রোহিলখন্ডের ইতিহাস
রোহিলাখন্ড ও রামপুর
বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বেরিলি শহরের ঝুমকার খ্যাতি অনেকেই শুনে থাকবেন বিখ্যাত সিনেমার গান-‘বেরিলি কি বাজার মে ঝুমকা গিরা রে’ গানটির মাধ্যমে। তেমনি কিছু লোক হয়ত শুনে থাকবেন রামপুর শহরের খ্যাতি, ওখানে তৈরী ‘চাকু’ র জন্য। তবে আমি বাজি রেখে বলতে পারি পিলভিট শহর যে বাঁশী তৈরীর জন্য প্রসিদ্ধ সেটা আপনি জানেন না। যদি জানেন, তবে আপনার সাধারণজ্ঞানকে কুর্নিশ জানাই। তেমনি ভাবে উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখন্ডের নাম শুনে থাকতে পারেন, কিন্তু রোহিলখন্ডের কথা বল্লে বেশীরভাগ লোককেই গুগলম্যাপের সাহায্য নিতে হবে।
আজকের দিনে খাতায় কলমে রোহিলাখন্ডের অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে, ওয়েস্টার্ন ইউপি ও উত্তরাঞ্চলের তরাই সংলগ্ন জায়গাটির নাম ছিল রোহিলাখন্ড। মহাভারতে এই জায়গাটাকে উল্লেখ করা হয় পাঞ্চাল প্রদেশ নামে, যার রাজা ছিলেন দ্রুপদ।
রোহিলাখন্ডের ভৌগলিক বিবরণ জানা থাকলে, পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের সাম্যক ধারণা করতে সুবিধা হবে। জায়গাটির উত্তর ও উত্তরপশ্চিমে হিমালয়, পূর্বদিকে অবধ বা অউধ রাজ্য, দক্ষিণে মুঘল সম্রাজ্য-দিল্লি আগ্রা। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলি ছিল এই অঞ্চলের কৃষিকার্যের জন্য উত্তম।
আবার এই নদীগুলি প্রধানত গঙ্গা, যমুনা, আজ থেকে পাঁচ, সাতশ বা হাজার বছর আগে তৎকালীন রাজ্যের সীমানা নির্ধারনের সূচক ছিল। সেই সময়ে বড় নদীর উপর সেতু থাকত না, ফলে যুদ্ধ হলে সৈন্যসামন্ত, ঘোড়া, হাতী ও আনুষঙ্গিক সহকারে নদী পারাপার ছিল যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই সাধারনত নদী হত দুইটি রাজ্যের মধ্যে ন্যাচারাল ব্যারিয়ার।
আগেকার আমলে,নবাব/ বাদশাদের, যুদ্ধের মাধ্যমে রাজ্য বিস্তার ট্যাক্স জেনারেশনের অন্যতম হাতিয়ার ছিল।উত্তর ভারতে নদীসমূহে জলের পরিমাণ গ্রীষ্ম ও বর্ষাতে বেশী থাকত আর শীতে জল কম থাকত। ফলে নদী পার হয়ে যুদ্ধ করার প্রশস্ত সময় ছিল শীতকাল।
এই অঞ্চলের নদী সমষ্টি পাশের মানচিত্রে দেখে নিন।সবারই জানা আছে দিল্লি শহর যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। যমুনা নদী থেকে শুরু করে যদি আপনি উত্তরপূর্বে হিমালয়ের পাদদেশ অব্দি রোহিলা ভূমির উপর দিয়ে যেতে চান, তবে আপনাকে প্রধানত তিনটি নদী পার হতে হবে, যমুনার পরে বড় নদী হল গঙ্গা, একশ কিলোমিটার তারপর আরো একশ কিলোমিটার গেলে যথাক্রমে রামগঙ্গা ও কালী নদী পেরোতে হবে। আয়তনের হিসাবে রোহিলাখন্ড ১২০০০ বর্গ মাইল, আর তার পার্শ্ববর্তী বড় রাজ্য, অউধ হল ২২০০০ বর্গমাইল। গঙ্গা ও যমুনার মধ্যবর্তী যে জায়গাটা রোহিলাখন্ডে পড়ছে, সেটাকে বলা হয় ‘গঙ্গা-যমুনার দোয়াব’, তারপর ক্রমে আসবে গঙ্গা-রামগঙ্গা দোয়াব। গঙ্গা-যমুনার দোয়াব, শিবালিক পর্বত থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত,এটার উত্তরের ভাগ‘আপার গঙ্গা দোয়াব’(হরিদ্বার থেকে আলিগড়), পরেরটা ‘লোয়ার গঙ্গা দোয়াব’(আলিগড় থেকে এলাহাবাদ)।
বর্তমান মানচিত্র অনুযায়ী, রোহিলাখন্ডের পশ্চিমদিকের শহরগুলি হল, সাহারানপুর, দেওবন্দ, মুজাফফরনগর, বাগপত, মীরাট, উত্তরে রামপুর, বিজনৌর, নাজিবাবাদ, মধ্যভাগে আমরোহা, মোরাদাবাদ, বাদায়ূন,বেরিলি, এটা এবং পশ্চিমে পিলভিট, সাহাজাহানপুর, ফারুকাবাদ, মঈনপুরী, ফিরোজাবাদ।
দিল্লির সুলতানেট পিরিয়ড বা স্লেভ ডাইনেস্টির (১২০৬-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ) সময়ে এই অঞ্চলে ‘কাঠেরিয়া রাজপুত’ সম্প্রদায়ের লোকেরা বসবাস করত। কাঠেরিয়া রাজপুতদের সঙ্গে দিল্লির মসনদের নবাবদের প্রায়ই যুদ্ধ লাগত। সুলতানেট পিরিয়ডে গিয়াসউদ্দীন বলবনের সময় থেকে, মুঘল সম্রাজ্যে আওরাংজেবের রাজত্ব (১৭০৭) পর্যন্ত বাদায়ূন ছিল দিল্লির সম্রাটের অধীনে।
বাদায়ূনের উত্তরে বেরিলি, পিলভিটের আশেপাশে অনেক জায়গাতেই ঘন জঙ্গল ছিল, বসতিও ছিল কম।
ব্রিটিশ চিত্রকর ড্যানিয়েলের আঁকা পিলভিটের কেল্লাদিল্লি থেকে সুলতান বা তার পারিষদদের শিকার খেলার জায়গা ছিল রোহিলাখন্ড।
আওরংজেবের শাসনের শেষের দিকে ঠিক হয় এই অঞ্চলের রাজপুত রাজাদের একাধিপত্য খর্ব করতে, কিছু রোহিলা আফগান সর্দারকে এনে বসান হবে। রোহিলা শব্দটা এসেছে,‘রো’ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে পর্বত। সেইসময় আফগানিস্তানের কান্দাহার অঞ্চলে লোকজন বিভিন্ন ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এরা বৃহত্তর পাশতুন ট্রাইবের অন্তর্গত। প্রত্যেক গোষ্ঠির একজন সর্দার থাকত। এই গোষ্ঠীগুলি ‘কাবিলা’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮০০ শতাব্দীর শুরুতে এই গোষ্ঠিগুলির মধ্যে বিশেষ ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন দাউদ খান। দাউদ খান ১৭০৫ সালে ঔরংজেবের আমলে ভারতে আসেন। দাউদ খানের আগে থেকেই মুঘলবাহিনীতে পঁচিশ হাজার আফগান সৈন্য ছিল। এদের বেশীরভাগকে ‘কাঠের’ অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়, দাউদ খানের অধীনে। দাউদ খানের আমলে ১৭০৫-১৭২০ পর্যন্ত রোহিলাখন্ডে পাঠানদের আধিপত্য উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। এরপর দাউদ খানের দত্তক পুত্র আলি মহম্মদ খানের রাজত্ব শুরু হয় ১৭২০ থেকে ১৭৪৮ পর্যন্ত। এদিকে আওরংজেবের মৃত্যুর (১৭০৭) পর থেকে মুঘল সম্রাজ্যের অবনতি শুরু হয়। দাউদ খাঁর রাজত্বকালে, মুঘল সম্রাটের অধীনে ছিল রোহিলখন্ড। ১৭২১ সালএর পর থেকেই রোহিলখন্ড এক স্বতন্ত্র রাজ্যে পরিণত হয়। ১৭৭৪ সালে প্রথম রোহিলা যুদ্ধ পর্যন্ত এই পঞ্চশধিক বৎসর, ছিল একত্রিত রোহিলাখন্ড রাজ্য। ১৭৭৪ এর পর রোহিলা রাজ্য খন্ডিত হয়ে খালি রামপুর রাজ্যের মধ্যে সীমিত থাকে।
আলি মহম্মদ সুশাসক ছিলেন। বেরিলির কাছে অওনালাতে তার রাজধানী ছিল। একই সময়ে আরএক পরাক্রমশালী নবাব সফদরজং,(১৭০৮-১৭৫৪) দিল্লির সম্রাটের দরবারে সন্মানিত উজীর ছিলেন।
সফদরজংমুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮), মহম্মদ শাহ
সফদরজংকে অউধের নবাব (১৭৩৯) নিযুক্ত করেন।সফদরজং ছিলেন জাতিতে ইরাণ বা পারস্যের মুসলিম। তার পূর্বপুরুষ এসেছিল, আজারবাইজান, তুর্কমেনিস্থান থেকে। এরা ছিলেন শিয়া মুসলিম। অন্যদিকে আলি মহম্মদ ছিলেন আফগানিস্তানের বরহা সম্প্রদায়ের সুন্নী মুসলিম। আলি মহম্মদ খান রোহিল খন্ডের প্রতিষ্ঠাতা
আকবর তার সম্রাজ্যে যে ১২ টি ‘সুবা’ তে বিভক্ত করেছিলেন, তার মধ্যে অন্যতম অউধ। সফদরজং যখন অউধের নবাব হন, তখন সবে রোহিলাখন্ড স্বতন্ত্র এক ‘সুবা’ র মর্যাদা পেয়েছে। মহম্মদ আলির রাজ্যবিস্তার সফদরজংএর মনঃপূত ছিল না।।একবার কি হল, বেরিলির জঙ্গলের কাঠ কাটা নিয়ে আলি মহম্মদের বনরক্ষীদের সঙ্গে সফদরজং এর সৈন্যদের লড়াই হয় ও বেশ কিছু হতাহত হয়। এ নিয়ে সফদরজং মুঘলসম্রাটের কানভারী করেন। এরপর মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ গঙ্গা পার করে সৈন্যবাহিনী পাঠান রোহিলাখন্ডে যুদ্ধের (১৭৪৬) জন্য। আলি মহম্মদের অধীনস্থ রোহিলখন্ডের বাকী সুবেদাররা সেই যুদ্ধে অংশগ্রহন করে নি। ফলে পরাজিত আলি মহম্মদকে মুঘল কোর্টে পেশ করা হয়। সফদরজং ভেবেছিল্ন এবার আলি মহম্মদের উপযুক্ত শাস্তি হবে। কিন্তু রোহিলারাজ্যের বাকী সব সুবেদার মহম্মদ আলির মুক্তির দাবী জানাতে থাকেন, এবং একজোট হয়ে দিল্লির কাছে অবস্খান করেন। সফদরজংএর অনিচ্ছা সত্বেও সম্রাট মহম্মদ শাহ, মহম্মদ আলি সসন্মানে মুক্তি দেন ও মহম্মদ আলি ফিরে এসে আবার রোহিলাখন্ডের শাসনভার নেন।
১৯৪৮ সালে অল্প বয়েসে মহম্মদ আলি যখন মারা যান, তখন তার ছয় পুত্রই ছিল নাবালক। মৃত্যুর আগে তিনি তার জ্ঞাতিকাকা হাফিজ রহমৎ খানকে তার পুত্রদের ‘রিজেন্ট’ (রাজার অবর্তমান্ যিনি রাজ্য পরিচালনা করে থাকেন) নিযুক্ত করেন। এরপর দীর্ঘ ২৬ বছর তিনি রোহিলাখন্ডের অন্যতম ফৌজদার ছিলেন।
১৯২০ সালের পর থেকে ১৭৭৪ সালের প্রথম রোহিলাযুদ্ধ পর্যন্ত এই অঞ্চলের ইতিহাস পাওয়ার টাসেল ও ঘন ঘন যুদ্ধের মধ্যে দিয়েই কাটে। নাদির শাহের পর অফগানিস্থানের নবাব হন আহমেদ শাহ আবদালি বা আহমেদ শাহ দুরানী (১৭২২-১৭৭২)। আহমেদ শাহ আবদালি কাবুলের সিংহাসনে বসেন ১৭৪৭ সালে।
আফগানিস্তান কোনকালেই সমৃদ্ধ দেশ ছিল না। পাহাড়ী এলাকায় এমনিতেই চাষবাস কম, লোকও কম, খাজনা দেওয়ার লোক কই? অফগানরা এমনিতেই যোদ্ধা জাতি, তাই আবদালির অধীনস্থ সব উপজাতির নিজস্ব সেনাবাহিনীর ভরণপোষণের ভার। সুতরাং যুদ্ধে জিতে লুঠপাঠ করে, সৈন্যবাহিনী বাড়ানর দিকে ঝুঁকলেন আবদালি। তার সময়ে ভারত আক্রমণ সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল। তিনটি কারণ আবদালির ফেভারে ছিল, এক তো ক্ষয়িষ্ণু মুঘল শক্তি, দুই নম্বর মুঘল শাসকদের প্রভূত ধনসম্পত্তি তৃতীয়ত খাইবার পাস অতিক্রম করলে সমতলভূমি দিয়ে সহজেই সেনাবাহিনীর চলাচলের পথ একদম দিল্লি পর্যন্ত।১৭৪৮ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে, আহমেদ শা দুরাণী আটবার ভারত আক্রমণ করেন। ১৭৪৮ সালে যখন প্রথমবার আহমেদ শা আবদালি মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধে জিতছিলেন, তখন একটি দুর্ঘটনায় তার তোপখানায় আগুন লেগে, কয়েক হাজার সৈন্য মারা যায়, ফলে আবদালিকে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে কাবুলে ফিরতে হয়। ১৭৫১ সালের তৃতীয় যুদ্ধে আবদালি, তৎকালীন মুঘল সম্রাটের অধীনস্থ নবাব মীর মন্নুকে পরাজিত করেন। এর ফলে পাঞ্জাবের মুলতান ও লাহোর চলে যায় আহমেদ শাহ আবদালির হাতে। এরপর ১৭৫৬/৫৭ তে আহমেদ শাহ আবদালি চতুর্থবার ভারতে আসেন। তখন মুঘল সম্রাট ছিলেন আলমগীর টু। তিনি তার মেয়ের বিয়ে দেন আহমেদ শাহ আবদালির ছেলের সঙ্গে। এর ফলে মুঘল ও আফগানদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন হয়। ১৭৬১ সালে পঞ্চমবারের জন্য ভারত আক্রমণে আসেন আহমেদ শা আবদালি। এটাই ছিল বিখ্যাত পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। রোহিলাখন্ডের আর এক রোহিলাখন্ডের ফৌজদারের কথা উল্লেখ করা জরুরী, তার নাম নাজিব উদদৌল্লা (১৭০৩-১৭৭০)। তিনি ১৭৩৬ সালে মুঘল কোর্টে আসেন ভাগ্যান্বষণে এবং অচিরাত নিজ কর্মগুণে রোহিলাখন্ডের নাজিবাবাদের ফৌজদার নিযুক্ত হন। নাজিব উদ দৌল্লা নাজিবাবাদ শহরের পত্তন করেন। তিনি এখানে কেল্লা, জামা মসজিদ বানানও এখান থেকে রাজ্যশাসন করেন। নাজিবাবাদের জামা মসজিদ
নাজিবাবাদ শহর ১৭৮৪-৯৪ ড্যানিয়েলের আঁকা
জামা মসজিদের গেট
অওরংজেব জীবনের বেশীরভাগ সময়টা দাক্ষিণাত্যে বিজয়ে কাটিয়েছিলেন, যদিও বিশেষ ফললাভ হয় নি। সৈন্যবাহিনী পিছনে প্রভূত খরচা, যা কিনা মুঘল সম্রাজ্যের পতনের অন্যতম কারণ ধরা হয়। আওরংজেবের মৃত্যুর পর মারাঠা সম্রাজ্য পেশোয়াদের অধীনে কতটা ছড়িয় পড়েছিল, তা ঐসময়ের ম্যাপ (হলুদ রং) দেখলেই বোঝা যাবে।ভারতের ম্যাপ ১৭৬৫ হলুদ অংশটি মারাঠা অধিকৃত
১৭৫৭ সালের শুরুতে চতুর্থ বারের মত আহমেদ শাহ আবদালি দিল্লি আক্রমণ করেন, এই যুদ্ধে তাকে নাজিব উদ দৌল্লা সাহায্য করেন। ফিরে যাবার আগে, আবদালি, বকলমে নাজিবের হাতে দিল্লি শাসনের ভার দিয়ে যান। বিনিময়ে নাজিব তাকে বিশলক্ষ টাকা বার্ষিক খাজনার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৭৫৭ সালের আগস্ট মাসে, বালাজী মাধব রাও (তদানীন্তন পেশোয়া বালাজী বাজী রাও এর ভাই) দিল্লির যুদ্ধে নাজিব এর অধীনস্থ মুঘলদের পরাজিত করেন। এরপর মারাঠা বাহিনী উত্তরপূর্বে রোহিলাখন্ডে ঢুকে পড়ে লুঠপাঠ চালায়। এই সময়ে রোহিলা সর্দাররা উত্তরে হিমালয়ের তরাই অঞ্চলে পালিয়ে যায়।
মারাঠাদের হাতে পরাজয়ের গ্লানি নাজিব উদ দৌল্লার মনে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। মারাঠা বাহিনীকে খালি রোহিলা সৈন্য দিয়ে কাবু করা যাবে না বুঝে, নাজিব আবার আবদালিকে দিল্লি আক্রমণের আহ্বান জানান। সালটা ১৭৬১, দিনটা ছিল ১৩ই জানুয়ারি। এটাই পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। সদাশিব রাও ভাউ এর
সদাশিব রাও ভাউনেতৃত্বে মারাঠা বাহিনীতে পুনের হোলকার, গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া, সুরজমল জাঠ, সুরজমল জাঠ (ভরতপুরের রাজা)
নিজাম সৈন্যবাহিনীর প্রধান, ইসমাইল খা
আহমেদ শা আবদালি
গরদি প্রভৃতি ছিলেন। মারাঠাবাহিনীতে তিন লক্ষ সৈন্য ছিল, কামান, হাতী, ঘোড়া কি ছিল না, সঙ্গে পঁচাত্তর হাজার মহিলা ও তীর্থযাত্রী। অপরপক্ষের আবদালির সঙ্গে ছিলেন রোহিলাখন্ডের নাজিব, হাফিজ রহমত, অউধের নবাব সুজা উদদৌল্লা। সুজা উদ দৌল্লা ছিলেন বুদ্ধিমান লোক।
সুজা উদ দৌল্লা অউধের নবাবতার কাছে মারাঠাদের পক্ষ নেওয়ার জন্যও দূত এসেছিল। বছর কয়েক আগে মারাঠা বাহিনীর দিল্লির দরবারে প্রাধান্য এবং আবদালিকে যদি মারাঠারা হারিয়ে দেয়, তার নিজের অউধের পতনের সম্ভাবনা, কারণ মারাঠা শক্তি আরো তাকদদার হয়ে উঠবে। সে ক্ষেত্রে মারাঠাদের অউধের আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।সে তুলনায় আবদালির পক্ষ নিলে লাভ হচ্ছে, যুদ্ধে জিতলে পরে আবদালি ধনসম্পত্তি লুঠ করে কাবুলে ফিরে যাবে।
পানিপথের এই যুদ্ধে মারাঠারা হেরে যায় এবং প্রভূত ক্ষয়ক্ষতি হয়। যুদ্ধে দু পক্ষে প্রায় তিরিশ হাজার করে সৈন্য মারা যায়। যুদ্ধের পরের দিন আরো চল্লিশ হাজার মারাঠা সৈন্যকে হত্যা করা হয়। মারাঠাদের এই দিল্লি অভিযানে, তাদের সঙ্গে অনেক মহিলা ছিল। এরা সঙ্গে এসেছিল উত্তর ভারতের তীর্থ পরিক্রমনে। আবদালি তাদের স্লেভ বানিয়ে আফগানিস্থানে নিয়ে যায়। যাবার আগে আহমেদ শাহ আবদালি, নাজিব খানকে, তার হয়ে দিল্লি দরবারের প্রতিনিধি করে যান।
পানিপথের যুদ্ধে হারের কারণে, সাময়িক ভাবে মারাঠা শক্তির হ্রাস ঘটে।
তবে মারাঠা শক্তি এই হারের কথা ভুলে যায় নি। পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের ঠিক দশ বছর পর, ১৭৭১ সালে পুর্নগঠিত মারাঠা শক্তি আবার দিল্লি দখল করে আলমগীর টু-কে দিল্লির মসনদে বসায়। এর পরের বছরই মারাঠা সৈন্য আসে রোহিলাখন্ড আক্রমণ করতে। মারাঠা সৈন্য, রোহিলাখন্ড লুটপাঠ করে, এমনকি পুরানো শত্রুতার কথা মনে রেখে নাজিব খানের কবর থেকে তার দেহাবশেষ বার করে ফেলে দেয় আস্তাকুড়েতে। তখন রোহিলাখন্ডের উত্তরে সাহারাণপুর থেকেদেরাদুন পর্যন্ত ছিল জাবিদা খান (নাজিব উদ দৌল্লার ছেলে) এর অধীনস্থ, রোহিলাখন্ডের বাকী অংশ ছিল হাফিজ রহমত খানের কাছে।
হাফিজ রহমত খান(আঠারশ শতকের মধ্যভাগে হাফিজ রহমত খানের তৈরী ব্রীজ - পিলভিট শহরে এখনও ব্যাবহার হয়)
হিমালত পাহাড় থেকে সমতল অংশে আসতে গেলে, দশ বার মাইল দৈর্ঘের ঘন জঙ্গল পড়ে। এখানের মাটিতে অনেক পরিমাণ বোল্ডার ও নীচে বালি। হিমালয় থেকে নেমে আসা ছোট ছোট ঝোরাগুলোর জল জমিতে শুষে নেয়। এই অঞ্চলটাকে বলা হয় ‘ভাবর’। এর পরে আবার আট দশ মাইলের স্ট্রেচটা ঘন ঘাসের জঙ্গলে ভর্তি। এই অঞ্চলটার নাম ‘তরাই’। এই দুই জায়গাতে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী মধ্যে অন্যতম বাঘ। এটি একটি দুর্গম অঞ্চল। রোহিলারা যুদ্ধে পরাজিত হলে, সৈন্যসামন্তসহ এখানে পালিয়ে আসত। মারাঠা আক্রমণে পর্যুদস্ত হয়ে, হাফিজ রহমত খান ও জাবিতা খান আশ্রয় নেন তরাই অঞ্চলে।
এর পরের ঘটনাটা ১৭৭৪ সালের প্রথম রোহিলা যুদ্ধ সম্বন্ধিত। ১৭৭৪ এর পরে রোহিলা খন্ডে আফগান শাসনের অন্ত হয়, রামপুর ছাড়া বাকী অংশ অউধের অধীনে আসে। তবে এই যুদ্ধের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনাক্রম চাণক্য নীতির নানা চড়াই উতরাইয়ের মত রোমাঞ্চকর। মারাঠাবাহিনী যখন রেহিলাখন্ড অধিকার করে বসে আছে ১৭৭২/৭৩ সালে, সেই সময়ের আশেপাশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখে নেওয়া যাক।
অউধের নবাব সুজা উদ দৌল্লার প্রসঙ্গে বলতে গেলে, এটা মনে রাখতে হবে, ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে কোম্পানির বাহিনীর সঙ্গে অযোধ্যার নবাব সুজা উদ দৌল্লা, বাংলার নবাব মীরকাশেম ও দিল্লির বাদশা শাহ আলম টু এর সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধে ইংরেজরা জয়লাভ করে ও ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদ ট্রিটি অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার একছত্র অধিপতি ঘোষিত হয়। রোহিলা যুদ্ধের সময় সুজা উদ দৌল্লা শাসিত অযোধ্যার, পূর্বদিকে শক্তিশালী ইংরেজ শক্তি ও পশ্চিমে রোহিলাখন্ডের আফগান নবাবগণ। তারাও সুজা উদ দৌল্লার শত্রু কারণ তার পিতা সফদরজং এর সঙ্গে একসময় রোহিলা সর্দার আলি মহম্মদের লড়াই হয়েছিল। এদিকে একলক্ষের অধিক সৈন্যসহ মারাঠা বাহিনী চাইলে অউধ দখল করতে পারে রোহিলাদের সাহায্য নিয়ে। এখানে বলা প্রয়োজন মারাঠা বাহিনীকে ওউধ আসতে গেলে, গঙ্গা অতিক্রম করে প্রথমে রেহিলাখন্ড হয়ে তারপর অউধে আসতে হবে। তাই মারাঠাদের জন্য রোহিলা সহযোগিতা প্রয়োজন। সুজা উদ দৌল্লার আমলে ফৈয়জাবাদ (লক্ষৌ থেকে সোয়াশ কিলোমিটার পূর্বে) ছিল অউধের রাজধানী।
যদি রোহিলাদের কথা ধরা হয় তবে তারা এইসময়ে মারাঠা বাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত। মারাঠা বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেলে তাদের নিজস্ব ফৌজ নিয়ে জয় হাসিল সম্ভব নয়, অউধের নবাব সৈন্য দিয়ে সাহায্য করলে তা সম্ভব। মারাঠা বাহিনী এই মুহুর্তে ততোধিক শক্তিশালী, যা তারা পানিপথের যুদ্ধের আগে ছিল। অউধের নবাব সুজা উদ দৌল্লার অনুমান ছিল যে ইংরেজবাহিনীর সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে মারাঠাদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই।
এবার মারাঠাদের কথায় আসি। ১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে মারাঠাবাহিনী, রোহিলাখন্ড লুটপাঠ করেছে, রোহিলা সর্দাররা (হাফিজ রহমত, জাবিদা খান) হিমালয়ের তরাইয়ে লুকিয়ে। মারাঠাদের হাতে সুযোগ, রোহিলাখন্ড অতিক্রম করে অউধ জয় করার, তবে সে ক্ষেত্রে রোহিলাদের সাহায্য দরকার। ইংরেজদের পক্ষে রোহিলাখন্ড যদি তাদের অধীনে আসে তবে পাঞ্জাব, মুলতান বাদ দিয়ে সমগ্র উত্তরভারত হবে তাদের মুঠোয়, ভারতে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদের এক সোপান এগোন হবে। একটা কথা জানা প্রয়োজন অষ্টাদশ শতকে মারাঠা শক্তি উত্তরে পাঞ্জাব থেকে পূর্বে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। শিবাজীর আমল থেকে শুরু হয়েছিল ‘এক চৌথা’ কর, বিজিত রাজ্যগুলির উপর। পরবর্তী কালে মারাঠা যে রাজ্য অধীন করত, তাদের কাছ থেকে এককালীন টাকা ও বার্ষিক খাজনা নিত। এর সিংহভাগ ব্যয় হত তাদের সৈন্যবাহিনী, আর্টিলারিতে।মারাঠা ফায়ার পাওয়ার ও অশ্বারোহী বাহিনী, মুঘল বাহিনী বা অন্য ভারতীয় শক্তির থেকে অনেক শক্তিশালী ছিল।
এখন যে রাস্তা দিল্লি থেকে বেরিলি যাওয়ার পথে গঙ্গা ক্রস করে, সেই জায়গাটার নাম গড়মুক্তেশ্বর। গড়মুক্তেশ্বরের আরো ১০০ কিমি দক্ষিণে, নরোরার কাছে, রামঘাট বলে গঙ্গার কিনারে ১৭৭৪ এর প্রথমদিকে মারাঠা বাহিনী অবস্থান করছিল। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে, যে হাতী, ঘোড়া সহ সৈন্যবাহিনী নিয়ে গঙ্গা পার হয়ে রোহিলাখন্ডে আসা কেবলমাত্র সম্ভব ছিল বছরের একটিমাত্র সময়ে, ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত যখন নদীতে বর্ষার জলও নেই আবার গ্রীষ্মের বরফগলা জলের প্রবাহ শুরু হয় নি।
এবার সবপক্ষেরই আসল চাণক্যনীতির খেলা শুরু। মারাঠারা দূত পাঠাল সুজা উদ দৌল্লাকে যে তারা এক কোটি টাকা পেলে আর অউধের দিকে এগোবে না, গঙ্গা পেরিয়ে নিজের মুলুকে ফিরে যাবে। এই একই সঙ্গে মারাঠারা রোহিলা সর্দারদের সঙ্গে সন্ধি করতে চাইল যে রোহিলারা যদি ৪০ লাখ টাকা দেয় তবে মারাঠারা রোহিলা সর্দারদের রাজ্য ফিরিয়ে দেবে আর রোহিলা সৈন্য নিয়ে অউধ জয় করবে।
এদিকে রোহিলা সর্দার হাফিজ রহমত দূত মারফত সুজা উদ দৌল্লাকে খবর পাঠাল যে অউধ বাহিনী অগ্রসর হয়ে রোহিলাদের সাহায্য করে, মারাঠাদের তাড়িয়ে রোহিলাখন্ডকে স্বাধীন করতে। সুজা উদ দৌল্লা কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে দূত পাঠালেন, কোম্পানির সেনা পাঠাতে, তাকে সাহায্য করতে। এদিকে রোহিলারা মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধির চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিল।
সুজা উদ দৌল্লা পোড় খাওয়া বিচক্ষণ রাজনীতিক। তিনি মারাঠাদের এক কোটি টাকার সন্ধি প্রস্তাবে সম্মত হলেন না, কারণ রোহিলাদের কাছ থেকে চল্লিশ লাখ পেলেও, বাকী টাকা তার কোষাগার থেকে যেত। ১৭৭৩ এর মার্চ মাসে সুজা উদ দৌল্লার অউধ ফৌজ, কোন্পানি ফৌজ সঙ্গে নিয়ে রামঘাটের কাছাকাছি (যেখানে মারাঠা সৈন্যরা অবস্থান করছিল) তার কাছে পৌছে গেলেন, এবং অনোলা (বেরিলির কাছে) হাফিজ রহমত ও জাবিদা খানের বাহিনীকে রামঘাটের দিকে রওয়ানা হওয়ার বার্তা পাঠালেন। কিন্তু এরমধ্যে হাফিজ রহমতের সঙ্গে মারাঠাদের চুক্তি হয়েছিল যে রোহিলারা পয়তাল্লিশ লাখ টাকা দেবে মারাঠাদের, তাদের রাজ্য
ফিরিয়ে দেবে এবং মারাঠাদের অউধ আক্রমণের পথ করে দেবে রোহিলাখন্ডের মধ্যে দিয়ে। এরজন্য হাফিজ রহমত পাঁচ লক্ষ টাকা অগ্রিমও দিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য যে হাফিজ রহমত ১৭৭২ সালে সুজা উদ দৌল্লার সঙ্গেও চুক্তি করেছিল যে অউধকে চল্লিশ লাখ টাকা দেবে, রোহিলাদের মারাঠাদের থেকে রক্ষা করার জন্য।
১৭৭৩ এর মার্চের প্রথমদিকে যখন অউধ ও কোন্পানির মিলিত শক্তি এগোচ্ছে, মারাঠাদের আহ্বানে হাফিজ তার বাহিনী নিয়ে বেরিলি থেকে সারদা নদী পেরিয়ে অনোলা এলেন, কিন্তু ওখানেই ঘাঁটি গেড়ে থাকলেন, ভাবটা এইরকম থাকল যে তিনি মারাঠাদের পক্ষ নিতে আসছেন। এদিকে সুজা উদ দৌল্লাও ভাবলেন রোহিলারা তাকে সাহায্য করতে আসছে।
আবার, ইংরেজ বাহিনীর কাছে কলকাতা থেকে নির্দেশ ছিল যাতে তারা গঙ্গা পেরিয়ে মারাঠাদের না আক্রমণ করে। অপরদিকে মারাঠারা ইংরেজ বাহিনীর ভয়ে রোহিলাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে অউধ আক্রমণ করার যে পরিকল্পনা করেছিল, তা থেকে বিরত থাকল। তারা চটপট ডিশিসন নিল যে রোহিলাদের উপর প্রতিশোধ নেওয়া, যা তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল তা সফল হয়েছে। তাছাড়া গঙ্গা নদী এইসময় পারাপারের উপযুক্ত, তাই মারাঠারা যুদ্ধে না গিয়ে ২২শে মার্চ গঙ্গা পেরিয়ে আবার দেশে ফিরে গেল।
এর পরপরই ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি থেকে সুজা উদ দৌল্লা রোহিলাদের কাছে চুক্তিমাফিক চল্লিশ লাখ টাকা দাবী করলেন। কিন্তু হাফিজ রহমত ও জাবিতা খান, সুজা উদ দৌল্লাকে বোঝাতে লাগলেন মারাঠাদের সঙ্গে তো শেষমেশ যুদ্ধ হলই না। তা ছাড়া তাদের কোষাগারে অত টাকা নেই, মারাঠারা সব লুঠে নিয়ে গিয়েছে। এদিকে সুজা উদ দৌল্লার অবস্থা ত্রিশঙ্কুর মত। তিনি ইংরেজ সৈন্য ডেকে এনেছেন, তাদের যুদ্ধ বাবদ খরচা দিতে হবে, নিজের সেনাবাহিনীর জন্যও টাকা দরকার। তখন সুজা উদ দৌল্লা গোপনে ইংরেজদের সঙ্গে চুক্তি করলেন, তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোন্পানিকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দেবেন, বিনিময়ে ইংরেজ সৈন্য তাকে সাহায্য করবে রোহিলখন্ডকে, অউধের অধীনে করার জন্য।
এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। ১৭৭৩ সালে মারাঠারা ফিরে গেলেও লোয়ার দোয়াবে, এটাও তে তাদের গ্যারিসন রেখে গিয়েছিল। সুজা উদ দৌল্লা বারবার রোহিলা সর্দার হাফিজ রহমত এর কাছে ডিমান্ড করছিলেন দুবছর আগে যে চল্লিশ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল, অউধ বাহিনী, রোহিলাখন্ডকে মারাঠাদের হাত থেকে রক্ষা করবে, সেই টাকা দেওয়ার জন্য। কিন্তু হাফিজ রহমত পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলেন, যদিও তিনি বুঝতে পারছিলেন যদি টাকা না দেওয়া হয়, তবে অউধের নবাব ও ইংরেজ বাহিনীর সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে এটে ওঠা যাবে না। হাফিজ রহমত খান বাকী রোহিলা সর্দারদের চেষ্টা করেও টাকার জন্য রাজী করাতে পারলেন না। এর কারণ সুজা উদ দৌল্লা কয়েকজনকে আলাদা ভাবে দূত পাঠিয়ে বলেছিলেন, যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকতে, তাহালে সুজা তাদের পরগনা সুরক্ষিত রাখবেন। এরপর ১৭৭৪ সালের এপ্রিল মাসে মিরানপুর কাটরা( শাহেজাহানপুর জেলা) তে রোহিলা বাহিনী মাত্র ২৮০০০ সৈন্য নিয়ে সুজা উদ দৌল্লা ও ইংরেজদের লক্ষাধিক সৈন্যর সঙ্গে যুদ্ধ হয়। ইংরেজদের আর্টিলারি আক্রমণে রোহিলারা দাঁড়াতেই পারে নি। হাফিজ রহমত এই যুদ্ধে নিহত হন। ফয়জুল্লা খান (রোহিলাখন্ডের প্রথম শাসক, আলি মহম্মদের জ্যেষ্ঠ পুত্র, যার রিজেন্ট হিসাবে, হাফিজ রহমত রোহিলাখন্ড শাসন করতেন) ও অন্যান্য রোহিলা সর্দাররা পালিয়ে যায় গাড়োয়াল হিমালয়ের তরাইয়ে বিজনোর জেলার লালডাঙের কেল্লায় ( হরিদ্বার থেকে কুড়ি কিনি) আশ্রয় নেয়। ইংরেজ সৈন্য আরো এগিয়ে এলে ফয়জল খান সন্ধি করতে চান। চুক্তি অনুযায়ী, রামপুর ও আশেপাশের ১০০০ বর্গ মাইল জায়গা, হাফিজুল্লা খানকে নূতন রাজ্য স্খাপনের জন্য দেওয়া হয়। বাকী রোহিলাখন্ডের আয়তনের নব্বই ভাগ চলে যায় অযোধ্যার নবাবের হাতে। এছাড়া ফয়জল খান পনের লক্ষ টাকা সুজা উদ দৌল্লাকে দিতে রাজী হন। ইংরেজরা এতে সম্মত হল, কারণ রোহিলাখন্ড ছাড়া উত্তর ভারতে, অউধ, দিল্লি, আগ্রা সবই বক্সারের যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পরোক্ষ অধীনে ছিল। রোহিলা যুদ্ধের পর উত্তর ভারতে ইংরেজদের হাত আরো শক্ত হল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এর পর থেকে সারা ভারতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু করে। মারাঠা প্রতিপত্তি এই সময়ের পর থেকে কমতে থাকে।
রোহিলা সর্দাররা যুদ্ধে হেরে হরিদ্বারের কাছে পাহাড়ে ছিল এবং রাজ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল। এই সময় সুজা উদ দৌল্লা অসুস্থ ছিলেন। পরের বছরই তার মৃত্যু হয়। তাই তিনিও চাইছিলেন রোহিলাদের সাথে সমঝোতায় আসতে। ৭ই অক্টোবর ১৭৭৪ সালে সন্ধি চুক্তি স্বক্ষরিত হয় ও রোহিলাখন্ড রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে ও ব্রিটিশ অধীনস্থ রামপুর রাজ্যের জন্ম হয়। রামপুর ব্রিটিশ অধীনস্থ এক করদ রাজ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা লাভ অব্দি। এইভাবে রামপুর চলে আসে অবিভক্ত ইউপির অধীনে। ওয়েস্টার্ন ইউপির যে বিশাল মুসলীম বেল্ট আছে তার পূর্বসুরীরা বেশীরভাগ ছিলেন আফগান রোহিলা।
রামপুর ফ্ল্যাগ অউধ ফ্ল্যাগ



















Comments
Post a Comment