কাকসমগ্র (রম্যরচনা)
কাক সমগ্র
‘কাকস্য পরিবেদনা’! অর্থাৎ কিনা সংসারে কে কার বেদনার খবর রাখে। কিন্তু, সত্যি বলতে কি, কাকের বেদনা বিদ্ধ করছে আমার কলমকেও। তাই সমবেদনা জানাতে উদ্যোগী হয়েছি। কালো বলে কি তাকে পক্ষী সমাজে ব্রাত্য করে রাখতে হবে? এ কি রকম ‘বিধির বিধান’? এই ‘বিধিলিপি’ খন্ডাতেই আজকের এই ‘খন্ডিত’ কাহিনী। ‘কালো জগতের আলো’ বা ‘কালো যা সে যত কালোই হোক, আমি দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ’, এ কি খালি কবিতার লাইন হয়ে থাকবে নাকি কালো কাককে ‘তার আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার’, এই ধ্বনি প্রতিদ্ধনি হয়ে দিকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়বে। তাই আজকে আমার কাককুলের জন্য ‘ ফাইট ফর জাস্টিস’ মোমবাতির আলোর মিছিলে না হোক, কলমের কালিতে কিছু ওকালতি করবার দুর্মর ইচ্ছে জেগেছে।
স্কুলজীবনে রচনা লিখতে হত। বাংলাতে লিখতে হলে সাজিয়ে গুজিয়ে কিছু গোঁজামিল দিয়ে খাড়া করা যেত, ইংরাজীতে লিখতে হলে মুখস্থবিদ্যার বাইরের গেলে খাড়াঁর কোপের অশংকা। আশেপাশে যেসব জিনিস সচরাচর দেখা যায়, যেমন ধরা যাক গরু, ঘোড়া, নদী, গ্রাম ইত্যাদি মিডল স্কুল লেভেলে রচনার বিষয়বস্তু থাকত যাতে প্রশ্নপত্র নিয়ে বিষম না খেতে হয়। এরকমই এক অতিপরিচিত পাখি হল কাক। লোকালয়ের সঙ্গে কাকের সখ্যতা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্ত তাকে নিয়ে সাহিত্য বা পূজাআর্চা কিছুতেই সে কল্কে পায় নি। ছোটবেলাতে মাছের কাঁটা বা উচ্ছিষ্ট, ছাইয়ের গাদায় ফেলার সময় দেখতাম কাকের দল সতৃষ্ণ নয়নে ঘুরঘুর করছে আশেপাশে। চুকিতকিতের মত সেফ ডিসট্যান্সে থেকে খাবার খাওয়ার চেষ্টা। হুশ হুশ করে তাড়াতে গেলে কাকগুলো ঠিক অপটিমাম দূরত্ব বজায় রেখে সুযোগসন্ধানীর মত চেয়ে থাকে।
কাক হচ্ছে ক্যারভিডি শ্রেনীর পাখি। এরা সর্বভুক। আমাদের খাবারের উচ্ছিষ্ট থেকে শুরু করে মরা ইঁদুর, টিকটিকি সবই খেয়ে থাকে। বলতে পারা যায় তারা মনুষ্য সমাজে জমাদারের দমদার কাজটা করে থাকে, যদিও তার ক্রেডিট দিতে আমরা অপারগ। কাক ও কলকাতা, নামের মিল তো আছেই, আর কোন ভারতের শহরে এত কাকের সমাহার নেই, নন-ভেজ আহার এর কারণ মনে হয়। সকালে ঘুম ভাঙে কাকের কর্কশ কা কা ডাকে। সেই থেকে কাকভোর কথাটার উৎপত্তি। ময়ূরের ডাকও তথৈবচ কর্কশ, কিন্তু সে জাতীয় পাখির শিরোপা পেয়েছে তার চেহারা ও পেখমের সৌন্দর্যতায়। ‘সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র’ বা ‘আগে দর্শনধারী পরে গুণ বিচারী’ এই প্রবাদবাক্যগুলির সার্থকতা ময়ূরের তকমা দেখেই অনুধাবন করা যায়।
বিধাতা গায়ের রং কালো দিলেও, কাককে একজোড়া সুন্দর চোখ দিয়েছেন। ‘কাকচক্ষু’ জল কথাটা তো কাকের চোখের কথা ভেবেই উৎপত্তি। কাকের স্বচ্ছ চোখের সঙ্গে নিস্তরঙ্গ গভীর পুকুরের জলের তুলনা। গরুর নিষ্পাপ চোখ নিয়ে সাহিত্যকর্ম হয়েছে, কিন্তু কাকের চোখের গভীরে গিয়ে সাঁতরানোর মত কোন কবি পাওয়া যায় নি। মাছের চোখ থেকে ‘মীনাক্ষী’, হরিণের চোখ থেকে ‘এণাক্ষী’ এরকম নাম আকছার বাঙালী মেয়েদের মধ্যে পাওয়া যায়, কিন্তু ‘কাকাক্ষী’ নাম কাউর আছে বলে শুনিনি।
এতো গেল বহিরঙ্গের কথা। কাকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় সেই জাতকের গল্প থেকে। তৃষ্ণার্ত কাক একটু জলের আশায় উড়ে বেড়াচ্ছে। জল অবশেষে মিলল, কিন্তু সে তলানিতে, কাকের ঠোঁটের নাগালের বাইরে। বুদ্ধিমান কাক। ঠোঁটে করে ছোট ছোট নুড়ি এনে কলসীর মধ্যে ফেলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর জলের লেভেল বেড়ে গেল, কাকেরও তৃষ্ণা মিটল।
আস্তাকুড়ে ঘাটাঘাটি করলেও কাক কিন্তু নিজে পরিষ্কার থাকতে ভালবাসে। তার অন্যতম প্রিয় আকর্ষণ সাবান। পুকুর বা নদীর ঘাটে গোসলরত লোকজনের সাবান পলকে চুরি করে নিজের পালক পালিশ করতে কাক ওস্তাদ। তবে কাকের দুর্নাম আছে যে সে তার বাসা যেমন তেমন করে বানায়, বাবুই পাখির বাসার ধারে কাছেও নয়। সেই থেকে উস্কোখুস্কো চুলকে বলা হয় ‘কাকের বাসা’। তা বাসা যেমনই হোক, কোকিল তাতেই ডিম পেড়ে যায়। সুতরাং কাকের স্নেহময়ী মাতৃরূপ কোন ‘কাকতালীয়’ ঘটনা নয়।
তবে হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী পিতৃপক্ষে তর্পনের পর কাককে খাওয়ানোর নিয়ম আছে। গয়ায় পিন্ড দিতে গিয়ে, গরু খাওয়াতে গিয়ে শিং এর গুতোর হাত থেকে রক্ষা আর কাক খুঁজতে হয়রানির কথা বেশ মনে আছে।
সম্প্রতি কাকের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পেতে কিছু রিসার্চ হয়েছে যা থেকে জানা যাচ্ছে কাকের ‘গ্রে ম্যাটার’ বেশ উঁচুদরের। ২০০০ সালে কেমব্রিজে আ্যবেল নামে এক পুরুষ কাক ও বেটি নামের এক মেয়ে কাকের বুদ্ধির পরীক্ষা। একটা স্বচ্ছ কাচের ডাকে কয়েক টুকরো মাংস রেখে তার পাশে পাতলা একটা লোহার হুক রাখা ছিল। এ্যবেল বেশ সহজেই হুকের সাহায্য মাংস তুলে নিতে সক্ষম হল। বেটির বেলায় খালি একটা সোজা তার রাখা ছিল। বেটি বেশ কয়েকবার চেষ্টায় একটি টুকরো তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু বেটি হাল না ছেড়ে দিয়ে তারটার একটা দিক বাকিয়ে নিতে সক্ষম হয় এবং সেটার সাহায্যে বাকী টুকরো গুলো সহজেই তুলে নেয়। সংসারের কূটকাচালিতে মেয়েদের বুদ্ধি, ছেলেদের তুলনায় বেশী তার অনেক প্রমাণ আছে, তাই বাকী জাগতিক কর্মেও এরকম কোন পরীক্ষা করে দেখলেও মেয়েরা বুদ্ধিতে বাজিমাত করবে । ইউপি তে কলেজে মেয়েদের আলাদা কোটা বন্ধ হয়ে যাবে যদি সত্যিটা বেরিয়ে পড়ে!
কাকের এই বুদ্ধিমত্তা পুরাকালেও ছিল। ‘কাকভুষূন্ডী’ হচ্ছে পুরাণে কল্পিত ত্রিকালদর্শী কাক। সুনীল গাঙ্গুলি লিখেছিলেন ‘কাকাবাবু সমগ্র’। আমি তার একান্ত গুণমুগ্ধ পাঠক। তবে আমার দৌড় ‘কাক সমগ্র’ পর্যন্ত। গুরু-শিষ্যের বিভেদ থাকবেই তো, গুরুমারা বিদ্যেতে আমার হাতযশ নেই!
দেবদত্ত
২৪/০৯/২১

Comments
Post a Comment