স্কুলজীবন (স্মৃতিকথা)
শৈশবে আমি
স্কুলজীবন (পার্ট ১)
একটা মজার ঘটনা দিয়ে স্কুল জীবনের কথা শুরু করি। ঘটনা যতদূর মনে পড়ে নার্শারিতে পড়ার সময়। পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে এসেছি লাফাতে লাফাতে। বাড়ী এসে বল্লাম- আমি থার্ড হয়েছি। রিপোর্ট কার্ড দেখে বাবা-মায়ের চক্ষু চড়কগাছ। বাংলা এবং ইংরেজীতে শূন্য আর অংকে দুই। তবে রিমার্ক কলামে জ্বলজ্বল করছে - ‘তৃতীয় স্থান’। পরে রহস্য উদ্ধার হল, জনা দশ-বারো ছেলে মেয়ের মধ্যে মাত্র তিনজনই পরীক্ষা দিয়েছিল। তবে বাংলা, ইংরেজীতে শূন্য পাওয়ার কারনটা মনে আছে। স্লেটে দিদিমনি সমান্তরাল লাইন টেনে দিয়েছিলেন, যার মধ্যে এ,বি,সি, ডি বা অ,আ,ক,খ লিখতে হবে। মনে হয় আমি একটু বড় স্পেসে লেখা অভ্যাস করেছিলাম। তাই স্বভাব অনুযায়ী একটু চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়ে ফাঁকা স্লেট জমা দিয়েছিলাম। অংকতে দুই পাওয়ার রহস্যটা মনে নেই। তবে ওটাও ব্ল্যাঙ্ক জমা দিলে, জীবনের প্রথম পরীক্ষায় রসগোল্লার হ্যাটট্রিকের অনন্যসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারতাম।
এরকমই টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্যে আরেকটা হচ্ছে নার্সারি স্কুলে টিফিন খাওয়ার আগে হাঁটু গেড়ে বসে প্রেয়ার করতে হত। কোন কারনে ছোট্ট শিশু মনে সেই লাইনগুলো গেথে গিয়েছিল। বাড়ীতে থেকে থেকে স্বগোক্তি করতে থাকতাম - ‘আধাতিকা দফুফুদা, পিতপিতা দশংগেতে’। বাড়ীতে বাবা মা চিন্তিত -‘কি ভাষা শেখাচ্ছে? এসপারেন্টো নাকি’? তখন সবে শোনা গিয়েছে পৃথিবীর প্রধান ভাষাগুলো থেকে অক্ষর নিয়ে এই নূতন ভাষা তৈরী হয়েছে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে একটাই ভাষা থাকবে আর সেটা হবে এসপারেন্টো।পরে অবশ্য একদিন এটার রহস্যভেদ হল, যখন বাবা মা স্কুলে গিয়ে জানল অপভ্রংশের উৎসের লাইনটি যার শুরু কিছুটা এইরকম ‘অদ্ধাত্মিক খাদ্য দাও প্রভু....’। সত্যি, বলিহারি যাই- খাদ্যের অদ্ধ্যাত্মিক সম্পর্কীয় ব্যাপারের উপলব্ধি বৃদ্ধবয়সে প্রাপ্তি হয়, শিশুমনে - যতদূর সম্ভব আমার আজকের ধারনা অদ্ধ্যাত্ম জ্ঞানের ফললাভ সুদূরপরাহত ছিল মন্ত্রচ্চারনে, টিফিনের প্লেটের দিকে তাকিয়ে সেই মন্ত্রবলে বলীয়ান হয়ে জিউব্হা লালাসিক্ত হত।
জ্ঞানবৃক্ষের ফললাভের আশায় স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছে যতটা না ছিল, তার থেকে বেশী ছিল বাবা-মায়ের নিরুপায়তা। দুজনে কলেজে ও স্কুলে চলে গেলে আমি থাকব কার কাছে। এটা আমার তিন চার বছর বয়সের কথা। তাই সপ্তাহে পাঁচ দিন মায়ের স্কুলে যেতাম, শনিবার বাবার পলিটেকনিকে। মায়ের স্কুলটা দশম শ্রেনীর গার্লস স্কুল। পাঁচিল ঘেরা স্কুলের ঠিক বাইরে ছিল প্রাইমারী স্কুল। মধ্যিখানে টিনের চালওয়ালা ঘরের চারপাশে দাওয়াতে চলত স্কুল। আমি সেই স্কুলের ছাত্র ছিলাম না, বয়স কমের কারনে, তবে সেখানে সবার পিছনে বসে থাকার অনুমতি ছিল। তখনের কথা কিছুই প্রায় মনে নেই, তবে মায়ের স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে বাদাম আর ছোলা খাওয়ার কথা মনে আছে। বাদামের থেকে বেশী লোভ ছিল ছোট্ট মোড়কে নুনঝালটার দিকে।
পরবর্তী অধ্যায় শুরু হল বাণীভবন বিদ্যালয়ে নার্সারি ক্লাসে।
স্কুলটা ছিল আমাদের বাসস্থান বাছুরডোবা থেকে অনেক দূরে, রেলক্রসিং, বাজার পেরিয়ে পুরাতন ঝাড়গ্রামের সাবিত্রী মন্দির ছাড়িয়ে, একটা সুড়কি বা মোরামের রাস্তা ধরে গেলে পড়ত বাণীভবন। ছোটবেলায় মনে হত স্কুলটা যেন সাতসমুদ্র তেরোনদী পেরিয়ে। এখন গুগল ম্যাপে দেখলাম দূরত্বটা পাঁচ কিলোমিটারের কম।শিশুমন সবকিছুকেই বড় কর দেখে, অনু ঘটনাগুলি কল্পনার চক্ষে হয়ে ওঠে পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য । প্রি নার্সারি ও নার্সারি সেকশনটা ছিল গেট দিয়ে ঢুকে একটা বিল্ডিংএ, সামনে একটা ছোট্ট খেলার মাঠ, তাতে একটা সি-স আর দুটো দোলনা। নার্সারি সেকশনটা ছাড়িয়ে গেলে একটা উঁচু মার্বেলের বারান্দা সংলগ্ন হলঘর। তারপরে ছিল প্রাইমারি সেকশনের ছোট একতলা বিল্ডিং, পিছনদিকে একটা দোতলা স্কুলবাড়ী। যতদূর মনে পড়ে নার্সারি সেকশনের হেডমিস্ট্রেস ছিলেন ইভা দিদিমনি আর প্রাইমারি সেকশনে লীনা দিদিমনি। আমরা ডাকতাম বড় দিদিমনি বলে। নার্সারি স্কুলে মজার ব্যাপারটা ছিল দুপুরে ঘুমানোর ব্যবস্থা। বাড়ী থেকে সবাইকে আনতে হয়েছিল বালিশ, চাদর, তোষক। একজন মাসীমনি ছিলেন ক্ষুদেদের দেখভাল করার জন্য। দুপুরবেলাতে শুয়ে ঘুম তো আসত না। মাসীমনির সদাসতর্ক চোখ এড়িয়ে পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকাতাম, আর মাঝে মাঝে মাসীমনির ধমক আসত-‘চোখ বন্ধ কর। মুস্কিল ছিল একটাই। সকালে এসে লেস বাঁধা শু জুতো খুলতে হত। অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেদের মত লেস খোলাটা আয়ত্তের মধ্যে ছিল কিন্তু চক্রব্যূহ ভেদ করে বেরিয়ে আসার মত, জুতোর লেস বাঁধা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। এখন মনে নেই, কোন একটি সহপাঠী আমার জুতোর লেস বেধে দিত, অবশ্যই বিনিময় মূল্য ছিল টিফিনের কিঞ্চিৎ ভাগ।
নার্সারিতে পড়ার সময় পুরানো আমলের একটা মিনিবাস গোছের আসত। আমি ছিলাম দূরতম যাত্রী। আমার বাড়ীটা ছিল মেন রাস্তার পাশের গলিতে, প্রথম বাড়ীটা। বাসটা গলিতে ঢুকে, ব্যাকগিয়ার করে আবার যেত। গলিটায় ঢুকে ব্যাকগীয়ার করার সময় প্রায়ই সেটার স্টার্ট বন্ধ হয়ে যেত। তখন ভুবনদা, যে আমাদের গাড়ীর কেয়ারটেকার ছিল, একটা এল শেপের লম্বা ডান্ডা নিয়ে ইঞ্জিনের মধ্যে ঢুকিয়ে কয়েকবার ক্লকওয়াইজ ঘোরাত, ইঞ্জিন আবার স্টার্ট হয়ে যেত। মাঝে মাঝে পেট্রল ভরত, বাছুরডোবার মোড়ে, কেড়িয়াদের পেট্রল পাম্পে। তখন এরকম মিটার ওয়ালা পেট্রল পাম্প ছিল না। হাত দিয়ে পাম্প করে একটা কাচের ডাব্বায় তোলা হত, সেখান থেকে গ্রাভিটি ফ্লো তে, গাড়ীর ট্যাঙ্ক ভরত।
আমাদের ক্লাসের পিছনে একটা হোস্টেল ছিল। সেখানে সেলাই দিদিমনিরা থাকতেন। পরে জেনেছি, দূর থেকে অনেক মেয়ে এখানে সেলাই শিখতে আসত। ওদের হোস্টেল আর ক্লাসরুমের মাঝে একটা ছোট মাঠ ছিল। বর্ষাকালে ওখানে অনেক ঘাস হত। তাতে ছোট ছোট লাল রং এর একরকম পোকা ঘুরত। আমরা বলতাম ভেলভেট পোকা। পোকাটার গা-টা সত্যি ভেলভেটের মত নরম ছিল। বাড়ী থেকে দেশলাই বাক্স নিয়ে যেতাম। পোকা ভরে ভরে জমাতাম। কে কটা পেল সেটা দেখা হত। আরেকটা ব্যাপার ছিল। তখনকার দিনে বর্ষার সময় অনেক ফড়িং উড়ত। ডানাগুলো হত ট্রান্সপারেন্ট। ঘাসে ফড়িং বসলে দুই আঙুল দিয়ে তার ডানাদুটো চেপে রাখতাম। মিনিট দুয়েক ধরে রাখার পর আঙুল ছেড়ে দিলেও ফড়িং উড়তে পারত না। তখন ওটাকে হাতের তালুতে বসিয়ে ঘুরতাম।
এরপর এসে গেলাম প্রাইমারি স্কুলে। তখন হাফ প্যান্ট আর শার্টের সাথে ছোট একটা টাই। সেটা টিপ বাটন দিয়ে শার্টের কলারের তলায় লাগাতে হত। শুক্রবার হত এনসিসি। ছেলেদের গ্রুপটাকে বলা হত কাব আর মেয়েদের গ্রুপের নাম ছিল বুলবুল। রুমালের থেকে বড় সাইজের একটা মেরুন রং এর কাপড়কে ছোট্ট রিংএর মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে গলায় বাঁধতে হত। সিনিয়ারিটি অনুযায়ী রিং এর ডিজাইন চেঞ্জ হত। মনে আছে একটা হুইসিলও পেয়েছিলাম। ক্লাসে বসা হত মাটিতে, আসনের উপর। সামনে থাকত, খাজাঞ্চিরা যেরকম টুল ব্যাবহার করে তারই ছোট সংস্করন। তখনকার সময় পিঠে ঝোলান ব্যাগ ছিল না। এল্যুমিনিয়ামের ছোট সাইজের সুটকেস শেপের বাক্স পাওয়া যেত। আজকালকার বাচ্চাদের মত জলের বোতল নিতে হত না। তলায় বড়দিদিমনির রুমের বাইরে বড় বড় ড্রামে জল থাকত। সেটা থেকে হাত লাগিয়ে জল খেতাম। ঝাড়গ্রামের জলের সুনাম ছিল। কুয়োর জল না ফুটিয়েও খাওয়া যেত।
ক্লাস ওয়ান টুতে পড়ার সময় একটা ক্লাস হত, সেটা ছিল চরকি কাটার ক্লাস। তুলো দেওয়া হত। একটা পাতলা লোহার ডান্ডার তলারদিকে একটা চাকতি লাগান ছিল। ওটা একহাতে মাটিতে রেখে ঘোরাতে হত আর তুলোর লম্বা বান্ডিলটা অন্যহাতে দুই আঙুলে চেপে রাখতে হত। চরকিটার উপরে তুলোর একপ্রান্ত ফাঁসিয়ে নিতে হত। এরপর চরকি ঘোরালে তুলো থেকে সুতো হয়ে পাতলা ডান্ডাটাতে জড়িয়ে যেত।
ক্রমশঃ
স্কুল-জীবন (পার্ট ২)
ক্লাস মনিটর ছাড়াও ক্লাসমেটদের থেকে একজনকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও আরেকজনকে পোষাক মন্ত্রী বানান হত। প্রেয়ারের পরে ক্লাশে যাওয়ার আগে, তারা আমাদের দাঁত পরিষ্কার কিনা, চুল কাটা আছে কিনা, নখ কাটা আছে কিনা সব চেক করত। পোষাক মন্ত্রীর কাজ ছিল ড্রেস এবং জুতো পরিষ্কার আছে কিনা, কোন বোতাম ছেড়া আছে কিনা চেক করা।
সপ্তাহে একদিন কি দুদিন গার্ডেনিং এর কাজ পড়ত। পালা করে এক এক ধরনের কাজ। শীতকালের দিকেই ওটা বেশী করতে হত। কারন তখন মরশুমী ফুল গাঁদা, দোপাটির চারা লাগান হত। শীতকালে কুয়োর জলের লেভেলটা অনেক নীচে থাকত। কয়েকজনের কাজ ছিল জল তোলা। দুজন কুয়োর কাছে দাঁড়িয়ে বালতি জলশুদ্ধ উপরে উঠলে গাছে জল দেওয়ার ঝাঝরিগুলোকে ভর্তি করত। দু তিনজন মিলে দড়ি টানতাম খালি বালতি কুয়োতে নামাতে আর জলশুদ্ধ বালতি ওঠাতে। কিছু ছেলে ঝাঝরি নিয়ে গাছে জল দিত, আর কয়েকজন খুরপি হাতে গাছের মাটি ঝুরো ঝুরো করত। এরমধ্যে কুয়োর দড়িটানাটাই ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। শীতকালে জল দিয়ে বন্ধুদের ভিজিয়ে দিয়ে মজা করতাম। প্রাইমারি স্কুলে ছিলেন একজন পিসীমনি। দুষ্টুমিটা পিসিমনির চোখ এড়িয়ে করতে হত।
নার্সারি স্কুলে, আমার চুলের সিঁথি কোনদিন ডানদিকে থাকত, আবার কোনদিন বাদিকে। স্নানের পর কোনদিন মা আর কোনদিন বাবা আঁচড়ে দিত। আমার চুলের পিছনদিকের বাকটা ছিল বাদিকে। ছেলেদের চুলের সিঁথি সাধারনত ডানদিকে হত। মা সেই ট্রাডিশন অনুযায়ী ডানদিকে সিঁথি কাটত, কিন্তু পিছনের চুলগুলো খাড়া হয়ে থাকত। বাবার আবার সাইন্টিফিক বুদ্ধি। পিছনের চুল যাতে পেতে বসে, সেইজন্য বাদিকে সিঁথি করত। চুলোয় যাক ট্রাডিশন। দিদিমনিরা একএক দিন একএক রকম সিঁথি কাটা দেখে জিজ্ঞাসা করতেন-‘মিঠু, আজ কে চুল আঁচড়ে দিল’?
দিদিমনিদের মধ্যে লীনা দিদিমনিকে খুব ভয় পেতাম। বাকী দিদিমনিদের মধ্যে ইতি দিদিমনি, মনোরমা দিদিমনির কথা মনে আছে। একবার ক্লাস ওয়ানে পাঁচটি মাছের নাম লিখতে দেওয়া হয়েছিল। আমি একটা মাছের নাম কাটামাছ লিখে এসেছিলাম। দিদিমনি তো হেসে কুটিপাটি। আরেকবার ইংরাজিতে প্রশ্ন ছিল ‘হোয়াট ইজ ইয়োর ফাদার ডু? এর উত্তরে আমি বাবার নাম লিখে এসেছিলাম।
আর্য কুমার নাগের কথা আমার ছোটবেলার স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে। লম্বা, কালো ফ্রেমের চশমার সঙ্গে হাফ শার্ট আর ট্রাউজার। বাবা খুব সম্ভবত বড়দা বলে ডাকত। বাবাকে, কাকু এবং কাকু স্থানীয়রা ‘বড়দা’ বলে ডাকত। বাবা যখন জেঠুকে ‘বড়দা’ বলে ডাকত, ছোটবেলাতে বেশ অবাক হতাম। মনে হত ‘বাবার’ও তাহালে ‘বাবা’ আছে!’ উনি ছিলেন জিওলজিস্ট। চাইবাসা অথবা সিংভূম, মানভূম ছিল ওনার কর্মক্ষেত্র। আমার বাবা মা কলেজ স্কুলে যায়, আর উনি জঙ্গলে অথবা জন মানবহীন রূক্ষ মালভূমিতে ঘুরে বেড়ান। আমার কল্পনার ডেভিড লিভিংস্টোন বা চাঁদের পাহাড়ের শংকরের মত রোমাঞ্চকর চরিত্র । ইনি দু/তিন মাসে একবার কলকাতা থেকে জীপ নিয়ে আসতেন। আমাদের বাড়ীতে একরাত থাকতেন। আগে থেকে খবর দেওয়া থাকত। তাই কোন অসুবিধা ছিল না। জেঠু এলে ভাল রান্না হত। সবচেয়ে ইনটারেস্টিং ছিল জেঠুর জীপটা। আগেকার দিনে জীপে যেমন ত্রিপলের ছাউনি হত, সেই রকম। তখনকারদিনে গাড়ী ব্যাপারটা সম্বন্ধে খুব উচ্চ ধারণা ছিল। জানা ছিল টাটা বিড়লা বা বিশাল বড়লোকেরাই গাড়ী চড়ে। কাগজে পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে, লেখা হত-‘পাত্রের গাড়ী আছে’। মানে হাই স্টেটাস। তাই ওরকম একটা জীপ দাড়িয়ে থাকত বাড়ীর সামনে, মনে মনে বেশ গর্ব হত। আশে পাশের বন্ধুরা এসে জীপে উকিঝুকি মারত, আর আমি ড্রাইভারের সীটে বসে, হ্যান্ডেলটাকে ঘোরাতাম, আর মুখ দিয়ে - ভুরররর .. ভুররর করে আওয়াজ করতাম, যেন গাড়ী চালাচ্ছি, মানে রবিঠাকুরের সেই কবিতাটার, ‘আমি যাচ্ছি মা পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে’ এরকম একটা ফিলিং হত।
মনে আছে জেঠু একবার শীতকালে এসেছিলেন। আগে থেকে বলা ছিল চল্লিশ কিলো বেগুন কিনে রাখতে। কারণ উনি জঙ্গলে ক্যাম্প খাটিয়ে থাকতেন বেশ কিছুদিন, জিওলজিকাল সার্ভে করতেন। আমাদের বাড়ীর সামনে দিয়ে বাঁকে করে চাষীরা বেগুন, টমেটো কফি, মূলো ইত্যাদি শব্জী নিয়ে যেত। তখনকার দিনে ঝাড়গ্রামের বেগুন ছিল বিখ্যাত। রাঁধলে, বেগুন থেকে তেল বেরোত।
মনে আছে উনি আমাকে একটা গল্পের বই দিয়েছিলেন। সেটার নাম ছিল কুলদা কিশোর গল্প চতুষ্টয়। কুলদারন্জন রায়, যিনি ছিলেন উপেন্দ্র কিশোর রায়ের ভাই। চারটে গল্প ছিল- পুরাণের গল্প, কথাসরিৎসাগর, বেতাল পঞ্চবিংশতি ও রবিনহুড। এরমধ্যে রবিনহুড টা সবচেয়ে প্রিয় বই ছিল। রবিনহুডের প্রবাদ প্রতিম তীর ধনুকের খেলা পড়ে, আমার প্রিয় খেলা হয়ে উঠল তীর ধনুক। তখন হাটে লোহার তৈরী তীরের ফলা পাওয়া যেত, সেটা বাঁশের কঞ্চিতে লাগিয়ে তীর বানাতাম। আমাদের যে দুধ দিত, তার বর, বিপিনদা, আমকে একটা ধনুক বানিয়ে দিয়েছিল। তার ছিলাটা ছিল বাঁশের ছিলকা দিয়ে তৈরী
একবার বাবার সঙ্গে কলকাতায় জেঠুর বাড়ী যাই। তখন আমার পাঁচ বছর বয়স হবে। জীবনে আজকালও যে জিনিষ দুটো প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ, সেগুলো প্রথম দেখি জেঠুর বাড়ীতে। এক নম্বরটা হচ্ছে টেলিফোন, দু নম্বরটা হচ্ছে ফ্রীজ। ঐ সময়ে ফ্রিজের সাইজ বড় হত। আজকালকার পাফ ইনসুলেশন তখনও বেরোয় নি। আমাকে নিয়ে গিয়ে ফ্রীজের ভিতরটা জেঠু দেখিয়েছিলেন। এখনও মনে আছে, হাতলটা খুলতেই, কি রকম ধূয়া ধূয়া ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে এল, ভিতরটা হাল্কা নীল আলো জ্বলছিল। জেঠু দেখালেন উপরে বরফ জমে আছে। বিষ্ময়ের পর বিস্ময়। বরফ তো থাকে পাহাড়ের চূড়ায়, বাড়ীতে বরফ, কি আশ্চর্য! এরপর দেখলাম টেলিফোন। কালো রং এর যন্ত্র টা দিয়ে নাকি অনেকদূরে কোন মানুষের সঙ্গে কথা বলা যাবে। তখন জেঠাইমা ছিলেন স্কুলে। জেঠু বল্লেন - এস তোমাকে জেঠী মার সঙ্গে আলাপ করাই। ডায়াল করে আমার হাতে ফোন দিলেন। কিন্তু আমি ছাই জানি না কোনটা স্পীকার কোনটা রিসিভার। জেঠু দেখিয়ে দিলেন। সেই আমার প্রথম ফোনালাপ।
সালটা ১৯৬৫। আমার মা তখন বিটি পড়তে বর্ধমান গিয়েছিল। কোর্সটা হত একবছরের। ঝাড়গ্রামে বিটি কলেজ থাকা সত্বেও মাকে বর্ধমান যেতে হয়েছিল কারন ঝাড়গ্রাম কলেজে মহিলা শিক্ষার্থীদের নেওয়া হত না। মা স্কুল থেকে ফেরার সময় সঙ্গে আরো দুই দিদিমনি, ঝর্ণা পিসি আর সুস্মিতা পিসি থাকত। ওদের বাড়ী ছিল আরো একটু এগিয়ে। মা তখন বর্ধমানে। বাইরের বারান্দায় বসে আছি। ঝর্ণা পিসি স্কুল থেকে ফেরার সময় জিজ্ঞাসা করল-‘মিঠু, মা নেই, তোর মন খারাপ করছে না’? আমি নাকি ঝটিতি জবাব দিয়েছিলাম- ‘ না তো মন খারাপ কেন করবে, রামচন্দ্র চৌদ্দ বছর বনবাসে ছিল মাকে ছাড়া, এটাতো মাত্র একবছরের ব্যাপার’।
ক্রমশঃ
ব্যাডমিন্টন racket আমার খুব প্রিয় ছিলস্কুল-জীবন (পার্ট ৩)
প্রাইমারি স্কুল থেকে একবার পিকনিকে গিয়েছিলাম। লোধাশুলি ছাড়িয়ে বম্বে রোড দিয়ে খড়্গপুরের দিকে যেতে, বাদিকে একটা বড় আমবাগান পড়ত। বাসে ফেরার সময় যে গানটা গাওয়া হয়েছিল সেটা এখনও মনে আছে-‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে’। একবার দিদিমনিরা নিয়ে গিয়েছিলেন টুসু পুজোর মেলাতে। তখন, সেটা হত সাবিত্রী মন্দিরের উল্টোদিকে। একবার গিয়েছিলাম দীঘাতে। যাওয়ার সময় মা দুইটাকা দিয়েছিল মনে আছে। বাসে করে গিয়েছিলাম। ওখানে আমরা কোন একটা বাড়ীতে ছিলাম, যেটা ছিল একটা বালির টিলার উপর। এটুকু মনে আছে যে বালির উপর দিয়ে রোল করতে করতে নীচে নামতে খুব মজা লাগত। একদম ভোরবেলা উঠে একদিন সমুদ্র পাড়ে গিয়েছিলাম। জোয়ারের জল নেমে গিয়েছিল। ভিজে বালি থেকে অনেক ঝিনুক কুড়িয়েছিলাম।
ক্লাসে সহরপাঠিনীদের কথা না বল্লে চলে না। ক্লাস ফাইভের পর বয়েজ স্কুলে পড়েছি। তাই মেয়েদের সান্নিধ্যলাভ প্রাইমারি পর্যন্ত। যে কজনের কথা মনে আছে, তারমধ্যে প্রথমেই মনে পড়ে নন্দিতার কথা। তার ডাগর চোখ, দুই বেণুনী, কোঁকড়া চুল, উজ্জ্বল হাসি সব মিলিয়ে নন্দিতা একটা অমোঘ আকর্ষন ছিল। ওই শিশুবয়সে ওটাকে কি বলা যায়। ইনফ্যচুয়েশন কি? জানি না। তবে এটাও ধ্রুব সত্যি যে প্রথমে ওর কথাই মনে হল। এছাড়া আরো দুটো মেয়ের কথা মনে আছে একজন ছিল কুন্তলা আরেকজন সংযুক্তা। সংযুক্তার বাবা আইটিআই এর প্রিন্সিপাল ছিলেন। অনেক পরে সংযুক্তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। ও তখন যাদবপুরে ম্যাথস অনার্স পড়ত। ফরসা, কোঁকড়া চুল, ঠোঁটের কোণে সবসময় হাল্কা হাসি। কুন্তলার সামনের দাঁতগুলো উঁচু ছিল। আরেকটি মেয়ে ছিল। তার নাম অনিতা কেড়িয়া। মুখটা সবসময় ওর দুখী দুখী থাকত। আরেকজন ছিল মধুমিতা, জাপানি কায়দায় ছাঁটা চুল ক্লিপ দিয়ে আটকে রাখত, যাতে কপালে এসে না পড়ে।
প্রাইমারি স্কুলের শেষ পরীক্ষাটাকে বৃত্তি পরীক্ষা বলা হত। যতদূর মনে হয় প্রাইমারি শিক্ষা বোর্ড ওটা পরিচালনা করত। সীট পড়েছিল কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশনে, যেখানে আমি পরে ক্লাস ফাইভ থেকে ইলেভেন অব্দি পড়েছি। মনে আছে বেঞ্চে সাদা কাগজে আমার নাম আর স্কুলের নাম লেখা ছিল। পাশে যার সীট পড়েছিল তার স্কুলের নাম দেখলাম ‘লেদাবহড়া’ প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের নাম শুনে বাড়ীতে কি হাসি।
প্রাইমারি স্কুলের পাঠ চুকল। ১৯৬৯ সালে ভর্তি হলাম কুমুদ কুমারী ইনস্টিটিউশনে।
আমার হাইস্কুল কে কে আই
গার্লস স্কুলটির নাম ছিল রাণী বিনোদ মঞ্জরী। ওটা ছিল গভর্নমেন্ট স্কুল। নামের ইতিহাসে শুনেছি একজন ছিলেন ঝাড়গ্রামের রাজার মা অন্যজন ঠাকুমা। আমাদের স্কুলটা মহাকুমার সবচেয়ে ভাল স্কুল বলে মান্য হত। বৃত্তি পরীক্ষার রেজাল্ট ভাল ছিল, তাই এডমিশনে কোন অসুবিধা হল না। এটুকু মনে আছে যে আমার নূতন স্কুলে জয়েন করতে দেরী হয়েছিল। তার কারন ছিল বাণীভবনের বার্ষিক সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যে নাটক হয়েছিল তার রিহার্সলে আমায় যেতে হত। ফাংশনটা হয়েছিল শহরের একমাত্র ইনডোর হল দেবেন্দ্র মেমোরিয়াল হলে। আমার পার্টটা ছিল কাশীরাজপুত্রের। মনে আছে বেশ জমকালো ড্রেস পরে, গোঁফ, মাথায় মুকুট আর রাংতা দিয়ে মোড়া তীরধনুক নিয়ে মঞ্চে অভিনয় করেছিলাম।
পুরানো স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে সৌমেন, সুরজিৎ, দেবাশীষ গাঙ্গুলি এই স্কুলে আমার সহপাঠী হল। ফার্স্ট বয়ের তকমাটা সৌমেনের বাঁধা ছিল। আমি ডিসট্যান্ট সেকেন্ড। মায়ের কাছে খুব বকুনি খেতাম -'সৌমেনের মত অতক্ষন পড়তে পারিস না, দ্যাখ তো, ওদের বাড়ীতে অত ভাইবোন, তার মধ্যে কি কনসেনট্রেশন'। স্কুলের মাইনে ছিল পাঁচ টাকা পঁচিশ পয়সা। তাতে তিনটাকা টিফিন ফি যুক্ত ছিল। টিফিন আসত শালপাতার ঠোঙাতে। সকালে হেড কাউন্ট করে লাঞ্চের একটু আগে বেতের ঝুড়িতে করে খাবার আসত। বেশীরভাগদিন চপ-মুড়ি বা গজা টাইপের কিছু থাকত। ডাস্টবিনের কনসেপ্ট বোধহয় তখনো আসে নি। শালপাতার ঠোঙা বায়োডিগ্রেডেবল। তাই চিন্তা ছিল না।
সকাল দশটা কুড়িতে স্কুল শুরু হত এসেম্বলি ও প্রেয়ারের মধ্যে দিয়ে। ‘অসতো মা সদ গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়... এই শ্লোক দিয়ে শুরু হত প্রার্থনা। জায়গাটা ছিল টিচার্স রুমের সামনে। আমি চিরকালই লেট লতিফ। ফলে স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকে জমায়েতের কাছে আসার আগে শুরু হয়ে যেত... ‘ জন গন মন অধিনায়ক। গান শেষ হওয়া পর্যন্ত স্ট্যচু হয়ে কম্পাউল্ডের মধ্যে দাড়িয়ে থাকতে হত।
ফাইভ, সিক্সে পড়ার সময় হেঁটে আসতাম স্কুলে। পিঠে ঝোলান থাকত ব্যাগ। আমার বাড়ী থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার হাঁটা পথ। মাঝে পড়ত রেল স্টেশন। প্রায়ই থার্ড লাইনে ট্রেন দাড়িয়ে থাকত। ট্রেনের তলা দিয়ে প্ল্যটফর্ম উঠলে অনেকটা শর্টকাট হত, নইলে ট্রেনের শেষে গার্ডকেবিনের পাশ দিয়ে ঘুরে আসতে পাঁচ মিনিট নষ্ট হত। থার্ড লাইনে লম্বা মালগাড়ী দাড়িয়ে থাকত। ঝাড়গ্রাম ছিল সাউথ ইস্টার্ন রেলের মেন লাইনের উপর। এই লাইনটা মাইনিং জোনে থাকায় সারাদিনই মালগাড়ী চলত। যদিও বাবা মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল তলা দিয়ে না যাবার, তবুও যেতাম, খালি দেখে নিতাম ইঞ্জিনের হুইসিল বাজছে কিনা।
শাল গাছ আমার চিরকালের প্রিয়। শালপাতার গন্ধ দিয়ে খতু চেনা যেত। শালের জঙ্গল থেকে বসন্তকালে কচিপাতার গন্ধ, শীতের পাতাঝরার দিনে শুকনো পাতার গন্ধ, বর্ষার জলে পুষ্ট শালপাতার বনজ গন্ধ, একে ওপরের থেকে আলাদা ছিল। সিক্স-সেভেনে পড়তে পাতাঝরার দিনগুলোতে বন্ধুদের সঙ্গে পাতাগুলো জড়ো করে সাপের লেজের মত লম্বা লাইন বানিয়ে, তার একপ্রান্তে আগুন জ্বালিয়ে দিতাম। সেটা ধিকি ধিকি জ্বলতে জ্বলতে এগোত। ক্লাসরুম থেকে স্যারের পড়ানো ভুলে জানালা দিয়ে চেয়ে দেখতাম কেমন করে আগুনের শিখা এগিয়ে চলেছে। বর্ষা বা কালবৈশাখীর দমকা হাওয়াতে শালের ফুলগুলি, পাক খেতে খেতে হাওয়ায় ভেসে যেত অনেকদূরে। অবাক চোখে চেয়ে থাকতাম। মনে পড়ে পয়লা মার্চ থেকে দুমাস সকালে স্কুল হত। সুগন্ধি ভাতে, গাওয়া ঘি দিয়ে সিদ্ধ ভাত খেয়ে হেটে স্কুল যেতাম। রেল লাইন পার হয়ে দেওয়ানী কোর্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার পর শুরু হত শাল গাছের জঙ্গল। সেটা শেষ হত গিয়ে হসপিটালের কাছে বড় রাস্তায়। ওই প্রত্যুষে শালের সুবাস আর সূর্য ওঠার আগে শান্ত ধরণীতে পাখির কূজন শুনতে শুনতে ওই পথটুকু দিয়ে হেটে যাওয়ার একটা নিদারুন আকর্ষণ ছিল।
এখনও নিশ্চয়ই শাল পাতার সুবাস তেমনি ছড়ায়, ফুলও হাওয়ায় ভাসে, আজ পঞ্চাশ বছর পর চোখ খুলে সেই অনুভূতি আসে না, বন্ধ চোখে এখনও তাকে তেমনি নিবিড় মমতায় দেখতে পাই।
ক্লাস ফাইভে অংক করাতেন অবনীবাবু। বাড়ী থেকে টুকটাক ফল নিয়ে আসতেন। যে আগে অংক করতে পারত তাকে সেই ফল প্রাইজ দিতেন। হিন্দি স্যার খুব পপুলার ছিলেন। নাম মনে নেই, আমরা হিন্দি স্যার বলে ডাকতাম। উনি ক্লাসে এলে সমস্বরে আওয়াজ উঠত-স্যার গল্প বলুন।
একটা ওনার বলা গল্প কিছুটা মনে আছে। একটা দেহাতী লোক, কোনদিন ট্রেনে চাপে নি, সে যাবে শহরে ট্রেনে চেপে। রেলগাড়ি কেমন দেখতে হয়, জানে না। তার বন্ধু সব শুনে বল্ল- কোন ব্যাপার না, দেখগে, সবসে পহলে এক কালা ডিব্বা আয়েগী, উসকা উপর সে ধূঁয়া নিকলেগা, আউর নীচে সে ছিরকতে ছিরকতে পানি আয়েগা। উসি মে চড় যানা। সেই কথা মাথায় রেখে, লোকটি স্টেশনে এসে পৌছাল। ট্রেন তখনো আসতে দেরী। টিটি বাবু, স্টেশনের পাশে ‘ছোট বাইরে’ করতে এসেছেন। কালো কোট পরে, সিগারেট ধরিয়ে যেই না বসে শুরু করছেন, লোকটা হুড়মুড় করে এসে তার কাঁধে চেপে বসছে আর বলছে-বড়িয়া হুয়া, সই টাইম মে টিরন পাকড় লিয়ে। আর থোড়া লেট হতা তো টিরন ভাগ যাতা।
ক্রমশঃ
তখন স্কুলের উঁচুক্লাসে। রেডিয়ো সিলোন শুনছি
স্কুল-জীবন (পার্ট ৪)
স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন সত্যেন্দ্র নাথ মল্লদেব। তবে আমরা, সবচেয়ে ভয় পেতাম সুধাংশু হোতা কে। উনি ছিলেন এসিস্ট্যন্ট হেডমাস্টার। আমরা উনাকে বাংলার বাঘ বলতাম। বাইরে বেশী জটলা করলে একটা হুঙ্কার ছাড়তেন, সব ছাত্র সুড়সুড় করে ক্লাসে ঢুকে পড়ত। ক্লাস ফাইভে কোন একজন ক্লাসমেটের সঙ্গে ঘুষোঘুষিতে তার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়তে থাকে। পিওন এসে ডেকে নিয়ে গেল টিচার্সরুমে শুধাংশু বাবুর কাছে। ভয়ে হাত পা কাঁপছে , কি শাস্তি পেতে হবে এই ভেবে। নীলডাউন, কানধরে উঠবোস, বেতের বাড়ি, এগুলো খুব কমন শাস্তি ছিল। উনি কিন্তু আমাকে বেশ কড়া করে বকে ছেড়ে দিলেন। আমি নাচতে নাচতে ক্লাসে ফিরে এলাম।
ক্লাস ফাইভে আমার রোল নম্বর ছিল ৩৩। আমার আগের রোল নম্বর ছিল বাদলার, ভাল নাম সুদর্শন। হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার আগে সে জানাল, আমার খাতা দেখে সে টুকবে। রাজী হয়ে গেলাম, কারন বাদলা আমাকে টিফিন পিরিয়ডে আলুকাবলি বা আইসক্রিম খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শ্যামল আর কমল দুই ভাই দুটো ঠেলা গাড়ীতে ঘন্টা বাজাতে বাজাতে টিফিন পিরিয়ডে স্কুল গেটের বাইরে দাঁড়াত। বাদামভাজা, তেঁতুলজলে মশলা দিয়ে আলুকাবলি, চানাচুর খুব বিক্রি হত। গ্রীষ্মকালে আইসক্রীম ওয়ালা আসত। পাঁচ পয়সা দাম। স্যাকারিন গোলা রং মিশান বরফ। সেটা খাওয়ার পর ঠোঁট হয়ে যেত লাল বা হলুদ, আইসক্রিমের কালার অনুযায়ী।
ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে বাজার করতে শিখে গেলাম, কিছুটা দায়ে পড়ে। বাবার প্লুরিসি হয়েছিল। বেশ কয়েকমাস কলেজে যেতে পারে নি। ডাক্তাররা রোগটা বুঝে উঠতেই সময় নিয়েছিলেন। তখন আড়াইশ গ্রাম কাটামাছের দাম ছিল ২টাকা, বেগুন ছিল চল্লিশ পয়সা কিলো।
ক্লাস ফাইভে মলয়ের সাথে পরিচয় হল। ও এসেছিল গিধনী থেকে। ওর বাড়ীটা ছিল স্টেশনের পাশে। একসঙ্গে হেঁটে স্কুল যেতাম। তখন থেকেই ওর সঙ্গে আমার প্রগাড় বন্ধুত্ব। ভাস্কর এসেছিল কলকাতা থেকে। ওর মাসি ছিলেন বেলা দিদিমনি, আমার মায়ের স্কুলে পড়াতেন। আমি বলতাম বেলাপিসি।
আমাদের স্কুলটা চারিদিক দিয়ে শালগাছে ঘেরা ছিল। বড়রাস্তা থেকে গেট দিয়ে ঢুকলে, ডানদিকে সারি সারি রুম, সেখানে এইট অব্দি ক্লাস হত, আর ডানদিকে বিশাল মাঠ। বড় দোতলা বিল্ডিং, যেখানে ক্লাস নাইন থেকে ইলেভেন পর্যন্ত ক্লাস হত, আর তার সামনে ছিল খেলার মাঠ। ক্লাস সেভেনে ওঠার পর বাবা একটা নূতন সাইকেল কিনল, পুরানো সাইকেলটা আমি পেয়ে গেলাম, সেটা হয়ে গেল জীবনের আবিচ্ছেদ্দ অঙ্গ। সাইকেলে স্কুল যাতায়ত শুরু হল। স্কুল ছুটির পর সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা লেগে যেত, বড় রাস্তা দিয়ে কে কত স্পিডে যেতে পারে। সাইকেলে পাম্পার দিয়ে হাওয়া ভরা শিখে নিলাম। পাঁচ পয়সা বেচে যেত। স্কুলের পড়ার বা হোমওয়ার্কের চাপ বেশী ছিল না। দুইমাস সামার ভ্যাকেশন, একমাস পূজার ছুটি, ডিসেম্বরের প্রথমদিকে বাৎসরিক পরীক্ষার পর, জানুয়ারীতে স্কুল খোলা অব্দি ছুটি, সব মিলিয়ে চুটিয়ে সময় কাটত। পরীক্ষার আগে দিনদশেক পড়ে নিলেই হয়ে যেত। বিকালে খেলাধূলাটা নিয়ম করে হত। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে এ্যনুয়াল পরীক্ষা হয়ে যেত। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম, কবে পরীক্ষা শেষ হবে। শেষদিনের পরীক্ষাটা দিয়ে সটান যেতাম ঘুড়ির দোকানে। ঘুড়ি, লাটাই, সুতো, সব কিনে আনতাম। বাড়ীর সামনে একটা বড় মাঠ ছিল। ঐখানে ঘুড়ি ওড়াতাম। তলার দিকে একটা লেজ লাগালে ঘুড়ি বেশ স্টেডী থাকত। পাড়ার ছেলেরা অনেকে মাঞ্জা দিতে জানত। কাচের গুড়ো, আঠা দিয়ে বানান হত। আমার বানানোতে ইনটারেস্ট ছিল না। পয়সা দিয়ে বলতাম- আমার জন্য মাঞ্জা সুতো বানিয়ে দে। শীতকালে ক্রিকেট খুব খেলা হত। পরীক্ষা শেষে প্রায়ই সারাদিন। মাঝে মাঝে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হত। আমরা খেলতাম ক্যাম্বিস বলে। ফুটবলটাই বেশী হত, গ্রীষ্ম, বর্ষা কালে। ফুটবল আমার কাছে ছিল। তখনও আজকালকার মত ফুটবল ছিল না। ব্লাডারটা আলাদা হত। সেটা চামড়ার বলের মধ্যে ঢুকিয়ে পাম্পার দিয়ে হাওয়া ভরতে হত। তারপর ব্লাডারের মুখটা বেধে, চামড়ার বলের মুখটার মধ্যে ঢুকিয়ে লেস বাঁধতে হত। পরে নূতন ধরনের বল এল। তাতে কোন ঝামেলা ছিল না। বলে সোজাসুজি হাওয়া ভরা যেত। সেই সময় আমরা ওটাকে রাশিয়ান ফুটবল বলত।খেলার পর ঘামে ভেজা জামা পরেই যেতাম ডিএম হল লাইব্রেরিতে, গল্পের বই নিতে। বই পড়ার এত নেশা ছিল যে, ওখানে বসেও আরেকটা বই পড়ে ফেলতাম। আমাদের সময় স্বপনকুমারের লেখা দীপক-রতনের গোয়েন্দাগল্প, আরণ্যদেবের কমিকস, মাসিক কিশোর ভারতী বা শুকতারা, এইগুলির খুব চল ছিল।ইনটারেস্টিং বই হলে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে আসতাম। পিছনের বেঞ্চে বসে বেশীরভাগ সময় সুরজিৎ এর সঙ্গে শেয়ার করে পড়তাম। কে কত তাড়াতাড়ি পড়তে পারে তারই কম্পিটিশন। দুর্গাপূজার সময় ছোটদের পুজাবার্ষিকী বেরোত। বাজারে শিবমন্দিরের সামনে মাস্টারমশাইএর বইএর দোকান ছিল। উনার পেপারেরও ডিলারশীপ ছিল। মাস্টারমশাই বলে ডাকলেও, উনি মাস্টার ছিলেন না। ঠোঁটের কোলে সবসময় একটা স্মিত হাসি। পুজাবার্ষিকীর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। অসংখ্য গল্প থাকত। বইগুলোর খুব সুন্দর নাম হত। নীহারিকা, বেনুবীণা, মনিদীপা, শতরূপা-এইসব। প্রথমেই পড়তাম ময়ূখ চৌধুরির ছবিতে গল্প। এছাড়া নারায়ণ গাঙ্গুলি, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শক্তিপদ রাজগুরু, সঙ্কর্ষণ রায়, নরেন মিত্র, লীলা মজুমদার, প্রবোধ সান্যাল আরো অনেক লেখক ছিলেন। ক্লাস সিক্স কি সেভেন থেকে শুকতারার মত আরেকটি ছোটদের মাসিক পত্রিকা বেরোত। দুরন্ত ঈগল বলে দীনেশ চন্দ্র মজুমদারের একটা উপন্যাস বেরিয়েছিল। পটভূমি পামীর মালভূমি, কাশগড়িয়া শহর। কিশোর ভারতী পুজা সংখ্যাও বেরোত।
ক্রমশঃ
স্কুল-জীবন (পার্ট ৫)
তখন ফাইভ-সিক্সে পড়তাম।একজন এ্যংলো ইন্ডিয়ান সাহেব শালবনি কি বিকাশভারতী থেকে মাঝে মাঝে সাইকেল চালিয়ে ঝাড়গ্রাম বাজারে আসতেন। তার মাথায় থাকত হ্যাট আর পরনে হাফ প্যান্ট। বাবার বয়সী, (উনি অবশ্য আরো বয়স্ক ছিলেন), কাউকে হাফপ্যান্ট পরতে দেখি নি। তার আগে কোনদিন সাহেব দেখিনি। ওকে রাস্তায় দেখলেই আমরা খুব উৎসাহিত হয়ে গুড মরনিং বলতাম। উনিও হেসে আমাদের গুড মরনিং বলতেন।
তখন আমরা ফাউন্টেন পেনে লিখতাম। কালি ছিল সুলেখা। পরে চেলপার্ক বলে একটা কোম্পানি এল। তিনরকম কালার বেশী ব্যবহার করতাম। ব্লু, ডার্ক ব্লু আর ব্ল্যাক। বেশীরভাগ পেনে, উপরের অংশটা খুলে কালি ভরতে হত। ড্রপার দিয়ে দোয়াত থেকে তুলে কালি ভরতে হত। এমনি পেন এক/দুই টাকায় পাওয়া যেত, একরকম পেন ছিল দশটাকা দাম, আমরা বলতাম চাইনিজ পেন, সেটার নিবটা খুব ফাইন ছিল আর ড্রপারটা পেনের মধ্যেই এটাচড। ফাইভে পরার সময় আমার একটা চাইনিজ পেন ছিল। আমার খুব প্রিয় ছিল, যত্ন করে সাবধানে রাখতাম। একদিন সেটা শার্টের মধ্যে আটকান ছিল। বাড়ী ফিরে দেখি খালি ঢাকনাটা আছে, পেনটা কোথাও পড়ে গিয়েছে। খুব দুঃখ হল। সামার ভ্যাকেশনের শেষ দিনে একটা খেলা ছিল। চুপিচুপি বন্ধুদের জামার পিছনে কালি ছিটানো। খাতা হত দুইরকম একটা সাদা পাতা, অংক করার জন্য, অন্যটা রুলটানা বাকী সাবজেক্টের জন্য। খাতার কভার পেজে রবীন্দ্রনাথ বা বিবেকানন্দ বা নেতাজীর ফটো থাকত, পাশে লেখা থাকত তাদের বাণী, যেমন-‘জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’ বা ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ভাই ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’।
তখন স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি। দুটো ক্লাসের মাঝে খানিক বিরতি। আমার বন্ধু সুরজিৎ আমার চুল টেনে পালাচ্ছে, আর আমিও পিছনে দৌড়চ্ছি ওকে পেটাব বলে। ক্লাসের দুদিকেই ছিল দরজা। বাদিকের দরজার বাইরে দিয়ে করিডোর, ডানদিকের দরজা থেকে নামলে, কিছুটা ফাঁকা জায়গা, তারপর বেশ কিছু শালগাছের জঙ্গল। অনেকগুলো ক্লাসরুম পরপর। করিডোর দিয়ে দৌড়ে, সব ক্লাসরুম পাক দিয়ে এসে, দেখি, সুরজিৎ ডানদিকের দরজা দিয়ে আবার পালাচ্ছে। আমি দেখছি ধরা মুস্কিল, কি আর করি, শেষ প্রতিশোধের উপায় হিসাবে, পা থেকে চটি খুলে মেরেছি।ঠিক সেই সময়ে, সুধাংশুবাবু ঢুকছিলেন ক্লাস নিতে। দুঁদে মাস্টারমশাই। সবাই খুব ভয় পেতাম। জুতো লক্ষভ্রষ্ট হয়ে সোজা স্যারের গায়ে। ফলস্বরূপ ক্লাসের বাইরে নীলডাউন।
তখনকার দিনে ক্লাসরুমে ফ্যানও ছিল না। এখন ভাবি, ফ্যান ছাড়া কোন কষ্ট তো হত না। তখনকার সময়ে সব স্যারেরা ধুতি পাঞ্জাবি পরে আসতেন। আদিত্যবাবু আসতেন অনেকদূরে বৈতা বলে একটা গ্রাম থেকে রোজ সাইকেল চালিয়ে, খুব অবাক হতাম, কারন বৈতা ছিল ১০/১২ কিমি দূরে। আশুবাবু ছিলেন, ক্লাসে এসে চেয়ারে মেরুদন্ড সোজা করে বসে থাকতেন আর সবাইকে বলতেন সোজা হয়ে বস।
রাধাগোবিন্দবাবু ইংরাজী পড়াতেন। তাকে ক্লাসে হাতপাখা ছাড়া দেখেছি বলে মনে পড়ে না। লোমশ চেহারার ছিলেন। কানের মধ্যে অনেক চুল ছিল। অকৃতদার ছিলেন। কানাঘুষোয় শুনতাম, উনি যার সঙ্গে প্রেম করতেন, তার নাকি বিয়ে হয়েছিল ওনার দাদার সাথে। বেচারা সেই দুঃখে চিরকুমার রয়ে গেলেন। একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল। ক্লাস ইলেভেনে, ইংরাজী টেস্টবুকের একটা গল্পে একটা ওয়ার্ড ছিল ‘হার্লট’। উনি সাধারনত, একহাতে পাখার হাওয়া খেতে খেতে, অন্যহাতে বই ধরে ইংরাজী লাইন পড়ে তার তর্জমা করতেন। হার্লটের মানেটা, আগেই ডিকশনারি ঘেটে জেনে নিয়েছিলাম। ওই লাইনটা পড়ার সময় সবাই মিটমিট করে হাসছি, আর প্রতীক্ষা করছি, উনি কি বলেন। একটু আমতা আমতা করে বলেছিলেন ‘খারাপ মেয়েছেলে’!
মনোরঞ্জন বাবু ছিলেন পিটি টিচার। খুব অমায়িক ব্যবহার। একমাত্র উনি আর গিরিজাবাবু প্যান্ট-শার্ট পরতেন। ফিজিক্স পড়াতেন হারাধন বাবু। খুব ভাল স্যার ছিলেন। ক্লাস নাইনে মেজারমেন্ট পড়ানোর সময় একটা ইনট্রোডাক্টরি লেকচার দিয়েছিলেন, সেটা এখনো মনে আছে। স্যারে ও বন্ধুরা কলেজে পড়াকালীন দীঘাতে সাইকেল করে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় যাকেই জিজ্ঞাসা করেন, সেই বলে-‘এই, আরেকটু গেলেই দীঘা। সেই ‘আরেকটু’ আর শেষ হয় না। তখনই বলেছিলেন, যদি দূরত্বটা কিলোমিটারে বা মাইলে জানতে পারতেন তবে একটা সুস্পষ্ট ধারনা হত। শশাঙ্কবাবু আমাদের কেমেস্ট্রী পড়াতেন। তার আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল। ভাল গান করতেন হারমেনিয়াম বাজিয়ে। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উনি পরিচালনা করতেন।
সালটা ১৯৭৫। তখন ক্লাস ইলেভেন এ পড়ি। সেটা স্কুলের গোল্ডেন জুবিলি ইয়ার। বড় করে ফাংশান হয়েছিল, দুই/তিনদিন ধরে। একটা নাটক হয়েছিল। আমি নাট্যকার সেজেছিলাম। প্রায় সব সিনেই আমার উপস্থিতি ছিল। তখনকার দিনের অরাজক অবস্থা নিয়ে থিমটা ছিল। চালে কাঁকর মেশানো, ভেজাল তেল, পুলিশের ঘুষ খাওয়া ইত্যাদি নিয়ে স্যাটায়ারিস্টিক নাটক।. লাস্ট সিনে এরকম অরাজক অবস্থা দেখে, আমার অজ্ঞান হয়ে স্টেজে পড়ে যাওয়ার কথা।তারপর অন্ধকার হয়ে ড্রপসিন পড়বে। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে তো গিয়েছি, কিন্তু লাইটও নেভে না, পর্দাও টানে না। দর্শকদের তালি বাজানো শেষ। মিনিট দুয়েক পরে চোখ পিটপিট করে বলেছি-‘লাইটটা বন্ধ কর না’। দর্শক আসন থেকে হাসির রোল। বুঝলাম গড়বড় করে ফেলেছি।
ক্রমশঃ
স্কুল-জীবন (পার্ট ৬)
হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষাতে প্রত্যেক সাবজেক্টের দুটো করে পেপার হত। তিনঘন্টা ধরে পরীক্ষা। তবে স্কুলে টেস্ট পরীক্ষা হত আড়াই ঘন্টায়, যদিও প্রশ্নপত্র হত তিনঘন্টার হিসাবে। ক্লাস নাইন থেকে পরীক্ষার সময় ঘড়ি পরে যেতাম। ঘড়ি পরলে মনে হত বেশ বড় হয়ে গিয়েছি, কারন তখন স্কুলে কেউই ঘড়ি পরত না।
ক্লাস নাইনে মহকুমা লেভেলে একটা পরীক্ষা হয়েছিল। মহকুমাতে একজন কি দুজনকে সিলেক্ট করা হবে স্কলারশিপের জন্য। ক্লাস নাইন থেকে ইলেভেন পর্যন্ত বছরে পাঁচশ করে টাকা। আমি ওটা পেয়েছিলাম। যদিও ওই টাকার প্রত্যক্ষ সদ্ব্যবহার করতে পারি নি। কারন টাকাটা বাবা ব্যাঙ্কে জমা করে দিত। বোঝাত-‘ দ্যাখ ইনটারেস্ট নিয়ে তোর টাকাটা সামনের বছর এত….., পাঁচ বছর পর কম্পাউন্ড ইনাটারেস্টে এত……’। টাকাটা আনতে মেদিনীপুর ডিআই অফিসে যেতে হত।স্যারের সঙ্গে বাসে করে যেতে হত, রেভিনিউ স্টাম্প লাগিয়ে তুলতে হত।
ক্লাস টেনে পড়ার সময়, মহকুমা লেভেলে, একটা সাইন্স পরীক্ষা দিতে ঘোড়াধরায় গিয়েছিলাম। বোধহয় একটু আগেই পৌঁছেছিলাম। হলের বাইরে দাড়িয়ে আছি। শুনলাম ভিতরে এখন বাংলা রচনা পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। ওটা শেষ হলে তবে সাইন্স পরীক্ষা। বাইরে বেশ গরম লাগছিল। কি মনে হল হলে ঢুকে স্যারকে বল্লাম’ আমি রচনা পরীক্ষায় বসতে চাই’। পরীক্ষকরা এলাও করে দিলেন। যদিও আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্যানের তলায় বসে শরীরটাকে ঠান্ডা করা। তিনখানা টপিক অনেকদিন আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে থেকে একটা এন্যাউন্স করা হবে হলে, পরীক্ষা শুরুর আগে। আমার টপিকের ব্যাপারটা আগে থেকে জানা ছিল না। তাই ঝালিয়ে আসার স্কোপ ছিল না। টপিক যেটা এসেছিল, সেটার বিষয় ছিল ‘শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে নারীচরিত্র’। গোটা দুই তিন শরৎচন্দ্রের বই পড়া ছিল। সেই স্বল্পজ্ঞানকেই পাথেয় করে লিখে ফেললাম রচনা। পরে দেখি সাইন্স আর রচনা দুটো পরীক্ষাতে আমি সেকেন্ড হয়েছি।
ক্লাস এইটের পর স্ট্রীট চুস করতে হত সাইন্স, আর্টস কমার্স। পড়াশুনায় একটু ভাল হলে সবাই সাইন্স নিত। সাইন্সে আবার একটা ফোর্থ সাবজেক্ট নিতে হত। আমাদের স্কুলে বায়োলজি আর মেকানিক্স ছিল। মেকানিক্স নিলে নাকি অনেক নম্বর ওঠে, কিন্তু বায়োলজি থাকলে মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং দুটোরই লাইন খোলা থাকে। সাইন্সে যে আমার অধিক আগ্রহ ছিল তা নয়, কিন্তু ওই যে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে চাকরী পাওয়া সুবিধা, তাই সাইন্স লাইন। আজকাল দেখি ভাল স্টুডেন্টরা কমার্স পড়ছে।
ক্লাস টেনে আমাদের স্কুলে কৃপাসিন্ধু বলে একটি ছেলে ভর্তি হল। শুনলাম সে ননীবালা স্কুলের ফার্স্ট বয়। আমাদের স্কুলটির নাম বেশী ছিল, তাই ওকে প্রথমে ধর্তব্যের মধ্যে আনি নি। তারপরে সে ছিল খুব শান্ত। রাস্তা দিয়ে হনহন করে স্কুলে হেটে এসে ক্লাসে ফার্স্ট বেঞ্চে বসত । রাস্তা দিয়ে আসার সময়, হাতটা ভাঁজ করে বগলের কাছে বই, খাতা থাকত। মাথাটা সোজা, চোখদুটো নাকবরাবর, অনেক দূরের দৃশ্যে ধাবমান। মন্মথবাবুর অংক ক্লাসে, অংকটা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে, আমাদের দিকে ঘুরে শুরু করতেন -‘আমি করছি কি’ , এই বলতে বলতে কৃপাসিন্ধু অংক কষে হাজির স্যারের কাছে। বাকী সময়টা ওয়ান টু ওয়ান চলত। আমরা কয়েকজন তখন সাইড দরজা দিয়ে হাওয়া। কৃপাসিন্ধু ক্লাসের ফার্স্ট বয় হয়ে গেল। আমি যথারীতি ডিসট্যান্ট সেকেন্ড। অমিত রায় বলে আরেকজন ভাল ছাত্র ছিল। তার দাদাও আমাদের সঙ্গে পড়ত। মেয়েদের কথা উঠলে অমিতের কানদুটো লাল হয়ে উঠত। সম্প্রতি খবর পেয়েছি এখন একজন নামকরা সাধু। জীবনের ১১৪ চক্রের সঙ্গে আর্টিফিশিয়াল ইনটালিজেন্স যোগ করে গোটা সাত আট বই লিখে ফেলেছে। অনলাইনে এই ব্যাপারে ক্লাস নেয়। ক্লাসের অন্য বন্ধুদের মধ্যে তারক চৌধুরি, অমরেশ মাহাত (নাড়ু), প্রত্যুষ, মানব, বলরাম, ছোটকু, মনোজিৎ, পমপম, সুমিত, গৌতম, প্রদীপ ষড়ঙ্গী, এদের কথা মনে আছ। টেন, ইলেভেনে অনেক প্রাকটিকাল ক্লাস থাকত। সাধারনত টিফিন পিরিয়ডের পর। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সাইকেল নিয়ে টো টো করে দূরে দূরে ঘোরার একটা নেশা ছিল। এতে সাধারনত সঙ্গী হত মলয়, ভাস্কর, সুরজিৎ, প্রদীপ। ভাস্করের একটা লেডিস সাইকেল ছিল। ওটা নিয়ে আমরা ওকে বেশ ক্ষাপাতাম। একবার এক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় একটা মানুষের মাথার খুলি পেয়েছিলাম। কাছে একটা গ্রামের রাস্তায় সাইকেলে ডিসপ্লে করতে করতে আসছি। গ্রামের কিছু বৌ-বাচ্চা সেই দেখে চোঁ-চাঁ দৌড়।
ক্রমশঃ
স্কুল-জীবন (পার্ট ৭)
একবার আমি, মলয়, ভাস্কর সুরজিৎ মিলে গিয়েছিলাম চিল্কিগড় হয়ে গিধনি।গিধনি ছিল ঝাড়গ্রামের পরের স্টেশন। ওর পরেই আসত ঝাড়খন্ডের চাকুলিয়া। তখন জায়গাটা বিহার ছিল, ঝাড়খন্ড তৈরী হয় নি। সেখান থেকে পড়িহাটি দহিজুড়ি রাস্তা হয়ে ফিরে এলাম। রাস্তায় পড়েছিল শালের জঙ্গল। সব মিলিয়ে পঞ্চাশ কিলোমিটার।
ঝাড়গ্রামের কাছে দুধকুন্ডীর মাঠে ছোটবেলায় সাইকেল চালিয়ে যেতাম। একটা বিশাল মাঠ। এদিক থেকে ওদিক দেখা যায় না। একবার ইন্দিরা গান্ধী ঐ মাঠে সভা করেছিলেন। আমি গিয়েছিলাম সাইকেল করে। অনেক ভীড় ছিল। মা স্কুল থেকে ভলেন্টিয়ার হয়ে গিয়েছিল। একদম সামনে থেকে তাকে দেখেছে। তখন জানতাম না ওটা ww 2 তে air strip ছিল। গুগল ঘেটে জানলাম। একবার শুনলাম ছয় সাত কিলোমিটার দূরে কলাবনির কাছে, কংসাবতী ক্যানালের কাছে কোন সিনেমার শুটিং হচ্ছে। কয়েকজন মিলে স্কুল কেটে সাইকেল চালিয়ে গিয়েছি শুটিং দেখতে। লোকজনদের জিজ্ঞাসা করে কাঁকড়ের রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে তো পৌঁছেছি। ক্যানেলের পাড় দিয়ে সাইকেল চালিয়ে উঠে দেখি একটা নাচের সিন হচ্ছে। কয়েকটা লোক ডান্ডাতে চৌকো ফ্রেমে চকচকে কিছু নিয়ে দাড়িয়ে। একট্রেসকে চিনতে পারলাম। তার নাম ছিল প্রেমা নারায়ন। পরে জেনেছিলাম ওই ডান্ডাগুলোকে রিফ্লেক্টর বলে। হঠাৎ দেখে একটা জীপ আসছে। জীপ দেখেই, সুরজিৎ বল্ল-তাড়াতাড়ি পালা। যেখানেই বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়। জীপের মধ্যে সুরজিতের বাবা। উনি কংসাবতী প্রোজেক্টের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। স্কুল পালিয়ে এসেছি জানলে, পাক্কা সবার বাড়ী খবর যাবে। উনার চোখ এড়িয়ে আমরা পালিয়ে বাঁচালাম।
১৯৭৪/৭৫ সালে শুরু হল ঝাড়গ্রাম মেলা। ২৩শে জানুয়ারী থেকে একসপ্তাহ ধরে মেলা চলত। প্রথম কয়েক বছর মেলাস্থান ছিল আমাদের স্কুল। সাতদিন ছুটি। মাঠে নানাধরনের স্টল। বড় নাগরদোলা, সার্কুলার টয় ট্রেন সব রকম এনটারটেনমেন্ট ছিল। অদিবাসীদের কালচারাল প্রোগ্রাম, সাঁওতালি নাচ হত। আমাদের ক্লাসরুম গুলোতে নানারকম এক্সিবিশন হত। আমি আর সুরজিৎ মিলে একটা রেডিও ট্রান্সমিটার আর রিসিভার বানিয়েছিলাম। প্রাইজেও পেয়েছিলাম। বিনোদ মঞ্জরীর আমাদের ক্লাসের মেয়েরাও এক্সিবিশন করেছিল। আমরা বারবার ঢুকে ওদেরকে নানারকম প্রশ্ন করতাম এক্সপিরিমেন্টের উপরে। ওরা দেশলাই কাঠি দিয়ে একটা খেলা দেখাচ্ছিল। যেটুকু মনে আছে, সেটা হচ্ছে দুটো কাঠি সরিয়ে ‘ইকোয়ালটু’র দুদিকটা মেলাতে হবে। আমরা পারছিলাম না। মেয়েটি পরে দেখিয়ে দিল দুটো কাঠি সরিয়ে একদিকটা হল ওয়ান অন্যটা রুট ওয়ান। আমি বল্লাম ‘এটা ঠিক উত্তর না, রুট ওয়ান ইজ ইকোয়াল টু প্লাস মাইনাস ওয়ান হয়। পরে রাস্তায় দেখা হলেই ওকে রুট ওয়ান বলে খ্যাপাতাম। শেষে ও রুট ওয়ান নামেই ফেমাস হয়ে গেল।
স্কুলের দুইটি অনুষ্ঠানে, ছুটির দিন হলেও খুব উৎসাহের সাথে যেতাম। একটা হচ্ছে সরস্বতী পুজো, অন্যটা ছিল স্বাধীনতা দিবস। সরস্বতী পুজার দিন দুপুরে ভোগে খিচুড়ি, লাবরা, চাটনি, মিষ্টি থাকত। স্বাধীনতা দিবসে প্রভাতফেরী, এনসিসির কুচকাওয়াজ, পতাকাত্তোলন ও পরিশেষে মিষ্টি আর নিমকির প্যাকেটের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটত।
আমরা ছিলাম ১১ ক্লাসের শেষ হায়ার সেকেন্ডারি ব্যাচ। ফাইনাল পরীক্ষার আগে তিনমাস সময় ছিল। আমাদের সময় টেস্ট পেপার থাকত। বিভিন্ন স্কুলের টেস্ট পরীক্ষার সব সাবজেক্টের কোশ্চেন পেপার। ঘড়ি ধরে ওগুলো সলভ করতাম। সীট পড়েছিল রাণী বিনোদ মঞ্জরী স্কুলে। সেই প্রথম মেয়েদের স্কুলে ঢোকা। কেমেসট্রি ফার্স্ট পেপারে। আমার সামনের সামনের সীটে কোন পড়াশুনায় ভাল কেউ ছিল। কথা ছিল ও কোনটা না পারলে আমি বলে দেব আর বিনিময়ে আমি কোনটা না পারলে ও বলে দেবে। এই চুক্তি খালি এক লাইনের যে উত্তর হত, যেমন ইকোয়েশন সলভের জন্যই ছিল। প্রবলেমটা হল আমাদের দুজনের মাঝে যার সীট পড়েছিল তার নাম ছিল চন্দন। কোঁকড়া চুল। ওর বাবা পুলিশে চাকরী করতেন। চন্দন ছিল তোতলা। একটা প্রশ্নের উত্তর ওর থ্রু দিয়ে দিতে গিয়ে ওর তোতলামির জন্য গার্ডের কাছে ধমক খেলাম। সেকেন্ড হাফে দেখি আমার সীট করে দেওয়া হয়েছে যেখানে টিচার বসে পড়ান সেই চেয়ার টেবিলে। টেনশনের চোটে সেকেন্ড পেপারটা খারাপ হয়ে গেল। অথচ কেমেস্ট্রি আমার ভাল লাগত, প্রিপারেশনও ভাল ছিল। কিন্তু লেটার মার্কস এল না।
তখনকার দিনে রেজাল্ট দেখার জন্য অনলাইনের ব্যাপার ছিল না। তখন গেজেট বেরোত। সেটা কেউ কলকাতা থেকে নিয়ে আসত। ওখানে রোলনম্বরের পাশে ডিভিশন ও মার্কস লেখা থাকত। একদিন খবর পাওয়া গেল গেজেট এসেছে। গিয়ে দেখি বিশাল ভীড়। চারআনা পয়সা দিতে হত নম্বর জানার জন্য। ঠেলাঠেলি করে সামনে পৌছে চারআনা দিয়ে রোলনম্বর বল্লাম। ফার্স্ট ডিভিশন ও নম্বর ছিল ৭২৩। আমার হাইস্কুলের পাঠ সাঙ্গ হল।
দেবদত্ত
২২/০৪/২০২১






অত অল্প বয়স থেকে অত বন্ধু বান্ধবীদের নাম মনে রাখা একটা বিরাট স্মৃতি শক্তির পরিচায়ক তাতেই বোঝা গেছিল আপনি একজন ক্ষুরধার বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। প্রায় একই বয়সী হয়েও আমার স্মৃতি তে ছোট বেলার কিছু কিছু ঘটনা মনে পড়ে করো নাম মনে পড়া তো দুস্কর।এই কারণেই এতো মন দিয়ে আপনার দীর্ঘ মনোগ্রাহী লেখা পড়লাম।
ReplyDelete