ধূসর অতীত ( মিনতি , লতিকা)
ডানদিকে যতীন্দ্র মোহন, মাঝখানে তপতী(ছোটমেয়ে) বামদিকেবড়মেয়ে আরতি। কলকাতায় লেকের পাশে টাইম ১৯৫৫/৫৬
ধূসর অতীত পর্ব ১২
মিনতি হল যতীন্দ্র মোহনের মেজকন্যা, তাপসের বোন। মিনতি আঠারবাড়ী পৌছে, প্রণাম পর্ব সেরে দৌড় লাগিয়েছে দুর্গাপূজার দালানের দিকে, যেখান ঠাকুর তৈরী হচ্ছে। সে পড়ে ক্লাস টুতে। এবছর সে বিদ্যাময়ীতে ভর্তি হয়েছে। মৃৎশিল্পী হরিপদ কাকা, মিনতিকে খুব ভালবাসেন। খুব ছোট্ট বয়েস থেকে, প্রতিমার কাঠামোর খড়বাধার সময় থেকে, মিনতি দিনে কয়েকবার করে আসত। মিনতির নিজেরও মাটি দিয়ে পুতুল বানাবার খুব শখ। তার উৎসাহ দেখে হরিপদবাবু তাকে হাতে ধরে শিখিয়েছেন, কি ভাবে ছাঁচ বানিয়ে, তারপর মাটি দিয়ে পুতুল বানায়। প্রথমদিকে মিনতি মাটি, ছাঁচ নিয়ে এসে তার মা কিরণকে দিত। মিনতির তৈরী পুতুলের চোখ, নাক, ঠোঁট কি করে সুন্দর করতে হয়, সেটা কিরণবালা দেখিয়ে দিতেন। কিরণ নিজেও ছাঁচ বানাতেন, যেটা তক্তি তৈরী করতে অবশ্য প্রয়োজনীয়। তার তৈরী ক্ষীরের তক্তি খুব সুস্বাদু। ছাঁচ কিভাবে আগুনে পুড়িয়ে করতে হয়, সেই বিদ্যে বড় মা (শাশুড়ী মা) মনোরমা দেবী তাকে শিখিয়েছেন ।
তক্তি বানাবার ছাঁচমিনতি দালানে গিয়ে দেখল, হরিকাকা এবার আসেন নি, অল্পবয়সী একটি ছেলে, আর একজন যোগানদার মিলে ঠাকুরের রং করছে। আগে আগে সে প্রত্যেকটা ধাপে ধাপে কাজ, খড় লাগানো থেকে শুরু করে, মাটি লাগানো, মুখ তৈরী, রং করা, সাজ পরানো, প্রতিটি পর্যায়ের শিল্পকর্মের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। সমান্য একতাল মাটি, কোন এক জাদুকরের হাতের ছোয়ায় ধীরে ধীরে চিন্ময়ী মাতৃ রূপ ধারণ করত, মিনতি বিষ্ময়বালিকা হয়ে সেই নান্দনিক ঘটনাসমূহের পূর্ণ আস্বাদন নিত।
একটু পরে দুপুরের খাওয়া হবে। তার আগে স্নান। মিনতির মনে হল জমিদার বাড়ীর পুকুরটা যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
জমিদারবাড়ীর সেই পুকুরলতিকা পিসি, মিনতির ছোটপিসি, মিনতির দাদা তাপসের প্রায় সমবয়সী। এই লতিকাই তাকে সাঁতার শিখিয়েছে। জমিদার বাড়ীর সংলগ্ন পুকুরে খালি যতীনবাবুর বাড়ীর লোকেদের প্রবেশাধিকার। ঘাটে অনকগুলি সিঁড়ির ধাপ নামলে তারপর পুকুর। প্রায় একতলা সমান উঁচু সিঁড়ি।জমিদার বাড়ীর পুকুরের বাঁধানো ঘাট। ২০১৪ সালে তোলা
ঘাটের পাশে একটা নৌকাও বাঁধা আছে। কখনো কখনো রাঙ্গাদি, মানে জমিদার গিন্নী নৌকাবিহার করেন পুকুরে। পুকুরের পাড় দিয়ে সারি সারি গাছ। একটা নিমগাছ ঘাটের কাছে হেলে আছে। তপ্ত দুপুরে ছায়া পড়েছে ঘাটে। আরতি, মিনতি, হেনা, মায়া এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে জমিদার তনয়ারা, তাদের নাম অমিয়া, উমা, কৃষ্ণা । তাদের পোষ্য দুটো কুকুরও আছে। কুকুরদুটি কলকাতা থেকে জমিদার পরিবারের সঙ্গেই এসেছে। একটা বড়সড় অ্যালসেশিয়ান, তার নাম বাদশা, আরেকটা পমেরিয়ান, তার নাম জুলি।
বাদশার ফটো
জুলি সাদা ধবধবে। জুলির সঙ্গে লতিকা, আরতি, মিনতির খুব ভাব হয়ে গেল। বাদশা, অপরিচিত মুখ দেখে বেশ উত্তেজিত। তার ঘেউ ঘেউ সমানে চলছে। তপতী সবে তিনবছরের। সে এমনিতেই বেশ ভীতু। বড়সড় চেহারার বাদশা আর তার হাঁকডাক শুনে, যারপরনাই শংকিত হয়ে, বড়দি আরতির আঁচলেটা শক্ত করে ধরে রেখেছে।অমিয়া বাদশাকে চেন টেনে ধরে রেখেছে। অমিয়ার হাতে একটা ডগবোন ছিল। সেটা সে দিল বাদশাকে খেলতে। বাদশাকে আর পায় কে। সে হাড্ডিটার পেছনে পড়ে গেল সব ভুলে। সামনের দুই পা দিয়ে, খুব নিবিষ্ট মনে ওটা মুখে নিয়ে চিবোবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। জমিদারের মেয়েরা সম্পর্কে যতীনবাবুর মেয়েদের পিসী। সাঁতার কাটার আগে ঘাটের পাশে বসে গল্প চলছে। জমিদার প্রমোদ রায়চৌধুরী যতীনবাবুর সম্পর্কে কাকা। যতীনবাবুর বাবা রজনী মোহনের মামাতো ভাই প্রমোদবাবু।জমিদার পরিবারসহ কলকাতার ভবানীপুরে নিজস্ব বাসাতে থাকেন। বছরে দুই তিনবার আসেন আঠারবাড়ীতে। যখন পরিবার নিয়ে আসেন, তখন দীর্ঘদিন থাকেন।
কলকাতা অনেক বড় শহর। তারই গল্প অমিয়া বলছে। তিন বোনই কলকাতার গোখেল মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলে পড়ে। কলকাতার হাওড়া ব্রীজ তারা দেখেছে। লোহা লক্কর দিয়ে তৈরী এতবড় ব্রীজ নাকি সারা বিশ্বে নেই।
লতিকা অবশ্য হাওড়া ব্রীজের ছবি দেখেছে। জমিদারের ভবানীপুরের বাড়ীতে মোটরগাড়ীও আছে। তাতে তিন বোন গড়ের মাঠে বেড়াতে যায়। কলকাতার মধ্যে ময়দান নাকি বিশাল জায়গা নিয়ে খোলা মাঠ। সাহেবরাও আসে। তারা ঐ বড় মাঠে গল্ফ খেলে। একটা ছোট্ট সাদা বলকে ছড়ির মত একটা ডান্ডা দিয়ে মেরে খেলা হয়।। সাবধানে হাটতে হয়। উমা পিসির চোখের সামনে একটা লোক হেটে যাচ্ছিল। বল এসে সোজা তার মাথায়। সে এক রক্তারক্তি কান্ড।গড়ের মাঠের একপ্রান্তে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। শ্বেতপাথরে তৈরী। কলকাতায় বিশ্বকর্মা পূজার দিন আকাশে অসংখ্য ঘুড়ি ওড়ে। ঘুড়িতে ঘুড়িতে প্যাচের লড়াই হয়। আরতি, মিনতিরা কোন দিন ঘুড়ি দেখে নি।
শীতকালে কলকাতার এলগিন রোডের পাশে জিমখানা গ্রাউন্ডে মস্ত তাবু টাঙিয়ে সার্কাস হয় আর তারপাশে হয় কার্নিভাল। রায়পরিবারের মেয়েদের কাছে শহর মানে মায়মনসিংহ। সেখান তেমন নামকরা অনুষ্ঠান কিছু হয় না, যেটা কিনা গর্ব করে বলা যেতে পারে। কলকাতায় কতরকম গাড়ী চলে। অমিয়া পিসি বলছিল গাড়ীর কোম্পানির নাম সব, শেভ্রলে, বুইক, ফোর্ড, ডজ, স্টুডিবেকার। সবই বিদেশী গাড়ী। সব শুনে রায়বাড়ীর মেয়েদের মনে হল কলকাতা এক স্বপ্নের শহর।
উমা কথায় কথায় বল্ল, তাদের ভবানীপুরে বাসার কাছে মনিমেলা হয়। রোজ বিকালে উমা যায় সেখানে। মেয়েরা খেলাধূলার সঙ্গে নানারকম হাতের কাজ, সূচীশিল্প ইত্যাদি শেখে। কলকাতায় পাড়ায় পাড়ায় মনিমেলার শাখা আছে। এই প্রতিষ্ঠানের পিছনে বিমল ঘোষ নামে এক ব্যাক্তি যুক্ত। তিনি অবশ্য ‘মৌমাছি’ নামেই বিখ্যাত।
ময়মনসিংহতেও মনিমেলার কেন্দ্র আছে। তপতী যতীনবাবুর ছোট মেয়ে। সে এমনিতেই খুব লাজুক। সে তার দিদি মিনতির কানে কানে বল্ল- ‘মেজদি, উমাপিসিকে বল না আমাদের আঠারবাড়ীতে মনিমেলার একটা শাখা খুলতে’। মিনতির কথাটা মনে ধরল। ঠিক করল সময় করে অমিয়া কি উমাকে বলবে,তারা যদি আঠারবাড়ীতে মনিমেলার শাখা খোলার জন্য জমিদারমশাইকে বলে সাহায্য করতে পারে। মনিমেলার শিশুদের শরীরচর্চা
দুপুরের খাওয়া হয়ে গিয়েছে। মিনতি খেয়েদেয়ে লক্ষ্য রাখছে কখন বড়মার খাওয়া হয়। সেই ময়মনসিংহ শহরে যাওয়ার পর থেকে তার কুলের আচার খাওয়া হয় নি। আচারের ডিপার্টমেন্টটা বড়মার। আচার তিনিই তৈরী করেন। তার ঘরে উপরের তাকে কুলের, তেতুলের, লেবুর আচার, বেলের মোরব্বা ইত্যাদি রখা থাকে। বড়মা হাতমুখ ধুয়ে আসতেই মিনতি তাকে বায়না করেছে আচার দিতে। বড় মা বল্লেন- ‘ছেমড়ির দেখি তর সয় না, দাঁড়া আগে পান খাই’। তিনি হামানদিস্তায় পান ছেঁচে খান। সেই পর্ব শেষ হওয়ার পর আচার পাওয়া গেল। সবুরে মেওয়া ফলে। বড়মায়ের হাতটিও বড়। তিনি বেশ একহাতা আচার তুলে দিলেন মিনতিকে।
কাল মহালয়া। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়া দরকার। আরতি, মিনতি, আশিস, মায়ের সঙ্গে শোয়। তপতী আবার শিশুকাল থেকে, বড়মার ভক্ত। ১৯৩৮ এ যখন রজনী মোহন দেহত্যাগ করেন, ঐ সময়ে, তপতীর জন্ম। স্বামীর মৃত্যুর পর, বড়মা, কিছুটা শোক ভোলার জন্য, তপতীর সর্বক্ষনের দেখভালের দায়িত্ব তুলে নেন। সেই থেকে, তপতীর রাতে বড়মার কাছে ঘুমানো অভ্যাস।
তপতীর যখন বছর খানেক বয়েস, সেইসময় বড় মা হঠাৎ করে ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়েন। সময়টা বর্ষাকাল। জ্বর বাড়তে থাকে। প্রথমদিকে, আঠারবাড়ীর ডাক্তার দেখছিলেন। কিন্তু অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। পেটে অসহ্য যন্ত্রনা। দুর্বল হয়ে পড়ছেন, খাওয়াতে অরুচি, যাই খান, তাই বমি হয়ে যায়, নচেৎ পেট ছেড়ে দেয়। ঈশ্বরগঞ্জ থেকে এক ডাক্তারও দেখলেন। তিনি জানালেন, এ সাধারণ অসুখ নয়। ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে তিনি, যতীনবাবুকে আলাদা করে ডেকে বল্লেন- ‘ম্যানেজার বাবু- ‘রোগীর অবস্থা তো ভাল দেহি না, এতদিন ধইরা উনি অসুস্থ, তার উপর সময়টা বর্ষাকাল, সব লক্ষন দেইখ্যা লাগত্যসে টাইফয়েড’। যতীনবাবু জানেন, টাইফয়েড খুব মারাত্মক অসুখ, এখনও এই রোগের ঔষধ, এলোপ্যথিক চিকিৎসাতে নাই। বাড়ীসুদ্ধ সকলে চিন্তিত, রোজকার চেনা ছন্দের অভাব। কিরণ, মালতীর নিরন্তর সেবাশুশ্রুষাতে কোন উপকার নাই। ধীর ধীরে বড়মা নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন। চেতনা অবচেতনার মধ্যে আনাগোনা। সকালবেলা আঠারবাড়ীর ডাক্তার নাড়ী পরীক্ষা করে জবাব দিয়ে গেলেন। মানুষ বিপদে খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চায়। অবিনাশ কবিরাজ, সে তল্লাটের নামকরা ধ্বনন্তরী। কিন্তু তার নিবাস কিশোরগন্জে। শেষ চেষ্টা। তাপস আর তার গোরাকাকা, জমিদার বাড়ীর ঘোড়ার গাড়ী নিয়ে চল্লেন কবিরাজের সন্ধানে। ঘন্টাদুয়েকের মধ্যে অবিনাশ কবিরাজ উপস্থিত। বড়মার তখন যায় যায় অবস্থা। জিভে গঙ্গা জল দেওয়া হচ্ছে। অবিনাশ কবিরাজ, ঘর থেকে সবাইকে সরিয়ে দিলেন। রোগীকে পরীক্ষা করে, তার ব্যাগ থেকে, বিভিন্ন রকম জড়িবুটি, শিকড় বার করে, কিরণবালাকে বল্লেন- ‘এগুলি হামানদিস্তায় বেটে দিন মা, তাড়াতাড়ি করে’। তারপর সেই ঔষধ একটু একটু করে বড়মাকে জিভে ঠেকিয়ে খাওয়াতে লাগলেন। অবিনাশ কবিরাজ নাড়ী টিপে ধরে আছেন, মাঝে মাঝে সেই ঔষধ দিচ্ছেন। ঘরের বাইরে সব উৎকন্ঠিত মুখ। সময় কেটে যায়। যেন অনন্তকাল। অবশেষে, অবিনাশ কবিরাজের মুখে হাসি ফুটল। বড়মা চোখ মেলেছেন। বৃদ্ধ কবিরাজ যতীনবাবুকে জানালেন, ‘আর ভয় নেই, উনি বেঁচে যাবেন।সবার মুখে হাসি ফুটল, যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। কৃতজ্ঞ যতীনবাবু কবিরাজকে প্রণাম করলেন।’রাখে হরি মারে কে’, এই কথা আরেকবার প্রমানিত হল।
ধূসর অতীত পর্ব ১৩
আজ মহালয়া। কাল রাতে সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে। রাতের খাওয়া, গ্রামের অন্যান্য ঘরের মত আটটা নাগাদ হয়। পূজার সময় এখন সকলে একত্রিত। তাই খাওয়ার পর বেশকিছুক্ষণ গল্প করাটাই স্বভাবিক। কত কথা যে জমে থাকে দীর্ঘদিনের অদর্শনে। তবে আজ ভোর চারটে থেকে রেডিওতে মহালয়া অনুষ্ঠান। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র নামে এক ভদ্রলোক এই অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। বছর দশেক হল ঘন্টা দেড়েকের অনুষ্ঠান টি শুরু হয়েছে। বীরেনবাবুর জলদগম্ভীর কন্ঠে সংস্কৃত মন্ত্রপাঠে ও ফাঁকে ফাঁকে সুললিত আগমনী গান, দেবীর আবাহনের সূচনা করে। পিতৃপক্ষের পর শুরু হয় দেবীপক্ষ। আঠারবাড়ী লাইব্রেরীতে মাসিক বেতারজগৎ ও আসে। তাতে লতিকা পড়েছে, অনুষ্ঠানের কুশীলবরা, আধিরাত্রে স্নান করে, শুভ্রবস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পৌঁছে যান চারটের আগেই। লতিকাই সবাইকে ঠেলঠুলে তুলেছে। রেডিও চালানোটা অবশ্য যতীনবাবু বা তার ছোটভাইরা ছাড়া কাউর এক্তিয়ারভুক্ত নয়। লতিকা গিয়ে তার দাদা, গোরাকে ডেকে এনে রেডিও চালু করল। জমিদার বাড়ী থেকে উমাদিও এসেছে। দারোয়ান তাকে টর্চ নিয়ে পৌছে দিয়েছে। জমিদার মশাই ও পরিবার সাধারনভাবে কলকাতায় থাকেন। এই কারণে তাদের বাড়ীতে এখনো রেডিও নেই। গ্রামের আর কারো বাড়ীতে এবং রায়বাড়ীর বাকি শরিকদের- কারো বাড়ীতেই রেডিও নেই। গ্রামের অনেকের কাছেই যতীনবাবুর বাড়ী, ‘রেডিও বাসা’ নামে পরিচিত।
যতীনবাবুর সাধের রেডিও
আঠারবাড়ী পরিবার
রেডিও বেশ বড়সড় সাইজের, এরকম রেডিওকে বলে ভাল্ব রেডিও, ফিলিপস কোম্পানির তৈরী। চালানর পর সেটা গরম হতে একটু সময় নেয়। উঠানে একটা এরিয়াল টানানো। তাপস আই এস সি পড়ে। সে বিজ্ঞানের ছাত্র। সে ভাইবোনেদের বুঝিয়েছে, ইথার তরঙ্গের মধ্যে দিয়ে শব্দতরঙ্গ ভেসে আসে, সেটা এরিয়ালের মাধ্যমে পৌঁছায় রেডিওতে। ‘বারহাত কাকুড়ের তেরহাত বিচির’ মত রেডিওর সঙ্গে পেল্লাই সাইজের একটা ব্যাটারী। সেটা বেশ ভারী। মাসদুয়েক পরপর তাকে চার্জ দিতে হয়। প্রথমবার চার্জ দিতে পাঠাতে হয়েছিল ময়মনসিংহ শহরে। তবে ভাগ্য ভাল, যতীনবাবুর বাড়ীতে রেডিও আসার মাস চারেক পরেই জমিদার বাড়ীর জন্য এসে গেল জেনারেটর। সেই ডায়নামো যখন সন্ধ্যেতে চালান হত তখন ভারী ব্যাটারিটাকে ধরে নিয়ে যেতে হত চার্জ করাতে। তাপস খুব সাবধানী ছেলে। সে আগের দিন সন্ধ্যেবেলা, হরকুমার আর শশীকে দিয়ে ব্যাটারী ফুল চার্জ করিয়ে এনেছে। হরিদাসের সব ব্যাপারে খুব উৎসাহ। সেও সঙ্গে গিয়ে দেখে এসেছে ব্যাটারী চার্জ দেওয়া।
কয়েক বছর আগে যখন বাণীকুমার রচিত এই অনুষ্ঠান আকাশবাণীতে সম্প্রচারণ হচ্ছে, তখন কিছু রক্ষণশীল হিন্দুরা বিরোধিতা করেছিলেন এই বলে যে এক কায়স্থ চন্ডীপাঠ করছে, মুসলিম বাজনাদার যন্ত্র সংগীতে অংশগ্রহণ করছে, এসব শাস্ত্র বিরোধী। কিন্তু ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ ততদিনে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছ, যে, এসব রক্ষণশীল মনোভাব ঝড়ের মত ফুৎকারে উঠে গেল। মায়া, হেনা, আরতি, মিনতি, লতিকা,দীপ্তি সব উঠে পড়েছে। রীণা, তপতী ছোট, তাদের অত উৎসাহ নেই। যতীনবাবু ও তার সেজ-ভাই নরেন শুনছেন। স্তোত্রপাঠের গমগম আওয়াজে, চারিপাশের উষালগ্নের শান্ত সমাহিত পরিবেশ ভেদ করে, আগমনী গানের মূর্ছনা বয়ে নিয়ে আনছে শক্তিরূপিনী দুর্গামাতার আবির্ভাব। স্তবগান শেষ হল, যতীনবাবু তার ট্যাঁক ঘড়ি দেখলেন, ভোর সাড়ে পাঁচটা। বাইরেটা ফর্সা হয়ে আসছে, পাখির কূজন, একটা মোরগ ডেকে উঠল। বাইরের আঙিনাতে একটা শিউলি ফুলের গাছ আছে। শিউলির গন্ধ যতীনবাবুর ঘ্রানে প্রবেশ করল। পিতৃপক্ষের এই শেষদিনটিতে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ করা হিন্দুদের একটি অতি প্রাচীন রীতি। বংশের জেষ্ঠ্য সন্তান হিসাবে, এই দায়িত্বটি যতীনবাবু পালন করে আসছেন বহু বছর। ধুতির উপর একটা উত্তরীয় চড়িয়ে, তার দুই ভাগ্নে, হরিদাস আর দুলালকে ডেকে দিতে বল্লেন কিরণবালাকে। বড়মা উঠে পড়েছেন ঘুম থেকে। দুর্বাঘাস, ফুল, পিন্ডদানের ফলমূল, ধুপকাঠি, ঘন্টা একটি থালায় সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। পদ্মফুল কালই শশীকে দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে বাগিচা পুকুর থেকে। খড়মটা পায়ে গলিয়ে যতীনবাবু বেরোলেন, পিছনে হরিদাস আর দুলাল সব পূজাসামগ্রী নিয়ে আসছে। ঘাটে আশেপাশের আরো কয়েকজন, পোস্টমাস্টার, ডাক্তার, এম সি স্কুলের দুজন মাস্টার মশাই ও আছেন।
নীলাকাশে শরতের পেজা তুলোর মত যত্রতত্র মেঘ, আউষের ক্ষেতে বাতাসের হিল্লোলে, ঘনসবুজ ধানের শীষের কম্পন, বর্ষার জলে পুষ্ট বেগবতী নদীর চরের কাশবন- নূতন পোষাকের গন্ধ, এই সবের মধ্যে দিয়ে এসে গেল দুর্গাপূজা। পূজারী ব্রাহ্মণদ্বয়, বিপিন মোহন চক্রবর্তী ও রাজেন্দ্র মোহন চক্রবর্তী দুই ভাই। তাঁরাই বংশপরম্পরায় জমিদারবাড়ীর পূজারী। জমিদারবাড়ীর অঙ্গনে রাধামাধবের মন্দির। তার নিত্যপূজার্চনার ভারও বিপিনবাবুর উপর। অষ্টমীর দিন বড় আকর্ষণ পাঠাবলি। গ্রামের লোকজন ভীড় করে আসে। তাপস লক্ষ করছিল, ঠাকুরদালানের একপাশে খুঁটিতে বাধা কালো রংএর পাঠাটা ভয়ার্ত স্বরে ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডেকে চলেছে।সমবেত ঢাক ঢোল ও কাঁসরের ধ্বনিতে তার আওয়াজ চাপা পড়ে গিয়েছে।
বেচারা বুঝতেও পারছে না, আর একটু সময়ের অপেক্ষা। তারপরই তার ভবলীলা সাঙ্গ হবে। প্রথমে লাউবলি, তারপর পাঠাবলি। উত্তেজিত ছোট ছোট বাচ্চারা হাঁড়িকাঠের স্বল্পদূরত্বে দাড়িয়ে। তাপস আর তারকয়েকজন পরিচিত, বৃথাই চেষ্টা করল তাদেরকে দূরে সরাতে। পাঠার মাথাটা হাঁড়িকাঠে, আর তার পা দুটো শক্ত করে পিছনে ধরে আছে একজন। কপালে রক্ততিলক কাটা ঝাঁকড়া চুলমাথা লোকটা খড়্গটা তুলেছে মাথার উপর, এমনসময় এক দুর্ঘটনা একটুর জন্য ঘটেও ঘটল না। একটি বছর পাঁচেকের ছেলে, পিছন থেকে ভীড়ের ঠেলায় তাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে এসে পড়ল হাড়িকাঠের উপর। চারিদিক থেকে রব উঠল- ‘গেল গেল’। লোকটির উদ্যত খাঁড়া, তখন নিজের মাথার উপর, এক লহমার ব্যবধান হলে কী হয়ে যেত বলা যায় না। লোকটা সামলে নিল, খাঁড়া মাথার উপরেই রইল, শিশুটিকে তাপসই ধরে সরিয়ে আনল। মূহুর্তের মধ্যে সবাই স্তব্ধ, ঘটনার আকস্মিকতায়। দেখতে দেখতে এসে গেল বিজয়া দশমী। সন্ধ্যেবেলায় নরসুন্দা নদীতে ভাসান সেরে এসে কোলাকুলি পর্ব। ছোটরা বড়দেরকে প্রণাম করে। তারপর মিষ্টিমুখ। ছোটদের অবশ্য বিজয়া পর্ব চলে দু-তিন দিন ধরে। পাশাপাশি সব বাড়ীতে গিয়ে বড়দের প্রণাম করে অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করে, কতক্ষণে রেকাবীতে করে গৃহকর্ত্রী মিষ্টি, নাড়ু, নিমকি নিয়ে আসবেন।
ক্রমশঃ











Comments
Post a Comment