করবেট ভ্রমন

 

             আমাদের রিসর্ট ব্যানিয়ান রিট্রিট

করবেট রিসর্ট

রামদিয়ে উত্তরাঞ্চলের সমভূমিতে দুটো বড়জায়গা আছে। একটার নাম রামপুর এবং আরেকটা হল রামনগর। রামপুরের নাম কিন্তু রামায়ণ বর্নিত রামের নামে নয়। স্যার হেনরি রেম্যাজের নামে। ব্রিটিশ শাসনকালে উনি ছিলেন কুমায়ূনের কমিশনার। তাকে বলা হত কুমায়ূনের মুকুটহীন রাজা। তারই নামে রামপুর। এছাড়া রামপুরের অরেক পরিচয় হল, আফগান নবাব শাসিত রোহিলাখন্ড, ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ অউধ এর নবাব সুজা উদ দৌল্লার সম্মিলিত শক্তির কাছে পরাজিত হয়, এরপর ফয়জল্লা খান পরে তার বংশধরেরা খালি রামপুরের নবাব হিসাবে, ভারত স্বাধীন হওয়া অব্দি রাজত্ব করেন। 

রামনগর শহরটার কাছে হচ্ছে ভারত বিখ্যাত জিম করবেট ন্যাশানাল পার্ক। এইটি হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে অবস্থিত। তরাই এর উত্তরে হচ্ছে ভাবর, তারও উত্তরে পাহাড়ের শুরু। ভাবর -১৬ কিমি বিস্তৃত অঞ্চল, যা উত্তরে সিন্ধু থেকে পূর্বে তিস্তা অব্দি বিস্তৃত। এখানের মাটি প্রধানত নুড়ি পাথর বালি দিয়ে তৈরী। অসংখ্য গিরিখাদ দিয়ে পাহাড় থেকে বৃষ্টির জল এসে পোরাস ভূমিতে ঢুকে যায়। সারফেসে নদীর উৎপত্তি তরাই থেকে শুরু। 

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি গেট আছে। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে নামকরা হল ঢিকালা, এছাড়া আছে ধানগড়ি, আমডান্ডা, ঝিরনা। তবে গেটের ভিতরে প্রাইভেট গাড়ী এলাউড না। অনলাইনেও এনট্রির পারমিশন পাওয়া যায়। শোনা গেল, জিম করবেটে প্রায় আড়াইশ বাঘ আছে।

জঙ্গলের মেন কোর এরিয়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে রামগঙ্গা। পাশ দিয়ে আরেকটি নদী আছে। সেই নদীর নাম কোশি। আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক রিসর্ট। রিসর্টগুলো বেশ জনপ্রিয়। আমরা ছিলাম ট্যাগ হলিডে গ্রুপের ব্যানিয়ান রিট্রিট বলে একটা রিসর্টে। বেশ সুন্দর সাজানো গোছান রিসর্ট। আমাদের রুমটা ছিল স্যুইট। আমরা ছিলাম এমএপি প্ল্যানে। রিসর্টের পিছন দিয়ে বয়ে গিয়েছে কোশি নদী। রিসর্টের এনট্রি গেটের শেষ এক কিলোমিটার কাঁচা রোড। নয়ডা থেকে গাড়ীতে পৌছাতে লাগল ছয়ঘন্টা, তাও ননস্টপ। মোরাদবাদ বাইপাসের পর কাশীপুর অব্দি ষাট কিমি রাস্তায় বড় বড় গাড্ডা।  তারপর বিশ কিলোমিটার রামনগর অব্দি রাস্তা ভাল। আমাদের রিসর্টটা রামনগর ছাড়িয়ে আরো কিমি। বারটার সময় এসে পৌঁছালাম। আমাদের রুমটা ছিল দোতলায়। ২৫ মিটারের একটা সুন্দর সুইমিং পুল আছে। একটু বিশ্রাম করে চলে গেলাম পুলে। এপ্রিল শুরু না হলেও দিনের বেলা বেশ গরম। পুলে একটু সাঁতার কেটে শরীরটা জুড়িয়ে গেল, ছয়ঘন্টার টানা ড্রাইভে একটু ক্লান্ত ছিলাম, সেটা দূর হল। আমাদের রুমের পাশেই ক্যান্টিন। দুপুরে খেলাম বাটার নান, ডাল মাখ্খনি, আর ভেজিটেবল জলফ্রেজি। বেশ টেস্টি বানায় দেখলাম। বিকালে চা খেতে গিয়ে দুই ফ্যামিলির সঙ্গে আলাপ। ওরা থাকেন মোরাদাবাদ। সন্ধ্যায় আলোর মালায় সাজান রিসোর্টটা ঘুরে দেখলাম। তিনটে বাসে করে স্কুলের মেয়েরা এসেছে। পতঞ্জলির হরিদ্বারে রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পড়ে সবাই। কলকাতার একটি মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল। সে খাস কলকাতার বিডন স্ট্রীটে থাকে। বেচারা করুণ মুখে জানাল, হোস্টেলে মাছ খেতে পায় না। আরও বল্ল মাছ না খেলে বুদ্ধি বাড়বে কি করে। আমি বুঝে পেলাম না কলকাতা থেকে বাবা-মা কেন এতদূরে পড়তে পাঠিয়েছেন। রাতে বুফে ডিনার ছিল। ননভেজের মধ্যে খালি কড়াই চিকেন। আলু-গোবি, মটরপনির আর ডালমাখানি ছিল। এছাড়া আইসক্রিম চিড়ের পায়েস।

সকালে উঠে নটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট সারলাম। রিসোর্ট থেকে বেরোতে বেরোতে দশটা। ইচ্ছে আশপাশটা একটু ঘুরে দেখব। এখান থেকে নৈনিতাল পঞ্চান্ন কিমি। কাছাকাছিও মধ্যে দশ-বার কিলোমিটারে আছে  পাওয়ালগড় ফরেস্ট। ওর কাছে আরেকটা গেট আছে সিতাবনি বলে করবেট ফরেস্টের একটা বাফার জোনে যাবার গেট। সুন্দর পিচের রাস্তা শাল-মেহেগনির জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ রাস্তার পাশে দেখলাম বনবিভাগের রেস্ট হাউস। রাস্তা থেকে ভিতরটা দেখে খুব লোভনীয় লাগল। একটা ছবির মত ব্রিটিশ আমলের বাংলো। গেটে তালা লাগানো। ঘুরপথে একটা রাস্তা দিয়ে ঢুকলাম। বাংলোটা শতাব্দী প্রাচীন, ১৯১২ সালে তৈরী। পাশে বিশাল দুটি গাছ। তার কান্ড দেখলে চমকে যেতে হয়। 


পাশেই
একটা ফলকে লেখাপাওয়ালগড়ের কুমারনামে পরিচিত মানুষখেকো, ১৯৩০ সালে জিম করবেট যখন মারেন, তখন তিনি এই বাংলোটাতে ছিলেন। কেয়ারটেকারকে কোথাও দেখতে পেলাম না। সামনের রাস্তাটা কোটদ্বার গিয়েছে। বাংলো থেকে একটু এগিয়ে সিতাবনি জঙ্গলে ঢোকার গেট। খালি লোকাল গাড়ী ঢুকতে দেয়। ওখানের ফরেস্টের লোক জানাল, রেস্টহাউসে থাকতে গেলে ডিএফও রামনগর থেকে পারমিশন লাগবে। অনেক আগে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফরেস্টবাংলোগুলিতে থাকতে খুব কম টাকা লাগত, খালি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে পারমিশন করাতে হত। আজকাল ফরেস্ট জিপার্টমেন্টও কমার্শিয়াল হয়ে গিয়েছে। বেশীরভাগ বাংলো মার্কেট রেটে বুকিং দেয়। গোটা কয়েক বাংলো এখনও কমার্শিয়াল করে নি। তার মধ্যে পাওয়ালগড়টা একটা। 

           পাওয়লগড় ফরেস্ট রেস্ট হাউস
পাওয়লগড়ের কুমার-পাশে করবেট সাহেবের    কুকুর রবিন
করবেট সাহেব পাওয়লগড়ের কুমারকে মারার পর

ওখান থেকে আমরা গেলাম করেবট ফল দেখতে। টিকিট কাটতে হল গাড়ীর জন্য একশ এবং পারহেড এনট্রি ৫০/- এনট্রি গেট থেকে দেড় কিমি গাড়ী যায়। বাকী পাঁচশ মিটার এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে হেটে যে ফল দেখা গেল তাতে মন ভরল। বেশী উঁচু ফল নয়। ২০/২৫ মিটার উঁচু থেকে পড়ছে। জিম করবেট নামে একটা মোহ আছে। সেটার জন্যই বেশী লোক আছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ভালই ইনকাম। 

ওখান থেকে বেরিয়ে মেন রাস্তা ধরে একটু এগোলেই কাঠগোদাম যাওয়ার রাস্তা। ওই রাস্তা ধরে দুকিমি যেতে পড়ল কালাধুঙ্গি। জিম করবেটের জাঙ্গল লোর মাই ইন্ডিয়া তে পড়েছি উনি গরমকালে নৈনীতালে সামারে কালাধুঙ্গির এই বাড়ীটাতে থাকতেন। ঠিক মেন রাস্তার পাশে বিঘা জমির উপর বাংলো প্যাটার্নের বাড়ী। অনেকদিন আগে এটা মিউজিয়াম হয়েছে। করবেট সাহেবের শিকারী জীবনের অনেক ছবি, ওর ব্যাবহৃত জিনিষপত্র রাখা আছে। পাওয়লগড়ের কুমারের সঙ্গে শিকারের পর তোলা ফটোটাও দেখলাম। শেষ জীবনে উনি কেনিয়াতে ছিলেন। অকৃতদার। সঙ্গে থাকতেন ওর বোন ম্যাগি। কুমায়ূনের সাধারণ লোকেদের জন্য উনি অনেক জনহিতকর কাজ করে গিয়েছেন। তার মানুষখেকো বাঘ মারার কাহিনী তো লোকের মুখে মুখে আজও ফেরে। চারটে নাগাদ লাঞ্চ করে রিসর্টে ফিরে এলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে গেলাম রিসর্টের কাছে এক হনুমান মন্দির দেখতে। আকারে আয়তনে বিশাল। দূর দুরান্ত থেকে লোকে এসেছেন পুজো দিতে। মন্দিরের ভিতরের বিশাল হলঘরে তখন হনুমান চল্লিশা পাঠ চলছে। অনেক ভক্ত শুনছেন সেই পাঠ। মন্দিরের পিছন দিকে কোশি নদী দেখা গেল।

                   হনুমান মন্দির 

আজকে আর সুইমিং হল না। বিকালে লনে টি-কফি, স্ন্যকসের আয়োজন। রাতে বুফে ডিনার। সারাদিনটা ভালই কাটল। পরেরদিন আবার ঘরে ফেরার পালা। বুফে ব্রেকফাস্ট সুইমিং সেরে বেড়িয়ে পরলাম যখন, তখন ঘড়ির কাটা বারটা ছুঁই ছুঁই। আসার সময় কাশিপুর , রামনগর হয়ে এসেছিলাম। যাওয়ার সময় অন্য রুট নিলাম।প্রথমে বাজপুর, ওখান থেকে দেওরালা, টান্ডা হয়ে মোরাদাবাদ বাইপাস। আজকাল মীরাট এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ার পর বেশ স্পীডে ড্রাইভ করা যাচ্ছে।সাড়ে পাঁচটায় নয়ডাতে পৌছে গেলাম। 

দেবদত্ত

২৮/০৩/২২

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments