মাত্রাজ্ঞান (রম্যরচনা)


মাত্রাজ্ঞান

ব্যাবহারিক জীবনে মাত্রাজ্ঞান ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন ধরুন আমাদের কলেজের এল্যমনি এসোসিয়েশনের এক দাদা, শৈলেশদা, সেমিনারে ধুতি, পাঞ্জাবি আর কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে আসতেন, আর কালচারাল ফাংশন বা পিকনিকে তাকে দেখা যেত সুট, বুট, টাইতে। এটাকেই বলা যায় মাত্রাজ্ঞানের অভাব।

মাপ ব্যাপারটা জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, তবে কোন কোন ক্ষেত্রে মাপও পরিবর্তনশীল।

ছোটবেলায় রেডিমেড প্যান্ট শার্ট কম পাওয়া যেত। বাবলুদার দোকানে গিয়ে মাপ দিতে হত। ঝাঁকড়া চুল পাতলা চেহারার বাবুলদার গলা থেকে সবসময় একটা মাপের ফিতা ঝুলত। প্রথম ফুলপ্যান্ট বানাই ক্লাস নাইনে পড়তে। ফুলপ্যান্ট মানে বড় হওয়ার প্রথম মাপ। স্কাইব্লু কালারের টেরিকটের প্যান্টপিস কেনা হল। তখনকার দিনে মফতলাল, ডিসিএম, এদের কাপড়ই বেশী চলত। খবর পাওয়া গেল বাবলুদার দোকানে মাসখানেক আগে বানাতে দিলে, তবেই দুর্গাপুজোর আগে ডেলিভারি পাওয়া যাবে। প্যান্টের মাপে কোমরের ঘের বা লম্বার মাপ নিয়ে বলার কিছু থাকত না, শুধু বলতাম তলায় কাপড় রাখতে। সেটা বাড়ন্ত বয়েস। তাই লম্বা হলে যাতে লেংথ বাড়ান যায় তারই দূরদর্শিতার পরিচয়। discretionary পাওয়ারটা ছিল প্যান্টের তলার ঘেরের মাপ নিয়ে। তখন চোঙা প্যান্টের জমানা ১৩ না ১৩. না ১৪ এই নিয়ে চুলচেরা বিচার করে নিজেকে বলতে হত। বেশী ছোট দিলে পরতে বা খুলতে এক্সারসাইজ করার নহবত আসত, খাটে বসে টেনে খুলতে হত। আবার ঘের বেশী মানে বন্ধুদের কাছে প্রেস্টিজ পাংচার। বছর দুয়েক ঘুরতেই ব্যাপারটা উল্টে গেল। হিন্দি সিনেমার হিরো বচ্চন কি রাজেশের দেখাদেখি বেলবটম প্যান্টের যুগ শুরু হল। তখন প্যান্টের তলাটা মাটিতে ধুলো না ঘসটালে মনে শান্তি হত না। ঘেরের মাপ হয়ে গেল ২০-২২ ইঞ্চি। তখন গ্যাভার্ডিন বলে একরকম মোটা কাপড় পাওয়া যেত। সেটা দিয়ে বেলবটম বানালে তলার দিকটা বেশ ফুলে থাকত। আজকাল রেডিমেড জামাকাপড়ের কল্যাণে টেলারিংশপের রমরমা অনেকটা অন্তর্হিত।

বাজার করার সময় আলু, পেয়াজ বা তরকারি যাই কিনি না কেন, দাড়িপাল্লায় মাপার জন্য তুলে দিতে হত। ক্লাস ফাইভ থেকে বাজার করার সুবাদে মাপের ব্যাপারে ধীরে ধীরে পারদর্শী হয়ে উঠেছি। এক কিলো আলু ওজন করতে দিলে, খুব কমবারই বেশী বা কম হয়।

মাপামাপির মাত্রায় একটা গোজামিলের গল্প মনে পড়ল। গল্প মানে সত্যি ঘটনা।আমার এক সিনিয়ার কলিগ, গুরুপদদা সত্তর দশকের প্রথম দিকে দুর্গাপুর সিমেন্ট সদ্য সদ্য চাকরি পেয়েছেন।  প্রথম ডিউটি পড়ল, গেট দিয়ে যেমেটেরিয়াল যেমন জিপসাম বা লাইমস্টোনের ট্রাক ঢুকলে সেটার মেজারমেন্ট করা। প্রথমদিকে ট্রাকের দৈর্ঘ, প্রস্থ, উচ্চতা মেপে, গুন টুন করে একদম এলিমেন্টারি মেথডে মেজারমেন্ট চলছিল। তাতে গেটের বাইরে ট্রাকের লাইন দীর্ঘতর হতে লাগল। বস এসে বোঝালেন শর্টকাট মারতে হবে।তোমার ট্রাকের উপরে ওঠার দরকার নেই। যে হেল্পার থাকে, তাকে বলবে মেজারিং স্টিকটা ঢুকিয়ে যেখান অব্দি লাইমস্টোনের লেভেল, আঙুলটা চেপে তোমায় দেখাবে, তখন তুমি লেনথ মেজার করে নিও। প্রত্যেক ট্রাকের নম্বর অনুযায়ী আগে থেকে দৈর্ঘ, প্রস্থ নিয়ে রাখবে, কারন যে ট্রাকগুলো তুমি এখন দেখছ, এরাই সবসময় মাল নিয়ে আসে। গুরুপদদা ভাবলেন কেল্লা ফতে। সত্যিই মাপামাপি দুরন্ত গতিতে চলতে লাগল। বেশ কয়েকদিন পরে বস এসে বললেনতুমি কি ঠিক করে রিডিং নিচ্ছ, আগের থেকে মাল কম আসছে মনে হচ্ছে, অথচ তোমার মাপ অনুযায়ী তো আগের কোয়ান্টিটি আসছে গুরুপদদা ভাবলেন কি হল, মন দিয়ে কাজ করছেন, যখন হেল্পার হাইট মাপে গুরুপদদা নিজে দাড়িয়ে দ্যাখেন। বস বল্লেনতুমি এক কাজ করবে, হেল্পার মেজার করার পর তুমি ট্রাকে উঠে চেক করবে বসের আজ্ঞা শিরোধার্য করে পরের দিন সেইমত ট্রাকে উঠলেন। স্টিকটা নিয়ে পুরো পাটাতন অব্দি ঠেকিয়ে যা উচ্চতা পেলেন, সেটা হেল্পারের দেওয়া উচ্চতার থেকে দেড় ইঞ্চি কম। পরে রহস্য উদ্ঘাটন হল। হেল্পার স্টিকটা মেজার করে উঠানোর সময়, আঙুলটা সাঁট করে একটু উপর দিকে স্লিপ করিয়ে নিত। বস পরে বলেছিলেনকলেজে অনেক মাপামাপি পড়েছ, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে হলে তৃতীয় নয়ন থাকতে হবে। বুকিশ নলেজের বাইরে প্রাকটিক্যাল এক্সপিরিয়েন্সের দামটাই প্রফেশনাল জীবনে বেশী কাজে আসে।

মাপ এদিক ওদিক হওয়া নিয়ে সবচেয়ে ভাল গল্প ছিল বাদরের রুটি ভাগ। গল্পটা নিশ্চয়ই সবার জানা আছে। তাই লেখার কলেবর বাড়াচ্ছি না।

কলেজে আমার এক ক্লাসমেট ছিল, সে ডে স্কলার। হোস্টেলে মাঝে মাঝে আসত। ক্লাস টেস্টের আগের সন্ধ্যেতে এসে জিজ্ঞাসা করত কতটা পড়তে হবে। যখন বলতাম এই এই চ্যাপ্টার আছে, তখন বইএর পাতা আঙুল দিয়ে মেপে আন্দাজ করে বলত-‘ঠিক আছে, এটুকু রাতে পড়ে নিলেই হবে, এখন চল টিটি খেলি গিয়ে এরকম ছেলের মাপজ্ঞান নিয়ে কোন কথা হবে না।

ট্রেনের টাইমিং দেখে মাপ করে ঠিক সময়ে স্টেশনে পৌঁছন আরেকটা মাপকাঠির নিদর্শন। আমার অভ্যাস ছিল স্টেশনে ইলেভেনথ আওয়াজে পৌঁছানোর বিয়ের পরে সেই হিসাব করে অস্টমঙ্গলায় কলকাতায় আসার জন্য স্টীল এক্সপ্রেস ধরতে গিয়ে সদ্যপরিণীতা বঁধুকে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে দৌড় করিয়েছিলাম।

দূরত্বের ব্যাপারে মাত্রাজ্ঞানের ব্যাপরটা আরো ভাল বোঝা গেল যখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পর আমরা স্কুলের কয়েকজন বন্ধু মিলে ঘাটশীলা বেড়াতে গেলাম। ট্রেন থেকে নেমে শুনলাম নদীর তীরে কপার ফ্যাক্টরির কাছে যে জায়গাটা সেটা তিন কিলোমিটার দূরে। জায়গাটা নাম ছিল মৌভান্ডার।তখন অল্পবয়েস, সবাই মিলে ঠিক হল রাস্তা নয় আমরা নদীর পার ধরে যাব। বেশ এডভেঞ্চার হবে। বেশ কিছুটা ঘুরে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে শুরু করছি, ফ্যাক্টরির চিমনিটা দেখা যাচ্ছে। মনে হল অল্প হেঁটেই পৌছান যাবে। নিজেরাই নিজেদের বুদ্ধির তারিফ করছি। বেশ কিছুটা হাঁটার পর সবিষ্ময়ে লক্ষ্য করলাম চিমনিটা অতদূরেই দেখাচ্ছে। দুপুর হয়ে আসছে। রোদ বেশ চড়া। সঙ্গে খাবার জল নেই। শার্টটাকে মাথার উপর দিয়ে ঘন্টা দেড়েক পরে যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে আমাদের অবস্থা ল্যাজে গোবরে।

টাইমের ব্যাপারে আশ্চর্য মাত্রাজ্ঞান দেখেছিলাম, আমাদের স্কুলের পিওন উমেশদার। ধুতি, হাফশার্ট পরা একটু গোলগাল চেহারা। ক্লাস শেষ হওয়া বা স্কুল ছুটির ঘন্টাটা উমেশদাই বাজাত। উমেশদার কাছে কোন ঘড়ি ছিল না। আমরা যদি টাইম জিজ্ঞাসা করতাম, উমেশদা হাত উল্টে কাল্পনিক ঘড়ি দেখে টাইম বলত এবং আশ্চর্যজনক ব্যাপার টাইম একদম ঠিক  বলত।

        স্কুলে ফিজিক্স পড়ার সময় একটা রিফ্লেক্সনের এক্সপিরিমেন্ট করতে হত। বাংলায় আমরা বলতাম প্রতিফলন। একটা সাদা কাগজে তিনটে পিন একটু এঙ্গেলে সমান্তরাল লাইনে রেখে সামনের মিরারে রিফ্লেক্শন দেখে সমান্তরাল ভাবে পিন বসাতে হত। তারপর কাগজ থেকে পিন সরিয়ে লাইন টেনে দেখতে হত মিরারএর পারপেন্ডিকুলার লাইন থেকে দুসাইডের এঙ্গেল মিলছে কিনা। এতে চোখের মাত্রাজ্ঞানটা জরুরী ছিল। আমরা ফাঁকি মেরে আগে দুদিকের এঙ্গেল সমান ভাবে মেপে লাইন টেনে তারপর পিন বসিয়ে দিতাম।

চোখের এরকমই এক মাত্রাজ্ঞানের কথা বলি। অনুপ ছিল আমাদের কলেজের ছেলে, আমার থেকে জুনিয়ার, এক অফিসেই তখন চাকরি করি। একদিন বাড়ীতে এসে সোফাতে বসে ঘরের কোনে রাখা একটা গাছকে দেখিয়ে সুমিতাকে বল্ল - ‘বাঃ, সুন্দর গাছ কিনেছেন তো বৌদি, তবে দিল্লির গরমে গাছ বাঁচান মুস্কিল আমি বল্লাম যেআরে জন্যই তো আর্টিফিসিয়াল প্ল্যান্ট কিনেছিঅনুপ বল্লআরে না, অরিজিনাল লাগছে বললামকাছে গিয়ে ভাল করে দ্যাখো। অনুপ উঠে গিয়ে দেখল, তারপর পাতায় হাত লাগিয়ে বললকি যে বলেন বৌদি একদম জ্যান্ত গাছ। একে হাইট অফ মাত্রাজ্ঞান বলা যায়।

সাধারণ মাত্রাজ্ঞান লাটে ওঠে যখন মানুষ কোন গুরুদেব বা গুরুজনের কথায় সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখে। আমার এক কলিগ কাম ঘনিষ্ঠ বন্ধু একদিন কথায় কথায় জানাল, তার বাবা মা সম্প্রতি হৃষিকেশ, হরিদ্বার ঘুরে এসেছে। দু জায়গাতে পুণ্যঅর্জনের জন্য স্নান করতে হয়েছে। ওর বাবা বলেছেন হরিদ্বারের জল হৃষিকেশের গঙ্গাজলের থেকে বেশী ঠান্ডা। আমি সাধারন বুদ্ধিতে বল্লামসে কি করে হবে, হৃষিকেশ তো হরিদ্বারের আপস্ট্রীমে, তাছাড়া হৃষিকেশের হাইট বেশী, ঠান্ডা তো ওখানেই বেশী হবে। লজিক্যালি তাই হয়, কিন্তু আমার বন্ধু বেশ রেগে গিয়ে বললআমার বাবা বলেছে, অতএব নিশ্চয়ই হরিদ্বারের জল বেশী ঠান্ডা। বুঝলাম, বেশ পিতৃভক্ত ছেলে, এই ব্যাপারে মাত্রাজ্ঞানের কিঞ্চিৎ ঘাটতি, তাই ওকে না ঘাটানো সমীচীন মনে করলাম।

দেবদত্ত

৩০/০৪/২১

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments