বেহালার স্মৃতি
৩৫ নম্বর ট্রাম বেহালা টু এসপ্লানেড
বেহালার কথা (পার্ট - এক)
ক্যালেন্ডারের তিথি অনুযায়ী সালগুলি ৬৫থেকে ৭০/৭১ নাগাদ। ট্রেনে করে হাওড়া পৌছে কুলির পিছনে উর্ধশ্বাস দৌড়ে, ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে দরাদরি করে, যখন ট্যাক্সিটা হাওড়া ব্রীজের উপর উঠত, তখন কাব্য করে বল্লে বলা যায়’ গঙ্গার শীতল সমীরণে’ শরীর জুড়িয়ে যেত। যে সময়টার কথা বলছি তখনও হাওড়া স্টেশনে ঘোড়ার ফিটন গাড়ী চলত। দাড়িয়ে থাকা গাড়ীর ঘোড়াগুলো বিচালি খেতে ব্যস্ত থাকত। অনেক ইচ্ছে থাকলেও ঘোড়ার গাড়ীতে ওঠার শখ পূর্ণ হয় নি। হয় বেহালার মত দূরের জায়গায় যাবার পারমিশন ছিল না অথবা অতদূর ঘোড়ার গাড়ীতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তখন দাদু ঠাকুমা থাকত, বেহালার বীরেন রায় রোডের বাড়ীতে। এই বাড়ীটার সামনে পর্যন্ত ট্যাক্সি আসতে পারত। কিন্ত পরে নফর চন্দ্র দাস রোডের বাড়ীটার গলিতে গাড়ী ঢুকতে পারত না। একবার তো বনানীদির বিয়ের সময়, বর মানে কালুদার গাড়ী ঢোকান হল গলিতে। বর ভি আই পি লোক। সে বেচারা অতটা হেটে আসবে, তাই সাহস করে গাড়ী গলিতে ঢোকান হল। কিন্তু গাড়ীটা গেল আটকে কিছুদূর এসে, গাড়ীর দরজা খোলার জায়গা প্রায় নেই, তার উপর বরন করার স্ত্রী আচার আছে। সে এক হুলুস্থুল কান্ড। আগে পিছে করতে গিয়ে গাড়ী পাচিলে লেগে ঘষা খেয়ে গেল। কালুদা নেহাত মাটির মানুষ, তায় আবার বড় কলেজের মাস্টার, তাই বিশেষ অঘটন ঘটে নি।
তা সেই বীরেন রায় রোডের বাড়ীটির কথা খুব মনে আছে। সামনে ছিল একটা বারান্দা দুটো দরজা পাশাপাশি, আলাদা দুই ঘর ভাড়াটে। আমাদের থাকার জায়গা মানে আক্ষরিক আর্থে একটাই ঘর, মাঝখানে পার্টিশন লাগিয়ে দুটো ঘর করা হয়েছে। পিছনে কমন উঠোন। দুপাশে দুই পরিবারের আলাদা বাথরুম, টয়লেট। সেই ছোট্ট ঘরে থাকত দাদু,ঠাকুমা, কাকু মানে আশিস কাকু, পথিক কাকু, কল্যাণ কাকু, ছোটপিসি। এখন ভাবি ওই ছোট্ট ঘরে অতজন থাকত কি করে। তাই বোধহয় কথা আছে - ‘যদি হয় সুজন, তেতুল পাতায় নজন।’কল্যানকাকু পলিটেকনিকে পড়ত, অনেক সময় দেখতাম টেবিলের উপর ঝুকে পড়ে টি সেট নিয়ে ড্রইং করছে। পাঠকরা আবার টি সেট কে চায়ের কাপ ধরে বসবেন না। ডাক্তারের যেমন স্টেথো,তেমনি ইন্জনিয়ারদের টি সেট। কাঠের তৈরী হত, দু হাত মত লম্বা ছিল। কম্পিউটার এসে যাওয়াতে আজকাল আর টিসেটের দরকার পড়ে না। পথিক কাকু বিএ পড়ত বলেই মনে হচ্ছে। হাতের লেখাটা মুক্তোর মত ছিল। তবে পড়তে কমই দেখেছি, আয়নার সামনে ঘন্টায় ঘন্টায় চুল আচড়াতে বেশী দেখেছি। ব্যাকব্রাশ করত। শীতকাল হলেই খক খক করে কাশত আর মাফলার জড়িয়ে লেপের তলায় শুয়ে থাকত। মা যখন ৬৫ এ বিটি পড়তে গেল, তখন বাবা আমাকে বেহালা বাড়ীতে রেখে এল। আমার তো মহা আনন্দ। বেশ কয়েকটা আশেপাশের বন্ধু জুটে গেল। তখন একটা খেলা খেলতাম, ছোট ছোট ফ্লাট পাথর একটার উপর একটা সাজিয়ে, ইট দিয়ে টিপ করে মারতে হত। এটার নাম পিট্টু ছিল। পয়েন্ট হত সিগারেটের প্যাকেটের চওড়া দিকটা কেটে। সকাল সকাল রাস্তায় খোজাখুজি করতাম, কোথায় প্যাকেট পড়ে আছে। চারমিনার সবচেয়ে সহজলভ্য প্যাকেট ছিল, তাই তার নম্বর কম, তার উপরে ওয়াইল্ড উডবাইন, দামীর মধ্যে ছিল ব্রিস্টল। ৫৫৫ এর প্যাকেট সবচেয়ে দামী।
বিকালবেলা দাদুর সঙ্গে হাটতে যেতাম। বাড়ী থেকে বেড়িয়ে একটু হেটে গেলে একটা খুব সরু গলি পেরিয়ে এলে বেশ চওড়া এক রাস্তা। সেটা কোন এক অজ্ঞাত কারনে বাঁধানো ছিল না। রাস্তার মাঝে মাঝে রেল লাইনের ভগ্নাবশেষ। ওই রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গেলে বীরেন রায় রোড। সেটা পেরিয়ে একটা গেট। গেটের দুইপাশে পাঁচিল গেটের ভিতর দিয়ে রাস্তাটা সোজা চলে গিয়েছে নিউ আলিপুরের দিকে। দাদুর কাছে শুনেছিলাম, অনেককাল আগে এখানে ছোট লাইনের মার্টিন রেল চলত। কালীঘাট ফলতা লাইট রেল বা সংক্ষেপন কেএফআর। ১৯৫৭ সালে শেষবারের মত যাত্রা এই ন্যারোগেজ রেলের। আমি ৬৬-৬৭সালের কথা বলছি। অর্থাৎ প্রায় বছর দশেক আগে রেল চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু রাস্তার বেশকিছু জায়গায় তখন রেল লাইন দেখতে পেতাম। বীরেন রায় রোড পেরিয়ে গেটের ভিতরে ঢুকলে বেশ ফাঁকা ফাঁকা জায়গা । সব নাকি রেলের জমি। বড় মাঠ। সেখানে ফুটবল খেলা হত। বেহালাতে খেলার মাঠের খুব অভাব ছিল। তাই সব উঠতি ছেলেপিলের দল ফুটবল খেলতে সেখানে ভীড় করত। রেলের রিজার্ভেশন কাউন্টারও ছিল। পরে এই রেল লাইন ধরে তৈরী হয় জেমস লঙ সরনী। একদিন দাদুর হাত ধরে হাটতে হাটতে পৌছে গেলাম নিউ আলিপুর। সেখানে আমাদের এক আত্মীয় থাকেন। তিনি বেশ বড়লোক। তিনতলা বাড়ী বড়রাস্তার উপর। তলায় গ্যারেজও আছে। ওনার দু একটা বাড়ী পরে স্যাম মানেকশ থাকতেন। উনি যে ঘরটায় থাকতেন, দেখলাম তার ছাদ খুব নীচু। একজন লোক দাঁড়ালে মাথা প্রায় ঠেকে যায়। ব্যাপারটা পরে দাদুকে জিজ্ঞাসা করায় বুঝিয়ে দিলেন, ওটাকে মেঝেনাইন ফ্লোর বলে। গ্যারেজ থাকলে নাকি এরকমটা হয়। উনার দুটো তলায় দুই ভাড়াটে নাকি মাসে হাজার টাকা করে ভাড়া দেয়। তখন তো আর সল্টলেক বা নিউটাউন হয় নি। তখনকার দিনে,নিউ আলিপুর হচ্ছে সবচেয়ে অভিজাত এলাকা। তখন আমার বাবার মাইনে ছিল সাতশ টাকা। তাই হাজারটাকা ভাড়া শুনে মনে হল, ইস এরকম একটা বাড়ী থাকলে চাকরী করার কি দরকার। ভাড়ার টাকাতেই তো আরামসে চলবে।
দাদুর সঙ্গে গল্পের বেশীরভাগটাই থাকত স্কুল ও পড়াশুনা সংক্রান্ত। নিয়ম করে স্কুলের হাফ ইয়ারলি বা এনুয়াল পরীক্ষার ফল সাবজেক্ট ওয়াইজ জানাতে হত। এই প্রসঙ্গে আমার জীবনের প্রথম পরীক্ষার কথাটাও জানাই। সেটা ছিল বাণীভবনে আমার নার্সারি ক্লাসে। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনর পর, বাবা মার কাছে নাচতে নাচতে এসে বলেছিলাম-‘দ্যাখে দ্যাখে, আমি থার্ড হয়েছি। রেজাল্ট দেখে দুজনের মুখের হাসি শুকিয়ে গেল। ইংরাজী ও বাংলায়, দুটোতেই গোল্লা আর অংকে দুই। আসলে শ্লেটে এ বি সি ডি ও অ আ ক খ লিখতে দেওয়া হয়েছিল, দিদিমনি লাইন টেনে দিয়েছিলেন ছোট ঘরের, আমি অত ছোট ঘরে কিছুই লিখতে পারি নি। প্রশ্ন উঠবে তাহলে তৃতীয় হলাম কি করে। সবচেয়ে সরল উত্তর যেটা হতে পারে, অথচ চট করে মাথায় আসা মুস্কিল, সেটা হচ্ছে- ক্লাসে তিনজনই ছাত্র ছিল। আমি, সৌমেন ও সুরজিৎ। পরবর্তী জীবনে আমরা ক্লাস ইলেভেন অব্দি একসাথে পড়াশুনা করেছি।
যাক বেহালার কথায় ফিরে আসি। তখন কাকু রাইটার্স বিল্ডিংএ চাকরী করত। ডায়মন্ড হারবার রোডে গিয়ে ট্রাম ধরে অফিস যেত। তখন ডায়মন্ড হারবার রোডটা একটা সরু ফিতের মত রাস্তা ছিল। রোজ জ্যাম লেগে থাকত। তখন শুনতাম রাস্তাটা নাকি ১২০ ফিট চওড়া হবে। স্কুলের উপরের ক্লাসে যখন পড়ি তখন সেই কাজ শেষ হয়। কাকু রোজ অফিস থেকে ফিরে আসার পর ট্রামের টিকিট গুলো যোগাড় করতাম। তখন ট্রামে ফার্স্ট ক্লাস আর সেকেন্ড ক্লাস ছিল। যতদূর মনে পড়ে ফার্স্ট ক্লাসের ভাড়া ছিল পনের পয়সা আর সেকেন্ড ক্লাস তেরো পয়সা। ট্রামের টিকিট গুলো লাগত গুলি খেলার কাজে। কাকু সেই জমানায় ধুতি পরে অফিস যেত। বেশ মনে আছে বিছানার উপর দাড়িয়ে ধুতি পরত। অবশ্য এই অভ্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটে, কাকীমার শুভপদার্পনের পরে।
বেহালার কথা (পার্ট টু)
আমাদের দু তিনটে বাড়ীর পরে ছিল বিভুদের বাড়ী। দোতলা বড় বাড়ী। আমাদের সঙ্গে কোন এক আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। আমার দাদু প্রায়ই বিভুর দাদুর সঙ্গে গল্প করতে যেতেন। বিভু আমার থেকে একটু ছোট তবে একসঙ্গেই খেলতাম। বিভুর দাদু একটু ভুলো মানুষ ছিলেন। যতদূর মনে পড়ে উনি হুকো খেতেন, বাইরের বারান্দাতে একটা ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে। কাকু কলকাতার বাইরে কোথাও যাচ্ছিল, এটা কাকুর বিয়ের অনেক আগের কথা। উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘পরিবার নিয়া যাইতাছ?’ ওখানে একজন ছিলেন কাকুর বয়সী, তাকে বাকিরা সুভাষ মামা বলত, তার মানে সম্পর্কে আমার দাদু। দাদু বল্লে পাকা চুল ওয়ালা লোক মনে পড়ে, তাই ভাবতাম কি কান্ড! এই অল্পবয়সী লোকটা আমার দাদু হয় কি করে। সুভাষ দাদু একটা সহজ সরল গোছের হাসিমুখের মানুষ। সংসারের ঘোরপ্যাচ বোঝার মত ক্ষমতা ছিল না। ছোটপিসির সঙ্গেই আমার ভাব ছিল বেশী। দুজনে মিলে রাতে মশা মারার কম্পিটিশন করতাম। রাতে কোন কোন দিন বায়ুচড়া হত, মানে ঘুম আসত না, তখন পিসিকে জাগিয়ে দিতাম। ঠাকুমা সকাল থেকে লেগে পড়ত রান্নাতে। কারণ সবাই যাবে অফিসে বা কলেজে। সঙ্গে ছোটপিসি হেল্পিংহ্যান্ড। দুজনেই নীরব কর্মী ও পিপীলিকার মত পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল। কথা কম কাজ বেশীর জ্বলন্ত উদাহরণ।
আমি বেশীরভাগ সময়টাই ব্যস্ত থাকতাম বাইরের জগতে। ঝাড়গ্রামের মত খোলামেলা জায়গাতে থাকতাম, তাই বাইরের মাঠ, ঘাট, খোলা প্রকৃতি আমাকে গভীর ভাবে আকর্ষণ করত। বেহালার ছোট বাড়ীতে মন টিকত না। ছোটবেলা থেকেই এডভান্চারাস ছিলাম। বন্ধুদের সাথে খেলতে যাবার নাম করে, কয়েকজন মিলে কেএফআর এর মাঠে চলে যেতাম। ওখান পাঁচ পয়সার আইসক্রীম পাওয়া যেত। ওটার উপর খুব লোভ ছিল। স্যাকীরিন মেশানো রং করা জল। তাই খেয়ে ঠোঁটগুলো লাল হয়ে থাকত। কলকাতায় তখন দেখতাম সবাই বেশ ঘুড়ি ওড়ানোতে পারদর্শী। কারণটা মনে হয় খেলার মাঠের অভাব। আমার আবার ফুটবল, ক্রিকেটটাই ভালো লাগত বেশী। বিভুদের বাড়ীর ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ান হত। আমার ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের। এই বাড়ীটা থেকেই ছোটপিসির বিয়ে হয়।
এরপর দাদুরা চলে আসে নফর দাস রোডের বাড়ীতে। আগেই বলেছি, গলিটা ছিল বড্ড সরু। তবে বাড়ীটা তুলনামূলক ভাবে বড়। পিছন দিকে আরেকঘর ভাড়াটে। স্বামী-স্ত্রী দুজন, নিঃসন্তান। সেই মহিলা চাকরী করতেন ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে। আমাদের জানলার পর সিমেন্ট বাঁধান প্যাসেজ, তারপর পাঁচিল । ওরা আসা যাওয়া করলেই দেখা যেত। সব বাড়ীতেই দেখেছি পুরুষরা চাকরিতে যায়, এখানে উল্টো, একসেপ্সন প্রুভ দা রুলের মত ব্যাপার ছিল। দুজনে মিলে আবার ধূপকাঠিও বানাতেন। সেটা দোকানে দিয়েও ইনকাম হত। এই বাড়ীটির সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট ছিল, পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে, অসমাপ্ত দোতলা, তার ছাদও ছিল, তবে প্লাস্টার ছিল না, দরজা, জানালার জায়গা ফাঁকা। তার উপরে তিনতলার ছাদ ছিল। ওটাই ছিল বিকালে বেড়াবার জায়গা। দোতলাটা ছিল কাপড় মেলার জন্য। এই বাড়ীটা থেকে ডায়মন্ড হারবার রোডটা কাছে ছিল। ট্রামডিপোতে যেতে রাস্তার উপর একটা কালী মন্দির ছিল। সবাইকে দেখতাম নমস্কার করতে। ট্রামডিপো ক্রস করে আরো এগিয়ে গেলে চোদ্দ নম্বর বাসস্টান্ড। কাছাকাছি একটা ভাল মিস্টির দোকান ছিল। ওখান থেকে সবসময় মিষ্টি কেনা হত। ডায়মন্ড হারবার রোড তখন চওড়া। দুদিকে বাজার, দোকান। ট্রাম আগে ব্রঙ্ভসমাজ রোড, যেটাতে বিদ্যাসাগর হাসপাতাল আছে, সেইখানে ঢুকে ব্যাক করে বেরোত। ওই রাস্তাটার উপর তখন হরিদাসকাকুর বাসা ছিল। অম্লান মানে হরিদাস কাকুর ছেলে আমার থেকে বছর দুয়েকের ছোট, কিন্তু খুব দুষ্টু । ও বাড়ীতে এলে ত্রাহি ত্রাহি রব। সব জিনিষ উপরে তুলে রাখা হত। ৩৫ নম্বর রুট ছিল। পরে লাইনটা আরো extended হয়। এখন ত মেট্রোর পিলার বসে গিয়েছে।
যতদূর মনে পড়ছে বাড়ীটির নম্বর ছিল ৮৫।৪A। এই বাড়ীটা থেকে প্রথমে বনানীদি ও পরে কাকুর বিয়ে হয়। ওই বাড়ীতে, বিয়েবাড়ীরঅনুষ্ঠান করতে অসুবিধা ছিল না। দোতলায় সব রান্নাবান্না হত। আর তিনতলায় প্যান্ডেল খাটিয়ে অতিথি আপ্যয়ন। যখনকার কথা বলছি তখন বিয়েবাড়ীর নিমন্ত্রণ পত্রে লেখা থাকত- ‘ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অতিথি আপ্যায়ন নিয়ম প্রযোজ্য।’ কাকুর বিয়েতে দুটো জিনিষ মনে আছে। একটা হচ্ছে, বরযাত্রীদেরকে তাড়াতাড়ি যেতে হবে, কারন বিয়েবাড়ীটা হচ্ছে কুদঘাটে। তখন সত্তরের উত্তাল দশকের মাঝামাঝি পর্যায়। কুদঘাট নাকি নকশালদের শক্ত ডেরা, তাই বেশী রাত করে ফেরা যাবে না। দু নম্বরটা হচ্ছে, কাকুর কলিগরা সবাই এল বৌভাতে। কলিগদের হাতে বেশ বড়সড় প্যাকেট। সবার কৌতূহল এতবড় প্যাকেটে কী বিশাল উপহার এল। তখনকার দিনে উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল বই, অথবা ফুলদানি বা ফটোফ্রেম বা দেওয়াল ঘড়ি। ঘনিষ্ঠ হলে শাড়ী। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা সাধারনত সোনার গয়না দিতেন। যাক অনুষ্ঠান বাড়ী শেষ হলে, সেই উপহারকে চিচিংফাক করা হল, মানে প্যাকেট থেকে বার করা হল। বড় বড় সাইজের দুটো বালিশ বেরোল। তখন একটা কথা খুব চলত-নালিশ করলে বালিশ পাওয়া যায়! বিয়ের উপহারে বালিশ টা বোধহয় এই প্রথম। বালিশ দেওয়ার দরকার পড়ত না, কারন খাট পালঙ্কের সঙ্গে বালিশও আসত। যাক গে জানা গেল নাকি এগুলো স্পেশাল বালিশ, এটাকে বলে ডানলেপিলোর বালিশ। তখন এই বস্তু সাধারণ গৃহস্থ বাড়ীতে আসে নি। তুলোর বালিশ হত, কাপাস তুলো হলে হাল্কা হত, সাধারন তুলোর বালিশ বেশ ভারী। অনেক সময় বালিশ ছিড়ে গেলে, ভিতর থেকে তুলোর বিচি বেরিয়ে সারা ঘরময় হয়ে যেত। ডানলেপিলোর বালিশ বা গদী তখনকার দিনের গ্রান্ড হোটেলের মত বড় হোটেলে থাকত। সেই জিনিষ এসে গেল নফর চন্দ্র দাস রোডের এঁদো গলির বাড়ীতে! নূতন কাকীমাকে আমার বেশ পছন্দ হল। সংসারের এবং সবার প্রতিটি খুঁটিনাটিতে সদাসর্বদা নজর।
শীতকালে কলকাতায় গেলে, অবশ্য কর্তব্যের মধ্যে একটা ছিল চিড়িয়াখানা ভ্রমন। পথিককাকুর এইসব ব্যাপারে উৎসাহী ছিল। একটা ওরাং ওটাং এর কথা খুব মনে আছে। সেটা দর্শকদের সঙ্গে খুব মজা করত। একটা সাদা বাঘ ছিল। ঝিলটাতে আসত অনেক পরিযায়ী পাখি। একদিন পথিককাকুর সঙ্গে গেলাম ডালহৌসি পাড়ায়, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিল্ডিংএ। সেখানে কলকাতার প্রথম চলমান সিড়ি অর্থাৎ এস্কালেটার বসেছিল। সেই সিড়ি দেখে আমি মুগ্ধ। বেশ কসরত করে উঠতে হল। কিছুক্ষন দেখে নিলাম বাকীরা কি ভাবে উঠছে। সে এক বিরাট থ্রিলিং এক্সপিরিয়েন্স।
দেবদত্ত ০৫/০৮/২০
কালীঘাট ফলতা লাইট রেলওয়ে



Comments
Post a Comment