করোনাকালে
করোনা (প্রি লকডাউন) পর্ব ১
আজ রবিবার। প্রভাতী চায়ের কাপ সহযোগে, হিন্দুস্তান টাইমসের প্রথম পাতায় চোখ বুলিয়ে দেখলাম, ভারত সরকার করোনা ভাইরাসকে ন্যাশানাল ডিজাসস্টার ঘোষনা করেছে। এর ফলে করোনা প্রতিরোধে সরকারী সাহায্যের কোন মাপকাঠি থাকবে না। এমনিতে তে সরকারী কোষাগারে ভাঁড়ে মা ভবানী। তবে এই সময়ে সরকার অনেকটা-লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন গোছের হয়ে পড়েছে। বাংলায় কথা আছে-‘ধরে আনতে বল্লে পেয়াদা বেধে আনে।’ বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন চলছে। করেনাতে পন্চত্বপ্রাপ্তি হলে একে তো সেলিব্রেটি, তার উপর সরকারী মরনোত্তর পুরস্কার চার লাখ টাকা। ব্যাঙ্গালোরে এক টেকি, হনিমুনে গিয়ে এই ভি আই পি রোগ নিয়ে এসেছে। তার নববিবাহিতা বৌ, ফ্লাইটে দিল্লী এসে, সেখান থেকে ট্রেনে আগ্রা এসেছিল দুই দিন আগে। এখন নর্দান রেলওয়ে চিরুণীতল্লাশী করে সেই কোচ চিহ্নিত করে সেটাকে ডিসইনফেক্ট করছে। মজার কথা, সেই মহিলা করোনাতে আক্রান্ত কিনা সেটার খবর কিছু নেই। সেই কোচে যারা ছিল, তাদের খুঁজে বার করে, প্রত্যেককে সতর্ক করা হচ্ছে। রেলওয়ের এহন দক্ষতাকে ধন্য ধন্য করতে হচ্ছে। শুধু যদি এই এফিসিয়েন্সি ট্রেনের সময়অনুবর্তিতাতে দেখা যেত। প্রশ্ন হচ্ছে, মেয়েটা যে হাওয়াই জাহাজে এল, সেটাও তো সমভাবে পোটেনশিয়াল থ্রেট। সেটা তো কিছু করা হয় নি। এ তো পুরো ঠগ বাছতে গা উজাড়। যে হারে জনসাধারণ করোনার জুজুতে আতংকিত, ধরুন, যারা ঐ কোচে ছিল, তাদের বাড়ী, অফিস সবাইকে স্ক্যানিং দরকার।
নয়ডাতে একজনের মৃত্যু হয়েছে করোনা ভাইরাসে। এবারে সরকারী হাসপাতালের সি এম ও বলেছেন, যতজন, ফুনারেল আ্যটেন্ড করতে গিয়েছিল, তাদের সবাইকে ম্যান্ডেটরী কোয়ারানটাইনে থাকতে হবে চৌদ্দ দিন । কথা হচ্ছে, কারা ফুনারেলে গিয়েছিল তার লিস্ট কোথায় পাওয়া যাবে? যদিও বা কিছু লোককে চিন্হিত করা গেল, এখন তারা যে চোদ্দদিন বাড়ী থেকে বেরোবে না তার জন্য তো পুলিশ পাহারা বসাতে হয় বাড়ীর সামনে।
এই প্রসঙ্গে নিজের জীবনের একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। সালটা ১৯৮৪। অফিসের কাজে ভূপাল যেতে হবে। সন্ধ্যেবেলা নিউদিল্লি স্টেশন থেকে জি টি এক্সপ্রেস ধরেছি। দেখি কামরায় এক টি ভি চ্যানেলের লোকজন, ক্যামেরা ইত্যাদি নিয় চলেছে। শুনলাম কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তারই কভারেজের জন্য যাচ্ছে। পরের দিন সকালে পাচটায় পৌছে স্টেশনের কাছে হোটেলে চেক ইন করেছি। জায়গাটা পুরানো ভূপালে। সকাল আটটাতে বি এইচ ই এল খোলে। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় দেখি, অনেক লোকজন পোটলা পুটলি সহ ফেরত আসছে। পরে অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম ইউনিয়ান কার্বাইড ফ্যাক্টরিতে গ্যাস লিক হয়েছে, অনেকে নাকি মারা গিয়েছে। আমার হোটেল ছিল আবার ওই ফ্যাক্টরি লাগোয়া। ঘটনাটা ঘটেছিল, আমি যে দিন পৌছেছি তার ঠিক চব্বিশ ঘন্টা আগে। তখন টি ভি এসেছে, তবে সব বাড়ীতেই যে ছিল তা নয়। খবরের কাগজই ভরসা। দুদিন পর ফিরে এসে জানতে পারলাম স্কেল অফ ডিসাস্ট্যার বিশাল, হাজার পাঁচেক লোক মারা গিয়েছে। অফিসেরবস থেকে শুরু করে সবাই বল্ল- আরে তুমি তো একদম ফ্যাক্টরির পাশে ছিলে, হোক না চব্বিশ ঘন্টা পর, সাবধানের মার নেই, হসপিটালে যাও, ভাল করে চেক আপ করাও। আমার যে খুব একটা ইচ্ছে ছিল তা নয়। তবে সবাই বলছে, তাই গেলাম হোলি ফ্যামিলি হসপিটালে। ও পি ডি তে টিকিট কেটে গেলাম ডাক্তারবাবুর কাছে- বল্লাম, আমি ভূপাল থেকে আসছি। ওই গ্যাস লিকের কাছাকাছি জায়গায় ছিলাম। আমাকে একটু চেক করে দিন। ডাক্তারবাবু গ্যাস লিকের একজন জলজ্যান্ত ভিক্টিম দেখে বেশ চমকিত। তাড়াতাড়ি আরো দু একজন ডাক্তারকে ডেকে আনলেন। তখন অব্দি বলার সময় পাই নি যে, আমি পৌছেছি ২৪ ঘন্টা পর। যখন বল্লাম, তখন ডাক্তার বাহিনীর ঔৎসুক্য কিছু কমে গেল। ওরা ভেবেছিলেন আমি ভূপালেই থাকি। যাক আমায় রুটিন চেক আপ করে ছেড়ে দিলেন।
আবার করোনার কথায় আসি। এই বেনোজলে অনেকেই মাছ ধরতে লেগেছে। অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা যজ্ঞের আয়োজন করেছে। গো মাতার গুণকীর্তন চলছে। ওইখানে যারা এসেছে, তারা সবাই গোমূত্র পান করেছে। সার্থকনামা বুমবুম ঠাকুর, হিন্দু মহাসভার প্রেসিডন্ট জানিয়েছেন, গোমূত্র, আন্টি ব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টিতে ভর্তি এবং এই ‘অমৃতসেবন’ কোনরকম ইনফেকশন প্রতিরোধ করবে। ভাইরাস আর ব্যাকটেরিয়া এক জিনিষ নয় বলেই জানতাম।তাই গোমূত্র ভাইরাস দমনে কি ভূমিকা নেবে, সে প্রশ্ন থেকেই গেল। সবশেষে সেখানে উপস্থিত সবাইকে ‘পন্চগব্য’ বিতরন করা হয়েছে। তারমধ্যে গোমূত্র, গোবর, গরুর দুধ, ঘি এবং দই আছে। ধন্য গোমাতা। যত দিন যাচ্ছে, ততই তোমার ইউটিলিটির বহর দেখে আশ্চর্য হচ্ছি।
কথায় বলে কারো পৌষমাস, কারো সর্বনাশ। কাগজের প্রথম পাতায়, আধপাতা জুড়ে লাইজলের আ্যড। সেখানে লেখা ‘ বাড়ীকে ‘ সেফ টু টাচ’ রাখুন, লাইজল ব্যাবহার করে। সঙ্গে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ছবি সারা বাড়ীতে জীবানু কিলবিল করছে, লাইজল লাগানোর পর বাচ্চা হেসে খেলে সারা বাড়ী ঘুরছে। সকালে যার সঙ্গে মর্নিং ওয়াক করি, সিদ্ধার্থ সেন চিন্তিত মুখে জানালেন, কালকে বাজার থেকে, কোন এক নয়ডা কোম্পানির স্যানেটাইজার কিনে এনেছিলেন, আজকের কাগজে বেরিয়েছে সেটা নাকি পুরো জালি। পুলিশ গিয়ে ফ্যাক্টরি সিল করে দিয়ছে। ভদ্রলোক সস্তাতে পেয়ে বেশী পরিমাণ কিনেছিলেন, এখন মাথায় হাত।
অনেক সাসপেক্টেড ভিক্টিম আবার হসপিটাল থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। নাগপুরে, মেয়ো হসপিটালে এরকম পাঁচজন আইসোলেশনে ছিল, কিন্তু তারা পালিয়ে যাবার পর, পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে। আজকেই দিল্লি এল্যামনি চ্যাপ্টারের ফাংশন ছিল, নয়ডার জলবায়ুবিহারের কমুনিটি হলে। ভেবেছিলাম কাছাকাছি আছে, যাওয়া যাবে, কিন্তু সে গুড়ে বালি। করোনা আতংকে প্রোগ্রাম ক্যানসেল।
সুপ্রিম কোর্টও নাকি, কেবলমাত্র জরুরী কেসের হিয়ারিং করবে। মল বন্ধ অনেক জায়গায়, সিনেমাহলেও তথৈবচ অবস্থা। দিল্লীর ইস্কুল, কলেজও এই মাসের জন্য বন্ধা। মাছের বাজারে গিয়ে দেখি গুটি কতক মাত্র ক্রেতা। অনেকের মুখেই শুনলাম, মাছ, মাংস খেলে নাকি করোনা ভাইরাসের সফ্ট টার্গেট হবে লোকজন। কথা হচ্ছে এরকম জরুরী অবস্থা কতদিন জারী থাকবে। এর আগেও তো অনেকরকম ভাইরাস এসেছে, ইবোলা ভাইরাস, এইচ ওয়ান-এন ওয়ান ভাইরাস, এইডস কত কি। এতো বিশাল সতর্কতা দেখা যায় নি। হতে পারে এটা বেশী ছোয়াচে। তব করোনার কল্যানে কিছু ইংরাজী শব্দ শিখলাম। এনডেমিক কথাটা জানতাম না, বিশ্ব স্ব্যাস্থ সংস্থা এটাকে এপিডেমিক না বলে কেন এনডেমিক বলছে, সেই সূক্ষ ভেদাভেদের কারণও অবগত হল। বাড়ীতেই হাত পা গুটিয়ে বসে আছি। তাই সাধারণ জ্ঞান বাড়াচ্ছি, নিউজ পেপার চর্বিতে চর্বণ করছি আর নেটফিল্কসে সিরিজ দেখছি। নিজের নামের পাশে সদ্য তকমা জুটেছে, ‘রিটায়ার্ড’। এখন দিল্লির ওয়েদার এককথায় সুপার্ব। তার উপর কাল বিকালে ভালমত শিলাবৃস্টি হয়ে, পি এম টু লেভেল তলানিতে। ভেবেছিলাম আজ হেরিটেজ ওয়াকে বেরোব। কিন্তু করোনাভীতিতে সেটা আর হল না। কয়েকদিন আগে পাড়ার এক বঙ্গসন্তান এর সঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল প্যাটেল চকের জিপিওতে। ওখানে ফিলাটেলি ডিপার্টমেন্টের কাউন্টার আছে। দুজনেরই স্ট্যান্প জমানোর শখ। দুদিন আগে মার্কেটে দেখা, কালোমত বেশ বড় সাইজের নোজ মাস্ক। হেজিপেজি নয়। ওটাই বোধহয় এন ৯৫ গ্রেডের হবে। বুঝলাম ভালমত প্রিকশন নিচ্ছে। স্ট্যান্পের প্রোগ্রাম পিছিয়ে গেল। কিছুদিন পরে তো মলমাস। বিয়েবাড়ীর ঝক্কি নেই। যদি শীতকাল হত তবে কি অবস্থা হত। নিমনত্রিতরা কি বিয়ে বয়কট করত। সেখানে অবশ্য দক্ষিন হস্তের ব্যাপারটা মুখ্য থাকে। খুব কম লোকেরই সেই টান উপেক্ষা করার মত মনোবল আছে!
করোনা পর্ব ২ (পোস্ট লকডাউন)
এখন করোনা ব্যাপারটা আর হাসি ঠাট্টার মধ্যে নেই। কয়েকদিন আগে, রাতে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা এল, মধ্যরাত থেকে লকডাউন। অর্থাৎ, যে যখানে আছেন সেখানেই থাকুন। ট্রেন, বাস, হাওয়াই জাহাজ, অর্থাৎ যা কিছু সাধারন মানুষের যাতায়তের সাধন, সব বন্ধ। অনেকটা সেই আমাদের ছোটবেলায়, গো-গো স্ট্যাচু খেলার মত ব্যাপার। সবাই গোল হয়ে ঘুরতাম, গো,গো বলতে বলতে হঠাৎ স্ট্যাচু বল্লেই, কোন একটা ভঙ্গিতে দাঁড়াতে হবে। তারপর রেফারি সামনে এসে জনে জনে দাতমুখ খিচিয়ে ক্যারিকেচার করবে. হেসে ফেললে অথবা নড়লে, খেলা থেকে আউট। এখানেও ব্যাপারটা সেরকমই দাঁড়াল। মেয়ে হায়দ্রাবাদ থেকে দুদিন আগে এসেছে, তাই নিশ্চিন্ত। যাক কিছুদিন বেচারী বাড়ীর খাবার পাবে। সেই কবে পূজার সময় এসেছিল। রুমির জন্য শাপে বর বলা যায়, দুদিনের ছুটি নিয়ে আসছিল, ছুটি তো নিতেই হল না, উপরন্তু পুরো ২১ দিন ছুটি। তবে ঠিক ছুটি বলা যায় না, ওয়ার্ক ফ্রম হোম বলা যায়। এয়ারপোর্ট থেকে আনতে গিয়ে আর চিনতে পারি না, ইয়াবড় মাস্ক, হাতে আবার গ্লাভস,ফুল স্লীভ সোয়েটার। ভাইরাস ঢোকার কোন উপায় নেই। বাড়ী আসার পর দেখা গেল দুই হাতে ফোস্কা। নিওসপরিন পাউডার নিয়ে আসতে হল।
লকডাউনে, আমরা মিয়া বিবির অবশ্য খুব একটা ফারাক পড়ছে না, কারণ ফেব্রুয়ারির পর থেকে আমার অবসরজীবন শুরু হয়েছে। তবে কিন্চিত দুংখ হল, ইস আরো কিছুদিন যদি চাকরীটা থাকত তবে, এরকম লকডাউন আরো মিস্টি লাগত। বসে বসে মাইনে পেতে কার না ভাল লাগে। আমি এবং আমার বেশীরভাগ বন্ধুরা ভালই দিন কাটাচ্ছে। তবে কয়েকটা ব্যাপারে কমপ্রেমাইজ করতে হচ্ছে। সেসাইটির গেট বন্ধ। কাজের লোক, নিউজপেপার, প্রেসওয়ালা সব বন্ধ। রোজ সকালে প্রভাতী চায়ের সঙ্গে পেপার পড়া দৈনন্দিন জীবনের অবশ্য কর্তব্য ছিল। দুধের সাধ ঘোলে মিটানর মত, মোবাইলে পেপার পড়ছি। কিন্তু তাতে কি আর সে মজা আসে। কাজকর্মের একটা ডিভিশন হয়ে গেল, ঝাড়ু মারাটা আমার দায়িত্ব। কাজটা নিয়ে বুঝলাম ভুল করে ফেলেছি। কোমর বেকিয়ে ঝাড়ুমারার থেকে, বাসনমাজাটা বোধহয় ইজি হত। সেটা আর বলার সাহস হয় নি। কারণ এর আগে দু একবার পরীক্ষায় ডাহা ফেল। কড়া দিদিমনির মত, এক একটা প্লেট তুলে দেখায়- এই যে, এখানে এখনো হলুদ লেগে, অন্যটার কোনায় সাবান, কি যে কর। তাই ঝাড়ুই সই। হোক, একটু বেশী কষ্ট। বেরোতেও হচ্ছে না। কিন্তু সারা দেশের অনেকেই ফেঁসে গেল। অনেকেই,সেই গো-গো স্ট্যাচুর মত স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।লকডাউনের পরের দিন দিল্লি থেকে আউটবাউন্ড ফ্লাইট চলছিল। আমার ক্লাসমেট বিজনের মেয়ে কাছেই থাকে। সে বেচারী রায়পুর যাবে। বিজন অতি কষ্টে টিকিট যোগাড় করেছে। উবের, ওলা বন্ধ, যা করে একটা গাড়ী যোগাড় হল। হাইওয়ের উল্টোদিকটা হচ্ছে ইন্দিরাপুরম মানে গাজিয়াবাদ ডিস্ট্রিক্ট আর আমাদের দিকটা নয়ডা হল গিয়ে, গৌতম বুদ্ধনগর। এমনি দেখলে রাস্তার এপার ওপার, কিন্তু বর্তমানে, ইন্ডিয়া পাকিস্তান বর্ডার বলা যায়। ভাড়ার গাড়ী ওপারে দাড়িয়ে রইল, আমি ওকে পুলিশ ব্যারিকেডের কাছে ছেড়ে দিলাম। এবারে ও দিল্লি বর্ডারে গিয়ে আবার আটকে গেল, প্লেনের টিকিট দেখিয়ে ছাড় পেল। ফেরার সময় দেখি, নয়ডার ইলেকট্রনিক সিটির মোড়টা, যেখানে ন্যাশানাল হাইওয়ে এসে মিশেছে, প্রায় গোটা পন্চাশ প্রাইভেট গাড়ী দাড়িয়ে, সব নয়ডাতে ঢুকতে চাইছে, পুলিশের সাথে কথা কাটাকাটি। এমনিতে নয়ডা পুলিশ যখন আমাদের পাড়ায় টহল দেয়, তারা গাড়ী থেকে কখনো নামে না, সাইরেন বাজিয়ে, ফ্ল্যশার জ্বালিয়ে, সাধারন লোককে ভীত শন্তস্ত্র করে চলে যায়, আজ তারা ব্যারিকেড বানিয়ে, লাঠিসোটা হাতে দাড়িয়ে। মনে হল মাছিও গলতে দেবে না।
সবাই বলছে বটে লকডাউন, তবে এটাকে লকআপও বলা যেতে পারত। কারণ, দেশের জনগনের অবস্থা তো অনেকটা জেলের লকআপে বন্দীর মত। তবে শুনলাম, এই ঘোর দুর্বিপাকে, জেলের অনেক বন্দীকে প্যারোলে ছেড়ে দিচ্ছে। একেই জেল ওভারক্রাউডেড, তায় কোর্ট বন্ধ, অগত্যা সরকার নাচার। একেই বলে কারও পৌষমাস, কারো সর্বনাশ।আমাদের সোসাইটির গেটে তালা, শব্জীওয়ালা ঠেলাতে করে সোসাইটির মধ্যে আসছে, শব্জী, দুধের প্যাকেট, যাই আসছে, সেটাকে সাবান দিয়ে ধুয়ে তবেই ফ্রীজে তোলা হচ্ছে। একেই বলে করোনা ভীতি। ছোট্ট একটা ভাইরাসের কত দাপট। বাঘের থাবার মত এখন বাজারে চালু করোনার থাবা। তবে সেই থাবা মুস্টিমেয় জনসাধারনের কপালে, বাকী অনেকের কপালেই জুটেছে পুলিশের ডান্ডা। টিভিতে একদিন দেখলাম, কলকাতার পুলিশ, বাজারে লোকের উপর বেশ হাতের সুখ করছে। প্রথমে বুঝিনি, শুনছি পুলিশ বলছে- মাছ কই?,মাছ কই?,তারপর ডান্ডাবর্ষন, ভাবলাম, মাছেভাতে বাঙ্গালী, তাই মাছ কেনার জন্য ছাড় দিয়েছে, মাছ না কিনলে পেটাচ্ছে। পরে ভুল ভাঙল, মাছ নয়, মাস্ক। মাস্ক না পরলে কেন ডান্ডা খেতে হবে বুঝলাম না, অনেক মুনির মত, একমাত্র করোনা আক্রান্তকারীর মাস্ক পরা উচিত। জটায়ু থাকলে নিশ্চয়ই এতদিনে ‘ভয়ংকর ভাইরাস’ গোছের রহস্য রোমান্চ সিরিজ লিখতেন। শোনা যাচ্ছে এই ভাইরাস নাকি ৭২ ঘন্টা বেঁচে থাকতে পারে। কইমাছের বাবা বলা যায়, প্লাশ্টিকের উপর কতক্ষন বেঁচে থাকে, কাগজে কতক্ষন, এইসব নিয়ে রিসার্চ পেপার বেরিয়ে গিয়েছে, হোয়াটস্ আ্যপের কল্যানে তা আমাদের কাছে এসে যাচ্ছে, তাই সবই সাবান দিয়ে ধুয়ে হচ্ছে। নিউজপেপার সাবান দিয়ে ধোয়া যাবে না। তাই ওটার ডেলিভারী বন্ধ। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ভাল না স্যানিটাইজার, এই নিয়ে অনেক চুলচেরা বিশ্লেষন। এসময়ে হোয়াটস্ আ্যপ, আর টিভি সময় কাটানোর বড় উপায়। হোয়াটস্ আ্যপে, বন্ধুমহলে তুমুল ডিসকাশন চলছে- লকডাউন ঠিক না ভুল, ঠিক হলে কতটা ঠিক, ভুল হলে কতটা ভুল। কোন দেশে কি রেটে প্রোগ্রেস হচ্ছে, কতজন মারা যাচ্ছে, তারা কোন এজ গ্রুপের, ইত্যাদি নানা জেনারল নলেজে, হোয়াটস্ আ্যপ ভর্তি।এই ধাক্কায় ইংরাজী ভোকাবুলারী বাড়ছে, প্যানডেমিক, এনডেমিক কাকে বলে জানলাম। কোয়ারনটাইন, যে এক ইতালীয় শব্দ সেটাও জানলাম। চোদ্দশ খৃস্টাব্দিতে, এক অজানা রোগ সিল্করুট দিয়ে মহামারী রূপে আসে, তখন ইতালীয় সরকার সব জাহাজকে, চল্লিশ দিন কোন দ্বীপে আটকে রাখত, ইটালিয়ান ভাষায় ‘চল্লিশ’ হল গিয়ে ‘কোয়ারান্তা’- তাই থেকে কোয়ারন্টাইন।মাঝে মাঝে ভি ডি ও আসছে, রাস্তাঘাট জনশূন্য, হাওড়া ব্রীজ পুরো শুনশান, তাতে কমেন্ট- সত্তর বছর ধরে খাটতে খাটতে এই প্রথম বিশ্রাম পেল, আমাদের নয়ডার শপিং মলের বাইরে নীলগাই ঘুরছে। দিল্লি আই আই টি তে, আমার বন্ধুর বাড়ীর লনে ময়ূর পেখম মেলে দাড়িয়ে আছে। দুর্ভাগা আমি, ব্যালকনির দরজা খুল্লে, সামনের পার্কে দেখি খালি গরু চরছে। পরে এই বলে মনকে সান্তনা দিলাম, যদিও আই আই টি দিল্লির পশ এরিয়াতে, তাহলেও ওটা হচ্ছে, আরাবল্লী হিলের শেষপ্রান্ত, রাজস্থানের লাগোয়া, তাই ময়ূর দেখতে পাচ্ছে, আমার জায়গাটা দিল্লির লাগোয়া হলেও, স্টেট হচ্ছে উত্তরপ্রদেশ, যেটা কিনা গোবলয় হিসাবে পরিচিত, তাই আমার পক্ষে গরু দেখাটাই স্বাভাবিক।
করোনা পর্ব ৩ পোস্ট লকডাউন (continued)
কালকে বেশ জুতসই করে, তেল দিয়ে মুড়ি মেখে, কাঁচা লংকা কুচিয়ে, বাপী চানাচুর সহ( সবই গত সপ্তাহে সি আর পার্ক থেকে কেনা, মেয়েকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে যাবার সময়), টিভি খুলে বসেছি, রচনাদিকে দেখব বলে, মানে দিদি নং ওয়ান সিরিয়ালটা আরকি, অসতর্কতায় হাত দিয়ে চোখ ডলতেই, সুন্দরী রচনাদি ঝাপসা, চোখের জলে, নাকের জলে একাকার। আগে অংশগ্রহনকারী দিদিদের জীবনের কষ্ট আর স্ট্রাগল শুনতে শুনতে বেশ মনোকষ্টে থাকতাম, দিদিদের জীবনের ঘুরে দাড়ানোকে কুরণিশ করতাম আর রচনাদিকে দেখে মন ভাল করতাম। কিছুদিন হল জিও ফাইবার কানেকশন নিয়েছি। সব সিরিয়াল নিজের সময়মত এ্যডরহিত দেখা যাচ্ছে। নেট ফ্লিক্স, হইচই, হটস্টার, প্রাইমভিডিও কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখি। সিনেমা দেখতে দেখতে রাত দেড়টা, দুটো বেজে যাচ্ছে। এখন আর ভয় কি। সকালে ওঠার তাড়া নেই। দুধ আনার ঝক্কি নেই, মোবাইল আ্যপ, বিগবাস্কেট ডেয়লির বদান্যতায় দুধ আসছে।
তবে সবচেয়ে করুণ অবস্থা মাইগ্রেটরি লেবার ফোর্সের, যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শহরে আসে সামান্য কিছু রোজগারের আশায়। তারা বেশীর ভাগই ঘরে ফেরার জন্য আকুল, রোজকার ইনকাম বন্ধ, তারা শহরে থেকে কি করবে? বাধ্য হয়ে কিছু লোক, দিল্লিতে যারা কাজ করে, গাঁও যাদের দুশ, তিনশ কিমির মধ্যে, তারা হেটেই রওয়ানা দিয়েছে। কাউর কাঁধে বাচ্চা, কাউর বা মাথায় বোচকা। কিছু করার নেই। আজকের পেপারে দেখলাম, একজন আটত্রিশ বছরের লোক, হেটে আগ্রা হয়ে মোরনা যাচ্ছিল, দিল্লি থেকে, আগ্রা অব্দি পৌছে, সে পথশ্রমে মারা গিয়েছে, কি প্যাথেটিক।আনন্দবিহার বাস টার্মিনাসে শয়ে শয়ে লোক, সবাই পূর্ব ভারতের শ্রমজীবী, থাকে দিল্লিতে, এরা সবাই আনঅরগানাইজড সেক্টরে চাকরী করে, এখন রুজিরোটি বন্ধ সব বাড়ী যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষায়। হোয়াটস্ আ্যপে ছবি আসছে, সরকারী বদান্যতায়, ইতালী থেকে প্লেনে করে ভারতীয় স্টুডেন্ট ফেরত আসছে, আরে দেশী মজদুররা পায়ে হেটে গাঁয়ে যাওয়ার জন্য শত শত মাইল পাড়ি দিচ্ছে।তবে এই দুর্ভিক্ষের বাজারে কিছু ব্যাতিক্রমী সাহসী লোকও দেখা যাচ্ছে। তাদের থিওরী হল, বডির ইমিউনিটি সিস্টেম বাড়িতে হবে, রোজ ভিটামিন ক্যাপশুল খাও, করোনা ধারে কাছে ঘেষতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী আজ প্রাণখুলে ‘মন কি বাত বলবেন- এন আর সি, সি এ এ নিয়ে জবাবদিহি করতে হবে না। এখন নাকি ন্যাশনাল ক্রাইসিস, চর্চার একমাত্র টপিক করোনা। আমাদের দিদিও কম যান না। পার্টির নাম তৃণমূল, গ্রাসরুট লেভেলে কাজ করার অভ্যাস, তাই পি এম এর মত ঠান্ডা ঘর থেকে ভাষণ না দিয়ে উনি ফিল্ড সার্ভিসে নেমে পড়েছেন। কোমরে শাড়ী গুঁজে, দোকানের সামনে লক্ষণরেখা টেনে দেখিয়ে দিচ্ছেন কিভাবে সোশাল ডিসট্যন্সিং মেনটেন করতে হবে।
করোনার ভয়ে মন্দির, মসজিদ, চার্চ সব বন্ধ। লোকে এরকম দুর্যোগে মন্দিরে যায় বিপদ কাটাতে। এখন সে গুড়ে বালি। তাহলে কি ভগবান সর্বশক্তিমান নন? বড় বড় মন্দির, তিরুপতি, সাইবাবা, তাদের তো শুনি কোটি কোটি টাকা ভক্তদের দান, সেখান থেকে টাকা দেয় না কেন। গভরনেন্ট তো অর্ডিনান্স এনে এদের কাছ থেকে টাকা যোগাড় করতে পারে। কিন্তু ধর্মের থাবা করোনার থেকেও ভয়ংকর। ভোট ব্যাঙ্কে ঘা পড়বে, এই শংকা সদাসময়। তবে এই লকডাউনের মধ্যেও উত্তর প্রদেশের সিএম, অযোধ্যা মন্দিরে গিয়ে, রামলালাক সরিয়ে, কোন টেম্পোরারী মন্দিরে রেখেছেন, কারন সেখানে বিশাল মন্দির হবে। ১৪৪ ধারা, লকডাউন থাকলে কি হবে, মন্দির-যোগীর ডাবল পান্চে সব রুলই শিকেয়। কাশ্মীরের হাসপাতাল থেকে ২৬ জন করোনা সাসপেক্ট পালিয়ে গিয়েছে। এদিকে বাংলাতে কিছু শ্রমিক অন্য রাজ্য থেকে গ্রামে ফিরে এসে, কোয়ারানটাইনের জায়গা হিসাবে গাছের ডাল বেছে নিয়েছে, কারন তাদের ছোট কুড়েঘরে এক্সট্রা রুম নেই। মানুষ যে বাদরের বংশধর, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। সময় কাটানোর জন্য হোয়াটস্ আ্যপে গানের লিংক, পিডিএফ এ ফেলুদা সমগ্র, শরদিন্দু অমনিবাস এবং আরো অনেক বই আসছে। বছরখানেকের বেশী রসদ। লোকে যেমন খাবার বেশী করে স্টোর করছে তেমনি, সময় কাটানোর ব্যবস্থায় হোয়াটস্ আ্যপ ছয়লাপ। বন্ধুদের প্রপোজাল আসছে, চল ভিডিও কলিংএ আড্ডা মারি, হুইস্কি যে যার বাড়ীতে বসে খাবে। ভালই, ড্রাঙকেন ড্রাইভিংএ ফাইনের ভয় নেই। টিভিতে আবার রামায়ন, মহাভারত দেখানো শুরু হয়েছে। মন্ত্রীজি, প্রকাশ জাভেডকর ছবিসহ টুইট কর জানালেন তিনি নাকি রামায়ন দেখছেন, অন্যরাও দেখছেন কিনা জানতে চাইছেন। একজন লিখল, - ইধার লংকা জ্বল রহী হ্যায় আর উনকো পড়ি গিয়ে রামায়ন দেখনা। আর একজন লিখেছে সেই ফ্রান্সের রানী মেরি এতোয়ানত বলেছিলেন- রুটি পাচ্ছে না তো কেক খাক, তেমনি দেশে লোক লকডাউনের চক্করে ভুখা আছে তো কি, পেটে কীল মেরে রামায়ন দেখ। বিব্রত মন্ত্রীমশাই তাড়াতাড়ি টুইট ডিলিট করেছেন। এইফাকে আমি একটু বায়োলজি চর্চা করে নিয়েছি। অনেকবারই ডাক্তারের কাছে গেলে শুনতাম, ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হয়েছে, কখনো শুনতাম ভাইরাল ফিভার। দুটোর মধ্যে যে অনেক ডিফারেন্স সেটা এতদিন পরে বোধগম্য হল। এন্টিবায়োটিক নাকি ভাইরাস মারতে পারে না। তাইতো বলি ভাইরাল ফিভার হলে কেন বলে, এন্টিবায়োটিক খেলে একসপ্তাহ লাগবে আর না খেলে সাতদিন।
করোনা পর্ব ৪
সর্বনাশ কান্ড। নিউইয়র্কে বাঘেরও করোনা হয়েছে। এই ভাইরাস ছোটখাট প্রানীদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে। মারি তো গন্ডার লুটি তো ভান্ডার, তাই করোনা জীবজগতের সবচেয়ে শানিত মগজাস্ত্রের অধিকারী মনুষ্যকুলকে আর অমিতশক্তির অধিকারী ব্যাঘ্রকুলকে কাবু করে ফেলেছে। এই সুযোগে আমাদের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ভাল কাজ পেয়েছে। জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে বাঘমামাদের জন্য কোয়ারানটাইন সেন্টার তৈরী হচ্ছে।
ওয়েস্ট বেঙ্গলে জুটমিল আর চা বাগান খোলার আবেদন এসেছিল সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের কাছ থেকে। বাজারে গুজব চায়ে নাকি ক্যাফেন আছে, করোনার মোকাবিলায় এন্টিবডি তৈরী করতে ওস্তাদ।জুটব্যাগের দরকার আসন্ন রবি মরসুমে কৃষিপন্যকে গুদামজাত করতে। জুট ইন্ডাস্ট্রি কিছুদিন আগে পর্যন্ত সানসেট ইন্ডাস্ট্রি বলা হত। শ্রমিক ছাঁটাই লকআউট নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। প্লাস্টিকের রমরমা কমাতে, এখন জুট কিছুটা হলেও স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। তবে সেন্টারের সঙ্গে টানা পোড়েনের দরুণ, দিদি বাধ সেধেছেন। সে যাই হোক, বেঙ্গলে ফুল শিল্প, প্রথমদফায় এপ্রিলফুল হলেও এখন তরিতরকারীর মত ‘এসেনশিয়াল’ আইটেমের তকমা পেয়েছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে, এই দুর্দিনে মন্দির বন্ধ থাকলেও, ঘরের পূজো জনসাধারন আরো মন দিয়ে করবে- ফ্রি টাইম ও করোনা ভীতির দৌলতে।
কেরালার হিন্দুস্তান ল্যাটেক্স লিমিটেড একসময় কংগ্রেস সরকারের প্রধান হাতিয়ার ছিল পরিবার পরিকল্পনায়। ছোটবেলায় দেখতাম এক ত্রিভুজ সিম্বলের পাশে, বাবা মা সহ দুই ছেলে মেয়ে, পাশে লেখা হাম দো-হামারা দো। আজকাল মর্ডান জমানায় স্ট্রবেরী, ব্যানানা, ভ্যানিলা ফ্লেভারের জিনিষ বেরিয়েছে, তাই হিন্দুস্তান ল্যাটেক্স হালে পানি পাচ্ছিল না। এখন করোনার দৌলতে তারা ২০০০ কোটি টাকার এন্টিবডি টেস্টিং কিট বানানোর বরাত পেয়েছে।
এদিকে দিল্লির খবর দেখলাম সিভিয়ার উইদড্রয়াল সিম্পটম ওয়ালা মদ্যপানকারীদের তুমুল ভীড়, দিল্লির কিছু হসপিটালে। সত্যি, দারুর দোকান থেকে হোম ডেলিভারীর ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল। ধূমপায়ীদের অবস্থাও নিশ্চয়ই তথৈবচ। তাম্বুলও নিশ্চয়ই সেই দলে।
ইউরোপেই এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সর্বচ্চো এবং মৃত্যুহারও বেশী। বেশীরভাগ দেশে ই লকডাউনের আওয়তা। তব এক্সেপশন প্রুভস দি রুলের মত ব্যাতিক্রমী দেশও আছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করছেন- হোয়াট ইস্ লকডাউন? আমাদের লোকেরা সবাই সেন্সিবল। নিজে থেকেই তারা সোশাল ডিসট্যান্সিয় মেনটেন করবে। পুলিশের রুলের গুতোর দরকার নেই। সদ্য শীত পার করে গ্রীষ্মের আগমন। শীতঘুম থেকে বেরিয়ে জনগন বাইরের জগতের স্বাদ নেয়। এবারেও তার অন্যথা হচ্ছে না। তবে সোশাল ডিসট্যান্সিং মেনটেন হচ্ছে। বাকী ইউরোপ বলছে, - দেখা যাক একমাস পরে কেস কোথায় যায়। নিউজ থেকে একটা ইনটারেস্টিং খবর পেলাম, সুইডেনে অর্ধেকের বেশী লোক একা থাকে। তার মানে কি ডিভোর্স রেট বেশী না লোকে অকৃতদার না কি বেশীরভাগ বয়স্ক জেনারেশন, হয়ত পার্টনার পরলোকে। এতে সুবিধে হচ্ছে সংক্রামন কম হবে। স্কুল কলেজও খোলা, অফিসও চলছে। তবে সুইডেনে নাকি অনেকদিন ধরেই ওয়ার্ক ফ্রম হোম কালচার চলছে। এদিকে এমেরিকাতে করোনার স্টেডী প্রোগ্রেস অব্যাহত। কয়েকদিন আগে ট্রাম্প সাহেব সস্ত্রীক ইন্ডিয়া ঘুরে গিয়েছিলেন। চাঁদনীরাতে দেখা তাজমহলের রোমান্টিসিজম এর রেশ কাটতে না কাটতে এ কি উপদ্রব। সেইজন্য এমেরিকাতে লকডাউনের ঘোষনাও দেরিতে। যার ফল জনগণ হাতেনাতে ভুগছে। এইমুহুর্তে ভাইরাসের কোন টীকা বেরোয় নি। ফলে সেই কোনজন্মে ম্যালেরিয়ার জন্য আবিস্কৃত ক্লোরোকুইন এর উপর ডাক্তাররা ভরসা রাখছেন। নাকের বদলে নরুন। যা পাওয়া যায় এই বাজারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর নেকনজরে এখন ক্লোরোকুইন। দাদাদিরির আরেক নমুনা দেখা গেল। ঝেড়ে কাশতে হল না প্রথম প্রথম টালবাহানার পর, হাল্কা ধমক খেতেই দেশী ক্লোরোকুইন হাজির এমেরিকায়।
আচ্ছা, আমরা কেন এটাকে সোশাল ডিসট্যান্সিং বলছি। আমাদের দেশে বর্ণাশ্রম প্রথা চালু ছিল। শূদ্র ব্রাম্হণের ছায়া মাড়ালে ব্রাম্হণকে স্নান করে শুদ্ধ হতে হত। গ্রামে কেউ গর্হিত কাজ করলে ধোপা নাপিত বন্ধ করে দেওয়া হত। সেটাই তো সোশাল ডিসট্যান্সিং। তাহালে তো এটাকে ফিসিক্যাল ডিসট্যান্সিং বল্লে ঠিক হত। মনে হচ্ছে টার্মটা বিদেশে কয়নেজ করা, ওদের দেশে তো আর আমাদের মত প্রথা নেই, তাই সোশাল ডিসট্যান্সিংটাই বাজারে চলছে।
আজ ১২ই এপ্রিল, আনঅফিসিয়াল ঘোষনা এসে গিয়েছে, লকডাউনের মেয়াদ বাড়বে। কাশ্মীরে অনেকদিন লকডাউন চলেছে, কাশ্মিরীদের অনেক ভোগান্তি হয়েছে, ইন্টারনেটও বন্ধ ছিল। মনে হচ্ছে ওদের প্রেয়ারে, উপরওয়ালা সারা দেশে লকডাউনের ফরমান দিয়েছেন। একা কেন ডুবব, ডুবতে হলে সবাইকে নিয়ে ডুবব। আজ বিকালের দিকে দিল্লিতে ভূমিকম্প হয়েছে। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ভাইরাসের পর ভূমিকম্প।একা রামে রক্ষা নেই সুগ্রীব দোসর। ইকনমি যে ভাবে তলানিতে ঠেকছে, তাতে করোনার আফটারশকে, ‘ভাতে মারা’ র শংকা অমূলক নয়। সবই ভয়ের খেলা, দাদার কীর্তির ‘ বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ’ গোছের ব্যাপার।
হোয়াটস্ এ্যাপে ঘুরছে, এরপর বিশ্বে এমন উথাল পাথাল হবে যে, ইতিহাসের পাতায় যাকে আমরা বিসি বা বিফোর ক্রাইস্ট বলি, সেই বি সি এখন নূতন নাম নেবে - বিফোর করোনা, অর্থাৎ সারাবিশ্বের জীবনদর্শন থেকে জীবনযাত্রা সবেরই এক অমূল পরিবর্তন হবে। কনজিউমারিসম কমবে, বিশ্বে এতদিন ধরে আরবানাইজেশন হয়ে আসছিল, এখন আবার রিভার্স মাইগ্রেশন হবে গ্রামের দিকে। রবীন্দ্রনাথের মননে ছিল পল্লীসংস্কার ও গ্রামের উন্নতি। হয়ত নূতন বিশ্ব সেই সংস্কারের পথে হাটবে। আজ মানুষে মানুষে ভালবাসার মূল্য ক্লিশ, ম্লান, ভোগবাদী দুনিয়ার চাহিদার সামনে। নিরন্তর ছুটে চলা তারই সন্ধানে। আমরা মানুষের মূল্য নির্ধারণ করি তার কর্মস্থলে সাকসেস আর সন্চিত অর্থের ভিত্তিতে। কবে আবার আমরা শিখব অন্তরের সৌন্দর্যের মর্যাদা দিতে? হয়ত করোনা আমাদের সেটাই শেখাবে।
করোনা পর্ব ৫
লক ডাউন বেড়ে গিয়েছে। চুলোয় যাক চুল কাটা। কারন এখন চুল খাড়া করা তত্ব উঠে আসছে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি নিয়ে। এ সেই নজরুলের-‘সৃষ্টিসুখের উল্লাসে’ বিধাতার তৈরী অভিশাপ নয়, মার্কিনি তত্ব অনুযায়ী, থ্রিলার ডিটেকটিভ কাহিনীর মত চীনের উহানের ভিরুলজী ল্যাবে মনুষ্যউৎপাদিত মারণ ভাইরাস, যে কিনা অসবধানত বসত একটি মেয়ের হাত ধরে তার বয়ফ্রেন্ডের শরীরে সংক্রামিত হয়েছিল। ঘটনাস্থলও কম চমকপ্রদ নয়। সেটা নাকি উহানের ওয়েট মার্কেটে মানে আমাদের ভাষায় মাছের বাজারে হয়েছিল। তবে মার্কিন গেয়েন্দারা এ প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি যে মিলনের এত জায়গা থাকতে তারা কেন মাছের বাজারে প্রেম করছিল।ডিটেকটিভরা এখনো ধাধায়, যে সংক্রামনটা প্রেমের বহিপ্রকাশ, চুম্বনের মাধ্যমে, নাকি প্রেমিকা রুমাল না ইউজ করে বয়ফ্রেন্ডের সামনে হেঁচেছিল। সারকামস্ট্যনশিয়াল এভিডেন্স দেখলে দ্বিতীয় পসিবলিটিটাই জোরাল লাগছে। মাছেরবাজার আর যাই হোক, চুম্বনের জন্য বেশ বেমানান। তা সেই এক হাঁচির জোরে পৃথিবী জেরবার। আমাদের পুরাণেও কিন্তু হাঁচিকে মোটেই অবজ্ঞা করা হয় নি।পুরাণ অনুযায়ী পৃথিবীকে রসাতলে চলে যেতে দেখে, মনু আসেন ব্রম্ভার শরণে জীবকুলকে রক্ষা করতে। ব্রন্ভা স্মরন করেন জগৎপালনকর্তা বিষ্ণুকে। সেইসময় অসবধানতাবসত হাঁচির থেকে বেরিয়ে আসে বরাহ অবতার হিরণ্যকশিপুর। বিষ্ণু যখন পৃথিবীকে সমুদ্রতলদেশ থেকে নিয়ে ফিরছিলেন, তখন সেই বরাহ আক্রমণ করে বিষ্ণুকে এবং সে বিষ্ণুর হাতে নিহত হয়। তার মানে হাঁচি জিনিষটা ফেলনা নয় সেই আমাদের পুরাকাল থেকেই। কলিকালে বরাহর বদলে ভাইরাস রূপে তার মর্ত্যে আগমন।
এদিকে আমরা ভারতবাসীরা ধীরে ধীরে এমেরিকানদের সমকক্ষ হয়ে উঠছি। অনেক দেশী লোকেদের বলতে শুনেছি, ভুলেও এমেরিকায় সেটল করব না- এখানের মত কাজের লোক কোথায় পাব? করোনার দৌলতে সব বাড়ীতে মিয়া-বিবি ঝাড়ুপোছা, রান্না সবই সামলাচ্ছে। এরকম চললে কাজের লোকেদের চাকরী হারানোর ভয় ঢুকবে।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় বন্ধু হোয়াটস্ আ্যপ। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা আর মজাদার সব ফরওয়ার্ডেড মেসেজে সময় বেশ কেটে যায়। তবে সেদিন পেপারে পড়লাম, করোনা ভাইরাসের রমরমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নূতন কম্পিউটার ম্যালওয়ার ভাইরাস উৎপত্তি হয়েছে, তারা নাকি হেলথ কেয়ার সফ্টওয়ারের বারটা বাজাবে। দুই মানিকজোড় ভাইরাসের তান্ডবে কি হবে কে জানে।
তবে এই হার্ড লকডাউনে জনসাধারনের হার্ডশিপ তুঙ্গে। সে সব নিবারন করার জন্য মন্ত্রীমশাইদের অফিস খুলে গিয়েছে। ঠান্ডা ঘরে বসে ঠান্ডা মাথায় আমাদের ডান্ডা লাগানোর কি উপায় বার করবেন কে জানে। এখন নানা মুনির নানা মত। কেউ বলছেন এই হার্ড লকডাউনে করেনাতে না মরলেও ভাতে মারার রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে। অনেক পন্ডিত সওয়াল করছেন করোনার উপস্থিতির হার অনুযায়ী জোন ভাগ করে লকডাউনের শ্রেনীবিভাগ করা হোক।
কতরকম যে কান্ড ঘটছে। কালকে দিল্লীর কেশবপুরমে রাস্তার পাশে গোটা কয়েক ৫০০/- নোট পড়ে থাকতে দেখে রীতিমত ধুন্ধুমার কান্ড। আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়েছে, তবে নোটের ধারকাছে কাউর যাওয়ার সাহস হয় নি। বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের পরিবর্তে পুলিশ হাজির স্যানেটাইজার, মাস্ক, গ্লাভস সহ। সেই নোটের দাবিদার, পরে পুলিশ স্টেশনে এসে জানান, তিনি এটিএম থেকে টাকা তুলে, স্যানিটাইজার স্প্রে করে শুকাতে দিয়েছিলেন নোটগুলি। তার মধ্যে কয়েকটা হাওয়াতে উড়ে রাস্তায় পড়েছে। সব শুনে পুলিশকর্তার বক্তব্য -‘রাম রাজত্ব আ গিয়া, রাস্তামে পড়া হুয়া নোট কোই নেহি লে রাহা হ্যায়। সুমিতার এক বান্ধবী আরো সরেস, উনি এটিএম থেকে টাকা তোলার আগে স্যানিটাইজার দিয়ে সব বাটন পরিস্কার করছেন। বিপদে বুদ্ধিনাশ একেই বলে। টাকা তুলে তবে হাতে স্যানিটাইজার লাগালেইতো হয়। কে জানে, উনি হয়ত ডাবল সেফটি স্ট্যান্ডার্ড এপ্লাই করছেন।
নেসেসিটি ইজ দি মাদার অফ ইনভেনশন- এই আপ্তবাক্যটি যুগে যুগে প্রমানিত। তারই প্রমান সেদিন গুরগাওতে পাওয়া গেল। রোগী সেজে, রীতিমত হসপিটালের সার্টিফিকেট নিয়ে, সঙ্গে আরো চারজন এটেনড্যান্ট ও নার্স হিসাবে নিয়ে আন্তরাজ্য পাড়ি দিচ্ছিল এম্বুালেন্স। তবে শেষরক্ষা হয় নি। পুলিশ তাকেও ধরেছে, যে কিনা এই অপারেশনের মাস্টার মাইন্ড ছিল। ওয়েডিং প্ল্যানারের মত টার্নকি জব। জনান্তিকে বলি, আজকাল ক্রিমেশন প্ল্যানারও মার্কেটে এসে গিয়েছে। খালি ডেথ সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিন, শ্মশানঘাট থেকে লজিস্টিক, নিকটজনেদের খবর দেওয়া, শ্রাদ্ধশান্তি পুরুতসহ সবই তাদের হাতের তালুতে। তবে পাড়াপড়শীকে শুনিয়ে রুডালী (ভাড়া করা কাঁদুনে) যোগাড় করতে পারবে কিনা সেটা জানা নেই। তবে উপযুক্ত দক্ষিণা দিলে তাও সম্ভব। কলকাতায় পাওয়া যায় কিনা জানি না, তবে নয়ডাতে শুরু হয়েছে। এদেরকেই বোধহয় স্টার্টআপ কোম্পানি বলে। হয়ত দেখা যাবে হয়ত কোন আমেদাবাদের এমবিএ র ব্রেনচাইল্ড।
কাগজে খবর আসছে, লকডাউন খোলার পর প্লেন আর ট্রেনের সফরে সোশাল ডিসট্যান্সিং মেনটেন করা হবে। ট্রেনের মিডল বার্থ আর প্লেনেরও মিডল সীট খালি রাখা হবে। টিকিটের দাম যে আকাশছোঁয় য়া হবে বোঝা যাচ্ছে। সেই শশী থরুরের বিখ্যাত ক্যাটেল ক্লাস হয়ে যাবে বিজনেস ক্লাস। তবে মেট্রো আর বাস রাইডে এরকম কিছু করা যাবে কিনা সে সম্বন্ধে কিছু শোনা যায় নি। একেই দিল্লিতে যা জ্যাম লাগে। পোস্ট লকডাউনে পাবলিক ভয়ের চোটে যদি সবাই পার্সোনাল ভেহিকল ইউজ করে তবে তো ভরাডুবি।
বাড়ীতে বসেও করোনার আঁচ টের পাচ্ছি। প্যাকেটের যা জিনিস আসছে, মায় আলু পেয়াজও, প্রথমে কোয়ারানটাইনে থাকছে ফ্ল্যাটের মেন ডোরের পাশে, তিনদিন পরে সেগুলো সাবান দিয়ে ধুয়ে তোলা হচ্ছে ভাড়ারে। খালি প্রবলেমটা হল আইসক্রীম নিয়ে। সেটাকে জল দিয়ে ধোয়া গেল না। প্রথমে প্যাকেটটা ভাল করে স্যাভলন লাগিয়ে মুছে, তারপর প্যাকেট খুলে আইসক্রীম ডাইরেক্ট ট্রান্সফারড টু টিফিনবক্স। এখন বেশ হিসাব করে কিনতে হচ্ছে, সবকিছুর অর্ডার দিচ্ছি, কোয়ারানটাইন থেকে মাল কিচেনে যাওয়ার পর।
আ্যমাজন, ফ্লিপকার্ট থেকে জিনিষ আনাচ্ছি। করোনার চোটে মাঝে সোসাইটিতে ঢুকতে দিচ্ছিল না। গেট থেকে টেনে টেনে আন। এখন আবার আসতে দিচ্ছে। আজকে তো এমনই হল চোর পুলিশ খেলার মত। আ্যমাজন ডেলিভারী বয় ফোন করল জিনিষ নিয়ে যান। বল্লাম ফ্ল্যাটে এস। সে আসবে না, কারন তারা এখন অভ্যস্ত গেট থেকে হ্যান্ডওভার করতে। কি আর করি, গেলাম ঘুম ঘুম চোখে। ততক্ষনে সে হাওয়া। রেগে মেগে ফিরে এলাম। এরকম আরেকবার হল। ফোন করেছে, কিন্তু গিয়ে দেখি সে নেই, মানে আসেই নি। অনেক চ্যাচামেচির পর তৃতীয়বারে পাওয়া গেল। সকালের চা খাওয়া মাথায় উঠল। কারন আ্যমাজনে চ্যাট করে ফিডব্যাক দিতে আরো আধাঘন্টা। জিনিষটা জরুরী ছিল, নইলে হয়ত ফেরত পাঠিয়ে দিতাম। ওটা না পেলে এই লকডাউন শেষ হতে না হতে আমার দুই হাঁটুও লকডাউন হয়ে যেত। সেটা হচ্ছে হ্যান্ডেলওয়ালা মপ। তার আবার বাকেটও আছে। সুবিধেমত নিংড়ে নেওয়া যায়। আগে মপিং ব্যাপারটা বিভীষিকাময় ছিল। আজকে ওটা ইউজ করে বেশ ভাল লাগল। হাঁটু লকের ভয় নেই।
এখন ৩রা মার্চের পর কি দাঁড়াবে সেটাই চিন্তার বিষয়। লকডাউন উঠে গেলে কি বাধনভাঙা জলের মত জনস্রোত রাস্তায় নেমে পড়বে, না মাস খানেকের বেশী চলা এই পিরিয়ডে স্থবির হয়ে থাকা পাবলিক, রেশ কাটিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গতেই আরো মাসখানেক লাগবে। হোয়াটস্ আ্যপে এ ব্যাপারে মজার ভিডিও ঘুরছে। সর্দারনী ঘুম থেকে তুলেছে বরকে অফিস যাওয়ার জন্য। সর্দারজী ঘুম ঘুম চোখে উঠে ঝাড়ু মারতে লেগেছে। বৌকে বলছে- কোনসা অফিস, ম্যায় কব অফিস যাতা থা?
করোনা পর্ব ৬
ভারত আবার জগতসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে- কবির এই বাণীকে সার্থক করতে, সরকারবাহাদুর ব্রতী হয়েছেন এবং এই লক্ষ্যে করোনা ভাইরাসের টিকা আবিস্কারের বিশাল টাস্কফোর্স তৈরী হয়েছে।উদ্দেশ্য মহত সন্দেহ নেই। তা সেই সৎ উদ্দেশ্য সফল করতে অনেক ডিপার্টমেন্ট এগিয়ে এসেছে। আগে কে বা প্রাণ করিবেক দান -গোছের ব্যাপার।কিন্তু দেখছি এতে আছে, আয়ুষ মন্ত্রনালয়, যারা কিনা আয়ুর্বেদ, উনানী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চর্চাকরে, তারা ছাড়াও ডিপার্টমেন্ট অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি, ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োটেকনোলজি, কাউন্সিল অফ সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাসট্রিয়াল রিসার্চ , কাউন্সিল অফ মেডিকাল রিসার্চ, ডিকেন্স রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাউজেশন, ডাইরক্টরেট জেনারেল অফ হেল্থ সার্ভিসেস, ড্রাগ কনট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া। মানে প্রায় সবাই আছেন। বোঝাই যাচ্ছে এরকম একটা হযবরল গোছের টাস্কফোর্স তৈরী করে দায়িত্বটাকে ডাইলুট করে দেওয়া হল। এরকমটা বোধহয় সব সরকারী, আধাসরকারী কাজে হয়ে থাকে। আমি যে পাবলিক সেক্টরে কাজ করেছি, সেখানেও কোন বিতর্কিত কাজ থাকলে, বেশ একটা কমিটি বানিয়ে ফেলা হয়, চা-কফি সহযোগে বেশ কিছু মিটিংএর পর, বেশীরভাগ সময় কনক্লুশন যা থাকে, ততদিনে যে কারণে কমিটি, সেটা ডাইলিউট হয়ে যায় অথবা ধরি মাছ না ছুঁই পানি গোছের রেকমেন্ডেশন থাকে। এরকম মহাযজ্ঞের কর্ণধার হচ্ছেন, প্রিন্সিপাল সাইন্টিফিক আ্যডভাইসর টু গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া এবং নীতি আয়োগের এক মেম্বার।
তবে সব সরকারী নিয়মনীতি মেনে কাজ শুরু করতে করতে, দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বে বেশ কয়েকটি ল্যাব এই মুহুর্তে ভ্যাকসিন আবিস্কারের দোরগোড়ায়। এরমধ্যে বেশী নাম উঠে আসছে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির। শিম্পাঞ্জির দেহ থেকে এই ভ্যাকসিনের উপাদান নিয়ে, ইতিমধ্যে মানুষের দেহে তার ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে। এলিসা নামে এক মহিলার নাম উঠে আসছে, যিনি স্বইচ্ছায় গিনিপিগ হতে রাজী হয়েছেন।মনে হচ্ছে আমরা যতক্ষনে দৌড় শুরু করব, ততক্ষনে খেল খতমের ঘন্টি বাজবে।
এরমধ্যে স্বস্তিদায়ক খবর হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের তিন প্রকার শ্রেনীভেদের মধ্যে, ‘টাইপ বি’ টি নাকি কম খতরনাক, সেটার প্রকোপ নাকি ভারতবর্ষের। বেশী প্রাণঘাতী ‘টাইপ এ এবং সি’, দেখা যাচ্ছে ইউরোপ এবং আমেরিকায়। তাই নাকি ইন্ডিয়াতে মৃত্যু মিছিল তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া অন্য থিয়োরীও আছে, শিশুবয়সে বি সিজি টিকা নেওয়ার জন্য, আমাদের দেহে আ্যন্টিবডি করোনা ভাইরাসকে ভালমত ফাইট দিচ্ছে।
আজকাল লকডাউনের রুটিনটাতে মধ্যবিত্তর বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সকালে অফিস যাওয়ার তাড়া নেই। আজকাল ফোন, হোয়াটস্ আ্যপের যুগ। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সব কিছু বাসাতেই ডেলিভারি হচ্ছে। নেটফ্লিক্স, জি ফাইভ, হইচই, প্রাইম ভিডিয়ো, হটস্টার, এগুলোতে ইচ্ছেমত সিরিজ, সিনেমা দেখা যাচ্ছে। সিরিজগুলোতে সেন্সরের কাচি নেই। এ মার্কার ছড়াছড়ি। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার দুঃখ ভুলেছি। সকালে পার্কে হাটতে না গেলেও চলছে। এক্সারসাইজ হয়ে যাচ্ছে ঘর সাফ করতে গিয়ে। এর উপর হোয়াটস্ আ্যপ,ফোন তো আছেই।সকালে উঠে করোনার স্কোরকার্ড দেখে নিচ্ছি। কোন জোন রেড এ ঢুকল, কে অরেন্জে গেল তার বিশ্লেষন করছি। মোটের উপর সাধারন মধ্যবিত্ত সুখেই আছে।
ইকনমিক্সের সাধারন রুলে বলে জিনিষের দাম বাড়লে চাহিদা কমে। কিন্তু এখানেও এক্সেপশন আছে। কিছু প্রোডাক্ট ধরা যাক ফ্রেন্চ ব্রান্ডেড পারফিউম বা রোলেক্স ঘড়ি, এসবের দাম বাড়লে ডিমান্ডও বাড়ে। এটা হচ্ছে অর্থনীতিবিদ দের ভাষায় ‘জিফেন গুডস’। এরকমই ব্যাপার আমাদের দেশে ক্রিমেটোরিয়ামে। দেশজুড়ে মহাযজ্ঞ চলেছে করোনার মহামারী থেকে বাঁচতে, তখন আশ্চর্যজনকভাবে শ্মশানে সৎকারের হার বিশ পার্সেন্ট কমে গিয়েছে। করোনার ভয়ে এমন সব এ্যন্টিবডি তৈরী হচ্ছে, যাতে কিনা নরম্যাল ডেথরেট কমে গিয়েছে। এ সেই মৃত সন্জিবনী সুধা গোছের ঔষধ। আমার ছোটবেলায় ঝাড়গ্রামে লেভেল ক্রসিং এর কাছে, দেওয়ালের গায়ে বড় করে বিজ্ঞাপন থাকত এই ঔষধটার। খুব অবাক হতাম, এরকম একটা অত্যাশ্চর্য ঔষধ থাকলে এত ডাক্তার দেখানোর, ঔষধপত্র খাওয়ার কি দরকার। প্রাণ গেলে ওটা খেয়ে নিলেই তো পূনর্মূষিকভব।
এদিকে ক্লোরোকুইনের নিদানে বিশেষ কোন উপকার হচ্ছে না দেখে, ট্রাম্প সাহেব নূতন ট্মাম্পকার্ড বার করেছেন ঝুলি থেকে, ডিসইনফেকটান্ট দিয়ে হাত মুখ না পরিস্কার করে, ওটাকে বডিতে ইনজেক্ট করে দাও। এহেন নিদানে ডাক্তারকুল হাতজোড় করে সবাইকে মানা করছেন । আমি অবশ্য ট্রাম্পের এই বোম্বেটে দাবাইকে কুর্নিশ না করে পারছি না। কারন আমার এক পুরাণো কান্ডের সঙ্গে মিল খুঁজে পেলাম। তখন চাকরী করছি, ট্রেনিং এর পর সি আর পার্কে বাড়ী ভাড়া নিয়েছি। গরমকালে ছাতে ক্যাম্পকট পেতে শুই। ঘরের থেকে ছাদটা ঠান্ডা, ভোরের দিকে ঘুমটা জমিয়ে হয়। তবে মশার কামড়টা বেশ কষ্টকর। ছাদে তো আর গুডনাইট লাগানো যাবে না, নিয়ে এলাম বেগন স্প্রে। খাটের আশেপাশে দিয়ে দেখলাম, বিশেষ কাজ হচ্ছে না। একটু পরে যে কে সেই। বাঁকা বুদ্ধিতে আমি ট্রাম্পের পথিকৃত। বেগন স্প্রে টা হাতে পায়ে স্প্রে করে শুয়ে পড়লাম। কি নিশ্চিন্ত। কয়েকদিন এরকম করার পর অফিসে গিয়ে নবলব্ধ জ্ঞানের কথা বল্লাম। ভাবলাম সবাই বেশ বাহবা দেবে। যা হরি, ব্যাপারটা নিয়ে বেশ হাসাহাসি হল, বসও জেনে গেল, পরে এটা জোক হিসাবে বন্ধুমহলে ঘুরতে থাকল।
এতদিন বেশ দুঃখে ছিলাম, ইশ রিটায়ার হয়ে গেলাম, সবেতন ছুটির স্বাদটা পাওয়া গেল না। তবে এরমধ্যে কিছু সান্তনা যে সরকারবাহাদুর ডিএ ফ্রীজ কর দিয়েছেন, মাসে কম্পালসারী করোনা ফান্ডে কয়েকদিনের মাইনে কাটবে। যাক আমার উপরে আর কোপটা পড়ল না। মনটা বেশ খুশী খুশী লাগছে, ভাগ্যিস রিটায়ার হয়ে গিয়েছি। একেই বলে পজিটিভ থিংকিং। নব আনন্দে জাগো।
মাটনের দোকানে সকালে ফোন করেছিলাম। এতদিন পাওয়া যাচ্ছিল না। আজকে বল্ল আছে। তবে দাম শুনে পিলে চমকে গেল । হাজারটাকা কিলো। অগত্যা মনে হচ্ছে সামনে কয়েকদিন পাঠার ছবি ঝুলিয়ে ডিমের কারি খেতে হবে। কলকাতার বন্ধুদের খুব মজা। তারা জমিয়ে মাছ খাচ্ছে। একেই বলে মাছে ভাতে বাঙালী।
এদিকে দিদি পুরানো হ্যাবিট ছাড়তে পারেন নি। দুই তিনদিন আগে নিজে ঝাড়ু হাতে ডেমনস্ট্রেসন দিয়েছেন কি করে রাস্তা পরিষ্কার রাখতে হবে। এরকম সর্বজ্ঞ ব্যাক্তি সচরাচর দেখা যায় না। ছবি আঁকা, কবিতা লেখা অর্থাৎ ফাইন আর্ট থেকে ক্লিন আপ আর্ট সবেতেই সিদ্ধহস্ত। এবার আর্ট অফ লিভিংএ হাত পাকালে ষোলকলা পূর্ণ, রবিশংকর বেকায়দায় পড়বেন। সেন্টারের পাঠানো খোচরদের জন্যও ওটা নিয়ে- ‘মার ঝাড়ু মার, ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর’ কায়দায় এগিয়েছিলেন, কিন্তু দিল্লীর রক্তচক্ষু দেখে ব্যাকফুটে খেল্লেন। চাইনিজ কিট নিয়েও খুব কিটকিট চলছে। রেজাল্ট ইরাটিক।
জয় বাবা লকডাউন। চলতে থাকুক তবে না কলমও চলবে। কত রঙ্গ দেখব দুনিয়ায়!
দেবদত্ত ২৫/০৪/২০
করোনা পর্ব ৭
ব্যাপারটা ভাবতেই বেশ রোমান্চ লাগছে। ধরুন আপনি পেট্রল পাম্পে পেট্রল কিনতে গিয়েছেন। আপনার গাড়ীর ট্যাঙ্কে সানন্দে পেট্রল ঢেলেও পাম্পের কর্মি ক্ষান্ত হলেন না। বেশ কিছু কড়কড়ে নোটও আপনার পকেটে গুঁজে দেওয়া হল। না স্যার এটা দিবাস্বপ্ন নয়। তেলের অর্থনীতি এবং বানিজ্যের ইদানীং হালহকিকৎ এরকমই একটা ভবিষ্যতের কথা বলছে। করোনা যেমন জনজীবন উথালপাতাল করেছে, তেমনি তেলকেও তুলোধোনা করতে ছাড়ে নি। কয়েকদিন আগে কাগজের শিরোনামে, অপরিশোধিত তেলে শূন্য অংকে বিক্রি হচ্ছিল। বেনোজলে মাছ ধরতে সুযোগসন্ধানী ব্যাবসায়ীরা সব তেল কিনে(?), যত সি ফেয়ারিং বড় বড় অয়েল ট্যাঙ্কার আছে সব ভরে ফেলেছে, যত রিফাইনারী আছে সবার স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ফুল। ব্যাবসায়ীরা আশায় ছিল সারা বিশ্বের অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী তেল, কয়েকদিনের মধ্যে আবার স্বমহিমায় ফিরবে। খালি অর্থনীতি নয়, রাজনীতিতেও ‘অয়েল ডিপ্লোম্যাসি বলে বাজারে একটা চালু কথা আছে। কিন্তু সে আশায় জল ঢেলে, অপরিশোধিত তেলের দাম হয়ে গেছে নেগেটিভ। লকডাউনের ঠ্যালায় যেমন জীবেনযাত্রা গ্রাইন্ডিং হল্টে এসে গেছে, তেমনি এখন তেল উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোটায়। তবে সুফলটা আম আদমির হাতে পৌছান দুরাশা, উদ্বৃত্ত তেলের ট্যাক্সের টাকা যাবে চাইনিজ কিট কিনতে, আর কোয়ারানটাইন সেন্টার বানাতে।
পুরুলিয়ার একটা ঘটনা সদ্য কাগজে এসেছে। সদ্যবিবাহিত দম্পতি। লকডাউনের আশীর্বাদে বাড়ীতেই হনিমুন চলছে। কিন্তু প্রোটেকশন না নিলে, বিবাহিত জীবনে ট্যা অথবা ট্যি এর জলদি আগমন, কাবাব মে যে হাড্ডি বরাবর। কিন্ত সেটার ভাড়ার শূন্য। বৌ লকডাউনের নোটিশ জারী করেছে। আদিম রিপু বলে কথা। বরবাবাজী বাইক নিয়ে বেরিয়েছে, মেডিকাল স্টোরে যাবে। পথে পুলিশের পাল্লায়। মাস্ক, হেলমেট, গাড়ীর পেপার ইত্যাদি সবই ঠিক। পুলিশ বেরোবার কারন জানতে চাইলে জবাব- ঔষধের দোকানে যাচ্ছি। প্রেশক্রিপশন কোথায়- পুলিশের প্রশ্ন। তার বক্তব্য , যেটা কিনতে যাচ্ছে, সেটা জরুরী পরিসেবার আওতায়, এ জিনিষের প্রেসক্রিপশন হয় না, সেল্ফ প্রেসক্রাইবড, বোঝেনইতো, আপনারও তো পরিবার আছে। পুলিশ কিংকর্তব্যবিমূড়, এই কন্ডিশনে ছাড় দেওয়া উচিত কিনা, কোন ইন্সট্রাকশনে লেখা নেই। ফোন গেল থানার ওসি হয়ে এসপি, ডি এম অব্দি। উপরওয়ালা ব্যাপারটা ব্রেন স্টরমিং করে- ‘মানবিকতা’ র খাতিরে ‘এলাও’ করে দিলেন। বোঝা যাচ্ছে অলিখিত নিয়মে এটাকে ‘এসেনশিয়াল আইটেমের তকমা দেওয়া হল।
কিছু মিলিটারী ডেকরেটেড অফিসার আছেন যারা ডাবল ওয়ার্ল্ড ওয়ার ভেটারেন, মানে তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪১-৪৪) দুটোতেই ওয়ার ফ্রন্টে ছিলেন। তাদেরকে বেশ সন্মানের চোখে দেখা হয়। বর্তমানের বিভীষিকাময় করোনা ভাইরাসের মত প্রানঘাতী, স্প্যানিশ ফ্লু এরকমই এক মহামারীরূপ ধারন করেছিল ইউরোপে, সালটা ১৯১৮-২০। তখন তো আর এত গ্লোবালাইজেশন হয় নি। তাই সেটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে নি। এক স্প্যানিশ মহিলা বা গ্রেট গ্রান্ডমাদারই বলা যায়, শিশুকালে স্প্যানিশ ফ্লু সারভাইভার, আবার এই ৯৬ বছর বয়েসে করোনার সংক্রমনকে জয় করে পুরোপুরি সুস্থ। রাখে হরি মারে কে। ডাবল মহামারী সারভাইভার।
মাঝে মাঝেই ভিডিও ক্লিপিং আসছে, লকডাউন অমান্য করাতে, পুলিশের ডান্ডাবর্ষনের ছবি। নূতন নূতন ফন্দী ফিকিরে ভারতবাসীর জবাব নেই। বাজারের থলি নিয়ে বা কেউ প্রেসক্রিপশন নিয়ে ঘোরাঘুরি এখন জলভাত, একজন দুই টন পেয়াজ কিনে ভ্যান চালিয়ে অন্য রাজ্য থেকে বাড়ী ফিরেছে, সত্যি মিথ্যা জানি না জনৈক ব্যাক্তি এক ঠেলাওয়ালার ঠেলায় শব্জী নিয়ে এপাড়া ওপাড়া করছেন। বাড়ীতে আর কতক্ষন থাকা যায়। ঠেলার নাম বাবাজী, এতো পুরানো প্রবাদবাক্য। আসল ঠেলাওয়ালা নাকি মহা আনন্দে উনার বাড়ীতে বসে টিভি দেখছে। তব শব্জীর লাভের বখরা আধাআধি হবে কিনা সেটা জানা যায় নি।
দিল্লিতে এখন প্লাজমা থেরাপি শুরু হয়েছে, করোনাতে আক্রান্ত ক্রিটিকাল রোগীদের জন্য। এতে নাকি বেশ ভাল ফল পাওয়া যাচ্ছে। যারা সেরে উঠেছেন, তাদের রক্তে নাকি করোনা ভাইরাসকে পরাস্ত করার বহুমূল্য এন্টিবডি আছে, সেই রক্ত নিয়ে করোনা আক্রান্তর শরীরে দিলে অবধারিত সুফল। কাগজে ছবি দেখলাম তবলিঘি জামায়েতের আক্রান্তরা সুস্থ হয়ে, প্রায় সবাই প্লাজমা দানের জন্য লাইন দিয়েছে।
চারদেওয়ালের মধ্যে বন্দী থেকে অনেক গৃহস্বামী আজকাল রান্নায় পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। ফেসবুক, হোয়াটস্ আ্যপে তাদের নবলব্ধ জ্ঞানের ফলস্বরূপ রন্ধন কর্মের ফটো আসছে। আজকাল তো আবার রাধুনী কথাটা প্রায় উঠেই গিয়েছে, তার যায়গায় বলা হয় শেফ। ছোটবেলায় রান্নাঘরে মিটসেফ বলে একটা জালি দেওয়া, ছোট সাইজের আলমারী থাকত। প্রথমে ভাবতাম ওটারই অপভ্রংশ শেফ, পরে জানলাম ওটা নাকি ফ্রেন্চ শব্দ।যাই হোক এই নব্য শেফদের রান্নার ফটো বেশ রমনীয়, তবে ফটো অনেক সময়ই ধোকা দেয়, তাই রান্নার স্বাদের ব্যাপারে ধন্দ থেকেই যায়, তবে ভারচুয়াল ওয়ার্ল্ড এর রীতি অনুযায়ী থাম্বস আপটা লাগাতে ভুলি না। রান্নার হাত-খুন্তি- কড়াই ধরার আগের প্রথম সোপান হচ্ছে শব্জী কাটা। লকডাউনের বাজারে ফেসবুকে বন্ধুদের ব্যন্জনের ছবি দেখে ভাবলাম, স্টেপিং স্টোন হিসাবে প্রথমে শব্জী কাটাত হাত লাগাই, বেটার হাফের হেল্পও হবে আমিও রান্নার অ,আ,ক,খ শিখব। সেইমত কাজ। নিজের বুদ্ধি কাজে লাগালাম। আলু, পেয়াজ দিয়ে শুরু করাই ভাল, উচ্ছে, পটল, ঝিঙ্গে কাটা অত সোজা নয় বলেই মনে হল। থাক ওগুলো পরের স্টেপের জন্য তোলা থাক। ভেবেছিলাম আলু, পেয়াজটা এক টুসকিতে নামিয়ে দেব। আলু আর পেয়াজ সবধানে ছাড়ালাম। মনোযোগটা বোধহয় একটু বেশী ছিল। চারটে আলুর মধ্যে তিনটে ঠিকঠাক নামল। চতুর্থটা কাটার সময় দেখলাম কেলো করে ফেলেছি। আলুটা ভুলে ফেলেছি ডাস্টবিনে আর ছিলকা বহাল তবিয়তে শোভা পাচ্ছে, বাকি তিনটে আলুর পাশে। প্রথমে ভাবলাম, টুক করে আলুটা ডাস্টবিন থেকে তুলে ধুয়ে নিই। করা গেল না, কেমন একটা গিল্টি ফিলিং হল। এমনিতেই গৃহলক্ষীর কল্যানে বাড়ী থাকে ঝকঝকে তকতকে, তাই মনে হল ডাস্টবিন থেকে তুললে মনটা খচখচ করতে থাকবে। এরপরে চাকু দিয়ে কাটার পালা। সব শেষ করে একগাল হাসি নিয়ে বল্লাম - দেখে যাও সব কেটে ফেলেছি। ভাবলাম বেশ এপ্রিশিয়েসন পাব, কিন্তু কোথায় কি, বৌ এর মাথায় হাত। বুকের ভিতরটা ফানুসের মত চুপসে গেল। যা শুনলাম তাতে বুঝলাম, আলু - পেয়াজ কাটা রীতিমত আর্ট। পনিরের আলু ছোট স্কোয়ার সাইজ হবে, আস্ত ডিমের ঝোলের আলু আরো বড়, মানে একটা আলুর চারটে পিস ধরা যেতে পারে। মাটনের হলে খালি দুই পিস করতে হবে। ওমলেটের ঝোলের আলু ফ্রন্চ ফ্রাইএর আকৃতি হবে তবে একটু বড়, আলু উচ্ছে ভাজার আলুটা ঐরকমই তবে একটু ছোট, মুচমুচে আলুভাজার আলু কাটাই নাকি সবচেয়ে কঠিন। আলুটাকে অনেক পাতালা করে কেটে তারপর লম্বা লম্বা কাটতে হবে। এতেও রক্ষা নেই, এরপর সেটাকে নুন জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে কিছুক্ষন, তবেই নাকি ভাজলে সেটা মুচমুচে হবে। পটলের আর ফুলকপির ডালনার আলুটা, ডিমের ঝোলের আর পনিরের ডালনার আলুর মাঝামাঝি হবে। পেয়াজের ব্যাপারেও নাকি তাই। অমলেট ভাজার পেয়াজ ছোট স্কোয়ার, মাছের ঝোলেরটা লম্বা, মুশুরীর ডালের খিচুরীতে চার টুকরো। আর শোনা গেল না। রনে ভঙ্গ দিলাম। একেই পেয়াজের ঝাজে চোখ জ্বলছিল, মনে হল আরো পানি বেরোচ্ছে। মাথা পুরো ভো ভো করছে। সামান্য আলু, পেয়াজে যদি এই ঝকমারী হয়, তবে, পটল, উচ্ছে, পালক তো পুরো ইউক্লিডের উপপাদ্য। হায়ার সেকেন্ডারীতে ঐ একটা জিনিষ ছেড়ে এসেছিলাম। বুঝলাম এ আমার কর্ম নয় আরো বুঝলাম এই জন্যই সে বেটার হাফ আর আমি বিটার হাফ! একেই বলে সেল্ফ রিয়েলাইজেশন।
দেবদত্ত ২৮/০৪/২০
করোনা পর্ব ৮
করোনার ব্যাপরে ম্যাথামেটিশিয়ানরাও পিছিয়ে নেই। পৃথিবী জুড়ে ২০ লক্ষ মানুষকে কাবু করতে যত ভাইরাস লেগেছে, তার সম্মিলিত ওজন মাত্র একগ্রাম। ইতিহাস বলে ভারতবর্ষ শূন্য আবিস্কার করেছিল, আবার জ্যোতিরবিজ্ঞানে অনন্ত মহাকাশের বিশালতার পরিমাপও করেছিল। করেছিল বল্লে ভুল হবে ব্রম্ভান্ডের বিশালতার সম্যক জ্ঞানের ধারনা করেছিল। মহাভারতে অতবড় কুরুক্ষেত্র যুদ্ধটাও লাগল কিন্তু ‘সূচ্যগ্র মেদিনী’ (সেটাও ওই এক গ্রামই হবে) দিতে অপারগ হওয়ার কারনে। আনবিক বোমার ব্যাপারটও তাই। অনু পরমানুর সংঘাতে অমিত শক্তির বহিপ্রকাশ ।
এদিকে লকডাউন ৩ এর কোন সম্ভাবনা আছে কিনা, সবই উদগ্রীব হয়ে আছে জানতে। সরকার এখন ধর্মসঙ্কটে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি। লকডাউন শিথিল না হলে দেশের অর্থব্যবস্থা গড্ডালিকা প্রবাহের শামিল, আবার লকডাউন পুরো আনলক করলে ভাইরাস আনলিমিটেড। অতঃকিম? তাই মনে হচ্ছে মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন হবে। ইনোফোসিসের নারায়ণমূর্তি, আনন্দ মহীন্দ্রা এবং আরো অনেকে লকডাউন শিথিলের পক্ষে জোর সওয়াল করছেন।
বিশ্বজুড়ে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রী কোভিডের চক্কোরে ঘোরসংকটে। টুরিসিম সেকটরটা রিভাইভ করতে সময় লাগবে। বছর দশেক আগে খাজুরাহো গিয়েছিলাম বেড়াতে। মন্দিরের বাইরের সিড়িতে বসে আছি। একদল টুরিস্ট এল। তাদের সংগে এক মধ্যবয়সী এসে আমার পাশে বসেছে। সে দেশী লোক। আলাপ হল। বল্ল সে নাকি গাইড কাম টুর অপারেটর। একটা লাইসেন্স ওয়ালা কার্ড দেখাল। মিনিস্ট্রি অফ টুরিসিম থেকে ইস্যু করা। এরকম লাইসেন্স থাকলে ট্যুর অপারেটর হওয়া যায়। জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি তোমার গ্রুপের সঙ্গে গেলে না। বল্ল- না, আমার এখানে ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজ জানা গাইড ফিট করা আছে। ট্রিপ হিসাবে আমার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট। দেখলাম প্রফেশনটা বেশ ইনটারেস্টিং । ওর কাজ টুর ইটিনারি বানানো, টুরিস্টদের লজিস্টিক ঠিক করা আর দেখভাল। সামারে টুরিস্ট কম। সে নাকি প্রত্যেক সামারে ফ্রান্স যায়। বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আগামী শীতে ট্যুরের বিজনেসটার কাজও এগিয়ে রাখে। পরে আমিও ইনসপায়ার্ড হয়ে টুরিস্ট গাইডের এ্যপ্লাই করেছিলাম কড়কড়ে পাঁচশ টাকা খরচা করে। তবে কী কারনে জানি না তার আর কোন রেসপন্স পাই নি। ধান ভাঙতে শিবের গীতের মত যে কথাটা বলতে চাইছিলাম সেটা হচ্ছে প্রফেশেনাল টুরিস্ট গাইডের মন্দা চললেও, কিছু এ্যমেচার টুরিস্ট গাইড বাজারে নেমেছে। বরাকর নদীর একদিকে পশ্চিমবঙ্গ আর অন্য সামান্ত ঝাড়খন্ড। নদী পেরিয়ে ঘন জঙ্গল তারপর হাইওয়ে। পুরুলিয়ার অনেক কারখানার শ্রমিক ঝাড়খন্ডের বাসিন্দা। পথপ্রদর্শকের সঙ্গে প্যাকেজ ডিল। নৌকায় নদী পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পথ দেখিয়ে হাইওয়েতে পৌছে দেবে। জনপ্রতি একশ। এটাই হচ্ছে নেসেসিটি ইজ দি মাদার অফ ইনভেনশন। এই পথ অবলম্বন করে অনেকে প্রফেশন চেন্জ করে ফেলেছে। আমাদের পাড়ার ফলওয়ালা এখন শব্জী বেচছে। এটা সফ্ট স্কিল মাইগ্রেশন। আমার ক্লাসমেট তরুণ সেদিন জানাল, ওদের পাড়ার অটোচালকরা এনমাস শব্জিওয়ালা হয়ে গিয়েছে। এটা টোটাল প্রফেশন মাইগ্রেশন বলা যায়। গিয়ার চেন্জের মত এখন দাড়ি-পাল্লার খেলা। ওজন করার সময় কব্জীটাকে কাটার কাছের হ্যান্ডেলে ঠেকিয়ে কীভাবে ওজনে মারতে সেটাও একটা শেখার জিনিস।
ভারতীয়রা টুকলিতে ওস্তাদ। কয়েকদিন আগে এ্যমেরিকায় এয়ার ফোর্স ফ্লাই পাস্ট করে মেডিক্যাল ফ্রেটারনিটির সবাইকে সেলাম ঠুকেছে কোভিডের লড়াইয়ে সাপোর্ট দিয়ে। আজকে সকালে (০৩/০৫), সেটাই হল আমাদের দেশে। দেশী সামরিক বাহিনী মনে হয়, লকডাউনের দৌলতে, সব এ্যাকটিভিটি বন্ধ রেখেছে। আম আদমী অলরেডী তালি-ঘন্টা বাজিয়ে, মোমবাতি জ্বেলে সিম্বলিক করোনা তাড়ানোর লক্ষ্যে স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান করেছিল। এবারে এয়ারফোর্স সেইপথে হেটে, সব শহরে ফ্লাই পাস্ট করেছে, কোথাও বা হসপিটালে পুস্পবৃস্টি করছে।
সব সরকারী দপ্তর করোনা প্রতিরোধে কিছু না কিছু অবদান রাখার চেষ্টা করছে। এতে নয়া সংযোজন, কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের প্রপোজাল- করোনা মুক্তিতে গঙ্গাজলের ব্যাবহার। হিন্দু শাস্ত্রের পবিত্র গঙ্গানদীর জলের নাকি রোগহরনকারী শক্তি আছে, যদিও অনেক শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গার জল কেমিক্যাল এন্যালিসিসে দেখা গিয়েছে, পান করা তো দূরের কথা, স্নানেরও যোগ্য নয়। সুখবর একটাই, আই সি এম আর, জলমন্ত্রকের এই নিদান খারিজ করে দিয়েছে।
এই লেখটা লিখতে লিখতে, চৌঠা মে থেকে তৃতীয় পর্যায়ের লকডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। ট্রেন, অন্তরাজ্য বাস পরিষেবা, বিমান সবই বন্ধ থাকছে। করোনার তীব্রতা অনুযায়ী পুরো দেশকে, রেড, অরেন্জ, গ্রীন জোনে ভাগ করা হয়েছে। ব্যাবসা, বানিজ্যে গতি আনতে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। মল, সিনেমা হল, পাবলিক গ্যাদারিং নৈব নৈব চ।
লকডাউন কবে উঠবে, ভাইরাসের দৌরাত্ব কবে কমবে, কিছুই জানা নেই। লকডাউন ১ এ তখন কাগজে গ্রাফ আসছিল, প্রথম লকডাউনের শেষে, করোনা পজিটিভ কেস ডাউন ট্রেন্ড হবে, লকডাউন টু না করলে, সেটা উর্ধমুখী হবে, আর লকডাউন টু করলে, শেষ পর্যায়ে সেটা জিরোতে নামবে। কিন্তু সে আশায় ছাই দিয়ে লকডাউন ৩ এর শুরুর দিক থেকেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা উর্ধমুখী। সরকারী মুখপাত্র এরজন্য দায়ী করেছেন রোগীদের দেরী করে হাসপাতালে রিপোর্ট করাকে। ইনিশিয়াল স্টেজে কেউ আসছেন না। এর কারন খুঁজতে গিয়ে, সাইকোলজিস্ট ও সোশিওলজিস্টরা, সরকার ও মেডিয়াকেই দায়ী করছেন। তাদের বক্তব্য, এই রোগটা এখন এতটাই স্টিগমাটাইজড যে, সমাজের ভয়ে অনেকে মাইল্ড সিম্পটম থাকা অবস্থায় হাসপাতালের যাচ্ছেন না। পত্রপত্রিকায় আবার ঘুরছে, অনেকের কোন সিম্পটম নেই, এযন্টিবডি টেক কেয়ার করছে, তারা বিনা চিকিৎসাতে সুস্থ হচ্ছেন। এসব ভেবে অনেকে দেরী করে যাচ্ছেন টিক্টমেন্ট করাতে। ফলত ক্যাসুয়ালিটি বাড়ছে।
লকডাউন কবে উঠবে, এই নিয়ে নানা থিয়োরী বাজারে ঘোরাঘুরি করছে। আমার যে থিয়োরীটা সবচেয়ে পযারটিক্যাল লেগেছে, সেটা হচ্ছে গদী দখল রাখার জন্য পাখির চোখ। জনগন শুরু থেকেই করোনাজুজুতে আতংকিত, তাই লকডাউন১,২ তে জনগন বেশ ভাল মনেই নিয়েছে। ধীরে ধীরে লোকে যখন বাড়ীতে থেকে বোর হবে, রুজী-রোটিতে টান পড়বে, তখন সবাই আপনা থেকেই লকডাউন শিথিল করতে বলবে। সেই সময় থেকে সরকার, লকডাউন উঠিয়ে নেবে। এতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
সবচেয়ে হাসির লেখা করোনা নিয়ে, যেটা হোয়াটস্ আ্যপে ঘুরছে, সেখানে করোনাকে বাঘমামা দেখিয়ে, সবার ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার কথা লিখেছেন এক সুরসিক ব্যাক্তি।
করোনা পর্ব ৯
কয়েকদিন আগে সোশাল মিডিয়াতে জোক ঘুরছিল, একবার গাঁজাকে করোনার প্রতিষেধক হিসাবে লাগান হোক। কারন নেপালে খুব গাঁজা চাষ হয়। নেপালীর প্রায় সবাই গাঁজা খায়। নেপালে তাই করোনা রোগী নেই। ভারতে সাধুবাবারা গোল হয়ে বসে গাঁজা টানে। তাদের কারুর করোনা হয়েছে বলে শোনা যায় নি। যে দম নিয়ে গাঁজা টানতে হয়, তাতে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ে। দুদিন আগে দেখা গেল গাঁজার জোকটাকে আর গাঁজাখুরি বলা যাবে না। কানাডার একদল বিজ্ঞানীরা গবেষনা করে দেখেছেন, গাঁজা থেকে নির্গত কিছু পদার্থ, প্রোটিনের মাধ্যমে যে অপদার্থ করোনা ভাইরাস মানবশরীরে ঢোকে, তা অনেকটাই আটকে দিতে পারে। আশায় আছি এই ধাক্কায় গভর্নমেন্ট, পপি কাল্টিভেশনের আরো জমির ছাড়পত্র দেয়। তাতে অদূর ভবিষ্যতে পপিসীড বা পোস্তদানার দাম যা কিনা দিল্লিতে ২৫০০/- প্রতি কেজি দাড়িয়েছে, সেটা কিছু কমবে। অনেকদিন ঝিঙ্গাপোস্ত খাওয়া হচ্ছে না পোস্তর অভাবে।
এখন লকডাউন ৪ চলছে গত ১৮ই মে থেকে। তবে এখন অনেকটাই ঢিলেঢালা, কাছাখোলা টাইপের। হাওয়াই জাহাজের উড়ান ২৫ তারিখ থেকে চলছে। মাঝে শোনা যাচ্ছিল, বিমানে মাঝের সীটটা খালি রাখা হবে সামাজিক দূরত্ব মেনটেন করতে। সেটা আর করে ওঠা যায় নি। ভাড়াবৃদ্ধিটাই মেন কারণ হবে, তবে এভিয়েশন মিনিস্টার, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মত সাফাই দিচ্ছেন, মাঝের সীট খালি রাখলেও এক মিটারের বাধ্যতামূলক দূরত্ব পাওয়া যাচ্ছে না।
এর ওপর আবার মড়ার উপর খাড়ার ঘায়ের মত প্রবল শক্তিশালী সাইক্লোন কলকাতা ও দক্ষিনবঙ্গকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে গেল। খালি কলকাতা শহরেই পাঁচ হাজারের বেশী গাছ গোড়া শুদ্ধ উপড়ে পড়েছে। পড়বি পড়, তারা সঙ্গে ইলেকট্রিক পোল, বিজলীর তারসহ শরশয্যা নিয়েছে। ফলে অনেক জায়গাতে লাইট আসতে ছয় সাতদিন লাগছে। মোমবাতির জন্য হাহাকার। আলো পাখা তো বন্ধই, ফ্রীজ, জলের পাম্প সব বন্ধ। ঝড়ের গতিবেগ কলকাতাতেই ছিল ১৩৩/- প্রতি ঘন্টায়। সমূদ্র উপকূলে দীঘার কাছাকাছি ছিল ১৮৫ কিমি প্রতি ঘন্টা। বিগত প্রায় তিনশ বছরের মধ্যে এরকম প্রলয়ংকারী ঝড় হয় নি। এখন ওয়েদার ফোরকাস্টিং, স্যাটিলাইটের কারনে অনেক উন্নত। বঙ্গোপসাগরে গভীর নিম্নচাপ, সাইক্লোনে পরিনত হয়ে আসার প্রতিমুহূর্তের খবর পৌছে যাচ্ছিল বৈদ্যুতিন মাধ্যমে। বাংলাতে পাচলক্ষ লোককে এবং উড়িষ্যাতে দুই লক্ষ লোককে আগেভাগে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। তাহালেও ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের দিক দিয়ে, সাধারণ মানুষ এটাকে হাল্কাভাবে নিয়েছিল। অনেকটা সেই গোপালের গরুর পালে বাঘ পড়া গোছের ব্যাপার। তার কারণ অবশ্য আছে। আগে বেশ কয়েকবার সাইক্লোন যে গতিতে সমুদ্র দিয়ে এসেছিল, স্থলভাগে তার শক্তি অনেক কম হয়ে যাচ্ছিল। ফলে অনেকেই ঝড়ের এত মারাত্মক আকার সম্বন্ধে ঠাহর করতে পারেন নি।
আচ্ছা আমরা কি এখন কলিকালের শেষপ্রন্তে এসে পড়েছি? প্রকৃতির এই ধ্বংসাত্বকরূপ এমনভাবে আর চোখে পড়ে নি। নর্থইস্ট ইন্ডিয়া করোনার হাত থেকে মোটামুটি ইনসুলেটেড ছিল। কাল সেখানে মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হয়ে গেল। এদিকে নর্থ ইন্ডিয়াতে অন্য সমস্যা। পাকিস্থান থেকে রাজস্থান হয়ে মধ্যপ্রদেশ,হরিয়ানা হয়ে আজ দিল্লী নয়ডাতে locust বলে একরকম পতঙ্গ দলে দলে ঢুকে পড়েছে। এদেরকেই বোধহয় পঙ্গপাল বলে। ভাইরাসের মত মানুষ এট্যাক না করলেও এরা শস্য নষ্ট করে ফেলে। ঘনাদার গল্পে এরকম পঙ্গপালের কথা আফ্রিকাতে হয় বলে জানতাম। গতবছর পাকিস্থানে খুব হয়েছিল। এবার পাকিস্তান ছাপিয়ে ভারতে। লকডাউন চললেও এতদিন শাকসবজি ঠিকঠাক আসছিল। এরপর সেই ভাঁড়ারেও না টান পড়ে।
করোনা পর্ব ১০
এতদিন চলছিল সেই আলিবাবার ‘চিচিং বন্ধ’, এবার শুরু হল ‘চিচিঙ ফাঁক ‘, লকডাউনের পর আনলকিং এর পালা। করোনা এখন অনেকটা বেশী সময় ধরে থাকা অতিথির মত। অতিথি প্রথম এলে তাকে অনেক খাতিরযত্ন করা হয়। আমরা থালা, ঘন্টি বাজিয়ে বাজি পুড়িয়ে তার অভ্যর্থনা করেছি। দীর্ঘ আড়াই মাসে সে এখন ঘরের লোকের মত আপন হয়ে দাড়িয়েছে। শোনা গেল করোনা এখন পাশবালিশের সমগোত্রীয়, তাকে বগলদাবা করে নিশ্চিন্তে ঘুমান। সরকারের গলায় ভিন্ন সুর। করোনাকে নিয়েই বাঁচতে হবে। কিন্তু ‘ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ এই মন্ত্র মাথায় রেখে ক্রমশ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। ধীরে ধীরে আমরা ব্রিটেন কে পিছনে ফেলে চার নম্বর স্থানে আছি। মন্দির, মসজিদও খুলে গিয়েছে। দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরে লম্বা লাইন। পিপিই কিট পরিহিত পুরুতমশাই। চিরপরিচিত পূজার ডালিতে ফুল নেই, পূজা শেষে চরনামৃত নৈব নৈব চ। এদিকে স্বত্ত্বধারী পার্টির রনহুংকার শোনা যাচ্ছে বিহার বাঙ্গলার আসন্ন এ্যসেম্বলী পোলে গদী দখলের প্রাণপন চেষ্টা। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে- তার উৎকৃষ্ট প্রমান। রবিঠাকুর, নেতাজী, বঙ্কিম, শ্যামাপ্রসাদ, বিদ্যাসাগর ইত্যাদি মনিষীদের নাম এক নিশ্বাসে উচ্চারণ করে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, রসাতলে যাওয়া সোনার বাংলা আবার হীরের টুকরো তৈরী হবে। ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়’ অথবা ‘ধন্য আশা কুহকিনী’ এসব কথাই মনে ঝিলিক দিচ্ছে।
বেশ কিছুদিন পরে আবার কলম ধরেছি। এখন প্রতিদিনে আক্রান্তের সংখ্যা পৌছে যাচ্ছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এটাকেই নাকি গোষ্ঠী সংক্রমন বা হার্ড ইমিউনিটি বলে, যদিও সরকার এখনো এটাকে মানতে নারাজ। ইতিমধ্যে কয়েক রাজ্যে আংশিক লকডাউন জারী হয়েছে। যেমন জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে শুক্রবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত লকডাউন থাকছে। অনেক স্টেটে অফিস কাছারী খুলে গিয়েছিল। ৩৩ শতাংশ স্টাফ রোজ হাজিরা দেবে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নামমাত্র। কলকাতায় বাসের ভীড়ে সামাজিক দূরত্বের দফারফা। সিনেমা হল তো বন্ধ। তাই মাল্টিপ্লেক্সের প্রবল আপত্তি সত্বেও কিছু সিনেমা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যেমন নেটফিক্স, আ্যমাজন প্পাইম ভিডিও, হটস্টার ইত্যাদিতে রিলিজ হচ্ছে। অনেক ওয়েব সিরিজও আছে। এখন নেটের ডাটা সহজলভ্য। তাই ঘরে বসে স্মার্ট টিভিতে সিনেমা দেখাই রেওয়াজ হয়ে দাড়িয়েছে।
এরমধ্যে আবার চায়নার সঙ্গে ইন্ডিয়ার বর্ডার সংঘাত। চীন তো অনেক আগেই সীমান্তের কাছ দিয়ে রাস্তাঘাট বানিয়ে নিয়েছে। এখন ইন্ডিয়া রাস্তা বানাতে শুরু করাতে সেটা চায়নার চক্ষুশূল। হাজার বছর আগে হাতাহাতি যুদ্ধ হত। এত টাকা দিয়ে সমরাস্ত্র কেনা বৃথা গেল। হাতাহাতি যুদ্ধে বিশজন ভারতীয় সেনা প্রাণ হারালেন গালোয়ান ভ্যালিতে। চায়নার স্ট্রাটেজী হচ্ছে - টু স্টেপ ফরোয়ার্ড, ওয়ান স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড।
এরই মধ্যে অযোধ্যা মন্দির নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের দিন ঠিক হয়েছে ৫ই অগস্ট। করোনা বাড়বাড়ন্তের মধ্যেও মোদীবাবু যাবেন এই অনুষ্ঠানে। আগের নকশায় মন্দিরের উচ্চতা ছিল ১২৫ ফুট, এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ১৬০ ফিট। ধর্মীয় উন্মাদনার রমরমাতে ‘ফিট’ করার জন্য মন্দিরের উচ্চতা বেশ কিছু ফিট বাড়ল।কারন মন্দির নির্মাণের সময়কাল ধরা হয়েছে সাড়ে তিন বছর। দুহাজার চব্বিশে পার্লামেন্ট ইলেকশনের আগে দেশবাসীর হাতে তুলে দেওয়া হবে মন্দির। সব ফ্রন্টেই এখন মন্দা, তাই ভাবমূর্তির জন্য ভরসা মন্দিরে এসে ঠেকেছে।
ওদিকে হাওড়াব্রীজের উপর এক মহিলা দুদুবার চড়ে বসেছেন। পুলিশ অনেককষ্টে তাকে নীচে নামিয়েছে। তার বক্তব্য ছোটবেলায় কিছু অবিস্কার করার জন্য নাকি তিনি নোবেল পেয়েছিলেন। তখন ছোট ছিলেন বলে গভর্নমেন্ট কাস্টেডিয়ান হয়ে নোবেল সরকারী দপ্তরে রেখেছে। বারবার বলা সত্বেও তাকে দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে আশার আলো জাগিয়েছে অক্সফোর্ড আবিস্কৃত ভ্যাকসিন বা টিকা। সেকেন্ড স্টেজ ট্রায়াল নাকি সাকসেসফুল। থার্ড স্টেজ ট্রায়াল শেষ হতে হতে এ বছর পেরিয়ে যাবে বলে ধরা হচ্ছে। ততদিন কি বিশ্ববাসীর কোভিডের হাত থেকে পরিত্রাণ নেই? কেউই উত্তর জানে না। আমার দুটো ছোট প্রশ্ন এই টিকা নিয়ে। একটা হচ্ছে টিকাটা কি দেওয়া হবে যাদের করোনা হয় নি, তাদের জন্য, নাকি যারা আক্রান্ত তারাও নেবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন, একবার নিলেই কি হবে? নাকি কয়েক বছর অন্তর অন্তর নিতে হবে?
এবারের অমরনাথ যাত্রা বাতিল। চারধামের মন্দিরগুলি এতদিন সাধারন দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ছিল, এখন খালি উত্তরাখন্ড স্টেটের জন্য খোলা। অনলাইনে তিরুপতি দর্শন চলছে ভক্তদের জন্য।
এদিকে বলিউডের শাহেনশাহ র গোটা পরিবার আক্রান্ত কোভিডে। তারা হোম কোয়ারান্টাইনের জন্য লিজ বাসা থেকে নানাবতী হসপিটালকেই প্রেফার করেছেন। নিন্দুকেরা আড়ালে বলছে নানাবতী হসপিটালের স্টার রেটিং বাড়াতেই নাকি এই ব্যবস্থা। সবই অংকের খেল।
এদিকে অর্জুন রাম মেঘওয়াল কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সাফ সাফ বলেছেন, বিকানীরে তৈরী ভাবীজি পাঁপড় নাকি করোনার এন্টিবডি তৈরী করবে। মন্ত্রীজীর নামের মধ্যে বেশ মিল আছে মগনলাল মেঘরাজের। উনি দুই হাতে দুই পাঁপড়ের প্যাকেট নিয়ে টিভি তে এই ঘোষনা দিয়েছেন। মন্ত্রীজি এমবিএ এবং আইএএস অফিসার ছিলেন। আর এক বিজেপির মধ্যপ্রদেশের নেতা রামেশ্বর শর্মা জানিয়েছেন বর্তমানে রাক্ষসগণ চলছে, তাই করোনার রমরমা, রামমন্দির নির্মাণ শুরু হলেই নাকি করোনা হাওয়াতে মিলিয়ে যাবে। নামের মধ্যে রাম এবং ঈশ্বর দুএরি সহাবস্থান তাই তারই যোগফলে এই বাণী!
করোনা পর্ব ৯
এবার যোগীরাজ্যে দুর্গাপুজা নৈব নৈব চ। ইউপির বাঙালীরা ব্যাকফুটে। তবে কথা হচ্ছে যে রামলীলার জন্য সরকার দরাজহস্ত। সবাই সরব এই বলে যে, সিদ্ধান্ত পক্ষপাতদুষ্ট। তবে আমার মনে হয় কেন্দ্রীয় সরকারের নূতন নীতির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে একটু তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে।
রাময়ণে বর্নিত কাহিনী অনুযায়ী রামচন্দ্র অকালবোধন করেছিলেন শক্তিরূপীণি দেবী দুর্গার, যাকে স্মরণ করেই বাঙালিদের এই প্রাণের দুর্গাপুজা। রামচন্দ্রের এখন দেশে রমরমা। স্বয়ং পিএম গিয়ে অযোধ্যাতে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম ঠুকে এসেছেন। তৎসঙ্গে দেশের কোণে কোণে আওয়াজ উঠেছে ‘আত্মনির্ভর’ হয়ে উঠল বলে এই ভারতমাতা। তাই রামকে দিয়ে শুরুবাত। কেয়াবাৎ! রামের নূতন ট্যাগলাইন ‘আত্মনির্ভর’ রাম। তেনার আর অকালবোধন করে মাদুর্গার আশীর্বাদ নেওয়ার দরকার নেই। সেই নীতি মেনে সিদ্ধান্ত রামলীলাতে ছুট, মাদুর্গার ‘দোলা’য় আগমনের ডালা ইউপি তে এবছর খুলবে না।
টিকার ব্যাপারে টীকাটিপ্পনি না করাই ভাল। প্রথমে ভাবা হচ্ছিল এই বছরের শেষের মধ্যে ভ্যাকসিন তৈরী হয়ে যাবে। যত দিন যাচ্ছে তত আশা দুরাশা বা ‘আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়’ গোছের হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিছুদিন আগে পুটিন ঘোষনা দিলেন রাশিয়া টিকা বানিয়ে ফেলেছে। তবে অমেরিকা আর তার তাবেদার দেশসমূহ রাশিয়ান টিকাকে রাসপুটিনের জাদুটোনা গোত্রের চিহ্নিত করে ত্যাজ্যপুত্র করেছে।
তবে ধন্য আমাদের ইউপি পুলিশ। যখন এপ্রিল, মে, জুনে লকডাউনের রমরমা, তখন ঠেলাওয়ালা শব্জীবিক্রেতাদের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। তারা সব বিপদ তুচ্ছ করে আমাদের এসেনশিয়াল কমোডিটির সাপ্লাই ঠিক রেখেছে। রাস্তা ছেড়েও সোসাইটি প্রাঙ্গনে তাদের অবাধ প্রবেশাধিকার দেওয়া হল। কিছুদিন আগে আমাদের সেক্টারে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। একটি কলেজপড়ুয়া গাড়ী করে রাতে আসার সময় একদল দুস্কৃতীকারী তাকে মারধোর করে গাড়ী নিয়ে পালায়। ছেলেটি পরে হসপিটালে মারা যায়। আমাদের সেক্টারে পুলিস পার্টি গাড়ীতে টহল দেয় দেখেছি। কখনই তারা গাড়ী থেকে নামার কষ্টও করে না। বেশীরভাগ সময়েই তাদের চোখ মোবাইলে নিবদ্ধ। পুলিশের বড়কর্তারা এসে সব দেখেশুনে নিদান দিলেন, ঠেলাওয়ালাদের জন্যই এসব অপকর্ম হচ্ছে। তাই পুলিশের লাঠির ঠ্যালা সামলাতে তারা এখন অদৃশ্য। অথচ সোশিওলজিস্টরা বলে থাকেন রোড সাইড ভেন্ডরস আর ওয়াচডগস অফ দি রোড। কলকাতায় রাস্তার দুপাশে দোকান থাকায় ইভটিজিংয় বা চেনস্ন্যাচিংএর ঘটনা নগন্য। তবে ধন্যি মানতে হবে বাসিন্দাদের । যখন কিনা করোনার সংক্রামণ দিনে দিনে বেড়ে চলেছে, তখন শব্জী ওয়ালার কাছাকাছি উপস্থিতির জন্য দরবার করা তো দূরে থাক, হোয়াটস্ আ্যপ গ্রুপেও কোন উচ্চবাচ্য নেই।
করোনা বেড়ে চলেছে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে করোনা জলভাত। রোজকার করোনার স্টাটিস্টিক্স রাখার থেকে মুখ বদলাতে সুশান্ত সিংহের আত্মহত্যার ধোয়াশা এবং বলিউড তারকাদের ড্রাগ সেবনের কীর্তিকাহিনী অনুসন্ধানে মেডিয়া প্রাণপাত করছে। সিবিআই এর তদন্তে সুন্দরী একট্রেসদেরই খালি তলব করা হচ্ছে। হিরোরা মনে হচ্ছে ধোয়া তুলসী পাতা। অবশ্য হিরোইনরা হলফ খেয়ে বলছেন তারা কোনদিন মাদক ছুয়েও দেখেন নি। সবাই আশা করছিল সুশান্ত সিংএর ভিসেরা রিপোর্টে কিছু বিষ টিষ পাওয়া যাবে। কিন্তু এমস বলছে সেরকমটা কিছু নেই। এতে কাগজওয়ালারা যারপরনাই দুঃখিত। মার্ডার হলে মিস্ট্রি আরো জমত, কাগজের কাটতি বাড়ত আর দেশের অর্থনৈতিক বেহাল দশা থেকে জনগনের মন ঘুরিয়ে রাখা যেত।
এই সেপ্টেম্বর মাসের শেষাশিষি দেখা যাচ্ছে এখন অব্দি দশলক্ষ লোক মারা গিয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে আর আক্রান্তর সংখ্যা সাড়ে তিনকোটির মত। ইউরোপে আবার সেকেন্ড ওয়েভ চলছে। তথাকথিত সভ্যদেশরা ভারতের থেকে কিছু কম যায় না। লন্ডনে বিক্ষোভ চলছে মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলেক করার বিরুদ্ধে।
২৮/০৯/২০২০

Comments
Post a Comment