৬২ সেক্টরের কালীপুজার রোজনামচা ২০২১
কালীপূজো (পার্ট ওয়ান)
কালি-কলমে, কমলার বন্দনার পর এবার পালা কালীমাতার। হেমন্তের পুণ্যলগ্নে শ্যামার্চনা। দিল্লি-নয়ডার বাতাসে ঠান্ডা আমেজ। উত্তর ভারতে থাকার সুবিধে হল দেওয়ালীর আনন্দ উপভোগের সঙ্গে সঙ্গে আদ্যাশক্তির আরাধনা। আজকাল এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধনতেরস নামক পকেট হাল্কা করার এক অনবদ্য সুযোগ। আপনাকে মার্কেটিংএ ‘মার্ক’ করে ‘মার্কেটিং স্ট্রাটেজিস্ট’রা তাদের গেমপ্ল্যান সাজান। এর সঙ্গে একটু ধর্মের সুড়িসুড়ি দেওয়া থাকে। হিন্দুধর্মে লেখা আছে, এই দিনটিতে ধাতু দিয়ে তৈরী জিনিষ কিনতে। মহিলারা অবশ্য ব্যাপারটাকে নোবেল মেটালে উন্নীত করেছেন ফর ‘নোবেল’ কজ অফ ধনতেরস। ‘মারি তো গন্ডার, লুঠি তো ভান্ডারে’র মত এইদিন বহুমূল্য সোনা কিনে নিজের ‘সোনার সংসার’ ভরিয়ে তুলুন। আমি অবশ্য ‘সোনা’ শুনেও না ‘শোনা’র ভান করে থাকি, যদিও আজকের কাগজ জানাচ্ছে ধনতেরসে পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকার সোনা বিক্রি হয়েছে। কে বলে ভারত গরীব দেশ।আমাদের সোসাইটি, টেলিকম সিটি থেকে তিনশ মিটার রাস্তার দুধারে ফুটপাথের উপর হরেক রকম দোকান, বেশীরভাগ পূজা সামগ্রীর। এছাড়া দীপবলীতে লাগানোর জন্য লাইটের ছড়ি, দিয়া, ইত্যাদি ও খাবারের দোকানে পুরো জায়গাটা জমজমাট। অনেকটা কলকাতার ফুটপাথের পাশে সারি সারি দোকানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। দুদিন আগে ‘করোয়া চৌথ’ ছিল। সেই উপলক্ষ্যে সব সোসাইটির গেটের পাশে, মার্কেটে, মহিলাদের মেহেদি লাগানোর হিড়িক ছিল। আজকাল যে জিনিষটার অভাব চোখে পড়ে সেটা হল বাজীর দোকান। সরকার থেকে বাজী, সে তারাবাতি হোক কি পটাকা, বাজারে নিষিদ্ধ। এসবের মূল কারণ প্রদূষণ। দৈনিক আবহাওয়াতে তাপমাত্রার সঙ্গে নূতন প্যারামিটার, পিএম টুপয়েন্ট ফাইভ ও পিএম টেনের লেভেল যুক্ত হয়েছে। মাস্ক এখন ডাবল প্রটেকশন দেবে- করোনার সাথে সাথে পলিউশনএরও। আগেও তো স্টাবল বার্নিং হত, দেওয়ালির সময় দেদার পটকা ফাটত, বছরের এই সময়টাতে হাওয়া স্ট্যগন্যান্ট থাকত, তখনও নিশ্চয়ই একই ব্যাপার ছিল, খালি পরিবেশবাদীদের এত রমরমা ছিল না। মনে পড়ছে দেওয়ালির দিনে সবাই বিশেষত নর্থের লোকজন সন্ধ্যেতে বাড়ীর পূজার পর সবাই সোসাইটির লনে জড় হত নিজের নিজের ফায়ারক্র্যকারের সম্ভার নিয়ে। এখন সব ইতিহাস।
মা কালীর বাহন হল গিয়ে শেয়াল। ছোটবেলায় আমাদের আধা মফস্বল শহরে সন্ধ্যার পর হুক্কা হুয়া শোনা যেত, যদিও দেখা যেত কম। বাবা শিখিয়েছিল শেয়াল আর কুকুরকে চেনার পার্থক্য হচ্ছে শেয়ালের ফারি লেজ। তারপর ধীরে ধীরে শহরের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শেয়ালের আন্তর্জলি যাত্রা। মজার কথা কয়েকদিন আগে, আমার এক ক্লাসমেট, কলকাতার বর্তমান পশ লোকালিটি নিউটাউন এর পশ সোসাইটি ‘ইউনিওয়ার্ল্ড’ থেকে শিয়ালের ছবি পাঠাল। সম্প্রতি ‘শিল্পকর্তা সুবীর চাকি হত্যামামলা কলকাতার কাগজের শিরোনামে। আমার বন্ধু জানাল তিনিও ওই সোসাইটিতে থাকতেন। ২০২১ এ কলকাতা শহরে শিয়াল! আবার জব চার্নকের সময়ে ফিরে গেলাম নাকি। শুধু শুধু পরিবেশ পরিবেশ বলে চারিদিকে হৈ হৈ- রই রই রব! বন্ধু আরো জানাল রাতে শিয়ালের হুক্কা হুয়ার কলতানে ঘুমের দফারফা। বল্লাম- ‘রক্ষাকালীকে ভক্তিভরে ডেকে বল, বাহনটাকে যেন একটু সামলে সুমলে রাখে’।
ছোটবেলায় সাইকেল চালাতে চালাতে ছোট ছোট পোকা চোখে ঢুকে যেত। রাস্তার স্ট্রীটলাইটের পাশে ছিল তাদের সংখ্যাধিক্য। একটা চোখ বন্ধ করে, অন্য চোখটা কুঁচকে সাইকেল চালাতাম। এই পোকার নাম ছিল শ্যামাপোকা। আর এই পোকার পাকামি শুরু হলেই বুঝতে পারতাম শ্যামাপূজা আসন্ন।
কালীপূজার আগের দিন চৌদ্দ শাক খাওয়ার নিয়ম, আর রাতে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালাতে হয়, এটুকুই জানা ছিল। আজকাল হোয়াটস্ এ্যাপের কল্যাণে জ্ঞানের পরিধির বহর বাড়ছে। এই দিনটি হল গিয়ে ভূতেদের পূজা করার দিন। এই দিনটিকে নাকি ভূত চতুর্দশী বলা হয়। দেবতারা যদি পূজা পেতে পারে, তাহালে ভূতেরা নয় কেন? সবাই তো পরপারে স্বর্গে যাওয়ার টিকিট পাবেন না, সেই সব অভাগাদের দরকার ভূতকে তুষ্ট করার। ‘ভূতের রাজা দিল বর, জবর জবর, আহা ভূত, বাহা ভূত, কিবা ভূত কিম্ভুত’… মনে পড়ছে? গুপী গাইন বাঘা বাইন সিনেমাতে ছিল। তাহালে প্রদীপের শিখা দিয়ে ভূত না ভাগিয়ে, অন্ধকারে কন্ধকাটার আরাধনা করতে আপত্তি কি? ভূতচতুর্দশী হল গিয়ে কালীপূজার প্রি-কার্সার। সেদিন সকালের দিকে গিয়েছি মাছের বাজারে। ফি বছরে পূজার দিনগুলিতেই সাধারণভাবে ৬২র বঙ্গ ব্রিগেডের সঙ্গে দেখা হয়, আজকাল অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যম অনন্য হোয়াটস্ এ্যাপ। মাছের বাজারে এলে খুচখাচ দুই একজন পরিচিত মুখের দেখা অবশ্যম্ভাবী। মাছ কিনতে কিনতে একটু খোশগল্প। আজকাল ফ্ল্যটবাড়ীর কল্যাণে পড়শীর হেঁসেলের খবর পাওয়া যায় না, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত আড় চোখে দেখে নেওয়া, কার ঘরে কি মাছ ঢুকল। আমাদের এক দাদা এ ব্যাপারে বেশ দক্ষ। একদিন ফোনে জানালেন - ‘খুব বিরিয়ানী খাচ্ছেন ৬২র বাঙালী দোকান থেকে!’ বুঝলাম রিসোর্সফুল লোক। হাঁড়ির খবর এক্কেবারে সাপ্লায়ারের মুখ থেকে বার করে ছেড়েছেন।
শাকপাতার থেকে মাটন ভাল। তারই সন্ধানে বাজারে। মাংসের দোকানের ছেলেটা কয়েকটা কচি পাঠাকে দড়ি বেধে পিছনে নিয়ে যাচ্ছে। দেখি আমাদের এক এক্টিভ সিলেটী মেম্বার বেশ উদাস দৃষ্টিতে গমনোদ্যত পাঠার দিকে তাকিয়ে। আমার স্বল্পজ্ঞান সিলেটি ভাষায় জিজ্ঞাসা করলাম - কিতা খবর? ওলাখান উদাস হৈয়া
কিতা দেখরায়? (কি ব্যাপার। ওরকম উদাস দৃষ্টিতে কি দেখছ?) তার উত্তর - ‘সি- ভালা ভালা অত খাসি যায়,কৈ যায়,কার লিগ্গা? (এই যে খাসি গুলো কি সুন্দর চলেছে বধ্যভূমিতে, কার জন্য?) বল্লাম - ‘সি- লূভ দিও না ,তুমার ভোগে ত আর লাগত না,বারন আছে। (নজর দিও না । তোমার তো খাওয়া মানা। হার্টের ব্যামো আছে না!)। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বল্ল - ‘ সি- অয় রে দাদা অয়,বেল ফাকলে কাকের কিতা? অখন খাসি নাই,খূসী নাই কেবল হরির নাম,নামৈব কেবলম।’ বেচারা!
কালীপুজা হয় অমাবস্যার দিনে। ডাকিনী যোগিনী থাকন দুইপাশে। গতবছর কালীপুজার কয়েকদিন পর গিয়েছিলাম কলকাতায়। শ্বশুর মশাই ভর্তি ছিলেন এনআরএস এর কোভিড ইউনিটে। ঐ চত্বরে ঢোকার মুখে দেখি গেটের দুইপাশে ডাকিনী যোগিনী। দুষ্টুবুদ্ধিতে বাঙালীর মাথা খেলে ভাল। কালীপূজার ভাসানে না দিয়ে কোভিড ইউনিটের পাশে এনে রেখেছে। আগে থেকে ভয় দেখিয়ে রাখা রোগীর আত্মীয়স্বজনকে, যারা ঢুকছেন তাদের টেঁসে যাবার সম্ভাবনা বেশী।
ভূত চতুর্দশীর দিন সন্ধ্যাবেলা কয়েকজন হর্তাকর্তা মিলিত হয়েছেন। আমিও ‘প্রেসেন্ট প্লিজ’। তালে তাল মেলাতে হবে তো! শ্যামা পোকা আজকাল মিসিং।.তার জায়গায় এসেছে মশা।.সঙ্গে এনেছে ডেঙ্গি। কমিটির দুজন ডেঙ্গি জয় করে উপস্থিত। ভূত যেমন ছিল হ্যারিকেন জমানার, ডেঙ্গুর উপদ্রবও ছিল ঐ সময়কার। মাঝে এই দু জনের কথা বিশেষ শোনা যায় নি। আজকাল এরা আবার বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। দুর্গাপুজার সাদামাটা এনট্রি পয়েন্টে সুন্দর গেট।.অনেক লাইটও লাগান। ফটো তুলে ৬২ বংস এ পোস্ট হয়ে গেল। ‘নেপোয় মারে দই’, ভাবটা এমন যে আমরা এইমাত্র পরিশ্রম করে গেট লাগিয়ে ফটো তুলছি।
এবারে কালীপুজা আর দেওয়ালি একই দিনে পড়ছে। সাধারণভাবে দেওয়ালির আগের দিন কালীপুজা হয়ে থাকে। তিথি নক্ষত্রের খামখেয়ালীপনার জন্যই এবারে, অন্যবারের তুলনায় ব্যাতিক্রমী। সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। সঙ্গে হাউসির বোর্ড। গতকালই বি ব্লকের ‘স্পার্কল’ দোকানটা থেকে কিনেছি। হাত কামড়াচ্ছি আর ভাবছি, আগের মিটিংএ নিজে থেকে হাউসির প্রোপোসাল কেন যে দিলাম। সবাই খুব উৎসাহ দিয়ে জানাল-‘দেবদত্তদা, দারুন হবে। আমরা আপনার পাশে।’ মানে বিড়ালের গলায় ঘন্টি বাঁধা হয়ে গেল। চিরকাল মাইকের থেকে দূরে। ৬২র পূজার মাইকের টিকি বাঁধা আছে কালচারাল সেক্রেটারি কুমার বিশ্বাসের কাছে। উনাকে মাইক বিশ্বাসও বলা যায়, কারণ উনি মাইকে বিশ্বাস রাখেন , কনফিডেন্টলি স্বচ্ছন্দে হাতে তুলে নেন, যেমন কিনা ভীমের হাতের গদা নিদেনপক্ষে বাউলের একতারা। আমার আবার মাইকে ‘অবিশ্বাস’, হাতে নিলে মনে হয় এই বুঝি শক খাব! সখ করে ‘শক’ খাচ্ছি।
ক্রমশঃ
পার্ট ২
সেই বিবেকানন্দের ভবতারিনীর সামনে প্রার্থনার কথা মনে পড়ল। পূজাস্থলে ঢুকে প্রথমেই করুণাময়ীর সামনে হাতযোড় করে হাউসি পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেবার আর্জি জানালাম।
৭টা বাজে। পুজোর প্রস্তুতি চলছে। তখনো বিশেষ কেউ আসে নি। কৌশিক একাই পূজার দেখাশোনা করছে। এককোণে ঠাকুরের ভোগ রান্না চলছে। পরিচিত মুখ, সুনীতা, সোমা এবং ইন্দ্রানী বৌদি। ইনাদের আরেকটা মিল হচ্ছে, সবারই টাইটেল ‘ব্যানার্জি’। এদের সঙ্গে আছেন শুক্লা, সোমা এবং তপতি বৌদি। এরা সবাই সকাল থেকে নির্জলা উপোষ করে আছেন।ভোগের রান্নার সুগন্ধকে উপেক্ষা করে পেটে কীল মেরে রান্না চালিয়ে যাওয়া সোজা কথা নয়।
বাসবের কাজ চিরকালই নিখুঁত এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে। বাড়ী থেকে একটা বড় স্পীকার নিয়ে এসেছে। তাতে সুন্দর শ্যামাসঙ্গীত হচ্ছে, পান্নালাল ভট্টাচার্যর কন্ঠে। বেশীরভাগ রামপ্রসাদী গান। একটা লাইন খুব মনে ধরল -‘আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা চৈতন্যময়ী’। অন্তর্নিহিত অর্থ বড় গভীর। আপনারা অনেকেই গুরু মন্ত্রে দীক্ষিত, বেদ, উপনিষদেও রুচি রাখেন। আমার কাহিনী ‘আমি তন্ত্র, মন্ত্র কিছুই জানি নে মা’। খালি বলি রসে বশে রেখো মা’। বছর কুড়ি আগে অফিস আয়োজিত একটি প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। নাম ট্রানসেডেন্টাল মেডিটেশন। গেরুয়া বসনধারী ফ্লুয়েন্ট ইংরাজী বলা অনেকটা সদগুরু টাইপের সাধু। শেষ দিনে শোনা গেল গুরু মন্ত্র পাওয়া যাবে। এক এক করে সবাই যাচ্ছে। বেরিয়ে এসে সবাইকে দেখি মুখে কুলুপ আটা। বেশ কৌতূহল নিয়ে ঢুকলাম। সাধুজী জানালেন মন শান্ত রাখার জন্য রোজ ধ্যান করতে হবে। এক জায়গায় গ্যাট হয়ে বসতে চোখ বন্ধ করে মিনিট পাঁচেক, তারপর ধীরে ধীরে টাইম বাড়াতে হবে। সাধু মহারাজ জানালেন কোন একটা নাম চুস করতে, সেটাই হবে আমার গুরুমন্ত্র। অপশন যখন অনন্ত, আমার চিন্তাও অনন্তকাল মনে হল সাধুজীর কাছে। মনের মধ্যে প্রবলভাবে হাতড়াচ্ছি কোন নাম নেব, বাবা, না মা, না কোন ঠাকুর দেবতা, নাকি কোন দেশবরেণ্য নেতা। সাধুজী অন্তর্যামী। বুঝলেন আমি এক আনকোরা পাবলিক। জিজ্ঞাসা করলেন -‘কোনসা চীজ আচ্ছা লাগতা হ্যায়’? ফট করে বলে বসলাম সাইকেল’। উনি বল্লেন - সাইকেলকা ঘন্টি কা আওয়াজ ক্যায়সা হোতা হ্যায়?’ বল্লাম ‘ক্রীং ক্রীং’। প্রবলেম সলভ। সাধুজী নিদান দিলেন ওটাই আমার গুরুমন্ত্র। সাধুজীকে নমস্কার করে বেরিয়ে এলাম বটে তবে ‘জ্ঞানচক্ষু’ খুলল না, কারণ চক্ষু বন্ধ করে বসে থাকার মত দুরূহ কাজ আমার অধরা রয়ে গেল। একে একে লোক সমাগম শুরু হল। ঢাকের আওয়াজে শ্যামাসঙ্গীত চাপা পড়ে গেল। গৌতম মুখার্জি সপরিবারে।পায়জামা-পাঞ্জাবী-জ্যাকেট, বাবা আর ছেলেতে কম্পিটিশন। ছন্দপতন খালি গৌতমের জ্যাকেটের তলায় লাগান ঝালর, ঝুলঝুল করছে। একটু পরে চলে এল সূর্যকান্তি। ওর ভরসাতেই আছি, হাউসি খেলানোতে আমার ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবেল’ পার্টনার। চক্ষুদুটি একটু নিমলীত মনে হল। কারণটা কি কারণবারি? সূর্যকে জিজ্ঞাসা করলে মিটিমিটি হাসে। কালীপুজার দিনে থুড়ি অমানিশায় তমোগুনে দোষ নেই। জনান্তিকে বলি, আমিও সে দোষে দুষ্ট। রাজদীপ ও তার বউ দুজনেই ডেঙ্গুজয়ী। জিজ্ঞাসা করলাম একই মশা কামড়ে ছিল কিনা। একযাত্রায় পৃথক ফল না হওয়াই ভাল! রাজদীপের একাহাতে বেশ গভীর ক্ষত। নারকেল মালা থেকে চাকু দিয়ে নারকেল ছাড়াতে গিয়ে বিপত্তি। লক্ষভ্রষ্ঠ হয়ে নিজেই ছুরিকাহত। স্টীচ করতে হয়েছে। আজকাল আমিও মাঝে মাঝে বাড়ীতে নারকেল নিয়ে আসছি। কারণটা আর কিছুই না। মার্কেটে ডাবের থেকে নারকেল শস্তা। ঘোর কলিকাল। ঝুনো ডাব থেকে নারকেল হয়। ডিমান্ড সাপ্লাইএর তারতম্যের কারণে ডাবের স্কাইরকেটিং প্রাইস মনে হচ্ছে। করোনা প্রিভেনশনে নাকি ডাবের জল উপকারী। তাই দেদার বিকোচ্ছে।
চারিদিকে ছোট ছোট জটলা, গোল টেবিল বৈঠক। প্রেসিডেন্ট এসে আমার পাশে বসলেন। বললেন-‘একটু লেখকের সান্নিধ্যে এলাম’। অমাবস্যার রাতে স্বপ্নালোকিত জগত। ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে’।! খালি বল্লাম ‘মইতে ত চড়িয়ে দিলেন, দয়া করে এবার তলা থেকে টান দেবেন না।
প্রত্যুষ হচ্ছে বাচ্চাদের মধ্যে সবচেয়ে উৎসাহী। ক্লাস সেভেনে পড়ে। বাচ্চাদের সব কম্পিটিশনে ও অংশ নেয়। প্রাইজও পায়। ও এসে জিজ্ঞাসা করে গেল ‘কখন শুরু হবে?’ হাউসির টিকিট বিক্রি শুরু হয়ে গেল। গেম শুরু করার টাইমিংটাও ট্রিকি। বেশী দেরী করলে আবার ভোগ খাওয়ার সময়ের সাথে ক্ল্যাশ করে যাবে। যে কোন নূতন এন্টরপ্রিনিওরশিপের মত, শুরুটা স্লো হয়, হাউসির টিকিটও প্রথম দিকে ছিল লো ডিমান্ডের তালিকায়। শান্তনু পুশ সেলিং শুরু করে দিল। ৪৮টার মধ্যে তখন মাত্র চারটে বেঁচে। সেটাও বিক্রি হয়ে গেল তাড়াতাড়ি। মহিলা মহলের রিকোয়েস্ট এল, খেলাটা যেন অঞ্জলির পর শুরু হয়। ঢাকের শব্দ আর কোন প্রোগ্রাম করানো, প্রায় চোর পুলিশ খেলার মত ব্যাপার। অঞ্জলির পর খেলা শুরু করব, শুরু হয়ে গেল আরতি ও ঢাকের যুগলবন্দী। যা থাকে কপালে। খেলা শুরু। ডিজিটাল জমানা। হার্ডবোর্ড আর নম্বরের চাকতি হয়ে গেল ব্যাক আপ। বিকালেই মোবাইল ঘাটতে ঘাটতে পেয়ে গেলাম অনলাইনে গেম খেলার জাদুকাঠি। সূর্যকান্তি, গৌতমের উপদেশ উপেক্ষা করে ডিজিটালেই স্টিক করে থাকলাম। ফুল হাউস পেলেন ইন্ডিয়ান অয়েলের অধিকারীদা। উনিও ডিজিটাল মাধ্যমে, অর্থ্যাৎ পেটিএমে টিকিট কেটেছেন। শুভব্রত আগে কোনদিন হাউসি খেলে নি। বিগিনার্স লাক। ও একটা প্রাউজ পেল। খেলা শেষ হল। ভোগের লাইনও লেগে গেল। খিচুড়ি, ফুলকপি আলুর চচ্চড়ি, বেগুনি, চাটনি ও রসগোল্লা। রসগোল্লার আবার ডাবল ধামাকা। দুটো করে।
বেশ কয়েকজন হাউসি খেলানোর জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে গেলেন। এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন যে আমি আর্মি ব্যাকগ্রাউন্ডের কিনা। শুনে আমার ভির্মি খাওয়ার যোগাড়। আমার বাড়ীতে চৌদ্দপুরুষেও কেউ আর্মিতে ছিল না। চিরকালের ভেতো বাঙালি। বুঝলাম, উনি জানেন যে আর্মি কি এয়ারফোর্সে পার্টি হলে হাউসি খেলা অবশ্যম্ভাবী। সবিনয়ে জানালাম ‘আধাসরকারী চাকুরে ছিলাম, আপাতত রিটায়ার্ড।আজকাল কাজ হচ্ছে ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ান।’ কয়েকজন অভিযোগ জানালেন-‘কি টিকিট দিলেন, কিছুই তো পেলাম না’! এর মধ্যে বন্ধুপত্নী দোলাও একজন। মনের ছাপ সবসময় ওর মুখের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পায়। হাউসিতে কিছু না পেয়ে মনোকষ্টে ছিল। কথায় কথায় একটু সাহিত্যিকদের আলোচনা হচ্ছিল। ছোটবেলায় বালিগঞ্জে ওর মাসীর বাড়ীর কাছে ফ্ল্যাটে থাকতেন সুনীল গাঙ্গুলি। রাত দশটার পর প্রায়ই তাকে নাকি দেখা যেত সিঁড়ি দিয়ে টলতে টলতে উঠছেন। এটা অবশ্য কোন গুপ্ত তথ্য নয়। নিজের অনেক লেখাতেই তিনি এ ব্যাপারে অকপট। সদ্যপ্রায়াত বুদ্ধদেব গুহ ওর প্রিয় লেখক। দেশে বেরোত মাধুকরী। পাঠকরা মুখিয়ে থাকত। চিরাচরিত প্রথা ভাঙতে তার লেখনী বলিষ্ঠ। আমার অবশ্য তার লেখা ‘খেলা যখন’ বইটা বেশী পছন্দ। ঋতু গুহর সঙ্গে তার প্রেম এ লেখার উপজীব্য। নিজের জীবনের মধুর ঘটনা কলমের টানে ভীষণভাবেই সজীব, তার সঙ্গে ষাটের দশকে গানের জগতের গুণীদের কথা।
এরপর মোটামুটি ভাঙা হাট। সেনমহাশয়ের সঙ্গে দেখা। মনে করিয়ে দিলেন বড় পাবলিশারতার হাতের মুঠোয়। ছাপাতে কোন অসুবিধা নেই। দক্ষিণার ব্যাপারটা সাহস করে জিজ্ঞাসা করা হল না। বারটা প্রায় বাজে। নয়ডা পুলিশ এসে বারবার তাড়া দিচ্ছে জমায়েত বন্ধ করতে।
দীর্ঘ একমাসের দেবীপক্ষ শেষ। এরপরের প্রোগ্রাম মাস দুয়েক পরে বাগদেবীর আরাধনা। লক্ষী চঞ্চলা, কিন্তু সরস্বতীর ব্যাপারে সে দুর্নাম নেই, তাই আশায় আছি, দু মাসের হাইবারনেশনের পর কলম থেকে এরকম পছন্দের কিছু শোনাতে পারি। আপনাদের শুভেচ্ছাপ্রার্থী।
দেবদত্ত
০৬/১১/২১

Comments
Post a Comment