কলকাতার সরকারী হাসপাতালের অভিজ্ঞতা
নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এই সেই কোভিড ইউনিট। বাইরে ডাকিনী যোগিনী মূর্তি !
সরকারী হাসপাতাল
করোনা চিকিৎসায় সরকারী হাসপাতালের গুনগান শুনছি। এব্যাপারে আমারও কিছুদিন আগে সরকারী হাসপাতালের অভিজ্ঞতা হল, তবে করোনা আক্রান্ত হিসাবে নয়, রোগীর আত্মীয় হিসাবে। কলকাতা থেকে আমার শ্যালকের ফোন এল নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, ওদের পুরো ফ্যামিলি করোনা আক্রান্ত, আমার শ্বশুরমশাই সহ। উনার বয়স ৯৩। এমনিতে উনি ফিট ছিলেন, খালি একটা প্রেশারের ঔষধ খেতেন। তাকে এডমিট করা হল তৃনমূলের লোকাল কাউন্সিলারকে ধরে, নীলরতন সরকার হাসপাতালে। এনআরএস এর কোভিড ইউনিটটা নূতন খুলেছে। আইসিইউ বেড পাওয়া গেল না, নূতন একটা নাম শুনলাম ‘এইচডিইউ’ বেড, মানে হাইলি ডিপেন্ডেন্ট ইউনিট, সেইরকম একটা বেড পাওয়া গেল। শালার কাছে শুনলাম, সরকারী এম্বুল্যান্সে করে নিয়ে গিয়েছে। পরে স্বাস্হ্য দপ্তর থেকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল, এম্বুল্যান্সের লোকেরা বখশিস চেয়েছিল কিনা। হেলথ সেক্রেটারী ফোন করে খবর নিয়েছেন। হতে পারে হয়ত উনার বয়স দেখে ফোন করেছে। শালাবাবু বেশ থ্রিলড। পরে শুনেছিলাম এরকম ফোন নাকি সবার কাছেই আসে। দুদিন পরে শালা জানাল রাইস টিউব লাগান হয়েছে। একটা কার্ড দিয়েছিল। তাতে ফোন নম্বর ছিল। সেখানে কথা বল্লে তারা ‘স্টেবল’ বা ‘খারাপ’ এইটুকুই বলে। শালার পরিবার করোনার জন্য বাড়ীতে। তাই দেখভাল করার জন্য জামাইবাবাজীন ভরসা।
মেয়ের আজকাল ওয়ার্ক ফ্রম হোম চলছে। তাই ঝটিতি টিকিট কেটে আমরা তিনজন পৌছে গেলাম কলকাতা। ১০ই নভেম্বর । যাতায়তের জন্য শালার গাড়ী পাওয়া গেল, অবশ্য সেল্ফ ড্রাইভিং মোডে। মহাকরণ বা নবান্ন অভিযানের মত শুরু হল আমার ও সুমিতার এনআরএস অভিযান। গল্ফগ্রীন থেকে বেরিয়ে প্রথমে একটা দোকান থেকে পিপিই কিট কিনলাম। কলকাতার রাস্তা সব ভুলে গিয়েছি। গুগল ম্যাপ ভরসা। যেতে যেতে ভাবছি গাড়ী কোথায় পার্ক করব। হাসপাতালে গাড়ী নিয়ে ঢুকতে দেবে তো? গিয়ে দেখি দিল্লির হসপিটালের মত আলাদা পার্কিং লট নেই। সুন্দর ঢুকে গেলাম। জিজ্ঞাসা করে টরে বেশ পিছনের দিকে কোভিড ইউনিটে গেলাম। গাড়ী রাখার জায়গার অভাব নই। কার্ডে টাইম দিয়েছিল ডাক্তার দেখা করবে ১২-৩০ থেকে ২ টোর মধ্যে। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য শ্বশুর মশাইএর কি ট্রীটমেন্ট চলছে এবং কেমন আছেন সেটার খবর নেওয়া। স্পেস সুটের মত সেই পিপিই কিট পরে সুমিতা গেট দিয়ে ঢুকল। আমি বাইরে। তিনতলা বিল্ডিং। তলায় একটা জানালায় একজন বসে। তিনি ডাক্তার নন, রোগীর আত্মীয়দের এটেন্ড করার জন্য।
এরপর শুরু হল চাতকের প্রতীক্ষা। জানা গেল ডাক্তার আসবে তিনটের সময়, যখন শিফ্ট চেন্জ হয়। তাহালে ১২.৩০ টু ২ এর মতলবটা কি। ওখানে বসারও কোন ব্যবস্থা নেই। ঠায় দাড়িয়ে। তিনটের সময় জানা গেল ডাক্তারবাবু লাঞ্চ করছেন, একটু পরে আসবেন। পৌনে চারটা নাগাদ জানা গেল ডাক্তারবাবু ‘ভাগলবা’। অর্থাৎ আমাদের যাওয়ার নীটফল শূন্য। একদম শূন্য বলা যায় না। ‘গলতা’ বের করা ভারতবাসীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট । বাইরে আরো দু একজন ছিল যাদের সঙ্গে আলাপ হল। তারা কয়েকদিন ধরে আসছে। আমি নভিস। জানলাম যে বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। আয়ারাই নাকি একমাত্র ভরসা। তাঁরাই অথেন্টিক খবর দেয়। তিনটে নাগাদ দেখলাম কয়েকজন বেরোচ্ছে। একটা হাসিখুশী দেখতে মেয়ের সঙ্গে দুজন রোগীর আত্মীয় কথা বলছে। মেয়েটির সঙ্গে স্কুটি। তাকেই পাকড়াও করে, বেড নম্বর বলে খবর পেলাম- ‘দাদু’ ঠিক আছে। রাইস টিউব আছে, সকালে উঠে নাকি তবলা বাজাবার মত করে হাত নাড়ছিল। যাক, তার ফোন নম্বর নিয়ে তিনশ টাকা গুঁজে দিলাম পরবর্তী আপডেটের আশায়। তবে পায়েল মেয়েটি জানাল, সে সামনের তিনদিন থাকবে না, কালীপুজার বাড়ী যাবে।
কি ঔষধ পত্র চলছে কি কোন আরো টেস্ট হবে কিনা সর্বপোরি রোগী সুস্থ হচ্ছে, না ডিটোরিয়েট হচ্ছে কিছুই জানতে পারলাম না। এরকম অবস্থা বাকীদেরও। একজনের সঙ্গে আলাপ হল। দেখলাম খুব পিতৃভক্ত। এর আগে তার বাবা অনেকবার হসপিটালে ভর্তি হয়েছেন, প্রতিবারই জিতে ফিরে এসেছেন। বাবার অনেক প্রবলেম । ছেলে সেই ব্যাপারে ডাক্তারকে বাবার পাস্ট মেডিকাল হিস্ট্রি জানাতে চায়। কিন্তু ডাক্তার তো ডুমুরের ফুল। তিনদিন ধরে ঠায় বসে থেকেও দেখা হয় নি।
আমি অবশ্য ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরে নিলাম। রাস্তা ও আশপাশটা বেশ পরিচ্ছন্ন। সরকারী হাসপাতালে এরকমটা ঠিক আশা করি নি। পিছনের দিকে হস্টেল। মনে পড়ল চার দশকেরও বেশী আগে আমার মাসতুতো দাদা ও তারপর এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। সেই দাদা ছিল ভাই বোনদের মধ্যে পড়াশুনায় সবচেয়ে ভাল। কিন্তু বিধির বিধান অন্যরকম ছিল। কলেজের শেষের দিকে তার মাথার গন্ডগোল দেখা যায়। পাশ করতে দুবছর দেরী হয়। তারপর সে এক গ্রামে ডাক্তারি করত। সামান্য ইনকাম। কয়েক বছর পরে শুনি ও আসছিল কলকাতায় সাইক্রিয়াটিক ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ নিতে। রাস্তা থেকে সে হারিয়ে যায়, তাকে আর পাওয়া যায় নি। দাদা ছিল স্বল্পবাক। এখনও ওর জোড়া ভুরু আর গভীর উদাস দৃষ্টি মনে পড়ে।
বেশ পুরানো পুরানো বিল্ডিং। সদ্য রং হয়েছে লাল হলুদ। খালি একটা সাত আটতলা নূতন বিল্ডিং নীল সাদা। ঘাসফুল পুরো কব্জা করতে পারে নি।একটা হেরিটেজ বিল্ডিং দেখলাম, নাম ফ্রেজার ওয়ার্ড। ১৫০ বছর পুরানো এই কলেজের আগে নাম ছিল ক্যাম্পবেল মেডিকাল কলেজ। এখানেই কালাজ্বরের টিকা আবিস্কার করেন ডাঃ ইউ এন ব্রহ্মচারী।
ক্রমশঃ
পর্ব ২
আমার আবার ফটো তোলার বাতিক। কোভিড ইউনিটের সামনে মোবাইল বাগিয়ে ফটো নিচ্ছি, সিকিইরিটি দৌড়ে এল। ‘দাদা- ফটো নিচ্ছেন কেন? দ্যাখান আপনার মোবাইল’। ব্যাটা, একটু আগে খইনি ডলছিল, মনে হল আমাকে গ্যাঙস্টার ভেবেছে। আরে ভাই তুমি চল ডালে ডালে, আমি পাতায় পাতায়। পকেটের মধ্যে দুটো মোবাইলের অন্যটা বের করে বল্লাম- আরে ভাই, ফটো নেহি লিয়া। তাকে মোবাইল খুলে ফটো স্টোর দেখিয়ে তবে শান্তি।
একদিন ছেড়ে আবার গেলাম হসপিটালে । এবার বুদ্ধি করে তিনটাতে গেলাম। আগের দিন ফোনে বলেছিল লাংসের সিটি স্ক্যন হংয়েছে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। ডাক্তার প্রেসেন্ট প্লিস ছিলেন। যদিও ওই কেলকিসিন্দে, উচ্চিংড়ে মার্কা লোকটার কথাবার্তা শুনে ডাক্তার বলে মনে হয় নি। তার কারণ সব প্রশ্নের উত্তর হ্যা বা না গোছের। যেমন সিটি স্ক্যন কেন করলেন। উত্তর - দরকার ছিল। কেমন আছে? উত্তর স্টেবল। এরপর কি হবে? ঐ তো কাল আরেকবার টেস্ট করে নেগেটিভ হলে দু দিন পর নিয়ে যাবেন। পরে মনে হল হয় সে ডাক্তারই ছিল না, নতুবা উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে করছে। তার কারণ হচ্ছে, আমি সেইফাঁকে এক আয়াকে পাকড়াও করে খবর নিলাম। তার শাড়ী পরার ধরন দেখে বুঝলাম সে ইউ পি বা বিহারের। সে বল্ল- ও বুড়া আদমী সিরিয়াস আছে। অক্সিজেন চলছে। খুললেই লেভেল ৮০ তে নেমে যাচ্ছে রাইস টিউব লাগান আছে। ডাক্তারের ফিডব্যাক শুনে সুমিতাকে কিছু জানালাম না যে আয়া উল্টো বলছে। নাইট শিফ্টের আয়াকে কিছু টাকা দিয়ে এলাম, যেন ঠিক করে দেখে। বলে রাখি আয়ারা সরাসরি পয়সা চায় না। কম্পাউন্ডে সিসিটিভি লাগান। এক রুগীর আত্মীয় জানাল, তাকে সিকিউরিটির হেড এসে ধরেছিল- কেন সে ওয়ার্ড বয়কে পয়সা দিয়েছে? দুটো সিসিটিভির মাঝে একটা সেফ জোন আছে। টাকা দিতে গেলে সেই লক্ষণের গন্ডীতে এসে দিতে হবে। মনে হল সিস্টার এবং আয়ারাই কাজ করে। ডাক্তার সবই প্রায় জুনিয়ার। কোন কোমরবিডিটির পেশন্ট এলে তাকে হ্যান্ডেল করার মত ক্যালি নেই।
চারটে থেকে ছটার মধ্যে, আগে থেকে নাম লিখিয়ে রাখলে, ট্যাবের মাধ্যমে রোগীকে দেখা যায়, কথাও বলা যায়। তবে বেশ ঝাপসা। সেটা দিয়ে দেখা গেল পেশেন্ট শুয়ে আছে। কথা বলার মত অবস্থায় নেই। যাইহোক ফেরত এলাম। পরেরদিন সকালে খবর এল উনি মারা গিয়েছেন। আবার দৌড়ালাম হাসপাতালে। গিয়ে শুনি বডি চলে গিয়েছে মর্গে। বল্লাম-আমরা একবার দেখতে চাই। শুনলাম তার পারমিশন ওয়ার্ড মাস্টারের হাতে। গেলাম তার কাছে। প্রথমে উনি হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট দিলেন। তারপর বল্লেন- মর্গে না যাওয়াই, ভাল। ডোম কোভিড পেশেন্টের বডির কভার নিজে খুলবে না। সব আপনাকে করতে হবে। আর এনআরএস এর মর্গে ট্রেনে কাটা থেকে নানা রকম বডি থাকে। সে আপনারা দেখে উঠতে পারবেন না। ক্রিমেশন কোথায় হবে জিজ্ঞাসা করাতে বল্লেন - বডি এখন করপোরেশনের হাতে। কোভিড পেশেন্টের বডি আত্মীয়কে দেওয়া হয় না। কোথায় কখন হবে আমরা বলতে পারব না। মোদ্দা কথা- মৃত্যুর সময়টুকু (সেটাই বা কতটা ঠিক জানি না) ছাড়া কিছু জানা গেল না। বেওয়ারিশ লাশের মত দেহ সৎকার হল।
সেদিন রাতে WB র হেল্থ সাইট খুলে দেখলাম একটা সার্কুলার ২৩ সেপ্টেম্বর এর। সেখানে লেখা আছে, পার্টি চাইলে করোনা ডেডবডি নিতে পারে, ম্যাক্সিমাম ছয় জন আত্মীয় বডি দেখতে পারে। হেয়ারসে ভ্যান নিজেদের ভাড়া করতে হবে। ক্রিমেটোরিয়াম অব্দি যাওয়া যাবে। দূর থেকে দেখা যাবে বডি কখন চুল্লীতে যাচ্ছে। এসব কথা আগে জানা ছিল না। তাহালে আমরা খরচা করে কমসে কম বডি দেখতে পেতাম, শ্মশান ঘাট অব্দি যেতে পারতাম। সরকারী হাসপাতালে- কমিনুকেশন, বিশেষত করোনা আক্রান্তদের পরিবারের সঙ্গে প্রায় নেই বলেই মনে হল।
পরে একটা জম্পেশ করে কমপ্লেন লেটার দিলাম, এনআরএস প্রিন্সিপালকে, হেল্থ সেক্রেটারিকে, যদিও এখনো কোন উত্তর পাই নি। এই হল গিয়ে আমার ‘ আখো দেখা হাল’ সরকারী হাসপাতালের।
দেবদত্ত
১৮/১২/২০২০
২০১৭ তে সাউথ সিটি কলকাতায়
Gআমার শ্বশুরমশাই U K Ghosh




Comments
Post a Comment