ধূসর অতীত (হরিদাসের কথা)

 


ধূসর অতীত পর্ব (হরিদাসের কথা)


সময়টা ১৯৩৭। হরিদাসের বাবা ডাক্তারি করেন খলাপাড়া গ্রামে। এই গ্রামটি ময়মনসিংহের নেত্রকোণা উপজেলার মধ্যে পড়ে। হরিদাসের মামার বাড়ী আঠারবাড়ীতে। যতীনবাবুর বোন, রজনী মোহনের জেষ্ঠ্যা কন্যা প্রতিভা হচ্ছেন হরিদাসের মা। দিগিন ডাক্তার,বছর কয়েক হল নিজের গ্রামের বাড়ী দেইলি ছেড়ে, তার  নিজের মামার বাড়ী, খলাপাড়াতে এসে বসবাস করছেন। দুটো কারণে তার এই সিদ্ধান্ত। এক তো খলাপাড়া গ্রামটা দেউলির থেকে বড়, গ্রামে এবং আশেপাশের গ্রামে ডাক্তার নেই। তাই পসার জমান সুবিধা। সেটা অচিরাৎ বোঝা গেল, কারণ প্রাকটিশ জমিয়ে নিতে বেশী সময় লাগল না। কম্পাউন্ডারি বিদ্যাটা তার আয়ত্তের মধ্যে ছিল, গ্রামেরই এক ছেলে, বিদ্যাপতিকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেন। টিংচার আয়োডিন, ল্যাকটোক্যালামাইন, ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ইত্যাদি নানা রকম সল্টের সঙ্গে মিক্সচার বানিয়ে ডোজ মেপে সে রুগীদের বুঝিয়ে দেয়। ছোটখাট ব্যান্ডেজ, সুই লাগানোতেও এখন তার হাত পোক্ত। এই অঞ্চলে  মুসলিম রুগীই বেশী। সাধারন জ্বরজারি, বর্ষাতে পেটের রোগ এসব রুগীই বেশী। ছোটখাট অসুখ হলে দিগিন ডাক্তার,হোমিওপ্যাথিক উষধ দেওয়া পছন্দ করেন। এজন্য কলকাতা থেকে একটা মেটেরিয়া মেডিকা আনিয়ে রেখেছেন। তাতে রুগীর খরচা কম পড়ে। সঙ্কটাপন্ন কেস হলে মোহনগঞ্জ নয়ত নেত্রকোণাতে রেফার করতে হয়। রাস্তাঘাটও ভাল না। বর্ষার সময় বা বর্ষার পরে রাস্তাঘাট কর্দমাক্ত থাকে। গরুড়গাড়ী তে করে রুগী নেওয়া মুস্কিল। শীতকাল বা গরমকালে সেই অসুবিধা নাই। বর্ষাতে তাই খাটিয়াতে শুইয়ে পাল্কীর কায়দায় নিতে হয়।

                 দিগিন বাবুর বাসা , খালিয়াজুড়ীতে

তার এখানে আসার দ্বিতীয় কারণটা হল তার গিন্নি প্রতিভা পাচটি ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে সামলে উঠতে পারছেন না। ছোট ছেলে কল্যাণ ছোটমেয়ে রীনার তখনও জন্ম হয় নি। আত্মীয়স্বজন বাড়ীর কাছাকাছি থাকলে প্রতিভা দেবীর একটু সোয়াস্তি। তার উপর খলাপাড়াতে একটা ছোট প্রাইমারী ইস্কুল আছে। প্রাইমারী মানে আজকালকার নার্শারী স্কুল। সেখানে পড়ার থেকে খেলাই বেশী। হরিদাসের দুইদিদি সেই স্কুলে পড়তে যায়। গত জন্মদিনে তাকে তার দিদিমা উপহার দিয়েছেন স্লেট পেন্সিল। দুইদিদি রবি ঠাকুরের লেখা সহজপাঠ পড়ে। সেই বই দেখে সে ,,, লিখতে শিখেছে। সে এবার বায়না ধরেছে, দিদিদের সঙ্গে স্কুলে যাবে। গ্রামের পাঠশালার প্রধান শিক্ষক শেখ জামাল হোসেন। লম্বা চেহারাকাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় সবসময় ফেজ টুপি। উনি ছোটবেলায়, সিলেট শহরে মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। আশেপাশের গ্রামের অনেক মুসলিম সম্প্রদায়ের বাস, তবে অক্ষরজ্ঞান কম সংখ্যকেরই আছে। বেশীরভাগই পেশায় জেলে, কিছু ঘর হিন্দু আছে, তাদের মধ্যে জেলে, মাঝি, কুমোর বেশ কয়েকজন, কেউ কেউ ঘরামির কাজও করে, প্রতি এক দু বর্ষা পরেই, খড়ের চাল নূতন করতে হয়।

শেখ সাহেব গতকাল সন্ধ্যায় দিগিন ডাক্তারের কাছে এসেছিলেন  তার বিবি সেলিনার জন্য ঔষধ নিতে।সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। প্রতিভা তুলসীতলায় পিদিম জ্বালিয়ে শাঁখ বাজানো শেষ করলেন। দিগিন ডাক্তার শাঁখের ফুঁ এর সঙ্গে সঙ্গে, মাথায় হাত ঠেকিয়ে ইষ্টদেবতাকে স্মরণ করলেন। পাশের ঘরে বিদ্যাপতিকে ডেকে বল্লেন, ‘আজকে আর কেউ আসবে না মনে হয়। আকাশটা কেমন থম মেরে আছে। সব গুছিয়ে তোল। হ্যারিকেনটা নিয়ে আয় দিগিন ডাক্তার স্টেথোটাকে বাক্সে ঢোকাতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় শেখ সাহেব এসে হাজির। শেখ জামাল, মুসলিম সমাজে প্রতিপত্তিশালী। তাকে বলা যায় না কাল আসুন।

                 শেখ জামাল, হরিদাসের হাতেখড়ি এর কাছে
শেখ সাহেব, ‘আদাব ডাক্তারবাবুবল শুরু করে, কথায় কথায় জানালেন, আজকাল গ্রামের মসজিদের ইমাম, দেশের বাড়ী গিয়েছেন, তাই তার উপর ইমামের দায়িত্ব, মাগরিবের নামাজটা আদা করে তিনি আসছেন, তাই এত দেরী। ঔষধ নেওয়ার পরে একটু খোশগল্প হল। তার একভাই সিলেটের চা বাগানে কাজ করে। তিনি মাসকয়েক আগে সিলেট হয়ে ফেন্সুগন্জের চাবাগানে গিয়েছিলেন। জায়গাটা সমতল নয়, কিছুটা পাহাড়ী। সেখানে মাইলের পর মাইল ঘন সবুজ চা বাগান। শেখ সাহেবের কথায় সিলেটী টান। কথায় কথায় তিনি বলছিলেন, আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে এক মুসলিম ধর্মপ্রচারক, সুদূর ইয়েমেন থেকে অনেক আউলিয়া নিয়ে  পূর্বদিকে যাত্রা করেন। তার সঙ্গে ছিল তার মাতৃভূমির মাটি। ঠিক করেছিলেন, তিনি ইসলাম ধর্মের প্রচার করবেন সেই স্থানে, যেখানের মাটি হবে তার জন্মস্থানের মত। তা সেই মাটি নাকি পাওয়া গেল সিলেটে এসে। সেই পীরবাবার নাম ছিল শাহ হজরত জালাল। অচিরেই পীরবাবার নাম ছড়িয়ে পড়ে এবং তার সাথী আউলিয়াদের কল্যাণে সিলেটে আজ মুসলিমদের বাড়বাড়ন্ত। কথার মাঝখানে হরিদাস দু কাপ চা নিয়ে ঢুকল। মা পাঠিয়ে দিয়েছেন। শেখ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন- ‘এইডা কি আপনার বড় ছাওয়াল? কত বয়স হইল? পাঁচ  বছর হয়েছে শুনে বল্লেন-‘ এরে দিদিদের সাথে স্কুলে পাঠাইয়া দ্যান 

স্কুল বেশী দূরে নয়। কিন্তু বর্ষাকালে স্কুল যাওয়া মানে নৌকাতে যেতে হবে। পূর্ববঙ্গে, বর্ষার প্রকোপ বেশী। হরিদাস মায়ের কাছে কবিতা শুনেছে-‘বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর, নদেয় এল বান তাদের খলাপাড়া চারিদিকে জল থইথই। ফি বর্ষাতেই এরকমটা হয়। নেত্রকোণার উত্তরদিকে গারো হিলস। বর্ষার পরে আকাশ পরিষ্কার থাকলে, তাদের গ্রাম থেকে অনেক দূরে সেই পাহাড়ের অবয়ব দেখা যায়।

             খালিয়াজুরী বিলের পাশ দিয়ে রাস্তা
                 গোধূলি আলোয় বিলের জলের স্বর্ণাভ ছটা
তার পিসির বাসা আরো দশ মাইল উত্তরে, জায়গার নাম খালিয়াজুড়ি। সেখান থেকে গাড়ো পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। ছবিতে পাহাড়ের চূড়া যেমন উঁচু হয়ে থাকে, এই পাহাড় কিন্তু সেরকম নয়, মনে হয় চূড়াটা কেটে সমান করে দিয়েছে, বড় হয়ে জেনেছে, এরকম পাহাড়কে টেবিলটপ হিলস হলে।

                   সামনে গারো পাহাড়ের হাতছানি 
সেই
বিস্তীর্ন গারো, খাসি, জয়ন্তিয়া পাহাড়ের বৃষ্টির জল সমতলভূমিতে নেমে আসে নেত্রকোণা, কিশোরগন্জের অনেক জায়গা জলে ভরে যায়। মনে হয় যেন সমুদ্র। হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, জলে হাল্কা হাল্কা ঢেউ। এউ জল আবার নেমে যায় আশ্বিন মাসে। শীতকালে সেখানে ধান চাষ হয়।তখন দেখে কে বলবে যে এই জায়গা বর্ষাতে পুরো জলমগ্ন ছিল। এই জলমগ্ন এলাকাকে স্থানীয় ভাষায় বলেহাওর

                         বর্ষায় হাওরের রূপ
বর্ষাকালে
, হরিদাসের বাড়ী থেকে প্রতিবেশীদের বাড়ী যেতেও কলাগাছের গুঁড়ির  ভেলা লাগে। কয়েকটা কলাগাছের গুড়িকে একসঙ্গে লাগিয়ে, আড়াআড়ি ভাবে বাঁশ বেধে ভেলা তৈরী হয়ে। লগি দিয়ে ঠেলে একা একাই যাওয়া যায়। ডুবে যাবার ভয় নাই। সাধারনত বুক সমান জল। স্কুলটা হাঁটা পথে পাঁচ-সাত মিনিট। বর্ষাতে আশেপাশের কয়েকজন মিলে নৌকা করে যায়। হরিদাস স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে কাগজের নৌকা বানাতে শিখেছে। নৌকায় যাওয়ার পথে কাগজের নৌকা বানিয়ে জলে ভাসায় আর অবাক চোখে দেখে নৌকা কি সুন্দর স্রোতের সাথে ভেসে চলেছে।


গরীব হিন্দু বা মুসলিমের অনেক সময় ডাক্তারবাবুর ফিস নগদে দিতে পারত না। দিগিন ডাক্তারও মুখ ফুটে চাইতে পারতেন না। একদিন অনেক রাতে বৈঠকখানার দরজায় ঠকঠক করে শব্দ। পাড়াগাঁ জায়গা। গৃহস্থর সন্ধ্যার পর থেকেই খিল লাগিয়ে বসে থাকে। রাত্রি আটটা সাড়ে আটট নাগাদ সবাই শুয়ে পড়ে। দরজায় এরকম দুমদাম আওয়াজ শুনে পরিবারের বাকী লোকজন শংকিত। ব্যাপারটা কি? ডাকাত দল নয়ত? দিগিন ডাক্তার তার চাকর তরণী, লাঠি আর বল্লম নিয়ে দরজা খুললেন। বাইরে পাশের গ্রামের জেলে হরুণ মিয়া দোকগোড়ায় দাড়িয়ে। সঙ্গে চুপড়িতে একটা বিশাল বড় আর মাছ। একটু আগেই জালে ধরা পড়েছে। গেল শীতে তার ছেলেটা নিউমোনিয়াতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। দিগিন ডাক্তারের চিকিৎসাতে সে সুস্থ হয়েছে। সেবারে হরুণ ডাক্তারবাবুর ফিস দিতে পারে নি। ডাক্তারবাবু দুবার তো তার বাসাতেই এসেছিলেন ছেলেকে দেখতে। তাই সেই ঋন পরিশোধ করতে এখন ডাক্তারবাবুর জন্য সে এই বিশাল চার পাঁচ সেরের মাছটা নিয়ে এসেছে। ডাক্তারবাবু এত বড় একটা মাছ নিতে ইতস্ত করছিলেন। কিন্তু সোজা সরল লোকটার ঐকান্তিক অনুরোধে মাছটা তাকে নিতে হল। গরীব লোকেরা অনেকসময় চেম্বারে আসতে ভয় পেত। ছুটির দিনে হাটতে বেরোলে, গ্রামের লোক তার পিছু নিত, রোগের ব্যাপারে শলাপরামর্শ করত। ফেরার সময় তাদের দেওয়া, গাছের পেঁপে, কলা, লাউ বা ফুলকফি কিছু না কিছু তার হাতে থাকত। একবার তো এক আস্ত মোষ এক রুগীর পরিবার দিয়ে গেল।

বর্ষাতে আশেপাশের বাড়ী যাওয়া মানে এক হাঁটু জল ভেঙে রাস্তা দিয়ে যাওয়া। সময় রাস্তার মধ্যে ছোট ছোট ট্যাংরা, কই, মাগুর কখনো সখনো উঠে পড়ে। হরিদাস তার বাড়ীর দুই কাজের লোক, তরণী আর ধরনী সঙ্গে, গামছা নিয়ে লেগে পরে মাছ ধরতে। সঙ্গে কখনো সখনো ছোট ভাই দুলালও থাকে।

ক্রমশঃ


ধূসর অতীত পর্ব ১০


নেত্রকোনা, কিশোরগন্জ ইত্যাদি জায়গাতে বর্ষাকালে বাজার হাট ঠিকমত বসে না। রান্নাবারির দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে গ্রামের বৌ, ঝিদের প্রধান বিনোদন, পূজা-পার্বন, হাট বা মেলা, যাত্রাপালা ইত্যাদি। বর্ষাকালে সবই বাড়ন্ত। তাই বাসার মা, দিদি, বোনেদের টুকিটাকি কেনার শখ পূর্ণ করার জন্য, নৌকাতে করে ভ্রাম্যমান দোকানী পসরা সাজিয়ে আসে।  নদীর ঘাটে নোঙর করে তারা ঝুড়িতে করে চুল বাধার ফিতে, ক্লিপ, নানা রংএর চুড়ি  আলতা সিঁদুর, পুতির মালা, নাকছাবি ইত্যাদি বিক্রি করতে নিয়ে আসে। সাধারনত মুসলিম মেয়েরাই এই কাজে যুক্ত। যেদিন তারা আসে, হরিদাসের মা, মাসী, মামী বোনেদের কি উৎসাহ। রান্না বান্না শিকেয় তুলে, যে যার পছন্দমত টুকিটাকি সাজগোজের জিনিষ কিনতে ব্যস্ত। রূপচর্চার চিরন্তন প্রবৃত্তি মেয়েদের মধ্যে সহজাত।

                            গ্রামের ফেরীওয়ালা


গ্রামানঞ্চলে বিশেষত বর্ষাতে সাপের উপদ্রবের কথা সর্বজনবিদিত। তাই পূর্ববঙ্গে বর্ষাতে মনসা পূজার খুব প্রচলন। শ্রাবন মাসে, নাগ পন্চমীর দিনে, খলাপাড়া গ্রামে মনসার থানে ঘটা করে মনসাদেবীর পূজা হয়। মনসামন্দিরের ভিতর অষ্টনাগের মধ্যে মনসাদেবী পদ্মপাতায় আসীন। তার দুইপাশে বেহুলা আর লখিন্দরের মূর্তি। হিন্দু রমনীরা সেদিন উপবাস করে মন্দিরে আসে। মন্দিরের আশেপাশে সাপের গর্তে দুধ ঢেলে পূজা শুরু হয়।  

                         গ্রামে মনসাপূজা হচ্ছে
মনসামঙ্গল
কাব্য পাঠ, মনসা গানের মধ্যে দিয়ে পূজা সমাপ্ত হয়। পূজার জায়গা হয়ে ওঠে এক মিলনস্থল। হরিদাস এর মত বাচ্চারা অবশ্য মন্দিরের বাইরের খেলাতেই মেতে থাকে বেশী।

তবে এই মনসা কেন্দ্রিক আরকেটা জিনিষ হয়, যাতে ছোট ছেলেপুলেরা আকর্ষিত হয় বেশী। সেটা হচ্ছে পটচিত্র প্রদর্শন। এগুলি সাধারনত মুসলিম মেয়েরা বাড়ী বাড়ী গিয়ে প্রদর্শন করে। দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত নিদর্শন। তাদের হাতে থাকে মোড়ান লম্বা পার্চমেন্ট পেপারের কাগজ। তাতে পরপর আঁকা থাকে হয় বেহুলা-লখীন্দরের কাহিনী অথবা মনসামঙ্গল কাব্য। সবই চিত্রের মাধ্যমে। পটুয়া, কাগজের রোল খুলতে খুলতে এক একটা করে ছবি দেখায় আর সঙ্গে সঙ্গে গান করে যা কিনা ওই দৃশ্যসম্বন্ধিত। ছোটরা সবাই গোল হয়ে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনে। 


 

বছরখানেক পরের কথা। হরিদাস এখন পড়ছে বারহাট্টা নামে নেত্রকোনার এক গন্জ শহরের প্রাইমারী স্কুলে। ছেলে মেয়েরা বড় হচ্ছে। তাদের শিক্ষার জন্য, দিগিন ডাক্তার তার খালাপাড়ার বসতবাটী গুটিয়ে নূতন করে প্রাকটিশ শুরু করেছেন বারহাট্টাতে।

                   বারহাট্টা গ্রামের কাছে রেললাইন
ময়মনসিংহ
নেত্রকোনা লাইনের শেষ স্টেশন মোহনগঞ্জ। হরিদাসের, খালাপাড়ার থেকে ১৮ কিমি দূরে ছিল এই মোহনগঞ্জ স্টেশন। নেত্রকোনা স্টেশনের পর মোহনগঞ্জের দিকে যেতে গেলে পরপর যে স্টেশনগুলি পড়ে, সেগুলি যথাক্রমে, বাংলা, ঠাকুরকোনা, কংসনদী, বারহাট্টা, আতাতপুর। দিগিনডাক্তারের নিজ বসতভিটা দেউলি গ্রামে। সেটা ঠাকুরকোনা থেকে এক মাইল। কংসনদীর একটা শাখানদী পেরিয়ে যেতে হয়। গরমকালে সেই নদী দিব্যি পায়ে হেটে যাওয়া যায়। কিন্তু বর্ষাতে নৌকা লাগে। কংস নদীটি নেত্রকোনার উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত। এর উৎসস্থল বর্তমান মেঘালয়ের তুরা পাহাড়।বারহাট্টা থেকে, ইউনিয়ান বোর্ডের রাস্তা ধরেও সোজা দেউলি গ্রামে পৌছান যায়। তবে এই হাটাপথের দুরত্ব মাইল চারেক।

 নূতন স্কুলে হরিদাসের বেশ বন্ধু তৈরী হয়েছে। তার দুই ভাইও তার সঙ্গে স্কুলে যায়। স্কুলটা রেললাইনের ধার ঘেষে। শ্রেনীকক্ষের জানালা দিয়ে, সমতল থেকে দশহাত উঁচু দিয়ে রেললাইন। ক্লাস চলাকালীন দূর থেকে ট্রেন আসার শব্দ পাওয়া যায়। পড়া ভুলে হরিদাস জানালা দিয়ে ট্রেনের যাতায়ত দেখে। ট্রেনের কু ঝিকঝিক আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে হরিদাস মনে মনে গুনগুন করতে থাকেরেলগাড়ী ঝমাঝম, পা পিছলে আলুর দম বিকালে স্কুল ছুটির পর রেল লাইন পেরিয়ে বাড়ী যাওয়ার রাস্তা। প্রায়ই বন্ধুরা মিলে রেললাইনের উপরে দুহাত সোজা রেখে ব্যালেন্স করে হাঁটার চেষ্টা করে। এটাও একটা খেলা, যে বেশীক্ষণ লাইনের উপর হাটতে পারে সে জিতে যায়।

দিগিন ডাক্তার, তার চেম্বার নিয়েই বেশী ব্যস্ত থাকেন। তাই বাড়ীর বড় ছেলে হিসাবে, মা তাকে মাঝেমাঝে বাজারে পাঠান। হরিদাসের অঙ্কে মাথা সাফ। সে বেশ গুছিয়ে, পয়সার হিসাব রেখে বাজার করা শিখে নিয়েছে। তাদের নিজেদের বাসা দেউলি গ্রামে। দেউলি ছোট গ্রাম। গ্রামের বেশীরভাগ পরিবার কৃষিজীবি। দেশের বাড়ী থেকে, সারা বছরের অন্ন সংস্থানের চাল, ডাল, আনাজ, ফল-পাকুড় নিয়ে আসা হয়। তাদের কাজের লোক তারিনীকে খলাপাড়া থেকে এনে রেখেছেন দিগিন ডাক্তার।সে এইসব আনা নেওয়ার কাজ করে। শীতকালে পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ তখন সংক্রান্তির ছুটি থাকে। পৌষ সংক্রান্তির দিন খুব মজা হয়। সেদিনটাতে খুব ভোরে সব ছোটবাচ্চারা উঠে পড়ে। ঠান্ডার দিন বলে আরো বেশী মজা লাগে। তেল মেখে সবাই নদীতে দাপাদাপি করে স্নান করে। তারপর ঠান্ডাতে হি হি করে কাঁপতে কাঁপতে, খড়ের আগুন জ্বালানো থাকে আগে থেকে, সেইখানে বসে সবাই তাপ নেয়, তার সঙ্গে গল্প, হাসি ঠাট্টা ইয়ার্কি  সমানে চলতে থাকে। এরপর বাড়ী ফিরে গিয়ে, পিঠে, পুলি, পায়েসের পর্ব।

ক্রমশঃ


ধূসর অতীত পর্ব ১১


বারহাট্টাতে একটা সার্কিট হাউস আছে। সেখানে একটা সুন্দর বাগান আছে। মাঝেমাঝে বড় সরকারী অফিসাররা আসেন। তখন গেট বন্ধ থাকে। দারোয়ানের ছেলে হরিদাসের ক্লাসেই পড়ে।হরিদাস কয়েকবার তার সঙ্গে গিয়েছে।কেউ না থাকলে,দারোয়ান মাঝে মাঝে দরজা খুলে দেয়, ভিতরের বাগান দেখার জন্য।

দুর্গাপুজার সময়টা পুরো পরিবার বারহাট্টা থেকে খলাপাড়া যায়। বাড়ীতে সব শরিক মিলে ধুমধাম করে পূজা হয়। বারহাট্টা থেকে দু স্টেশন পরে মোহনগঞ্জ। সেখান থেকে দশমাইল হাঁটা পথ। কাশবন আর সবুজ ধানের ক্ষেতের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তা। দশমীর ভাসানের দিনটা খুব আকর্ষণীয়। আশেপাশের প্রতিটি গ্রামেই পূজা হয়। দশমীর দিন প্রতিমা এনে তোলা হয় নৌকাতে। সেই নৌকা যায় আশেপাশে গ্রামের ঘাটে। তখন গ্রামের এয়োরা আসে ঠাকুরবরণ করতে। পুরো গ্রামের লোক ভীড় করে ঘাটে। ঢাক, ঢোল, কাঁসরঘন্টায় ভরে থাকে ঘাট। ঢাকের আওয়াজ তখন হয়ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন এরকমভাবে সব গ্রাম প্রদক্ষিন করে নৌকা ফেরে নিজের গ্রামে। সন্ধ্যায় ভাসান। দুটো নৌকার মাঝে ঠাকুর বসিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য আরো নৌকাতে থাকে দর্শনার্থীর দল। নদীর মাঝখানে এসে নৌকা দুটি দুদিকে সরে যায়। হয়ে যায় ঠাকুরের বিসর্জন। ধ্বনি ওঠেআসছে বছর আবার হবে


বারহাট্টা থাকাকালীন একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। লোকটাকে, হরিদাস দেখেছে, তার বাবার চেম্বারে ঔষধ নিতে। হরিদাসের শখ ছিল, মাঝে মাঝে বাবার চেম্বারে চলে যেত, হোমিওপ্যাথিক পুড়িয়া কাগজে ভাজ করে রোগীকে কাগজের ছোট্ট লেফাফাতে ভরে দিয়ে বাবাকে সাহায্য করত। তা সেই লোকটা অবাঙ্গালী, ইউপির বেনারস সাইডের লোক। নাম রামশরণ শর্মা। তার বাড়ী নাকি বেনারসের পশ্চিমপারে। তার কথা অনুযায়ী পশ্চিমপারের লোকেরা কৌলিণ্যে বেশী উঁচুতে, পূর্বপারের থেকে। রামশরণ ছিল থানার হাবিলদার। ধীরে ধীরে রামশরণ স্থানীয় কালী মন্দিরে যাওয়া শুরু করল কিছুদিন পরে, রামশরণের কালী মন্দিরে যাওয়াটা দিনে পাঁচ ছয়বার হতে লাগল। বছর ঘুরে যেতে না যেতে সে মন্দিরেই থাকা শুরু করল।কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরী থেকে বরখাস্ত করে দিল। তখন সে জটাজুটমন্ডিত এক সাধক। ক্রমে ক্রমে তার খ্যাতি দূরদেশে ছড়িয়ে পড়ল। বারহাট্টার কালীমন্দির সদাই দর্শনার্থীদের আগমনে মুখরিত। সবাই আসছেকালীরামবাবার আশীর্বাদ নিতে। তখন সে কালীরাম নামেই পরিচিত।একবার এক অচেনা ভদ্রলোক এলেন দিগিন ডাক্তারের কাছে। তিনি আসছেন সুদূর ঢাকা থেকে। কালীরাম বাবার কাছে যাবেন। দিগিন ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন-‘তা বলেন, আমি আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি?’ ভদ্রলোক জানালেন, তার একটা কাচের ছোট শিশি চাই, কারণ কালীরামের মন্ত্রপূতঃ জল ধাতুর পাত্রে নেওয়া যাবে না। দিগিনবাবু মনে মনে ভাবলেন বছরখানেক আগেও রামশরণ তার কাছ থেকে ঔষধ নিত, একেই বলে ভাগ্যের চাকা ঘোরা, এখন সে লোককে মন্ত্রপূতঃ ঔষধ দিচ্ছে। তিনি নিজে অবশ্য অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস করেন না। সে যাই হোক, উনি, তাকে একটা ঔষধের খালি শিশি দিয়ে বিদায় করলেন।


বর্ষাকালে সচরাচর দূরে যাওয়া কম হয়। একবার ভরা বর্ষাতে খবর এল খালিয়াজুড়িতে হরিদাসের যে পিসি থাকেন, তিনি অসুস্থ। হরিদাসের ঠাকুমা যাবেন খালিয়াজুড়িতে, মেয়ের দেখভাল করতে। হরিদাসের ছোটবেলার খলাপাড়া গ্রাম ছাড়িয়ে সে গ্রাম আরো দশ মাইল। যাওয়া মানে মোহনগঞ্জ স্টেশনে নেমে যেতে হবে নৌকায়। হরিদাস, ঠাকুমা আরো দুজনকে নিয়ে শুরু হল নৌকা যাত্রা। সঙ্গে বেশ অনেক মালপত্র। মেয়ের বাড়ীর জন্য, দেউলির বাসা থেকে চাল, ডাল আরো জিনিষ নিয়ে চলেছেন হরিদাসের ঠাকুমা। হাওড় যেন দেখতে এক সমুদ্রজল হয়ত একগলা। খলাপাড়া অব্দি এই হাওড়ের নাম গনেশের হাওড়। ধানের শীষগুলি বেরিয়ে আছে জলের উপরে। মেঘলা আকাশ। মাঝে সবাই মিলে খলাপাড়া নামলেন দুপুরের আহারাদি সেরে আবার যাত্রা। দুই মুসলমান মাঝি একটু পরে আকাশের কালো মেঘ দেখে বল্ল, মনে হয় ঝড় উঠবে। তারা আরো জোরে দাঁড় বাইতে লাগল। এই হাওড়টার নাম ডিঙ্গিপোতার হাওড়। চারদিকে যত চোখ যায়, পানি থইথই। এই হাওড়ের দুর্নাম আছে। ঢেউ ওঠে ঝড়ে। নৌকাডুবির ঘটনা প্রায়শই হয়। কিছু মৃত্যুও ঘটেছে। একটু পড়ে দিগন্ত জুড়ে কালো মেঘ। ঝড় উঠল, সঙ্গে সমান তালে বৃষ্টি। নৌকায় ছলাৎ ছলাৎ করে জল উঠছে। হরিদাস আর ঠাকুমা একটা পাত্র দিয়ে জল চাছতে লাগলেন। কিন্তু বৃষ্টির তেজ বেড়েই চলেছে। মাঝি উপায়ন্তর না দেখে বল্লনৌকা হাল্কা করতে হবে ঠাকুমা কি আর করেন। পন্চাশ সের চাল ছিল। সবই হাওড়ের গর্ভে দান করে সে যাত্রা রক্ষা পাওয়া গেল। ঝড় একটু পরে থেমে গেল। ঢেউগুলির দাপটও কমে গেল।


হরিদাসের এবার ক্লাস ফোর। বারহাট্টাতে উচুক্লাসের স্কুল নেই। তাই ঠিক হল হরিদাস মামার বাড়ী মানে আঠারবাড়ীতে থাকবে। মহিম চন্দ্র হাইস্কুলের বেশ নাম আছে। স্কুলটাও বাড়ীর পাশে। সেখানে থেকে পড়াশুনা করাই শ্রেয়। তাই প্রতিভা দেবী সাত ছেলে মেয়েকে নিয়ে চল্লেন বাপের বাড়ী। প্রতিভা দেবীর বড় দুই মেয়ে মায়া হেনা, যতীন বাবুর মেয়ে আরতি মিনতির খুব বন্ধু। কিরণবালা চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে  আরতি, মিনতি দুজনেই  ময়মনসিংহ থেকে আসছে পূজার ছুটিতে। মায়া আর হেনার তর সইছে না কবে পৌছাবে আঠারবাড়ী হরিদাসের বয়স সবেমাত্র দশ। তবে সে বাড়ীর বড়ছেলে। তাই তার দায়িত্বজ্ঞান সম্বন্ধে সে সচেতন যাবার সময় পোটলাপুটলি বাঁধা হল। প্রতিভা দেবী দেউলির বাসা থেকে চিনার চাল আনিয়েছেন। বড়মা চিঠিতে লিখেছেন চালের জন্য। সুগন্ধযুক্ত এই চাল পায়েস বানাবার খুব উপযুক্ত। বড়দা মানে যতীনবাবু শুটকি মাছের ভক্ত নন। কিন্ত তার ভাই গোরা আর ধন খুব সিঁধেল শুঁটকির ভক্ত। সেই মাছও বেশ ভাল করে বাঁধা হয়েছে। হরিদাস, তার ভাই দুলাল দিন গুনছে। তারা জানেমামা বাড়ী ভারী মজা কীল চড় নাই সেই সময়কালটা, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের প্রকোপ সরাসরি গ্রাম বাংলায় না পড়লেও কিছু আঁচ তো পড়েছে। জিনিষপত্রের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে। হরিদাসেদের বারহাট্টাতেও গোডাউন বানিয়ে খাদ্যশস্য মজুদ করা হচ্ছে। এসব নাকি জাপানীদের সঙ্গে যুদ্ধে লাগবে। স্কুলে একদিন বন্ধুরা খবর দিল লালমুখো সাহেব মিলিটারী তাবু ফেলেছে গুদামের কাছে। তারা শস্যভান্ডার পরিদর্শনে এসেছে। হরিদাস বন্ধুদের সঙ্গে গিয়ে দূর থেকে রাইফেল কাঁধে আমেরিকান মিলিটারী দেখতে গেল। তাদেরকে সবাইটমিবলে।




          কলকাতায় গোরা মিলিটারি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়
হরিদাসের হাসি পেল, সে তার বাড়ীর পাশের নেড়ীকুত্তার নাম রেখেছে টমি। ইয়াবড় লালমুখো রাইফেলধারী সাহেবকেওটমিনাম দিয়েছে দেশের লোকে।

ক্রমশঃ


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments