অভিধানে নেই! (রম্যরচনা)

 


অভিধানে নেই (পর্ব )

ফ্লিককার্টে একটা আলমারি অর্ডার করেছিল গিন্নি। এখন আর সেই পেল্লাই জিনিষ কষ্ট করে লিফ্টে না ঢোকান গেলে, সিঁড়ি দিয়ে টেনে তোলার কারবার নেই। সিঁড়ির ল্যান্ডিং দিয়ে ঘোরাবার সময়, কোণায় লেগে গেল কিনা সে চিন্তা নেই। কয়েকটা প্যাক করা ফ্ল্যাট পিস ডেলিভারী করে দেবে। আমারও সে রকম একপিস এল। আজকাল মাল্টিটাস্কিং। ডেলিভারি বয়ের সঙ্গে টুলকিট। এইটুলকিটব্যাপারটাও এই রচনার অঙ্গ। তবে বক্তব্য ভিন্ন। ক্রমশঃ প্রকাশ্য। যাক ছেলেটি জানাল এখনই সে ফিট করে দিতে পারে, বা লিখে দিলে পরে কেউ এসে করে দেবে। যে ঘরে আলমারি থাকবে, সেটার হোয়াইটওয়াশ চলছে। তাই লিখে দিলাম দুদিন পর এস্যেম্বলি করার জন্য। আজকাল সব কোম্পানির কাস্টমার কেয়ার ফোন ছাড়া হোয়াটস এ্যপ চ্যাটের ব্যবস্থা রেখেছে। পরের দিন ফ্লিপকার্টে ফোন করা হল। যে কোম্পানির আলমারী তাদেরকেও চ্যাট করে বল্লাম দুইদিন পর লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। তারপর থেকে মাঝে ফোন আসছে ফ্লিপকার্ট থেকে, লাগান হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করে। লেটেস্ট ফোন মেসেজ অনুযায়ী জানা গেল যেহেতু এস্যেম্বলি কমপ্লিট, তাই ফিডব্যাক দিতে হবে। এমনি কি কার্পেন্টারের বিহেভিয়ার ঠিক ছিল কিনা তাও জিজ্ঞাসা কর ফেলল। রেগে মেগে আমার বঙ্গহিন্দিতে বল্লাম -‘দিবাস্বপ্ন দেখতে হো কেয়া, আভিতক কোই আয়া নেহি।কলসেন্টারের ছেলেপুলেরা ট্রেনড। অনেক সরি টরি বলে বল্ল - ‘এখুনিটিকিটরেজ করে দিচ্ছি। ট্রেনের টিকিট প্লেনের টিকিট কি সিনেমা হলের টিকিট কাটতে হয় শুনেছিটিকিট raise’ টা কি ব্যাপার। ভাবলাম ফিটিং এর জন্য আলাদা দক্ষিণা আছে, তারই টিকিট কাটতে বলছে। আমাকে বুদ্ধু বানানো? কেনার আগে দেখে নিয়েছি ফিটিং ফ্রী। গলাটাকে বেশ গম্ভীর করে বললাম-‘কোই টিকিট নেহি কাটেগা- হাম জানতা হ্যায় লাগানে কা চার্জ নেহি হ্যায় ছেলেটি আমায় আশ্বস্ত করে জানালটিকিট raise’ মানে কমপ্লেন রেজিস্টার করা।

এরকম আরেকটা টার্মঅফরোডিং কয়েকমাস আগে গাড়ী কেনার আগে, ইউ টিউব খুলে সব কোম্পানির গাড়ীর রিভিউ দেখছিলাম। তাতে বেশ কিছু রিভিউতে দেখি বলছেগাড়ীকা অফরোডিং আচ্ছা হ্যায়  সুইচ অফ করে রোডে দাড়িয়ে পড়লে কি আচ্ছা হবে বুঝতে পারছিলাম না।  পরে জানা গেলঅফরোডিংব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, রাফ রোডে গাড়ীর পারফরমেন্স।

অফলোডিং বলতে জানা ছিল কার্গো থেকে মাল আনলোড করা। মোবাইলের অনাবশ্যক এ্যপস গুলো ডিলিট করাকে নাকি অফলোডিং নাম দেওয়া হয়েছে। শিশুর জন্মগ্রহনকেও আজকাল বলা হচ্ছেসন্তানসম্ভবা মা অফলোডিং করেছেন।বুঝুন ব্যাপারটা শিশুর জন্মগ্রহনের মত আনন্দঘন জিনিষ হয়ে গেল গাড়ী থেকে মাল নামানর মত নীরস ঘটনা। একধরণের শব্দের সমাহারের অভিধানের নাম হওয়া উচিতশব্দকল্পদ্রুম’!


প্রথমবার বাংলাদেশে পদার্পন। গাড়ীতে যাচ্ছি এয়ারপোর্ট টু বনানী। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম - ‘কত ডিসট্যান্স?’ জানাল১৫ কিলো ব্যাপার কি? চালের ওজন বলছে নাকি। থাকতে থাকতে বুঝলাম, ওখানে কেউ কিলোমিটার বলে না। দূরত্বওকিলো’, ওজনওকিলো’! একেই বলে কেলোর কীর্তি! পরে এই ধরনের সংক্ষিপ্ততার আরো পরিচয় পেয়েছি। ইউনিভার্সিটিকে সংক্ষেপে বলেভার্সিটি ভার্সেটাইল ক্যালি!

কলেজে পড়ার সময়মাসকাটশব্দটা খুব পপুলার ছিল। ইংরাজী বাংলার যৌথ সমাহার।মাসমানে জনগন আরকাটহল গিয়ে কেটে পড়া। এই একটা ব্যাপারে ছাত্রদের মধ্যে বেশ ঐক্যভাব ছিল। দল মত, জেন্ডার নির্বিশেষে, এসএফআই কি ডিএসএফ, ফার্স্ট বয় টু লাস্ট বয় সবার সম্মতি থাকত। চাকরীতেও যেমাসকাটহয় সেটা আমার মেয়ের কাছ থেকে জানলাম। সেটা অবশ্য খুব কমই হয়ে থাকে, যদি কখনো পরপর তিনটে ছুটি থাকে, তবে সেই প্রোজেক্ট্ যারা যারা কাজ করে, আগে থেকে ডিসাইড করে দিনটা সবাই ছুটি নেয়।রেসপ্ক্টেবলকর্পোরেট অফিস। তাইমাসকাটএর সন্মানীয় নাম দেওয়া হয়েছে। একে বলা হচ্ছেকালেক্টিভ ডিসকানেক্ট 

কর্পোরেট সেক্টরের এরকম আরেকটা গালভরা ফ্রেজ পাওয়া গেল - ‘সেভিং দ্য ডে লাইট কেউ যদি ভেবে থাকেন সরকারের তরফ থেকে আপনাকেবিজলী বচতএর জন্য এ্যওয়ার করছে তাহালে তিনি একদমইঅফ দ্য মার্ক এটা সাধারনত আইটি সেক্টরে ব্যাবহার হয়ে থাকে। ধরুন ক্লায়েন্ট এমেরিকার। তারা হয়ত ভিডিও কনফারেন্সিং কোন এক সময়ে শুরু করল। ইন্ডিয়ান কোম্পানিতে যারা সেই প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত, তারা কিছু সময় পরে জয়েন করল, সে ক্ষেত্রে বলা হবে ইন্ডিয়ান কাউন্টার পার্টরাসেভিং দ্য ডেলাইটকরছে। 

এরকম আরেকটা নূতন টার্ম শুনলাম মেয়ের কাছে। সেটা হলশাউট আউট প্রথমে ভাবলাম এটা বোধহয় কলিগকে প্যাঁক দেওয়ার নূতন টার্ম। মেয়ে খোলসা করল-ব্যাপারটা আদপেই তা নয়। বরঞ্চ উল্টোটাই। টিমের কেউ যদি ভাল কাজ করে, তবে বাকী কলিগরা তাকেশাউট আউটকরে বাহবা দেয়।

আজকাল ইংরাজী অনার্স করেও অনেক মেয়ে আইটি সেক্টরে চাকরী করে। প্রথমে ভাবতাম, ইংরাজী অনার্সের সাথে সফ্টওয়ারের কি সম্পর্ক? এইসব টার্মিয়নলজি থেকে বোঝা যাচ্ছে কেন ইংরাজী অনার্সদের কর্পোরেট অফিসে নেওয়া হচ্ছে। এদের পোষাকী নামকনটেন্ট রাইটার

হোয়াটস্ এ্যপের কল্যাণেলোলকথাটির সঙ্গে সবাই পরিচিত হচ্ছে। প্রথমদিকে ভাবতামলে হালুয়া ইংরাজী সংস্করন লোল, পরে শুনলাম এটার মানে হললাফ আউট লাউড লাফিং ব্যাপারটা বেশ পপুলার হয়ে উঠেছে। ধর্মগুরু থেকে ম্যানেজমেন্ট গুরু সবাই শিক্ষা দিচ্ছেন -‘সিচুয়েশন যেমনই হোক, ভেঙে পড়া যাবে না, এ্যটিচুড পজিটিভ হতে হবে, ‘লাউড লাফনা হলেও চোরা হাসি ঠোঁটের কোনে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। হাজার দুঃখেও চোখের জল ফেলা যাবে না। এটাও একধরনেরভাবের ঘরে চুরি মাঝে খুব শুরু হয়েছিল শহরাঞ্চলের পার্কে সকালে মরনিং ওয়াক সেরে আবালবৃদ্ধবনিতা, গোল হয়ে তালি বাজাতে বাজাতে পিলেচমকানো অট্টহাসি।রামগরুরের ছানা উল্টো সংস্করণ। 

এএসএপি আর এফ ওয়াই  আই, এই দুটোও আজকাল হোয়াটস্ এ্যপে চলছে। অফিসের নোটশীটে দুইটারই বহুল ব্যবহার দেখেছি। এসএস পি হল গিয়েএজ শুন এজ পসিবল’, আর এফ ওয়াই আই হল গিয়েফর ইয়োর ইনফরমেশন দ্বিতীয়টা হল গিয়ে বেশ ডাইসি রিমার্ক। বস যখন কনফিউসড থাকেন এই রিমার্কটি করে থাকেন। ধরি মাছ না ছুঁই পানিটাইপের কমেন্ট। তলার লোকটি তার বিদ্যেবুদ্ধি অনুযায়ী ডিসিশন নেবে। হেড আই উইন, টেল ইউ লুস। কাজ ঠিকঠাক নামলে বসের কৃতিত্ব, ভুল হলে তলার লোকের ঝাড়।

ক্রমশঃ


পর্ব

চাকরী জীবনে বসকে “ইয়েস স্যার” বলা বহুল প্রচলিত নীতি। চাকরিতে উন্নতির প্রথম সোপান। আজকাল এর একটা প্রতিশব্দ খুব ব্যাবহার হচ্ছে। টিভিতেও, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের সিরিজে বিশেষত এ্যকশন ওরিয়েন্টেড এপিসোডে খুব শোনা যায়। এটা হল “কপিড”। বস রিমোট লোকেশন থেকে কোন  ফ্রন্ট টিমকে ফিল্ডে এগোনোর নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন নির্দেশের প্রত্যুত্তরে “ইয়েস স্যার” এর বদলে বলা হয় “কপিড”।

মাস আটেক আগে, কাগজে কিছুদিন  খুবটুলকিট কান্ডনিয়ে হৈচৈ হল। টুলকিট তো জানা ছিল গোদা বাংলায় মেকানিক বা ইঞ্জিয়ারদের অস্ত্র। ইঞ্জিনিয়ারের বাংলা, বাংলাদেশে গিয়ে জেনেছিলাম। ওখানে বলা হয় প্রকৌশলী।মারি অরি পারি যে কৌশলেটুলকিটহচ্ছে প্রকৌশলীর কুশলতার অস্ত্র। এখনব্লু কলারযুগে টুলকিটের কর্মদক্ষতা সন্দেহের পথে। ডিজিটাল মাধ্যমেটুলকিটব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যাপারটা একটু খোলসা করা দরকার। হঠাৎ খবরের কাগজের শিরোনাম, সদ্য কলেজ পাশ করা একটি মেয়ে, নাম তার দিশা রবি, দিল্লি পুলিশ রাতারাতি তাকে ব্যাঙ্গালুরু থেকে তুলে এনেছেটুলকিটকেসে। দিল্লির ফার্মার প্রটেস্ট কেসে নাকি এই টুলকিট ব্যবহার করে দিশা রাস্ট্রদোহিতা করেছে। পুলিশ বলছে গুরুতর অপরাধ। আমি ভাবছি ২২ বছরের কলেজের মেয়ে কি লাঙল চালাল, না কাস্তে ধরে প্রতিবাদ মিছিলে সামিল হয়েছিল, যে পুরো কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়ে গেল। পরে খোলসা হল পার্থিব জগতের প্রতিবাদ আর ডিজিটাল মিডিয়ামের প্রতিবাদের মধ্যে তফাতখানা। ধরুন, এই কৃষক আন্দোলনে আপনি পামফ্লেট ছড়িয়ে লোক যোগাড় করলেন পদযাত্রা করতে বা মোমবাতি নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করলেন। এরকমটা যদি আপনি ডিজিটাল মিডিয়ামে করতে পারেন, অর্থাৎ সোশাল মিডিয়ামে এমন কিছু কৌশল তুলে ধরলেন, যাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নেটিজেনরা আন্দোলনকে আরো জোরদার করবেন। এটাকেই বলা হচ্ছে টুলকিট। সাদা বাংলায় -‘অগ্নিতে ঘৃতাহুতি।

বাংলাতে এরকম একটা প্রচলিত ইডিয়াম হলকেস খেয়ে গিয়েছি।মানে দাঁড়াল কোন একটা বেঁফাস কাজ করে ফেঁসে গিয়েছেন। আমাদের সময় কলেজে আরেকটা ওয়ার্ড খুব চলত। সেটা হচ্ছেব্যাপকব্যাপক ঝামেলামানে বেশ ভাল রকম গন্ডগোল।

শৌচালয়বাবাথরূমসর্বসমক্ষে বল্লে, আশেপাশের লোকজনের ভ্রুকুটির সন্মুখীন হওয়া অনিবার্য। যদিপায়খানাবলেন, তবে আপনার সামনের সুন্দরী মহিলাটি নাকে রুমালচাপা দিয়ে আপনার সামনে থেকে ছিটকে যাবেন।  প্রথমদিকে দেখতাম রাস্তার পাশের বাথরুমে লেখা থাকতপাবলিক কনভেনিয়েন্সঅথবাল্যাভেটরি। এটা কিছুটাআম আদমী ব্যাবহৃত শৌচালয়ের ইংরাজী সংস্করন। বড় হোটেল বা এয়ারপোর্ট বা মলে যেখানে সামাজিক মর্যাদায় কৌলীন্যবহনকারী জেন্ট্রীর আনাগোনা, সেখানে গেলে লেখা পাবেন   ‘ওয়াশরুম’,  আজকাল রিফাইন্ড হয়ে ওটা দাঁড়িয়েছেরেস্টরুম’ , যেরকম রিফাইনমেন্ট চলছে এরপরের নামগ্রুমিং রুমহলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আগে মহিলা/পুরুষের আলাদা টয়লেট বোঝানোর জন্য লেখা থাকতলেডিস’/‘জেন্টসবামেন’/‘ওমেনআজকাল লেখা থাকেহিজ’/‘হার দিল্লি এয়ারপোর্ট আবার এক কাঠি উপরে। সেখানে খালি ছবি, ইস্কাবনেররাণীকিরাজা লিপিমালা উদ্ভাবনের আগে মানুষ ব্যবহার করত চিত্রলিপি। আধুনিক যুগে আবার সেই চিত্রলিপির প্রয়োগ। 

হ্যান্ডিক্যাপডকথাটা আজকাল প্রয়োগ হয় না, এরপর এলফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জডআজকাল বলা হয়ডিফারেন্টলি এবেলড

ইদানীং কালে মল থেকে শপিং করাটা মধ্যবিত্তদের জন্যও বেশ পপুলার। জিনিষ সব থরে থরে সাজানো। দেখতে থাকুন, পছন্দ হল ট্রায়াল রুমে ঢুকে ট্রাই করুন। পছন্দ না হলে, ওখানেই ফেলে রেখে গটগটিয়ে বেরিয়ে আসুন। নো গিল্টি ফিলিং।সিং ইজ কিংনয়, জমানায়কাস্টমার ইজ দি কিং যাক সে কথা যেটার জন্য মলের অবতারণা সেটা হচ্ছে, মলের টংএ (সেই ঘনাদার টংএর ঘরের কথা মনে পড়ে গেল) থাকেফুড কোর্ট কোর্ট কাছারী থেকে পাবলিক শতহস্ত দূরে থাকে। কিন্তু এই কোর্ট বিশেষ পপুলার, - চাইনিজ থেকে মেক্সিকান, মাটন রেজালা থেকে ধোসা, বিরিয়ানী টু ব্যারিস্টা, সব পাওয়া যাবে। আগেফুড জয়েন্টবেশী শোনা যেত। ফুড কোর্টটা হালফিলের। নামকরণের পিছনে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে যেটা সবচেয়ে এপ্রোপ্রিয়েট মনে হচ্ছে সেটা বলি। মলে ইয়াং জেনট্রি বেশী, জোড়ায় জোড়ায় শপ হপিং করে করে বেড়াচ্ছে। আলতো ভাবে হাত ধরে এক গ্লাস মিল্কশেক দুদিক থেকে দুইজন খেতে খেতে চারচক্ষুর মিলন, সেটাকেইকোর্টশিপবলে। তাই নাম হল ফুড কোর্ট। পাঠকের জন্যফুড পর থট 

দেবদত্ত 

২৪/১০/২১

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments