মিলন তিথি (কলেজে বন্ধুদের সাথ)
মিলন তিথি
স্কুল ও কলেজে বন্ধুরা জীবনের অনেকটা জুড়ে থাকে। আজকাল হোয়াটস্ অ্যপের মাধ্যমে যোগাযোগ তো থাকছেই, মাঝে মাঝে গুগল মিট বা জুমের সাহায্যে আড্ডাও হচ্ছে। আরো একধাপ এগিয়ে আমাদের উজ্জ্বল তারকা, স্বনামধন্যা শাশ্বতীর ইনিশিয়েটিভে ইউনিভার্সিটির ভিতর, নয় নয় করে ৩৮ বছর আগে ছেড়ে আসা ডিপার্টমেন্টে জনা কয়েক আড্ডা জমালাম। ৮বি র সামনের গেট বন্ধ, গাড়ী নিয়ে ঢুকতে হল আর্টস ফ্যাকাল্টির গেট দিয়ে। সুনীল গাঙ্গুলির কথায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের দেখা যায় গড়িয়াহাটের, তবে অধমের মতে সেটা যাদবপুরের আর্টস ফ্যাকাল্টির সামনেটা। গাড়ী পার্ক করতে করতেই দেখা হয়ে গেল অপূর্ব আর পার্থর সঙ্গে। ডিপার্টমেন্টের সামনে গেটের পাশটা দেখিয়ে বল্ল- ‘আমাদের সময় এখানে একটা ভাঙা সাজেশন বক্স রাখা ছিল, তাতে কে জানি চক দিয়ে লিখে দিয়েছিল - বেস্ট সাজেশন, রিপেয়ার ইট!’
হারুদার দোকানটা আর নেই। এখন কম্পিউটারের জমানা, তখন আমাদের বই ছাড়াও কিনতে হত ল্যাব শীট, গ্রাফ পেপার, লগ-লগ শীট। অপূর্ব উল্টোদিকের সুজয় বোসের রুমটা দেখিয়ে বল্ল- একবার দোলের দিন সুজয় বাবুর তার নিজস্ব স্টাইলে বলেছিলেন-‘ এই ছোকরারা, আমার পায়ে হাত দিয়ে আবীর মাখাতে হবে না। অনেক চেষ্টা করেও তাকে রাজী করান যায় নি। তাতে ক্লাসের ছেলেরা সেই জানলা ভেঙে তার ডেস্কের উপর মুঠো মুঠো আবীর ছড়িয়ে দিয়েছিল। পরে নাকি উনি ছাত্রদের মানভঞ্জন করতে এক ঠোঙা জিলিপি নিয়ে এসেছিলেন। সুজয়বাবু আমাদের মধ্যে নেই, ডিপার্টমেন্ট থেকে বহুবছর আগে রিটায়ার করেছেন, এখনো তার ঘরের সামনে তার নামের ফলক ঝকঝক করছে। সেটা কি বিনম্র শ্রদ্ধার প্রকাশ না অসবধনতাজনিত ঘটনা, সেটা বুঝলাম না।
ডিপার্টমেন্টে ঢোকার আগে তখনো দিনের আলো ছিল, তাই আমরা ফটো তোলা ও ঘুরে দেখার তাগিদে গেলাম ইন্টিগ্রেট বিল্ডিং, ব্লু আর্থের আশেপাশে। সামনের বিশাল মাঠটা মাটি ফেলে উঁচু করা হচ্ছে। যে ইনডোর ব্যাডমিন্টন কোর্টটা ছিল, সেখানে এখন সাত-আটতলা বিল্ডিং। মনে পড়ল তুষ্টি বলে একটা মেয়ে খেলত আর বেণু বলে একটা লম্বা ছেলে। মোনালিসা বড়ুয়া আর মদালসা হাজারিকা বলে দুটো মেয়ে টেবিল টেনিস খেলত। শ্রীপর্ণা বলে একটা মেয়েকে দেখেছিলাম, সে কোনি সিনেমার হিরোইন ছিল।
একটু পরেই একমোবদ্বিতীয়ম ধূর্জটি মহাশয়ের প্রবেশ। পায়জামা, পাঞ্জাবি, দাড়ি-গোঁফ লম্বা চুল নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই লেখাও পরিবেশবিদ। ওর কাছেই প্রথম শুনি ‘ইস্ট কলকাতা ওয়েট ল্যান্ড’ প্রিসারভেশনের ব্যাপারটা। কলকাতার ড্রেনেজ সিস্টেমের নোংরা জল কিভাবে ন্যাচারাল প্রসেসে পরিশোধিত হচ্ছে, সেটা আমাদেরকে ঘুরে দেখাবার একটা প্রস্তাব দিল। খুবই লোভনীয়, যারা কলকাতায় আছিস তারা যেতে পারিস।
ধূর্জটি কিছু মজার কিছু সিরিয়াস ঘটনা শোনাল। একটা বলি - ও একটা অদিবাসী স্কুল, যেটা পুরুলিয়ার মাও অধ্যূষিত বান্দোয়ানে ভালোপাহাড়ে অবস্থিত, সেটা চালানোর কাজে যুক্ত। কমলবাবু সেই কর্মকান্ডের নায়ক। দেখা গেল একসকালে তিনি পেয়ারা গাছের ডাল নিয়ে দাঁত খড়কে করতে করতে সবাইকে উপদেশ দিচ্ছেন- ‘কি তোমরা পেস্ট ইউজ কর, এই দেখ, চুয়াত্তর বছর বয়েসে দাঁত মজবুত রেখেছি ন্যাচারোপ্যাথি করে’। পরের দিন তার ঘরের বাইরে পোষ্টার পড়ল ‘বাঘের মত দাঁত চাহিলে পেয়ারাডাল ব্যবহার করুন, আমিও করি তবে নীচেরটা সহযোগে’। নীচেদেখা গেল দড়ি দিয়ে আটকানো কলগেট পেস্টের টিউব । বলাবাহুল্য ধূর্জটির কান্ড। কমলদার বাথরুম থেকে চুপিচুপি তুলে এনে পর্দাফাস করেছে।
জায়গাটা নক্শাল অধ্যূষিত, তাই প্রশাসনের নজর বহিরাগতদের প্রতি। ধূর্জটি একবার মেলার অনুষ্ঠান করেছিল, বাইরে শিল্পী, পটুয়া ইত্যাদিদের নিয়ে। মেলাচলাকালীন কিছু পুলিশ এসে ধূর্জটীকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে- প্রথমে মামুলী প্রশ্ন, কি করেন, কোথায় থাকেন, কেন এসেছেন ইত্যাদি। যেই না ধূর্জটি বলেছে জেইউর এক্স স্টুডেন্ট, একে তুলে নিয়ে গিয়ে নানারকম জেরা। বল্ল বেশী এদিক ওদিক যাবেন না, জায়গা ভাল না। পরের দিন মাকে নিয়ে বেরিয়েছে, সেই পুলিশের লোক ওকে ফলো করছে। ধূর্জটি ওকে জিজ্ঞাসা করেছে - অমুক জায়গাটা কোথায়। সে প্রথমে বল্ল - কেন যাবেন? ধূর্জটির উত্তর ফটো তুলতে। প্রথমে সে মানা করে দিল, তারপর জিজ্ঞাসা করল সঙ্গে কে। ‘মা’ শুনে বল্ল ‘আগে বলেন নি কেন, যান যান , যখানে খুশী যান’।
একবার ওদের দঙ্গলে একটি ইয়াং কাপল এসে জুটল। সুন্দর চেহারা ছবি, হাশিখুশী। বল্ল আমরা কয়েকদিন থাকতে চাই, ট্যুরিস্ট, আশেপাশে থাকার মত জায়গা নেই। তা ধূর্জটিরা রাজী হয়ে গেল। তারা সারাদিন অনেক কাজকর্ম করে, সবার সঙ্গে স্বচ্ছন্দ। তবে ছেলেটি সন্ধ্যার সময় বার হয়ে যায়, ফেরে রাত করে। জিজ্ঞাসা করাতে তার উত্তর সে বার্ড ওয়াচার রাতে নাইটজার (nightjar) দেখতে যায়। ক্যামেরায় তোলা ছবিও দেখাল। ওরা কিছুদিন থেকে চলে গেল, আবার এল। এরকম দু তিনবার আসা যাওয়ার পর একবার ছেলেটি উধাও হয়ে গেল। গেল তো গেল সে আর ফিরল না। মেয়েটি রোজ বিষন্ন মুখে বসে থাকে, কান্নাকাটি করে। ধূর্জটিরাও খোজাখুজি করে কিন্তু তার কোন ট্রেস পাওয়া যায় না। মেয়েটি পরে চলে যায়। অনেক বছর পর ওখান থেকে দুটো বডি পাওয়া যায়, তার মধ্যে ওই ছেলেটি একটি। জানা যায় সে আইবির লোক ছিল, মাওবাদীরা তাকে হত্যা করেছে। ধূর্জটিরা ঘুনাক্ষরেও কিছু টের পায় নি।
এই সব কথার মাঝখানে এসে গেলাম কে সি রায় হলে। শুরু হল চা বিস্কুট সহ গোল টেবিল আড্ডা। এসে গেল দেবাশীষ দে সরকার। ও সেল এ ছিল। ২৫ বছর আয়রন ওর মাইনসে পাহাড়ে কাটিয়েছে। একহাজার মিটার উঁচু জঙ্গলে ঘেরা জায়গাটার নাম কিরিবুরু। টাটা নগর থেকে দেড়শ কিলেমিটার। অনেক বন্য জন্তুর সঙ্গে হাতীও ঘুরে বেড়াত বাড়ীর আশেপাশে। কি রোমাঞ্চকর জায়গা।
ক্রমশঃ
পার্ট ২
মৌসুমী আগেই এসেছিল। কোন চেন্জ নেই, খালি চুলে কিছু রুপোলি রেখা ছাড়া। ও আর অতসী নাকি একদিন বসেছিল সত্যেনদার ক্যান্টিনে। পাগলা সোমনাথ হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে অতসীকে বল্ল- এই ফাইলটা একটু ধর তো, আমি এক্ষুনি আসছি। কিছু বোঝার আগেই সোমনাথ হাওয়া। মৌসুমী সবে সবধান করতে যাচ্ছিল সোমনাথ এতগুলো লোককে ছেড়ে তোকেই দিচ্ছে কেন। তার আগেই অতসীর হাউমাউ চিৎকার, ফাইলের ভিতর থেকে কেঁউ কেঁউ করত করতে একটা পাপি বেরিয়ে এসেছ। অতসী ততক্ষণে চেয়ারসমেত ধরণীতলে।
এসে গেল চিত্রভানু সপরিবারে । সবাই মিলে যাওয়া হল ঘনাদার টং এর ঘরের মতো ডিপার্টম্ন্টের ছাদে, শাশ্বতীর আদরের ইল্যুমিনেশন ল্যাব দেখতে। ইন্জিনিয়ারিংএ চিরকালই ইন্টারেস্ট কম, এখন তো নেই বল্লেই হয়, তাই নিজস্ব অপ্রাকৃতিক চিন্তায় সেই কালো কালো ঘরগুলি ( আলোর ল্যাব কালো মানে বেশ কনট্রাস্ট) বেশ ভুতুড়ে বাড়ী গোছের লাগল। ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ভুডুইজমের উৎকৃষ্ট জায়গা। ধূর্জটি স্বঙাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একটি পিএইচডি স্টুডেন্টকে এলইডির থেকে ড্রাইভার, রিফ্লেক্টর, কনকেভ, কনভেকস লেন্সের উপর জোর দেওয়ার আলোচনার সাথে সাথে আমাদের কে জানাল যে এরকম অন্ধকার জায়গাতেই বেলগাছে ব্রম্হদৈত্যি আর শেওড়াগাছে পেত্নীরা বিরাজমান থাক। কল্পনায় তাদের লকলকে জিভ আর ‘আঁয় তোঁকে খাঁই’ এসব ভাবতে ভাবতে নেমে এলাম। মানে ‘ইল্যুমিনেটেড টু সুপার ন্যাচারাল’ হয়ে নীচে নামলাম শাশ্বতীর উদ্দেশে- ‘নিজগুনে ক্ষমা করে দিস!’
নীচের রাস্তায় অনেক আলো, খালি সত্যেনদার ক্যান্টিনের সামনেটা নিকষকালো। চোখ বুজতেই সত্যেনদার সদাহাস্যময় মুখ আর এক পা তুলে সামনের বারান্দায় বেঞ্চিতে বসে থাকার কথা মনে পড়ল।
অরবিন্দ ভবনটা লাইটিংএর কেরামতিতে বেশ সুন্দর লাগছিল। ফটো তোলা হল। অরবিন্দ বিল্ডিংএর পিছনে একটা গোল ট্যাংক ছিল জল খাবার জন্য। এখন তার পাশে একটা ক্যান্টিন। একপ্রস্থ চা বিস্কুট আবার। একজনকে দেখলাম, হাসিটা খুব পরিচিত, কথা বলার ভঙ্গিটা। জানা গেল সে হচ্ছে ভাস্কর গুপ্ত। মনে পড়ল পেপারে ওর নাম দেখেছি, জয়েন্ট এনট্রান্স বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিল । আমাদের ব্যাচের ইলেকট্রনিক্স। একটু পরে ডিপার্টম্ন্টের জামাইবাবু অর্থাৎ শ্রীযুক্ত চন্দনবাবু মানে শাশ্বতী বর এল।
কথা হচ্ছিল দারু নিয়ে। আজকাল গরীবদের নেশা করার জন্য সরকার কুড়ি টাকার পাউচ এনেছে বাজারে। যাদবপুর কমিউনে আজকাল স্যানিটাইজার তৈরী হচ্ছে। চন্দন গিয়েছিল তারজন্য এলকোহল কিনতে কোন ফ্যক্টরিতে। অবশ্য সরকারের আবগারী দপ্তরের কাছ থেকে পারমিশন সহযোগে। সেখানে নাকি তৈরী হচ্ছিল সেই পাউচের মদ, খুবই ক্লিন এটমোস্ফিয়ারে উইথ পিওর ইনগ্রাডিয়েন্টস। ওদের লোক নাকি বলেছে আপনারা দামি ব্র্যল্ড ছেড়ে এই দেশী পাউচ খান, পয়সাও বাঁচবে আর খাঁটি জিনিষ। মোদির আত্মনির্ভর প্রকল্পে দিদির প্রথম অবদান।
কথা হচ্ছিল হায়ার এডুকেশন, রিসার্চ ইত্যাদি নিয়ে। ধূর্জটির অভিজ্ঞতা - দিল্লি ইউনিভার্সিটি এক বাঙালী অধ্যাপিকার ব্রাঙ্হলিপির উপর । ধূর্জটির কিছু ব্যাপারে খটকা লাগায় উনাকে ইমেল করে। তিনি তার কোন উত্তর দেন নি। সেখানে কোন গাইডের রেফারেন্স ছিল। তিনিও সদুত্তর দেন নি। যে পাথরের উপর স্লাইড ছিল সেটাও তিনি দিতে পারলেন না। নেট খুঁজে এক জাপানি প্রফেসরের কাছ থেকে যিনি ওটার উপর আসল কাজ করেছিলেন, তিনি পুরোটা এক্সপ্লেন করে, সেই স্লাইডের ফটো পাঠালেন। ধূর্জটি দেখল, সেই ডিইউর মহিলা যে তত্বের উপর খাড়া কারো পেপার লিখে ডক্টরেট করেছেন সেটাই ভুল। এই হচ্ছে রিয়েলিটি।
আমার কথাটি ফুরালো, নটে গাছটি মুড়াল।
দেবদত্ত
০১/১২/২০২০



Comments
Post a Comment