লক্ষীপুজা ২০২১
২০২১ শের লক্ষী প্রতিমা-সেক্টর ৬২ নয়ডা
লক্ষীপূজা
জনতার দরবারের পপুলার ডিমান্ড, লক্ষীপূজার ধারাবিবরণীর জন্য। মইএর উপর চড়িয়ে দিয়েছেন, তার সঙ্গে আশার পারদও চড়ছে, তবে লেখা আশানুরূপ না হলে মই কেড়ে নেবেন না বলেই আশা রাখি।
এক ভক্ত জানালেন লক্ষীঠাকুরণের কষ্ট - মা, বাবা কি ভাইবোনের থেকে বেশী। মায়ের সঙ্গে সপরিবারে এই তো দশমীর দিন ফেরত গেলেন, দিন চারেক কাটতে না কাটতে ভক্তদের ডাকে আবার মর্ত্যে আবাহন। করোনার সময় আবার ডাবল ঝামেলা - আরটি পিসিআর, মাস্ক, স্যানিটাইজার সব চাই। বোঝার উপর শাকের আঁটি। তার উপর আছে লক্ষীর ঝাঁপি। চোর, গাটকাটার যা ভয়, সেটাকেও মুঠো বন্দী করে রাখতে। লক্ষীর মুঠোয় ঝাপি, আর মানুষের মুঠোয় মুঠোফোন। প্যান্ডালে বিশ্বজিত ব্যানার্জির সঙ্গে দেখা। চিন্তিত মুখে জানাল, মোবাইল বাসায় ফেলে এসেছে। আজকাল আমরা অসহায় বোধকরি যদি মোবাইল সঙ্গে না থাকে।
গোলকধামে গিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়াকে দেখার সুযোগ হয় নি, তবে ধরাধামে বিষ্ণুর সবচেয়ে পবিত্রধাম, বদ্রীনাথ দেখার সৌভাগ্য বেশ কয়েকবার হয়েছে। চাকরীজীবনের শেষভাগে পোস্টিং ছিল যোশীমঠে। সেখান থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার হল গিয়ে বদ্রীনাথ। মন্দির খোলার দিন, কি বন্ধের দিন বা ছুটির দিনে প্রায়ই ঘুরতে যেতাম। এপ্রিলে মাঝামাঝি খোলার দিন আর নভেম্বরে বন্ধের দিন গেলে হরেক রকম প্রসাদ পাওয়া যেত ভক্তদের লঙ্গর থেকে।সে খাবার হত খুব সুস্বাদু।
মন্দিরের চত্বরের মাঝে ভগবান বিষ্ণুর মন্দির। ভিতরে বিষ্ণু ঠাকুরের সঙ্গে কুবের, নারদ, উদ্ধব সবাই আছেন। জগতের পালনকর্তা, আর কে না জানে সংসারের সারসত্য কড়ি-কাঞ্চন - প্রজাপালনে সেটার হিসাব রাখতেই, খাজাঞ্চি কুবের সহ বিষ্ণুর এই দরবার। কিন্তু বেচারী লক্ষীঠাকুরণ। তার নিবাস মন্দিরের চত্বরে এক কোণার একটি মন্দিরে। এমনটা কেন, তারও এক মজাদার কাহিনী। বিষ্ণুর দরবার, সঙ্গে তার চেলাচামুন্ডারা, যারা সবাই পুরুষ। বেচারী বিষ্ণুপ্রিয়া, এই হট্টগোলের বাজারে কি করে সবার সামনে প্রিয়ার ভূমিকা পালন করবেন? তাই হরিপ্রিয়া বা পদ্মাপ্রিয়া বা কামাক্ষী বা রমা র স্থান আলাদা মন্দিরে। তবে শীতকালে মন্দির যখন বন্ধ থাকে তখন নারায়ণ রিল্যাক্স মুডে থাকেন। ঔ সময় তার নিবাস যোশীমঠে। নীচে নামার সময়, বদ্রীনাথ ও যোশীমঠের মাঝামাঝি, পান্ডুকেশ্বরে কুবের থেকে যান। যোশীমঠে নারায়ণ ও লক্ষী থাকেন একই ছাদের তলায়। তাহালেই দেখুন, জগতের হিতে মালক্ষীকে কত স্যাক্রিফাইস করতে হয়।
হোয়াটস্ এ্যাপে মেসেজ চলে এল রাত সাড়ে আটটায় পূর্ণিমা ছেড়ে যাবে তাই ৬-৪০এ অঞ্জলি হবে। আগে কোনদিন অঞ্জলি দিই নি। রিটায়েরমেন্টের পর পাবলিক সেক্টরের কর্মীদের ‘ইনাটারেস্ট’ থাকে ব্যাঙ্ক ইনটারেস্টে, আর সুদের ফ্রি ফল, মধ্যবিত্তের স্মুদ লাইফের বড়ই অন্তরায়। তাই ঠিক করলাম ‘পুষ্পবিহীন’ অঞ্জলি দিয়ে ঠাকুরকে প্রার্থনা জানিয়ে আসি।
ঢোকার সময় কৌশিকের সঙ্গে দেখা। কোলে ওর বাচ্চা। দুর্গাপুজার সময় ওর একবছর কমপ্লিট হয়েছে। নিষ্পাপ চেখে জুলজুল করে আমাকে দেখল। আমাদের মন্ডপে যে দুই একজন সারাক্ষণ পূজাস্থলে ঠাকুরমশাইএর পাশে পাশে থাকে, তারমধ্যে কৌশিক অন্যতম। কথা কম ও বেশী কাজে বিশ্বাসী। কৌশিক আমার কানে কানে জানান দিল-‘কাকু, তুমি দারুণ লিখেছ, কিন্তু যাকে ঘিরে এত আয়োজন, সেই পূজা, মানে কোর সাবজেক্টের উপর লেখা বাড়ন্ত। হক কথা। লিখতে হলে সাবজেক্টে দখল থাকা দরকার। বেদ, উপনিষদ মায় দুর্গা পূজার স্তোত্র সবই অজানা। এই সেদিন ‘শরণ্যে ত্রম্বকে গৌরী’ র মধ্যে ‘ত্রম্বক’ মানে জেনেছি (ত্রি+অম্বক) ত্রিনয়ন বা শিব ঠাকুর। বাড়ীতে যখন জগদ্ধাত্রী পূজা হয় তখন সংকল্পে বসতে হয়। তারপরের বাকী সময়টা কাসরঘন্টা বাজাতে বা শাঁখে ফুঁ দিতে বা ধূপধুনো জ্বালাতে ব্যস্ত থাকি। তবলা কি হারমোনিয়াম বাজাতে তালজ্ঞান চাই, বেতালের জন্য কাসর-ঘন্টা সই।
কালকূটের বিখাাত বই ‘অমৃত কুম্ভের সন্ধানে।’ অমৃতের সন্ধানে- ঈশ্বরের আরাধনা, কিন্তু মানুষ তো ‘শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা’। সমরেশ বসুর কলমে সেই ধর্মভীরু মানুষের জীবনের কাহিনী উঠে এসেছে। কুম্ভস্নানের পুণ্যঅর্জন তার লক্ষ্য ছিল না, লিখেছিলেন আপাতদৃষ্টিতে অতিসাধারণ মানুষের জীবনদর্শন, যা সর্বকালের পাঠকের সমাদরযোগ্য।
কোজাগরী লক্ষীপূর্ণিমাতে বাঙালীর ঘরে ঘরে লক্ষীর আরাধনা।.তবে লক্ষী চঞ্চলা। তিনি যাতে ঘরে প্রবেশের পর মুহূর্তে না উধাও হয়ে যান, তার জন্য সারা রাত জেগে থাকতে হয়। গৃহবাসী যাতে না ঘুমিয়ে পড়ে, তাই আগেকার দিনে পেয়াদা পাড়ার রাস্তায় হাঁক দিতে দিতে যেত ‘কে জাগ রে?’ তাই থেকেই এই ‘কোজাগরী’ কথাটার উৎপত্তি।
অঞ্জলির ডাক পড়ল। এবারে মাইক নেই। ঠাকুরমশাই লক্ষীপ্রতিমার দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পড়ছেন। একেই সংস্কৃত মন্ত্র। ঠিক শুনতে পাচ্ছি না। কানটা পুরুতমশাইএর দিকে করলে চোখটা পাশের মহিলার দিকে চলে যাচ্ছে। ছোটবেলায় মা শিখিয়ে দিয়েছিল একগ্রচিত্তে ঠাকুরের মুখের দিকে তাকিয়ে মন্ত্র উচ্চরণ করতে হয়। মহা বিপদ। হঠাৎ হালে পানি পাওয়া গেল। পাশে পিনাকী ভটচার্য। সাধারনত লোকে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ে। আমিও তাই। এর গূড় রহস্য হচ্ছে খটমট সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণে বেশ ভুলভাল হয়ে যায়। পাশের লোকের কান বাঁচাতে তাই এই ‘মন্ত্রগুপ্তি’। পিনাকী শুনছি বেশ জোরে জোরে বলে যাচ্ছে, কখনো বা পুরুত মশাই বলার আগেই। ভালই হল। ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে পিনাকীর মুখের কাছে কান খাড়া করে অঞ্জলি দিলাম।
এই মন্ত্র উচ্চারণের ব্যাপারে, আমার শিশু বয়সের এক মজার কাহিনী শোনাই। নার্সারি ক্লাসের ঘটনা। স্কুল থেকে রোজ বাড়ী ফিরে রোজই সুর করে বলতে থাকি - ‘আধাতিকা দফুফুদা, পিতপিতা দশংগেতে’। বাড়ীতে বাবা মা চিন্তিত -‘কি ভাষা শেখাচ্ছে? এসপারেন্টো নাকি’? তখন সবে শোনা গিয়েছে পৃথিবীর প্রধান ভাষাগুলো থেকে অক্ষর নিয়ে এই নূতন ভাষা তৈরী হয়েছে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে একটাই ভাষা থাকবে আর সেটা হবে এসপারেন্টো।পরে অবশ্য একদিন এটার রহস্যভেদ হল, যখন বাবা মা স্কুলে গিয়ে জানল অপভ্রংশের লাইনটির উৎসটি, যার শুরু কিছুটা এইরকম ‘আধ্যাত্বিক খাদ্য দাও প্রভু....’! ছোট্ট মাথায় কি এত গুরুগম্ভীর শব্দরাজি ঢোকে, সুরটা মনে ধরেছিল তাই ওই বিচিত্র বাণী বাবা-মায়ের চিন্তার উদ্রেক করেছিল।
খবরকাগজের মাধ্যমে জানতে পেরেছি - এই যে, আমরা দুর্গাপুজার অষ্টমীর দিন অঞ্জলির সময় বলি - ‘ ধনং দেহি পুত্রান্ দেহি সর্ব কামাংশ্চ দেহি মে'। এই মন্ত্রোচ্চারণ নিয়ে এখন কনট্রোভার্সি চলছে। নারী জাগরণী সমিতির দাবি উঠছে, 'পুত্রান্ দেহি'র বদলে 'সন্তানান্ দেহি' বলা হোক, যাতে পুত্র বা কন্যা নির্দিষ্ট করে না প্রার্থনা করে সন্তানের কথা বলা হোক ওই মন্ত্রে। কেউ আবার শাস্ত্রমতের দোহাই দিয়ে বলছেন ‘সে যুগে নিঃসন্দেহে পুত্র সন্তানই চাইতেন বেশিরভাগ মানুষ। কারণ আর্যরা যখন যুদ্ধ করতে করতে অগ্রসর হচ্ছে, তখন লড়াই করার জন্য শক্তিশালী পুত্রের প্রয়োজন বলেই মনে করা হত।’ গৌতম এই প্রসঙ্গে বল্ল, বিয়ের পরপর পুরীর মন্দিরে গিয়েছিল। এক পান্ডা কোন ফাঁকে সঞ্চিতাকে পাশে ডেকে নিয়ে ঝাড়ু লাগিয়ে, কেষ্টঠাকুরের দাক্ষিণ্য প্রদান করে কিঞ্চিৎ কাঞ্চনমূল্যের আশায় ছিল। গৌতম টানাটানি করে সদ্যবিবাহিত পত্নীকে ঝাড়ুর হাত থেকে উদ্ধার করে ফেলায় পান্ডার বাড়া ভাতে ছাই পড়ল। সে রেগে গিয়ে জানাল -‘তোর দুটো মেয়ে হবে’। গৌতমের দুই ছেলে। পুরীর মন্দিরের অভিশাপে ‘শাপে বর’ হয়েছে।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
এবার পূজাতে গৌতম মুখার্জি কলকাতায় কাটিয়েছে। কলকাতায় নাকি ‘অল রোডস লিড টু রোমের’ মত পুরো জনসমুদ্র ‘বুর্জ খলিফা’ গামী। কলকাতা লিবারেল সিটি হিসাবে পরিচিত। তাই দুর্গা মায়ের বুর্জ খলিফায় অধিষ্ঠান নিয়ে কথা ওঠে নি। তবে সংবাদমাধ্যমের দ্বারা জানতে পারলাম দেওয়ালী সেল উপলক্ষ্যে ফ্যাব ইন্ডিয়ার নূতন কালেকশনের নাম ‘যশন ই রিওয়াজ’ সোশাল মিডিয়াতে ট্রোলের শিকার। ওটার মানে হচ্ছে ‘উৎসবের পরম্পরা’। অনেকে ফ্যাব ইন্ডিয়া বয়কটের ডাক দিয়েছেন। বিজনেসে ধাক্কার ভয়ে, ফ্যাব ইন্ডিয়া বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিয়েছে।
লক্ষী ঠাকরুণের সম্বন্ধে জ্ঞানের ঝাঁপি বাড়াতে গুগলে যেই বাংলায় ‘লক্ষী’ লিখেছি, সাজেশন এল পশ্চিমবঙ্গে কন্যাশ্রীর সাকসেস স্টোরির পর ‘লক্ষীর ভান্ডার’ প্রকল্পের। গরীবের টাকারূপী সিন্ধুতে বিন্দু যোগ হবে, কিন্তু বিন্দু বিন্দু ভোটে পার্টির ভোটলক্ষীর ঝাঁপির প্রাপ্তিযোগ অবশ্যম্ভাবী।
দুর্গাপূজা নিয়ে লেখার পর লোকজনের আমার প্রতি মনযোগে কিঞ্চিৎ বৃদ্ধিলাভ হয়েছে। আমি লাইটমুডে থাকতে পছন্দ করি, লাইমলাইটে থাকার অভ্যাস রপ্ত হয় নি। কেই কেউ এসে আলাপ করে গেলেন। একজন হচ্ছেন পি আর দাশ। হিসাব করে দেখলাম আমার থেকে দশ বছরের বড়। দুর্গাপুজায় ‘ডাকের সাজ’ এর অরিজিন নিয়ে লিখেছিলাম। উনিও ‘ডাক’ নিয়ে একটা মজার কাহিনী শোনালেন। লট্ট্যা মাছ বাংলাদেশে পাওয়া গেলেও, আগেকার সময় কলকাতায় লট্যা মাছ আসত বোম্বে থেকে রেলের ডাকে। তাই কলকাতার বাজারে লট্যা মাছের আরেক নাম ছিল ‘বন্বে ডাক’। বিশ্বজিত জানালেন শুটকি বানাতে লট্যা মাছ শিকে লটকে রাখা হত। তাই থেকে নাম লইট্যা মাছ। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ল ক্লাস ওয়ান কি টুতে পড়ার সময়, পরীক্ষায় পাঁচটি মাছের নাম লিখতে দিয়েছিল। আমি একটা মাছ লিখেছিলাম কাটা মাছ। দিদিমনিদের খুব হাসাহাসি। আমার আর কি দোষ। বাজারে যাওয়ার আগে বাবা জিজ্ঞাসা করলে, মা বেশীরভাগ সময় বলত ‘কাটা মাছ’ আনবে।
মহিলামহলের নেকনজরেও যে পড়েছি তার প্রমাণ পেলাম। বেসমেন্টের পূজাস্থল থেকে উপরে উঠছি সূর্যকান্তর সঙ্গে ‘বুদ্ধির গোড়ায় ধূয়ো দিতে’ মানে সাদা বাংলায় ধূম্রপান করতে, দোলা ও মৌসুমীর সঙ্গে দেখা। হৈ হৈ করে জানান দিল - অনেক কিছু কি সুন্দর করে লিখলেন, পূজার কটা দিন আমাদের শাড়ীর কালেকশন ডিসপ্লে হয়, এটাও তো লেখার একটা গুরুত্বপূর্ণ টপিক।এবারে একদম মিস করবেন না’। যথা আজ্ঞা। এরা সবাই মিসেস। যারা ‘ মিস’ তারা শাড়ী কম পড়ে, তাদের মধ্যে বাংলা জানা আরো কম। তাই তাদের কমেন্ট ‘মিস’ করলাম। বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’ তেমনি করেই বঙ্গ ললনার সৌন্দর্য বর্ধন কিন্তু শাড়ীতে। দিল্লিতে আগে শাড়ীর দোকান কম ছিল। শাড়ীর দোকান মানে ব্রাইডাল শাড়ী, চিকমিকে জরি বসানো শিফন শাড়ী। আজকাল দিল্লি হাট হোক, কি খড়ক সিং মার্গের স্টেট এম্পোরিয়াম বা অনলাইনে শাড়ীর ছড়াছড়ি। পছন্দ না হলে রিফান্ডও করা যাবে। প্যান্ডেমিকের আগে পূজার একমাস আগে থেকে সিআর পার্কে শাড়ীর মেলা হত। বঙ্গ বিউটিদের লাইন লেগে যেত। শাড়ীর ব্যাপারে সব মহিলা বেশ সেন্সেটিভ। মহিলাদের জটলার মাঝে আমি শাড়ীর জটিলতত্ব উদ্ধারে রত। গোলটেবিল থুড়ি চেয়ার বৈঠকে শক্তিকুঞ্জের শক্তি স্বরূপিনীরাই পাল্লায় ভারী। বাংলাদেশে থাকার সুবাদে জামদানীটা চিনি। একজন পরিচিতার উজ্জ্বল শাড়ীটি ছিল বালুচরী। সেটার প্রশংসা করে পাশের পরিচিতার তসরসিল্কের শাড়ীকে ভুলে মুর্শিদাবাদ সিল্ক বলে ফেলেছি, যেটা কিনা তসর সিল্কের তুলনায় হাল্কা। তিনি অবশ্য খুব হাল্কা ভাবে নিলেন না। শাড়ীর ‘শাড়াশি’ চাপে আমি গলদঘর্ম।
সেন মহাশয়ের আবির্ভাব। আমার বই ছাপাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। একটু পরেই উনি দশ বারো বছর আগে রিটায়ার্ড ভদ্রলোককে চাকরী করে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ‘আশার ছলনে ভুলি, কি ফল লভিনু হায়’ অথবা ‘ধন্য আশা কুহকিনি’ এই আপ্তবাক্য স্মরণ করে আমিও সটকে পড়লাম।
মিত্র সাহেব বয়স্ক মানুষ, হাতে স্টিক। হঠাৎ এসে বল্লেন - ‘তুমি কি ডক্টর রায়’? আমি বল্লাম -‘এই সুসংবাদ আপনাকে কে দিল?’ উনি জানালেন - হোয়াটস্ এ্যপে দেখছি তোমার নামে অভিনন্দনের বন্যা।’ বল্লাম- ‘এরজন্য আপনি আমার প্রফেশন চেঞ্জ করে দিলেন! লেখাটা কি পড়েছিলেন?’ উনি উত্তরে জানালেন রাতে আনন্দবাজার পড়েন, আরো অনেক কিছু পড়েন, তবে আমার লেখাটা পড়ে উঠতে পেরেছেন কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। তারপর হঠাৎ স্টিক ছেড়ে দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে শান্তনু …শান্তনু বলে এদিক ওদিক দেখতে থাকলেন, যেন দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে খুঁজছেন। শাল্তনুর ছেলে সোহম এবার আই আই টি ক্লিয়ার করেছে। তাকেও কনগ্রাচুলেট করতে হবে।যষ্ঠি বেচারা একাকী উল্টো ত্রিশূলের মত দাঁড়িয়ে। ফটো দিলাম।
ক্রমশঃ
মুকুলদা সেই লাঠি
পর্ব ৩
ব্যানার্জি সাহেব প্রাঙ্গনে থাকেন।.আইওসিতে ছিলেন।আমার থেকে অনেকটাই বড়। আমি বাংলাদেশে ছিলাম শুনে, ৬০-৬২ সালে তার কিশোর বয়সে বাংলাদেশে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বলছিলেন।.উনার বাড়ী ছিল বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায়। খুলনাতে রূপসা নদীর ঘাট পেরিয়ে ন্যারোগেজ লাইন ধরে দক্ষিণে বাগেরহাট হয়ে কচুয়া। ঘটনাচক্রে আমি থাকতাম বাগেরহাট জেলাতেই। কাজের সূত্রে প্রায়ই যেতাম ওখানে। এত সবুজে ভরা ডিসট্রিক্ট টাউন বাংলাদেশে আর নেই। বাগেরহাট পি সি কলেজের সুবৃস্তিত মাঠের ধারে এখনও সেই রেলস্টেশনের কিছু চিহ্ন আছে। কলেজের নামটা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নামে। উনি অরিজিনাল বাগেরহাটের কাছে কোন গ্রামে জন্মেছিলেন, কিছুদিন ওই কলেজে পড়িয়েছেন।২০০০ সালে জাপানিদের হাতে তৈরী রূপসা ব্রীজ হওয়ার পর যাতায়ত সুগম হয়েছে খুলনা আর বাগেরহাটের মধ্যে। চ্রেনলাইন অবশ্য অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
লক্ষীপ্রতিমা ভাল করে লক্ষ্য করলাম। সাদা শোলার সাজটাই চোখ টানছে।। কমললোচনের হাতে কমল দেখা গেল, তবে লক্ষীর ঝাপি চোখে পড়ল না। কোভিডের কারণে সরকারী কোষাগারে টানাটানি, তাই মা-লক্ষীর হাতের ঝাঁপিও আন্তর্হিত। ছোটবেলায় বন্ধুরা মিলে মফস্বল শহরের গোটা দশ বার পূজোর ঠাকুর খুব খুটিয়ে দেখতাম। কোন ক্লাবের ঠাকুর সবচেয়ে ভাল হয়েছে সেই নিয়ে চুলচেরা বিচার হত। ভালত্বের মাপকাঠি ছিল প্রতিমার মুখের সৌন্দর্য ও মূর্তির আয়তনের বিচারে। থীম পূজোর রমরমা তখন ছিল না। এখন প্রতিমার থেকেও প্যান্ডালের অভিনবত্বের বিচারে প্রাইজ দেওয়া হয়। যাই হোক, লক্ষ্য করে দেখলাম লক্ষীর বাহন প্যাঁচা ধবধবে সাদা। প্যাঁচা কালো বলেই জানতাম। সাহেব প্যাঁচার ব্যাপারটা কি? আমাদের পুরোহিত মশাই রথীন আচার্য জানালেন -‘পেঁচা নানা রকম হয়, তবে সব পেঁচাই লক্ষ্মীর বাহন নয়। ছোট্ট সাদা পেঁচা, যাকে লক্ষ্মীপেঁচা বলা হয়, সেটাই লক্ষ্মীর বাহন।’
লক্ষী ধন-সম্পদের সঙ্গে সৌন্দর্যের প্রতীক। কথায় আছে -‘রূপে লক্ষী, গুণে সরস্বতী’। প্যাঁচাকে তার উল্টোটাই ধরা হয়। কেন তাকে লক্ষীর বাহন হিসাবে গ্রহন করা হল, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। মনে হয়, যেহেতু লক্ষী রাতের বেলায় গৃহস্থের ঘরে আসেন, তাই প্যাঁচা, যার চলাফেরা রাতে, তাকেই দেবী বাহন হিসাবে রেখেছেন।
কথাবার্তার মাঝে দেখলাম কয়েকজনের হাতে মূলভোগের বাটি ঘুরছে। অমৃতের স্বাদ দূর্গাপূজাতে পেয়ে চিত্ত লালায়িত। বীরভোগ্য বসুন্ধরা। সীট ছেড়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম ভোগ রান্নার প্যান্ডেলের দিকে। দাড়িয়ে আছি। সবাই ভিতরে ব্যস্ত। ভাবলাম বলি ‘মা জননীরা, দুয়ারে লেখক’। তার আর দরকার পড়ল না।সঞ্চিতা একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল। সাক্ষাত অন্নপূর্ণা।
প্রেসিডেন্ট সাহেব অতীশ চক্রবর্তী মহাশয়, কলকাতা থেকে জয় বাংলা নিয়ে ফিরেছেন। ৭১ সালে সদ্য তখন বাংলাদেশ হয়েছে। এই সময় ঘরে ঘরে চোখের এই ছোয়াচে রোগটা হয়েছিল। আমিও তার ভুক্তভোগী ছিলাম। পোষাকী নাম কনজাংটিভাইটিস। সমঝদার লোক, চোখের দুর্দশায় এখনও আমার লেখাটা পড়ে উঠতে পারেন নি, তবে বাকীদের মতামতের ভিত্তিতে অলরেডি দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। এই সুবাদে কালীপুজার কমিটি মিটিংএ থাকবার আমন্ত্রণ জানালেন। ‘বাস্কিং ইনটু দ্য নিউ ফাউন্ড গ্লোরি।’ এছাড়া মহিলা মহলের হাসি মুখ। একেই বলে সোনায় সোহাগা।
সূর্যকান্তর সরকারী অফিস, নাম হচ্ছে ‘মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টিং’। যদিও ডক্টরেট, হাবে ভাবে শান্ত, সৌম্য। ওর অফিসটা আমাদের সেক্টরেই। তবে প্রদীপের তলায় অন্ধকারের মত এবারে বৃষ্টি এসেছে নিয়ম মেনে জুলাই এর শেষের দিকে, যদিও প্রেডিকশন ছিল জুনের মাঝামাঝি। তবে লক্ষীপূজার আগে যে স্পেলটা হল, সেটার ভবিষ্যতবাণী সঠিক ছিল।
কুশল ব্যানার্জি আমার বন্ধু। এনটিপিসি থেকে রিটায়ার করছে। এমনিতেই দোহারা চেহারা। এবার মনে হল আরো কৃশ। শুনলাম সকালে লেবুর জল, গরম জল ইত্যাদি খেয়ে রোগা হয়েছে। সকালে উঠে যোগাসন প্রাণায়াম ইত্যাদি করে। আমকেও উপদেশ দিল গরম জল ও যোগের যুগলবন্দী ট্রাই করতে। বন্ধুপ্রবরকে মাথা হেলালাম বটে, তবে এবার আবিষ্কার করলাম অঞ্জলি দিতে গিয়ে, দাড়িয়ে দাড়িয়ে পা নাচছে। সুতরাং যোগ ‘দূর অস্ত’। ফ্রীজ থেকে এখনও ঠান্ডা জল মেরে দিই, গরম জল খেলে উল্টি না হয়ে যায়। বেচে থাক ‘মাই সাইন অফ প্রসপারিটি’ মানে সযত্নে লালিত কিঞ্চিৎ স্ফীত মধ্যপ্রদেশ। কুশল মাঝে মাঝে আমায় উপদেশ দেয় আরলি টু বেড, আরলি টু রাইজ’, রাতের ডিনার আটটার মধ্যে, এতে নাকি লংগিভিটি বাড়ে। রিটায়ার মেন্টে পর রাত দুটোয় শুতে যাই নেটফ্লিক্সে ‘রেজারেকশন’ দেখে, উঠি নটায়, রাতের ডিনার দশটার পর। আমাকে উপদেশ দিয়ে কুশল ব্যার্থ। আমার মোক্ষম যুক্তি -‘মনে কর আমি দুবাইতে থাকি। ব্যাস, তাহালেই তোমার আর আমার ক্লক কোয়েনসাইড করে যাবে।
কালীপূজাতে মাংস-ভাতের একটা হাওয়া উঠেছে। পন্ডিত বাবু হাল ধরলে সুরাহা হবে। যুক্তি সাজাতে হবে, সেই অফিসের নোটশীটের খেলা। নব্বইএর দশকে যখন এসির তেমন প্রচলন ছিল না, অথচ অফিসে বড়সাহেবদের ঘরে কম্পিউটার লেগে গিয়েছে, তখন নোটশীটে এসির এপ্রুভালে লিখতে হত কম্পিইটারের জন্য এসি চাই, বড়কর্তার ঠান্ডা মেশিনের হাওয়া খাওয়াটা গৌণ।
লক্ষীপূজার প্রসাদও পাওয়া গেল। দুর্গাপূজায় বেশ বড় প্যাকেটের এক কোণে কিছু বোদে ছিল। এবার তৎসহিত একটি ছোট নারকেল নাড়ু। ফিডব্যাকের ফলে ইনক্রিমেন্টাল ইমপ্রুভমেন্ট।
লক্ষীপূজাপ ভোগ প্রসাদে প্যাকেট সিস্টেম নেই। কব্জী ডুবিয়ে খিচুড়ি খাও আলুভাজা ও লাবড়া সহযোগে। তারপর চাটনি ও পায়েস। বাঙ্গালীরা ঝোঁক আলুভাজার দিকে, যদি আইটেমে ননভেজ না থাকে। সেটা বোঝা গেল যখন পাচকঠাকুর, নিশিকান্ত নিজে আলুভাজা ‘টেনে’ দিতে থাকল। খিচুড়ির কোয়ালিটি দুর্গাপূজাতে বেটার ছিল নাকি লক্ষী পূজাতে তাই নিয়ে পাবলিকের প্রশ্নবান। আজকেরটা পাতলা, দূর্গাপূজারটা ঘন ছিল। আমার দুটোই চলে, জিহ্বার স্বাদের তারতম্য বুঝি গব্যঘৃতের পরিমাণের কম বেশীর উপর।
হয়ে গেল লক্ষীপূজার পরিসমাপ্তি। আগামীকাল ওয়ার্কিং ডে। তাই আসর ভেঙে গেল তাড়াতাড়ি।
দেবদত্ত
২১/১০/২১


Comments
Post a Comment