ডান-বাম ও কানাগলি (রম্যরচনা)



 ডান-বাম কানাগলি

বেশ কয়েকমাস হল রিটায়ার করেছি। অখন্ড অবসর জীবনে অনেকেই পরমার্থ জ্ঞানের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্য কিনা জানি না ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্তি আমার কপালে কি করে আসবে, যার ডান-বাম জ্ঞানেই বিশেষ খামতি। আজকাল অবশ্য এই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ব্যাপারগুলোকে বেশকাস্টমাইজকরেইউজার ফ্রেন্ডলিকরা হচ্ছে। আমার এক কলেজের বন্ধু জানাল ভারতখ্যাত যোগ বিশেষজ্ঞ যোগের সরলীকরণ করে মার্কেটে নিয়ে এসেছেনসহজ যোগ এদিক ওদিক থেকে, যেটুকু আগে জেনেছিলাম, সেটা হচ্ছে যোগ মানে দুচোখ বন্ধ করে মনকে চিন্তাশূন্য করে অথবা কোন একটি বিষয়ে কিংবা নিরাকার ব্রহ্মকে কে কল্পনা করে দুই পা মুড়ে বসে থাকতে হবে। সিদ্ধযোগীদের সামনে কামিনী-কাঞ্চন থাকলেও যোগবিচ্যুতি ঘটবে না। আমার আবার দুপায়ে সরষে। এক জায়গায় বসে থাকলেও দুই পা- সমানতালে নাচতে থাকে। তাই সযত্নেযোগকে বিয়োগের খাতায় রেখেছি। আমার বন্ধু জানালসহজ যোগব্যাপারটা নাকি খুবই সোজা। মনের মধ্যে যে চিন্তাই আসবে সেটাকে সরিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। সমুদ্রের লহরীর মত একটি একটি করে চিন্তা মাথার মধ্যে দিয়ে খেলে যাবে। এই বিশেষসহজ যোগআয়ত্ত করার জন্য দিন দশেকের কোর্সও আছে, অবশ্যই কাঞ্চন মূল্য সহিত। মুখ দিয়ে প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল দৈনন্দিন জীবনে তো মনে একটার পর একটা সু বা কু চিন্তা আসতে থাকে। সহজ যোগের সহজ বক্তব্য তো তাই। তাহালে কেন আর কষ্ট করে এরকম কোর্স করার দরকার। যাক বন্ধুবিচ্ছেদের কথা ভেবে মনের ভাব প্রকাশ করি নি।

 

যে বলছিলাম আমার ডান বা বাম জ্ঞান প্রাপ্তি এখনো পুরোপুরি হয় নি।কথায় কথায় লোকে খাটো বুদ্ধির লোকেদের বলে থাকে - ‘ তোমার দেখছি ডান বাম জ্ঞান নাই কোন অজ্ঞাত কারণে বুদ্ধিতে খামতি না থাকলেও ডান-বাম গুলিয়ে যেত।  ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার হয়েছে ডান দিকে বল্লে বাদিকে চলে গিয়েছি। তাই মা শিখিয়ে দিয়েছিল, যে হাতটা দিয়ে খাবার খাস, সেটা মুখের সামনে নিয়ে আসবি। ওই হাতের দিকটা হল ডান হাত। সেই করেই স্কুল জীবনে চালিয়ে গিয়েছি।কলেজে উঠে ঘড়ি প্রাপ্তির পর আরো সুবিধা হল। যে হাতে ঘড়ি পরি সেটা বাম হাত।কোন দিক বোঝার জন্য বাহাতের ঘড়িটাকে দেখে নিতাম। এই করেই জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালাচ্ছিলাম। কলেজে ইলেকট্রিকাল পড়তে গিয়ে, শিশু বয়সের , ,, পাঠ দিয়ে শুরুর মতফ্লেমিংস লেফ্ট হ্যান্ড রুল ফ্লেমিংস রাইট হ্যান্ড রুল পড়তে হল। প্রথমে ডান বা বাম হাতের কনফিউশন দূর করে, তারপর তিনখানা আঙুলকে তিন ডাইরেকশনে নিয়ে গিয়ে চৌম্বক ক্ষেত্র, বিভব প্রভেদ, বিদ্যুৎ প্রবাহ বুঝতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যেত।

বিয়ের পরেও বৌ এর হাতেও ধরা পড়ে গেলাম। বেশ কয়েকবার যাদবপুর থেকে দুজনে রিক্সায় চেপে গল্ফগ্রীনের শ্বশুরবাড়ী আসতে গিয়ে ডান গলিকে বামগলি বলে শেষমেষ কানাগলিতে পড়ে প্রেস্টিজ পাংচার। তবে সে ভাল মেয়ে, আমার এহেন ভ্রান্তি কখনো লিক করে নি।

অর্জুন হলে মুস্কিলে পড়তাম নিশ্চয়ই। তিনি শুনেছি সব্যসাচী তার ডান এবং বা হাত সমানে চলে। কোন ডিসক্রিমিনেশন করা যাবে না দুই হাতের মত। কমিনিউস্টদের মত সবাই এক - ‘আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে তবে আমি যে আবার একশো পার্সেন্ট ডান বা একশো পার্সেন্ট বাম, তা নই। আর সব ডানহাতির  মত লিখি ডান হাতে, খাবার খাই ডান হাতে, তবে এই লকডাউনের পর্যায়ে ঘর মুছতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, বা হাত দিয়ে মুছতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ বোধ করছি। ফুটবল খেলতে গিয়ে দেখেছি, দুই পা দিয়ে দুই ধরনের শট মারি। চেটো দিয়ে বল মারতে বাম পায়ের অগ্রাধিকার আর সাইড দিয়ে মারতে ডান পা। তাহালে কি আমি পুরোপুরি ডানহাতি নই। ডান - বাম জ্ঞানের নিগূড় তত্ব আবিষ্কার করার জন্য গুগল বাবাজীবনের শরণাপন্ন হলাম। গুগল বলছে এটাকেক্রশ ডমিন্যান্সবামিক্সড ডমিন্যান্সবাহ্যান্ড কনফিউশনবলে। এই ধরনের ব্যাক্তিদের হাত/পায়ের ব্যবহার, কিছু কাজে ডান এবং কিছু কাজে বাম হাত বা পায়ের ওপর নির্ভরশীল। বাস্কেটবল, হকি প্রভৃতি খেলায় এরকমহ্যান্ড কনফিউসডলোকেরা তুলনামূলকভাবে ভাল খেলবে, যতটা না তারা ব্যাডমিন্টন বা টেনিস খেলবে।

এদিকে আমার মেয়ে রুমি আবার লেফ্ট হ্যান্ডার। চামচ বা হাতে ধরে যখন সে ইলিশ মাছের কাঁটা বেছে খায়, তখন বুঝি স্ট্রংলি লেফ্টহ্যান্ডার, আমার মতহ্যান্ড কনফিউসডনয়। দুর্গাপুজাতে আমাদের পাড়ায় দুপুরে ভোগ খাওয়ানো হয়। টেবিলের উপর রাখা ডেকচি থেকে ভলেন্টিয়াররা খাবার পরিবেশন করে। রুমি একবার পুজোতে রসগোল্লা দিচ্ছিল। একটু পরে দেখি সব ছেড়ে দিয়ে গম্ভীর হয়ে বসে আছে। ওকে নাকি কোন এক আঙ্কল বলেছে - ‘এত বড় হয়ে গিয়েছ, এখনো শেখো নি, বা হাত দিয়ে পরিবেশন করতে নেই আমি বল্লামতুই বল্লি না কেন - “আমি বা হাত দিয়ে খাই। তাই আমার বা হাত যা, আপনার ডান হাতও তাই  

ডান বামের ক্ষেত্রে যেটা সবচেয়ে কনফিউশন সেটা হচ্ছে যখন কেউ বলে ডান কানে বা ডান হাতে চুলকোচ্ছে। এবারে আমাকে অনেক চিন্তা করে বার করতে হয়, আমার ডানদিকটা মিরার ইমেজে ওর বাম দিক। সেই বুঝে ওর ডানদিকটা আমার বাদিকে। রীতিমত চিন্তাশক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ।

মিলিটারীতে প্যারেডের সময় লেফ্ট-রাইট করতে হয়। লেখাটা লিখতে গিয়ে হঠাৎ মনে হল রাইট-লেফ্ট নয় কেন। এই শীতে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে কদম কদম বাড়ায়ে যা করতে গিয়ে দেখি- কি আশ্চর্য, বাঁ পাটা আগে চলছে। এই ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে বুঝলাম - ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই

পলিটিক্সেও ডান বামের বিভাজন আছে, এটা এসেছিল ফ্রেন্চ লেজিসলেটিভ এস্যামিবলিতে যারা ফরাসী বিপ্লব সমর্থন করত, তারা বাঁদিকে বসত, আর যার পুরানো বোরবন ডাইন্যাস্টিক রুল চাইত, তারা বসত ডানদিকে। এখন বাম মানে সর্বহারাদের পার্টি আর ডান মানে বড় কর্পোরেটদের ধামাধরা পার্টি।

সবশেষে বলতে হয়ডান-বাম জ্ঞান নাইমানে লোকটি বেশ অজ্ঞ, সেটা মোটেই ঠিক নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অনেক ইতিহাস।

দেবদত্ত

১০/১২/২০২০

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments