ইলিশ বৃত্তান্ত (রম্যরচনা)


 ইলিশ বৃত্তান্ত (পার্ট )

নদীর উৎসমুখের মত লেখারও একটা উৎস থাকে। সে কথাটাই আগে বলে নি। সকাল সকাল হোয়াটস্ এ্যপে একটা পোস্ট পেলাম যে শীঘ্রই গঙ্গা, পদ্মার ইলিশ আরো অনেকটা উজানে সাঁতরে, পৌছাতে পারে এলাহাবাদ বা অধুনা প্রয়াগরাজ অব্দি। ১৯৭৮এ ফরাক্কা ব্যারেজ চালু হওয়ার পর, ইলিশের গতিবিধিতে চীনের প্রাচীর হয়ে দাড়িয়েছিল এই ব্যারেজ। এখন সেটা বার্লিন ওয়ালের মত হটে গেল। ব্যারাজে এলএন্ডটি কোম্পানি কিছু মডিফিকেশন করেছে। ব্যাপারটা পুরো খোলসা না হওয়াতে ইংরাজী পেপারে যা লিখেছে সেটাই হুবহু তুলে দিলাম-‘new lock, meant to create a safe navigational passage, between water pools at different levels’ এর পেছনে কারিগরী বিদ্যা যাই থাক, ইলিশ যদি এলাহাবাদ অব্দি এসে পড়ে, তারপর দয়া করে বামদিকে বেঁকে যমুনা ধরে তাহালে আমার মত দিল্লিবাসীর পোয়াবারো।

ছোটবেলাতে, বাবা, কাকার কাছে খুব শুনতাম পদ্মার ইলিশের নাকি জুড়ি নেই। তখন ঝাড়গ্রামে বর্ষাকালে আসত কোলাঘাটের রূপনারায়ণ নদীর ইলিশ। সেটাও খুব ভাল লাগত। কিন্তু অদেখা বা অচাখা পদ্মার ইলিশের প্রতি লোভটা বরাবরই বহাল ছিল। ৮২ সালের পর চাকরীসূত্রে চলে এলাম দিল্লি। আমার অনেক কলেজের বন্ধুরা পোস্টিং পেল ফরাক্কাতে। আমি ততদিনে দিল্লির রাজমা-চাউল, তন্দুর চিকেন, শর্ষকা শাকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। তার উপর সপ্তাহে দুদিন ছুটি। তাই দুঃখ পেলেও ফরাক্কার ইলিশটাকে স্যাক্রিফাইস করতে কষ্ট হয় নি। পরে অবশ্য বন্ধুরা বলেছিল, ইলিশ কমে গিয়েছে, দামও অগ্নিমূল্য। তাই শুনে কিছু সান্তনা পেলাম।

এখনকার কোভিড ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসির মত, বছর দশবার আগে শুরু হল শেখ হাসিনার ইলিশ ডিপ্লোম্যাসি। কলকাতার লোকেদের রসনা তৃপ্তি হল। মাঝে আকাক্ষিত তিস্তার জলের অংশ না পেয়ে হাসিনার হাসি-না হয়ে গেল। তখন আবার ইলিশ বন্ধ। আজকাল যেমন বেঙ্গল পলিটিক্সে গুজরাটি রাজত্ব, তেমনি দিল্লি তে শুরু হল গুজরাটি ইলিশ দেখতে বেশ চকচকে বড় সাইজ। দোকানদার জোর গলায় হেকে জানান দেবে- স্যার বাংলাদেশ থেকে সদ্য এসেছে। ইলিশের সুখ্যাতি তার স্বাদে, আকারে বা চেহারায় নয়।প্রথমে দর্শনধারী, পরে গুন বিচারিএই পন্থা অবলম্বনে অখেরে ক্ষতি। মোটা ইলিশ দেখে, মোটা ভাইয়ের গুগলীতে পা দিলেই জানবেন বিপদ। সম্প্রতি ঠাকুরনগরে গিয়ে ঘোষনা করে এসেছেন, টিকা লেগে গেলেই, নাগরিকত্ব দরাজ হাতে বিতরণ করবেন। মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হল, ১৩০ কোটির টিকা লাগানো কবে শেষ হবে। যারা টিকা নিতে চাইছেন না, তাদের কি আন্ডারটেকিং দিতে হবে- আমি টিকা লাগাব না। যদি তা না হয়, তবে টিক  টিক  করে ঘড়ির কাটা এগোবে, কিন্তু টিকা লাগবে না। দিদি হয়ত এই সুযোগেদুয়ারে টীকাপ্রকল্প গ্রহন করবেন। ইলেকশনেজয়টিকা জন্য টানটান লড়াই। এই যাঃ, মেন টপিক থেকে সরে যাচ্ছি। ছোটবেলায় কিছু ঘুড়ি হত, যে গুলি উড়ালে বেকে গিয়ে কার্নিক মারত, মানে ডানে বা বায়ে কাত হয়ে উড়ত আর দিকেই যেতে থাকত। নাছোড়বান্দা ঘুড়িকে সিধে রাখার জন্য,উল্টো সাইডে গ্যাটিস দিতে হত। আজকাল হাওয়াটাই রাজনীতির, তাই ইচ্ছে না থাকলেও কিরকম কার্নিক মারা ঘুড়ির মত লেখার গতিপরিবর্তন হতে থাকে।

যাক গে, যেটা বলছিলাম, গুজরাট ইলিশে, ধোকা খাওয়ার পর, সেটা বন্ধ ছিল। যখন বাংলাদেশে পোস্টিং হল ২০১৩তে, মনে মনে খুশী হলাম এই ভেবে, যে, পৈত্রিক ভিটেটাও দেখা যাবে, আর পদ্মার ইলিশও জমিয়ে খাওয়া যাবে। দুটো সাধই পূরণ হয়েছিল, তবে ইলিশের ব্যাপারটা একটু কমপিলিকেটেড, সেটাই খুলে বলি। কিছুদিন ঢাকায় থেকে, চলে গেলাম দক্ষিণবঙ্গের বাগেরহাট জেলার কাছে মংলাতে। বাগেরহাট, দেশভাগের আগে খুলনা জেলার অংশ ছিল। ২০০০ সালের আগে ফেরী বা নৌকাতে রূপসা নদী পেরিয়ে বাগেরহাটে আসতে হত।



এখন জাপানি এড- তৈরী, ঝা চকচকে রূপসা ব্রীজ পেরিয়ে সোজা মংলার রাস্তা।
                       খানজাহান আলি ব্রীজ (রুপসার উপর )আমি
যেখানে থাকতাম, সেখান থেকে সুন্দরবনের শুরু মেরে কেটে তিন-চার কিলোমিটার। পশুর নদীর উপর মংলা বন্দর। ওই রূপসা নদীটা সুন্দরবনের কাছাকাছি আসার পর নাম হয়েছে পশুর। না কোন পশু সংক্রান্ত ব্যাপার এতে নেই, সুন্দরবনে, গরান, সুন্দরী প্রভৃতি দামী গাছের মত পশুর গাছও দামী গাছ। মংলা বন্দরে জাহাজ নোঙর করা মানে, জাপানি রিকনডিশনড গাড়ী এসেছে। জাপানি বুদ্ধি, নিজের দেশ হলে পয়সা খরচা করে স্ক্রাপ-ইয়ার্ড বানাতে হত, পুরানো গাড়ী ঠিকঠাক করে এখানে পাঠিয়ে দিচ্ছে। একেই বলে উইন উইন সিচুয়েশন।

 

তো বহু প্রতিক্ষীত বর্ষাকাল এল। পশুর নদী দিয় স্পিড বোটে আমার রোজ যাতায়ত কর্মক্ষেত্রের জন্য। মাঝে মাঝেই বোট থামিয় ইলিশ কিনি নদীতে থাকা জেলেদের নৌকা থেকে। জ্যান্ত ইলিশ দেখার সৌভাগও ওইখানেই।কিন্তু সাইজ সবই ৫০০ গ্রামের কাছাকাছি।




 পশুরের ইলিশে বাংলাদেশের ইলিশের সেই আকাক্ষিত স্বাদ পেলাম না। আমার অতি পরিচিত ডাক্তার রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, পশুরের ইলিশ, পদ্মা বা বরিশালের নদীর ইলিশের মত স্বাদ হয় না।

কেন হয় না এই প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল। খুলনার রাস্তা দিয়ে একদিন গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি। দেখি, একটা বিল্ডিং এর উপর লেখা খুলনা, বিভাগীয় সদর কার্যালয়, মৎস দপ্তর গাড়ীর ড্রাইভার সইদ কে বলে, গাড়ী থামিয়ে অফিসে ঢুকলাম। খোঁজখবর নিয়ে বিভাগীয় প্রধান ফারুক সাহেবের ঘরে ঢুকে- ‘সেলাম আলেকুমবলে কুর্ণিশ করলাম। বল্লাম, আমি আসছি কলকাতা থেকে, একটা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হল, পশুরের ইলিশের টেস্ট বরিশালের থেকে কম কেন? সুদূর কলকাতা থেকে এসে আমি এরকম এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন করব, সেটা বোধহয় আশা করেন নি। বাংলাদেশের লোকেরা খুব অতিথিপরায়ণ। কোন উত্তর না দিয়ে, বেয়াড়াকে ডেকেলালচা বিস্কুট আনালেন। বাংলাদেশে সবাইলালচা খায়, দুধ চা, আলাদা করে বল্লে পাওয়া যায়। আমার আবার চা খেলে মনে হয় চিরতা- জল খাচ্ছি। সদুত্তরের আশায় সেটাতেই হাল্কা চুমুক দিলাম, না দিলে, পাছে উনি কিছু মনে করেন। ফারুকভাই, চশমার কাচটা একটু মুছে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বল্লেন - কি আর কই আপনারে, হেডার লইগ্যা তো আপনাগো দেশ দায়ী।আমি তো প্রায় আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা। ইলিশের টেস্টের জন্য ভারত কি ভাবে দায়ী হবে। ইলিশ তো ঢুকছে বঙ্গোপসাগর থেকে, ভারতের দিক থেকে তো আর বাংলাদেশে আসছে না। সব গুলিয়ে গেল। ইন্ডিয়ান বলে আমাকে অপদস্থ করছেন নাকি।

ক্রমশঃ

 

     পশুর নদীতে সাইটের কাছে ইলিশ ধরা 
               বাংলাদেশে পশুর নদী

ইলিশ বৃত্তান্ত (পার্ট )

 

এবারে ফারুক সাহেব আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন-

পশুরের পানি কত ঘোলা দ্যাখসেন তো, পশুর, সিবসা, পদ্মা যে নদীগুলি বাংলাদেশের পশ্চিম দিকে, হেগুলিতে পানি আসে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। আপনার বাঁধ দিসেন ফরাক্কায়, তিস্তা নদীতে, পানি কইম্যা গ্যাসে গিয়ে হেই নদীগুলানে। কিন্তু বাংলাদেশের পূর্বদিক থেকে আসাম বা মেঘালয় থেকে এসেছে, যেমন ধরেন গিয়া - বলেশ্বর, আড়িয়াল খা, মেঘনা, কচা ইত্যাদি তাতে পানি প্রবাহের কোন কমতি নেই।  আমি বল্লাম- সেটা না হয় বুঝলাম, তার সঙ্গে ইলিশের স্বাদের কি সম্পর্ক? ফারুক ভাই বোঝাতে শুরু করলেন- দ্যাখেন, যদি গিয়া পানির প্রবাহ কম হয়, তবে স্রোত কম হয়, তা ছাড়া জোয়ারের পানি থাকে বেশী লবণাক্ত। একে তো স্রোতের বিরুদ্ধে ইলিশ সাঁতার কাটে, তাতে তাদের শরীরে তেল বেশী তৈরী হয়, সাইজ ভাল হয়, ডিমও বেশী হয়। জানেনই তো মিস্টি পানির ইলিশের স্বাদ বেশী। ইলিশ সম্বন্ধীয় এই নবলব্ধ জ্ঞান ধাতস্থ হতে বেশ সময় লাগল। কিন্তু আমিও সন্দেহবাতিক বাঙালী। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নই। বল্লাম - তা সবাই যে বলে পদ্মার ইলিশের স্বাদের কথা, তা আপনার কথা অনুযায়ী, এটা তো হওয়ার কথা নয়। ফারুক ভাই উঠে দাড়িয়ে পিছনের বাংলাদেশের ম্যাপটা দেখিয়ে বল্লেন, - এই যে, আমাগো পদ্মা, হেই খানে আইস্যা মিশছে যমুনার সাথে, তার তলায় দ্যাখেন, সম্মিলিত ধারা আইস্যা, চাঁদপুরে মিলত্যাসে মেঘনার সাথে। তাই এই অংশে ইলিশে সুস্বাদু। যাক সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গিয়েছি। কথাবার্তার মাঝখানে কখন যে লাল চা শেষ টের পাই নি। ইলিশ রহস্য ভেদ হওয়ার পর, লাল চা, সে রকম বিস্বাদও তো লাগল না!

এরপর থেকে খুলনা গেলে, ওখানের বিখ্যাত সান্ধ্যবাজার থেকে বরিশালের ইলিশ কিনতাম। মাঝে মাঝে ঢাকা যাওয়ার সময় পদ্মার ফেরীঘাটে ইলিশ মাছ ভাজা সহযোগে মাছভাজার তেল দিয়ে ভাত মেখে তাতে পোড়ান শুকনো লংকা মেখে খেয়েছি। বেশী সুখ্যাতি করে আপনাদের রসনাকে আরো লালায়িত করতে চাই না!

অফিসিয়াল কাজেও ইলিশের জুড়ি নেই। আমারই এক যদুবংশীয় কলিগ, কোম্পানির বাঙালি সিএমডির জন্য, ইলিশ প্যাক করিয়ে নিয়ে গিয়ে, আখেরে ক্যারিয়ার গুছিয়ে নিয়েছিল, সে খবরও পেলাম। সেই চেয়ারম্যান সাহেবের কথা একটু বলার লোভ সামলাতে পারলাম না। এটাও মাছ সংক্রান্তে। উনার চেহারাটা ছিল জমিদার সুলভ, লম্বা চওড়া, আক্ষরিক অর্থেই বাগেরহাটের কাছে কাড়াপাড়া জমিদার বাড়ীর সন্তান। জমিদারদের মত জমিয়ে খাওয়ার জন্য তার সুখ্যাতি ছিল। একবার এলেন সস্ত্রীক সাইট পরিদর্শনে। ঢাকা থেকে সড়কপথে সাইটে আসবেন। মাঝরাস্তায় তার মধ্যান্হ ভোজনের আয়োজন। রান্নার তদারকির ভার আমার উপর। পাবলিক সেক্টরেগুরুকৃপাঅর্জন করতে হলে মাল্টিডিসিপ্লিনারি টাস্কে পারদর্শী হতে হয়। আমি যেগুরুকৃপা জন্য খুব উৎসুক ছিলাম তা নয়, দক্ষিণহস্তের রসস্বাদনটাই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। দেশী মুরগী, মাটন ছাড়া মাছের মধ্যে ইলিশ, ভেটকী,চিংড়ি, পার্শে, কই, মাগুর সবই ছিল মেনুতে। তদারকির অংশ হিসাবেস্যার এটা নিন ওটা নিন’, বলে কর্তব্যকর্ম সারছিলাম। সাহেব খুব যত্নসহকারে চেটেপুটে খেয়ে একটা পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর তুললেন। খালি মাগুর মাছের বাটিটা পড়ে রইল। মাগুর মাছের মত টেস্টি মাছ কেন খেলেন না, সেটা উনাকে না জিজ্ঞাসা করে থাকতে পারলাম না। সিএমডি সাহেব একটু হেসে বল্লেন-‘বুঝলে তো, ছোটবেলায় জ্বরজ্বারি হলে পথ্য ছিল কাচকলা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল। বিমার আদমিকা খানা, ঢুকল মাথায়। বড় হওয়ার পর তাই মাগুর মাছটা ছেড়ে দিয়েছি, খেলেই মনে হয় জ্বর আসছে।

মাঝে মাঝেই ঢাকা থেকে টিম আসত সাইট ভিজিটে। অনেক ভিআইপি, গন্যমান্য পলিটিশিয়ান, পরিবেশবাদীদের আপ্যায়ন করতে করতে হাত পেতে উঠেছিল। ভাল লাঞ্চ, ডিনার থাকলে কাজের ব্যাপারটা গৌণ হয়ে যেত। মেনুতে ইলিশ, চিংড়ি, খাসি বা দেশী মুরগীর উপস্থিতি মিটিংএর পরিবেশ হাল্কা করে দিত। বাংলাদেশিরা খেতে এবং খাওয়াতে খুব ভালবাসে।

নয়ডাতে ছুটিছাটায় এলে অনেকেই প্রশ্ন করেন - ‘ইলিশ নিয়ে আসো নি, ওখানের ইলিশের তো খুব টেস্ট। একবার ঠিক করলাম, ইলিশ নিয়ে আসব দিল্লিতে। আমাদের সাইটে গাড়ী চলত, মিলন বলে একটি খুলনা শহরের ছেলের কন্ট্রাক্টে। সে বল্লস্যার একদম চিন্তা করবেন না, বাজারে চলুন, আমার চেনা দোকানদারকে বলে ইলিশ বরফশুদ্ধ থার্মকোলে প্যাক করে দেব, একবারে দিল্লি গিয়ে খুলবেন সেইমত তিনটে মাঝারি সাইজের ইলিশ প্যাক করান হল। পরের দিন ভোরবেলা বেরিয়ে মংলা থেকে বেনাপোল বর্ডার। সকাল সাতটা নাগাদ এলে ভীড় কম। সাইট থেকে কোম্পানির পাজেরো স্পোর্টসে ঘন্টতিনিকের রাস্তা। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করে বর্ডারে লাইনে দাড়িয়ে আছি। একটু পরে দেখি এক বাংলাদেশী পুলিশ দূর থেকে বলছে-‘পানি পড়ে ক্যান? প্রথমে পাত্তা দিই নি, ভাবলাম অন্য কাউকে বলছে। সর্বনাশ, ব্যাটা দেখি পায়ে পায়ে আমার দিকেই আসছে। সভয়ে পিছনে দেখি কাধের ঝোলা ব্যাগ থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছে। কি করি, তোতলাতে তোতলাতে বল্লাম- ‘জলের বোতলটা লিক করছে মনে হয় পুলিশ বাবাজীবনও ছাড়ার পাত্র নয়। ব্যাগের তলায় হাত রেখে দুফোটা জল নিয় শুকে দেখে বল্ল- মিথ্যা কথা ক্যান কহেন দ্যাখি, ইলিশ লইয়া যাইতাসেন, আমি বুঝি না, দ্যান দেখি একশ টাকা। কি আর করি, একশ টাকা গচ্ছা দিতে হল। বর্ডার ক্রশ করে শেয়ার অটোতে বসেছি। ফোঁটার ফ্রিকোয়েন্সি বেড়েছে। খুব সাবধানে ব্যাগটাকে অটোর বাইরে ধরে রেখেছি, যাতে সহযাত্রীদের গায়ে না পড়ে। বর্ডার থেকে বনগা স্টেশন আট কিলোমিটার। সেই কোন পুরানের গল্পে ছিল নারদ তেলভর্তি বাটি হাতে পৃথিবী প্রদক্ষিন করছিলেন যাতে একফোটা তেল না পড়ে, ইষ্টনাম করতে ভুলে গিয়েছিলেন, আমারও প্রায় সেই অবস্থা। বনগা লোকালে উঠে ব্যাগটাকে উপরে রেখেছি। কেলো আর কাকে বলে। না, এই ট্রেনে যাওয়া যাবে না। নেমে পড়ে ট্রেনটা যাওয়া অব্দি ওয়েট করলাম। প্ল্যাটফর্ম একটু খালি হলে। কাঁধের ব্যাগ থেকে থার্মকোলের প্যাকেটটা বার করলাম। চওড়া সেলোটেপ খুলে, প্যাকেটটা খুলে সব বরফ ফেললাম রেললাইনে। যাক এবার জলপড়া বন্ধ হল। ট্রেনে নিশ্চিন্ত। সন্ধ্যাবেলা ফ্লাইট। যাব পিসির বাড়ী দমদমের মল রোডে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে নামলাম। জায়গাটা চেনা। কাছেই গোরাবাজার। ক্যান্টনমেন্টের গোরা সৈন্যরা এখানে বাজার করত, তাই থেকে নাম গোরাবাজার। ঢুকলাম সেখানে মাছের বাজারে। উদ্দেশ্য, মাছগুলোকে কাটিয়ে পিস করে প্যাক করিয়ে নেব। মাছওয়ালা সব শুনে প্যাকেট খুলে মাছ গুলোকে দেখে বল্ল-‘ দাদা, এই গুজরাটি ইলিশ কোথায় পেলেন? ব্যাটা বলে কি? রাগ উঠে গেল- বল্লাম, আমি তো বাংলাদেশ থেকে এক্ষুনি এই ইলিশ নিয়ে ঢুকেছি। গুজরাটি বল্লেই হল। মাছওয়ালাও দমবার পাত্র নয়। বল্ল- আরে স্যার, আপনাকে বলি। গুজরাটের ইলিশ শুনলে কলকাতার বাঙ্গালীরা মুখ ব্যাকায়। তাই গুজরাটের ইলিশ বাংলাদেশ হয়ে পদ্মার ছাপ মেরে এপারে আসছে। আমার চোয়াল ঝুলে গেল-এত কান্ড করে নিয়ে এলাম, একি কথা শুনি, ধরনী দ্বিধা হও গোছের অবস্থা। বোঝা গেল আরবসাগর তীরবর্তী রাজ্যের মাটিতে বিজনেসের বীজ পোঁতা, তাই আদানী আম্বানি দের রমরমা, আমাদের মত আনি দুআনি অবস্থা নয়। তবে বাঙ্গালীর বুদ্ধি বলে কথা। নয়ডাতে এসে গূড়তত্ব আর ফাঁস করি নি। ছেলে খেয়ে বল্ল- ফুকো ফুকো মাছটা খুব ভাল খেতে। এরপর আর কোনদিন বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আনার চেষ্টা করি নি।

সৈয়দ মুজতবা আলির গল্পের একটা বিখ্যাত লাইন ছিল- সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে। আজকাল গুজরাটের বঙ্গবিজয়ের চেষ্টা দেখে, গুজরাটি ইলিশের বাংলার মাছের বাজার বিজয়ের কাহিনী মনে পড়ে গেল। মারি অরি পারি যে কৌশলে!

 

দেবদত্ত

১২/০২/২০২১

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments