভোটগণনার প্রেডিকশন করছেন। গোয়াতে তৃণমূলের ফুটিং হবে কিনা তাই নিয়ে ‘চায়ে পে চর্চা’। পাশে দাড়িয়ে আমারই বয়সী এক ভদ্রলোক চা খাচ্ছিলেন। সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বল্লাম-‘সামনে তো জোর আলোচনা চলছে। কালকেই তো রেজাল্ট।’ নিয়ম অনুযায়ী এরকমভাবেই বাক্যলাপ শুরু হয়। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম কবে থেকে দিল্লিতে আছেন? কাজকর্ম করেন, না কি রিটায়ার্ড?বল্লেন, ৭৮ থেকে দিল্লিতে। এয়ারফোর্স থেকে রিটায়ার করে ব্যাংকে ছিলেন। গতবছর থেকে পুরোপুরি রিটায়ার্ড। নাম বল্লেন বাসব লাহিড়ী। আমাকে নাকি কোথাও দেখেছেন, প্লেস করতে পারছেন না। আমি নিজের নাম ও বাসস্থান জানালাম। জিজ্ঞাসা করলেন- ‘দিল্লিরই আদি বাসিন্দা না কলকাতা থেকে? প্রত্যুত্তর দিয়ে, সৌজন্য খাতিরে জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কোথা থেকে? পড়াশুনা কোথায়?’ উনি অম্লানবদনে জবার দিলেন- ‘আমি যাদবপুর থেকে ইলেকট্রিকাল পাশ করেছি ১৯৮২তে। আমার চোয়াল ঝুলে গেল। প্রথমে ভাবলাম ভুল শুনেছি। দুবার জিজ্ঞাসা করাতে ৮২ ও যাদবপুর ইলেকট্রিকাল কনফার্ম করলেন। আমি বল্লাম -‘কি আশ্চর্য আমিও তো ৮২ সালের ইলেকট্রিক্যল। এই নামে তো কেউ আমাদের ক্লাসে ছিল না। আমাদের হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপেও আপনি নেই। কাউর সঙ্গে যোগাযোগ নেই? লাহিড়ী বাবু (আসল নাম কি না কে জানে) স্ট্রিট স্মার্ট। জবাব দিলেন ‘ অনেক দিনের ব্যাপার তো ভুলে গিয়েছি’। জিজ্ঞাসা করলাম আপনি কি নাইটে পাশ করেছেন?’ উনি নির্বিকারমুখে জানালেন না, উনি ডেস্কলার ছিলেন। সিবিআইয়ের দুঁদে গোয়েন্দার মত আপাদমস্তক দেখে প্রশ্ন করলাম - “আপনি যে বল্লেন ৭৮ থেকে দিল্লিতে আছেন? তাহালে আপনি যাদবপুর থেকে বিরাশি তে পাশ করলেন কি করে?” জুতসই প্রশ্ন করতে পেরেছি ভেবে একটু আত্মপ্রসাদ অনুভব করলাম। আমি যদি ‘সিবিআই’ হই উনিও তাহালে ‘নটবরলাল’। বল্লেন ‘ আরে না, ওই নক্সাল আমলে চলে আসি, আবার আটাত্তরে গিয়ে পাশ করে আবার ফিরে আসি। আচ্ছা আপনি কি দুবছর আগে পাশ করেছিল অমুককে চিনতেন?’ উত্তরের আগেই নাটক শুরুর ঘন্টা বেজে গেল। তড়িঘড়ি করে উনি পা বাড়ালেন হলের দিকে। পরে আফশোষ হল, ইস, মোবাইলে ফটো তুলে রাখলে পরে গোয়েন্দাগিরির সুবিধে হত।
নাটকের দৃশ্যাবলী
পরের নাটকের নাম ‘নির্জন পথের ধারে’। নাটকের উপজীব্যও বর্তমান জীবনের টানাপোড়েন। অসদুপায়ে টাকা রোজগার একটা নেশার মত। তেমনই এক ডাক্তার, তার পরিবারের থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু ধন-সম্পত্তি কি পারিবারিক সুখশান্তির অন্তরায়? টাকা নিশ্চয়ই জরুরী স্বচ্ছল জীবনযাত্রার জন্য, সঙ্গে ওয়ার্কলাইফ ব্যালেন্সও জরুরী। ডাক্তার টাকার মোহে ইল্যিগ্যল এবরশন, ফেক মেডিক্যল সার্টিফিকেট ইস্যু করে। স্ত্রীএর বারণ শোনে না। চূড়ান্ত ক্ল্যাইম্যাক্সে সে টাকার বিনিময়ে এক খুনীকে নার্সিংহোমে থাকার সার্টিফিকেট দেয়, যে সময়ে খুন করেছিল সেই দিনটির জন্য, পরমুহূর্তে জানতে পারে লোকটি তার বোনের ধর্ষনের প্রতিশোধ নিতে ডাক্তারেরই রেপিস্ট ছেলেকে খুন করেছিল। ডাক্তার তার কৃতকর্মের যোগ্য ফল পায়। অনুশোচনার অন্ত থাকে না, কড়া দামে চুকাতে হয় অপকর্মের ফল। অভিনয় চলনসই গোছের। যে দুষ্কর্মের পরিণতি দেখান হল, তা কিছুটা সিম্বলিক লাগল, কারণ বর্তমান জীবনে টাকার জোরে-‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’
প্রথম দুটি পরিবেশনা ওয়েস্ট বেঙ্গলের নাটক গ্রুপের। তৃতীয় পরিবেশনাটি দিল্লির অনেক পুরানো গ্রুপ করোলবাগ বঙ্গীয় সমাজের উপস্থাপনা।যেহেতু দিল্লির গ্রুপ, তাই সেট সাজানোতে কোন কার্পণ্য করে নি। নাটকটা সিম্বলিক। প্রথমদিকে চিত্রনাট্যের দৌর্বল্য, নাটক অনেক ড্র্যগ করেছে। বিষয়বস্তু অনুযায়ী, এক গৃহস্থের অনুপস্থিতিতে, তার বাড়ীর জামাকাপড়ের তোরঙ্গটি, এলাকার সিপাহী, এক মাতালকে প্রলুব্ধ করে চুরির চেষ্টা করে। এরপর কোতোয়ালের আগমন, যে পদমর্যাদায়, সিপাহির উপরে। তার নজর একাকী ঘুমন্ত বধূটির গয়নার উপর, এরপরে আসেন উজির, তিনি চান বধূটিকে ভোগ করতে। নাটকের ক্লাইম্যাক্সে দেখা যায়, ঘর থেকে স্বয়ং রাজামশাই বেরোচ্ছেন সব লুন্ঠন করে। রাজা সাফাই দেন-কোষাগার শূন্য। তাই গরীবের সম্পত্তি লুন্ঠনই একমাত্র হাতিয়ার, কারণ গরীবের প্রতিবাদে অক্ষম। রাজার অবস্থা মনে করিয়ে দেয়, সেই কবি নীরেন চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতাটি। ডায়ালগ ও চরিত্রগুলি, আগেকার বাংলা নাটকগুলির মত, সিম্বলিজম ব্যাপারটা ধরা পড়ে নাটকের চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেটুকু জোরাল বক্তব্য বাদ দিলে, বাকী সময়টা গতানুগতিক, জোলো। চরিত্রচিত্রণ মোটামুটি, মাতালের অভিনয়ে অতি নাটকীয়তা। মোটের উপর ঠিকঠাক।
বাড়ী ফেরার সময় একটা মজার ঘটনা বলি। ফেরার সময় মেট্রোতে বসে বেশ মনোযোগ সহকারে আমার ‘তথাকথিত ক্লাসমেটের’ এনকাউন্টারের বিবরন লিখছি। মনে হল একবার যেন এন্যাউন্স হল সেক্টর ৬২ আসছে। ভাবলাম- দূর - এত তাড়াতাড়ি হবে না। দরজাটা খোলা ছিল। স্টেশনের নামটা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ট্রেন চলতেই দেখলাম নয়ডা ৬২ স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। ভাবলাম যাঃ-একেই দেরী হয়ে গিয়েছে, এর উপর স্টেশন মিস করে গেলাম। যাক পরের স্টেশনটাই টার্মিনাস। ওখানে স্টেশন ছেড়ে যাবার ভয় নেই। আরো মিনিট পাঁচেক দেরী হবে এই যা। ট্রেন থেকে নেমে, সিঁড়ি চড়াই উৎরাই করে ফিরতি ট্রেন পাওয়া গেল। সব সীট খালি। দাড়িয়েই থাকলাম। স্টেশন মিস করা যাবে না। ট্রেন দাড়িয়েছে ৬২তে। অপেক্ষা করছি দরজা খুলবে। খুলছে না দেখে, পিছন ঘুরে দেখি, উল্টোদিকের দরজা বন্ধ হচ্ছে। ও হরি, তার মানে প্ল্যটফর্ম উল্টোদিকে ছিল। চশমার কাঁচ, মেট্রোর কাঁচের রিফ্লেকশনে, আমি ভেবেছি আমার দিকেই প্ল্যটফর্ম। একটা ইয়াং ছেলে আমায় দেখে বুঝেছে গড়বড় করে ফেলেছি। সে আমকে বোঝাচ্ছে ‘ আঙ্কেল, কোইবাত নেহি, নেক্সট স্টেশন মে উতারকে, বাহার মত যাইয়ে, প্ল্যটফর্ম চেঞ্জ করকে দুসরা ট্রেন লে লিজিয়ে।’ আমি আবার নিজের দুরাবস্থা সবিস্তারে বর্ণনা করতে ভালবাসি। ওকে সগৌরবে জানলাম যে একটু আগেও একই ভুল করেছি। বুঢ্ঢা হো গিয়া লাগতা হ্যায় এটাও জানালাম। যাক এরপর আর ভুল হয় নি। সেক্টর ৫৯ এ নেমে আবার উল্টোদিকের মেট্রো ধরে সেক্টর ৬২। সব মিলিয়ে মিনিট দশেকের এদিক ওদিক।
মেট্রোতে কেস খেয়েপরের দিনের প্রথম নাটক ‘মানবতার মুখ’, চন্দননগরের নাট্যগোষ্ঠী। আমার মনে হয় নাটকের থিমটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য সবই চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি। মনে হয় না কোন লেখক অথবা নাট্যকার সম্পূর্ন কোন চরিত্র মন থেকে আঁকেন, কোন না কোন বাস্তবজীবনে দেখা ব্যাক্তির জীবনের সাথে মিল পাওয়া যায়। ঘটনাবলীও জীবনের কোন পাতা থেকে উঠে আসা। নাট্যবোদ্ধাদের কথা আলাদা, সাধারণ মানুষের কাছে সেই ধরনের থিমই বেশী এ্যপিল করবে, যা তার বা কোন পরিচিতর বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার সঙ্গে সে যদি মিল পায়। তবে ড্রামাতে কিছু নাটকীয় মোড় বা অন্তে একটি ক্লাইম্যাক্স দর্শকের মনে দাগ কাটার জন্য এসেনশিয়াল।
প্রায় বিগত দুই বছর ধরে বিশ্বব্যাপী করোনার দৌরাত্ব্যে, সারা বিশ্ব জুড়ে সাধারণ মানুষের জীবন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। নাটকের বিষয়বস্তু হিসাবে খুবই কনটেম্পোরারি। ঘটনাক্রম শুরু হয় একটি মধ্যবয়স্ক সুখী পরিবারের করোনা সময়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির টানাপোড়েনে। গৃহস্বামী উদারমনস্ক, হেল্পিং নেচার করোনাতে দুঃস্থ পরিবারগুলিকে সাহায্যের জন্য সদাপ্রস্তুত, যা অনেক সময়ই তার সংসারী বেটারহাফের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘটনাস্থল কলকাতা। মায়ের উদ্বিগ্নতার কারণ তার সন্তান, যে লকডাউনে দিল্লির হোস্টেলে আটকে আছে। করোনার দুর্দশার মধ্যেও একশ্রেনীর অসাধু লোক তারই ফাঁকে ফয়দা লুঠছে। ভদ্রলোকটি যে ফ্ল্যাটের জন্য টাকা গুনছিলেন, তার হ্যান্ডওভার ডেট এক্সটেন্ড হয়, টাকা লাগে বেশী। কমিউনিটি সার্ভিসে নিবেদিত প্রাণ লোকটির একসময় শোনা যায় চাকরি খুইয়েছেন। দুঃসময়ে সবাই হাত ফিরিয়ে নেয়। এমনকি স্ত্রীর বাবা ফোনে বলেন এবারে জামাইষষ্ঠী আসতে হবে না করোনার দোহাই দিয়ে, যদিও আসল কারন যদি মেয়েকে আর্থিক সাহায্য করতে হয়। ক্লাইম্যাক্সে জানা যায়, চাকরি যায় নি, আশেপাশের মানুষগুলিকে পরখ করতেই বেকারি-র ফাঁদানো গল্প। অন্তে স্ত্রী স্বামীর জনসেবায় যোগদান করেন, কারণ নিঃস্বার্থ সেবার মধ্যে লুকিয়ে আছে মানবতা।স্ত্রীর চরত্রচিত্রণ অত্যন্ত সাবলীল। সংলাপ ও দৃশ্যান্তরের গুণে নাটক তরতর করে এগিয়েছে।
এরপর যে নাটকটা হল সেটা, ইংরাজী নাটকের অনুবাদ শোনা গেল। কাঁচা হাতের অনুবাদ। নাটকের বিষয়বস্তু হৃদয়ঙ্গম করা শক্ত। চাইল্ড এবিউস নিয়ে কাহিনী। থানাতে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে আসা হয়, চারজনকে খুনের অভিযোগে। মৃতরা একই ফ্যামিলির। বাবা-মা ও জুভেনাইল ছেলে-মেয়ে। গ্রেপ্তার হওয়া লোকটি একজন লেখক। তার লেখা গল্পগুলির মধ্যে আসল খুনের ধরণের আশ্চর্যজনক মিল। আসল কালপ্রিট বাবা-মা। অভিযুক্তের ভাইও খুনের মধ্যে জড়িত ছিল বলে, দাদা তাকেও লকআপে খুন করে ও পুলিশের গুলিতে, সেও মারা যায়।স্টোরিলাইন বেশ মরবিড। ইন্টারভ্যালের সময় বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েকজন নাটকের ব্যাপারে বলাবলি করছেন। গ্রুপটা পশ্চিম বিহার, দিল্লি থেকে এসেছে। এরাও সব ওই গ্রুপের বা পাড়া পড়শী। তিন-চারদিন ধরে আসছি। প্রথমদিকের কিন্তু কিন্তু ভাবটা কাটিয়ে উঠেছি। বন্দুকের ব্যারেল যেমন ফায়ার করতে করতে গরম হয়ে ওঠে, আমিও এখন অকুতোভয়। কাছে গিয়ে টপকে পড়ে প্রশ্ন করলাম - “নাটকটা কি আপনারা কিছু বুঝলেন? আমি তো কিছু বুঝি নি।” মানে পুরো আত্মসমর্পন করলাম। এ ধরনের পরিমন্ডলীতে “জানি না” বলাটা ব্রাত্য। একজন আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বল্লেন “আরে এটা তো চাইল্ড এব্যিউসের উপর”। বল্লাম “থিমের সারাংশ নয়, নাটকে যেটা দেখান হল সেই মূল গল্পটা বোঝা যায় নি। উনি বেশ রাগতস্বরে বল্লেন এসব নাটক চুপ করে বসে দেখতে হয়। বুঝলাম এনাকে না ঘাঁটানোই ভাল। ওদের গ্রুপের আরেকজন জানালেন, প্লে টা বিদেশী নাটকের অনুকরণে এবং দুঘন্টার নাটক ছেঁটে একঘন্টা করা হয়েছে। একতো টপিকটাই উইয়ারড তার উপর কাচি চালিয়ে দফারফা।
পাড়ার মাঝারিমাপের থিয়েটারগ্রুপগুলিতে যারা থাকেন, তাদের মধ্যে শুধু অভিতেনা নন, নাট্যকারও থাকেন। যেটা বলতে চাইছি, সেটা হল যে আজকাল, নাটক খালি নামকরা কিছু নাট্যকারের লেখা নাটক অভিনয় হয় না, মাঝারি মাপের (গুণের দিক থেকে মাঝারি নয়) নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বহু লেখকের লেখা নাটকের অভিনয় হচ্ছে। “যত মত, তত পথ” এর মতো “যত মাথা তত ভিন্ন বিষয়বস্তু। নানা ধরনের বিষয়ের উপর নাটক লেখা হচ্ছে, যেমন ধরুন - একটি নাটকে কিছু লোককে সাজানো হয়েছে শুয়োর, যারা বসবাস করে একটি হাইরাইজের পাশে, বঞ্চিত গোষ্ঠীর শ্রেণীসংগ্রামে জোটবদ্ধতার গুরুত্ব বোঝান হয়েছে নাটকটিতে। একটি নাটকে, এক ভাড়াটে বাড়ী ছাড়ার সময়, জিনিষপত্র গোছগাছ করতে গিয়ে দেখা গেল অপ্রোয়জনীয় জিনিষের আধিক্য যা হয়ত অনেক আগে ফেলে দিলে বাড়ীতে স্থানসংকুলানের অভাব নূতন বাসাতে যাবার চিন্তা আসত না, যার তুলনা করা হয়েছে জীবনস্মৃতির তুচ্ছ ঘটনা, যেগুলি মন থেকে দূর করে, চলমান পারিপার্শ্বিক জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারলে রোজকার জীবনে স্বাচ্ছন্দ আসা অবশ্যম্ভাবী। একটি নাটকে দেওঘর স্টেশনে প্ল্যাটফর্মে কুলিদের জীবনযাত্রা ও মহাজনেরকাছ থেকে ধার নিয়ে পরবর্তীতে এক্সপ্লয়টেশনের গল্প। দেহাতী বিহারী সংলাপ নাটকটির হলমার্ক। এই নাটকটি উল্লেখের কারণ, বাংলা নাটক প্রতিযোগিতায়, অন্য একটি প্রদেশের ডায়ালেক্ট ও জীবনযাত্রা তুলে ধরা হয়েছে, যা বোঝাচ্ছে বর্তমান চিন্তাধারা প্রাদেশিকতার গন্ডী লঙ্ঘনে পারঙ্গম। থিমের বৈচিত্র্য থাকার জন্য এই আটদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের রোজকার তিনটি করে নাটক দেখতে কখনো একঘেয়েমি লাগে নি।
আরেকটা জিনিষ লক্ষ্য করা গেল,কলকাতা সাবার্বান শিল্পাঞ্চলগুলি থেকে যেমন, আগরপাড়া, বেলঘরিয়া থেকে আগত দলগুলির নাটকে দেখা প্রতিবাদী সত্তা, যা নিশ্চিত রূপে ক্ষয়িষ্ণু শিল্পসংস্থার আর্থসামাজিক টানাপোড়েনের প্রতিফলন।
আরেকটা ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করছি। ব্যাপারটা হল গিয়ে অনেক নাটকেই রবীন্দ্রসংগীতের বহুল উপস্থিতি। যে গানগুলি ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলির সুর, তাল, লিরিক্স - মেলোড্রামাটিক নাটকের ছন্দের পরিপন্থী। একটি নাটকে কয়েকটা ফোক সঙ ব্যবহৃত হয়েছে। সেই গানগুলির সুর, ছন্দ সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে সাযুজ্য।
দেবদত্ত রায়
নয়ডা ৬২
১৪/০৩/২০২২







Comments
Post a Comment