ধূসর অতীত (ফটনের কথা)
ধূসর অতীত পর্ব ১৭
কয়েকদিন পরেই কালীপূজা। নরেন্দ্র মোহন ও তাপস গিয়েছিলেন রায়বাড়ীর তালুক সম্পত্তি রামেশ্বরপুর ও ফুলবাড়িয়াতে। নরেন্দ্র মোহন, কয়েকদিন ধরেই যতীনবাবুকে বলছিলেন, পাটের ফসল কাটা হয়েছে। এবার তো পাট বিক্রির উদ্যোগ নিতে হবে। নিজেদের তালুকগুলোর খবরদারির জন্য যাওয়া দরকার। যতীনবাবু কাছারীর কাজে ব্যস্ত।
এখন স্কুলে পূজার ছুটি। নরেন্দ্র (সুন্দর) মেয়েদের প্রাথমিক স্কুলের মাস্টারমশাই। স্কুলের নাম জ্ঞানদা সুন্দরী প্রাথমিক বিদ্যালয়। জ্ঞনদা সুন্দরী ছিলেন এখনকার জমিদার প্রমোদ রায় চৌধুরীর মা। নরেন সকালে বেরিয়ে সবকিছু পরিদর্শন করে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ী ফিরেছেন। সঙ্গে বেশ কয়েক আটি পাট পাতা, এক প্রজা মাথায় চাপিয়ে নিয়ে এসেছে।
পূর্ববঙ্গ ধানের দেশ। বছরের অধিকাংশ সময়, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত চোখ জুড়ায়। তবে পূর্ববঙ্গের জমি ও জলহাওয়া পাট চাষের জন্য সমান উপযোগী। ১৯৩০ ও ৩১ সালে যতীনবাবু তাদের জমিতে পাট লাগিয়েছিলেন।
ফলন ভাল হলেও দাম পান নি। বিশ্বের বাজারে তখন চাহিদা কম। যতীনবাবু কাগজে পড়েছিলেন, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যে মন্দা, অমেরিকানরা এর নাম দিয়েছে ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে পাটের চাহিদা বেড়েছে। তার বড় কারণ, পাটের রপ্তানী করে ইংরেজ সরকার ভাল লাভ করছে। তারউপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জুটব্যাগ ও জুটের তৈরী নানা জিনিষের চাহিদা তুঙ্গে।
যতীনবাবু ভাবলেন ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’ এটা যেমন সত্যি তেমনি প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ভাগীদার না হয়েও কারো কারো জন্য এটা টাকা রোজগার একটা ভাল উপায়। ময়মনসিংহ, কিশোরগন্জের ভাটি অঞ্চলে পাটের ফলন বেশী।
বছর বিশেক হল ময়মনসিংহ-ভৈরব রেললাইন হয়েছে আর বছর পাঁচেক হল মাইল খানেক লম্বা একটা লাইন, আঠারবাড়ীর খলবলা বাজারের কাছে নরসুন্দা নদীর পাশে ঘাট অব্দি টানা হয়েছে। পাটচাষ হয় বর্ষাকালে আর পাটের ফসল পেতে সময় লাগে তিনমাস। এই আশ্বিন মাসে পাট খেত থেকে তুলে জলে ভিজিয়ে রাখতে হয়, বেশ কয়েকদিন। তারপর শুকিয়ে পাটের আঁশ বার করা হয়। এই বছরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় পাটের বাজারদর ভাল পাওয়া যাবে। তাই এবারও গতবারের মত যতীনবাবুর নির্দেশে তার ভাই সুন্দর, তাদের তালুকের অর্ধেক জমিতে পাট চাষ করিয়েছেন প্রজাদের দিয়ে। বাকী জমিতে আউষ ধান লাগান হয়েছে। তার ভাগ প্রজাদের দিয়েও যা থাকে, সম্বৎসরের রায়বাড়ীর খাওয়ার সংস্থান হয়েও কিছু বেঁচে যায়। সেটা স্থানীয় বাজারে আড়তদারদের বিক্রি করা হয়। পাট অর্থকরী ফসল। সোজাসুজি জুটমিলে পাঠিয়ে যা অর্থ আসে, তাতে তালুকের খাজনা মেটানো হয়।
যদিও পাটের উৎপাদন বেশী হয় পূর্ববঙ্গে, কিন্তু সব পাটকলগুলোই অবস্থিত কলকাতার দিকে নৈহাটি, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে, হুগলি নদীর গা ঘেষে।
নৈহাটি শিল্পাঞ্চলে পাটের কলযতীনবাবু একবার লিডওয়ার্ড সাহেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলে দু তিনটে পাটকল থাকলে, এত কষ্ট করে কাঁচামাল এখান থেকে কলকাতায় পাঠাতে হত না। সাহেব অনেক খবর রাখেন। তিনি বোঝালেন, চটকলে যে তাঁতযন্ত্র লাগে, সেগুলো অনেক বড় ও ভারী। সেসব যন্ত্রপাতি সমুদ্রগামী বড়জাহাজে করে আসে। ঐ রকম বড় জাহাজ ভিড়তে পারে কলকাতা বন্দরে। ব্রিটিশ আমলের কলকাতা বন্দর
আর পাট বিদেশে রপ্তানী করতেও কলকাতা বন্দরের সাহায্য নেওয়া হয়।
যতীনবাবু সকালবেলা এসে দাঁড়িয়েছেন বৈঠকখানার বারান্দায়। গোয়ালে দুধ দোয়াচ্ছিল হরকুমার। আজকাল দুটো গরু দুধ দিচ্ছে। একটার বকনা বাছুরটার বয়স মাসখানেক । তাকে একটু দূরে খুটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে জুলজুল চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার ভাগের দুধ দুইয়ে নিচ্ছে, তার করুণ চোখে সেটারই প্রতিচ্ছবি। যতীনবাবুর মায়া হল। তিনি বল্লেন -‘ অনেক দুধ দোয়াইসছ। এবার বাছুরটারে খুঁটি থিক্যা খোল। ওরে দুধ খাইতে দে’। একটা পাখির সুরেলা আওয়াজ পেলেন যতীনবাবু । গোয়ালঘর আর বারান্দার মাঝে একটা লেবু গাছ। তারই উপর বসে আছে হলুদবর্ণের পাখি। তার গলার কাছটা কালো।ঠোঁটটা হাল্কা লাল। যতীনবাবু পাখিটির নাম জানেন। ইষ্টিকুটুম পাখি। অনেকে একে বউ কথা কও বলেও ডাকে। বাড়ীর কাছে এ পাখির ডাক শোনা মানে কুটুমবাড়ীর কেউ আসবে। যতীনবাবুর নিজের পোষা পাখিগুলোর কথা মনে পড়তেই অন্দর মহলের বারান্দাতে খাঁচায় রাখা মুনিয়া পাখীর কথা মনে পড়ল। পাখিদের পাশে আরেকটা খাঁচায় কয়েকটা সাদা ইঁদুর আছে।
তিনি গতকালই সুন্দরকে বলে রেখেছেন নরসুন্দা নদীর ঘাটে যাবেন খোঁজ নিতে, কোন কোন কোম্পানি পাট কিনতে আসছে, তারা কবে আসবে, সেই বুঝে নদীপথে রামেশ্বরপুর থেকে পাট আনার বন্দোবস্ত করতে হবে। বাড়ীর লোকজন সবাই ঘুম থেকে উঠেছে। কিরণবালা এসে আশিসকে যতীনবাবুর কাছে দিয়ে গেলেন। কিরণবালার এখন অনেক কাজ। চায়ের পাটটা মালতী সামলাচ্ছে। পূজার সময় ঘরভর্তি লোক। তাদের সকালের জলখাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে। যতীনবাবু চিড়া-মুড়ি গোছের কিছু দ্ই বা দুধ ও কলা দিয়ে খান। বাকীরা সবাই ভাতের সঙ্গে সিদ্ধ দিয়ে খায়। তবে আজ হবে পাটপাতা ভাজা। পাটপাতাতে নানা রকম খাদ্যগুণ আছে আর খেতেও বেশ ভাল। আশিস টলমল করে সবে চলতে শিখেছে। তাকে পাশে বসিয়ে যতীনবাবু তার ট্যাঁকঘড়িতে দম দেওয়া শুরু করলেন। ঘড়িটা স্মিথস কোম্পানির।
যতীনবাবুর ঘড়িইংল্যান্ডে তৈরী। বছর তিনেক আগে শোনপুরে যাওয়ার সময় কলকাতা থেকে কিনেছিলেন। কুক এন্ড কেলভি চৌরঙ্গীতে ঘড়ির নামকরা দোকান। সাহেব সেলসম্যান। কার্টিয়ার কোম্পানির হাতঘড়িও ছিল। তবে দামটা অনেকটা বেশী বলে, ইচ্ছে থাকলেও, যতীনবাবু এই ঘড়িটা কিনলেন। সাহেব সেলসম্যান হিসাবে তুখোড় । যতীনবাবুকে বলেছিল- ‘বাবু, ইউ টেক দিস কার্টিয়ার ওয়াচ। পিপল এরাউন্ড ইউ উইল এপ্রিসিয়েট এন্ড এডম্যায়ার ইউ’। যতীনবাবু তাকে আর বলেননি যে সুদূর গ্রামবাংলার লোকেরা যারা অনেকে ঘড়িই চোখে দেখেনি, তাদের কাছে স্মিথস বা কার্টিয়ারের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। আশিস তক্তপোষ থেকে নেমে যেতে চাইছে। সে ঘরময় হাটবে। তাকে শান্ত করার জন্য , যতীনবাবু ঘড়িটা আশিসের কানের কাছে ধরলেন। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ আশিসের কাছে নূতন। সে অবাক হয়ে শুনছে ঘড়ির আওয়াজ।
সকালের জলখাবারের পর যতীনবাবু আর সুন্দরবাবু বেরিয়েছেন। সঙ্গে তাপসকেও নিয়েছেন। তাপস পরবর্তী প্রজন্মের প্রথম সন্তান। তার উপরেও বিষয়সম্পত্তির দেখভালের দায়িত্ব পড়বে ভবিষ্যতে। সেদিন অলক্ষ্যে বিধাতার নিষ্ঠুর হাসি, যতীনবাবুর চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। খলবলা বাজার পেরিয়ে ঘাটের অনতিদূরে শ্রী শ্রী কালীমাতার মন্দির।
খলবলা বাজারের কালী মন্দিরযতীনবাবু ছাতা মাথায় হাঁটছিলেন। আশ্বিনেও বেলা ১১টাতে সূর্যের বেশ তেজ। যতীনবাবু ছাতাটি বন্ধ করে মন্দিরের পাশের দোকান থেকে একটা জবাফুলের মালা কিনলেন। এখন আর পূজা দেওয়া যাবে না। দৈনিক পুরোহিত ভূদেব ভট্টাচার্য সকাল সকাল পূজা করে চলে গিয়েছেন । যতীনবাবু মালাটা কালীঠাকুরকে পরিয়ে দিয়ে নমস্কার করে, একআনা দানপাত্রে দিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাপসের আবার ঠাকুর দেবতার ভক্তি কম। সে বাইরে দাড়িয়ে দেখছিল দুটো ফিঙে পাখি মন্দিরের পাশে বিশাল জারুল গাছটায় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। কালো কুচকুচে পাখিটির লম্বা লেজটা কেমন মাঝখান থেকে চেরা।
বর্ষার পরপর ভরন্ত নরসুন্দা নদী কূল ছাপিয়ে বয়ে চলেছে। তবে এটা ছোট নদী বলে শান্ত, ছোট ছোট ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
এরকমই কোন নদী দেখে রবিঠাকুর লিখেছিলেন:-
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।.....
আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।
একদিকে বাঁধানো ঘাট। সেটা সাধারন লোক স্নান করা, কাপড় কাচার জন্য ব্যবহার করে, আর তার পাশেই পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী নৌকার ঘাট।
নরসুন্দা নদীর ঘাটবাঁশ ও গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরী। সাঁকোতে ঢোকার মুখে একটা চারিধার খোলা খড়ের ছাউনির ভিতরে, বাঁশের তৈরী বেঞ্চে বসে আছে ঘাটের ইজারাদার। পারাপারের জন্য লোকপিছু সিকি পয়সা নেওয়া তার কাজ। বস্তায় ধান, চাল, পাট ও অন্যান্য মালপত্র এলে আলাদা আলাদা রেট হিসাবে সে পয়সা নেয়। লোকটা যতীনবাবু ও সুন্দরবাবুর পরিচিত। ওর নাম নাজমুল। কয়েকটা মুটেও আশেপাশে রয়েছে। নাজমুল শশব্যস্তে উঠে এসে বল্ল- আদাব বড়কর্তা, পাটের ব্যাপারে খোঁজ লইতে আইসেন বুঝি ? যতীনবাবু বল্লেন - হ।
ঢাকা শহরে কিছু বম্বে ও লাহোর থেকে মুসলিম ও পার্শি ব্যবসায়ী বিজনেস শুরু করেছে। তারা পাট সংগ্রহ করে পৌছে দেয় জুটমিল গুলোতে। এদের মধ্যে ইস্পাহানি, আদমজি, রুস্তমজির নাম উল্লেখযোগ্য। নাজমুল বল্ল- ইস্পাহানি আর রুস্তমজী কোম্পানির লোকের এসে পড়েছে। কলিকাতা থেকে সাহেব কোম্পানির জুট মিলের গোরা অফিসার, তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে উঠেছে। নদীর অপর পারে বিষ্ণুপুর গ্রাম। সেখান থেকে একটা নৌকা এসে ঘাটে লেগেছে। আজ রায়ের বাজারে হাটবার। সবাই যাবে ওখান। একটি মহিলা নামল তার মাথায় বাঁশের তৈরী ঝুড়ি আর কুলো। একটি লোকের মাথায় মিষ্টির বড় হাড়ি। একজন দাড়িওয়ালা মুসলিম লোকের বেতের চওড়া ঝুড়িতে কয়েকটা হাঁস মুরগী নিয়ে চলেছে। তরিতরকারী নিয়ে যাচ্ছে, এমন দুই তিন জনকে দেখা গেল।
যতীনবাবু নরেনকে বল্লেন- ‘তোর রামেশ্বরপুরে যাওন লাগে। ওই সুজন কর্মকার আর সুবোধ, ছাওয়াল দুইটাই বেবাক কাজের উপযুক্ত, হ্যাদেরকে সব বুঝাইয়া নৌকায় মাল আননের ব্যবস্থা করতে হইব। তাপসরেও লইয়া যাইবি। ফটন যদি আইস্যা পড়ে তবে তারেও লইয়া যাইও’।
ক্রমশঃ
ধূসর অতীত পর্ব ১৮
যোগীন্দ্র মোহন ওরেফে ফটন দাড়িয়ে আছেন তার কোয়ার্টারের বারান্দায়। জায়গাটা আমচং টি এস্টেট,
খাসি পাহাড়ের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে। পাহাড়ের ঢাল ধীরে ধীরে নেমে গিয়েছে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাতে। দক্ষিনদিকটায়, চা বাগানের কাঁটাতারের বেড়া পেরোলই ঘনজঙ্গল। ভৌগলিক কারণে খাসি পাহাড়ে মৌসুমী বায়ু অতি সক্রিয় হয়ে বৃষ্টি ঘটায় আর তার জন্য এই ঘন জঙ্গল। বাঘ, হাতী, হরিণ সব ধরনের বন্য জন্তুর বাস এই জঙ্গলে। দলছুট হাতি বা বাঘের উপদ্রবের ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে থাকে। ফটনের চাকরী হয়ে গেল পাঁচ বছরের বেশী। ছোটবেলা ও স্কুলজীবন কেটেছে আঠারবাড়ীতে। সেই জায়গাটা সমতলভূমি, সবুজ ধানক্ষেত ও নদীনালা বেস্টিত। এই আমচং জায়গাটার সঙ্গে মিল নাই। এখানে পাহাড়ের ঢালে ঘনসবুজ হাঁটু উচ্চতার চা বাগান একরের পর একর বিস্তৃত। দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা আর দূর চক্রবালে পাহাড়ের সারি মিশে গিয়েছে আকাশে খেলা করা মেঘের আলয়ে। প্রকৃতির এই দুটি রূপই সুন্দর। আঠারবাড়ী যদি হয় গৃহস্থবাড়ীর নাকে নথ আর কানে দুল পরা ষোড়শী কন্যা তবে আমচুং যেন চঞ্চলা বনবালিকা, মাথায় তার পাখির পালক আর গলায় যুঁই ফুলের মালা। ফটন চাকরীতে জয়েন করার আগে কোচবিহারের কলেজে পড়াশুনা করেছেন। সেখানে কাছাকাছি চাবাগান ছিল। কিন্তু চাকরী করতে এসে প্রথমবার তিনি চা শিল্পের বিশাল কর্মকান্ডের পরিচয় পেলেন। প্রথম ছমাস ট্রেনিং পর্বে, চা গাছের পরিচর্যা থেকে শুরু করে চা পাতা তোলার পদ্ধতি, ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতির সম্যক জ্ঞান, কোয়ালিটি ল্যাবে চা পাতা টেস্টিংএর কার্যপ্রণালী, এইসব কিছুর ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ হল।
এই কোয়ার্টারটা নূতন। একটা টিলার উপরে অনেকটা জায়গা নিয়ে। কিছুদিন আগে পদোন্নতি হয়ে এসিসট্যান্ট ম্যানেজার হয়েছেন। এতবড় কোয়ার্টারে একা থাকা কষ্টকর। খিদমতগারের অভাব নেই। চাপরাশী, বাবুর্চি, মালি সবই আছে।পুরানো কোয়ার্টার থেকে শিউলির চারা আর একটা লেবুর কলম নিয়ে এসেছিলেন গতকাল। মালি সকালে সেটাই লাগাচ্ছে। এইবার শীতে গাঁদা আর দোপাটির চারা লাগাবেন ভেবে রেখেছেন।
দুর্গাপূজার সময় এবার ছুটি পান নি। চা বাগানের দুই মালিক জেমস স্টুয়ার্ট আর মরগান সাহেব এসেছিলেন বাগান দেখাশোনার কাজে। এই টি এস্টেটের সর্বময় কর্তাও ইংরেজ। বছর খানেক আগে সেজ-দাদা, সুন্দর এসেছিলেন বেড়াতে। সেইসময় আপার আসামের টোকলাই টি এস্টেট থেকে বেড়াতে এসেছিলেন মিস্টার মরগ্যান। তিনি আমচংএর ম্যানেজার হাইড সাহেবের বন্ধু। মরগ্যান সাহেবের একদিন ইচ্ছে হল শিকারে যাবেন। তিনি সকাল সকাল এসে হাজির ফটনের কোয়ার্টারে। সুন্দর সব শুনে টুনে বল্লেন-‘আজকে যাওয়া উচিত হবে না। পাঁজিতে বলছে আজ ‘মঘা’। শুভকাজে ‘ত্রিপাদ’ দোষ। সাহেব কি আর পাঁজির গূড়তত্ব বোঝেন? তিনি ঝুলোঝুলি করতে থাকলেন যাবার জন্য। অগত্যা তিনজন মিলে বেরোলেন শিকারে। সঙ্গে চার পাঁচজন কুলি লাইনের লোক। সাহেবের কাছে একটা বন্দুক আর ফটনেরও নিজস্ব বন্দুক। বুট,হ্যাট ইত্যাদিতে সজ্জিত হয়ে বেরিয়েছেন। তবে সেদিন কপাল খারাপ। বাঘ তো দূরের কথা, একটা হরিণেরও দেখা মিলল না। বনমুরগীগুলোও সব হাওয়া। একটা ফেজেন্ট দেখে সাহেব বন্দুক তাক করেছিলেন, কিন্তু সেটা গুলি করার আগেই উড়ে গেল। কি আর করা যায়। ঘন্টা কয়েক পরে ফেরার রাস্তা ধরলেন। জঙ্গলের দু একটা জায়গাতে মাচান বানান ছিল। সাহেব হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। একটা মাচান দেখে বল্লেন-‘লেট আস ক্লাইম্ব আপ এন্ড ওয়েট সাম টাইম ফর এ প্রে’ নরেন আর ফটনের ফেরার ইচ্ছে, খিদেও পেয়েছে। কিন্তু সাহেব গেস্টকে না বলা ভাল দেখায় না। সাহেব কাঠের বানানো সিঁড়ি দিয়ে কয়েকপা উঠেই ‘মাই গুডনেস’ বলে চিৎকার করে তলায় মাটিতে এক ঝাপ। ‘গেট আউট অফ হিয়ার’ বলে উর্ধশ্বাসে দৌড়। বেশ কিছুটা দূরে এসে সাহেব জানাল, মাচানের উপর একটা বাঘ শুয়ে ঘুমাচ্ছিল। ‘উই আর লাকি টু এসকেপ’। বাসায় ফিরে সাহেবের খেয়াল হল সুন্দর কি একটা দেখে বলেছিলেন না যাওয়ার জন্য। সাহেব এবার ‘মঘা’ সম্বন্ধে বিশদ খোঁজ খবর নিলেন। ফটনবাবু ঘরে গিয়ে লাল পাঁজিটা নিয়ে এলেন, সাহেবকে বোঝাতে। যাওয়ার সময় সাহেব বলে গেলেন, এরপর কখনো শিকারে গেলে তিনি পাঁজি দেখে তবেই বেরোবেন।
চা বাগানের পরিবেশ চাকরীর শুরু থেকেই যোগীন্দ্রবাবু বাবুর পছন্দ। একটা ছন্দে ফেলা জীবন। শহরের মত হুড়োহুড়ি নেই। অফিস, ফ্যাক্টরি সবই হাতের কাছে। চা পাতা তোলার কাজ সকাল থেকেই শুরু হয়।
মদেশীয়া মেয়েরা চা পাতা তুলে ওজন করাতে নিয়ে যাচ্ছেপাতা তোলার কাজটা মদেশীয়া মেয়েরাই করে থাকে। প্রথম প্রথম যোগীন্দ্রবাবু অবাক হয়ে চেয়ে দেখতেন কি নিপুণ হাতে তারা ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চা পাতা তোলে।
সন্ধ্যার পর পাহাড়ের নীচের দিকে সার দেওয়া কুলিলাইনের বস্তি থেকে মাদল আর গানের আওয়াজ ভেসে আসে। নিস্তব্ধ এই জায়গায়, যোগীন্দ্রবাবুর সঙ্গী বই। গতবার আঠারবাড়ী থেকে ফেরার সময়, গৌহাটি থেকে মুলক্ রাজ আনন্দের ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ বইটা কিনে এনেছিলেন। আসল বইটা হিন্দিতে। খুব জনপ্রিয় হওয়াতে সবে বাংলা সংস্করন বেরিয়েছে। সদ্য বইটা পড়ে তিনি চাবাগানের ব্রিটিশ মালিকদের অত্যাচারের কাহিনী জানলেন। আপাতদৃষ্টিতে এই হাসিখুশী সরল কুলিদের জীবেনযাত্রার মধ্যে যে কত বেদনা লুকিয়ে আছে, কত কষ্ট, কত অশ্রুধারা বয়ে গিয়েছে তা জানতে পেরে তার কোমল অন্তরে আঘাত হানল।
ইতিহাস বলে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চীন থেকে চা গাছ আনা হয় আপার আসামে। তার আশপাশ দিয়েই প্রথমদিকে চাবাগানগুলো গড় ওঠে। আসামের আবহাওয়া ও পাহাড়ী ঢাল চাবাগান করার জন্য উপযুক্ত। কিন্তু জঙ্গল না কাটলে বাগান কি করে তৈরী হবে। তাই শুরু হল দলেদলে শ্রমিক ধরে আনা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বেশীরভাগ ছিল ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, ইউনাইটেড প্রভিন্স বা অন্ধ্রপ্রদেশের অদিবাসীরা। সিপাহী বিদ্রোহের পরে, ইংরেজরা বিশাল হারে রেললাইন পাতার কাজ শুরু করেছিল, যার একটা কারণ ছিল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে যাতে তাড়াতাড়ি সৈন্য ও মালপত্র পাঠান যায়। অনেক শ্রমিক যারা রেললাইন পাতার কাজ করছিল তারাও দলে দলে এল চা বাগান তৈরীর কাজে। শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডের মত অসুখে, সংখ্যাতত্বের মতে ১৯১৭ থেকে ২০র মধ্যে বছরে বিশহাজার করে শ্রমিক মারা যাচ্ছিল।সারা পৃথিবী জানে, অমেরিকায় তুলোর আবাদে, কি পরিমাণ অত্যাচারিত হতে হত নিগ্রো ক্রিতদাসদের। কিন্তু এই সহজ সরল বিভিন্ন জায়গার লোকগুলি, যারা এখন জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে পরিচিত ‘কুলি’ হিসাবে, তাদের বঞ্চনার খবর, বিশ্ব তো দূরের কথা, এই উপমহাদেশের কজনই বা জানে।
মুলক রাজ আনন্দ না লিখলে ফটনও জানতে পারত না। ব্রিটিশ মালিকদের অত্যাচারে ১৯২১ সালে দলকে দল কুলি বরাক ও সুরমা উপত্যকার চাবাগান থেকে বেরিয়ে পরে দেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশে। কিন্তু চা-বাগানের মালিকেরা, রেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ট্রেনের টিকিট কাটতে দেয় না। তখন শ্রমিকরা পায়ে হেটে গোয়ালন্দ ঘাট পৌছায়, স্টীমারে উঠতে। তখন পুলিস তাদের বাধা দেয়। গুলিতে বহুমানুষ হতাহত হয়। কুলিদেরকে বাধ্য করা হয়, চা বাগানে ফিরে যেতে। আজ থেকে মাত্র বিশ বছর আগের ঘটনা, কিন্তু ফটনবাবু জানতেন না। ফটনবাবু ঠিক করলেন, অন্তত তিনি যতদিন চাবাগানে কাজ করবেন, কুলি, কামিনরা যাতে উপরওয়ালার কাছ থেকে সহৃদয় ব্যবহার পায়, তার চেষ্টা করবেন।
আজকে কুলিদের ‘পে-ডে’। মদেশীয়া মেয়েরা সব গোল হয়ে একজায়গায় দাড়িয়ে, হাসিতে গল্পে মশগুল। সমান্য কটা মাত্র টাকা। তারা জানে না, তাদের শ্রমের সঠিক মূল্য মালিকপক্ষ কখনই দেয় না। তারা জানবেই বা কোথা থেকে। কুলিলাইনেই তাদের জন্ম, ছোট বাচ্চাকে, বুকের কাছে কাপড়ে বেঁধেই তারা চা-পাতা তোলে, ঘরের কাজ সামলায়। এই সমান্য কটা টাকায় সংসারের দৈনন্দিন খরচা মিটিয়ে, জামাকাপড়, শীতবস্ত্র কেনার টাকা কুলোয় না। তবুও তাদের সহজাত হাসিটা লেগেই থাকে। নিরক্ষর এই কুলিদের জীবন আবর্তিত হয়, চাবাগান আর বস্তির মধ্যে। এস্টেটের কাঁটাতারের বেড়াটার ওপাশে কি ঘটছে, তার খবর ওদের কে দেবে। চাবাগান তৈরীর সময়, ইংরেজরা, দলেদলে স্বল্পশিক্ষিত বাঙালীদের কুলিসর্দার ও অন্যান্য দেখভালের কাজে নিযুক্ত করেছিল। ‘বাবু যত বলে পারিষদদল বলে তার শতগুণ’ নীতিতে বিশ্বাস করে, কুলিদের নানা উপায়ে তারা ভীত রাখত।
প্রতিদিন সকালে মেয়েরা যায় মাথায় টুকরি নিয়ে, চা-পাতা তুলতে। চা পাতা তোলার সময় ঝুড়িটা নিয়ে নেয় পিঠের উপর। জমি থেকে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতার উপরে যে পাতাগুলি থাকে সেগুলি তোলাই নিয়ম। তাই দূর থেকে চাগাছগুলিকে সবসময় একই উচ্চতার লাগে। বিকালে পাতা তুলে তারা মাথায় করে টুকরি সুদ্ধ ঝুড়িটা নিয়ে আসে, বাগানের কাছাকাছি নির্দিষ্ট জায়গায়। পাতা ওজন করে প্রত্যেক কুলির নামের পাশে লেখা হয় তার ওজন। তারপর তারা সেই ঝুড়িটা নিয়ে, গরুড়গাড়ীতে পাতা স্থানান্তরিত করে। এরপর তাদের ছুটি। মাইনে হয় চা-পাতার ওজনের ভিত্তিতে। যোগীন্দ্রবাবুকে সুপারভাইজ করতে হয়। পেমেন্ট করেন ক্যাশিয়ারবাবু। এদিনটা হাটবার হয়। বিকালে সব মেয়েরা দলবেধে যায় হাটে। মেয়েদের প্রসাধনের ইচ্ছে যে চিরন্তন সেটা বোঝা যায় যখন তারা ভীড় করে চুড়ি, নাকছাবি, হার, দুলের দোকানে। ছেলেদের ভীড় মদের ভাটিতে। তারা মাইনের অনেকটাই খরচা করে সেখানে। মাঝে মাঝে তাদের ঝগড়া পৌছে যায় হাতাহাতিতে। ফটনবাবুর উপরে তাদের অনেক আস্থা। ফটনবাবুকে অনেকসময় তাদের ঝগড়া মেটাতে হয়।
একবার এরকমই একটি ঘটনা। কুলীলাইনের ছেদীলালের বৌ সিমকি। ছেদীলাল প্রৌঢ়, অর্ধেক সময় নেশা করে। সিমকি সুন্দরী ও অল্পবয়সী, তার বাবা অনেকটাকা নিয়ে ছেদীলালের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল । সে একদিন বরের ঘর ছেড়ে একটি ছেলে, নাম ছগন, তার সাথে পালিয়ে গেল। পরে খবর পাওয়া গেল ছগন আর সিমকির মধ্যে অনেকদিন ধরে আসনাই চলছিল। একসপ্তাহ পরে সিমকি ছগনের হাত ধরে ফেরত এল। তারা গৌহাটির কামাখ্য মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করে এসেছে। সিমকির মাথায় গাড় সিঁদুরের প্রলেপ। পরনে নূতন শাড়ী। কুলি লাইনে এই নিয়ে রীতিমত হইচই। বয়স্করা বলছে , এতো অনাচার, সমাজের চোখে অন্যায়, এই মুহুর্তে ওদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হোক। কেউ কেউ আবার ছগনের পক্ষে। তার মধ্যে বেশ কয়েকজন ছগনের বন্ধুস্থানীয়। মীমাংসা কিছুতেই হয় না। শেষপর্যন্ত মাতব্বররা ধরে নিয়ে এল ফটনবাবুকে, একটা মীমাংসা করে দেওয়ার জন্য। চারিদিকে উত্তেজিত জনতা। সবাই জটলা করে আছে। ফটনবাবু এসে দেখলেন সিমকির চোখ লাল। নিশ্চয়ই কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়েছে। যোগীন্দ্রবাবু মাথায় এলো না এরকম একটা কেস, তিনি কি করে মেটাবেন। মারামারি বা এমনি ঝগড়ার ঘটনা দুপক্ষকে বুঝিয়ে শান্ত করা যায়। কিন্তু এখানে কার পক্ষ নেবেন। যাই হোক ছেদীলাল প্রথমে শুরু করল-‘স্যার, সিমকি আমার বিয়ে করা বউ। ওকে আমার সঙ্গে থাকতে হবে’ যোগীন্দ্রবাবু সিমকিকে জিজ্ঞাসা করলেন-‘ তুই তো ছেদীলালের বিয়ে করা আওরত, তুই কি করে আরেকটা বিয়ে করিস। নায্য মতে তোর ছেদীলালের কথা শোনা উচিত। সিমকি দুদিকে মাথা ঝাকিয়ে বল্ল-‘কক্ষনো থাকব না। ও আমাকে মারে, সব টাকা মদের পিছনে উড়িয়ে দেয়। জিজ্ঞাসা করুন তো ওকে, আজ পর্যন্ত কটা শাড়ী আমাকে কিনে দিয়েছে। আমার বাবা, পয়সা লিয়ে, আমার কুন কথা না শুনে আমার বিয়ে দিয়েছে। আমি ছগনকে ভালবাসি। আমি ওর সঙ্গে থাকব’। যোগীন্দ্রবাবু পড়লেন মহাসমস্যায়। ভাবছেন কি করা যায়। ছেদীলালকে বল্লেন-‘ও বলছে তোকে ভালবাসে না, আজ ধর আমি জোর করে ওকে তোর বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম, দুদিন পর যদি ও আবার পালিয়ে যায় তখন কি হবে। ছেদীলাল মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবতে লাগল, কি বলবে। যোগীন্দ্রবাবু তখন বললেন- ‘তুই তো শুনেছি অনেক টাকা দিয়েছিলি সিমকির বাবাকে। ধর, ছগন যদি তোকে টাকাটা দিয়ে দেয় তবে কেমন হয়।’ সবাই মাথা নাড়ল এরকম একটা উপায় শুনে। ছগন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল ‘আমি জানি ও পাঁচকুড়ি টাকা দিয়েছিল। আমি ওকে ছকুড়ি টাকা দেব যদি ও সিমকিকে ছেড়ে দেয়। ছেদীলাল আমতা আমতা করে মীমাংসাটা মেনে নিল। ফটনবাবুও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। এরপর কুলি লাইনে যোগীন্দ্রবাবুর জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল।
ইংরেজ কালচারে ক্লাব হাউসের মাহাত্ব্য অনেক, বিশেষত চা-বাগানের মত নির্জন জায়গায়। সন্ধ্যার পর সব অফিসার শ্রেনীর লোকেরা জমায়েত হন গল্পগুজব করতে। সঙ্গে অবশ্যই থাকে মদ্যপান। তাস, বিলিয়ার্ড, ক্যারাম এগুলো ইনডোর গেম। শীতকালে নেট টাঙিয়ে খেলা হয় ব্যডমিন্টন। ফটনবাবু মদ্যপান করেন না। প্রথমদিকে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে হুইস্কি খেয়েছিলেন, তবে স্বাদটা মোটেই ভাল লাগে নি। একবার বীয়ার খেয়ে তো মনে হয়েছিল চিরতা ভেজানো জল খাচ্ছেন। যোগীন্দ্রবাবু সিগারেটটা খুব খান। সিগারেট টানতে টানতে যখন ব্রীজ খেলেন, তখন তার মনে হয় বুদ্ধির গোড়ায় ধোয়া গিয়ে, মাথা সাফ হচ্ছে।
ফটনবাবু আজকাল চা বাগানের ইতিহাসের উপর পড়াশুনা করছেন। দুটো বইও আনিয়েছেন গৌহাটী থেকে। ইংরেজরা প্রথম যে চা বাগান তৈরী করে ১৮৫০ সালে তার নাম সিনামোরা। কুলিদের দিয়ে প্রথমে ঘন জঙ্গল কেটে বাগানের জমি তৈরী করা।
কাজটা সহজ ছিল না। বড় বড় গাছ কেটে, মাটির তলা থেকে শিকড় বার করা খুবই কষ্টসাধ্য। এই কাজের জন্য হাতী নেওয়া হল। আসামের জঙ্গলে প্রচুর হাতি ছিল। এরপরের কাজ ছিল পুরো চা বাগানকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে ফেলা, যাতে বন্যজন্তু ঢুকতে না পারে। তারপর ছিল চা গাছের নার্সারি বানান।
চা গাছের বীজ প্রথমে জলে চুবান হত। যে বীজ জলের তলায় চলে যেত, সেগুলি নেওয়া হত নার্শারি বানাতে। সার লাগত না। রৌদ্রের হাত থেকে বাঁচাতে খড় দিয়ে ঢেকে রাখা হত। এক বছর গেলে পরে, শিশু চা গাছকে বাগানে স্থানান্তরিত করা হত। চা পাতা পাওয়া যেত, আরো পাঁচ বছর পর।
কারখানতে তৈরী হত দুরকম চা। একটা হচ্ছে সিটিসি, দেখতে গুঁড়ো গুঁড়ো। এই চায়ের লিকার ভাল হয়। অন্য চা টাকে বলে লিফ টি। এটা তৈরী করতে সময় বেশী লাগে। এতে ফ্লেভার ভাল হয়।
মজার কথা এই চা ইংরেজরা প্রথমদিকে বিনা পয়সায় বিভিন্ন জায়গায় সাধারন লোককে খাওয়াত। তারপর শুরু হল বিভিন্ন হাটে বাজারে, ফেরীঘাটে, রেলস্টেশনে বড় বড় বিজ্ঞাপন । তাতে লেখা থাকত-‘ইহাতে নেই কোন মাদকতা দোষ/ইহা সেবনে চিত্ত হয় পরিতোষ।’ বিজ্ঞাপন সচিত্র হত, তাতে চা বানানোর পর পর ধাপ গুলি দেখানো থাকত। এই ভাবে, ধনী, গরীব নির্বিশেষে আপামর ভারতবাসীর রান্নাঘরে জায়গা করে নিল চা। লোকজন অভ্যস্ত হয়ে পড়ল ‘বেডটি’ তে। চা শিল্পের রাজস্বে ভরে উঠল বিদেশী কোষাগার, আর ঘাম ঝরাল মদেশিয়া কুলিরা।
আসামের চা বাগানে ইংরেজ মালিকের পরিবার
চা বাগানে দুর্গাপুজার সময়টা ভালই কাটল। বাঙ্গালী যারা পরিবারসহিত থাকেন, তারা প্রতিবছরের মত এবারেও খুব ধুমধামের সঙ্গে পূজা করলেন। কালিপূজার সময় পনের দিনের ছুটি মন্জুর হয়েছে। অফিসার্স ক্লাবে নিয়মিত নিউজপেপার আসে। ছাত্রজীবনে ফটনবাবু জড়িয়ে ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনে। তখন চোখে স্বপ্ন ছিল ভারতমাতাকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি দেওয়া। নেতাজীর ঘনিষ্ঠরা এসেছিলেন কোচবিহারে ১৯৩৭ সালে। তার পরের বছর হরিপুরাতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নেতাজী। ১৯৩৯ এ ত্রিপুরীতে পার্টি নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, গান্ধিজীর মনোনীত প্রার্থীকে পরাজিত করে। এটি গান্ধিজী নিজের ব্যক্তিগত পরাজয় বলে ধরে নিলেন। গান্ধীজির অনুগামীরা সব একে একে ওয়ার্কিং কমিটি থেকে সরে এলেন। নেতাজী কংগ্রেস পার্টি ত্যাগ করে গঠন করলেন ফরোয়ার্ড ব্লক। নামেই বোঝা যায় তিনি দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলায় বিশ্বাসী । নেতাজী মনে প্রানে বিশ্বাস করেন এই ইংরেজ শাসনের অচলায়তন সরাতে দরকার সশস্ত্র বিপ্লব। বাংলার তরুণ সম্প্রদায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠল নেতাজীর ভাবধারায়। বাঙ্গালী বিপ্লবীরা চিরকালই ইংরেজ শাসনযন্ত্রের চোখের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির আদেশ, অনেক যুবককে অকৃষ্ট করেছিল সশস্ত্র বিপ্লবের। ফটনও ছিলেন এই দলের। প্রত্যক্ষ সংগ্রামে না হলেও পরোক্ষে মদত জুগিয়েছেন। সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কলকাতায় গিয়েছিলেন। তখন শ্রদ্ধানন্দ পার্কে গিয়েছিলেন নেতাজীর ভাষন শুনতে। ওই সভার পর থেকেই মনে মনে ফটনবাবু নেতাজীর ভক্ত হয়ে পড়েন। কলেজে থাকাকালীন প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহন করে জেলেও কাটিয়ে এসেছেন কিছুদিন। রাতের ট্রেন ছাড়বে গৌহাটি থেকে। পরদিন সকালে পৌঁছাবেন পার্বতীপুর। তারপর স্টিমারে ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে রেলগাড়ীতে ময়মনসিংহ। ময়মনসিংহ থেকে আবার ভৈরবগামী ট্রেন ধরে আঠারবাড়ী । দূরের পথ। সঙ্গে ছোট একটা তোরঙ্গ আর হোল্ডল। হোল্ডল লাগবে রাতে শোয়ার জন্য।
গৌহাটি স্টেশনে ফটনবাবুর হাতে অনেকটা সময় ছিল, ট্রেন ছাড়ার আগে। তিনি ঢুকলেন হুইলারের বইএর দোকানে।
একটা বই নিলেন এক সাহেবের লেখা ‘ দিগ্রেট থেফ্ট এন্ড হিস্টরি অফ ইন্ডিয়ান টি’। ট্রেনে সহযাত্রী এক মাড়োয়ারী, নাম খেমকা। তিনি গৌহাটি এসেছেন চায়ের নিলামের খোজ খবর করতে। আজকাল ধীরে ধীরে চা এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বড়লোকদের সকালে ব্রেকফাস্ট টী থেকে, চা এখন হয়ে উঠেছে আম জনতার জনপ্রিয় পানীয়। তিনি বল্লেন আজকাল সব রেল স্টেশনে চা এর স্টল খুলে গিয়েছে।
বড় বড় করে বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে, চা উপকারি স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য। ছবি দিয়ে চা বানাবার পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। খেমকাবাবুর কলকাতার বড়বাজারে রং এর দোকান। তিনি সঙ্গে এবার চায়ের ব্যবসা শুরু করবেন।
সীটে গুছিয়ে বসে, ফটনবাবু সদ্য কেনা বইটা পড়া শুরু করলেন। বইটা চা এর উপর একটা প্রমান্য দলিল বলা যায়। যোগীন্দ্রবাবু একনিশ্বাসে বইটা শেষ করলেন। ইচ্ছে হল নবলব্ধ জ্ঞান খেমকাবাবুকে শোনান। পরে মত পরিবর্তন করলেন কারন তার মনে হল এই ব্যবসায়ী মানুষটি চা কে টাকা কামাবার উপায় হিসাবে দেখছে। সে কি করে চা এর ইতিহাসের সমঝদার হবে। তবে খেমকা তাকে নিজে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘ কি ভাই- এত মন দিয়া কি পড়িতেছিলেন? ফটনবাবু সংক্ষেপে তাকে চায়ের ইতিহাস শোনালেন নিম্নরূপে।
ভারতে চায়ের ইতিহাসটা খুবই ইনটারেস্টিং । চা খাবার চল চায়নাতে তিনহাজার বছর ধরে চলে আসছে। তখন সেটা খাওয়া হত ঔষধ হিসাবে। বুদ্ধইসমের সঙ্গে সিল্ক রুট ধরে চা পৌছে যায় ইউরোপে। এরপর যখন ইউরোপিয়ান বণিকেরা এল তখন চায়না থেকে রপ্তানী হত মশলা, চা পাতা ও পোর্সেলিন এবং ভারত থেকে মশলা ও আইভরি। প্রথমে এসেছিল পর্তুগীজরা, ওরাই প্রথম চা নিয়ে যায় নিজেদের দেশে। এরপর আসে ডাচেরা। তারা চা খেয়ে এত ইমপ্রেসড হয় যে তারা ট্রেডিং হাউস খোলে জাভা-তে। ডাচ টি প্রথম লন্ডনে বিক্রি হয় ১৬৫৮ সালে। ইংল্যান্ডে বিশাল জনপ্রিয়তা পায় চা। ইংরেজরা প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে আনা চিনি ব্যবহার শুরু করে চায়ের সঙ্গে। ডাচরা তার আগেই শুরু করেছিল চায়ে দুধ মেশানো। কারন হিসাবে ধারনা যে তাদের expensive পোর্শেলিনের কাপে দাগ লেগে থাকবে। তখন ইংরেজ বণিকেরা LEVANT GROUP বা John Company , যেটা পরে চেন্জ হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খোলে। প্রথমদিকে তারা ডাচ কোম্পানি থেকে চা কিনে পাঠাত। পরে দেখা গেল বছরে ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডের চা ইমপোর্ট হচ্ছে। ইংরেজরা তখন চেষ্টা শুরু করল চা যদি এখানে ফলান যায়। শোনা গেল নর্থ ইস্ট আসামে সিংপো ট্রাইবরা চা পাতার মত কিছু ব্যবহার করে তরকারী বা চাটনিতে। ১৮২৩ এ এক সাহেব রবার্ট ব্রুস, সেই গাছ নিয়ে আসেন রিসার্চের জন্য। কিন্তু তখন চায়নার গাছকে চা গাছ ধরা হত। আসামের গাছ একটু অন্য রকম ছিল। তাই ডিক্লেয়ার হল যে আসামের গাছটা চা গাছ নয়, পরে সেটা ভুল প্রমানিত হয়।
এদিকে চায়ের ডিমান্ড ইংল্যান্ডে এত বাড়তে লাগল যে, ইংরেজ কোষাগারের সব সিলভার শেষ হতে লাগল। এদিকে চায়না তাদের চা শিল্পকে সিক্রেট করে রেখেছিল বিদেশীদের কাছ থেকে।চায়না তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ব্যাবসার মনোপলি দিতে মানা করে দেয়। তখন ইংরেজরা অন্য ফন্দী বার করে। তারা ভারত থেকে চায়নাতে আফিম পাঠাতে শুরু করে। সাধারন চাইনিজরা চা ছেড়ে আফিম দিয়ে নেশা শুরু করে। এর ফলে যে টাকা আসত সেটা চা কেনার জন্য ইংরেজরা খরচা করত। এরজন্য শুরু হয় Great opium war চায়না এবং ব্রিটিশদের মধ্যে।
তখন তৈরী হয় India Tea committee. কিন্তু তারা অনেক এক্সপিরিম্ন্ট করেও সাকসেস পায় নি। ১৮৪৮ সালে স্কটিশ সাহেব রবার্ট ফরচুন চায়না যান সিক্রেটলি এবং ওখান থেকে ভারতে চা গাছ চুরি করে আনেন। এটা পরিচিত The Great Theft নামে। তিনি চাইনিজের ছদ্দবেশে গিয়েছিলেন। তিনি চা বানাবার পদ্ধতিও শিখে আসেন।
প্রথমে সেই গাছ দার্জিলিং ও আসামে লাগান হয়। দার্জিলিং এ চায়ের ফলন ও কোয়ালিটি আশানুরূপ হলেও আসামে ফেল হয়ে যায়। তখন বোঝা যায় high altitude and low temperature suitable for Chinese tea plant. এরপর যেটা identify হয় সেটা হচ্ছে আসাম ট্রী যেটাকে চা গাছ ধরা হচ্ছিল না, সেটা আদতে চাইনিজ চা গাছের আরেকটা স্পিসিস। এটা suitable for high temperature and low altitude. তারপর চাইনিজদের থেকে চুরি করা টেকনোলজিতে আসামের গাছকে ট্রিম করে শুরু হয় আসাম টি এর উৎপাদন। পুরো কাহানী টা গোয়েন্দা গল্পের মত thrilling.
ক্রমশঃ



















Comments
Post a Comment