সেক্টর ৬২ পুজা মিটিং ধারাভাষ্য (রম্যরচনা)
মিটিং স্থল বিএইচইএল বিনায়কেরএর কমন রুম
মিটিং ডে
মেন ইভেন্ট, দুর্গা পূজা শেষ। লক্ষীপূজার খিচুড়ির ঢেঁকুর না মিটতে মিটতে, কমিটি ডাক দিয়েছেন মিটিংএর। কালী পূজার প্রস্তুতি ও আগামী সালের পূজার রূপরেখা তৈরীর সাধু উদ্দেশ্য। এনসিআর ধীরে ধীরে কলকাতাকে ফলো করছে। কলকাতার সব বড় ও মাঝারি পূজাকমিটি সেই বছরের পূজা শেষ হতেই পরের পূজার থিম নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু করে। এবার আর জুম মিটিং নয়, করোনার নিম্নমুখী গ্রাফের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উর্ধমুখী সামাজিক মেলামেশা, সেই হিসাবে ফিজিক্যাল মিটিং। দুর্গাপুজার পর দুদিন বেশ বৃষ্টি হয়ে ওয়েদার গড সুপ্রসন্ন হয়ে, একধাক্কায় তাপমাত্রা কয়েক নচ কমিয়ে দিয়েছেন। ওয়েদার গড লিখতে লিখতে চিন্তাশক্তির পোকাটা আবার নাড়া দিয়ে গেল। হিন্দুধর্মে তেত্রিশ কোটি দেব-দেবী। কিন্তু আবহাওয়ার জন্য কোন কনসোলিডেটেড দেবতা নেই। হাওয়ার জন্য পবনদেব আছেন আর বৃষ্টির জন্য বরুণদেব। কিন্তু এদের বস মিসিং। ঠান্ডা বা গরমের আলাদা দেবতা নেই। তাই ওয়েদারে এনার্কি। এতদিন বঙ্গোপসাগর বা আরবসাগরের নিম্নচাপে অসময়ে বৃষ্টি হত। এবারের দুর্গাপুজার পরের বৃষ্টিটা হয়েছে সূদূর মেডেটারিনিয়ান সী থেকে আগত জলীয় বাষ্পের কারণ। কেন এমনটা সেটা আমাদের ডক্টর সূর্যকান্ত বলতে পারবে, ও কাজ করে ওয়েদার অফিসে। স্বর্গের মন্ত্রীমন্ডলীতে এই পদটি খালি আছে। আপনারা চাইলে এপ্লাই করে রাখতে পারেন।
এক তো হোয়াটস্ এ্যপে মেসেজ এসেছিল, দক্ষিণ হস্তের সদ্বব্যবহারের সুযোগ আছে, তারপর সুন্দর আবহাওয়া এবং প্রায় টেনশেনবিহীন মিটিং ( কারণ মেন পূজা তো সাকসেসফুলি কমপ্লিটেড) এ অংশগ্রহন করা যাবে। এ ছাড়া টাইমটা হচ্ছে দুপুর বারটা, হেলতে দুলতে আসা যাবে।
বিএইচইএল বিনায়ক এপার্টমেন্টের লনের পাশে সুন্দর একটি কমনরুম। গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন এসে গিয়েছেন। স্কুলের পুরানো অভ্যাস অনুযায়ী পিছনের রো তে বসে পড়লাম। পাশে আনেয়ার। চিন্তিত মুখে আমায় জিজ্ঞাসা করল-‘দেবুদা ‘হরফন মৌলা কথাটার অর্থ কি’? মোবাইলে দেখাল কেউ একজন হোয়াটস্ এ্যপে কমেন্ট করেছেন। এই রে, এক আধটু লিখছি বটে, তবে আমাকে সুনীতি চ্যাটুয্যে ভাবলে কি করে চলবে। ডাহা ফেল। তবে আমাদের মধ্যে একজন সুনীতিকে পাওয়া গেল। তিনি হচ্ছেন অমিতাভ রায় মশাই। উনিও এক্স এনটিপিসি।তিনি জানালেন এর অর্থ ‘সকল কাজের কাজি’, মানে যে সব কাজ সমান দক্ষতায় করতে পারে। এটারই বাংলা প্রতিশব্দ ‘সব্যসাচী’। আমারও ফিসিক্যালি দুইহাত চলে, তবে আমি কনফিউসড লেফ্টহ্যান্ডার। ফুটবলে কিক মারতে বা পায়ে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য, আর বাঁহাতে ঘর মুছতে। লকডাউনের সময় নিজের এই প্রতিভা আবিস্কার করে নিজেই চমকিত।
মিটিংএর মেন কর্ণধার তিনজন প্রেসিডেন্ট অতীশবাবু, সেক্রেটারী সেনশর্মাদা, আর ট্রেজারার বোসদা। তারা টেবিলের উল্টোদিকে, যেন সেমিনারের ডায়াসের ডিগনিটরি। আমরা জনা দশ বারো বাধ্য ছাত্রের মত পিছনের চেয়ারে। মিটিং শুরু চা-পকোড়া সহযোগে।
পাশে বসেছিলেন শক্তি শরণ বাবু। নামে শক্তির উল্লেখ থাকলেও গায়ে গতরে সেটা মনে হল না। তবে, আফ্টার এ সেকেন্ড থট মনে হচ্ছে পালোয়ানী চেহারা হলে নামটা শক্তি স্বরূপ হত, উনি শক্তির ‘শরণ’ নিয়েছেন বলবৃদ্ধির জন্য, তাই নামটা যথাযোগ্য। শরীরে না হোক, মনের জোর দেখলাম আমাদের মত ‘ছা পোষা’ বাঙ্গালীরা থেকে অনেক বেশী। উনি বিএইচইএল থেকে প্রি ম্যাচিওর রিটায়ারমেন্ট (ভি আর এস নয় কিন্তু) নিয়ে নিয়েছেন। সব বঙ্গপুঙ্গব কুতিয়ে কাতিয়ে, পুরো চাকরী জীবনটা টেনে দেয়। ‘যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ’। বিদেশে ক্যারিয়ারের মাঝপথে চাকরী ছেড়ে ঘুরে বেড়ায়, আবার রিজুভিনেট হয়ে ফিরে এসে প্রফেশনাল লাইফে ঢোকে। এ দেশে লাইফ এনজয় করার জন্য প্রি ম্যাচিওর রিটায়ারমেন্ট নিতে গেলে দম চাই।
প্রথমে ফিডব্যাক সেশন। ফুড প্যাকেট নাকি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে। মনে হচ্ছে আগামী দুর্গাপূজাতে এই প্রথাই বজায় থাকবে। শুনেছিলাম সেক্টর ৬১ তে নাকি সব সোসাইটির গেটে, মেম্বারদের হেড অনুযায়ী প্যাকেট রেখে আসা হচ্ছে। আরও সহজ হয়ে গেল ভোগ খাওয়া। মন্ডপে ঠাকুরের শ্রীচরণ দর্শন করে খাওয়ার দিন শেষ। তবে আমার প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল সঙ্গত কারণে, কারণ ৬২র পূজার অনেক মেম্বার, বেশ দূরে থাকেন। প্যাকেট পৌঁছান দুষ্কর। কেউ একজন জানালেন কার্তিক ঠাকুরের মাথা দেহের তুলনায় ছোট। দূর্গা, লক্ষী, সরস্বতীর থেকে তো ছোট বটেই, এমন কি পাশে থাকা ত্রিশূলবিদ্ধ অসুরের থেকেও ছোট। সেটাই বোধহয় দর্শকদের ‘মাথাব্যাথা’ র কারণ। আমার চোখে অবশ্য পড়ে নি। আমার টাং টা কোর্স, যা পাই, তাই খেতে ভাল লাগে, চোখটাও মনে হয় কোর্স, সব মহিলাকেই সুন্দরী দেখি, তাই ঠাকুরের সৌষ্ঠভ নিয়ে বিচার করা, আমার অক্ষমতার নিদর্শন। এরপর, ৬২র বঙ্গস বিউটিদের যদি জনান্তিকে রূপের প্রশংসা করি, তবে তারা সন্দেহের চোখে দেখতেই পারেন!
কালীপূজাতে তাম্বুলা খেলার কথা তুললাম। সবারই মনে পড়ে গেল প্যান্ডালে পূজাকালীন শেখরদার হাউসি খেলানোর কথা। নম্বর বলার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত কিছু উপমা থাকত- যেমন ধরুন ‘টু ফ্যাট লেডি এইট্টিএইট’ বা ‘রিটায়ারমেন্ট এজ সিক্সটি’ বা ‘টপ অফ দ্য হাউস নাইন্টিনাইন।’ কানু বিনে গীত নেই’। তবুও লাইফ ‘গোজ অন।’ একসময়ে শৌভিক, ভোগের রাজসূয় যজ্ঞের প্রধান কর্ণধার ছিল। একটা প্রাণচঞ্চল ছেলে কেমন করে আমাদের ফাঁকি দিয়ে চলে গেল, ভেবে কূল পাওয়া যায় না। যাক, চরৈবতির সত্যকে ধ্রুব মেনে, হয়ত এবার হাউসি হবে।
কালীপূজায় জনতার আর্জি ছিল মাংস ভাতের। তবে আমাদের কালীর থন হল গিয়ে শুদ্ধ শাকাহারী স্থল। জায়গাটা রাজপুত গোষ্ঠীর কাছে ভাড়া নেওয়া। এটাও একটা প্যারাডক্স এরকম লড়াকু জাতি ঘাস-পাতা খেয়ে তরবারি চালায়, আমরা অতীব মাংসাশী হয়েও ক্ষুরধার জিভের ভরসায় চায়ের কাপে তুফান তুলি। সুতরা টেকন্যিকাল কারণে মাটন নাকচ।
মিটিং এর মধ্যভাগে এসে গেল ডিমের ডেভিল। সুন্দর প্যাকেটের মধ্যে তিনি শোভা পাচ্ছেন, পাশে দুই পারিষদের মত প্লাস্টিক কন্টেনারে সস ও শশা-পেয়াজ মিশ্রণ। তবে আমার ব্যাপার ‘কপালে নেই কো ঘি, ঠকঠকালে হবে কি’। লাঞ্চ তড়িজুতের হবে না ভেবে ওটাকে পাঞ্জাবির পকেটে চালান করেছিলাম। ফেরার পথে মার্কেট পার্স বার করতে গিয়ে প্যাকেট ‘পপাত ধরণীতলে’। ডিমের ডেভিল ‘ডেভিলস এডভোকেট’ হয়ে তলায় গড়াগড়ি দিচ্ছে। ফিলসফিক্যাল হয়ে গেলাম ‘কা তব কান্তা কস্তে পুত্রা’। আমার উদরের প্রতি উদারতা না দেখালেও, কোন চারপেয়ের জঠরাগ্নির তো নিবৃত্তি হবে।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
খেতে খেতে গুরুগম্ভীর আলোচনা আর্থকরী বিষয়ে। কালচারালের কর্মকর্তা তা খরচের হিসাব পেশ করলেন। খাজাঞ্চিবাবুর অকাট্য যুক্তি, গত কার্যকরী সভায় সাংস্কৃতিক বাজেট শূন্য রাখা হয়েছিল, কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পীদের কলা কুশলতা প্রদর্শন হবে। যেহেতু ডিজিটাল মাধ্যম, তাই ভৌগলিক সীমা পরিসীমা নেই, কেউ কোনসময় হয়ত এই পূজাতে যুক্ত ছিলেন, তিনিও অংশগ্রহন করছেন। কালচারাল কমিটি কখনই অর্থকরী ব্যাপার নিয়ে অত কালচার করেন না, লক্ষী, সরস্বতী বিবাদটা চিরকালই বিদ্যমান। ডিমের ডেভিল ক্যাটালিস্ট। মিটিং জমে উঠেছে আর্গুমেন্ট ও কাউন্টার আর্গুমেন্ট। সব শোনার পর জাজেদের রায়, তারা খুঁটিয়ে দেখবেন, সওয়াল জবাব ও রায়দান পরবর্তী মিটিং অব্দি মুলতুবি থাকল।
পরবর্তী পর্যায়ে, ডেভিলের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে, মিটিংএ ডিভাইন টাচ!
এবার ডিজিটাল স্যুভেনির প্রকাশ হবে। এটাও কিছুটা সেই কালচারাল ফাংশান টাইপের, দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর মত ব্যাপার। মোটাসোটা ছাপার আকারে স্যুভেনিরটাকে হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে বেশী মজা। বাকীরা কি বলবেন জানি না, হার্ডকপির গল্পের বই হাতে নিয়ে পড়তে গেলে ছোটবেলাটা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে সব সুখস্মৃতি নিয়ে। এই ব্যাপারে আমি প্রাচীনপন্থী। নিজে লিখতে গেলে অবশ্য কাগজ কলমের বালাই নেই। খুটখুট করে মোবাইলেই টাইপ করে ফেলি।
পরবর্তী পূজার স্থল যাতে ৬২ সেক্টরের পার্কের পুরানো পরিসরে হয়, সবারই সেটাই মনস্কামনা। থিম পূজোর চিন্তা ভাবনা চলছে। এই ব্যাপারে কলকাতাকে গুরু মানতে হবে। বুর্জ-খলিফা না হোক কিছু তো একটা ভাবাই যায়। সবচেয়ে সেফ বেট হচ্ছে ‘পরিবেশ’। প্যান্ডেলকে একটু সবুজ করে কিছু পোস্টার, গঙ্গা দূষণ নিয়ন্ত্রন, হালফিলের স্মগ টাওয়ারের রেপ্লিকা, স্বচ্ছভারতের স্লোগান ইত্যাদি লাগিয়ে দিলে দুই একটা সরকারী পুরস্কার জুটে যাওয়াও আসম্ভব নয়। এরজন্য কনসালটেন্ট নিয়োগের চিন্তা ভাবনা চলছে।তবে খাজাঞ্চি সাহেব পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ভাঁড়ারের অবস্থা শোনালেন। ‘যিনি খান চিনি, তাকে যোগান চিন্তামনি’ এটাতে সাধারণ সদস্যরা বিশ্বাস করেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ‘বিশ্বাসে মেলায় কেষ্ট, তর্কে বহুদূর’, ভেবে বসলে ইউটোপিয়ান ওয়ার্ল্ডে থাকতে হবে। পূজাকমিটি তো আর অন্নপূর্ণার ভান্ডার নয়, এর ঝুলি ভরার দায়িত্ব তো আমাদেরই সবার। সব মেম্বার বর্ধিত হারে চাঁদা দিলেও লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ মাত্রই পূরণ হবে, যদি আমরা আমাদের পুরানো ‘পম্পাস এন্ড্য গ্রাঞ্জিওর’ মেনটেন করতে চাই। বাকীটা কর্পোরেট সেক্টরের ফান্ডিং। এখানে ব্যাপার হচ্ছে ‘কিস্সা কুর্সী কা’। যতদিন ‘পদে’ আছেন, পূজার ‘বিপদে’ ভেন্ডাররাই আপনার ভরসা। ‘বানিজ্যে বসতে লক্ষী’ এটা আমরা সবাই জানি, কিন্তু ৬২ সেক্টরের বাঙালিরা নিরানব্বই শতাংশই চাকরীজিবী। তাই খাজাঞ্চি, প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারির থ্রি মাসকেটিয়ার্স বাহিনী, পরবর্তী পূজাকে সাফ্যল্যমন্ডিত করতে অর্থকরী দিকটাকে সচল রাখার জন্য সবার সাহায্যপ্রার্থী হয়েছেন।
মুকুলদা সামনের দিকেই বসে ঝিমোচ্ছিলেন। মিটিং সাঙ্গ হবার মুখে হঠাৎ উনার কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ল। ট্রেজারারের লক্ষীর ঝাঁপির সুলুক সন্ধানে সতত ব্যস্ত থাকেন। তার শেষ প্রশ্ন - কতজন চাঁদা দিয়েছে? এটা যদিও মিটিংএ কয়েকবার বলা হয়েছে, তবুও আরেকবার জানান হল ১৬৬। মিটিং শেষ। আড্ডা ও আলোচনার সফল সমাহার। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আরেক প্রস্থ গল্প। খাওয়ার প্রেফারেন্স নিয়ে গল্প। সৌরভ মাছ খায় না। কারণ জানাল মাছ খেলে নানারকম প্রবলেম। ‘ল্যকটোজেন ইনটলারেন্সের’ মত ‘সামথিং ফিসি ইন ফিস।’ ‘খাসিতে হাসি না’! আমি আবার ‘স-মাস’। না বাংলা ব্যাকারণের সমাস নয় মাংসে সুখ বলতে পারেন। হাড়ের ভিতরের সুষুন্মা যতক্ষণ না বের করতে পারি হাল ছাড়ি না, চুষেও যখন হয় না, তখন চামচের শরণাপন্ন হতে হয়। চামচের পিছনদিকটা দিয়ে খোঁচাখুঁচি চলে। আর বেশী বলব না, নজর লাগার ভয় আছে!
দেবদত্ত
২৬/১০/২১

Comments
Post a Comment