দুর্গাপুজার টুকরো ঘটনা (রম্যরচনা)
- দুর্গাপুজার রোজনামচা (২০২১)
দেখতে দেখতে পুজো এসে গেল। নয়ডার বাতাসে কিন্তু এসময় শিউলির গন্ধ নেই, এখানে কাশফুল দেখি না, শরতের পেজা তুলোর মত মেঘও নেই, থাকার মধ্যে ছ্যাঁকাপোড়া গরম। সেই কবে রামচন্দ্র অকালবোধন করে পুজোটাকে আশ্বিনে নিয়ে এসেছিল, অরেকবার অকালবোধন করে মাসখানেক পিছিয়ে দিলে উপভোগটা একটু স্বস্তিতে করা যেত।
পঞ্চমীর সকাল। আজকাল আপডেট পেতে অসুবিধা নেই। হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে ছবি এসে গেল দুর্গা মা প্যান্ডেলে পদার্পণ করেছেন। রিটায়ারমেন্টের পর হাতে সময় অঢেল। চলে গেলাম প্যান্ডেলে। আজ দুপুরে প্রিপূজা বিভিন্ন কমিটির কোঅর্ডিনেশন মিটিং। আমি সব কমিটিতেই অমনিপ্রেসেন্ট। আজকাল শুনি খুব জুম মিটিং হয়, আমি অবশ্য জমিয়ে দক্ষিণহস্ত সদ্ব্যবহার করে সাক্ষাত মিটিংএ বেশী পক্ষপাতী। আলোচনা কিছু হল না, তবে জুতসই ছবি তুলে ৬২ গ্রুপে নিমেষে পৌছে গেল। বেশ কিছু থাম্বস আপও এসে গেল।
পিয়ালী এসেছিল ওর মেয়েকে নিয়ে। ওদের বাড়ীতে পূজোর চারদিন বিভিন্ন পদ্ধতিতে রান্নার নিয়ম। ষষ্ঠীর দিনে পিয়ালীর বাড়ীতে কোন সেঁকা রান্না যেমন ধরুন রুটি, পরোটা চলবে না। তাই লুচি, আলুর দম খেতে হয়।
শুভব্রত, ও সূর্যকান্তি বেশ কিছুক্ষণ পরে হাজির। তিনদিন ভোগের আঠারশ প্যাকেট তিন ক্ষেপে গাড়ীতে করে নিয়ে এসেছে। একা দুই কর্মবীর।
ষষ্ঠীর সকাল। ‘একা কুম্ভ রক্ষা করে নকল বুঁদিগড়’ এর মত বসে আছি। বোধন হবে বিকালে। খেজুরে গল্প শুরু হল যে ছেলেটি প্যান্ডেল কাজ করছে তার সঙ্গে। নাম তার সঞ্জয় শেখ। হিন্দু মুসলিম মিলিয়ে নাম। সর্বধর্মসমন্বয়। মানুষের জীবন চড়াই উৎরাইএ ভর্তি। জীবনভোর স্ট্রাগল। আমাদের অধিকাংশ বাষট্টিবাসী আধাসরকারী চাকরিতে জীবনধারণ করেছি। কোনদিনই ছপ্পর ফাড়কে কিছু আসে নি, আবার খুব খারাপও কিছু নেই।
সঞ্জয় ৯১ সালে দিল্লিতে আসে। আদতে বহরমপুরে সাইকেলের দোকান ছিল। কাছেই ছিল একটা কলেজ। সেই কলেজের ছেলেপুলেরাই সাইকেল সারাতে আসত। পার্টির ছেলেদের ঠেকও ছিল ওর দোকানটা। সেখানে টাকা চুরি নিয়ে দুপক্ষের বিবাদে সঞ্জয়ও জড়িয়ে পড়ে। রাতে পুলিশ এসে ওকে কোমরে দড়ি বেধে নিয়ে যায়। তখন ওর বয়স বার তের। তিনমাস পরে ওকে পুলিশ ছেড়ে দেয়। এই ঘটনায় ও ভেঙে পড়ে, মনস্থ করে আর সে বহরমপুরে থাকবে না। সাইকেল সারাইএর সরঞ্জাম বিক্রি করে আড়াইশ টাকা পেয়েছিল। ওর এক পরিচিত তখন নয়ডাতে থাকত। তার সঙ্গে এসে খোরা কলোনিতে ওঠে। সেই ‘প্রবাসে দৈবের বশে’ উপস্থিত হয়ে ইন্ডিয়ান অয়েলে কন্ট্রাক্টটারের কাছে কাজে ঢোকে।জীবনের অরেকটা অধ্যায় শুরু সাইকেল মিস্ত্রি থেকে ধীরে ধীরে কলের মিস্ত্রী। ইন্ডিয়ান অয়েল কোম্পানির সেক্টর ৫৫র কনস্ট্রাকশন হাতে খড়ি। মাঝে বছর তিনেক ব্যাঙ্গালোরে ইলেকট্রিক মিস্ত্রীরির সহযোগী হিসাবে চাকরী করে এখন আবার নয়ডাতে থিতু। এখন নিজেই ছোটখাট কাজ নেয়। পুজোতে এই ঠিকা কাজ কিছুটা খেপ খেলার মত। তবে সেই বহতা জীবনসংগ্রাম চলমান। জীবন ও জীবিকা অনিশ্চিত। যতক্ষন শ্বাস ততক্ষণ আশ।
আমাদের ঢাকী, উনিশ বছর ধরে আমাদের পুজোতে ঢাক বাজায়। ওর নাম সঞ্জীব দাশ। অনেক বছর ধরে দেখছি। তবে এবারই প্রথম ডিটেলস জানলাম। এবারে ওরা তিন জেনারেশন উপস্থিত। ওর বাবা ও ছেলে সবাই আছে। ওদের বাড়ী হাওড়াতে। বংশানুক্রমিক ঢাকী হলেও পারিবারিক মাছের ব্যবসা হাওড়াতে। গত বছরের গোড়ায় লকডাউনের আগে পাড়ি দিয়েছিল গোয়াতে। লকডাউনে আর ফেরা হয় নি। ওখানেই ঠিকায় কাজ পেয়ে যায়। মাসে পনের হাজার টাকা বেতন।সিমেন্স ফ্যাক্টরিতে কাজ, তবে বারঘন্টার শিফ্ট। পরিবারকে আনিয়ে নিল গোয়াতে। দুই ছেলে। এ বছর জানুয়ারীতে নেমে এল বিপর্যয়। বড় ছেলেকে গাড়ী চালানো শিখিয়ে লাইসেন্স করে দিয়েছিল। ভেবেছিল গোয়াতে ড্রাইভারি করবে। ২০ বছর বয়সী ছেলে জেদ ধরেছিল বাইকে করে ২৫০ কিলোমিটার দূরে মন্দিরে পুজো দিতে যাবে। কাউর মানা শোনে নি। সেই যাত্রাই শেষযাত্রা। ট্রাকের সঙ্গে বাইকের মুখোমুখি ধাক্কা।স্পট ডেড। বলতে বলতে ওর গলা ধরে এল। তবে সেই শোকের ধাক্কা কাটিয়ে আবার জীবনের ছন্দে ফেরার চেষ্টা। আরেকটা ছেলে আছে, সেটাই স্বান্তনা। ওর ঢাক ছিল গোয়াতে। ওখানের বাতাসের আর্দ্রতাতে ঢাকের চামড়া গেছে নষ্ট হয়ে। ওটা নাকি ছাগলের চামড়া দিয়ে তৈরী হয়। ওর বাবা কলকাতা থেকে সেই চামড়া ও বাঁধবার সরঞ্জাম নিয়ে এসেছে। দুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজেই বেঁধে নিল ঢাক। ভাবি কত রকম কাজের কারিগর এরা। কিন্তু এই দেশে সেই স্কিলের যোগ্য সমাদর নেই। এরকম স্কিলড ওয়ার্কার এদেশে অনেক। যোগ্যতার দাম হারিয়ে গিয়েছে ভীড়ের অন্ধকারে।
ভাল পড়াশুনা আর ভাল কলেজের ডিগ্রি হচ্ছে জীবনে থিতু হবার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার, অন্তত এদেশে।
সেই সঞ্জয় শেখ
আমাদের পুজোর জন্মলগ্ন থেকে ঢাকী সঞ্জয় দাশ। অনেক আগে বাবার হাত ধরে আসত
পুজোর দুই হর্তাকর্তা কুমারদা ও বোসবাবু পুজোতে বরাবরই নরসুন্দরের কাছ থেকে শিবসুন্দর হয়ে আসেন। এবারেও তার ব্যাতিক্রম নেই।কুমারের সাকিন ডিজাইনার্স পার্ক, পরণেও ডিজাইনার্স কুর্তা। বোসবাবুর মিশমিশে কালো চুলে সাদা ফ্রেঞ্চকাট। ট্রেডমার্ক অফ ট্রেজারার। খালি খাজাঞ্চির খাজানায় বদল। কাঁধে ঝোলান চামড়ার ব্যাগের জায়গায় এবারে সিম্পল সাদা কাপড়ের থলে। পোস্ট কোভিড পরপর দুবছরের পুজোতেই বাজেটের কাটছাঁট। আগের বড় খরচ ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আজকাল ইনহাউস ভার্চুয়াল প্রোগ্রাম। প্যান্ডেলে আসার দরকার নেই। ঘরে বসে দেখে নিতে পারেন। ‘ইনহাউস’ শিল্পীদের জন্য ৬২ সেক্টরের লক্ষণের গন্ডী নেই। কলকাতায় থাকুন কি টরেন্টোতে থাকুন, কোনদিন যদি আপনি বাষট্টি বংস এর সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকেন, তবে রেকর্ড করে পাঠিয়ে দিন। নভিস-ই হন, কি উস্তাদের সাকরেদ হন, বাহা-বাহা জুটবে দরাজ হাতে।
এবার সবার মুখে মুখে পন্ডিতবাবুর নাম। নাম না বলে জয়জয়কার বল্লেই ভাল। কমিটির বড় সাহেবরা একদিন ভোগ খাওয়ান হবে ঠিক করেছিলেন। বাজেট, তিনদিন খাওয়ানোর হ্যাপা, কুপন কি করে এত তাড়াতাড়ি করা যাবে, ইত্যাদি যুক্তি পন্ডিতবাবু তুড়ি মেরে ঘায়েল করে দিলেন এক মোক্ষম যুক্তি দিয়ে- ‘এক দিন ভোগের ইনফ্রাস্চ্রাকচার যদি করে ওঠা যায়, তবে তিনদিনও তাতেই করা যাবে, খালি কাঁচা মালটাই তিনগুণ খরচা’। সেক্রেটারি সাহেব দরাজ হাতে সমর্থন দিলেন। পাশ হয়ে গেল তিন দিন ভোগ, ইংরাজিতে এটার নাম ‘মাস ফিডিং’, যদিও এই নামটা আমার পছন্দ নয়। সাদা বাংলা করলে এটা দাঁড়ায় ‘কাঙালীভোজন’।
ষষ্ঠীর দুপুরে একাই বসে আছি। বোসদা (আইওসি) ক্যামেরা হাতে হাজির। ধোপদুরস্ত প্যান্ট শার্ট। বল্লাম -‘বেশ মাঞ্জা দিয়েছ তো! বোসদার মুখে সবসময় স্মিতহাসি। বোসদার জিজ্ঞাস্য- ‘কি ব্যাপার লোকজন কোথায়?’ বল্লাম আজ তো ষষ্ঠী। বিকালে লোকজন আসবে বোধন দেখতে। বোসদা ভেবেছে আজ সপ্তমী। ওয়ান ডে এ্যডভান্স। বোসদা নাকি এবার ভোগ কমিটিতে নেই। তাই ক্যামেরার হাতেখড়ি চলছে।
বিকালে ঋষভ হাজির। গুরুদায়িত্ব। কাল থেকে একঘন্টার সান্ধ্য অনুষ্ঠান। বাড়ীতে বসে ফেসবুকে দেখুন বা প্যান্ডেলে এসে বড় স্ক্রীনে দেখুন। বড় বড় ঝোলা থেকে ল্যাপটপ, তার ইত্যাদি বের হচ্ছে। শুভর সঙ্গে কথোপকথন হচ্ছে ঋষভের। কানে এল ‘অক্স’ কোথায় পাব? কি কান্ড। দুর্গা মা বাপের বাড়ী এসেছেন বটে, কিন্ত ‘অক্স’ বাবাজীবন তো কৈলাশে শিবঠাকুরের সঙ্গেই আছে! তাকে নিয়ে টানাটানি কেন? কুন্ঠিত মুখে নিজের অজ্ঞতা লুকিয়ে জিজ্ঞাসা করে জানা গেল এটা অক্সিলিয়ারী কেবল, সংক্ষেপে অক্স। তার জন্য পোর্ট খোজা হচ্ছে। না, এ কোন বন্দর নয়। কম্পিউটারে তার গোজার জায়গা, ঐ ব্যাপারটাকে, পোর্টে শিপের ডকিং বলা যায়।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
দশমীর দিন সকাল সকাল হল খালি করে দিতে হবে। আজকাল বিসর্জনের সেই মজাটা চলে গিয়েছি। কলঙ্কিত যমুনা যাতে আর কলুষিত না হয় তারই প্রচেষ্টায় যমুনায় বিসর্জন বন্ধ। ‘ঢাকের তালে কোমর দোলে’ করতে করতে ট্রাকে চড়ে কালিন্দী কুঞ্জ যাত্রার মজাটাই ছিল আলাদা। এখন আড়ম্বরহীন পাশের মেকশিফ্ট, অথরিটির কাটা পুকুরে মায়ের বিসর্জন।
ঠাকুর বরণ হচ্ছে
সকাল সকাল হল খালির কারণটা জানা গেল। দুপুরের দিকে কুর্তা পায়জামা পরিহিত কয়েকজন ভদ্রলোক এলেন। পুজোর জন্য এই যে পৃত্থীরাজ ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে, এটা কোন ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। এই হলটা ক্ষত্রিয় সমাজ বা রাজপুত বা ঠাকুর সম্প্রদায়ের কোন অর্গানাইজেশনের মালিকানাধীন। বেশীরভাগই রাজপুতানার লোক। তবে সবাই বিজনেসের সঙ্গে জড়িত। শুনলাম আমাদের দশমীর দিন হলে অস্ত্রপূজা হবে। তীর, ধনুক, তরোয়াল এমনকি বন্দুকও থাকবে। আকাশে ফায়ারিং হবে। সেক্রেটারি আমন্ত্রণ জানালেন। হ্যা… হ্যা বল্লাম বটে, আমরা বাঙালীরা কলম চালাই, ‘অসির থেকে মসী বড়’ জেনে এসেছি, পিস্তল-বন্দুক থেকে একটু দূরে থাকাই ভাল। ডাঃ কর্ণ সিং, অমর সিং এখানে নাকি আগে এসেছেন। রাজস্থান, হরিয়ানা, ওয়েস্টার্ন ইউ পি তে এই রাজপুত, গুজ্জর, মীনা, জাঠ - এরা সবাই ওয়ারিয়ার জাতি। পেপারের হালফিলের নবলব্ধ জ্ঞান থেকে জানালাম -‘মিহির ভোজ কা স্ট্যচু লে কে তো আপলোগ আর গুজ্জর মে কাজিয়া শুরু হো গিয়া’। কাগজ পড়ে জেনেছি গ্রেটার নয়ডার মিহির ভোজের স্টাচ্যু কিছুদিন আগে যোগীজী উদ্বোধন করে গিয়েছেন। প্ল্যাকে নামের আগে ‘গুজ্জর রাজ’ লেখা ছিল। সেই নিয়ে বাওয়াল। রাজপুতদের ক্লেম মিহির ভোজ তাদের স্বজাতি। সেক্রেটারি সাহেব মহা উৎসাহে মোবাইলে হোয়াটস্ এ্যপ খুলে দেখালেন গোয়ালিয়র কোর্টে জনৈক রাজপুত যিনি নিজেকে মিহির ভোজের বংশধর বলছেন, এক এফিডেভিডের বয়ান অনুযায়ী, তিনি কেস ফাইল করেছেন।
পুজোয় স্পনসরশিপের ছড়াছড়ি। অষ্টমীর মূলভোগটার প্রতি সবার বেশী আকর্ষণ। কোভিড জমনাতে একটা জিনিষের স্পনসরশিপ বন্ধ। সেটা হচ্ছে ফুল। অঞ্জলি হচ্ছে ফুল রহিত। যখন মাঠে প্যান্ডেল খাটিয়ে পুজো হত, তখন পুষ্পাঞ্জলির ফুল- বেলপাতা দুই তিনটে ডালিতে করে ঘুরিয়ে দেওয়া হত। সেখান থেকে ফুল, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পাপড়ি নেওয়ার কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। লাইনের পিছন অব্দি ডালি না পৌছালে, এর ওর হাত থেকে পাপড়ি সংগ্রহ চলত। অঞ্জলি শেষে সেই ফুল মায়ের পায়ে ডাইরেক্টলি ছোড়া যাবে না। ডালিতে সংগ্রহ করে ফুল পৌছে যাবে মায়ের শ্রীচরণে। এই প্রসেসে সময় লাগত অনেকক্ষণ, কিন্তু ব্যাপারটা বেশ জমজমাট হত। এবারে পুষ্প ছাড়া পুষ্পাঞ্জলি, কিছুটা যেন বাঙালীর রবিবারে ম্যাদামারা নিরামিষ আহার।
তবে হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপের কল্যাণে জানা গেল ‘নীল পদ্ম’ এর জন্য স্পনসরশিপ এসেছে। পদ্ম বুঝি নীলও হয়। জ্ঞানের ভান্ডারে নূতন সংযোজনের জন্য আমাদের পুজার পুরোহিত মশাই রথীন আচার্যের শরণাপন্ন হলাম। ১০৮ টি পদ্মফুল লাগে সন্ধিপুজোর সময়। পুরাণ মতে অসুর বিনাশে রামচন্দ্র শরৎকালে দুর্গার আবাহন করেন অকালবোধন করে। দীর্ঘ পূজার পর দেবীর সন্তুষ্টি না মেলায়, বিভীষণ রামকে উপদেশ দেন ১০৮ টি নীলপদ্ম দিয়ে পুজো দিতে। সেইমত হনুমান নিয়ে আসেন নীলপদ্ম। কিন্তু একটি ফুল কম পড়ায়, ‘পদ্মলোচন’ রামচন্দ্র, নিজের একটি চোখ দেবীপুজায় অর্পিত করতে চাইলে দেবী দুর্গা সন্তুষ্ট হয়ে রাবণের উপর থেকে ভদ্রকালীর কবচ সরিয়ে নেন। ১০৮টি পদ্ম ও ১০৮টি প্রদীপ সন্ধিপুজার আবশ্যিক অঙ্গ।
এবারে আমাদের কুইজ মাস্টার শেখরদা আমাদের মধ্যে নেই। তার উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ও প্রাণবন্ত উপস্থিতির অভাব ক্ষণে ক্ষণে উপলব্ধি হচ্ছে। কুমারের কাছ থেকে পুজো সংক্রান্তে একটা কুইজ জানা গেল। প্রতিমার শিঙ্গারের জন্য ‘ডাকের সাজ’ অথবা ‘শোলার সাজ’ খুবই প্রচলিত। ডাকের সাজের উৎপত্তির কথাটা কুমার শোনাল। বেশ ইনটারেস্টিং। আগে খালি শোলার সাজ-ই হত।
গ্রামের মেয়েরা শোলার সাজ বানাচ্ছে
স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে কোন এক বাঙ্গালী জার্মানী গিয়েছিলেন। সেখানে দেখেন সিলভারের থিন ওয়েফার দিয়ে তৈরী মুকুট দিয়ে সাজিয়ে বারিয়াল করা হয়। তার মনে হয় এরকম সিলভার দিয়ে তৈরী গয়না দিয়ে প্রতিমার সাজ করান যায়। তিনি তারপর সেইরকম গয়না ডিজাইন দিয়ে অর্ডার করে আসেন।পরে সেটা ডাকের মাধ্যমে ডেলিভারি আসে। সেই থেকে সাধারণ মানুষ এটাকে ‘ডাকের সাজ’ বলে থাকেন। ৬২র পুজোতে এই প্রশ্নেরসঠিক জবাব যিনি দিয়েছিলেন তার নাম শুভেন্দু। কুমার বলার সময় সামনেই শুভেন্দুবাবু বসেছিলেন। উনি গেল এ্যপার্টমেন্টে থাকেন। পেশায় নিউরো-সাইক্রিয়াটিক এন্যালিস্ট। জগতের ক্রিয়াকর্ম চলছে ভগবানের অঙ্গুলি হেলনে, কিন্তু আপনার শরীরের প্রতিটি মুভমেন্টের মধ্যে লুকিয়ে সেন্সরি অর্গ্যন, মোটর এ্যকশন, ভলিন্টারি, ইনভলিন্টরি রিএকশ্যনের কথা, তারই কিছু ঝলক ধরা পরল শুভেন্দুবাবুর সঙ্গে কথোপকথনে।
সপ্তমীর দুপুরে এবার লাইন লাগিয়ে ভোগ খাওয়ার হাত থেকে মুক্তি। পরিবারের একজন এসে সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী লাঞ্চের প্যাকেট নিয়ে যেতে হবে। সুতরাং পোস্ট লাঞ্চ পিএনপিসির ইতি। ঘরে বসে এসির ঠান্ডা হাওয়া ভোগ খেতে খেতে নেটফ্লিক্সের লেটেস্ট সিরিজ উপভোগ করুন। প্যান্ডেল যুগে, গরম খিচুড়ি ঠান্ডা করতে, ফ্যানের কাছাকাছি জটলা লেগে থাকত। এম্যাজন, ফ্লিপকার্টের কল্যাণে আজকাল প্যাকেজিং ব্যবস্থা খুবই উন্নত। সুন্দর কালো খোপ কাটা থালাতে খিচুরি, ভাজা, তরকারি, চাটনি ও মিষ্টি। উপরের ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকের ঢাকনা। সিলিংও প্রপার। কোন প্যাকেট থেকে একফোটা খিচুড়িও লিক হয় নি। হোয়াটস এ্যপ গ্রুপে খাবারের রেভ রিভিউ।
ভোগ ডিস্ট্রিবিউশনের আসর
সকালে প্যান্ডালে প্রেসেন্ট প্লিস থাকার বড় ইনসেন্টিভ হচ্ছে, ছোট্ট বাটিতে মূলভোগ প্রাপ্তি। প্যান্ডেমিকের জমানায় প্যান্ডোরাস বক্স খুলে গিয়েছে। মূলভোগের ব্যাপারটা সম্বন্ধে আগে অজ্ঞ ছিলাম কোন অজ্ঞাত কারণে। মাঠে যখন পুজো হত, পুজামন্ডপের পাশে ত্রিপল ঢাকা একটা জায়গা থাকত। ‘বামন চিনি পৈতে দিয়ে, বামণি চিনি কিসে’?, তাই জানতাম না ব্রাহ্মণ রমনীদেরই একমাত্র অধিকার এই মূলভোগ রান্নার। মাদুর্গা এই সুস্বাদু খিচুড়ি, তরকারী (দরাজ হাতে ঘি গরমমশলা পড়ে), পায়েস, ছাকা তেলে বেশ কয়েকরকম ভাজা খেয়ে থাকেন। ঠাকুর আর কি খান, সব জনগণের সেবায় লাগে। তবে এই মূলভোগে ভাগ বসানোর সৌভাগ্য আগে ঘটে নি, কারণ ‘মাস ফিডিং’ এর জন্য যে খিচুড়ি হয় আর ঠাকুরের নৈবেদ্যর প্রসাদের গুনমানে যে আকাশপাতাল তফাত বিদ্যমান, সে সম্বন্ধে কোন সম্যক ধারণা ছিল না। গতদুবছর ধরে মূলভোগের কাঞ্চনমূল্য অনুধাবন করছি এবং এর প্রেমে পড়ে গিয়েছি বলা যায়।
ষষ্ঠী পুজোর দিন দুই কিশোরী এল পুজোমন্ডপে। ঢাকের আওয়াজ শুনে তারা এসেছে। সদ্য কলকাতা থেকে সিমবায়োসিসে ল পড়তে এসেছে। বি ব্লক মার্কেটের পিছনের পিজিতে থাকে। দুর্গাপুজোতে প্রভূত উৎসাহ। ভোর চারটেতে উঠে মহালয়া শুনেছে। এই প্রথম পুজোতে বাড়ী ছেড়ে বাইরে। মন খারাপ ছিল এবার আর পুজো দেখা হবে না। পুজোতে অঞ্জলি দিতে পারবে শুনে ওদের মুখে খুশীর ঝলক দেখা গেল। একজনের নাম অনুষ্কা, অন্যজন প্রমা। উমা শুনেছি, কিন্তু প্রমা শুনি নি। জিজ্ঞাসা করে নামের মানে জানলাম- সত্য বা যথার্থ বা গভীর জ্ঞান অথবা স্থির বিশ্বাস।
ক্রমশঃ
পর্ব ৩
সপ্তমীর বিকালে আরতির সাথে সাথে ধুনিচি নৃত্য।বাষট্টির নৃত্যপটিয়সীদের গালা পারফরমেন্স দেখা গেল। ধুনুচির সাথে তা ধিন ধিনা। বেসমেন্টের খোলা চত্বরটা বেশ বড়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একঘন্টার অনুষ্ঠান লোকাল ট্যালেন্টদের নিয়ে। অংশগ্রহনকারীদের মধ্যে স্টেজে ওঠার আগে টান টান উত্তেজনার ব্যাপারটা আর নেই। অনুষ্ঠান যদিও ‘লাইভ পারফরমেন্সের’ তকমা পাচ্ছে, কিন্তু পার্টিসিপ্যান্টরা সবাই রেকর্ড করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ‘নো টেনশন’। যতক্ষণ মনোমত না হচ্ছে রেকর্ডিং বারবার করতেই বা অসুবিধা কি। যতই ডিজিটাল টেকনোলজির বুলি কপচাই- এ হল গিয়ে ‘ভাবের ঘরে চুরি’। খোলা বই নিয়ে পরীক্ষা। প্রোগ্রাম শুরুর কিছু পরেই অধিকাংশ দর্শককুল দেখা গেল গোল টেবিল গল্পে বা মোবাইলে মত্ত। খালি হাইলাইটটা হল, মাঝে একবার স্ট্যন্ডে খাটানো বড় স্ক্রীনটা হাওয়ার চোটে কাটা কলাগাছের মত ‘পপাত চ মমার চ’। দিদি নম্বর ওয়ানের ‘মোমেন্টস অফ দ্যা ডে’! সেই নিয়ে বেশ হাসাহাসি হল। তবে ভারচুয়েলে একটা সুবিধা দেখা গেল। মহিলাদের গ্রুপ পারফরমেন্সের বিভিন্ন গানের সাথে, তাদের অঙ্গে নূতন নূতন কালারফুল শাড়ী।
অষ্টমীর দিন দেখছি কালচারাল কমিটির হর্তাকর্তা স্ট্রাটেজি চেঞ্জ করে ফেলেছে। ধুনুচি নৃত্যের সময়, আগেভাগেই চেয়ারগুলোকে সিনেমাহলের কায়দায় স্ক্রীনের সামনে ঘুরিয়ে দিয়েছে। অভিমন্যুর চক্রব্যূহ! এখন দর্শকবৃন্দ কি রিএক্যশন দেন সেটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। দেখলাম ঔষুধে কাজ ধরেছে।
অষ্টমীর সকালে যেতে হল নয়ডা কালীবাড়ীতে। বাঙালীরা যেখানে গিয়ে থাকতে শুরু করে সেখানে একটা কালীবাড়ী গজিয়ে ওঠে। সেই দিল্লি কালীবাড়ী দিয়ে শুরু। তারপর সত্তরের দশকে সি আর পার্ক কালীবাড়ী, নব্বইএর দশকে নয়ডা কালীবাড়ী। বেশ কিছুদিন আগে আমার পরিচিত শুভময় ফোন করে জানাল অষ্টমীর দিন কবিতা আবৃত্তি কম্পিটিশনে আমাকে জাজ হতে হবে। আজকাল দুই একবার কালীবাড়ীর ম্যাগাজিনে আমার রম্যরচনা বেরিয়েছিল। সেই সুবাদে মনে হচ্ছে সাংস্কৃতিক বিদগ্ধ পরিমন্ডলে ঢুকে পড়েছি। তবে নাকের বদলে নরুণ গোছের ব্যাপার, ধরে নেওয়া হচ্ছে, কোন ব্যাক্তি, কলম-কারি করতে পারলে বাচিক শিল্পের কারিকুরিতেও তিনি সমভাবে দক্ষ। অনকোরা ফিল্ড। নির্বাচিত কবিতা হোয়াটস্ এ্যপে চলে এল। ‘জাজমেন্ট’ ‘মনুমেন্ট’ টাস্ক। লেগে পড়লাম। পাঁচ বিভাগ। ক্ষুদে থেকে প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য দুয়ার খোলা। নিজে পার্টিসিপেট হলেও বোধহয় এত ব্যাকএন্ড প্রিপারেশন করতাম না। গুগুলে টাইপ করে আবৃত্তি শুনে নিলাম। টাং শার্প সবাই জানেন আমার এ্যরেনাতে ইয়ার শার্প জরুরী, সেটাই করে নিলাম। পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়ে পৌঁছালাম। কালীবাড়ীতে বেশ ভীড়। নির্দিষ্ট সময়ের আধঘন্টা পরে পৌছেছি। বন্ধুকে কুন্ঠিত মুখে বল্লাম ‘সরি-দেরী হয়ে গেল’। বন্ধুর প্রশান্ত মুখ। মানে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’! জিজ্ঞাসা করলাম-‘স্টেজ কোথায় রে?’ এবার বন্ধু কুন্ঠিত মুখে মাথা চুলকে বল্ল- ঐ উঠোনে লাল শালু টাঙানো জায়গাটাতে ভেবেছিলাম করব। কিন্তু ওখানে তো অষ্টমীর প্রসাদ দিচ্ছে। ইতিমধ্যে আরেক দাদার আগমন। তিনি জানালেন পাঁচ গ্রুপে মোট পাঁচজন প্রতিযোগী আছে। একেই বলে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ! ‘দুয়ারে সরকারের’ মত আমি ও অন্য একজন বিচারক ও তিনচারজন কর্মকর্তা চাতকের মত বসে আছি, কখন আসবে প্রতিযোগীরা। একজন বললেন -‘এই কজনে কি আর কম্পিটিশন হবে। ক্যানসেল করে সবাইকে প্রাইজ দিয়ে দি’।আরেকজনের মত-‘অঞ্জলির আওয়াজে কিছু শোনা যাবে না। বিকালে করা যাক। ততক্ষণে আরো কিছু বাচ্চা আসতে পারে’। বেশ দমে গেলাম। বিচারকের আসনের, জীবনে প্রথম ‘ফেদার ইন মাই ক্যাপ’ কি অধরা থেকে যাবে? সবিনয়ে জানালাম - ‘বিকালে আসা যাবে না। এখনই করে ফেলুন না’। আড় চোখে দেখেছি গাছের ছায়ার কভার সরে যাচ্ছে। বেশী দেরীতে ঠা ঠা রোদে পোষাবে না এই জজগিরি। ছোট্ট পোর্টেবল স্পিকার ও হ্যান্ড মাইক এসে গেল। কাজটা সিম্পল ম্যাথস মনে হচ্ছে, এ্যলজেবরা কষার মত ল্যাজেগোবরে হতে হবে না। কারণ তিনটে গ্রুপে একজন করে প্রতিযোগী। একটাতে কেউ নেই। আর একটাতে দুজন। একটি বাচ্চা মেয়ে উঠে জানাল সে কবিতাটি ভুলে গিয়েছে। শুভময় তার ভূয়সী প্রশংসা করে জানাল-‘স্টেজে উঠে ভুলে গেছি’ বলতেও বুকের পাটা লাগে। বেশ কিছু হাততালি পড়ল। বাচ্চা মেয়েটি বেশ কিছুক্ষণ পরে এসে জানাল সে এবার আবৃত্তি করবে। ভাল কথা- তবে সে নির্ধারিত কবিতা না বলে দুই তিন লাইন ‘হাট্টিমাটিম টিম তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাড়া দুটো শিং’… বলে বেশ কিছু হাততালি কুড়াল। আমার নেহাত শিং নেই তবে এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় আমার রোম খাড়া হয়ে উঠল। প্রতিযোগিতা শেষ। সবার জন্য প্রাইজ। কর্মকর্তাদের তরফ থেকে অনুষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা হল। নিয়ম অনুযায়ী আমাকেও মাইক দেওয়া হল। এক কর্মকর্তা সবিনয়ে জানালেন এনসিআর-এ বাংলাভাষার চর্চা সম্বন্ধে কিছু এক্সপার্ট কমেন্ট দিতে হবে। আউট অফ সিলেবাস। এরকম গুগলির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। গুগল করারও সময় নেই। শিশুদের মধ্যে মাতৃভাষা প্রসারে বাবা-মায়ের মনোসংযোগ, ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস যে বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে, পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণের দিনটিতে স্মরণ করে - ইত্যাদি বলে বক্তব্য শেষ করলাম। শুভময় মাইকে অনেক স্বচ্ছন্দ। ‘হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন’ দিয়ে শুরু করে, জীবনানন্দের - ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর মুখ খুজিতে যাই না আর… ‘ দিয়ে পরিসমাপ্তি। লাভের মধ্যে এক বোতল ঠান্ডা জল ও কোল্ড ড্রিংকসের বোতল প্রাপ্তি।
ফিরে এলাম নিজ কুলায় অর্থাৎ ৬২র বঙ্গীয় সমাজে। সিদ্ধার্থ সেন পরিচিত মুখ। চেয়ারে বসেই বেশী সময় কাটাচ্ছেন। হাঁটুর ব্যাথায় কাবু। আঠার সেক্টারের মার্কেটে সিড়িতে উঠতে গিয়ে পা আটকে পড়ে গিয়েছিলেন। প্রোগ্রেসিভ লেন্সের এই এক ঝকমারী। সিঁড়ি দেখতে গেলে নীচে তাকাতে হয়। তখন চশমার রিডিং পোরশানটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে চলে। সিঁড়ির এলিভেশন বোঝা যায় না। আমি নিজে সিঁড়ি চড়ার সময় চশমা খুলে নি।
বিকালে অতনুকে (পিডিআইএল) দেখলাম, চোখে কালো চশমা। ব্যাপার কি? জানা গেল ক্যাটারাক্ট অপারেশন করিয়েছে। ডাক্তার না বললেও নিজে থেকে প্রিকশন নিচ্ছে চশমা পরে। তবে রাতে কষ্ট করে জিরো পাওয়ারের চশমা না পরে, কালো চশমা পরার মাহাত্ব্য বোধগম্য হল না। অমিতাভকে অনেকদিন চিনি। আগে সাগরে, মানে সাগর এপ্যার্টমেন্টেড থাকত। এখন স্পেশাল স্ট্যটাস-‘করোনা বিজয়ী’। যমের দক্ষিণদুয়ারের চৌকাঠ থেকে ফিরে এসেছে। ম্যাকস বৈশালীর ভূয়সী প্রশংসা করল। একমাস হসপিটালে থাকতে হয়েছিল। মজার ব্যাপার, সে দীর্ঘদিন বাড়ি থেকে না বেরিয়েও করোনার শিকার।
অষ্টমীর দুপুরে লুচি, পনির, ছোলার ডাল, বোদে সহকারে প্যাকড লাঞ্চ। পুরো ব্যাপারটাই মাখনের মত স্মুদ। টপাটপ লিস্ট মিলিয়ে টিকমার্ক, তারপর স্লিপ দেখিয়ে প্যাকেট সংগ্রহ। সেই কাউন্টারের সামনে কিউ, এটা ফুরিয়ে গেছে, ওটা বাড়ন্ত বলে চ্যাঁচামেচি নেই, একটার বদলে দুটো বেগুনীর দিন শেষ। রসগোল্লা এই কাউন্টারে একটা সাটিয়ে অন্য কাউন্টারে আরেকটা ম্যানেজ করবেন, সেই উপায়ও নেই। মোদ্দাকথা রিটায়ার্ড লাইফের ম্যাদামারা জীবন, উত্তেজনার পারদ কম। তবে পাবলিকের এই ডেলিভারী সিস্টেম বেশ পসন্দ। আজকাল হাইব্রীডের জমানা। লকডাউনে যে সব অফিস বিশেষত সফ্টওয়ার কোম্পানি গুলো হাইব্রীড মডেলের কথা ভাবছে। দুদিন হয়ত অফিস যেতে হল, বাকী কয়দিন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’।এরপর ভোগ খাওয়াটাতে হাইব্রীডের ভাবনাচিন্তা করা যেতে পারে। যে চায়, সে প্যাকেট নেবে, বাকীরা ট্রাডিশনাল মেথড চালাবে। দুটোরই প্লাস-মাইনাস পয়েন্ট আছে।
ক্রমশঃ
পর্ব ৪
সৌরভ খুব মেটিকুলাসলি কোভিড প্রোটকল বানিয়েছে। রঙীন গ্লসি পেপারে মাস্ক সহ ছবির তলায় লেখা ‘নো মাস্ক, নো এনট্রি’। গেটে সিকিইরিটি নিয়মকরে স্যানিটাইজার লাগাচ্ছে হাতে। ‘রিস্ক টেকার’ এর ডিগ্রি বোঝাতে গিয়ে, অনেক বছর আগে, দিল্লি এফএমএস থেকে এক প্রফেসার অধিকারী এসেছিলেন আমাদের অফিসের ট্রেনিংএ। প্রায় তিরিশ বছর আগের ঘটনা। যা মনে আছি তাই বলি। কলেজের ক্যাম্পাসের কাছে ছোট্ট নালা। পাশে কলেজের মেয়েরা গল্প করছে। বাইক নিয়ে একটি ছেলে এল। নালার কাছাকাছি এসে বুঝল, ক্রস করা রিস্কি। ছেলেটি বাইক ঘুরিয়ে চলে গেল। এ হচ্ছে ‘রিস্ক এভয়ডার’ এরপর দ্বিতীয় একটি ছেলে এল। সে নেমে, নালাটা দেখে শুনে সবচেয়ে সরু জায়গাটা বেছে, ধীরে ধীরে ক্রস করল। এ হল ‘ক্যালকুলেটিভ রিস্ক টেকার’। এরপরের ছেলেটি বাইক থেকে নামল না। নালাটা দেখল। তারপর কিছুটা পিছনে চলে গেল। এরপর হর্ণ বাজাতে বাজাতে দুরন্ত গতিতে এসে নালাটা জাম্প করে চলে গেল। পুরস্কার স্বরূপ তরুণীদের হাততালি জুটল। ইনি হলেন ‘এডভেঞ্চারার’। মাস্কের ব্যাপারে এরকম এন্যালজি টানা যায়। কয়েকজনকে দেখলাম ডবল মাস্ক -‘একা রামে রক্ষে নেই সুগ্রীব দোসর’। এদের মধ্যে আছে কুমার ও অতনু। কিছু আছেন যারা সবসময় মাস্ক পড়ে আছেন। এরা ‘রিস্ক এভয়ডার’। অধিকাংশ লোকের দেখা গেল মাস্ক আছে তবে থুতনিতে। অন্য কেউ কাছাকাছি এলে নিয়মরক্ষার্থে লাগিয়ে নিচ্ছেন। একটু পরে আবার যে কে সেই। এই দল ক্যালকুলেটেড রিস্ক টেকার’। আরেকদল আছেন, যাদের মাস্ক পকেটে। সিকিইরিটির সামনে থাকলে রুমালের মত করে মাস্কটা ধরেন, পুলিশ দেখলেও এ রকমই করেন, তারপর পূজামন্ডপে একদম মুক্তকচ্ছ। এরা ‘এডভেঞ্চারার’ ক্যাটাগরির। লক্ষ করে দেখলাম শেষোক্ত বিভাগে, সংখ্যায় মহিলারাই সংখ্যাধিক্য। আজকাল নারীশক্তির জয়জয়কার, তারপর মন্ডপে দুর্গতিনাশিনীর বরাভয়। এরই জ্বাজ্জ্বল্য প্রমাণ পাওয়া গেল।
অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট, মোট ৪৮ মিনিট মিলিয়ে সন্ধিপূজা। এই মাহেল্দ্রক্ষণে দেবী চামুন্ডারূপে উদ্ভূত হয়ে অসুরবিনাশিনী। এবার রাত সাড়ে এগারটা নাগাদ সন্ধিপূজার সময়। উৎসাহী ভক্তবৃন্দ অধিক রাতেও হাজির, ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর জন্য উৎসাহের কোন কমতি নেই। মোবাইল জমানায় সব ইভেন্টের সঙ্গেই সেলফি। প্রদীপের মায়াবী আলোয় চূর্ণকুন্তলের ফাঁকে ভক্তিরসজারিত মুখমন্ডল আদর্শ পোর্টেট। সকালে হোমযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে নবমী পূজার সমাপ্তি।
নবমীর সকালে পূজার প্রেসিডেন্ট সাহেব হাজির। এতদিন রিমোট কন্ট্রোলে চালাচ্ছিলেন। প্রিপূজা মিটিং এখন ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। উনি এখন হাইব্রীড মডেল চালাচ্ছেন। অর্ধেক সময় নয়ডা, অর্ধেক সময় নিউটাউন। বেস্ট অফ বোথ দ্য ওয়ার্লডস। নবমীর সকালে তারকা সমাগম। ১৯শ বছরের পুরানো পুজোর ফাউন্ডার মেম্বার সমীর, সাহা, দুই বোস, সেনশর্মাদা, আমি, সুশোভন, অতীশদা, শান্তিরাম, সিদ্ধার্থ সেন ও আরো অনেকের জমিয়ে আড্ডা। দেবীপক্ষের অনুষ্ঠান। দুবার চা-ও চলে এল। গুলতানিতে চা হচ্ছে ক্যাটালিস্ট। বোসদার ক্যামেরা দিয়ে শুভর ফটো সেসন। শুভব্রত ৬২ বঙ্গের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার। পোর্টেট স্পেশালিস্ট।
পুজো কমিটি ও পেরেন্ট বডি - ‘বেঙ্গলি কালচারাল এশোসিয়েসন’ নিয়ে চায়ের কাপে তুফান। গোড়ার দিকে এই বিসিএ-র পত্তন। আমিও নাকি তার মেম্বার, যদিও মেম্বারশিপের জন্য কোন বাৎসরিক চাঁদা নেই। বঙ্গীয় সমাজের নিজস্ব কোন অফিস বা জমি নেই। ইউপি সরকারের কাছে নয়ডার জমি স্বর্ণডিম্ব। রিজনেবল রেটে ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে জমি বিক্রি হয় না। প্রথম দুই এক বছর চেষ্টার পর হাল ছেড়ে বিসিএ এখন ছিন্নমূল। বিসিএ-র আমব্রেলাতে পুজো কমিটির কর্মকান্ড। কমপ্লেক্স ব্যাপার। বিসিএ-র প্রেসিডেন্ট গৌতম রায় মশাই। তিনি এবার ‘দেশের বাড়ীর’ পুজোতে ব্যস্ত।
দুপুরের দিকে প্রেসিডেন্ট সাহেবের গাড়ীতে গেলাম, ইন্ডিয়ান অয়েল সোসাইটিতে যে আমাদের ভোগ তৈরীর জায়গা দেখতে।। প্যাকিং ও রান্না সমানতালে চলছে। ইন্দ্রনীল, সূর্যকান্তি এরা সবাই রিলে করে গাড়ীতে করে ভোগের প্যাকেট নিয়ে আসছে পূজামন্ডপে। ব্যানার্জি ও অধিকারী সাহেবের সদা শ্যেনচক্ষু খাবারের গুণমান নিয়ন্ত্রনে।
বিকালে বাসবের উদয়। আমাদের কালচারাল কমিটির মেন স্টে। বঙ্গীয় সমাজের কুলেস্ট পার্সন। এখন চাকরীসূত্রে সুদূর রাজকোট। দেরী করে আগমনের কারণ জানা গেল ‘হৃদয়দৌর্বল্য’ তবে সেটা ‘চিত্তবৈকল্য’র কারনঘটিত নয়। আসা ইস্তক যথারীতি কাজে লেগে পড়েছে। নিজের বাড়ী থেকে দামী স্পিকার নিয়ে সেট করছে যাতে সান্ধ্য-অনুষ্ঠানের অডিও কোয়ালিটি বাড়ে। কর্মযোগী।
ঘড়ির কাটার টিকটিক এগিয়ে চলেছে। সারাবছর অধীর অপেক্ষা, পূজার তিন-চারদিনের আনন্দের আসন্ন যবনিকাপতন। ঢাকের আওয়াজে শোনা যাচ্ছে - ‘ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন।’ গত বছর থেকে করোনা জুজুর ভয়ে, সকালের কুইজ, হাড়িভাঙ্গা, শঙ্খধ্বনি, ডার্ট থ্রো সবই বন্ধ। তাই সন্ধ্যের ধুনুচি নৃত্য জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।
সাড়ে আটটা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান টিভির পর্দায়। শেষ অনুষ্ঠান ‘রুহানিয়ত’ গ্রুপের। আনোয়ার কে জিজ্ঞাসা করে নামের মানে জানা গেল। ‘ রুহ’ আরবী শব্দ, অর্থ আত্মা বা প্রাণশক্তি, রুহানি হল- আত্মা সম্পর্কিত বা আধ্যাত্মিক আর রুহানিয়ত- আধ্যাত্মিক মনেভাবসম্পন্ন। উদ্যাক্তাদের কাছে শুনতে পেলাম, নেপথ্যে তাদের গত দেড়মাসের কঠিন রিহার্সাল, লোদি গার্ডেনে শুটিং করতে গিয়ে আরকিওলজি ডিপার্টমেন্টের লোকেদের হাতে হেনস্থার শিকারের ঘটনা জানাল গেল। ওখানে ভিডিও শুটিং করার ফি এমনিতে পঞ্চাশ হাজার টাকা। চাদনীচক থেকে কাপড় কিনে ড্রেস বানান, গয়না কেনা এসবই নেপথ্যের কাজ। কুশীলবের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দৃষ্টিনন্দন নিবেদন। অধিক রাত পর্যন্ত জমাটি আড্ডা।
সকাল সকাল প্রতিমা পৌঁছে গেল পুকুরঘাটে। বিসর্জনের টাইম দশটা। হিসাব করে আমার বাড়ীর জগদ্ধাত্রী ঠাকুরকে ঠেলায় চাপিয়ে নিয়ে গেলাম ঘাটে। ঢোকার মুখে তিন-চারজন অবাঙ্গালী মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন -ইনকো ভি বিদায়ী করনা পড়ে?’ বল্লাম-‘ কর দিজিয়ে, ইয়ে মাতাজী ভি দুর্গামাতা কি দুসরা রূপ হ্যায়।’ ভালই হল-আমার ঠাকুরও অনেক সিঁদুরের ছোয়া, মিষ্টিমুখ করল ভাসানের আগে। এরপর সংক্ষিপ্ত পর্ব। মন্ডপের সিঁদুর খেলা আর মহিলাদের ঘুরে ঘুরে ঢাকের তালে নৃত্য অনুপস্থিত। যমুনা পাড়ে সেই ট্রাকের সারি মিসিং। সব ট্রাকের আগে লাগানো হত ক্লাব ও সেক্টরের নাম সহ ব্যানার। আনেক আগে হাতে ধরে প্রতিমা ট্রাক থেকে নামাত হত। তারপরে ব্যাপারটা আরো সোজা হয়ে গেল। ক্রেনের সঙ্গে দড়ি বেধে ট্রাক থেকে ঘাট অব্দি চলে যেত প্রতিমা। কালিন্দীকুঞ্জের কাছে যমুনার কিছুটা অংশ ঘেরা থাকত। সেখানেই ভাসান হত। যারা যেতাম ভাসানে, সবার জন্য টিশার্ট থাকত। ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে ভাসানের নাচ ছিল মাস্ট। নন-বেঙ্গলিরা বিয়ের প্রসেশানে নাচে, বাঙ্গালীর নাচের জায়গা হল পূজার ভাসান।
ফেরার সময় একজন মহিলা আক্ষেপ করলেন-‘এবার তো সিঁদুর পেলাম না’। সিঁদুর খেলা ছোট করে হল জানি, কিন্তু সিঁদুর পাওয়ার ব্যাপারটা জানা ছিল না। উনি বল্লেন - পূজা শেষে পুরোহিত মশাই সিঁদুরের কৌটো রেখে দেন প্রতিমার পাশে, সেইখান থেকে একচিমটে সিঁদুর সবাই নিয়ে বাড়ীতে রাখেন সংসারের মঙ্গলকামনায়।
আগের জেনারেশনে বাড়ী বাড়ী ঘুরে পাড়ার পরিচিত কাকু-কাকীমা, দাদু-দিদাদের প্রণাম করে নাড়ু, মিষ্টি খাওয়ার চল ছিল। পরিচিতদের বাড়ী সপরিবারে বিজয়া করতে যাওয়ার রীতি ছিল। এখন আর সে যুগ নেই। প্যান্ডেলেই দেখা, বিজয়ার গ্রিটিংস, কোলাকুলি ও প্রণাম, শান্তিজল ছেটানো, সব কাজই সেরে নেওয়া হয়। হোয়াটস্ এ্যপে বিজয়ার মেসেজের ছড়াছড়ি। ছবিতে দেদার রসগোল্লা চলে আসছে, দৃষ্টিক্ষিদে মেটাতে। খরচা নেই, ফোন করে সময় নষ্ট করার দরকার নেই, ছবিসহ যে মেসেজ আসছে, সেটাকেই ফরোয়ার্ড করে দিলেই হল। কখনও ভুল করে শুভবিজয়ার বদলে শুভনববর্ষের মেসেজও চলে আসে। ‘টু এ্যর ইজ হিউম্যান।’
‘আসছে বছর আবার হবে’, এই আশা বুকে বেধে প্রতীক্ষারত সমগ্র ৬২ সেক্টরের বঙ্গীয় সমাজ।
সবাইকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে ধারাবিবরণীর ইতি।
দেবদত্ত
১৫/১০/২১
পরিশিষ্ট
উপরের লেখাটা ‘৬২ বঙ্গস’এ পোস্ট করার পর বিকালের অনুষ্ঠানে, কিছু পাঠকের সনির্বন্ধ অনুরোধে বিজয়াদশমীর ‘সান্ধ্য মিলন’ অনুষ্ঠানের ধারাভাষ্য সংযোজন করতে ব্রতী হয়েছি। আটটা থেকে অনুষ্ঠান শুরু। অনুষ্ঠান মনে ‘শান্তিজল’ গ্রহন, নির্ভেজাল আড্ডা, লেগপুলিং ও বিগত চারদিনের ঘটনাবলীর চর্চা। সবশেষে মিস্টির প্যাকেট বিতরণ। ট্রাডিশনাল কোলাকুলি বন্ধ। দূর থেকে করজোড়ে নমস্কার ও কুশল বিনিময়। পুরোহিত মশাই ডাকলেন শান্তিজল নেবার জন্য। কবির ভাষায় ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃত্থী’ আর তারই মাঝে এই শান্তিজল যেন ‘বরিষ ধারা মাঝে শান্তিরও বাণী।’ ‘শান্তি’ জিনিষটা বড়ই দুর্লভ। ছোটবেলায় উপেন্দ্র কিশোর কায়চৌধুরীর লেখা ‘রবিনহুড’ বইটার শেষপরিচ্ছদটা ছিল কিছুটা এইরকম। রবিনহুড ও তার দলবল ইংল্যান্ডের রাজার কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে। রাজা ‘তথাকথিত’ দস্যুদলের মনোবাঞ্ছা পূরণে ব্রতী, যাতে তারা স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরতে পারে। কেউ জমি চাইছে, কেউ চাকরী কেউ বা দোকান। সবশেষে এল দস্যুদলের পাদ্রী ফ্রায়ার টাক। সে রাজার সামনে হাঁটু গেড়ে বল্ল - আমি সন্নাসী মানুষ, টাকা পয়সা লাগবে না, যাতে মনের শান্তিতে থাকতে পারি, তার ব্যবস্থা করে দিন। স্মিত হাস্যে রাজার উত্তর ছিল-‘তুমি যে সবচেয়ে কঠিন জিনিষটি চেয়ে বসলে সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্মূল্য বস্তু, ওই জিনিষটি দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।’ এক হাজার বছর আগের ঘটনা, তবুও সেই ‘শান্তি’ আজও অধরাই থেকে গিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মের হানাহানি জনিত হলাহল তো ছেড়েই দিন, যে মূহুর্তে, আপনার মারুতি গাড়ীর পাশে পড়শীর হন্ডা সিভিক লেগে গেল, আপনার শান্তি ভঙ্গ হল। এটা এক ধরণের শান্তিভঙ্গ। শান্তিজল নিয়ে আমার অশান্তির কারণটা আবার একটু অন্য ধরণের। মাথা নীচু করে শান্তিজল নিচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ গেল পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ম্যাডামের শাড়ীর আঁচলের দিকে। নূতন শাড়ীর দামের ট্যাগের লেভেল সাটা। শুনেছি বড় স্কুলের দিদিমনি। দিদিমনিদের ছোটবেলা থেকেই ভয় পাই। তাহালেও ভয় কাটিয়ে তাঁকে বল্লাম, ‘ম্যাডাম, দামের ট্যাগটা বোধহয় খুলতে ভুলে গিয়েছেন।’ উনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে ‘কী কান্ড’ বলে দেখার চেষ্টা করে - ট্যাগটাকে টার্গেট করতে চাইছিলেন, ততক্ষনে আমি সাহস করে আঁচলের কোণা থেকে ট্যাগটা উঠিয়ে ফেলেছি। উনি ধন্যবাদ জানালেন। কিন্তু আমার পোড়া চোখে নজর গিয়েছে শাড়ীর দাম। ১৯৯৭/-। ব্যাস, হয়ে গেল শান্তি বিঘ্নিত। পুরো ২০০০/- নয় আবার ক্রিকেটের নিরানব্বই এর গেরোও নয় বা বাটার জুতোর ৯৯/- এর ধাক্কাও নয়। ১৯৫০/- কি ১৯৭৫/- হতে পারত। মন অশান্ত হয়ে পড়ল সাতান্নবই এর গূড়তত্ব অনুসন্ধানে। এখনও চিন্তায় আছি, আপনারাও একটু মাথা খাটাবেন এর রহস্য উদ্ধারে। এও একরকমের অশান্তি! তবে গুগল থাকায় অশান্তি কমেছে। গুগল হচ্ছে ডিজিটাল ভার্সান অফ সানন্দা ম্যাগাজিনের ‘আমার মা সব জানে’ কলামটি।
ইতিমধ্যে সিদ্ধার্থ সেন মহাশয়ের আগমন। উনার চলাফেরা উচ্চমার্গে। নক্ষত্রখচিত পরিমন্ডলীতে থাকেন। সাংস্কৃতিক জগত থেকে শুরু করে, রাজনীতিবিদ, সরকারী উচ্চপদস্থ আমলা, ধ্বনন্তরি ডাক্তার সবাই আছেন তার তালিকায়। দরাজ হাতে সাহায্যে প্রস্তুত। উনি আমার লেখা পড়ে বেশ প্রসন্ন মনে হল। চেয়ারটা টেনে আমার সামনে বসে জানালেন দিল্লির বড় পাবলিশার তার হাতের মুঠোয়। বরাভয় মুদ্রা নিয়ে বল্লেন আমার বই উনি ছাপিয়ে দেবেন। একেই বলে ‘গাছে না উঠতেই এক কাদি’। পাবলিশারের চেনা পরিচিতি, সেন মহাশয়ের তালিকায় নবতম সংযোজন।
হাসি মস্করাতে এটাও শোনা গেল সদ্যপ্রয়াত বুদ্ধদেব গুহর রিপ্লেসমেন্ট হিসাবে আমাকে ভাবা হচ্ছে। লেখার গুণে নয়। দেবদত্ত এর চেহারার লালটু ভাবটা ভগবানদত্ত। যাক একেই বলে পারফেক্ট লেগপুলিং।
একটু পরে দেখা দিল নিরূপম। কেরালাইট স্টাইলের ধুতি, লুঙ্গির মত করে পরা। উপরে নীল শার্ট। বেঙ্গলে ধুতি হলে উপরে পাঞ্জাবি থাকবেই। শার্টটা বাঙালী চোখে কেমন বেখাপ্পা লাগে, এই পোষাকের নামটাও তাই। এটাকে নাকি ‘মুন্ডু’ বলে। ‘মাথা’ খাটিয়ে বার করেছে, তাই বোধহয় মুন্ডু।
আনোয়ারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ওর কর্মক্ষেত্র ‘শিপ লজিস্টিক’। কয়েকদিন আগে পেপারে পড়ছিলাম শিপের ফ্রেট রেট অনেক বেড়ে গিয়েছে, কারণ পোস্ট প্যান্ডেমিক ইকনমিক এ্যাক্টিভিটি বেড়ে যেতে শিপ সংকট। তাই এই বিপত্তি। আনোয়ার একটা মজার জিনিষ জানাল। কন্টেনার শিপের রেট বাড়লেও অয়েল ভেসেলের ফ্রেটরেট কমে গিয়েছে। তার কারণ অয়েল ভেসেলের সংখ্যাধিক্য।
এবারের পূজাতে লক্ষ করলাম আমাদের দুই পুরোহিত মশাইএর ড্রেস কোডের পরিবর্তন। আগে সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি থাকত পরনে, এবারে হলুদ গেরুয়ার মাঝামাঝি কালারের পাটভাঙা ধুতি, পাঞ্জাবি। গলায় ডবল রুদ্রাক্ষের মালা। মৃন্ময়ী মূর্তির পাশে আরাধনারত পারফেক্টলি ড্রেসড যুগল পুরোহিত মশাইদের দেখে সবার মনেই ভক্তির জোয়ার। তবে একটা নামাবলী ও পিছনে টিকি থাকলে ব্যাপারটা আরো উচ্চমার্গে পৌঁছাত।
হার্ট এ্যটাক নিয়ে কথা হচ্ছিল। কোন এক মেম্বারের সদ্য ‘দিল কা দৌড়ার’ পর এন্জ্যিওপ্লাস্টি হয়েছে। তার সুযোগ্য সহধর্মিনী তার ‘হয়শলা বুলন্দ’ করার জন্য বলেছেন - ‘এই তো কয়েকমাস আগে অতবড় ক্রিকেট ক্যাপ্টেনের সব বাঙালীর ‘দাদা’ সৌরভ গাঙ্গুলির তো স্টেন্ট বসল। এখন তো দিব্যি আবার ‘দাদাগিরি’ শুরু করে দিয়েছে। সুতরাং মাভৈ মাভৈ, তুমিও দুদিন পর একদম ফিট হয়ে যাবে’। পারফেক্ট উদাহরণ সহ ‘মরাল বুস্টিং’।
‘রুহানিয়াত’ গ্রুপ পূজামন্ডপে এক আনন্দ সংবাদ দিলেন। তাদের ট্রুপ সরকারী আমন্ত্রণ পেয়েছে ‘হিউম্যান বিহেভেরিয়াল পসিটিভিটির’ উপর কোন এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে ‘কার্টেন ড্রয়ার’ ফাংশান করার জন্য। কোন এক ভূতপূর্ব আমলা, যিনি এখন হিউম্যান রাইটস কমিশনে আছেন, সকালে লোদি গার্ডেনে ওদের ভিডিও শুটিং দেখে, ওদের এই সুযোগটি দিয়েছেন।
বাঙ্গালীদের খাওয়ার শেষপাতে মিস্টি না হলে চলে না। ২০২১ এর যবনিকাপাতে সেটারও কার্পণ্য ছিল না। গল্পগুজবের শেষে মিস্টির প্যাকেট বিতরণ। ‘মধুরেণ সমাপেয়ত। ‘আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে সোনা পায়’ এই আপ্ত বাক্যের যথার্থতার প্রমাণ পাওয়া গেল, যখন আসর ভাঙ্গার সময় দেরী করে গাত্রোত্থান করাতে, দুই প্যাকেট মিষ্টি বেশী পাওয়া গেল, কারণ অনেকেই আইপিএল দেখতে ব্যস্ত ছিলেন।
‘আসছে বছর আবার হবে’ ও পার্কের পুরানো জায়গাতেই হবে এই আশা নিয়ে, আসুন আমরা সবাই ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি। ভগবান নিশ্চয়ই ভক্তদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবেন।
দেবদত্ত
১৭/১০/২১





Comments
Post a Comment