তুলসী বিবাহ (রম্যরচনা)
নারায়ণ শিলা
তুলসী বিবাহ (পর্ব ১)
আমাদের সোসাইটিতে আজ ঘটা করে তুলসী বিবাহের আয়োজন করা হয়েছে। তুলসী বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অজ্ঞ, তবে কিছুটা নিস্কৃতি পাওয়া গেল আত্মগ্লানি থেকে যখন দেখলাম, অনেকেই এই উৎসবটিকে প্রথম চাক্ষুষ করছেন। সোসাইটির লনে বেশ কালারফুল দুই তিনটি প্যান্ডাল। দুপুর থেকে মাইকে খুব কীর্তন শুনছিলাম। এদিককার মহিলামহলে কীর্তন, সুন্দরকান্ড পাঠ খুব জনপ্রিয়। নবরাত্রির সময় নয়দিন নয় শক্তির আরাধনা। প্রতিদিন কেউ না কেউ বাড়ীতে কীর্তনের আসর বসান। সোসাইটির হলে ফি হপ্তা চলে সুন্দরকান্ড পাঠ ও ভজন। মহিলারা সবাই দুলে দুলে গাইতে থাকেন আর গানের শেষে ধূয়া ওঠে ‘মাইকা ভোগ লাগাও’ বা ‘মাইকা সিঙ্গার করাও’। যদিও এই ভোগে কোন মিস্টি বা ফল থাকে না। তবে বিশ্বাসে ‘ফললাভ’ নিশ্চয়ই হয়।
সোসাইটির হোয়াটস্ এ্যপ মেসেজ দেখে প্রথম একটা ধারণা হয়েছিল তুলসী বিবাহ নিশ্চয়ই কোন এক বিশেষ সমাজিক শ্রেনীর গণবিবাহ, যেটা এরেঞ্জ করা হয়েছে সোসাইটির পক্ষ থেকে। বিকালের দিকে পন্ডিতজির একপ্রস্থ মন্ত্রপাঠ শোনার পর মনটা উশখুশ করে উঠল, ঘটনাটা সরজেমিনে তদন্ত করার।
লনে ঢোকার মুখে পেয়ে গেলাম ত্রিপাঠীজিকে। রিটায়ার্ড লোক। আর এস এস এর সক্রিয় সদস্য। পার্কে দেখা হলে মাঝে মাঝে ঠাট্টা করি-‘আর এসএসের ট্রেডমার্ক হাফপ্যান্ট না পরলে আপনাকে ফুল মেম্বারশিপ দেব না।’ যাই হোক ত্রিপাঠীজির কানে কানে জিজ্ঞাসা করলাম অনুষ্ঠানটি কি এবং কেন? জানা গেল আজ একাদশীর দিনে বিষ্ণু ভগবানের তুলসী গাছের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল। সেই উপলক্ষে এই বিয়ের অনুষ্ঠান। বর্ষার সমাপ্তির পর, এই সিম্বলিক অনুষ্ঠানের পর থেকে হিন্দুদের বিবাহ অনুষ্ঠানের সূচিত হয়। জয়মালা বদল একটু আগে হয়ে গিয়েছে। একটু পরেই আসল বিবাহ অনুষ্ঠান। সুইমিং পুলের রেলিং এর ধারে ছাদনাতলা।
প্যান্ডালের মধ্যে লালশালুতে বাঁধা তুলসীমাইয়ার ব্রাইডাল ড্রেস। দুইপাশে দুই পন্ডিতজী। একজন দাড়ি, গুম্ফ, শশ্রু মন্ডিত গেরুয়া বসনধারী, অন্যজন পরিষ্কার করে দাড়ি গোফ কামানো, মাথায় হিমাচলী স্টাইলের কানঢাকা টুপি। চেহারা এবং টুপি সব মিলিয়ে সত্যজিৎ রায়ের মহাপুরুষ সিনেমার বিরিঞ্চি বাবা। কথবার্তা বিরিঞ্চিবাবা স্টাইলে এবং যথেষ্ট এনটারটেনিং। সামনে অনেক মহিলা উপবিষ্ট। দুদিকের চেয়ারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু পুরুষ ও মহিলা। মহিলাদের সংখ্যা ভারী, বিয়ের ব্যাপারে তাদেরই বেশী উৎসাহ। এদের মধ্যে কেউ কন্যাপক্ষ, কেউ আবার বরপক্ষ।
মনে হচ্ছে লটারী করে ঠিক করা হয়েছে।
বাঙালী বাড়ীর উঠানে তুলসী মঞ্চ থাকে। আজকাল অবশ্য ফ্ল্যাটবাড়ীর ব্যালকনিতে তিনি কচ্চিৎ কদাচিৎ নজরে আসেন। সন্ধ্যাবেলা গৃহিনী তুলসী মঞ্চে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাচ্ছেন, এ ছবি পুরানো বাংলা সিনেমায় প্রায়শই দেখা যেত। সর্দিকাশি লাগলে আদা তুলসীপাতার চা খাওয়া হত। তুলসীকে এতদিন পবিত্র গাছ হিসাবেই জানতাম। তিনি যে আবার বিষ্ণুর স্ত্রী সেটা জানা ছিল না। তুলসীর প্রথম পতি শঙ্খচূড় সাপ। তার মৃত্যু লেখা ছিল, যদি একমাত্র, তার স্ত্রীর সতীত্ব অন্য কোন পুরুষ হরণ করেন তবেই তা সম্ভব হবে। শঙ্খচূড় যখন শিবের সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় ছিলেন, নারায়ণ শঙ্খচূড়ের ছদ্মবেশে, তুলসীর সতীত্ব হরণ করেন। এরপরই শঙ্খচূড়ের মৃত্যু হয়। এই ঘটনা জানার পর তুলসী নারায়ণকে অভিশাপ দেন যে, নারায়ণ পাথরে রূপান্তরিত হবেন ও তাকে পাওয়া যাবে নেপালের গন্ডক নদীতে। এতকথা বলার কারণ সেই পাথরই হল নারায়ণ শিলা বা শালগ্রাম শিলা এবং আজকে সেই নারায়ণ শিলার সঙ্গে তুলসীর বিবাহ হবে।
হাল্কা ঠান্ডার আমেজ। সোসাইটির নূতন মন্দির কমিটি তৈরী হয়েছে। করোনার পরে এই প্রথম কমিউনিটি প্রোগ্রাম। তাঁরাই এই অনুষ্ঠানের মূল হোতা। চা কফির কোন কমতি নেই। প্রাথমিক জ্ঞানলাভের পর ভয় ভয় ভাবটা কেটে গিয়েছে। জমিয়ে এক কাপ চা নিয়ে চুমুক দিতেই দেখা ভেঙ্কটেশের সঙ্গে। আমাদের সোসাইটিতে কোন মন্দির নেই। পুজো দিতে গেলে পাশের সোসাইটিতে যেতে হয়। তাই এক মন্দির কমিটি তৈরী হয়েছে। ভেঙ্কটেশ কথায় কথায় জানাল সে মেম্বার নয়, তবে ড্রাফ্টিং ও লেখালেখির কাজে তার ডাক পড়ে, তাই কমিটির হাঁড়ির খবর সে রাখে। আমার অবশ্য ভেঙ্কটেশের ইংরাজি জ্ঞান নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। করোনার সময় হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে যা লিখেছিল তাতে মনে হল এক রেসিডেন্ট মারা গিয়েছেন, পরে শুনলাম তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে এসেছেন। আমাকে ফিসফিস করে জানাল পার্কের যে দিকটাতে আমাদের ফ্ল্যাটগুলি, মন্দিরটি সেই দিকেই হবে বলে ঠিক করেছে কমিটি। মজা হচ্ছে যারা এই কমিটিতে তারা সবাই পার্কের অন্যদিকে থাকে। আরো মজার ব্যাপার মন্দির করার জন্য সবার খুব উৎসাহ, কিন্তু সেটা নিজের ফ্ল্যাটের কাছে হলে মুস্কিল! ঘন্টার শব্দে ঘুমের ব্যাঘাত হবে।ধর্মের ভড়ং নিয়েই লোকের বেশী মাথাব্যাথা, ‘উদারতা’ শিক্ষাটা গ্রহণে অপারগ, এটাই সারসত্য ।
পন্ডিতজি মাইকে ঘোষনা দিলেন ‘স্টেজ ইজ অল সেট ফর ম্যারেজ’। দুলহাকে অর্থাৎ শালগ্রামশিলাকে তিনি বার করলেন তার ঝোলার মধ্যে থেকে। নারায়ণ শিলা কেউই প্রায় দেখেন নি। কালো রংএর, তার মধ্যে একই প্যাটার্নে সমান্তরাল রেখা। ভারতের কোন নদীতে পাওয়া যায় না। একমাত্র হিন্দুরাস্ট্র নেপালের গন্ডকী নদীতেই পাওয়া যায়। এর নাকি অনেক দাম। সবাইকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান হল ‘দুলহা রাজা’। মোবাইলে ক্লিক ক্লিক হল। পন্ডিতজি ঘোষণা দিলেন লগ্ন বয়ে যাচ্ছে। কন্যাপক্ষ থেকে শয্যা প্রদান করা হল যৌতুক হিসাবে। বস্ত্র দেওয়া হল। মধ্যমণি হলেন গিয়ে তুলসী। একটি পুতুলকে সুন্দর করে শাড়ী পড়িয়ে, গোটা চার পাঁচ তুলসীর ডাল গুঁজে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের মন্ত্রপাঠও হয়ে গেল। তারপর তুলসী দেবীকে সিংহাসনে করে নারায়ণ শিলার চারিধারে ঘোরান হল। তারপর হাভন। আগুন জ্বেলে বেশ কিছুক্ষণ ‘ওম স্বাহা’ হল।
মন্দির কমিটির সবাইকেই চিনি। কমিটির এক প্রধান উদ্যোক্তা ঘনশ্যামজি। কয়েকদিন আগেই পার্কে দেখা। কট্টর হিন্দু ধর্মের সমর্থক। রিলিজিয়াস কনভারসান নিয়ে দুই চারটে কথার পর এক মজার কিস্সা শোনালেন। পাঞ্জাবে কোন এক দলিতকে খ্রীষ্ঠান হওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করা হচ্ছিল। সেই লোকটি পয়সা কড়ি পাওয়া যাবে বলে রাজী হয়ে গেল। কিন্তু দলিত লোকটি চার্চে ঢুকে বেঁকে বসল। ঘনশ্যামজি গর্বের সঙ্গে জানালেন লোকটি খৃষ্টের ক্রুসিফায়েড মূর্তি দেখে নাকি বলেছিল ‘ ইয়ে তো হাত মে কীল লাগা হুয়া মুর্দা আদমি হ্যায়। খুদই ইতনা পেইন মে হ্যায়, ইয়ে বেচারা মেরা কেয়া ভালাই করেগা! হামারা কৃষ্ণ ভগবান কো দেখিয়ে সুদর্শন চক্র হ্যায়, ইন্দ্র দেবতা কা বজ্র হ্যায়, কিতনা শক্তিশালী হ্যায়। ম্যায় তো ইসিকা শরণ মে রহুঙ্গা।’ এহেন লজিকে আমি পুরোপুরি বোল্ড আউট। ঘনশ্যামজি আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বিদায় নিলেন।
ক্রমশঃ
পুজো চলেছে
পর্ব ২
সোসাইটির অনেক মহিলা ছাদনাতলায় কার্পেটে বসে বিবাহকার্য দেখছিলেন। বিকালে ঘন্টাখানেকের উপর কীর্তন করে সবাই ক্লান্ত। শাস্ত্রে লেখা আছে কিনা জানিনা, তবে স্ত্রী স্বাধীনতার যুগে মহিলাদের অধিকার নিয়ে সবাই সোচ্চার, সেটা মাথায় রেখে রসিক পন্ডিতমশাই জানালেন, - তুলসী, বিবাহের আগে নারায়ণের কাছে কিছু শর্ত রেখেছিলেন, প্রথম এবং প্রধান হল তার প্রতি প্রেমভাব অক্ষুন্ন রাখতে হবে, বয়েসের সাথে সাথে যৌবনের সৌন্দর্য হ্রাস পেলেও, নারায়ণের প্রেমভাব যেন কোনমতে কমে না যায়। আরেকটি যেমন, ঘরের রান্নাবান্না তিনি করবেন, কিন্তু মাঝে মধ্যে রান্নার স্বাদের তারতম্য হলে নারায়ণ বকাবকি করতে পারবেন না। তৃতীয়টি হল অন্যদের সামনে তিনি তুলসীকে কোন কটু কথা বলবেন না, যদি কোন ব্যাপারে মতান্তর হয়, তবে তা একান্তে কথোপকথনের মাধ্যমে জানাতে হবে। চতুর্থ, যদি গৃহস্বামী কোন দান ধ্যানে অর্থ ব্যায় করতে চান, তাহালে অবশ্যই সেটা স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষ। পঞ্চম, যদি গৃহস্বামী তীর্থ গমনে উদ্যোগী হন তবে পত্নী সমব্যভিহারে করা আবশ্যক। একান্তই যদি না করতে পারেন, তবে স্ত্রীর পারমিশন জরুরী। এসব শোনার পর শালগ্রাম শিলাও তার কিছু শর্ত শোনালেন। তার একটি হল, বিয়ের আগে তুলসীর যেমন বাড়ীর বাইরে অবারিত দ্বার ছিল, বিয়ের পর সেটা রেস্ট্রিকটেড। বাপের বাড়ী ভাইদুজ ও রক্ষাবন্ধনে পারমিটেড, কিন্তু বাকি সময় যেতে গেলে পরিবারের সম্মতি নিয়ে যেতে হবে। তবে ফাইনাল এনালিসিসে আজকালকার হিসাব অনুযায়ী দুলহা রাজার শর্ত তার পত্নীর তুলনায় কম।
এরপর ডিনার। মন্দির কমিটি বেশ ভালই আয়োজন করেছে দেখলাম। পুরি, আলুর তরকারি, ফুলকপির শব্জি, দইবড়া, গোলাপজামুন সহযোগে খাসা ডিনার। আজকাল পেপার প্লেটের কোয়ালিটি আগের তুলনায় অনেক বেটার। আগে খাবার নেওয়ার, তলায় থাবা দিয়ে ভাল করে না ধরলে, প্লেট ভেঙে যাওয়ার সমূহ বিপদ ছিল। এখন বেশ হার্ড মেটিরিয়ালে তৈরী। পুরিটাও বেশ পাতলা ও নরম। দুর্গাপুজার ভোগের লুচি খেতে গিয়ে চোয়াল ব্যাথা হয়ে গিয়েছিল। সাড়ে আটটা ডিনারের টাইমটা আমার জন্য তুলনামূলক ভাবে আর্লি। তবে সবার সঙ্গে গল্প করতে করতে পাঁচটা পুরি খেয়ে ফেল্লাম।
দেবদত্ত
১৫/১১/২১
পার্কের পাশে সেই অস্থায়ী মন্দির
পুনঃ
এর পরের ঘটনার বিবরণ না জানালে কাহিনীটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তুলসী বিবাহ তো মহা ধুমধাম করে হল। তবে ঐ যে কথায় আছে-“নো লাঞ্চ ইজ ফ্রি লাঞ্চ”, সেটা কয়েকদিনের মধ্যে বোঝা গেল। মন্দির কমিটির মুখ্য উদ্দেশ্য হল একটা স্থায়ী মন্দির নির্মান। আগেই বলেছি আমাদের সোসাইটির লেআউট অনুযায়ী অর্ধেক ফ্ল্যাট একদিকে, বাকী অর্ধেক অন্যদিকে। মাঝখানে পার্ক। এবার কমিটির প্ল্যান হল আশেপাশের সোসাইটির মত আমাদের সোসাইটিতে পার্মানেন্ট মন্দির বানাতে হবে। এবং সেটা হবে পার্কের কোনে, যেদিকে আমার ফ্ল্যাট আছে। অন্যদিকে হবে না, কারণ কমিটির উদ্যোক্তারা যার অন্যদিকে থাকেন তাদের ঘন্টার আওয়াজে ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে।
গেমপ্ল্যানলঅনুযায়ী মুরগীর খাঁচার মত জালি দেওয়া একটা আলমারির মধ্যে নববিবাহিত তুলসী এবং নারায়ণের মূর্তিকে তালাবন্ধ করে পার্কের কোনে রাখা হল। কয়েকদিন খুব ধূপ ধুনো সহকারে পূজারীর চল্ল। এরপর একদিন গর্গ বলে আমাদের সাইডের এক ফ্ল্যাটওনার(বছর কয়েক আগে এটা ভাড়া দিয়ে অন্য জায়গায় আছে), হঠাৎ এসে উপস্থিত। একদিন দুপুরে পার্কে বেশ চ্যাঁচামেচি শুনে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখি বেশ জটলা, উত্তেজিত গলার আওয়াজ। গিন্নির বারণ সত্বেও নেমে গেলাম, এখানের নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় এরকম উত্তেজনাময় ঘটনার সাক্ষী হওয়ার লোভ কি সামলান যায়? পার্কে গিয়ে শুনলাম কিছুক্ষণ আগে গর্গ এসে লাথি মেরে মন্দির উল্টে দিয়েছে। খাঁচা একদিকে কাত, সদ্য জানাই নারায়ণের একহাত ভাঙা। দুদিকে বিভক্ত দুই দল। একটু পরে নাড়া উঠল একদিক বলছে জয় ভারতমাতা, জয় মন্দির কমিটি, অন্যদল বলছে- মন্দির দূর হটো। ইতিমধ্যে উত্তেজনার পারদ আরো এককাঠি উপরে, তিনচারজন পুলিশ একজন লেডি কনস্টেবল সহ হাজির। মন্দির কমিটি ফোনকলের ফল। পুলিশ হুইসল বাজিয়ে দুইদলকে আলাদা করল। মন্দির কমিটির লোক বলছে ভগবানকা হাত তোড় দিয়া, উসকো গ্রেপ্তার কর, অন্যদল বেঝাচ্ছে- এরা জোর করে আমাদের সাইডে মন্দির বানাতে চাইছে। আজকালকার জমানায় মন্দিরে হাত দেওয়া গুরুতর অপরাধ। তবে পুলিশ একটু অবাক যে কালপ্রিট হল গিয়ে হিন্দু। একজন বোঝাতে লাগল কালাপাহাড় হিন্দু হয়েও জগন্নাথ মন্দির ভেঙে দিয়েছিল। সব ধর্মেই বিশ্বাসঘাতক থাকে। সুতরাং গর্গকে গ্রেপ্তার করতে হবে। পুলিশ কখনই এরকম ব্যাপারে নাক গলাতে চায় না। প্রথমে বলছিল “আপষমে সুলাঝা লো”। তবে মন্দিরপক্ষ নাছোড়বান্দা। এবার পুলিশের বক্তব্য রিচেন কমপ্লেন দিতে হবে। এবারে সবাই চুপ। দুই একজন বেগতিক দেখে সটকে পড়লেন-পুলিশের ঝামেলায় কোন ছাপোষা লোক জড়ায়। মন্দির কমিটির দুই-একজন হর্তা-কর্তা গোছের লোক কমপ্লেন দিলেন।
এই ঘটনার দুই একদিন পর দুপুরে হঠাৎ সন্দীপের স্ত্রী আমাদের ফ্ল্যাটে হাজির। সই সংগ্রহ অভিযান চলছে। গর্গকে পুলিশ তুলে নিয়ে থানায় বসিয়ে রেখেছে,”পুছনাছ” চলছে। ওকে ছাড়িয়ে আনার এপ্লিকেশনে সই চাই। পরে শোনা গেল মুচলেকা দিয়ে গর্গ ছাড়া পেয়েছে। সোসাইটির হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে এই নিয়ে জোর কাজিয়া চলছে। মন্দির সবার চাই, তবে নিজের ফ্ল্যাটের কাছে “নৈব নৈব চ”। রাকেশ নামের একজন কিছুদিন আগে রামমন্দির নির্মানে অদম্য উৎসাহে চাঁদা তুলছিল। সে একদম চুপ। কারণ অনেক আগে তার ফ্ল্যাটের নীচে একটা জায়গা নির্বাচন হয়েছিল মন্দির বানানর জন্য। তখন রাকেশের চ্যাঁচামেচির জন্য সেটা সম্ভব হয় নি।
এখন যেটা চলছে সেটা হল সোসাইটির লোকজন দুইভাগে বিভক্ত। নিয়ম করে শনি-মঙ্গলবার শাঁখ -ঘন্টা সহযোগে সন্ধ্যে বেলা অস্থায়ী মন্দির প্রাঙ্গণে পূজাপাঠ চলছে। মাঝে মাঝে লাড্ডু বিতরণ চলছে। স্টেপ বাই স্টেপ এগোনোর মত করে সামনে কয়েকটা মার্বেল স্ল্যাব বসেছে। এরপর কি হবে তারই অপেক্ষায় আছি।
১৫/১২/২০২১
পরবর্তী পর্বে বছর খানেকের ব্যবধানে মন্দির তৈরী কমপ্লিট। মন্দির কমিটি রাজস্থানের কোন এক ফ্যাক্টরিতে গিয়ে ওয়ার্ক অর্ডার ফাইনাল করে এলেন। নূতন টেকনোলজির কল্যাণে নয়নভিরাম মন্দির সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে রেডী।
সময়টা ২০২৪শের দুর্গাপূজার প্রাক্কালে। রেড সান্ডস্টোনের স্ল্যাব সিএনসি মেশিনে কাটিং হয়ে নানা দেবদেবীর মূর্তি খচিত অবস্থায় পরপর জুড়ে মন্দির তৈরী হল। নবরাত্রি হল উত্তরভারতের বড় ফেস্টিভাল। দুর্গাপূজা ঐ সময়টাতে পড়ে। খাস বেনারস থেকে চার পুজারী এসে চারদিনব্যাপী যজ্ঞ করে ঠাকুরের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন। শর্মাজী আমাকে বোঝালেন, মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠার সময় তেজ প্রকট হয়, ঐ সময় তাকালে চোখ জ্বলে যাওয়ার সম্ভাবনা, তাই দর্পনের সাহায্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে। শেষদিনে মহিলারা নানারংএর শাড়ী পড়ে মাথায় ঘট নিয়ে সেক্টরের রাস্তায় ঘুরলেন।
সঙ্গে টেম্পোতে ঠাকুর, যার মধ্যে আছেন শেরাবালী মাতা, বিষ্ণু-লক্ষী, রাম-সীতা-লক্ষণ ভক্ত হনুমান সহিত, রাধা-কৃষ্ণ।
মন্দিরে আলাদা করে শিবলিঙ্গ আছে। শিবের মাথায় জল ঢাললে, সেই জল আন্ডার গ্রাউন্ড পাইপ দিয়ে স্টর্মওয়াটার ড্রেনে যাচ্ছে। সেদিনটা ছিল দুর্গাপুজোর নবমী। আমিও ভাগ নিলাম শোভাযাত্রায়।
দুদিকটাই সামলাতে হচ্ছে একদিকে সোসাইটির মন্দির অন্যদিকে দুর্গাপুজো।
১০/১০/২৪
দেবদত্ত












Comments
Post a Comment