প্রেমের চচ্চড়ি (রম্যরচনা)


প্রেমের চচ্চড়ি

পশ্চিমবঙ্গের তপ্ত রাজনীতির আঙিনাতে শোভন-বৈশাখী প্রেমকাহিনী যেন মরুভূমিতে ওয়েসিস।তেলে-ঝালেবাঙালীর ভোজনের শেষপাতেরচাটনি বৈশাখী দেবীশোভন বান্ধবীএই ডাকেই বেশী পরিচিত। একি নিছক বন্ধুত্ব, নাকি আরো নিগূড় কিছু! এই নিয়ে অনেক জলঘোলা। এই ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমে পড়েছে মেডিয়া। পাঠক বা দর্শকের কাছে বিবাহোত্তর পরকীয়া সর্বকালীন আকর্ষণের ব্যাপার।ডন-জুয়ানবালায়লা-মজনু মতশোভন-বৈশাখীপ্রেমকাহিনী পরবর্তী কালে কোন জটিল প্রেমের সিনেমার উপজীব্য হবে সন্দেহ নাই। প্রেম মাত্রই জটিল, সেটা যদি আবার পরকীয়া হয়, তাহালে তো কথাই নেই। পরকীয়ার পরতে পরতে জটিল বাঁক, জটিলেশ্বর মুখোপধ্যায়ের গানের লিরিক্সের মতকেউ বলে ফাল্গুন, কেউ বলে পলাশের মাস, আমি বলি আমার সর্বনাশ। কেউ বলে দখিনা, কেউ বলে মাতাল বাতাস, আমি বলি আমার দীর্ঘশ্বাস।’ 

ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে ধীরে ধীরে শোভনবাবুর স্ত্রী রত্নাদেবীর প্রবেশ। এরপর এনট্রি নিয়েছেন জাঁদরেল শ্বশুর মশাই, রত্নাদেবীর ছেলে মেয়ে, সম্প্রতি এই নাটকে মনের কথা বলতে, যোগদান করেছেন মনোজিৎ, যিনি কাগজে কলমে বৈশাখী দেবীর স্বামী।

তবে এদের প্রেমকাহিনীর মধ্যে দীর্ঘশ্বাস কি হাহুতাশ কম, লড়াকু বাঙালীর ভাবমূর্তি বেশী প্রকট। এল্যিগেশন কাউন্টার এল্যিগেশনে এবিপি আনন্দের টিআরপি উর্ধমুখী। শোভন বৈশাখীর প্রণয় শেষ পর্যন্ত পরিণয়ে পৌছাবে কিনা এটার উত্তরে বলা যায় - তাদের তৃনমূল না বিজেপি কোন পার্টিতে তারা যোগদান করবেন অথবা আরো প্রিসাইজলি কোন পার্টি তাদের নেবে- সেটার উত্তরের মতই কঠিন। তারা যদিও এখনও কপোতকপোতীর মতবাধি নীড় থাকি সুখে, উচ্চবৃক্ষচূড়েপরিনতি লাভ করতে পারেন নি, রাজনীতির মঞ্চে তারাহাতে হাতে ধরি ধরি গাহিব তিরিতিরিগাইতে গাইতে মোদী-দিদির মাঝখানে দোদুল্যমান। তবে প্রেমের পারদ চড়ার সাথে, শোভনের রাজনৈতিক পারদ চড়চড় করে নামছে। গতবার ভাইফোঁটায় দিদির আঙুলের টিপ, কি দিল্লিতে গিয়ে কৈলাশ বিজয়বর্গীর ( এই নামটা শুনলে দুটো জিনিষ মনে পড়ে , সেই ফেলুদার ধাঁধা কই+লাশ= কৈলাশ, আর মা, দিদিমারা যে গান দিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়ানখোকা ঘুমাল, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে’) সামনেমালাবদলথুড়ি মালা গ্রহণ করেও কোন পার্টিতেই তীর বেঁধাতে পারেন নি।তীরে এসে তরী ডোবাযাকে বলে, শেষমুহুর্তে ভোটের টিকিটের টিকি মেলে নি। 

কিছুদিন আগে জানা গিয়েছিল শোভনবাবু তার সমস্ত সম্পত্তির ওয়ারিশ করেছেন বৈশাখী দেবীকে। যেন রামের জন্মের আগেই রামায়ণ লেখা! তবে শোভনবাবুকে দেখে একটা জিনিষ উপলব্ধি করা যায়প্রেমেতে মজিলে মন, কিবা হাঁড়ি কিবা ডোমমনে রাখবেনটল ডার্ক হ্যান্ডসামনা হলেও চলবে, টাকের সঙ্গে ট্যাঁকের জোর দরকার। আর টাক থাকলে টাকা থাকে এও সর্বজনবিদিত। সুতরাং আলুভাতে বা নাদুস নুদুস চেহারা কোন বাঁধা নয়। সুতরাং হাল্কা স্ফীতোদর, বিলীয়মান কেশরাজি সমৃদ্ধ মধ্যবয়সীরা আশায় বুক বাঁধতে পারেন

বেচারা শোভনবাবু। রাজনীতির জটিল ঘূর্ণাবর্তে তিনি এখননা ঘরকা কি না ঘাটকাহলেও নারদাকান্ডে রেহাই পান নি। তাকেও জেলে যেতে হয়েছিল। জেলের ফাটকে বাড়ী থেকে আনা টিফিন শোভনবাবুকে পৌঁছাতে না পেরে বৈশাখী দেবীর অঝোর কান্না পুরো এপিসোডের এক আবেগঘন মুহূর্ত। শোভনবাবুর নির্দোষিতা প্রমান করতে তার  শতাব্দীর সেরা ডায়ালগওর মন শিশুর মত নিষ্পাপ’! 

শোভনবাবু অফিসিয়াল জামাই নন, তাই জামাইষষ্ঠীর পুণ্যলগ্নে কবজি ডুবিয়ে মোর্গা-মুসল্লম কবজা না হলেও, ফেসবুকে নামের স্ট্যেটাসে চমক। এখন তিনি শোভন বৈশাখী বন্দ্যোপধ্যায় চট্ট্যোপধ্যায়। প্রেমিক যুগল এক দেহে হল লীন, সেই গীতগোবিন্দেরতমসি মম ভূষণং, ত্বমসি মম জীবনং’! 

এদিকে বৈশাখী দেবীও এবিপির সাক্ষাতকারে সবসময়পটের বিবি মুখের মেকআপ, লিপস্টিক, আঙুলের দামী আংটি সব মিলিয়ে কোন ফিল্মস্টারের থেকে কম যান না। খালি ড্রব্যাকটা হল প্রেমে হাবুডুবু খাওয়াতে গায়ে গতরে বিশেষ শ্রী বৃদ্ধি।  তার এই মেকআপ নিয়ে রত্নাদেবী প্রায়ই কটাক্ষ করে থাকেন। শেভনবাবুকে মাঝে রেখে দুই রণচন্ডীনীর বিবাদ যেন সমুদ্র মন্থনের কাহিনী। যত চার্নিং হচ্ছে ততই হলাহল বেরিয়ে আসছে। এরমধ্যে দর্শকবৃন্দের কোলাহল। একদমহলমার্কখবর! কলোয়াতি গানে তবলার সংগতের সঙ্গে ওস্তাদজীর ভৈরবী সুর ধীরে ধীরে দ্রুতলয়ে  এক উচ্চতায় পৌঁছায় বা কবিয়ালদের তরজা যেমন উত্তোরত্তোর বৃদ্ধি পায়, তেমনি বৈশাখী রত্না কাজিয়া ক্রমবর্ধমান। 

আজকের খবরে মনোজিৎ এর মনোকষ্টের হদিশ পাওয়া গেল। উনি আবার যাদবপুরের ইংরাজীর অধ্যাপক। তিনি জানালেন বৈশাখী দেবী তার সঙ্গে গত তিনবছর থাকেন না। তার নাকি ক্যান্সার হয়েছিল। যাওয়ার আগে মনোজিৎ বাবুর কথা অনুযায়ী তার যৌথভাবে স্বাক্ষর করা চিঠি যাতে কিনা লেখা আছেতোমার এপথ আমার পথের থেকে, অনেকদূরে গেছে বেঁকেএই জাতীয় কিছু বক্তব্য, সেটা নাকি দুজনের কাছেই এককপি করে আছে। একই কলেজের( যদিও উনি এখন শিক্ষক আর আমি কয়েকদশক আগে কলেজের ছাত্র ছিলাম) হওয়ার সুবাদে কর্কট রোগের কথা শুনে বেশসিমপ্যাথিভাব জাগছিল, কিন্তু কেসপ্যাথেটিকহয়ে গেল যখন বৈশাখী দেবী জানলেন, মনোজিৎ বাবুরও একজন বিবাহিত মহিলা বান্ধবী আছেন। একেই বলে শঠে শাঠ্যং

সম্প্রতি বৈশাখী দেবী নাকি ডিভোর্স চেয়েছেন। এখবর শুনে রত্নাদেবী গাছকোমর বেঁধে যুদ্ধক্ষেত্রে  নেমেছেন। ব্রহ্মাস্ত্র যে তারই হাতে। তিনি ডিক্লেয়ার করেছেন, শোভনবাবুকে উনি ডিভোর্স দেবেন না। এবার বোঝ কতধানে কত চাল! তবে বৈশাখী দেবীও পাকা খেলুড়ে। তিনি ইন্টারভিউতে জানালেনবিয়ে টিয়ে একটা সামাজিক দলিল। সাচ্চা প্রেম হচ্ছেনিকশিত প্রেম কলুষিত হেম। তারা এখন যে পর্যায়ে আছেন সেটাকে বলা যায়, ‘প্রেমেরও জোয়ারে, ভাসাবে দোঁহারে, বাঁধন খুলে দাও দাও দাও এই খোলা বাঁধনের পবিত্র প্রেমকে অগ্নিসাক্ষী রেখে গাটছাড়া বাঁধা এক বিলাসিতা বই কিছু নয়। অতএব চালাও প্রেমের পানসি।এখন চিত্রনাট্যের যবনিকা আদৌ হবে কিনা বা পরবর্তী অঙ্ক কোন ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছায়, তারই প্রতীক্ষায় আমাদের মত আম আদমি!

দেবদত্ত 

২২/০৯/২১ 


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments