পার্টিশনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
পার্টিশনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
পার্টিশনের ব্যাপারটা এতই কমপ্লেক্স যে এর সরলীকৃত ব্যাখ্যা করা যায় না। এই উপমহাদেশে অনেক ধর্মের অনেক ভাষার মানুষ বসবাস করেন। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় নেতাদের চিন্তাধারা এবং সাধারণ জনসাধারনের সম্মিলিত ইচ্ছে এবং সর্বোপরি ব্রিটিশ সরকারের শোষনবৃত্তি এবং ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির পরিপ্রক্ষিতে দেশভাগের সিদ্ধান্ত কতটা ঠিক ছিল তার বিচার করা উচিত। অখন্ড ভারত বা দ্বিখন্ডিত ভারত দুটোর পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচুর যুক্তি আছে।
আমি স্বাধীনতা লাভের কয়েক দশক আগে থেকে খুব সংক্ষেপে ঘটনাগুলি ও তার ফলে উদ্ভুত পরিস্স্থিতি অল্প কথায় বলার চেষ্টা করছি।
শুরুটা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ দিয়ে, যখন ব্রিটিশ শক্তি তদানীন্তন সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী ও রেভিনিউ আর্নার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে দুভাগে ভাগ করে, আসাম,ইস্ট বেঙ্গলকে এক করে মুসলিমগরিষ্ঠ স্টেট বানাল, যার রাজধানী হল ঢাকা আর অন্যটা ওয়েস্টবেঙ্গল, উড়িষ্যা, বিহার নিয়ে হিন্দু মেজরিটি স্টেট যার রাজধানী হল কলকাতা। এইসময় থেকে ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির প্রাধান্য শুরু হল।
১৯০৬ তে মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯০৯ সালে ইন্ডিয়া কাউন্সিল এ্যাক্ট হয়, যাতে কিনা ঠিক হয়, মুসলিম মেজরিটি province এ ইলেকশনে মুসলীম candidate দাঁড়াবে আর হিন্দু মেজরিটিতে হিন্দু ক্যানডিডেট। এর ফলে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের একটা বড় ফাটল ধরে।
এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।১৯১৪-১৮, ভারতীয় সৈন্যরা ব্রিটিশদের হয়ে লড়াই করে। ১৩ লক্ষ ভারতীয় এতে যোগদান করে।বাকী ব্রিটিশ কলোনি গুলি, যেমন কানাডা, অস্ট্রেলিয়, NZ,SA মিলিয়ে যত সৈন্য ছিল, ভারতীয় সৈন্য ছিল তার চারগুন। এখানে দুটো ব্যাপার খুব তাৎপর্যপূর্ণ। একটা হল ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল কংগ্রেস, ভারতীয়দের কাছে এপীল করেছিল যুদ্ধে যোগ দিতে, এইকারণে যে ব্রিটিশ প্রভুরা বলেছিল, যুদ্ধ শেষে ভারতকে স্বরাজ বা Dominion স্ট্যাটাস দেওয়া হবে। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে সৈন্যবাহিনীর হিসাবে বাকী কলোনি ও ইংল্যান্ডের নিজের ফৌজের থেকে, সংখ্যাতত্বের বিচারে ভারত ব্রিটিশদের কাছে অনেক মাহাত্ব্যপূর্ণ ছিল। ব্রিটিশ এম্পায়ারের মিলীটারী পাওয়ার হিসাবে অখন্ড ভারতের সৈন্যবাহিনী, তাদের সমগ্র বিশ্বে সুপার পাওয়ার মানা হত। ভারতের সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়াটা তো প্রথম থেকে দুশো বছর ধরে চলেছে। মজার কথা হল, ব্রিটিশরা যুদ্ধের পরে অলিখিত চুক্তি অর্থাৎ ডমিনিকান স্ট্যটাস দিতে অস্বীকার করে। ১৯১৬ তে লক্ষৌ কনভেনশনএ কংগ্রেস এ মুসলীমলীগ একত্রিত হয়ে স্বায়ত্বশাসনের দাবী তোলে। তখন জিন্না , কংগ্রেস ও মুসলীম লিগ দুটোরই মেম্বার ছিলেন, এবং প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন হিন্দু মুসলিম ইউনিটির। তখন পর্যন্ত কেউ ভাবতে পারে নি হিন্দু মুসলিমের জন্য দেশ আলাদা হবে।
কিন্তু এর পর থেকে ধীরে ধীরে জিন্না, গান্ধী দূরত্ব বাড়তে থাকে, তার কারন, অনেক মাস মুভমেন্টের জন্য, গান্ধী সবচেয়ে জনপ্রিয় লিডার হয়ে উঠলেন। শোনা যায় ১৯২০ এ তিনি একটি মিটিংএ গান্ধীজিকে, মহাত্মা গান্ধীর বদলে Mr. Gandhi বলে সম্বোধন করেন এবং এর ফলে অন্যান্য সিনিয়ার কংগ্রেস লিডারদের তীব্র বাদানুবাদ হয়। গান্ধীজি সাউথ আফ্রিকা থেকে ফেরার অনেক আগে থেকে জিন্না কংগ্রেসে ছিলেন, গান্ধীজীর অত্যাধিক জনপ্রিয়তার ফলে জিন্নার সঙ্গে গান্ধীজির ego clash শুরু হয়ে যায়। এটার প্রতিফলন হয় ১৯৩৭ এর provincial govt ইলেকশনে। অনেক মুসলিম দের জন্য সংরক্ষিত জায়গাতে, কংগ্রেসের মুসলীম প্রার্থী, মুসলীম লীগকে হারিয়ে জয়লাভ করে । এর কারণ। সাধারণ লোক কংগ্রেসকেই মানত, কারন প্রকৃত freedom struggle তাঁরাই করেছিল। এরপর থেকে separate পাকিস্তানের আওয়াজ জোরদার হতে শুরু করে, কারণ মুসলীম লীগ মনে করছিল, অখন্ড ভারতে মাইনরিটি মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা হবে না।
জিন্না ১৯৪০ এর মার্চে প্রথম আলাদা পাকিস্তানের ডাক দেন। এরপর যে সুবিধাটা মুসলীম লীগের হয় সেটা হল, ১৯৪২ এর quit India movement এর দরুন কংগ্রেসের সমস্ত প্রথম শ্রেনীর নেতাকে তিন বছর কয়েদ করে রাখা হয়। তখন মুসলীম লীগের পাকিস্তান তৈরীর জমি তৈরী করা সহজ হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে, ইংরেজদের পক্ষে কলোনী চালানোর মত বিপুল অর্থ ছিল না। ১৯৪৬ এ ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠায়, ইংরেজ পার্লামেন্ট। ক্যাবিনেট মিশন চেয়েছিল দেশভাগ হবে না। বেন্গলওআসাম পূর্বদিকে এবং পশ্চিমে পান্জাবে (যেখানে মুসলীম মেজরিটি ) মুসলীম লীগ সরকার বানাবে বাকী ভারতে কংগ্রেস রুল করবে। সেন্টারের ফেডারেল structure হবে, কিনা হাতে কম power থাকবে, স্টেটের হাতে অনেক বেশী পাওয়ার। weak Centre হওয়ার কারনে কংগ্রেস সেটা রিজেক্ট করে দেয়।মুসলীম লীগ প্রথমে মেনে নিয়েও পরে রিজেক্ট করে।
এর পরপরই ১৯৪৬ এর ১৬ই অগাস্ট জিন্না ডাক দেয় Direct Action day র জন্য। কলাকাতায় দাঙ্গা শুরু হয়, ক্রমে ক্রমে, বিহার, ইউপি হয়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।
এই দাঙ্গাই ছিল অখন্ড ভারতের স্বপ্নের কফিনের শেষ পেরেক। এরপর দেশ বিভাগ ছাড়া কোন রাস্তা খোলা ছিল না। ইংরেজরাও তাড়াতাড়ি এদেশ থেকে পাততাড়ি গুটোতে চাইছিল।
দেবদত্ত
২২/০৭/২০

Comments
Post a Comment