প্রতীক চিহ্ন (রম্যরচনা)


 প্রতীক চিহ্ন

আমাদে দেশে যেসব জনসাধারণ ভোটপ্রয়োগের মাধ্যমে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠনের ফয়সালা করে থাকেন, তারা বেশীরভাগই স্বল্পশিক্ষিত। তাই আগেকারকালের সাংকেতিক চিহ্নের মত ইলেকশন সিম্বলের আবির্ভাব। তবে এই সিম্বল অথবা লোগো বানাবার জন্য অনেকদিক বিবেচনা করতে হয়। সিম্বলটা এমন একটা কিছু হতে হবে, যা সহজেই মোটাবুদ্ধির মাথাতেও ঢুকে যায়। ব্যালট বাক্সে ছাপ মেরে ফেলার সময় কাউর সাহায্য পাবার উপায় নেই। তাই এটাকে এক তো বোধগম্য হতে হবে, আবার সেটা এমন কিছু হতে হবে, যেটা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কোন না কোনভাবে যুক্ত। মানে আপনি যদি আফ্রিকার জিরাফকে সিম্বল করেন তবে রুরাল পপুলেশনের মাথায় না ঢোকারই কথা, গরু, ছাগল, মুরগী চলতে পারে। এইসব গৃহপালিত জন্তু সব প্রদেশেই আছে, কিন্তু ময়ূর কি উট সিম্বল হিসাবে চালান মুস্কিল, কারণ ভারতের সব প্রদেশে নেই। বাঁদর যদিও সব স্টেটেই দেখা যায় তবে বাঁদরের বাঁদরামির সঙ্গে সবাই অল্পবিস্তর পরিচিত। তাছাড়া বাঁদরের নুইসেন্স ভ্যালু আছে, তাই জনগনের নাপসন্দ হবারই কথা। সেই কারণে চুহাকে বাদ দেওয়া যায়। তবে হাতী, বাঘ, সিংহ চলতে পারে, কারণ সাধারণ মানুষ তাদেরকে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখে। আর কে না জানে সরকারবাহাদুরের প্রতিনিধিদের যাদের আমরা নেতা বলি, দূর থেকে ভাষণ শুনি, তারাও আমআদমীর কাছে সন্মানীয় ব্যাক্তি। ওই একই কারণগরুর গাড়ীবাসাইকেলচলতে পারে, তবেএরোপ্লেনকিরকেটনৈব নৈব চ।গাড়ীশহুরে লোকেদের জন্য, তাই ওটাও সাধারণভাবে ব্রাত্য, তবে তেলেঙ্গানা এখন বেশ উন্নত প্রদেশ, তাই সেখানের এক পার্টির সিম্বল গাড়ী।  সাধারণ জীবনযাত্রায় যেসব জিনিস লাগে যেমন ঝাড়ু, টেবিলল্যাম্প, জাগ, বই, ঘড়ি, এসবই কোন না কোন পার্টির সিম্বল। 

দুটো ন্যাশান্যাল পার্টি কংগ্রেস বিজেপি তিনবার কর তাদের পার্টি সিম্বল পাল্টেছে। কংগ্রেসের প্রথম প্রতীক ছিলজোয়াল কাঁধে  জোড়া বলদ পঞ্চাশের দশকে তখন চাষবাষের জন্য সবচেয়ে পরিচিত, তাই এই হেলে বলদ। কৃষক সমাজের মন পেতে অব্যর্থ অস্ত্র। ১৯৬৯এ ইন্দিরা কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় তাদের সিম্বল হয়গাই-বাছুর বাছুর আবার মায়ের বাটে মুখ দিয়ে আছে।বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনাবলা যায় আর কি! মাতৃস্নেহ এবং গরিবী এই দুইএর সমাহার একদম যাকে বলে রাজযোটক। সেই কালে কংগ্রেসের শ্লোগান ছিলগরিবী হঠাও আমরা ঠাট্টা করে বলতামগরিব হটাও ইমার্জেন্সীর পর অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের সিম্বল হলহাত আমাদের দেশের লোকেরা হাতের কাজ বেশী করে, শানিত মগজাস্ত্রের জোরে হোয়াইট কালার জব করে মুষ্টিমেয় কিছু লোক। আর এটা জানা- আছে যারা বুদ্ধির কাজ করেন তারা সাধারনত ভোট দিতে যান না। অতএবহাতএর জন্য হাত তুলতে লোকের অভাব হবে না।যখন প্রথমহাতসিম্বলটা এল, অনেকেই ঠাট্টা করে বলতপার্টিটা জলে ডুবে যাচ্ছে, তাই হাত তুলে বাঁচার প্রচেষ্টা। বিজেপি আবার দীর্ঘদিন (১৯৫১-৭৭) পর্যন্তঅয়েল ল্যাম্পপ্রতীক হিসাবে ব্যবহার করত। কিন্তু খালি তেলই পুড়েছে, লম্ফ নিয়ে লাফালাফি সার। এই সারসত্য উদ্ঘাটনের পর বিজেপি ১৯৭৭একৃষক হালে শরণাপন্ন হয়। কিন্তুহালপার্টির হাল ফেরাতে পারে নি। কবি মাইকেল মধুসূদনের কথায়কেলিনু শৈবালে ভুলি কমল কানন তাই তিনবছর পরেই কমলের আবির্ভাব। ফুল হিসাবে কমল শুদ্ধতার প্রতীক, লক্ষীঠাকুরণ বসেন কমলের উপর। তাই আজ তারই দয়ায় বিজেপির ভোটের ঝুলির বাড়বাড়ন্ত। তবে অচিরাত লক্ষীঠাকুরণের কুপিত-দৃষ্টি পড়তে পারে, কারণ তার একহাতে ধানের ছড়া, যাদের পরিশ্রমে তার হাতে শোভিত, সেই বেচারারা বিগত দশমাস ধরে দিল্লির হাইওয়েতে প্রদর্শনরত।

সর্বহারাদের পার্টি বলে পরিচিত সিপিআই সিপিএম এর প্রতীক চিহ্ন হল যথাক্রমে কাস্তে-ধানের ছড়া এবং তারা-হাতুড়ি-কাস্তে। ছোটবেলায় তখন ভোটের আগে পায়ে হাঁঠা মিছিল চলত। সবার আগে রিকসায় ফিট করা মাইক। তখন খুব শোনা যেতভোট দিন বাঁচতে, তারা হাতুড়ি কাস্তে। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের পাল্লা ভারী ছিল আশি নব্বই দশকে, কারণ তাদের তূণে সবরকম অস্ত্র ছিল। মাইনরিটিদের জন্যতারা’, শ্রমিক শ্রেনীর জন্যহাতুড়িআর কৃষকদের জন্য কাস্তে। আজকাল কাস্তের দাপট আস্তে আস্তে ম্রিয়মান, নূতন প্রজন্মের কাছে কাস্তে, হাতুড়ির বদলে সফ্টওয়ার বেশী পসন্দ। 

পার্টির নামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৃণমূলের সিম্বল হল গিয়েঘাসফুল তাদের নেতারাও বলে থাকেন  তারা কাজ করেন গ্রাসরুট লেভেলে। ইউপি তে সমাজবাদী পার্টির সিম্বল হল গিয়ে সাইকেল। গেলবার অখিলেশ সিএম থাকার সময় একঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করলেন। নয়ডাতে সাইকেল লেন বানান শুরু হল। সাইকেল তাদের পার্টির প্রতীক। বেশ সুন্দর টার্টান ট্রাকের মত পাটকিলে রংএর ট্র্যাক, একটু পরে পরে সাইকেলের ছবি। সদুদ্দেশ্য ছিল সন্দেহ নেই। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ঠেলাওয়ালারা সাইকেল ট্র্যাক দখল করে ফেলল। এছাড়া গো-সংরক্ষণের বাড়বাড়ন্তে গরুর পালও সাইকেল ট্র্যাকের দখল নিয়েছে। এখন সব বড়রাস্তার মাঝখানে মানুষ সমান উঁচু ব্যারিয়ার। ফলে সাইকেলওয়ালারা চীনের প্রাচীরের কাছে বাঁধা পেয়ে এখন পায়ে হেটে বা শেয়ার অটোতে যাতায়ত করে। তার আগে সুশ্রী(?) মায়াবতী সিএম থাকাকালীন নয়ডা, লক্ষৌতে অনেক পার্ক তৈরী হয়েছিল। সে সব পার্ক হাতীর স্ট্যাচুতে ভর্তি, কারণ , তার দল বহুজন সমাজ পার্টির প্রতীকহাতী ২০১২ তে উত্তরপ্রদেশ ইলেকশনের সময়, ইসি- নির্দেশে পার্কের সব হাতী ঢেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যত না আবার গজরাজ বিএসপির রাজদরবারে প্রবেশে সহায়তা করে ফেলে। জয়পুরের মহারাণী গায়ত্রী দেবী একবার ইলেকশনে দাড়িয়েছিলেন। তাঁর প্রতীক ছিলস্টার তাঁর অপোনেন্টের সিম্বল ছিলঘোড়সওয়ার যোদ্ধা ঘোড়সওয়ার হিসাবে রাণীকে প্রজারা দেখেছে অনেকবার, তাই বেশীরভাগ ভোটার ওই ঘোড়সওয়ার চিহ্নে ছাপ দিয়ে এল, ফলে রাণীর হার হয়েছিল।

কিছু ব্যাতিক্রমীর মধ্যে যেমনতেলেগু দেশমপার্টি তাদেরসাইকেলসিম্বল নিয়েও, ‘মোটরগাড়ীপ্রতীক চিহ্নিততেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি কাছে হেরে যায়। কিছু কিছুহটকেবাআই ক্যাচিংসিম্বলও চলছে যেমন ধরুন উইকেটের সামনে ব্যাটসম্যান, ইন্জেকশনের সিরিঞ্জ, বিস্কুট, পেন্সিল শার্পনার, নেলকাটার, মিক্সি।

ইলেকশন কমিশনের কাছে সব হাতে আঁকা সিম্বল মজুদ আছে, যেখান থেকে পার্টিকে প্রতীক বাছতে হয়। আজকাল ডিজিটাল জমানাতে অনেক পার্টি চাইছে কম্পিউটারে তৈরী গ্রাফিক ডিজাইন।

আমার করুণ অভিজ্ঞতা দিয়ে মধুরেন সমাপেয়ত। আমাদের হাউজিংয়ের সোসাইটির ইলেকশন। ইউপি সহকারী আবাস সমিতির অফিসার এসেছেন। ভোটপূর্ব ক্যাম্পেনও হয়েছে। আমিও একজন ক্যান্ডিডেট। জীবনে এর আগে ভোট দেওয়া বা  ক্যানডিডেট হওয়ার সুযোগ হয় নি। ডাবল ধামাকা।বছর পনের আগে একবার নয়ডাতে লোকসভা ইলেকশনে ভোট দিতে গিয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। তখন সদ্য ভোটার কার্ড পেয়েছি। বেশ উৎসাহের সঙ্গে গিয়েছি। পোলিং অফিসার কার্ডটা দেখে বেশ কয়েকবার আমার আপাদমস্তক দেখলেন।আপ ভোট নেহি দে সকতে, ইহা জেন্ডারমে ফিমেল লিখা হ্যায় সেবার বোকা বনে ফেরত আসতে হয়েছিল। যাক এবার আরেকটা সুযোগ পাওয়া গিয়েছে। সহকারী সমিতির লোক বলে দিলেনএক পেন্সিল টাইপকা চীজ হ্যায়, কালি লাগাকে ঠাপ্পা লাগাইয়ে।যথাআজ্ঞাবলে ঢুকলাম। আঙুলসমান একটা হেক্সাগোনাল পিস। লম্বা জায়গাটাতে কালি লাগিয়ে নিজের নামের পাশে বিজয়দর্পে ছাপ লাগিয়ে বেরিয়ে এলাম। পরে জানলাম আমার ভোট ইনভ্যালিড, কারণ ওই ছোট্ট লম্বা জিনিষটার তলার দিকে রবার লাগানো একটা স্বস্তিক চিহ্ন আছে। ওটাতে কালি লাগিয়ে ঠাপ্পা মারতে হবে। ন্যাড়া কি আর দুবার বেলতলায় যায়? এরপর আর কখনো ভোট দিতে যাই নি।প্রসঙ্গত বলি কয়েকবার -মেল করেও ভোটার কার্ডেফিমেলট্যাগ বদল হয় নি

দেবদত্ত 

১০/০৯/২১


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments