গর্ধভচরিতমানস (রম্যরচনা)



 গর্ধভচরিতমানস

গাধা প্রাণী হিসাবে পশু সমাজে সিডিউল কাস্ট শ্রেনীভুক্ত বলা যায়। চিরকাল ঘাড় গুজে মোট বয়েই সারাজীবন কেটে যায়। সুখের মুখ কোনদিনই দেখতে পায় না। গৃহপালিত জীবের মধ্যে প্রায় সবাই মাল্টি টাস্কিং করে থাকে। গরু বেচারাও গাধার মত নিরীহ। গরু শব্দ থেকেইগোবেচারাশব্দটার উৎপত্তি। গরু দুধ দেয়, গরুর গোবর উঠান নিকানো থেকে ঘুটে তৈরীতে কাজে লাগে, একশ বছর আগেও আমাদের দেশে লোকজন গোশকটে দূরের পথ পাড়ি দিত। বর্তমানকালে গোমূত্র নিয়েও আয়ূষ মন্ত্রনালয়ে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। অদূর ভবিষ্যতে মকরধ্বজের মত মূত্রধ্বজ বাজারে আসার প্রবল সম্ভাবনা। ঘোড়ার ব্যাপারটা দেখুন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে, ঘোড়দৌড়ের মাঠ সবেতেই তাদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অলিম্পিকেও ইকোয়েসট্রিয়ান ইভেন্ট আছে। সেটাতে আবার দ্রুত গতির কেরামতি নেই, নানারকম অবস্ট্যকল লাফিয়ে পার হতে হয়, চলার ভঙ্গিও বিভিন্ন ট্রট (দুলকি), গ্যালপিং। গাধা বেচারা সেই যে একই গতিতে মাথা নীচু করে হাঁটা শুরু করে, মালিক না থামানো অব্দি তার কোন বিরাম নেই। আগেকার জমানায় রাজা বাদশাদের মধ্যে উপঢৌকন হিসাবে হাতী, উট, ঘোড়া ইত্যাদি প্রদানের রেওয়াজ ছিল।গর্ধভকখনও নজরানা হিসাবে দেওয়া হয়েছে, এমনটি কখনো শোনা যায় নি।

গাধা বেচারার দুর্ভাগ্যের কথা শিশুবয়েসেই জেনেছিলাম ছড়ার বইয়ের মাধ্যমে। গাধার ডাকও তার মোটা বুদ্ধির সঙ্গে মানানসই কর্কশ। বেচারা গাধারও কি পূর্ণচন্দ্রের স্নিগ্ধ কিরণে প্রেমভাব জাগবে না? গান তো প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। গান গেয়ে গাধার কি দুরবস্থা তাই নিয়ে সেই ছড়া। শিশুবয়সের সেই বই এখনো আমার বইএর আলমারীতে বিদ্যমান। নীচে তারই ফটো শেয়ার করলাম।


দুর্ভাগ্য সর্বসময়ের সাথী হলে আমরা বলিফাটা কপালবলে থাকি, তবে আমার মনে হয়গাধাকপালআরো বেশী যুক্তিযুক্ত।

মোটামুটি মোট বয়ে নিয়ে যাওয়াটাই গাধার কাজ। অর্বাচীন লোক ছাড়া গাধার পিঠে চড়ে সফরের কথা কেউ ভাবে না। রাজা বাদশাদের আমলে একরকম শাস্তি প্রদানের কথা শোনা যেত, সেটা হল দোষী ব্যক্তিকে ন্যাড়া করে, মাথায় ঘোল ঢেলে গাধার পিঠে উল্টো করে বসিয়ে শহরের রাস্তায় ঘোরানো হত। 

শক্তের ভক্ত, নরমের যমএই প্রবাদবাক্যের উপলব্ধি গাধাই সবচেয়ে বেশী ফিল করে। লম্বা কানদুটো নাড়িয়ে মাছি তাড়ানো ছাড়া টুশব্দ পাওয়া যায় না। এরকম একটি শান্ত জীবকে মনুষ্যকুল তার যথাযোগ্য মর্যাদা তো দেয়ই নি, উপরন্তু বোকাসোকা ধরণের লোককেগর্দভবিশেষণে ভূষিত করে থাকে। স্কুলে মাস্টারমশাই হামেশাই ব্যকবেঞ্চার ছাত্রদের ওই নামে ডেকে থাকেন। ইংরেজ কি অমেরিকানরাও ব্যাপারে পিছিয়ে নেই। কথায় কথায়আ্যসহোলশব্দটা ব্যবহার করে থাকে। মানুষের পশ্চাদ্দেশের ইংরাজী নামকরণ কি করে গাধার ইংরাজী নাম Ass থেকে হল, সেটা ভাষাবিদরাই বলতে পারবেন। ইংরাজীতে গাধার অবশ্য আরো একটা নাম আছে, সেটা হল ডঙ্কি। 

তবে ঈশপের গল্পে গাধার বুদ্ধি নিয়ে একটা মজার কাহিনী আছে। বুদ্ধি না বলে দুষ্টবুদ্ধি বলা যায়। এক গাধা একবার অনেক নুনের বস্তা নিয়ে যাচ্ছিল। ওজনের চোটে তার গতি শ্লথ। এদিকে মালিক তাড়া লাগাচ্ছে। একটা সাঁকো পার হওয়ার সময় বেচারা টাল সামলাতে না পেরে জলে পড়ে গেল। মালিক আর কি করে। গাধাকে টেনে তুলল রাস্তায়। গাধা দেখে, বোঝা তো একদম হাল্কা। নুন তো সব জলে গলে গিয়েছে। বেশ মজা। রকম আরেকদিন। সেদিন ছিল চিনি। ভার অত না থাকলেও, সেদিনও গাধা ইচ্ছে করে জলে পড়ে গেল। মালিক এবার গাধার চালাকি বুঝে ফেলল। সে এবার তুলোর বস্তা চাপিয়ে দিল গাধার পিঠে। এবারেও গাধা ইচ্ছে করে জলে পড়ে গেল। কিন্তু হায় কপাল। এবার তো ওজন দ্বিগুন। অতিকষ্টে গাধা গন্তব্যস্থলে পৌঁছাল। একে বলে অতিচালাকের গলায় দড়ি। 

হিন্দুধর্মের দেবদেবী দের বাহন হিসাবে বাঘ, সিংহ, ময়ূর, হাতী থেকে শুরু করে মায় ইঁদুর অব্দি সবাই স্থান পেয়েছে। ইঁদুরকে জাতে তোলার কারণ তার নুইসেন্স ভ্যালু। ইঁদুর ক্ষেতের শস্য নষ্ট করে, জামা-কাপড় এমনকি কাগজও কুচিকুচি করে কেটে ফ্যালে, তাই তাকে দেবতার বাহন বানিয়ে তুষ্ট করার প্রচেষ্টা। গাধা বেচারা সেরকম কৌলিন্য পেল না। এটুকু লেখার পর গুগল ঘেটে জানলাম মা শীতলার বাহন নাকি গাধা। তবে শীতলা পুজো আজকাল প্রায় বন্ধ, কারণ উনিবসন্তরোগের দেবী। ওই রোগটা যেটাকে গুটি বসন্ত বলে সেটা বিদায় নিয়েছে। যাক সে রকম পপুলার দেবী না হলেও শীতলা যে গাধা কে রেকগনাইজ করেছেন এটাকে গাধার প্রাইড হিসাবে ধরা যায়।একস্পেশন প্রুভস দি রুলএর মত ব্যাপার। 

তবে আজকের কাগজ পড়ে গাধার কৌলিন্যপ্রাপ্তির ব্যাপারে বেশ কিছু জানলাম। আমাদের পড়শী দেশ চায়না, আমাদের তথাকথিত শত্রুদেশ পাকিস্তানকে নানারকমভাবে সাহায্য করে থাকে সে অধুনিক অস্ত্রসম্ভারই হোক, কি শিল্পস্থাপনই হোক। বেচারা পাকিস্তানের ইকনমি এমনিতেই সঙ্গীন। তাই পাকিস্তান ঠিক করেছে বার্টার সিস্টেমে তারা গুচ্ছের গাধা পাঠাবে। পাঠককুল আবার ভেবে বসবেন না যে পাকিস্তান হাস্যরসিকতার উদ্দেশে গাধা পাঠাচ্ছে। অবশ্য চায়নার সঙ্গে হাসি-মজাক করার মত সাহস পাকিস্তানের নেই। গাধার চাহিদা এখন তুঙ্গে, কারণটা কিন্তু তার ভারবহনের ক্ষমতার সদ্বব্যবহারের জন্য নয়। রক্তের গুণবৃদ্ধি বিভিন্ন রোধ প্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য, গাধার চামড়ার চাহিদা উর্ধমুখী।  চায়নাতে গাধার সংখ্যা ফিবছর কমছে। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের মত চায়নাও গাধাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের চোখে দ্যাখে। চাইনিজরা এখন বিশ্বের দরবারে অমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। স্বভাবতই তারা গাধার মত নিকৃষ্ট প্রাণীকে সমাজজীবন থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। গরীব দেশগুলো গাধা ব্রিডিংএর আখড়া হয়েছে। চায়না আগে নাইজের আর বুরকিনা ফাসো থেকে গাধা আমদানী করত। এখন তাদের পড়শী দেশ পাকিস্তান গাধা পালনে বিশ্বে তৃতীয় নম্বরে রয়েছে। কারাকোরাম হাইওয়ে তো তৈরী হয়ে গিয়েছে। ফ্রেট কস্টও লাগবে না। গাধার নিজেরাই গুটিগুটি পায়ে চলে যাবে একদেশ থেকে আরেক দেশে। চায়নার যা বুদ্ধি, বলা যায় না, তারা গাধার পিঠে চাপিয়ে অন্য কোন ইমপোর্টেড মালপত্রও নিয়ে আসবে। একেই বলে এক ঢিলে দুইপাখি মারা।

দেবদত্ত

০২/০৯/২১


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments