সাইকেল (রম্যরচনা)

সন্ধ্যাবেলা সাইকেল চালিয়ে চলে যেতাম, মংলা আর পশুর নদীর মোহনায়। এক বৃস্টিভেজা আসন্ন সন্ধ্যায় তোলা এই ফটোটা আমার বড় প্রিয়। এই ছবিটা ফেসবুকে দেখে আমার এক বন্ধুর বৌ কমেন্ট করেছিল- ‘ এই ছবিটা দেখে একটা গল্প লেখা যায়’।
 সাইকেল পার্ট

সাইকেল জিনিষটা আমার চিরকালের প্রিয়। খুব ছোটবেলাতে বাবা একটা ট্রাইসাইকেল কিনে দিয়েছিল। তখন কতই বা বয়েস হবে। তিন কি চার। ছোটবেলার সবচেয়ে পুরানো স্মৃতিও এই ট্রাইসাকেল জড়িত।  আবছা ভাবে মনে পড়ে, সেই ট্রাইসাইকেল নিয়ে, বাড়ীর পিছনের মাঠ ধরে অনেকটা চলে গিয়েছিলাম। সেই নির্জন মাঠে, একা হারিয়ে গিয়ে, ভীষণ ভয় করছিল। পরে বাড়ীতে খোজাখুজি। বাবা যখন খুঁজতে খুঁজতে এল, তখন আমি কাঁদছি

এই প্রসঙ্গে বলি, বাবার কলেজের এক ছাত্র, সেই ট্রাইসাইকেল নিয়ে আমার ফটো পাঠিয়েছিল, অল ইন্ডিয়া ফটো কম্পিটিশনে, ক্যাপশন ছিল-‘আমি যখন বাবার মত হব সেই ছবি থার্ড প্রাইজ পেয়েছিল। যে ছবিটা তুলেছিল, শান্তিময় সান্যাল, পরে ফটোগ্রাফীকে প্রফেশন করে নেয়।

তারপর যখন ওয়ান কি টুতে পড়ি, তখন দেখতাম বাবা সাইকেল নিয়ে সকালে বাজারে যেত। সাইকেলটা রাতে ঘরের মধ্যে থাকত। তার একটা কারণ ঝাড়গ্রামে তখন খুব চোরের উৎপাত। গৃহস্থ গভীর ঘুমে থাকলে চুরি করার সুবিধা। তাই মাঝরাতে কচ্চিৎ কদাচিৎ কড়ানাড়ার খটখট আওয়াজ আসত। বাবার ঘুম বরাবরই পাতলা। তাই চোর কয়েকবার ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়েছিল। ছোটবেলায় তখনও বাড়ীতে লাইট আসে নি। লাইট আসে ৬৫ সালে ভারত- পাকিস্তান যুদ্ধের সময়।কানেকশন দিয়ে দিয়েছিল মিটার বক্স পর্যন্ত, সেই সময়টাতে মিটার বাড়ন্ত ছিল বোর্ডের অফিসে, এদিকে বাড়ীর মধ্যে ওয়ারিং কমপ্লিট। এসময় বাবার ইলেকট্রিকাল ইন্জিনিয়ারিং এর বিদ্যা কাজে লেগে গেল। তার দিয়ে শর্ট করে বাড়ীতে লাইট জ্বালিয়ে ফেলল। কাছেই আবার এক লাইনম্যান থাকত। সে যাতে না দেখে ফেলে, তাই সব দরজা জানালা, কালো কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা হত। যে কথা বলছিলাম, ছোটবেলায় আমার কাজ ছিল, সাইকেলটাকে স্ট্যান্ড থেকে খুলে বারান্দা অব্দি নিয়ে আসা, বাবা বাজার যাবার আগে। কিছুদিন পরে সেটাকে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে আনতেও শিখে গেলাম। আরো বছর খানেক পরে সাইকেলটা নিয়ে, মাঠের পিছনে একটা ঢালু লম্বা জায়গায় হাফ প্যাডেল করতে শিখে গেলাম, অবশ্যই কয়েকবার আছাড় খেয়ে। আমি আবার কোন কিছু শেখার ব্যাপারে সেল্ফ-ডিপেন্ডেন্ট। চিরকালই অন্যকে জিজ্ঞাসা করতে একটু বাঁধো-বাঁধো ঠেকত। গাড়ী, মানে চারচাকা কেনার সময়ও এরকম একটা ব্যাপার হয়েছিল। আমাদের সমসাময়িক অধিকাংশ বন্ধুদের গাড়ী চালানোর হাতেখড়ি মারুতি গাড়ী দিয়ে। আমার এক বন্ধুকে নিয়ে গিয়েছিলাম গাড়ী ডেলিভারীর সময়। সে তো চালিয়ে এনে আমার গঙ্গোত্রী কলোনির ডি ডি ফ্ল্যাটের পিছনের পার্কিং লটে রেখে দিল। পরের দিন রবিবার। আমার ফ্ল্যাটের তিনতলার জানলা থেকে দেখছি আর হাতটা নিশপিস করছে, ইস গাড়ীটা যদি চালানো যায়। সুমিতাকে বলা যাবে না, কারণ চালাতেই তো জানি না, অবশ্যই মানা করবে। তবে গাড়ী চালানোর বি সি টা জানা ছিল, আক্ষরিক অর্থেই বি সি, মানে ডানদিক থেকে ধরলে, প্রথমে এক্সিলারেটার তারপর ব্রেক পরে ক্লাচ।এই স্বল্পবুদ্ধি নিয়ে, বাড়ী থেকে বেরোলাম দুধ আনতে যাব বলে। আগেরদিন বন্ধুর কাছে দেখে নিয়েছিলাম গীয়ারটাকে নিউট্রালে রেখে, গাড়ী স্টার্ট করতে হয়। বেশ কয়েকবার ব্যাটে বলে হল না, মানে গীয়ার্ দিয়ে এক্সিলারেটর দাবাতে গেলেই স্টার্ট যায় বন্ধ হয়। যাক বেশ কিছুক্ষন কসরত করার পর গাড়ী ১০-১৫ ফিট চলল। সেটাই এক বিশাল এচিভমেন্ট মনে হল।

যাক যে কথায় ছিলাম, বেশ কিছুদিনের মধ্যে, সড়গড় হয়ে গেলাম হাফ প্যাডেলে। তবে রাস্তায় যাওয়া বারন, মাঠের মধ্যেই চক্কর কাটতাম। ক্লাস ফাইভে যখন উঠি, তখন অন্য বন্ধুদের থেকে লম্বা ছিলাম, সিটে উঠে বড়দের মত চালানো শিখে গেলাম। বাবার সাইকেলের সিটটা ছিল বেশ উঁচু। তখন, ২২ ইঞ্চি, ২৪ ইঞ্চি, ২৬ ইঞ্চি উঁচু সাইকেল সিট হত। বাবারটা ছিল ২৬ ইঞ্চি। প্রথমদিকে পা পুরো প্যাডেলের শেষ নীচু অংশ অব্দি যেত না। ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি তখন আরেকটা সাইকেল কেনা হল। আগে থেকে বাবা কিছু বলে নি। বাড়ীতে হঠাৎ করে নূতন দামী কিছু এলে, এমনিতেই উৎসাহ দ্বিগুন হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম হল না।  তখন থেকে ইস্কুলে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলাম। আমাদের স্কুলটা ছিল, লেভেল ক্রসিং আর বাজার পেরিয়ে, প্রায় চারকিলোমিটার। সেই ভীড় ভাড়াক্কার মধ্যে চালিয়ে স্কুল যেতে যেতে বেশ পোক্ত হয়ে গেলাম সাইকেলে। পিছনের ক্যারিয়ারে বন্ধুদের বসিয়ে, ঘোরাটাও অভ্যাস হয়ে গেল। পিছনে কেউ বসলে আবার হ্যান্ডেল স্টেডি রাখা বেশ শক্ত কাজ। আর যদি মানুষের বদলে সমপরিমান ওজনের জিনিষ থাকে, তাহলে সেটা আরো শক্ত। তখন তো কয়লার উনুনে রান্না হত। কয়লার ডিপোটা ছিল মাইলখানেক দূরে। বাবা অর্ডার করে এলে বাকে করে ৫০ কিলো কয়লা দিয়ে যেত। তখন সদ্য শংকরেরজানা অজানারেপড়ে ফেলেছি, অমেরিকাতে নাকি বার-তের বছর থেকে ছেলেরা নিউজ পেপার ডেলিভারি করে অথবা অন্য কাজ করে, পকেটমানি আর্ন করে। তাই আমিও দু দফায় পঁচিশ কিলো করে কয়লা সাইকেলের পিছনে চাপিয়ে আট আনা করে রোজগার শুরু করলাম। আরেকটা উপায় ছিল রোজগারের, তবে সেটা বছরে একবার। স্কুলে উপরের ক্লাসের ছেলেরা হাফ দামে পাঠ্যবই বিক্রি করত, সেটা কিনে বাবার কাছ থেকে নূতন বইয়ের দাম নিতাম।

আমাদের স্কুলের নাম ছিল কুমুদ কুমারী ইনশ্টিটিউশন, আর গার্লস ইস্কুলটার নাম ছিল বিনোদ মন্জরী। এরকম নামের কারন হচ্ছে, ঝাড়গ্রামের বেশীরভাগ উন্নতি প্রকল্পের জমি, রাজার দান করা জমিতে তৈরী।তাই তদানীন্তন রাজার মা আর শাশুড়ীর নামে সেই দুই স্কুল।ছোটবেলায় ঠাকুরমার ঝুলি আর ঠাকুর্দারথলে পড়ে, রাজা রাজড়ার ব্যাপারে একটা উচ্চ ধারণা জন্মেছিল। কিন্তু সে ধারণা কি করে পাল্টাল সেটাই বলি। বাবা তখন অফিসিয়েটিং প্রিন্সিপাল হওয়ার সুবাদে গভর্নিং বডির মেম্বার। রাজা মশাই সেই কমিটির চেয়ারম্যান। কোন একটা কারণে উনি বাবাকে রাজবাড়ীতে ডেকে পাঠালেন। রাজামশাইয়ের দরবার থেকে ফিরে আসার পর, খুব উৎসাহের সঙ্গে জানতে চাইলাম, রাজবাড়ী কেমন দেখলে, কেমন আপ্যায়ন হল? বাবা চিরকালই উচ্ছাসবিহীন। ভাবলেশহীন মুখে জানাল, রাজা মশাই তো লুঙ্গী পরে বসেছিলেন, একটু কথাবার্তা হল, চা আর মুড়িমাখা সহযোগে। ব্যাপারটা আমার মোটেই পছন্দ হল না, কিরকম রাজা,দরবারে তো অন্তত মুকুট পরে, তরোয়াল হাতে থাকা উচিত, তার বদলে কিনা লুঙ্গী, নিদেনপক্ষে ধুতি পান্জাবী হলেও চলত। বলাবাহুল্য, রাজা রাজড়ার ব্যাপারে ভক্তিশ্রদ্ধা কিঞ্চিত হ্রাস পেল।

ক্রমশঃ


ছোটবেলার ট্রাইসাইকেল। এটা আমার খুব প্রিয় ছিল। বাবার কলেজের এক ছাত্র এই ফটো তুলে অল ইন্ডিয়া ফটো কম্পিটিশনে প্রাইজ পেয়েছিল

সাইকেল পার্ট

স্কুলের কথা বলতে গিয়ে কোথায় চলে এসেছি।স্কুলের সামনে একটা বড় মাঠ ছিল, আর পুরো স্কুলটির বাউন্ডারি ছিল শালগাছ দিয়ে।আলাদা করে কোন বাউন্ডারি ওয়াল ছিল না। তাই সাইকেল নিয়ে স্কুল পিরিয়ডে বেরিয়ে পড়া, বেশ সোজা ব্যাপার ছিল। মাসে একটা দিন পড়ত, যেদিন ক্লাস টিচার মাইনে নিতেন, পুরো প্রথম হাফটা। মাইনেটা দিয়েই কয়েক বন্ধু মিলে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম ঘুরতে।প্রথমদিকে স্কুলের কোন ড্রেস ছিল না, তাই রাস্তায় বোঝার উপায় থাকত না যে আমরা স্কুল কেটে ঘুরছি।ঝাড়গ্রাম শহরটা খোলা জায়গায়, উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব- পশ্চিম, চারিদিকেই অবারিত দ্বার।বর্ষাকালে মাঝে মাঝে রেনি ডে হয়ে ছুটি হয়ে যেত। স্কুল যাওয়ার সময় বেশী করে ভিজতাম, যাতে রেনি ডে হওয়ার সম্ভবনা বাড়ে। এরকমই এক দিনে, সাইকেল চালিয়ে চলে গেলাম ঝাড়গ্রামের পরের স্টেশন গিধনি, ওটাই নাগপুর মেন লাইনে ওয়েস্ট বেঙ্গলের শেষ রেল স্টেশন, তারপর ঝাড়খন্ডের চাকুলিয়া স্টেশন পড়ে। কখনো শালজঙ্গল পেরিয়ে লোধাশুলি হয়ে বম্বে রোড, মানে মেন হাইওয়ে। অন্যদিকে দহিজুড়ী হয়ে বেলপাহাড়ী।একবার বন্ধুরা মিলে গেলাম ডুলুং নদী পেরিয়ে চিল্কীগড়ের বিখ্যাত কণকদুর্গা মন্দির। আশেপাশে পড়ত সাঁওতালদের গ্রাম। ওদের বাড়ীগুলো কি পরিস্কার আর বেশীরভাগ বাড়িতেই সুন্দর করে আঁকা পটচিত্র। দহিজুড়ী বিখ্যাত ছিল রসগোল্লা জন্য। আরেকটা রাস্তা ছিল বাবার কলেজের সামনে দিয়ে, বৈতা বলে একটা জায়গা, সেটা ছিল কংসাবতী নদীর পাশে।আমাদের স্কুল থেকে বিশ কিমি। অংকের মাস্টারমশাই আদিত্যবাবু রোজ এতটা রাস্তা সাইকেলে যেতেন আসতেন। খুব অবাক লাগত সারের স্ট্যমিনা দেখে।

তখন ফোর-ফাইভে পড়ি। শুনলাম পেট্রোলপাম্পের মোড়ে, এক সাইকেলওয়ালা, সে নাকি তেলেগু, সাতদিন ধরে সাইকেল চালাবে, উইদাউট ব্রেক। রোজ স্কুল থেকে ফেরার সময় দেখতাম সাইকেলওয়ালার কেরামতি। জমি টাচ না করে সিট থেকে, এক পা প্যাডেলের উপরের সাইকেলের ফ্রেমে রেখে, অন্য পাএর তালুটা  দিয়ে, সাইকেলের চাকার টায়ারটা একটু একটু করে টানছে আর সাইকেল ধীরে ধীরে গোল হয়ে ঘুরছে, কখনো সে চলন্ত সাইকেলের সীটের উপর দাড়িয়ে পড়ছে অবলীলায় অথবা উল্টোমুখ করে সাইকেলের হ্যান্ডলে বসে চালিয়ে যাচ্ছে।সবচেয়ে মজার ছিল ওর স্নান করাটা, পা প্যাডেলে রেখে, পেটটাকে হ্যান্ডেলের সঙ্গে সাটিয়ে, বালতির জল নিয়ে স্নান করত। আমার কাছে সে ছিল কিছুটা স্বপ্নের নায়কের মত, খালি ভাবতাম, ইশ আমি যদি ওর মত সাইকেল চালাতে পারতাম। মফস্বল শহরে তখন সাইকেলেরই যুগ ছিল। ছোটবেলায় জ্বর-জারি খুব হত, বাবার তো একবার প্লুরিসি হল।সেইসময় ডাক্তারবাবুকেকলদিলে উনি আসতেন সাইকেল নিয়ে। পিছনের ক্যারিয়ারে ডাক্তারি ব্যাগটা থাকত। বাড়ীর লোকের, ওটা হাতে ধরে নিয়ে আসা একটা কাস্টমের মধ্যে পড়ত। রোজ সকালে পোস্টম্যানকাকু আসত পাড়াতে সাইকেল চালিয়ে, চিঠি পৌঁছাতে। আজকাল বাড়ীতে ডেলিভারী মানে, আ্যমাজনের প্যাকেট, নয়ত জ্যমেটো, সুইগির হোম ডেলিভারি ফুড।

তারপর কলকাতায় কলেজ লাইফে সাইকেল চালানোর সুযোগ চলে গেল। বাড়ী এলে সেটা সুদে আসলে পুষিয়ে নিতাম। আমার বেশ কয়েকটা বন্ধুমহল, তখনকার বাংলায়- ‘ঠেকছিল। একটা ক্লাসের বন্ধুদের, সেটা সাধারনত স্টেশনের প্ল্যাটফরমেই হত। একনম্বর প্লাটফরমের শেষপ্রান্তে গাছ ছিল, তার পাশের বেঞ্চটা ছিল বিকালে আমাদের দখলে। সন্ধ্যের সময় দেখতাম অনেক পাখি কিচির মিচির করতে করতে গাছে ভীড় করত। এগুলোই ওদের বাসা ছিল।কিছুক্ষন ধরে ওদের চিল্লামিল্লি চলত, তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে আসত। একটু পরে ঝমঝম শব্দ করে আসত খড়্গপুর-টাটানগর প্যাসেন্জার।অনেক সাধারন লোক, বাজার করে অথবা ডাক্তার দেখিয়ে বা চাকরী করে ট্রেন ধরত। কিছুক্ষনের জন্য, চা আর সিঙ্গারা ওয়ালার হাঁকডাক আর প্যাসেন্জারদের কলকাকলীতে মুখর। ট্রেন চলে গেলে নিঝুম শান্তি, পিছনদিকে ছিল একটা লাশকাটা ঘর আর তার পাশে শাল কাঠের গুদাম। কাঁচা শালকাঠের একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসত।আরো একটা গ্রুপ ছিল, আমার এক ক্লাস উপরের, সেই আড্ডাটা ছিল জেলখানার পাশের রাস্তাটার দুদিকে কালভার্টের উপর। কলেজে আমাদের ক্লাসে সোমনাথ বলে একটা ছেলে ছিল। সোমনাথ নামের আরো ক্লাসমেট ছিল। তবে একে পাগলা সোমনাথ বলেই সবাই চিনত। সে মাঝে মাঝে সাইকেল নিয়ে বড়বাজার থেকে যাদবপুরে আসত। ওর কাছ থেকে নিয়ে সাইকেল চালাতে গিয়ে দেখি, একটা ব্রেক নেই, আরেকটা হাল্কা ধরছে। এরকম এক সাইকেল নিয়ে আসা, প্রায় প্রাণ হাতের মুঠোয় করে আসা। পাগলা সোমনাথের অনেক ক্যালি ছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত যে কোন হিন্দি সিনেমার সুরে গেয়ে দিত। একদিন দেখি সত্যেনদার ক্যান্টিনের সামনে জলে ভিজিয়ে পাউরুটি খাচ্ছে।ফাইনাল ইয়ারে ইন্ডস্ট্রিয়াল টুরে গিয়ে, দিগম্বর হয়ে নৃত্য শুরু করেছিল।

তখন ফাইনাল পরীক্ষার পর চাকরির খোজাখুজি চলছে। ইনক্যাব বলে টাটানগরে একটা কেবল কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম।কলকাতা টু টাটানগরের ফার্স্ট ক্লাসের ফেয়ার পাওয়া গেল। গিয়েছি তো ঝাড়গ্রাম থেকে টাটানগর, সেকেন্ড ক্লাসে। জীবনে সেই প্রথম রোজগার। অনেকদিনের শখ ছিল, সাইকেলে ডায়নামো লাইট লাগাব। পিছনের চাকাটা ঘোরার সময় ডায়নামোটা টায়ারে লেগে ঘুরত, আর তাই থেকে লাইট জ্বলত। ফিরে এসেই সেই লাইট কিনে ফেললাম। অনেকদিনের স্বপ্নপূরণ হল।

এরপর চাকরী পেয়ে দিল্লি এলাম।সেটা ১৯৮২ শেষের দিক। বদরপুর পাওয়ার স্টেশনে আমাদের একবছরের ট্রেনিং। পাওয়ার ইন্জিনিয়ারস ট্রেনিং সোসাইটি বা সংক্ষেপে পেটস হোস্টেলে থাকতাম। দেখি আমাদের কুক মহিন্দরের কাছে একটা সাইকেল। সেটা নিয়েই প্রতি রবিবার বদরপুর মার্কেট অথবা সূরজকুন্ডে চলে যেতাম। বদরপুর যদিও দিল্লির পিনকোডের আন্ডারে, কিন্তু সেইসময় ওখানে হরিয়ানার দেহাতী অঞ্চলের প্রভাব স্পস্ট। অনেক প্রৌঢ়কে দেখতাম, দোকানের বাইরে খাটিয়াতে আধশোয়া হয়ে হুকো টানছে, মাথায় একটা রাজস্থান স্টাইলে পাগড়ী বাঁধা।সুরজকুন্ড যাওয়ার রাস্তাটায় এখন বিশাল আন্ডারপাস, যেখানে মথুরাগামী মেন রেললাইন ক্রস করছে, তখন সেখানে ছিল লেবেল ক্রসিং, চারিদিকে ছোট ছোট বাবলা গাছের ঝোপ, মাঝে দুই একটা গরুড়গাড়ী। এখন সেইরাস্তা গাড়ীর ভীড়ে সারাক্ষন জ্যাম। সময়ের সাথে সাথে কত বদল। 

ট্রেনিং এর পর পোস্টিং হল নেহেরু প্লেসে। এই অফিস পাড়াটা তখন সদ্য হয়েছে। সাউথ দিল্লিতে, সি আর পার্ক, যেটা কিনা বাঙ্গালী কলোনী বলেই বেশী খ্যাত, সেটা মাত্র আড়াই কিমি। ভাগ্যক্রমে ভাড়াও পেয়ে গেলাম। তখন দিল্লিতে এশিয়াডের পরপর অনেক উন্নতি হয়েছে, মাইগ্রেটেড চাকুরিজীবি অনেক, তুলনায় বাড়ী কম, স্বভাবতই ভাড়া খুব বেশী। আমার এক কলিগ বাড়ী দেখে, তারপর ভাড়া শুনে, বাড়ীওয়ালাকে বলেছিল- আচ্ছা রান্নাঘরটা না নিলে কত ভাড়া? বাড়ীওয়ালা বেশ অবাক চোখে তাকাতে জবাব দিল, ‘না- মানে এত ভাড়া গুনলে তো হাড়ি চড়বে না, তাই রান্নাঘরটার আর দরকার নেই

এর পরের পর্বে আমি সেই সাইকেল দিল্লির বাড়ীতে নিয়ে আসি। ট্রেনে বুক করে দিয়েছিলাম। সেটা এল নিজামুদ্দিন স্টেশনে। এরপর থেকে আমার অফিস যাতায়ত সাইকেলে।বন্ধুমহলে তখন অনেক বাঙ্গালী কলিগ, বেশীরভাগই ব্রীফকেস নিয়ে সামনের বাসস্যান্ড থেকে বাস ধরে, কয়েকজন স্কুটারে যায়। আমি তাদের সামনে সাইকেল নিয়ে যাই, মাঝে মাঝে আওয়াজও খাই। নেহেরু প্লেসের কাছেই ওখলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া। একবার সাইকেল নিয়ে গিয়েছি ইনিস্পেকশনে। তখন কন্ট্রোল সুইচগিয়ার বেশ বড় কোম্পানি। ইনস্পেকশনের পর, কমার্শিয়াল ম্যানেজার বলল- স্যার গাড়ী বলছি, আপনাকে পৌছে দেবে। গম্ভীরভাবে জানলাম- থ্যাংকস, বাট আই হ্যাভ মাই ওন ভেহিকেল। কেলোটা হল, সে ব্যাটা বেরোবার সময় আমাকে দেখে ফেলল সাইকেল শুদ্ধু।দেখি ফিক ফিক করে হাসছে। এন টি পি সি ইন্জিনিয়ার। এমনিতে ভেন্ডররা বেশ খাতির করে।তবে সেদিন প্রেস্টিজ পাংচার। ভারতে সাইকেল জিনিষটা কোনদিনই কৌলিন্য পায় নি।গরিবের ভোটব্যাংক পাওয়ার তাগিদে, উত্তরপ্রদেশে মুলায়েমের এস পি পার্টির প্রতীক হল সাইকেল। নয়ডাতে আমাদের সেক্টরে বেশ খরচা করে সাইকেল লেন হল অখিলেশের আমলে। উদ্দেশ্য মহৎ সন্দেহ নেই, তবে দুদিনের মধ্যেই, ঠেলাওয়ালা, পান-সিগারেটের দোকান বসে গেল। একবার তো দেখলাম পাশের ড্রেন থেকে ভ্যাট তুলে পুরো সাইকেল লেন ভর্তি।

ক্রমশঃ

               সুন্দরবনের রাস্তায় বাংলাদেশে। ২০১৫সাল

সাইকেল পার্ট

এটা বিয়ের আগের ব্যাপার। সম্ভবত ৮৬ সাল। আমাদের কলেজেরই দুলাল ঘোষ, আমার পরের ব্যাচে জয়েন করেছিল। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে ইস্কুলিং, খুবই রামকৃষ্ণ ভক্ত, রোজসকালে অফিসে এসে প্রথম কাজ ছিল ডায়রী খুলে দশবার ঠাকুরের নাম লিখে ফেলা।এমনিতে বেশ উইটি।পরে অস্ট্রেলিয়া চলে গেল। তো আমরা ঠিক করলাম, সাইকেল নিয়ে লম্বাসফরে বেরোব। ঠিক হল মথুরা হয়ে ভরতপুর যাব।ভরতপুর চুস করার কারণ, তখন সদ্য সদ্য সালেম আলির আত্মজীবনীফল অফ স্প্যারোপড়ে ফেলেছি। বার্ড ওয়াচিংএ একটু ইন্টারেস্ট জেগেছে, দুটো বইও কিনেছি একটা সালেম আলির- বার্ডস অফ ইন্ডিয়া , অন্যটার নামবার্ডস অফ ইন্ডিয়ান সাবকনটিনেন্ট শীতকালে নাকি ভরতপুরে অনেক পরিযায়ী পাখি আসে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা সাইবেরিয়ান ক্রেন। মথুরা ১৩০ কিমি, ওখান থেকে ভরতপুর আরো পন্চাশ।তখন শীতকাল। ভোরবেলা বেরোলাম। বদরপুর-মেহেরৌলি রোড ধরে, তুঘলকাবাদ ফোর্ট পাশে রেখে এসে পরলাম এন এইচ টুতে। এটাই ফরিদাবাদ পল্বল হয়ে চলে গিয়েছে মথুরা। রাস্তা তখনো চওড়া হয় নি। তাই সাবধানে যাচ্ছি। প্রায় ঘন্টা চারেক চালানর পর, দেখি এক ফরেনার একটা রেসিং সাইকেল নিয়ে পাশ দিয়ে বেড়িয়ে গেল।ক্যারিয়ারের দুইপাশে দুটো ব্যাগ, হ্যান্ডেলের সামনে, একটা ম্যাপ ভাজ করে লাগানো।  ভাবলাম সাহেবের সঙ্গে একটু গল্প করব। কিন্তু আমার সাধারন সাইকেলে ওর সঙ্গে পাল্লা দেয় কার সাধ্যি। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আরো কিছুটা এগোনর পর দেখি, সাহেব সাইকেল থামিয়ে রাস্তার পাশে একা বসে কফি খাচ্ছে আর কিছু লিখছে। পাশে দেখি একটা ছোট গ্যাস স্টোভ। বুঝলাম ওটাতেই জল গরম করেছে। আলাপ হল, জানলাম আসছে নেদারল্যান্ড থেকে, বয়স পয়তাল্লিশ।সারা ইউরোপ হয়ে, টার্কি, অফগানিস্থান, পাকিস্তান হয়ে, ইন্ডিয়া। কলকাতা যাচ্ছে। সেখান থেকে ফ্লাইট ধরে ব্যাংকক। নর্থ ইস্ট হয়ে যাবে না, কারণ আরাকানের জঙ্গলে নাকি ডাকাতের ভয়। ওর ওয়াইফ কিছুদিন আগে মারা গিয়েছে, তাই ওয়ার্ল্ড ট্যুরে বেরিয়েছে।জিজ্ঞাসা করলাম, খরচা কি করে চলছে- হাতের কাগজটা দেখিয়ে বল্ল,- ‘আমি নেদারল্যান্ড এর একটা কাগজে উইকলি কলাম লিখি আমার ভ্রমণসংক্রান্ত, তারাই স্পনসর করছে ব্যাপারটা বেশ ভাল লাগল। মাছের তেলে মাছভাজা হচ্ছে। তখন জানতাম না যে আমার হাত দিয়ে কিছু লেখা সম্ভব। তাহালে হয়ত চেস্টা করা যেত। তবে সবচেয়ে বড় প্রবলেম হল, আমাদের দেশে লম্বা ছুটি পাওয়া মুস্কিল, এরকম ট্রিপ করতে গেলে চাকরী ছাড়তে হবে। আর আমাদের দেশে, একবার চাকরী ছাড়লে, আর পাব কিনা, তার কোন গ্যারান্টি নেই। আজকাল আমাদের কম্পানিতেস্যাবাটিকাল লিভশুরু হয়েছে, তিন বৎসর পর্যন্ত বিনা বেতনে ছুটি নেওয়া যাবে। এটা যদি আগে থাকত, তবে বুঝিবা এরকম একটা এডভেন্চার করা যেত।

নেহেরু প্লেসে, আমাদের অফিসটা ছিল চোদ্দতলা, তার পাশে স্কুটারের পার্কিং লট। সামনের রাস্তার পাশে, সাইকেল আর গাড়ীরও পার্কিং লট ছিল। অফিস থেকে মান্থলি স্টিকার দিত স্কুটার পার্কিং এর জন্য, নইলে ১৫/- পার্কিং ফি মাসে ছিল। প্রথমদিন সাইকেল নিয়ে রাখতে গিয়েছি, স্কুটারের পার্কিং লটে, কারণ অফিসের সবাই ওখানেই পার্ক করে। পার্কিং এটেনডেন্ট আমাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ফুটিয়ে দিল।সাইকেলবালে ইধার এলাওড নেহি হ্যায় বলার চেষ্টা করলাম- ‘‘হাম এনটিপিসিকা ইনি্জনিয়ার হ্যায়, হামারে সারে সাথী ইহাই লাগাতে হ্যায় কাকস্য পরিবেদনা! গেলাম আমাদের এইচ আর ডিপার্টমেন্টে। আগে ওটার পার্সোনাল ডিপার্টমেন্ট নাম ছিল।বল্লাম আমার সমস্যা। ওদের বক্তব্য- ফ্রি স্টিকারবালা রুল স্কুটার আর গাড়ীকে লিয়ে হ্যায়। আমিও ছাড়ার পাত্র নই, বল্লাম যে স্কুটার কেনার মত, সাইকেল কেনার জন্য কোমপানি আমাকে লোন দিয়েছে, তার মানে আমি ওটাকে অফিস যাতায়তে ব্যাবহার করতে পারি। অকাট্য যুক্তি। শেষমেশ অফিস রুল মডিফাই করে সাইকেলের স্টিকার শুরু হল।তবে আমি একমোবদ্বীতয়ম ছিলাম সাইকেল স্টিকার নেওয়াতে।

সিআর পার্কে থাকার সময় সাইকেল অনেক কাজে লাগত, বন্ধুদের বাড়ী আড্ডা থেকে শুরু করে, বাজার, লাইব্রেরি ইত্যাদি সব জায়গাতেই সাইকেল সর্বক্ষনের সঙ্গী। আমার ব্যাচমেট, অমলেন্দু কলকাতার ছেলে। ঠিক করল বাইক কিনবে। কিন্তু দুচাকায় ব্যালেন্স দরকার। তাই তার ব্যালেন্সের হাতেখড়ি হল আমার সাইকেলে। বিয়ের আগে শীতকালে, শনি-রবিবার প্রায়ই চলে যেতাম, নিউজ পেপার নিয়ে, সাইকেল চালিয়ে কুতুব মিনার।দূরত্ব ছিল, আমার বাড়ী থেকে নয় কিমি। ওই হেরিটেজ সাইটে বসে পেপার পড়তে যে কি ভাল লাগত। টোস্ট-অমলেট অথবা আলুপরোটা দিয়ে ব্রেকফাস্ট চত্বরের দোকানেই হয়ে যেত।

সেই প্রাণাধিক প্রিয় সাইকেলটা সিআর পার্ক ছাড়ার সময় বিক্রি করে এলাম।

এরপর যখন ৯৫ সালে দাদরীতে, দিল্লি থেকে ৪০ কিমি, বদলি হয়ে এলাম, তখন দাদরীর টাউনশিপে কোয়ার্টার নিলাম।আরেকটা নূতন সাইকেল কেনা হল। সেটার হ্যান্ডেলটা বেশ রেসিং সাইকেল টাইপের, চাকার রিমটাও পাতলা। শীতকালে ওটা চড়েই অফিস যেতাম। ছেলেকে সামনে বসিয়ে স্কুলে ছেড়ে আসতাম সকালে।একবার বিপত্তি ঘটল, হঠাৎ করে হ্যান্ডল টা গেল বেকে আর সূর্যর পা ঢুকে গেল চাকায় স্পোকের ফাঁকে। পড়লাম সবসুদ্ধ উল্টে। স্কুল যাওয়া লাটে, লোকজন ধরাধরি করে নিয়ে গেল টাউনশিপ হসপিটালে, আমি অল্পের উপর দিয়ে ছাড়া পেলাম, কিন্তু বেচারা সূর্যের গোড়ালি থেকে মচকে গিয়ে অনেকটা কেটে গিয়েছিল। একসপ্তাহ স্কুল যাওয়া বন্ধ।তখন বলা যায় আমি তিন প্রজন্মকেই রিপ্রেসেন্ট করছি। সাইকেল, স্কুটার এবং গাড়ী তিনটেই চালাই।ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছি চিরকাল সাইকেল চালিয়ে কলেজ যেতে। পিছনের ক্যারিয়ারে থাকত অফিস ব্যাগ। কলেজে পৌছলে, বাহাদুর সেলাম ঠুকে সাইকেলটা পার্ক করতে নিয়ে যেত, পার্ক করে ব্যাগটা নিয়ে আসত বাবার টেবিলে।অনেকটা আজকের দিনে ভ্যালে পার্কিং এর মত। দিল্লিতে যাওয়ার পর দেখলাম বেশীরভাগের বাহন হচ্ছে স্কুটার।তখন নূতন বাজাজ স্কুটারের দাম ছিল সাড়ে তিনহাজার টাকা। ৫০০/- দিয়ে বুক করে রাখলে, বছর তিনেক পরে নম্বর আসত ডেলিভারীর। আমার অফিসের কলিগ, অজিতকুমার, সেই বুকিং এর কাগজ ব্ল্যাকে বিক্রি করে সাড়েতিন হাজার টাকা পেল এবং অফিসে একটা পার্টিও দিল।চারচাকা তখন রাস্তায় খুবই কম। এম্ব্যাসেডার আর ফিয়াট কিছু দেখা যায় রাস্তায়। মারুতি কম্পানি তখন সদ্য বাজারে এসেছে।অফিসে তখন দুই একজন বড় সাহেবের গাড়ী ছিল। একদিন অফিসে হেটে আসছি। হঠাৎ একটা গাড়ী পাশে এসে দাঁড়াল। দেখি আর পি সিং সাহেব ডাকছেন, ‘বাচ্চো, যাও, গাড়ী মে উনি তখন অফিসের অন্যতম বড় সাহেব, দেখা হলে নমস্তে বলা পর্যন্তই উনার সঙ্গে আলাপ। পরে উনি পাওয়ার গ্রীড কোম্পানির চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।যা হোক গাড়ীতে উঠে পড়লাম, ভাবছি, সাহেবের আমার প্রতি এত সদয় হওয়ার কি কারণ। যাক পার্কিং লটে গাড়ী থেকে নেমে- ‘থ্যাঙ্ক ইউবলে চলে আসছি, সিং সাহেব হাঁক পাড়লেন- ‘আরে বাচ্চো, ইধার আও, থোড়া মদত করো, কভার লাগানে মেএবার বোঝা গেল লিফ্ট দেওয়ার কারণ। তখনকারদিনে গাড়ী বেশ মহার্ঘ বস্তু, এরিস্টোক্রাসীর নিদর্শন, সেইসময় চল ছিল কভার দিয়ে গাড়ী ঢেকে রাখার।যাক, অফিসের সাহেব বলে কথা, কভার লাগাতে হাত লাগালাম।

২০১৩ সালে যখন বাংলাদেশ যাই, প্রথম মাস দুয়েক ছিলাম ঢাকাতে। সেখানে রাস্তা দিয়ে হাটাই দুস্কর, সাইকেল তো দূর অস্ত। সাইটে খোলামেলা জায়গায় গিয়ে মনে হল মুক্তি পেলাম।গেস্টহাউসে থাকি। প্রথম অফিসিয়াল কাজ যেটা করলাম, সেটা হচ্ছে, একটা নোট বানালাম, কনটেন্ট হচ্ছে, খুব জরুরী ভিত্তিতে দুটো সাইকেল কেনা দরকার, গেস্টহাউস স্টাফেদের জন্য, কারণ বাজার যাওয়া অন্যান্য অফিসের কাজে পিয়ন পাঠাতে হলে সাইকেল সবচেয়ে এফেক্টিভ। কিছুদিনের মধ্যে সাইকেল এসে গেল।মজার ব্যাপারটা ছিল, স্টাফদের কেউই সাইকেল চালাতে জানত না। ভাগ্য ভাল যে, সেটা নিয়ে কেউ কখনো কোশ্চেন করে নি।রোজ সন্ধ্যেবেলা সাইকেল চালাতাম। দুই তিনবার পশুর নদী, নৌকায় সাইকেল শুদ্ধ ক্রস করে, সুন্দরবনের সীমানা অব্দি গিয়েছি। সে গল্প বাংলাদেশ পর্বের লেখাতে আসবে। এই তো কিছুদিন আগে ভোপাল গিয়েছিলাম অফিসের কাজে। একদিনে কাজ হয়ে গেল। পরের দিন বিকালে ফিরব।সকালে খেয়েদেয়ে বেরোলাম ভোপালের লোক দেখতে। ভোপাল শহরটির ইউনিকনেস হচ্ছে এই লেক, শহরের মাঝখানে, একূল থেকে ওকূল দেখা যায় না।লেকের জলে বোটিং এর বন্দোবস্ত, পাশেই মিনি চিড়িয়াখানা। নামে মিনি, এরিয়াটা সুবিশাল।সুবিধা হচ্ছে ভাড়াত সাইকেল পাওয়া যায়। বেশ খুশী লাগল,  অনেকদিন পরে সাইকেল চালানোর সুযোগ পেয়ে।কারণ, আজকাল পোস্টিং যোশীমঠে। পাহাড়ে আর যাই হোক সাইকেল নৈব নৈব চ। একপাশে লেক, অন্যপাশে দূরে দূরে এনক্লোসার। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। বেশ মন খুলে কয়েক কিমি সাইকেল চালিয়ে নিলাম।

পরিশেষে বলি, সাইকেলের গুন একমাত্র নারকেলের সংগে তুলনীয়। নারকেলে, ছোবড়া, নারকেল মালা থেকে শুরু করে জল শাঁস, সবই ইউজেবল। সাইকেলও তাই, পলিউশন নেই, শব্দ নেই, তার উপর এক্সারসাইজ হচ্ছে, আলাদা করে জিম যাওয়ার সময়ও বাচছে।  আজকাল দেখি আরবান এরিয়াতে, সাইকেল চালানোতে উৎসাহ দেওয়ার বদলে, এমন সব মডিফিকেশন হচ্ছে রোড নেটওয়ার্কে, যাতে কিনা সাইকেল চালানো দুরূহ হয়ে পড়ছে। আমাদের জায়গাতেই দেখছি, দুই রাস্তার মাঝে বুকসমান উঁচু ডিভাইডার। মার্কেট, বাড়ীর সামনের বড়রাস্তার ওপারে হলেও, সাইকেল অথবা পায়ে হেটে যাওয়া যাবে না। গাড়ী বার করতে হবে। কলকাতা এই হিসাবে মোর ফ্রেন্ডলি।

দেবদত্ত

১১/০১/২০২০

       ভূপালে লেকের পাশে। সাইকেলটা ভাড়াত নিয়েছিলাম। ২০১৮          সালে তোলা 


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments