টিকটিকির ল্যাজ (রম্যরচনা)


 টিকটিকির ল্যাজ

টিকটিকির কান্ডকারখানার সঙ্গে আমার পরিচিতি ছোটবেলা থেকে। ঝাড়গ্রামে আমাদের একতলা বাড়ীর দরজা, জানালা সবসময় খোলা থাকত। সেইসব কালে নেটের খুব একটা প্রচলন ছিল না। তাই মশা, মাছি, পোকা, টিকটিকির ভিসা ফ্রী এনট্রি ছিল। আজকাল কর্ত্রীর ইচ্ছেয় কর্ম। তাই ফ্ল্যটের দরজা, জানালাতে আলাদা নেটের আস্তরণ শুদ্ধ এডিশান্যাল দরজা জানলা। তার সঙ্গে নিয়মিত হিট স্প্রে করার ফলে পোকা-মাকড়, মশা টিকটিকির জন্য, আমার ফ্ল্যটের চৌকাঠ মেক্সিকো-এমেরিকার বর্ডার। 

জঙ্গলে যেমন নদী বা ডোবার পাড়ে জল খেতে, খাদ্য বা খাদক সবরকম প্রাণী ভীড় করে, তেমনি ছোটবেলায় ঘরের টিউবলাইটের আশেপাশের দেওয়ালটা নানারকম পোকা মাকড় আর টিকটিকির চারণভূমি ছিল। পাঠ্যপুস্তক পড়তে পড়তে প্রায়ই চোখ চলে যেত দেওয়ালে। এটা কিছুটা এট্যেনশন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রেম বলা যায়, যদিও গল্পের বই পড়ার সময় সেটা ঘটত না। টিকটিকি গুলো ঠিক কুমীর যেমন নদীর পাড়ে রোদ পোহায়, তেমনি করে নিশ্চল হয়ে দেওয়ালের গায়ে সেটে থাকত। পোকা-টোকা কাছাকাছি এলেই কপাৎ করে খেয়ে ফেলত। টিকটিকির এই শিকার পদ্ধতির অনুকরণ হালফিলের গোয়েন্দারা করে থাকেন, তাই লোকজন গোয়েন্দাদের নাম দিয়েছেটিকটিকি যা হোক বেশ কয়েকটা পোকার দফারফা করার পর টিকটিকি গলা ফুলিয়ে টকটক করে ডেকে উঠত, বলা যায় কিছুটা আমাদের পরিতৃপ্তি সহকারে ভোজনের পর ঢেঁকুর তোলার মত। 

আজকাল একটা জিনিষ লক্ষ করছি। ডারউইন সাহেব বলতে পারবেন ক্রমবিবর্তনের সঙ্গে টিকটিকির এহেন আচরণের কোন সংযোগ আছে কিনা। ছোটবেলাতে দেখতাম টিকটিকিগুলো বাড়ীর ভিতর দেওয়াল ধরে ঘোরাফেরা করে। সাম্প্রতিক কালে ফ্ল্যাটের দরজা-জানালার জাল ভেদ করে ঘরের ভিতর টিকটিকির আগমন দুঃসাধ্য। তাও কচ্চিৎ কদাচিৎ দুই-একটা টিকটিকি ঘরে ঢুকে পড়ে। তবে তাদের চলাফেরা দেখছি ভার্টিকাল থেকে হরাইজন্টাল হয়ে গিয়েছে। মেঝেতেই তাদের চলাফেরা। 

টিকটিকি কাহিনীর ল্যাজের দিকে এসে পড়েছি, তাই টিকটিকির ল্যাজের কথা দিয়েই মধুরেণ সমাপেয়ত করব। বাড়িতে যখন লাইট আসে নি, ক্লাস থ্রী পর্যন্ত, ততদিন টিকটিকির সংখ্যাধিক্য ছিল না। টিউবলাইট আসার পর পর্যাপ্ত ভোজনে তাদের বংশবৃদ্ধি ঘটতে লাগল। টিকটিকি তাড়ানোর ভার আমার উপর পড়ল। তখনকার দিনে ঝাড়গ্রামে খুব চোরের উৎপাত ছিল। বাড়ীতে মোটাসোটা তেল মাখানো বাঁশের লাঠি ছিল। রোজ শুতে যাবার আগে বাবা লাঠি দিয়ে খাটের তলায় খোঁচা মারত, বাইচান্স যদি কোন চোর লুকিয়ে থাকে। তখন শোনা যেত যে অন্ধকারের সুযোগে সন্ধ্যাবেলা চোর ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। বাবা লাঠিটাকে তলায় ঢোকালেই, আমি ভয়ের চোটে চোখ বন্ধ করে খাটে শুয়ে থাকতাম, মনে হত এই বোধহয় চোর খাটের তলা থেকে হাউমাউ করে বের হয়ে আসব। তবে সেই দুর্ভাগ্য কোনদিন হয় নি। ওই লাঠি কাজে লাগল আমার টিকটিকির সঙ্গে ট্যাকটিকাল ওয়ারফেয়ারে। প্রথমদিকে টিকটিকিগুলোর কাছাকাছি লাঠির বাড়ী মেরে তাদের ভয় দেখাতে লাগলাম। প্রথমদিকে অল্পস্বল্প কাজ হতে লাগল। কিছুদিন পরে লাঠির শব্দের ভয়ের থেকে উদরপূর্তির ইচ্ছেটাই টিকটিকি বাহিনীর কাছে বেশী আকর্ষনীয় বলে মনে হল। পরিস্থিতি যে কে সই। এটা ক্লাস ফাইভ-সিক্সের কথা। ততদিনে আমি টেনিদার বেশ অনেক গল্প পড়ে ফেলেছি। এটার মধ্যে একটা গল্প ছিলটিকটিকির ল্যাজ 


যতদূর মনে পড়ছে গল্পটা ছিল কিছুটা এই রকম ফুটবল ম্যাচের আগে টেনিদা মাকালীকে পুজো দিতে গিয়েছিল। জিতলে পর, প্রথমে পাঁচসিকে পুজো দেবে পরে কমিয়ে পাঁচআনা বলাতে কালীঠাকরুণ বোধহয় টেনিদার উপর রুষ্ট হয়েছিলেন। তাই প্রসাদী জবার বদলে টেনিদার মাথায় পড়েছিল টিকটিকির ল্যাজ! তখনই জানলাম টিকটিকির ল্যাজ বলা যায়, টিকটিকির এপেনডিক্সের মত। ল্যাজ খসে গেলেও টিকটিকি দিব্যি বেঁচে থাকে এবং পরে ধীরে ধীরে আবার ল্যাজ গজায়। প্রসঙ্গত পটলডাঙ্গার দল সেই ম্যাচে হেরে গিয়েছিল। 

টেনিদার থেকে শিখে আমিও টিকটিকি যুদ্ধের স্ট্রাটেজি চেঞ্জ করে ফেললাম। ততদিনে টিকটিকি বাহিনী বুঝে গিয়েছে লাঠির ঠকঠক আওয়াজ, শূন্য কলসীর ঠকঠক আওয়াজের মত, ওতে খালি ওইভারত মাতা কি জয়এর মত ওয়ার ক্রাই আছে কিন্তু আসলি দম নেই। শত্রুপক্ষের ভালনারেবল পয়েন্ট হল তাদের পিছনদিকটা। চোখটা থাকে সামনের দিকে। তাই অতর্কিতে পিছন থেকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি থাকে না। শুরু হল আমার ব্যাক স্ট্রোক। ল্যাজটাকে তাক করে ডান্ডা মারা, যতটা সোজা মনে হচ্ছে তা কিন্তু না। দিন কয়েকের চেষ্টায় সফলতা প্রাপ্তি ঘটল। দুই তিনটে টিকটিকির ল্যাজ খসাতে পারলাম। সবচেয়ে মজা হচ্ছে, লেজগুলো বেশ অনেক্ষণ ধরে লাফাতে থাকে। লেজবিহীন টিকটিকি গুলোর তখন বেশ ল্যাজে-গোবরে অবস্থা।  বেশ ভীত চোখে তারা নিরীক্ষণ করতে থাকল তাদের ল্যাজের দূরাবস্থা। বিনা রক্তপাতে যুদ্ধজয়ের দোরগোড়ায় পৌছে গেলাম! মুকুটহীন রাজার মত, ল্যাজহীন টিকটিকির দল কিছুদিনের মত রণে ভঙ্গ দিল। বিনা রক্তপাতে বিজয়ী। এই হল আমার টিকটিকি ট্যাকটিকস এর কাহিনী

দেবদত্ত 

০১/০৯/২০২১

Comments

  1. বাঃ, টিকটিকির টুকিটাকি ঘটনা বেশ ব্লগবন্দী করেছিস!

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments