করোনাকালে দুর্গতিনাশিনী
দুর্গতিনাশিনী
আজকাল বাঘছাল পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠেছে। মর্ত্যে বাঘের আকাল। তায় সরকারী ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্পে বাঘের পঞ্চত্ব প্রাপ্তির হারও কম। তার উপর চায়না, যার সঙ্গে সম্পর্ক এখন ‘হিন্দি চিনী ভাই ভাই’ এর বদলে ‘হিন্দি চিনী ঠাঁই ঠাঁই’ হয় গিয়েছে। মানে সম্পর্কে এখন ‘চিনি কম’ বলা যায়। তার উপর শিবঠাকুরের বাসস্থান কৈলাস পর্বতও শত্রু রাজ্যে। চৈনিক জনসাধারণরাও এথিস্ট। ফলে যে চেয়ে চিন্তে একটা বাঘছাল কব্জা করবেন সেটার আশাও সুদূরপরাহত। এদিকে গিন্নি ঠাকরুণ চোখে আজকাল কম দেখেন। ছুঁচে সুতো পরাতে গেলে চশমা লাগে। তাই সরস্বতীকে বাবা বাছা করে, বাঘছালে তাপ্পি দিয়ে সেলাই করিয়েছেন।
দুর্গার বাপের বাড়ী যাওয়ার সময় এগিয়ে আসছে। গির থেকে একটা সিংহ এসেছে। কিন্তু সেটার রিকেটি চেহারা দেখে মা দুর্গার কপালে ভাঁজ। গিরের বনপাল জানিয়েছেন, একই গোত্রের ক্রস ব্রিডিংএ আজকাল সব সিংহই নাকি হারজিরজিরে পয়দা হচ্ছে। সর্বনাশ করেছে। মা ঠাকুরুণ শেষমেষ বর্ষার ফলাটা ঠিকমত বিধিয়ে, অসুরবিনাশিনী, দুর্গতিনাশিনী হতে পারবেন তো। আগে আগে তো সিংহ প্রায় একাই অসুরকে কাবু করে ফেলত। এদিক দিয়ে শিবঠাকুরের সুবিধা হয়েছে। কয়েকদিন অন্তর অন্তর তিনি বাহন চেন্জ করছেন। ভারতে ষাঁড়ের আধিক্য। গোহত্যা নিবারণী সমিতির প্রচেষ্টায় ষাঁড়ের বাড়বাড়ন্ত।
এবার বাপের বাড়ীর অবস্থা ভাল নয়। কি এক মহামারী এসেছে। দুচোখের জোর কমলেও ত্রিনয়ন দিয়ে মা দুর্গা দেখেছেন, ধরাধামে লোকে ধরাশায়ী হয়ে পড়ছে সেই রোগে। ভাগ্য খারাপ হলে যমলোকের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বেশ কয়েক দশক আগে উঁচু জাত, নীচুজাতের লোকেকে ছোয়াছুয়ি করা তো দূরের কথা, ছায়া মাড়ালেও স্নান করতে হত। কলিকালে ওটাই ফিরে এসেছে। কেউ কাউকে ছুয়ে ফেল্লে সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছে। কাজকর্মে যাওয়া শিকেয় উঠেছে। বাড়ীতে বসে সবাই নেটফিল্স কি আ্যমাজন প্রাইম দেখছে।
এবারে সব ব্যাপারটাই কেমন ‘হঠকে’ হচ্ছে। মহালয়ার কয়েকদিন পরেই দুর্গা আসেন পৃথিবীতে। এবারে সব একমাস পিছিয়ে। আশা ছিল করোনা তার মধ্যে শক্তি হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। ‘টু বি অর নট টু বি’ র মত তাঁর আগমন নিয়ে সংশয় ছিল। শেষ মুহুর্তও ছাড়পত্র পাওয়া গিয়েছে। বাঙালী হুজুগে জাত। তাদের প্রধান উৎসব তো তাকে ঘিরে।তবে এবার প্রণামীতে বিশেষলাভের আশা নেই। যেতেও ভয় লাগে। ধূপ, ধুনো মন্ত্রপাঠ কি ভাইরাসকে ঠেকাতে পারবে? দুর্গা একবার পতিদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, - মর্ত্যে করোনা ভাইরাস তুমি পাঠিয়েছ নাকি। শিবঠাকুর বল্লেন-‘কি যে বলো, এ সব ঐ মর্ত্যের বাসিন্দাদের কান্ড। ইউহান প্রদেশের মাছের বাজারে,একটা লোক ল্যাবরেটারী থেকে রেডিমেড তৈরী ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। শুনলাম চিত্রগুপ্ত নাকি একা সামলাতে পারছে না। তিন শিফ্টে ওভারটাইম দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। শিবঠাকুর অর্ধনিমলীত চক্ষে নন্দীকে ডাকলেন- ‘এই ব্যাটা, গেলি কোথায় - হুকোটা সেজে নিয়ে আয় দেখি। অবাক বিষ্ময়ে দুর্গা ঠাকরুণ বল্লেন -‘তোমার আবার এত উন্নতি হল কবে থেকে?’ শিবঠাকুরের উত্তর-‘আর বল কেন গিন্নি, নারদ মর্ত্যে ঘুরে এসে বল্ল, জোরদার খবর, কে এক সিনেমার হিরো সুইসাইড করেছে, সবাই বলছে তাকে তার লিভ ইন পার্টনার নাকি গাঁজা কিনে এনে খাওয়াত, সেই দোষে মেয়েটাকা জেলে পুরে দিয়েছে। একেই তো পৃথিবীর টালমাটাল অবস্থা, রিস্ক নিয়ে যাচ্ছ, আমার গন্জিকাসেবনের কথা শুনলে, তোমাকে না শ্রীঘরে ঢুকিয়ে দেয়।
‘আ মরণ, তা ভালই হয়েছে, গাঁজা থেকে হুকোতে নেমেছ, তা এই লিভ ইন পার্টনারটা কি ব্যাপার গো?’ দুর্গা জিজ্ঞাসা করলেন। শিব ঠাকুরের উত্তর ‘ আর বল কেন, তুমি তো কত তপস্যার পরও আমার বাঘছাল, জটা, গায়ে মাখা ছাইভস্ম দেখে এক-কথায় বিয়েতে রাজী হয়ে গেল, এখন সে পাট নেই যে, বাপ এসে বলবে- ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে আর কনে নাচতে নাচতে ছাদনাতলায় বসবে তারপর দোহাতে মিলিয়া সুখে শান্তিতে সংসার করিবে। আজকালের ফ্যাশান বিয়ের আগে কিছুদিন একছাদের তলায় স্ত্রী-পুরুষ একসঙ্গে থাকবে, যদি ঠিকঠাক লাগে তবেই ম্যারেজ রেজিস্টারে সিলমোহর। বাচ্চা জন্মে যাবার পরও বিয়ে হচ্ছে।’ দুর্গা বল্লেন-‘ও মা, কি কান্ড, বিয়ের পর ফুলশয্যাতে প্রেমালাপের বদলে বাচ্চার ন্যাপি চেন্জ করতে হলে সেটা তো হল গিয়ে বাসরশয্যার বদলে শরশয্যার নামান্তর।
কথার মাঝখানে সরস্বতী কাঁদোকাঁদো মুখে এসে বল্ল- তুমি পই পই করে বলে দিয়েছ প্যান্ডালে মাস্ক পরে থাকতে হবে, ওদিকে গনেশদাদা ধাই ধাই করে নাচছে আর বলছে হাতীমুখে মাস্ক পরা যাবে না। গনেশদাদা মাস্ক না পরলে আমি আর লক্ষীদিদিও পরব না। ‘ওহ্-আর বিরক্ত করিস না, একেই তোর ভক্ত- স্কুল, কলেজের পড়ুয়ারা করোনার জ্বালায় তিতিবিরক্ত, ক্লাস হচ্ছে অনলাইনে, তুই কি চাস তোকে না নিয়ে যাই, আর পাবলিক তোকে অনলাইনে দেখুক? পুজোর মজাটাই দেখছি মাটি করে দিবি। শিব ঠাকুর হাঁক পেড়ে বল্লেন-‘ সরস্বতী মা, চিন্তা করিস না তোকে মাস্ক পরে থাকতে হবে না, প্যান্ডালে নো এনট্রি জোন করে দিয়েছে, তোর মায়ের ভক্তদের জন্য, খালি পুজোর পুরুত, ঢাকী মন্ডপে থাকবে, আর জানিসই তো, এদেশের ভিআইপি কালচার, ওই পুজোর কর্মকর্তাদের ছাড় দেওয়া হয়েছে।’ সরস্বতী নাচতে নাচতে চলে গেল। দুর্গাঠাকুর বল্লেন-‘সে কি, ভক্তদল প্রতিবছর হুড়োহুড়ি করে আমার দর্শন পেতে, এত সাজুগুজু করে যাব, ভক্তরা আমার ধারে কাছে ঘেষবে না? আগে জানলে আমি কি আর যাই। শিব বল্লেন-‘সেই তো, তোমার ফেভারিট জায়গা, বাংলাতে, সব্বার প্রথমে পুজোর ছাড়পত্র দিল, তারা এখন যা করল সেটাকে গাছে উঠিয়ে মই কেড়ে নেওয়ার মত ব্যাপার। তবে শোন তোমায় বলি উত্তর প্রদেশ সরকার দেরীতে হলেওশেষমেষ কিন্তু সরকারী ছাড়পত্র দিয়েছে পুজোর জন্য। প্রথমে তো মানা করে দিয়েছিল। তখন আমি হোয়াটস্ আ্যপ মেসেজ পাঠালাম গোরখনাথ মন্দিরের মাধ্যমে, যে, তোমার ভক্ত রামচন্দ্রের দশেরার পারমিশন দিচ্ছে, আর রাম ঠাকুর, যে কিনা তোমায় পুজো করে রাবণবধ করে ফেমাস হয়ে গেল, সেই দুর্গার পুজোতে মানা করে কোন সাহসে। অকাট্য যুক্তি। তার উপর তোমার সেই ভক্ত রামের এখন ও রাজ্যে রমরমা, মন্দিরটা ওদিকেই হবে কিনা।- তাই তোমার আবাহনে সরকার সম্মতি দিয়েছে।
শিব গিন্নির কানের কাছে এসে বল্লেন শোন তুমি ঐ ইউপিতেই যাও, নয়ডার বাষট্টি সেক্টরে তোমার ভক্তরা খুব খাটাখাটি করেছে। একটু নূতন রকমও লাগবে, প্যান্ডেলের বদলে পাকা ঘর পাবে। লোকে যাই বলুক মূল ব্যাপারটাতো দক্ষিণহস্তের। তা সেই মূলভোগও শুনেছি দারুণ কিছু রান্না হবে। এবারেতো আবার সকালের জলখাবার বন্ধ। তাই দুপুরের ভোগটা ভাল না হলে চলবে কি করে। নাও দেখি দুগ্গা দুগ্গা বলে রওয়ানা হয় তো।
আমি একবার নন্দী ভৃঙ্গীকে পাঠাই নয়ডা ফর্টিসে, দু তিনটে কোভিড বেড বুক করে রাখুক, বলা তো যায় না, রিস্ক নিয়ে যাচ্ছ, যদি একটা কিছু হয়ে যায়। সাবধানের মার নেই!
দেবদত্ত
২০/১০/২০২০

Comments
Post a Comment