শিকড়ের সন্ধানে (ভ্রমনকাহিনী)
শিকড়ের সন্ধানে—১
বাংলাদেশ পোস্টিং চাওয়ার পিছনেএকটা বড় ইচ্ছে ছিল, বাপ, ঠাকুর্দার ভিটেবাড়ী দেখার। ছেটবেলাতে ৯০% বাঙ্গাল বাড়ীতে যা হয়ে থাকে, সেরকম আমিও ঠাকুর্দা, ঠাকুমার মুখে সবুজ ধানক্ষেত,সুখী জীবন, টাটকা মাছ আর বার মাসে তের পার্বণের গল্প, ফেলে আসা সোনালী স্মৃতির রোমন্থন আর কিঞ্চিত হা হুতাশ শুনতাম। দেশভাগের পর পরই আমরা চলে আসি। প্রথমে আমার দাদু তার অন্য চারভাইকে সঙ্গে নিয়ে হাবড়াতে( সীমান্তের এপারে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ডিস্ট্রিক্টে)০ এসে জমি কেনেন। ঠাকুমা আসার সময় অল্প কিছু গহনা আর তার সঙ্গে একটা দোনলা বন্দুক আর রেডিয়ো এনেছিলেন। তখনকার দিনে রেডিয়ো জিনিষটা বেশ মহার্ঘ এবং মর্যাদাপূর্ণ বস্তু ছিল। গ্রামের জমিদার বাড়ীতে আসার আগে আমাদের বাড়ীতে রেডিয়ো আসে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। নেতাজি তখন জার্মানী হয়ে জাপানে। তার দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষন রেডিও তে আসত। গ্রামের লোকেরা ভীড় করে সেই ভাষন শুনতে আসত। রেডিওটা রাখা থাকত বাড়ীর বৈঠকখানাতে। বাড়ীর মেয়েরা যাতে শুনতে পারে তারজন্য দাদু অন্দরমহলে একটা স্পিকার লাগিয়ে দিয়েছিলেন। দাদু বরাবরই একটু শৌখিন প্রকৃতির লোক। রেডিওটা ছিল ভাল্ব রেডিও। পরে যখন ট্রান্সিস্টার রেডিও এল, তখন ওটা ফেলে দিতে হল। রেডিয়ো এবং বন্দুক দুটোই কেনা হয়েছিল ৩০০/- টাকা করে। নকশাল আমলে, একবার দাদু, ঠাকুমা ওটাকে ট্রাংকে করে আমাদের ঝাড়গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে এল। কারণ কলকাতায় বাড়ীতে বন্দুক রাখা রিস্কি। যাইহোক আমার মহা আনন্দ হল। তখন ফাইভ অথবা সিক্সে পড়ি। অস্ত্র বলতে তীর ধনুক ছিল। আর গাছের ডাল দিয়ে বন্দুক। তাই নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। সত্যিকারের ডাবল ব্যারেল বন্দুক দেখে আমি যারপরনাই চমৎকৃত। বন্দুকের নলটা আর পিছনের কাঠের বাটটা আলাদা করা যেত। আমার কাজ ছিল প্রতি সপ্তাহে, তেল দিয়ে ওটাকে পরিষ্কার করা। নলটার মধ্যে, একটা কাঠি দিয়ে তেলমাখা ন্যাকড়া লাগিয়ে যত্নের সঙ্গে পরিষ্কারর করতাম। দু বাক্স গুলিও ছিল। একটা খালি বুলেট ছিল। সেটাতে একটা গোল সীসার বল সামনে থেকে দেখা যেত। বাকীগুলো ছিল ছররা গুলি। সেটা আবার দুইধরনের। একরকম হরিণ মারার, অন্যগুলো পাখী মারার। বন্দুক টা নিয়ে একদিন আমি আর বাবা পাখিও শিকার করে আনলাম। পরে সেই বন্দুক বিক্রি হয়ে গেল ৩০০০/- টাকায়। খুব দুঃখ হল। তাও কিনা, কিনল এক দোকানদার। বাবার সঙ্গে বাজারে গেলে দেখতাম আলু, শবজি বিক্রেতা লুঙ্গি অথবা গামছা পরা গরীব দোকানদার । এই রকম একজন লোক যে কী করে একটা বন্দুক কিনতে পারে, সেটা ভেবে কূলকিনারা পেলাম না। পরে বাবা বল্ল যে লোকটা হচ্ছে আড়তদার। তার কাছ থেকে ছোট দোকানদাররা মাল কিনে বেচে। আর আড়তদার বড়লোক হয়।
আমাদের আদিনিবাস ছিল ময়মনসিং ডিস্ট্রিক্ট এর আঠারবাড়ী গ্রামে। দেশভাগের পর ১৬টা ডিসট্রিক্ট বেড়ে হয়েছে ৬৪। বর্তমানে আঠারবাড়ী পড়ে ময়মনসিং জেলার মধ্যে। বাংলাদেশে আসার পর প্রায় দুমাস অতিক্রান্ত। তখন কাজের সূত্রে কয়েকজন বাংলাদেশেীর সংগে আলাপ হয়। সমাদ্দার বাবু ছিলেন চীফ ইন্জিনিয়ার। বরিশালের লোক। অফিসিয়াল কোন কাজ নিয়ে গেলে বেশ চিন্তার পড়ে যেতেন। উনার সংগে এক কনসালটেন্ট ছিলেন আজিজুর রহমান। কিছু বলার আগেই ডাক ছাড়তেন’ অ আজিজ ভাই, হেডা তো বড় মুস্কিল হইছে, বুঝন যায় না রায়বাবু কি কয়, জলদি আসেন দ্যাখি’। বাকি সময় খুব অমায়িক। তাকেই ধরে পড়লাম- আঠারবাড়ী যাব, একটু ব্যাবস্থা করে দিন। এসব ব্যাপারে বাংলাদেশীদের আতিথেয়তার তুলনা নেই। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে মায়মনসিংএ বিপিডিবি( Bangladesh Power Development Board) র গেস্ট হাউস বুক করে দিলেন। ওদের ওখানের অফিসের গাড়ীটাকেও বলে দিলেন যে আমাকে সে নিয়ে যাবে আঠারবাড়ী। শুনলাম বাসে যাওয়াটাই বেটার। মহাখালী বলে একটা বাস টার্মিনাস থেকে বাস ছাড়ল। ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে হাইওয়ে ধরতেই একঘন্টা লেগে গেল। হাইওয়েটার তখন সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। সব মিলিয়ে সাড়ে তিনঘন্টা লাগল । ময়মনসিংএর বাসস্ট্যান্ডটা ব্রহ্মপুত্র নদীর পাশে। নদীর পারে কাছারীঘাট। মূল শহরটা নদীর পশ্চিমপাড়ে। নদীর উপরদিয়ে ব্রীজ,
ব্রহ্মপুত্র নদীতে ময়মনসিংএর ব্রীজময়মনসিং কে যুক্ত করেছে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের সংগে। এই ব্রীজটা চায়না-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ ব্রীজ নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত বলি, সত্যজিৎ রায় এবং নীরদ সি চৌধুরীর পূর্বপুরুষরা কিশোরগঞ্জের নিবাসী ছিলেন।আজকের রাত্রিবাস বিপিডিবির গেস্টহাউসে। পরেরদিন সকালবেলায় বেরিয়ে পড়লাম আঠারবাড়ীর উদ্দেশে। মনে দারুন রোমাঞ্চ, দেশের বাড়ী দেখতে যাচ্ছি। এখান থেকে আসার পর বাবা, কাকা, কেউই আর ওখানে যান নি, আমিই প্রথম। ড্রাইভার জানালেন , আঠারবাড়ী ৪০ কিলো,সোয়াঘন্টা লাগবে। ততদিনে জেনে গিয়েছি বাংলাদেশে “কিলো” মানে কিলোমিটার। ব্রহ্মপুত্র নদী পেরিয়ে কিছুটা গিয়ে, জায়গাটা নাম শম্ভুগঞ্জ, রাস্তা দুদিকে ভাগ হয়ে গিয়েছে। নামলাম সেখানে চা খেতে। দোকানের নাম ভাই ভাই। বাংলাদেশে এরকমই সব নাম, ‘মায়ের দোয়া’, ‘বাবার দান’, গোছের। শম্ভুগঞ্জ থেকে একদিকে নেত্রকোনা আর অন্যটা কিশোরগঞ্জ। ড্রাইভার জানাল, এটা original ব্রহ্মপুত্র। আজথেকে চারশ বছর আগে এক বিশাল ভূমিকম্পের কারনে নদীটা উত্তরদিক থেকে দুইভাগ হয়ে যায়, অন্য নদীটা বাংলাদেশে যমুনা নামে পরিচিত। আদত নদীর বেশীরভাগ জলটাই, যমুনা দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাংলাদেশের উত্তরভাগে বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর যেতে গেলে দীর্ঘ সাড়েপাঁচ কিমি লম্বা, ১৯৯৮ সালে তৈয়ারী, যমুনা ব্রীজ ক্রস করতে হয়। তার আগে ফেরী সার্ভিস ছিল। যেমন এখন দক্ষিন বাংলাদেশে, খুলনা, গোপালগঞ্জ, যশোর আসতে গেলে দৌলতাদিয়া-পাটুরিয়া অথবা মাওয়া ঘাট ক্রস করতে হয়। এখন পদ্মার উপরদিয়ে যমুনাব্রীজের মত পদ্মাসেতু তৈরী হচ্ছে। দক্ষিনের লোকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে কবে কমপ্লিট হবে, ঢাকা যাওয়ার সময় আর্ধেক হয়ে যাবে।
মেন রাস্তা থেকে মাঝেমাঝেই চোখে পড়ছে, ব্রিটিশ আমলে তৈরী রেললাইন। ধানি জমি থেকে বেশ কিছু উঁচুতে।
রাস্তায় পড়ল সেই পুরানো রেললাইনএকটু পরপর নালা বা ছোট নদীর উপর দিয়ে আর্চ স্ট্রকচারের ব্রীজ। মনে হচ্ছিল আমি যেন তিরিশ-চল্লিশ দশকের সফর করছি। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর একটা জায়গা পড়ল, নাম ঈশ্বরগঞ্জ। এই নামটা খুব শুনেছি ঠাকুমার কাছে। তখনকার দিনের গঞ্জ শহর, আঠারবাড়ী থেকে বড় কিছু কিনতে গেলে ঈশ্বরগঞ্জ বাজারে আসতে হত। মেন রাস্তা থেকে ডান দিকে ধরে গেলে আঠারবাড়ী স্টেশন, চারিদিকে ধানখেত, লেভেল ক্রসিং পেরিয়ে আঠারবাড়ী রেলস্টেশনকে বামদিকে রেখে, আরো কিছুটা গিয়ে পৌঁছে গেলাম জমিদারবাড়ীতে।
শিকড়ের সন্ধানে-২
সামনে একটা গেট, সেটার উপর লেখা আঠারবাড়ী ডিগ্রি কলেজ।
পুরো কমপাউন্ডটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। আমার দাদু ছিলেন জমিদারের নায়েব। বাবার কাছে শুনেছি, আমাদের বাড়ী ছিল জমিদারবাড়ীর পাশে। ঢুকলাম জমিদারবাড়ীর কমপাউন্ডে।
জমিদার বাড়ীর কমপাউন্ড
ভিতরে ঢুকে বড় একটা মাঠ। তারপর দোতলা কলেজ বিল্ডিং, পিছনের দিকে একটা এল শেপের পুরান একতলা বাড়ী। ভাবলাম এটাই নিশ্চয় জমিদার বাড়ী। কিন্তু যে বর্ণনা বাবার কাছে শুনেছি সেটা তো ঠিক মিলছে না। বাবা তো আর নেই। তাই দিল্লিতে আমার এক সম্পর্কের হরিদাস কাকুকে phone করলাম। তাঁর বয়েস আশির উপর। আমার ঠাকুর্দার বাবার তিনটি বিবাহ ছিল, অবশ্য প্রতিবারই পত্নী গত হওয়ার পর। হরিদাস কাকুর মা মেজ তরফের মেয়ে ছিলেন। সেই অর্থে আঠারবাড়ী হরিদাসকাকুর মামার বাড়ী। শুনেছি ছোটবেলাতে তিনি ওখানেই মানুষ। তখনও হোয়াটস্ আ্যপ কল শুরু হয় নি। ইন্ডিয়া -বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ হলে কি হবে, international call charge ছিল ১২/- প্রতি মিনিট, যখন কিনা অমেরিকাতে কল করলে ৫/- লাগত। এই হাই কল রেটের কারণ মনে হয়, অবৈধ প্রবেশ অথবা সন্ত্রাসবাদ রুখতে
সরকারের নির্দেশ। কাকুর সংগে কথা বলে বুঝলাম ঐ এল শেপ বাড়ীটা হচ্ছে কাছাড়ী বাড়ি। অর্থাৎ জমিদারির সব সেরেস্তা, খাজনা আদায় ঐখানেই হত। প্রজারা জমিজমা সংক্রান্ত সবকাজ করতে ঐখানেই আসত। কাছারীবাড়ির সর্বময় কর্তা ছিলেন আমার দাদু। আসলে আমরা ছিলাম জমিদারের সম্পর্কে জ্ঞাতি। জমিদারমশাই তাই দাদুর হাতে সেরেস্তার কাজকর্ম দিয়ে রেখেছিলেন। আঠারবাড়ী জমিদার মোটামুটি বড় জমিদার বলা যেত। শুনেছি এক সাহেবও নাকি ওখানে চাকরী করতেন। তবে ঐ এলাকার সবচেয়ে বড় জমিদার হচ্ছেন মুক্তাগাছার জমিদার, তারা অবশ্য ময়মনসিং এর জমিদার হিসাবে বেশী খ্যাত। ময়মনসিং থেকে মুক্তাগাছা ১১ কিমি দূরে। সেখানেও গিয়েছি। তবে সে গল্প পরে।
সেই দিনটা ছিল শুক্রবার মানে জুম্মাবার। ওটা আমাদের রবিবারের মত। অফিস, ইস্কুল, কলেজ সব ছুটি। তাই জায়গাটা জনমানবশূন্য। এমনিতেও প্রথমে লক্ষ করে দেখেছিলাম, জমিদার বাড়ী, অধুনা কলেজের, পাচিলের ভিতরের অংশ এবং বাইরের সংলগ্ন অন্চল মোটেই ঘিন্জি নয়, চারিদিকে বেশ গাছপালা, পুকুর, নূতন কনস্টাকশন প্রায় কিছুই নেই। কারনটা অবশ্য পরে জেনেছি। তদানীন্তন পাকিস্থান সরকার সব জমিদারবাড়ী এবং তাদের জমিজমা এনিমি প্রপার্টি হিসাবে অধিগ্রহন করে ১৯৬৫ র যুদ্ধের পর। পরে এই নিয়ে বিস্তারিত লিখব, কারণ এরসঙ্গে হিন্দু মাইগ্রেশনের একটা বড় সম্পর্ক আছে। এনিমি প্রপার্টি বলে সরকারী জায়গা, কোন প্রাইভেট construction নেই।
হঠাৎ দুটো বাচ্চা ছেলে দেখি গরু চরাতে ঢুকেছে। কিন্তু তারা তো আর আমার দাদুর নাম জানে না, তাই আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি কোথায় ছিল কি করে জানবে। ওদের জিজ্ঞাসা করলাম- ভাই, এখানে সবচেয়ে বয়স্ক লোক কোথায় থাকে? বল্ল, গেট থেকে বেরিয়ে বামদিকে গেলে যে বাসাটা, সেখানে এক দাদু থাকে। গেলাম সেখানে, বাইরে কেউ নেই, ডাকাডাকির পর এক সাদাচুল বয়স্ক লোক বেরিয়ে এলেন। বল্লাম- আলেকুম সেলাম চাচা, আমি আসছি ইন্ডিয়া থেকে, আমাদের আদিবাড়ি ছিল এইখানে। আমি সকাল থেকে এসে বাসাটা খুজছি। আমার দাদুর নাম ছিল যতীন্দ্র মোহন রায়। আপনার কি জানা আছে আমার দাদুর বাসা এখানে কোথায় আছে? উনি কিছুক্ষন অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে জোড়হাত করে বল্লেন, আপনে তো দাঁড়াইয়া আছেন, আপনাগো বাসাতেই, আসেন, আসেন, আমাগো কি সৌভাগ্য। বসলাম এসে বাড়ীর উঠানে। উনার নাম সাদাত হোসেন। বয়স আশি পেরিয়ে।
সাদাত হোসেনের সঙ্গে আমিছোটখাট চেহারা, একটু ছাগলদাড়ি। উনি ছিলেন লোকাল ইস্কুলের মাস্টার। তিন ছেলে, বৌমা নাতি-নাতনীদের নিয়ে এখানেই থাকেন। সরকার থেকে আমাদের বাড়ীটা অধিগ্রহন করেছিল। তিনি নাকি সরকারের কাছ থেকে লীজ নিয়ছেন। এ খবরের সত্যতা বিচার করি নি অথবা করার প্রয়োজন মনে করি নি। এত বছর পরে আমি তো আর বাড়ীর দখল নিতে আসি নি। এসেছি দুচোখ ভরে দেখতে সেই ছিন্নমূল পরিবারের একমাত্র প্রতিভূ রূপে এই গ্রামের রূপ, রস, গন্ধ আস্বাদন করতে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে বেশ কিছু জায়গা জুড়ে কয়েকটা বাড়ী।জমিদার বাড়ীর পাঁচিল লাগোয়া আমাদের বাড়ী
বাড়ীর ভিতর অংশ। সবুজ দরজার ঘরটাতে দাদু-ঠাকুমা থাকতেন
সেগুলোতে কেউ থাকে না।শুনশান হয়ে পড়ে আছে। অনেক শরিক ছিল রায়বাড়ীর। শেষ যিনি ছিলেন, তারা নাকি ৭১ সালের যুদ্ধের সময় ইন্ডিয়া চলে যান। পুরান দিনের কথা জিগ্গাসা করলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় নাকি আমাদের বাড়ীটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ডেরা। এখানে অস্ত্রশস্ত্র মজুদ থাকত। জিগ্গাসা করলাম তাহলে সব হিন্দুরাই কি এখান থেকে চলে গিয়েছে। জানালেন, না এখনও বেশ কিছুঘর হিন্দু আছে, পাঁচিলের পশ্চিমপারে, ঠাকুরদালানের গা ঘেষে তাদের বাসা।
জমিদারবাড়ীর পুরোহিতের বংশধরজমিদার বাড়ীর পাশে হিন্দুদের ঘর
অনুরোধ করলাম- চাচা, আপনার যদি সময় হয় তবে আমাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাবেন? দেশভাগের পর যে হিন্দু প্রজারা এখনো আছে, তাদের সংগে পরিচিত হতে চাই। বল্লেন- “হেডা কুন কথা হইল? আপনি আইসেন কতদূর থিক্যা দেশের বাড়ী দেখনের লাইগ্যা, হেডা তো আমার কর্তব্য, আগে বইস্যা নাস্তা করেন, তারপর সব হইব”। অগত্যা বসে নাস্তা সেরে দুজন বেরোলাম। আবার গেট দিয়ে ঢুকলাম। বাদিকে ছিল বড় মাঠ। ডানদিক দিয়ে একটা ছোট পায়ে চলা পথ, একটু এগিয়ে গিয়ে একটা বেশ বড়সড় গেট। কিন্তু পুরানো গেট কালের আগ্রাসনে ভগ্নদশা নিয়ে দাড়িয়ে আছে। জমিদার বাড়ীর সিংহদুয়ার। এখন ভগ্নপ্রায়
ভিতরে ঢুকে বেশ বড় চত্বর। তার তিনদিকে তিনটে বাড়ী ভাঙাচোরা অবস্থায় দাড়িয়ে। একটা বাড়ী দোতলা । বছরের পর বছর কেউ না থাকলে যা হয়। অযত্নে পড়ে থাকা বাড়ী অগাছার জঙ্গল।
জমিদার বাড়ীর ভিতরটা
পিছন দিকে একটা বড় পুকুর। তার তিনদিকে ভাঙাচোরা পাঁচিল। ভাঙা পাঁচিলের ভিতর সেই পুকুর
একটা ভাঙা দরজাও দেখা যাচ্ছে। ঠাকুমার কাছে শুনেছিলাম, পাচিলের কাছে খিড়কী দরজা দিয়ে ঠাকুমা ও অন্য হিস্যার মেয়েরা পুকুরে নাইতে আসতেন। ঐ পুকুরটা ছিল খালি জমিদার বাড়ী আর আমাদের রায়বাড়ীর মহিলাদের ব্যাবহারের জন্য। পুকুরের পাশে সিড়ি বাঁধানো ঘাট। বসলাম একটু। চারিদিকে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে পুকুরের স্বচ্ছ টলটলে জল।
শিকড়ের সন্ধানে-৩
আঠারবাড়ী জমিদারের নাম ছিল প্রমোদ রায়চৌধুরী। তিনি নাকি দত্তক পুত্র। স্বাধীনতার পর ওরা সবাই চলে আসেন ভবানীপুরে, আঠারবাড়ী হাউসে। সাদার্ন এভিনিউর কাছে উনাদের একটা মার্কেট ছিল। নাম সাদার্ন মার্কেট। দেশভাগের পর দাদু ঐ মার্কেটের ম্যানেজার ছিলেন বেশ কিছুদিন।
হরিদাসকাকু ফোনে বলেছিল, কাছারী বাড়ী আর জমিদার বাড়ীর মাঝামাঝিতে একটা অস্ত্রাগার ছিল। তাতে নাকি তিরিশটা বন্দুক, তরোয়াল আর পেয়াদা, বরকন্দাজদের ড্রেস ও লাঠি ইত্যাদি থাকত। জমিদারের খাজান্চি ছিলেন বিজয় দাদু। তিনি কোনসময় কলেজে আমার দাদুর সহপাঠী ছিলেন। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বাড়ীরই লোক হয়ে গিয়েছিলেন। তারকাছেই থাকত সেই তোপখানার চাবি। সেটা সবসময় তার ট্যাকে গোজা থাকত। স্নান, বাথরুমে গেলেও সংগে থাকত। একটু কড়া মেজাজের লোক। অনেক তোয়াজ করার পর একবার তোপখানা খুলে বাবা, কাকাদের দেখিয়েছিলেন সেই অস্ত্রভান্ডার।
সাদাত বাবুর সংগে হাটতে হাটতে গেলাম আমাদের শরিকি বাড়ীর পিছন দিকে। সেখানে আছে মানে এখন তো ভাঙা অবস্থায়, আঠারবাড়ী লাইব্রেরি। শুনেছিলাম বঙ্গবাসী, প্রভাতী পত্রিকা সব আসত। রবিঠাকুর একবার একবার ১৯২৫ সালে আঠারবাড়ী এসেছিলেন। তাকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল ঐ লাইব্রেরি ঘরে। তিনি তখন বেরিয়েছিলেন বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে। গৌরিপুর, মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ী হয়ে এসেছিলেন আঠারবাড়ীতে। ঠাকুমার কাছে শুনেছি আমার বাবা তখন কয়েকমাসের। বাবাকে নাকি কোলে নিয়ে আদর করেছিলেন। রবিঠাকুরের হাতের স্পর্শ পেয়েও বাবাকে কবিতা, গল্প অথবা গানের অনুরাগী হতে দেখি নি। রেডিওতে খালি সংবাদ শুনত। গান শুরু হলে রেডিও বন্ধ।
এরপর গেলাম, মেন গেটের যেদিকে আমাদের বাড়ী, তার উল্টোদিকে একটু গিয়ে, সেখানে কয়কঘর হিন্দুর বাস। আলাপ হল রতিশ চক্রবর্তী মশাইয়ের সঙ্গে। উনারা বংশপরম্পরায় জমিদারবাড়ীর কুলপুরোহিত। এখন হয়ত আর সেই রমরমা নেই, কিন্ত নিষ্ঠাভরে দুর্গাপুজা, জগদ্ধাত্রী পূজা হয়ে থাকে। অনেককাল ধরেই জগদ্ধাত্রী পূজা বেশী ধুমধামের মধ্যে হত। এপারে চলে আসার পর সবই বন্ধ হয়ে যায়। আমি নয়ডাতে সেই পূজা শুরু করি দশবছর আগে।
নয়ডার বাড়ীতে জগদ্ধাত্রী পুজা
বেশীরভাগ উৎসাহটা আমার বৌএর। দুর্গাঠাকুরের একটা দালান দেখলাম, সেটা নূতন হয়েছে। একটা গোল সাদা মন্দির দেখিয়ে বল্লেন, এটা সেই জমিদার আমলের কালী মন্দির। পাশেই ওরকম একটা জগদ্ধাত্রীর মন্দির ছিল। এখন খালি সেটার foundation টা আছে।
ভক্তিভরে প্রনাম করলাম সব কুলদেবতার মন্দিরে। কয়েকদিন পরেই ছিল জগদ্ধাত্রী পূজা। রতিশ ঠাকুরমশাইকে টাকা দিয়ে এলাম পূজা দেওয়ার জন্য।
মন্দির ছাড়িয়ে গেটের বামপাশে একটা বড় পুকুর। সেটা বেশ বড়। পুকুর না বলে দিঘী বল্লে ভাল হয়। সেটা ছিল সব পুরুষমানুসদের গোসলের জায়গা।
সাদাত বাবু দেখালেন পুকুরের পারে একটা পরিত্যক্ত ঘর। সেটা নাকি ডায়নামো ঘর নামে পরিচিত ছিল। জমিদারবাড়ীতে রাতে ইলেকট্রিক বাতি জ্বলত। উৎসবের সময় মন্দিরেও লাইট জ্বলত।
একবার নাকি জগদ্ধাত্রী পূজার সময় টিপু সুলতান নাটক করার কথা হল। ছোট বড় সবাই মিলে মহা উৎসাহে রিহার্সাল দিতে লাগল। তখন আবার জমিদার বাড়ীর পাশে এক সাহেব থাকতেন। তিনি ছিলেন কাছেরই এক জুট মিলের সর্বময় কর্তা। গন্যমান্য ব্যাক্তি বলে তিনি তো আসবেনই নাটক দেখতে। নাটকটিতে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে বেশ জ্বালানয়ী ভাষন ছিল। দাদুর ভয় হল, এরকম নাটক দেখে যদি সাহেব পুলিশে নালিশ জানায়, তবে তো মুস্কিল। তাই ঠিক হল, সাহেব ছুটিতে গেলে নাটক মঞ্চস্থ হবে। সেই টিপু সুলতান এখন নূতন ইতিহাসের পাতায় আর ব্রিটিশ বাহিনীর সংগে যুদ্ধ করা স্বাধীনতা সংগ্রামী নন, হিন্দু বিদ্বেষী হিসাবে প্রতিভাত হচ্ছেন। কর্ণাটক গভরমেন্ট ইতিহাসের বই থেকে টিপু সুলতানকে বাদ দিয়েছে।
গল্প করতে করতে দুপুর পেরিয়ে গিয়েছে। বিদায় নিলাম সাদাত হোসেনের কাছ থেকে। সঙ্গে নিলাম বসতবাড়ীর মধ্যে থেকে পরম শ্রদ্ধায় কুড়িয়ে নেওয়াএকমুঠো মাটি। হয়ত তা খালি অকিঞ্চিত মাটি, কিন্তু আমার কাছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি মাখানো, তার মূল্য সোনার থেকে কম নয়। লাঞ্চের অনেক অনুরোধ সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলাম। কারন একটু রেল স্টেশন দেখব, তারপর জায়গাটা একটু ঘুরে দেখব।
কালের আঙিনায় স্মৃতি ফিকে হয়ে আসে। কিছুটা পরিনত বয়সে চিন্তাধারা, স্থিতধী ও প্রাজ্ঞ হয়, তখন মানুষ তার রুটস কে খোঁজে। সত্যি বলতে নিজের দেশের বাড়ীতে যাওয়ার আগে, মনে ইচ্ছে ছিল, কিন্তু চাক্ষুষ করার পর, আবেগতাড়িত মন আমাকে কল্পনার চোখে নিয়ে গেল অতীতের মায়াময়, আলোআধারির অপার্থিব জগতে। সেই মূহুর্তে ওই জায়গা মনে হল ঈশ্বরের বাগান, যেখানে আমার পূর্বপুরুষের পদরেনু মিশে আছে। মনে হল আমার আত্মা যেন খোঁজ পেয়েছে এক পরম গুপ্তধনের।
এই ফিলিং আসার বড় কারণ বলে যেটা আমার মনে হয়, সেটা হল ঐ জায়গায় নূতন কোন কনস্ট্রাকশন হয় নি, কারণ জমিদারবাড়ী ১৯৬৫র পাকিস্তান গভর্নমেন্টের রুল অনুযায়ী এনিমি প্রপার্টি।
শিকড়ের সন্ধানে-৪
আঠারবাড়ী স্টেশনটা জমিদারবাড়ী থেকে এক কিমি হবে। গাড়ীটা বড় রাস্তায় রেখে হেটে যাচ্ছি। তখন সবে জুম্মার নামাজ শেষ হয়েছে। স্টেশনের লাগোয়া মসজিদ। ওটা পেরিয়ে ঢুকলাম স্টেশনে। দেখে মনে হল, সেই ব্রিটিশ আমলের পর আর কোন সংস্কার হয় নি। ছবি দেখলেই বুঝবেন। দাদুকে সেরেস্তার কাজে ময়মনসিং যেতে হত। বাবাও ময়মনসিং কলেজে পড়ত। সবাইকে কোন না কোন কাজে ময়মনসিং অথবা কিশোরগন্জ যেতে গেলে এই ট্রেনই ছিল ভরসা। তখন সড়ক যোগাযোগ ভাল ছিল না। লম্বা দূরত্বে ট্রেনই ছিল ভরসা। দক্ষিন বঙ্গে ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম। অসংখ্য নদীনালা বেষ্টিত ভূমিতে রেললাইন পাতা যায় নি। তাই নদীপথের প্রাধান্য ছিল।
আঠারবাড়ী স্টেশনে ট্রেন দাঁড়িয়েএই লেভেল ক্রসিং রাস্তায় আসার সময় পড়েছিল
যে গল্প শুনেছি দাদুর কাছে, তারই ছবি যেন ভেসে উঠল। এখনো সেই মিটারগেজ লাইন। স্টেশনের নামলেখা ফলকের পর দিগন্তহীন ধানক্ষেত। সময় যেন থমকে দাড়িয়ে আছে।আমি মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলাম, বাবা ধুতি পরে, তোরঙ্গ নিয়ে পুজোর ছুটিতে, ময়মনসিংহর কলেজ থেকে বাড়ী ফিরছে।হয়ত এই কারণেই আঠারবাড়ীর স্মৃতি মনের মনিকোঠায় চিরকাল অমলিন থাকবে।
স্টেশন থেকে বেরিয়ে কাছের একটা দোকানে ঢুকে লাঞ্চ করা গেল। বেরিয়ে হাটতে শুরু করেছি, একটা বেশ বড়সড় বিল্ডিং দেখলাম। শুনলাম এটা একটা সিনেমা হল।হলটা নাকি অনেক বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
আঠারবাড়ীর পরিত্যক্ত সিনেমা হলবাংলাদেশে সিনেমা দেখতে একসময় ভীড় হত। যব থেকে ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখান বন্ধ হয়েছে, তবে থেকে দর্শক কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের নিজস্ব সিনেমা খুব একটা পপুলার নয়।
দেখি উল্টোদিক থেকে এক বেশ বয়স্ক লম্বামতন মুসলিম ভদ্রলোক আসছেন। ভাবলাম, এরকাছে পুরানোদিনের খবর পাওয়া যেতে পারে। ধরলাম উনাকে, বল্লাম- আদাব কাকা, কই যান, আপনার সংগে কিছু কথা আছে। মাথা নাড়লেন- আসেন, আসেন, যাইতে যাইতে কথা কই। বল্লাম আমার আসার উদ্দেশ্য। বয়স কত জিজ্ঞাসা করায় বল্লেন চারকুড়ি পার। বুঝলাম উনি আমার বাবার কাছাকাছি বয়সের। জিজ্ঞাসা করলাম জমিদার বাড়ীর কথা, আমার দাদু ও বাবার নাম। বাবার নাম শুনে বল্লেন- খুব ভলভাবে চিনতাম সব রায়বাড়ীর পোলাপানরে। তাপসের কথা খুব মনে আছে। হে তো ম্যাট্রিক পাশ কইরা মায়মনসিং কলেজে পড়তে গেছিল। বাবার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। বল্লাম উনি এখন গত। বাবার ছোটবেলার চেনা লোকের সংগে আলাপ করতে পেরে মনটা আনন্দে ভরে গেল। একসংগে ফটো তুল্লাম।
বাবার বন্ধুর সঙ্গে ফটোএবার ফেরার পালা। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম দেশভাগ একটা কতবড় অভিশাপ আমাদের জীবনে। আমরা তো স্বাধীন ভারতের মানুষ। ওর আঁচ হয়ত আমার জীবনে সেরকমভাবে আসে নি। কিন্তু দাদু, ঠাকুমার কথা ভাবি। একটা ভরা সংসারের সবকিছু সমূলে উৎপাটিত করে চলে আসা, সে যে কি যন্ত্রনাময়। ইতিহাস বলে, সাধারণ ভারতবাসী, ভিন্নধর্মের সহাবস্থানে বিশ্বাসী। তারা তো কখনো চান নি এই দেশভাগ। এতো কিছু ক্ষমতালিপ্সু রাজনৈতিক নেতার হঠকারিতার কুফল। তার মাশুল দিতে হল পুরো একটা জেনারেশনকে। কবি অন্নদা শঙ্কর রায় সবচেয়ে সরল ভাষায় লিখেছিলেন ‘ তেলের শিশু ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ কর, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে দু ভাগ কর’। এখন ও মনে হয়, কেন এপার বাংলা আর ওপার বাংলা মিলেমিশে এক হয়ে যেতে পারে না। জানি, এই কল্পনা অলীক। ধর্ম, বিভাজনের সবচেয়ে বড় বাধা। ভাষা, সংস্কৃতি এক হলেও বিভাজনের ফল্ট লাইনটা সেই ধর্ম।
মোট দুইবার গিয়েছি আঠারবাড়ী, দ্বিতীয় বার সস্ত্রীক। সে গল্পের কাহিনী পরে করা যাবে।
দেবদত্ত
নভেম্বর ২০২০























Comments
Post a Comment